#মেহবুব
লেখনীতে: #তাবাসসুম_তোয়া
১২.
বিয়ের দুদিন পর সেই অঘটনটা ঘটালাম। আমি মিস অঘটন-ঘটন পটীয়সী।
উনি নিচে আসছেন—এটা দেখতেই আমি দৌড়ে গেলাম চাবি নিয়ে। আর দৌড়ে যেতে গিয়ে ডাইনিংয়ের চেয়ারে পা বাধল, আর সেই চেয়ার উল্টে আমার পায়ে পড়ল। ব্যাস! খানিকক্ষণ উঠতে পারলাম না। আর ধড়াম করে পড়া চেয়ারের শব্দ চলে গেল নিচ অব্দি। আম্মু আমাকে ধরে বসে থাকলেন। আমার চোখ বেয়ে নামল বর্ষার ঢল!
বাপ্পি গেট খুলে দিল। উনি দৌড়ে উঠে এসেছেন উপরে। আমাকে আর আম্মুকে বসে থাকতে দেখে দৌড়ে এলেন। এসেই আমার পা'টা আগে ধরে দেখলেন। দাঁড় করাতে চাইলেন, কিন্তু পারলাম না। পা ফেলতে পারলাম না, বেঁকিয়ে গেল!
আমি তখন উনার মুখের দিকে তাকাতে পারলাম না। চোখ দুটো একদম লাল করে আমার দিকে তাকালেন। চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন,
— "সবসময় ছুটোছুটি!"
বাপ্পিকে বললেন,
— "গাড়িটা বের করো।"
আম্মুকে বললেন,
— "আম্মু, ওর বোরকা আনো।"
আম্মু বোরকা আনলেন না, আনলেন আমার বড় খিমারটা। সেটাই পরিয়ে দিলেন। বাপ্পি ততক্ষণে নিচে হর্ন বাজাচ্ছে।
উনি বললেন,
— "আম্মু, বরফ দাও।"
আম্মু একটা হাফ লিটারের পানির বোতল বরফ করা ছিল, সেটা বের করে দিলেন। আম্মু আমাকে ফুঁ দিয়ে দিলেন। আমি ব্যথায় মরে যাচ্ছিলাম!
উনি কোলে করে নিচে নিয়ে গাড়িতে বসলেন। তারপর পা'টা ভালোভাবে দেখলেন। তারপর বরফটা লাগাতে থাকলেন আলতো হাতে!
উনি শুধালেন,
— "ভীষণ ব্যথা?"
আমি মাথা ঝাঁকালাম। পা'টা ফুলে উঠেছে অনেকখানি। পায়ের পাতায় হয়তো ফ্র্যাকচার হয়েছে!
আমি কাঁদছি ফ্যাঁচফ্যাঁচ করে। টিস্যু দিয়ে চোখ মুছে দিচ্ছেন, অথচ আমার দিকে তাকাচ্ছেন না আর!
উনি বললেন,
— "আমি আব্বুকে কী জবাব দেব? দুদিন হয়নি তার মেয়েকে এনেছি!"
ঝাপসা দৃষ্টিতে দেখলাম, উনি চোখ-মুখ একদম শক্ত করে আছেন! কী অগ্নিমূর্তি! নাকি মর্মাহত! বুঝতে পারলাম না!
হাসপাতালে পৌঁছে হুলস্থুল কাণ্ড বাধালেন ক্যাপ্টেন আহমেদ আল তারিক! উনার বন্ধু একজন ডাক্তার। খুব দ্রুতই সব হলো। এক্স-রেতে ধরা পড়ল মেটাটার্সাল আর টার্সাল মিলিয়ে হাড় ফাটছে ছয়টা।
কিছু পেইনকিলার দেওয়া হলো। আরও ওষুধপত্র প্রেসক্রাইব করে আর কী কী করতে হবে বলে দিলেন। বেড রেস্ট চার সপ্তাহের!
উনি বাসায় ফোন দিয়ে ডিপ ফ্রিজে পানি রাখতে বললেন। প্রধান ট্রিটমেন্ট বরফ দিতে হবে অনবরত আর বেড রেস্ট! অবশ্য এই পুরোটা সময় বরফ দিয়েই যাচ্ছেন একজন নার্স। তাই ব্যথাটা বেশ খানিকটা কমেছে!
