ফন্ট সাইজ:
থিম:
ঝরা ফুল

৫ম পর্ব

লেখক: বিনতে ফিরোজ

‘ঝরা ফুল’

বিনতে ফিরোজ

৫.

ইবলিশ চত্বর শুনশান হয়ে আছে। সচরাচর এতোটা ফাঁকা থাকে না। আড্ডারত বন্ধুদের দল, রিকশা থামিয়ে গল্প করতে থাকা মামা অথবা ছিন্নমূল মানুষ। কেউ না কেউ সবসময়ই থাকে। আজ কেনো ফাঁকা কে জানে। কোনো বিশেষ দিবস কি? মামুন জানে না। এদিক দিয়ে সে খুবই কাঁচা। নিজের জন্মদিনটাও খেয়াল থাকে না। বাংলালিংক থেকে দফায় দফায় মেসেজ না দিলে সেটাও অন্যান্য কাজের চাপে মস্তিষ্কের এক কোণায় পড়ে থাকে। কেউ বয়স জিজ্ঞেস করলে থতমত খেয়ে হয়। গুনতে হয় সেই দুই হাজার দুই থেকে। কতো যেনো হয়!

নকিয়ার পাঁচ ইঞ্চির একটা ফোন। কালো কুচকুচে। পেছনে ক্যামেরা বলতে কিছু নেই। তবে কথা বলা এবং মেসেজ চালাচালির জন্য চমৎকার। ফোন জিনিসটা অপছন্দ হলেও এটা খুব বেশি খারাপ লাগছে না। হাতে গোনা কয়েকজন নাম্বারটা জানে। বিভিন্ন কাজের জন্য ফরম ফিলাপ করতেও একটা নাম্বার দরকার। সেজন্যই ফোনটা চালানো। নয়তো এই জিনিসের দরকার খুব একটা ছিলো না মামুনের।

ছোট্ট ফোনটা কানে ধরে প্রায় পনেরো মিনিট ধরে বসে আছে মামুন। বিপ বিপ করে রিং বাজছে। কল যাচ্ছে, কেটে যাচ্ছে, মামুন আবার দিচ্ছে। চামড়া উঠে যাওয়া ঘড়িটার দিকে তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সে। আর এক মিনিট হলে বিশ মিনিট পুরো হবে। তারপরই রিং দেয়া বন্ধ করবে সে।

বিশ মিনিট হয়ে গেলো। বেজে বেজে বন্ধ হয়ে গেলো ফোনটা। শেষ দুটো কলে ব্যস্ত বলেছে। ফোনটা পকেটে রেখে দিলো মামুন। পনেরো দিন পরপর মাসে দুইবার এই নাম্বারে ফোন দেয় মামুন। নিয়ম করে। নাম্বারটা দাদাজানের কাছ থেকে নেয়া। তার জন্মদাতা মঈনুল এই নাম্বার থেকে কয়েক বছর আগে মামুনের দাদার সাথে যোগাযোগ করেছিলেন। মামুন নাম্বারটা টুকে রেখেছে সযত্নে। নিয়ম করে কল দেয়। কেউ ধরে না, কাটেও না। যেনো বেজে বেজে বন্ধ হয়ে যাওয়ার কাজটা দেখে খুব আনন্দ নিয়ে। সেই আনন্দ ফোন ধরে নষ্ট করতে চায় না। তবে এই চোর পুলিশ খেলার ব্যতিক্রম হলো আজ। শেষ দুবার ব্যস্ত বলেছে। সম্ভবত নাম্বার ব্ল্যাক লিস্টেড হয়ে গেছে। মামুন খানিকটা অবাক হয়েছে বটে। বছর বছরের নিয়মের ব্যত্যয় ঘটলে একটু তো অবাক লাগবেই।

মঈনুল কেনো তাদের সাথে যোগাযোগ করে না মামুন জানে না। তবে যেমনি হোক, লোকটা তার বাবা। র’ক্ত সম্পর্ক বড় জটিল। চাইলেও অস্বীকার করা যায় না। মামুন অবশ্য করতে চায়ও না। বাবা থাকতে কে তার ছায়া চাইবে না? তবে মঈনুল বোধহয় মামুনকে খুব বেশি পছন্দ করেন না। শুধু মামুন কেনো, কাউকেই পছন্দ করেন না। কারো সাথেই যোগাযোগের চেষ্টা তার নেই। একবার টাকা চাইতে দাদাজানের কাছে ফোন দিয়েছিলেন। সেই শেষ। এরপর আবার কোথায় হারিয়ে গেলেন কে জানে! হারিয়ে যাওয়া ব্যক্তিকে খোঁজা যায়, খুঁজলে পাওয়া যায়। কিন্তু যে নিজে থেকে নিখোঁজ হয়ে যেতে চায় তাকে খোঁজা অর্থহীন। মামুন অর্থহীন কাজটা না করলেও মঈনুলকে ফোন দেয়। কখনও যেনো তার উপরে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার অভিযোগ না আসে। পিতার পক্ষ থেকে এমন কোনো অভিযোগ সে নিতে চায় না।

সামনে ইয়ার ফাইনাল পরীক্ষা। প্রস্তুতি খুব ভালো নয়। আবার বেশি খারাপও না। মোটামুটি ধরনের। এই জিনিসটা মামুন খুবই অপছন্দ করে। হয় ভালো হবে, নইলে খারাপ হবে। এর মাঝে আবার কি!

তবে তার জীবনটাও এমনই। পরিচয়ের শেকড়, বাবার অস্তিত্ব ঠিক এমন। মোটামুটি। না আছে, না নেই। থেকেও নেই, না থেকেও আছে। মামুন মাথা নাড়ে, কারো জীবন সে নিজের ইচ্ছায় চালাতে পারবে না। নিজেরটাই পারে না আর অন্য কারো চিন্তা!

সন্ধ্যা নেমে আসছে। কুয়াশা বাড়ছে। উঠে দাঁড়ালো মামুন। সামনে একটা জটলা দেখতেই পুরোনো দিনের একটা স্মৃতি মনে পড়ে গেলো।

খুব বেশি পুরনোও নয় ঘটনাটা। সদ্য ভার্সিটিতে ভর্তি হয়ে মামুন তখন পুরো ক্যাম্পাস চষে বেড়ানোর চিন্তা মাথায় নিয়ে ঘুরছে। কি বিশাল ক্যাম্পাস! প্রতিটা জায়গা তার নখদর্পণে থাকা চাই। সেই লক্ষ্য পূরণে দিনে কয়েকবারই ইবলিশ চত্বর মাড়াতে হয়। এভাবেই একদিন সিনিয়রদের সামনে পড়ে গেলো। তিনটা মেয়ে এবং চারটা ছেলের একটা দল গাছের নিচে বসে আড্ডা দিচ্ছিলো। আড্ডার শীর্ষ আনন্দের সময়ে সে দলটার পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। কি মনে করে তারা মামুনকে থামালো। ভয় সাধারণত কম পেলেও র‍্যাগ শব্দটার প্রতি একটা ঘৃণা, লুকোনো অস্বস্তি ছিলই। বিশেষ করে উনিশের অক্টোবর থেকে। কাজেই হঠাৎ সিনিয়রদের ডাকটা তার কাছে খুব স্বাভাবিক মনে হলো না। ভেতরে ভাব প্রকাশ না করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করলো সে। সফল হলো। সিনিয়র গ্রুপ ছেলেটার বেপরোয়া হাবভাব দেখে রেগে গেলো। ফার্স্ট ইয়ার নিশ্চিত হওয়ার পর ত্যাড়ছা কণ্ঠে একজন বলল, ‘ এই যে এই জায়গা দিয়ে যাচ্ছ, নাম জানো?’