বাসায় ফিরেছি রোগী হয়ে। আমি মূলত এসেছিলাম রোগীর সেবা করতে। বিয়েটাও তাড়াতাড়ি হলো উনার সেবা করব—সেই সিদ্ধান্তে। এখন উল্টো উনি তিনবেলা আমার সেবা করছেন! বরফ দেওয়ার পুরোটা দায়িত্ব উনি পালন করলেন।
কিন্তু সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে, উনি আমার দিকে তাকাচ্ছেনও না, আবার কথাও বলছেন না! আমি ছটফট করছি! কী করলে উনি মানবেন! আমি কয়েকবার সরি বলেছি। কিন্তু আমার কঠিন পুরুষের এত শক্ত, কঠিন রূপ কি আমার জানা ছিল?
পরের দিন সকালে আম্মুকে বললেন,
— "আমার ফিরতে হবে। রিপোর্ট করতে বলেছে এই সপ্তাহেই!"
আমার প্রাণ বের হয়ে গেল! এত দ্রুত সময় ফুরিয়ে গেল!
ঐদিন সকালে খাবার নিয়ে যখন এলেন, আমি বললাম,
— "সরি, আমি বুঝতে পারিনি ওভাবে পড়ে যাব। প্লিজ!"
উনি আমার চোখের দিকে না তাকিয়েই খাইয়ে দিচ্ছেন! তারপর যখন ওষুধ দিলেন, আমাকে সেটা খাইয়ে চলে যেতে নিলে আমি হাত আঁকড়ে ধরলাম। উনি হাতের দিকে তাকালেন। আমি ছাড়ছি না, উনিও যাচ্ছেন না।
হাত ধরে কাছে টানতে চাইলাম, কিন্তু বিশাল মানুষটাকে নড়াতে পারলাম না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকলেন। পুরো একদিন হয়েছে, উনি এমনটা করছেন।
আমি এবার কান্না করছি আর বললাম,
— "আর এমন হবে না, ওয়াদা করছি। প্লিজ!"
উনি বসে পড়লেন। আমি সঙ্গে সঙ্গেই একপাশ থেকে উনাকে জড়িয়ে নিয়েছি!
উনি যা রাগ করার করুক! আমি মানবো না। উনি কেন আমাকে দূরে রাখছেন! আমি কি ইচ্ছে করে করেছি?
উনি আমার সাহস দেখে অবাক হলেন মনে হয়।
উনি পাশ ফিরে আমার দিকে তাকালেন। আমিও উনার চোখের দিকে তাকালাম! উনি তাকিয়েই থাকলেন। আমার সাহস আরও বেড়ে গেল। উনার মান ভাঙাতে আমি সেদিন অনেকগুলো সাহসী কাজ একসাথে করলাম! যেটা এমনিতে ভাবতেও আমার গায়ে কাঁটা দিত!
°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°
আব্বু, আম্মু, মুহাইমিন সবাই এলো। আব্বু তো ভীষণ মর্মাহত হলেন। অনেকক্ষণ কথাই বললেন না। চুপচাপ আমার হাত ধরে বসে থাকলেন।
— "কীভাবে হলো, বাবা? একটু শান্তভাবে চলাচল করবে না?"
আমি কী বলব!
আব্বু নিজে বসে বসে ফল কেটে খাওয়ালেন। আব্বুর অফিস আছে। বিয়ের জন্য কয়েকদিনের ছুটি নিয়েছিলেন। তাই যেতেই হবে। আমাকে দোয়া-কালাম পড়ে ফুঁ দিয়ে গেলেন। এই কাজটা আব্বু ছোটবেলা থেকেই করতেন। কখনও সামান্যতম বিপদ হলেই আব্বু বারবার আমাদের দোয়া পড়ে ফুঁ দিয়ে দিতেন।
আম্মু থাকলেন সারাদিন।
— "কী করলি? ছেলেটার চেহারার দিকে তাকানো যাচ্ছে না! নিজেকে দোষী মনে করছে!"
— "এখানে উনার দোষ কোথায়?"
— "এত বছর কিছু হলো না, আর ওর কাছে নিয়ে আসছে আর অমনি এত বড় দুর্ঘটনা!"