মাথা নাড়ল মামুন, ‘ জানি।’

‘ কি? বলো।’

‘ ইবলিশ চত্বর।’

গ্রুপটা যেনো ধপ করে জ্বলে উঠলো। মামুনের মনে হয়েছিল ওরকম একটা প্রতিক্রিয়া দেখানোর জন্য তারা যেনো তৈরিই ছিলো। এও জানতো মামুনের উত্তর কি হবে।

তারপরের স্মৃতিটুকু খুব সুখের নয়। বকা, ধমক, ম্যানার্স শেখানো সবই চলল। ইবলিশ চত্বর নাম হলেও সিনিয়রদের সামনে তা বলা নিষেধ। তাদের কাছে অন্য নাম বলতে হবে। কি যেনো বলেছিল জায়গাটার নাম? উহ! মামুন মনে করতে পারছে না। এখনও তো সে ফার্স্ট ইয়ারেই আছে। আবার কোনো গ্রুপের সামনে পড়লে তো সর্বনাশ! বাপের নামও তখন ভুলে যেতে হবে।

ধ্যান ভাঙলো চিকন একটা কণ্ঠে, ‘ ভাই ভালো?’

ঘুরে তাকালো মামুন। চার সাড়ে চার ফুটের একটা বাচ্চা ছেলে। বয়স বোধহয় দশ হবে। নামটা যেনো কি? ওহ মনে পড়েছে। কদম।

‘ ভালো। তোর খবর কি?’

ধপ করে বসে পড়ল ছেলেটা। উদাস গলায় বলল, ‘ বেশি একটা ভালো না। ডাইল খাইতে পাই না কয়দিন।’

‘ অবস্থা আমারও টাইট। বিড়ি সিগারেট খাই না আজ তিন দিন।’

‘ ভাই আপনি বেঁচে আছেন কেমনে!’

‘ এমনেই। পকেটে টাকা নাই। বিড়ি খাবো কি দিয়ে?’

‘ কথা ঠিক। এক কাজ করবেন। ঘুমের ভিতর খাবেন।’

‘ কিভাবে?’

‘ স্বপ্নে।’

মামুন বিরক্তি নিয়ে তাকালো, ‘ কিছুই হবে না আমার। ডাইল না খেয়ে তো তোর চেহারা ফর্সা হয়েছে মনে হচ্ছে।’

কদম খুশি হলো, ‘ কথা কি সত্য নাকি!’

‘ হু। কিন্তু মাথা কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। উল্টা প্যান্ট পড়ছিস ক্যান?’

‘ মাথা ভালোই কাজ করতেছে। এক প্যান্ট কয়দিন পড়ব? তাই এইবার উল্টা করে পড়ছি। নিউ ফ্যাশন।’

‘ বুদ্ধি ভালো। কিন্তু আমি ক্যাম্পাসে অ্যাপ্লাই করতে পারবো না। এই জামা কাপড় পড়ি তাই মানুষ উল্টায় উল্টায় তাকায়।’

‘ কারো তাকাতাকি গা করবেন না ভাই। আপনারে পুরা ফাটাকেষ্ট লাগে!’

‘ নমুনা দিলি একখানা!’ বিতৃষ্ণা নিয়ে বলল মামুন। পরপর উঠে দাঁড়ালো। ‘ বকুল মিয়ার খবর কি?’

‘ আব্বা আছে ফাষ্ট ক্লাশ। সেদিন স্বপ্নে নতুন বুদ্ধি পাইসে। এখন বড় বাজারের মধ্যে পা লুকায় রেখে বসে। ইনকাম জোশ!’

‘ চল তোর আব্বার টাকা পয়সা কিছু গুণে আসি।’

‘ চলেন। আপনারে এক কাপ চা খাওয়াবো।’

কদমের মুখের দিকে তাকিয়ে মামুন দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, ‘ আমি তোরে ডাইল খাওয়াবো না।’

চেহারায় হাত বুলিয়ে কদম বলল, ‘ কয়দিন একটু ফর্সা মর্শা হই। ডাইল আবার পরে খাবো।’

রুয়েটের গেট ছেড়ে সামনে তালাইমারী বাজার। আরেকটু সামনে মসজিদ তারপরেই অ্যাপোলো ইনফর্মেশন সেন্টার। বকুল মিয়া সকালটা বসেন বাজারে, দুপুর কাটে অ্যাপোলোর সামনে আর সন্ধ্যা থেকে রাত অবধি থাকেন মসজিদের সামনে। এই নিয়ে তার নিজস্ব কিছু ব্যাখ্যা আছে। সকালের বাজার থাকে ফ্রেশ। মানুষ নতুন টাকা নিয়ে বাজার করতে আসে। সকাল বেলা সকালে অসহায় কিছু মানুষ দেখলে মানুষ মন নরম হওয়া স্বাভাবিক ব্যাপার। সারাদিন কাজের পর খিটখিটে মেজাজ যেটা আশা করা যায় না। তাই বকুল মিয়া হুইল চেয়ার নিয়ে বাজারের এদিক ওদিক ঘুরে বেড়ান। তারপর দুপুরের দিকে মসজিদ পার হয়ে অ্যাপোলোর সামনে যান। তার ধারণা এখানে শুধুমাত্র মরণব্যাধির মানুষেরাই আসে। তাদের মন নরম থাকে। আশপাশের অসহায় মানুষকে দান সদকা করতে চান। বকুল মিয়া সেই সুযোগটা নিতে চান। আর বাকি সময়টা মসজিদের সামনে কাটান। তার মতে এশার নামাজে যারা মসজিদে আসে তাদের শরীর দয়ার শরীর। আর যেখানে দয়া সেখানেই বকুল মিয়া। যদিও সুস্থ সবল পা দুটো আঁটসাঁট করে বেঁধে লুকিয়ে রাখতে খুব কষ্ট হয়। কিন্তু একটু কষ্ট না করলেও তো আবার চলে না। কিছু পেতে হলে কিছু দিতেই হয়।

‘ হুইল চেয়ার তো সেই হইছে। জোগাড় করলেন কিভাবে?’

বকুল মিয়া বিরক্ত হলেন। এই ছোকরাকে তার দেখতে ইচ্ছা করে না। দুনিয়ার ত্যাড়াব্যাকা কথা বলবে। অথচ ছেলে হয়েছে তার সাগরেদ।

‘ যেখানেই পাই। তোমারে বলা লাগবে?’ ব্যস্ত সন্ধ্যায় মানুষের যাতায়াত বেড়েছে। বকুল মিয়া আশপাশে দেখলেন। একজন ভিক্ষুককে সাধারণ মানুষের সাথে এভাবে বসে কথা বলতে দেখলে মানুষ সেটা ভালোভাবে নেবে না।

মাথা নাড়ল মামুন, ‘ না। কিন্তু এমন নিত্য নতুন বিজনেস আইডিয়া আপনি কিভাবে পান? আমার একটু জানার ইচ্ছা।’

‘ স্বপ্নে পাই। যাও দূরে যাও। ত্যাক্ত কইরো না।’

কদম কষ্ট পেলো। আব্বা মামুন ভাইকে দেখতেই পারেন না। মামুন অবশ্য নড়ল না।

‘ আমাকে দেখে বলেন। কোন জিনিসটা বাদ দিলে রোজগার ভালো হবে?’ বকুল মিয়ার পায়ের দিকে ইশারা করল মামুন। বকুল মিয়া কটমট করে বললেন, ‘ মাথাডা বাদ দিতে পারলে সবচেয়ে ভালো হয়। তাইলেই তোমার ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল।’

‘ কিছু মনে কইরেন না ভাই। আব্বার মনে হয় আজকে ইনকাম হয় নাই। মাথা গরম।’ ফিসফিস করে বলল কদম।

‘ বুঝতে পারছি। ফুলির খবর তো কিছু বললি না।’

‘ ফুলির কথা আর কি বলব ভাই। ম’রেও না আবার বাঁচেও না।’ দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল মামুন। এখানেও মোটামুটি অবস্থা। জগতটা কি মোটামুটির উপরে বেঁচে আছে?

‘ঝরা ফুল’

বিনতে ফিরোজ

৫(বর্ধিতাংশ).

রাতে শুতে যেয়ে বেশ একটা ঝামেলা তৈরি হলো। আবেদার আলী এবং জেসমিনের জন্য একটা ঘরের প্রয়োজন। সেটা করতে হলে মিতুকে নিয়ে জাহানারাকে একসাথে থাকতে হবে। জেসমিন ঢের বুঝলেন মেয়ে সেটা চাচ্ছে না। অবাক হলেন বটে। নিজের মেয়েকে কাছে নিতে না চাওয়ার যুক্তি কি হতে পারে!