ঐদিন সারাদিন উনি বাসাতেই থাকলেন, কিন্তু আম্মু আমার পাশে থাকায় বারবার দরজা দিয়ে দেখে চলে যাচ্ছিলেন। আম্মু সেটা বুঝলেন, তাই সন্ধ্যার দিকে মুহাইমিনকে নিয়ে চলে গেলেন। বাপ্পি পৌঁছে দিল।
রাতে রুমে ঢুকে সেই ফোন! কথা বলছেন আর এটা-ওটা করছেন। কথা শেষে আমার পাশে বসলেন। আমাকে কোলের মধ্যে টেনে নিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন,
— "তুমি ঢাকা ফিরে যাবে কীভাবে? তোমার সেমিস্টার ফাইনাল কবে?"
— "সামনের মাসে।"
— "ক্লাস করা লাগবে না? কতগুলো পরীক্ষা মিস দিয়েছ এ পর্যন্ত?"
আমি মাথা নিচু করে ভাবলাম। উনি বললেন,
— "এতগুলো বছর কোনো অঘটন ঘটল না, আর যখনই আমি আমার বুকে আনলাম, অমনি এত বড় দুর্ঘটনা হলো।"
উনার কণ্ঠে লুকানো দুঃখটা আমি স্পষ্টই বুঝতে পারলাম। সান্ত্বনা দিতে পা উঠিয়ে বললাম,
— "এই দেখেন, আমি একদম সুস্থ। কোনো ব্যথা নেই! ফোলাটাও কমে গেছে!"
উনি সত্যিই উঠে গিয়ে পা'টা ভালোভাবে দেখলেন, কী অবস্থা!
আমি মাথা নিচু করে বসে থাকলাম।
উনি দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। মনে হচ্ছে ভাবছিলেন, কী করবেন!
আমিও চিন্তায় পড়ে গেলাম। পা সুস্থ না হওয়া অবধি উনি ছাড়বেন না। আবার ক্লাস-পরীক্ষা মিস যাচ্ছে। আমিও ভাবতে বসে গেলাম। গতদিনও সিআরের মেসেজ পেলাম। পরশুদিন আরেকটা সিটি আছে। কিন্তু কী করা! আমার কাছে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শুধুই একজন! কিন্তু সেই একজনই আমার ক্লাস-পরীক্ষা নিয়ে বেশি তটস্থ!
উনি ঠিক করেছিলেন, বিয়ে শেষে উনি ফিরে যাওয়ার সময় আমাকে হলে রেখে যাবেন। সপ্তাহখানেকের ব্যাপার! কিন্তু পা ফাটিয়ে আমি পড়ে রইলাম। আর উনারও সময় ফুরিয়ে আসছে। আমিও ভাবছি, সেও ভাবছে।
আমি খেয়াল করিনি, সে আমার দিকে তাকিয়ে। আমি কানের কাছের চুল একটা একটা করে টেনে নিয়ে কামড়াচ্ছি আর ভাবছি। এটা বলতে গেলে আমার আরেকটা অভ্যাস! চিন্তা করলেই চুল কামড়াই!
হঠাৎ খেয়াল করলাম, উনি আমার দিকেই তাকিয়ে! কী অদ্ভুত দৃষ্টিতে! আমি সাথে সাথে চুল ছেড়ে দিয়েছি।
উনি আরও এগিয়ে এলেন!
— "Peculiar woman, আর কী কী স্বভাব আছে তোমার?"
আমি থতমত খেয়ে গেলাম।
— "নেই।"
— "নেই না?"
আমি ঝাঁকালাম, নেই!
কেমন করে তাকালেন, আর তাকিয়েই থাকলেন! আমি বুঝলাম, বিপদ সংকেত সাত ছাড়িয়ে মহাবিপদ সংকেত আটের পথে! আমি এবার কই পালাই!
আমি বালিশ হাতে নিয়েছি, চেহারা ঢাকব ঢাকব। উনি ওখান থেকেই হাত বাড়িয়ে বালিশটা ধরে নিলেন। বললেন,
— "আজ থেকে আমি তোমার বালিশ, আমাকে দিয়ে তোমাকে ঢেকো।"
চলবে....