বিকাল থেকে আবার আবেদার আলী থম মে’রে আছে। হু হা দিয়ে কাজ চালাচ্ছেন। কথাবার্তা বলছেন খুব কম। স্বামীর দিকে একবার তাকিয়ে জেসমিন ভাবলেন আজ আগে মেয়ের কাহিনী বুঝে নেয়া যাক। মেয়ের বাপকে পরে বুঝে নেবেন।

‘ একটা কাজ কর। মিতুর ঘরে নিচে বিছানা পেতে ওখানে তোর আব্বাকে দে। মিতু ওপরে থাকুক। আর আমি তোর সাথে থাকি।’

মায়ের প্রস্তাবে জাহানারা যেনো আতকে উঠলেন। গাইগুই করেও অন্য সমাধান পেশ করতে পারলেন না। এর চেয়ে তো মিতুর সাথে থাকাই ভালো ছিল!

মিতুর ঘরে সিঙ্গেল বিছানা। মিতু কোনোভাবেই সেখানে থাকতে রাজি হলো না। নানাকে নিচে ফেলে সে বিছানায় থাকে কিভাবে! অগত্যা আবেদার আলী বিছানায় গেলেন। এক ফাঁকে স্ত্রীকে চোখ রাঙাতে ভুললেন না বৃদ্ধ। জেসমিন থতমত খেলেন। হচ্ছে টা কি চারপাশে!

মিতুর ঘরের লাইট বন্ধ করে বসার ঘরের লাইট জ্বেলে দরজা খুলে রাখলেন জেসমিন। লোকটা মাঝরাতে ওঠে। তখন ঘর একেবারে অন্ধকার হয়ে থাকলে সমস্যা। হোঁচট খেয়ে পড়ে যেতে পারে। চারপাশ শান্ত হওয়ার পর মেয়ের দিকে নজর দিলেন। কেমন আড়চোখে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। জেসমিন ভুরু কুচকে ডাক দিলেন, ‘ এই জাহান!’

জাহানারা মায়ের দিকে তাকিয়ে ঘনঘন পলক ফেলতে লাগলেন। জেসমিন কিছুই বললেন না। অপেক্ষায় থাকলেন কোনো সূত্র পাওয়ার।

‘ মশারি টাঙিয়ে দে। মশারি ছাড়া আমি শুতে পারি না।’

যখন দুজনে শুয়ে পড়েছেন তখন ঘড়ির কাঁটা এগারোটার কাছে। শীতের দিনে বেশ রাত। চারদিকের নীরবতার নিজের নিঃশ্বাসটুকুও যেনো কানে বাজে। জেসমিন সেসময় একটু চালাকি করলেন। এতদিন যে কাজ করে স্বামীকে জ্বালাতেন আজ সেই কাজটা করলেন মেয়েকে ফাঁকি দেয়ার জন্য।

বেশ খানিকটা সময় এপাশ ওপাশ করেও জাহানারা চোখে ঘুম আনতে পারলেন না। ঘুম আসার কথাও নয়। তার অবচেতন মন তাকে জাগিয়ে রেখেছে একটা ফোন কলের জন্য। সেই কল আসবে বারোটার পরে। তার আগে তিনি ঘুমাবেন কিভাবে!

কিছুক্ষণের মাঝেই জেসমিনের নাক ডাকার আওয়াজ পাওয়া গেলো। এই আওয়াজ সম্ভবত দেয়াল ভেদ করে পাশের ফ্ল্যাটেও পৌঁছে গেছে। জাহানারা মোটেই বিরক্ত হলেন না। বরং জেসমিন তাড়াতাড়ি ঘুমানোর কারণে বেশ খুশি হয়ে বাকি সময়টা জেগে রইলেন। ঘড়ির কাঁটা বারোর ঘরে পৌঁছানোর আরো পনেরো মিনিট পর একটা কল এলো। জাহানারা হাসিমুখে রিসিভ করলেন। প্রথমে অডিও তারপর ভিডিও কলে কথা বললেন প্রায় ঘণ্টার বেশি সময় ধরে। কান খাঁড়া করে সবটুকু শুনলেন ঘুমের ভান করে পরে থাকা জেসমিন। ক্রমেই তার চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। এই তাহলে জাহানারার ইতি-উতির কারণ!

~

ঘুমটা ভালো হয়নি। বয়সকালেও মেয়ে একই ভুল করছে ধরতে পেরে জেসমিন বেজায় চটে গেছেন। রাতেই এক দফা বকাবকি করতে চেয়েছিলেন। পরে মনে হলো দিনের বেলা ঠান্ডা মাথায় বোঝাতে হবে। জাহানারার এখন নিজের মেয়ে আছে। এখনও কি তার পাগলামি করা সাজে!

কিন্তু সময় গড়াতেই তার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার দশা হলো। সকাল সকাল রশিদ এলেন জাহানারাকে সাথে করে নিয়ে যাওয়ার জন্য। জেসমিন শক্ত চোখে তাকিয়ে রইলেন। তার ধারণা রাতের সেই কলটা রশিদই করেছে। বাড়ি পর্যন্ত চলে এসেছে এই ছেলে! মিতু ততক্ষণে বেরিয়ে পড়েছে স্কুলের উদ্দেশ্যে।

‘ আসসালামু আলাইকুম চাচা। কেমন আছেন?’ বুড়ো বুড়িকে দেখে রশিদ নিজেও বেকায়দায় পড়ে গেছে। কিন্তু ফেরত যাওয়ার তো উপায় নেই। তাই কথা এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চালালেন তিনি।

‘ ওয়ালাইকুমুস সালাম। ভালো আছি।’ মুখের সামনে পেপার ধরে রাখা আবেদার আলীর হাবভাবে বোঝা যাচ্ছে তিনি কথা বাড়িয়ে যেতে ইচ্ছুক নন। বিব্রত ভঙ্গিতে হেসে রশিদ নিজের পরিচয় দিলেন, ‘ আমি আপনার মেয়ের সাথে একই স্কুলে চাকরি করি। থাকি এই বাস স্ট্যান্ডের পাশে।’

‘ তা উল্টোদিকে এসেছ কেনো?’ জাহানারার বাড়ি রশিদের বাড়ির বিপরীতে। আবেদার আলীর ইঙ্গিত সেদিকেই।

‘ এই একটা কাজে এলাম এদিকে তাই ভাবলাম দেখা করে যাই।’

‘ যেদিকেই কাজে যাও সেদিকেই সবার সাথে দেখা করো নাকি?’ বাঁকা চোখে তাকালেন বৃদ্ধ। রশিদ উত্তর দেয়ার আগেই আবার বললেন, ‘ বিয়ে করেছ তো নাকি? করেছো? তাহলে বউ বাচ্চার সাথে একদিন পরিচয় করিয়ে দিও। এসেছ যখন বসো, এক কাপ চা খেয়ে যাও। কই তোমার কলিগকে চা দাও।’ ভোঁতা মুখে রান্নাঘরে গেলেন জাহানারা। আব্বা যে নিরবে খোঁচাটা দিলেন এটা রশিদ ধরে ফেলেছে। সে কারণেই উঠে যেতে চাইছিল। কিন্তু আবেদার আলীও ছাড়ার মানুষ নন।

জাহানারাকে কিছু বলার সুযোগ পেলেন না জেসমিন। ভাবলেন স্কুল থেকে ফিরলে তবেই মেয়েকে নিয়ে বসবেন। তার আগেই যেনো আবেদার আলী তার কাছে বো’মা ফা’টা’লেন।

‘ মেয়ে যে এখানে এসেও ঘটনা ঘটিয়ে ফেলেছে জানো?’

‘ কি ঘটনা?’ খালি বাড়িতে দুজন আলোচনা করতে বসলেন।

‘ কাল চা’র দোকান থেকে অনেক কিছু শুনে এসেছি। সব যে সত্যি না এটা তো জানি। কিন্তু আজকে সকালে ছেলেটাকে দেখে বুঝলাম অনেক কিছুই সত্যি।’

‘ কাল রাতে বারোটার পরে প্রায় অনেকক্ষণ জাহান কার সাথে যেনো কথা বলছিল। এই ছেলেটাই মনে হয়। পাড়ার লোকেও জেনে গেছে!’

আবেদার আলী মাথা নিচু করে বসে রইলেন। জেসমিন নরম কণ্ঠে বললেন, ‘ কি করবে এখন?’

‘ কি করতে বলো তুমি? আমি তো কোনো দিক দিশা পাই না।’

‘ ও বাড়িতে আসলে একটু বোঝাও।’

‘ বোঝানোর বয়স ওর আছে জেসমিন? সেই কবে থেকে বোঝাচ্ছি। এখন ওর নিজের একটা মেয়ে হয়েছে। কয়দিন পর মেয়েটাকে বিয়ে দিতে হবে। এসব করে ও নিজের দুর্নাম যা রটানোর তা তো রটিয়েই ফেলেছে। ওর জন্য এখন আমার নাতনিও ভুগবে। কি করবো আমি?’ বৃদ্ধের গলা কেঁপে উঠল। জেসমিন অস্থির হয়ে গেলেন। কিভাবে মেয়েকে বোঝাবেন এসব পাপ, অন্যায়।

____________

টিফিন পিরিয়ডে শিমু মিটিমিটি হাসতে হাসতে একটা খাম বের করে দিলো। লুফে নিলো সেটা মিতু। হাতে নিয়েই শিমুকে মা’রতে শুরু করলো সে।

‘ খালি খাম দিয়ে আমার সাথে মজা করছিস? আমি যে ভাইজানের চিঠির জন্যে ম’রে যাচ্ছি সেই খেয়াল আছে তোর?’

‘ আরে থাম থাম। কথা শোন আগে। তোর ভাইয়ের চিঠি এসেছে। তো সেটা নিতে তোর সই লাগবে না! আমি কি নিয়ে আসতে পারি?’

মিতুর মন এক নিমেষে ভালো হয়ে গেলো। উৎফুল্ল কণ্ঠে বলল, ‘ সত্যি চিঠি এসেছে?’

‘ হ্যাঁ।’

‘ শিমু চল চল যাই।’

‘ এখনও তিনটা ক্লাস বাকি!’

‘ হোক বাকি। চল না যাই! তোকে কালকে ঝালমুড়ি খাওয়াবো। চল চল!’

‘ বাবা জানতে পারলে বকা দিবে।’

‘ আচ্ছা তাহলে তুই ক্লাস কর। আমি যাই।’

‘ রাগ করলি মিতু?’

‘ আজকে আমার খুশির দিন। কেউ এসে আমার দুই গালে চারটা থাপ্পড় দিলেও আমি রাগ করব না।’

একটা ক্লাস টেস্ট হওয়ার ছিলো। সেটা সকালেই হয়ে গেছে। এর পরে আছে চারুকারু, শারীরিক শিক্ষা এবং বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় ক্লাস। দারোয়ানের চোখ ফাঁকি দিয়ে বিশাল গেটের এক পাশ দিয়ে ছুটে বেরিয়ে গেলো মিতু।

পোস্ট অফিসে পৌঁছাতে লাগলো পনেরো মিনিট। আকবর আলি শুনলেন তাড়াতাড়ি বের হওয়ার কারণ। মিতু ভুজুং ভাজুং বুঝিয়ে চলে এলো। বাড়ি যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারল না। রাস্তার এক পাশে বসেই চিঠি খুলে ফেললো।

এই যে ভাইজান ধমক দিয়েছে, বানান ভুল করার জন্য বকা দিয়েছে তাই পড়ে মিতুর এতো ভালো লাগলো! বারবার পড়ল সেই একই লাইন। ভাইজান এখন কেমন দেখতে হয়েছে? আহা! সামনে থেকে একদিন যদি তার বকা খেতে পারতো মিতু! উঠে দাঁড়ালো মিতু। ঘুরে দাঁড়ালো লাইব্রেরির দিকে। প্রাচীনকালে কার্ড করেছিল। বই নেয়া হয়নি। আজকেই ‘পথের পাঁচালী’ নিয়ে যাবে।

|চলমান|

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৫ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন