‘ঝরা ফুল’
বিনতে ফিরোজ
১৭.
দশ বছরে এই প্রথম মনে হলো মিতু তার সাথে নেই। অস্থির বোধ করলো মামুন। জাহানারা বিয়ে করেছে। করুক। তাতে তার কিছু যায় আসে না। কিন্তু মিতু? তাকে কোথায় নিয়ে গেছে? কাদের সাথে মিতুকে থাকতে হচ্ছে? কার কাছে ফোন দিবে মামুন? দাদাজান ওদের খোঁজ নেন না। মামুন জানে। তার কাছে ফোন দিয়ে লাভ নেই। তাহলে নানার কাছে? নানা নানী বলতে মামুন আবেদার আলী, জেসমিনকেই বোঝে। তার মাতৃকুলের কোনো আত্মীয় নেই। কিন্তু এই নানা নানীও তার সাথে যোগাযোগ ছিন্ন করেছে। শুধুমাত্র মঈনুলের ছেলে হওয়ার অপরাধে। অথচ সেই মঈনুলের সাথেই তার কোনো যোগাযোগ নেই। অভিমানের পাল্লা ভারি হওয়ার কারণে আবেদার আলীর কাছেও ফোন দিলো না মামুন। অস্থির হয়ে ঘরময় পায়চারি করতে থাকলো।
রহিম তাকে দেখছিল। সে নিশানের বিছানায় শুয়ে ছিল। উঠে বসে বলল, ‘ হইছে কি তোর?’
‘ হুঁ? না কিছু না।’ অথচ সে প্রায় দৌড়াতে শুরু করেছে।
‘ কিছু নিয়ে টেনশনে আছিস?’
‘ একটু।’
রহিম বুঝলো মামুন বিষয়টা খোলাসা করতে চাচ্ছে না। সে আবার শুয়ে পড়ল। চোখ বন্ধ করে বলল, ‘ আম্মা বলে টেনশনে পড়লে প্রথমে দাঁড়াইতে হয় জায়নামাজে। সেখানে মালিকের কাছে আর্জি জানাতে হয়, দোয়া করতে হয়। তারপর ঠান্ডা মাথা নিয়ে কাজ করতে হয়। ফ্রি তে উপদেশ দিলাম। আমার আম্মার অমুল্য কথা। ফাও ভেবে ভুল করো না হে বৎস।’
মামুন চুপচাপ সেই কথা শুনল। রহিমের মা বলেছে? বলতে পারে। মায়েরা হয়তো এমন কতকিছুই বলে। সোজা বাথরূমে যেয়ে ওযু করলো মামুন। বুকের মাঝে মিতুর মুখটা খুব যত্ন করে এঁকে জায়নামাজে দাঁড়ালো। মালিক। সব ক্ষমতার মালিক। তাই তো!
_______________
ইসমত আরা গিয়েছিলেন এক সইয়ের কাছে। তিনিও বয়সের ভারে শক্তিহীন হয়ে পড়েছেন। অনুষ্ঠানে তাকে দাওয়াত করা হলেও তিনি আসতে পারেননি। এজন্যই কিছু খাবার দাবার গুছিয়ে দিয়ে এলেন ইসমত আরা। এর মাঝে এতো কিছু হয়ে গেছে সেসব তার জানার কথা নয়। কিন্তু ফিরতি পথে আশপাশের মানুষের গুঞ্জন শুনে তার মনে হয়েছিল কোথাও কিছু একটা হয়েছে। একজন আবার তাকে পথে দাঁড় করিয়ে জিজ্ঞেসও করলো, ‘ চাচী সাইফুল ভাইয়ের বউয়ের নাকি আগে একবার বিয়ে হয়েছিল?’
ইসমত আরার সবচেয়ে পছন্দের বিষয়। গম্ভীর মুখে তিনি বললেন, ‘ হুঁ।’
‘ সেই ঘরে নাকি একটা মেয়েও আছে?’
‘ হুঁ।’
মহিলার গলার স্বর হঠাৎ করেই খাদে নেমে এলো, ‘ মেয়েটা ভালো তো চাচী?’
‘ মানে?’
‘ মানে আবার কি। দুই দিন গেলেই তো বিয়ের বয়স হবে ঐ মেয়ের। স্বভাব চরিত্র ভালো তো? নাহলে আবার আপনাদের মুখেই চুনকালি দিবে।’
ইসমত আরা মুখ ঝামটা দিয়ে চলে এলেন। তিনি মানুষ চেনেন। ঐ আলাভোলা মেয়ে রাতে টয়লেটে যেতে চাইলেই তার আঁচল ধরে টানাটানি করে। এই মেয়ের আদ্যপান্ত তার জানা হয়ে গেছে। সমস্যা মেয়ের মা’কে নিয়ে। মহিলা ধরি মাছ না ছুঁই পানি টাইপ মহিলা। ইসমত আরার আশঙ্কা এবার সাইফুল তার থেকে দূরে সরে যাবে। ঠিক যেই আশঙ্কায় তিনি ছেলের বিয়ে দিতে চাননি।
বাড়ির থমথমে পরিবেশ দেখে ইসমত আরার ভুরু কুঁচকে এলো। মেহমান যেনো আর হাতে গোনা কয়েকজন আছে। এতো তাড়াতাড়ি তো যাওয়ার কথা না। বাড়ির লোকজনই বা কোথায়?
নিজের ঘরে ঢুকতেই চিন্তিত মেয়েকে নজরে পড়ল। মিতু ঘুমিয়ে আছে। তার মাথায় হাত দিয়ে কোলে মেয়েকে নিয়ে বসে আছে মায়িদা। মাকে দেখেই তার হাত ধরে নিজের পাশে বসালো মায়িদা।
‘ বাড়িতে হইছে কি? সব চুপচাপ কেনো?’
মায়িদা কথা গুছিয়ে নিচ্ছিল। এর মাঝেই আবার ইসমত আরা বললেন, ‘ এই জামাই আসলো না কেনো? বড় জামাইয়েরও দেখা নাই।’
‘ কেউ আসে নাই ভালো হইছে। তোমার মেয়ের এই নাটক দেখার জন্য মানুষের এতো সময় আছে?’ ক্ষোভ নিয়ে বলল মায়িদা।
‘ কি হয়েছে রে?’ সাবধানী গলায় বললেন ইসমত আরা। মায়িদা সংক্ষেপে ঘটনা বলল। ইসমত আরার চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। চাপা কণ্ঠে বললেন, ‘ মানুষের সামনে এমন একটা কিছু না করলেই হচ্ছিল না!’
‘ তোমার মেয়ের কাছে যেয়ে শোনো।’
‘ মনিরা যে এসব করেছে তুই না দেখেই বলছিস কিভাবে?’
‘ না দেখে মানে! সকাল থেকে আকাশ মেয়েটাকে বিরক্ত করে যাচ্ছে। আর স্কুল থেকে এসে তো ও আমাদের সাথেই বসে ছিল। দেখেছো ওকে আকাশের সাথে কথা বলতে? তাহলে ও আকাশকে কিভাবে ডেকে নিয়ে চলে আসলো? প্রথমে দরজা বন্ধ করলো তারপর আমরা যেনো তাড়াতাড়ি ঢুকতে পারি এজন্য দরজা খুলে দিলো তাই না? দারুন বুদ্ধি!’
ইসমত আরা নিজের মেয়েকে চেনেন। মিতুকেও দেখছেন। কাজেই আসল ঘটনা বুঝতে তাকে বেগ পেতে হলো না।
‘ আপা সবার সামনে ভাবিকে ছোট করতে চাচ্ছিল। মিতুকে শুধু এজন্যই ব্যবহার করলো। তুমি আপাকে কিছু বলবা না মা? বড় ভাইয়ের চোখে মেয়েটা কেমন দোষী হয়ে গেলো। ভাই তো আর এসব জানে না।’
ইসমত আরা ইতস্তত করলেন। সবার সামনে মেয়েকে কিছু বলা যায়! মেয়ে বড় হয়েছে, তার নিজের সংসার হয়েছে। এখন কি তাকে বকা, ধমকানো মানায়? কিন্তু মায়িদাকে ঠান্ডা করা দরকার।
‘ বলবো। তুই ঠান্ডা হ। জামাই আসবে না?’
‘ না আসবে না। আমি ফোন করে বলে দেবো যে আমি চলে যাচ্ছি। ওকে আসতে হবে না।’
‘ এসব কি কথা! আসবে না কেনো?’
‘ এখানে এসে কি দেখবে? ভাবির মেয়ে এক ছেলেকে হাত করতে চাচ্ছে, এই ঘটনা শুনবে? কোনো দরকার নেই। শ্বশুরবাড়িতে আমার একটা সম্মান আছে। তোমাদের জন্য আমি সেটা নষ্ট করবো না। আমি এখনই গুছিয়ে নিচ্ছি। শোনো মা! দয়া করে তোমার মেয়েকে একটু বোঝাও। এভাবে আশকারা দিয়ে দিয়েই তুমি আপাকে নষ্ট করেছো। মানুষের দিকে ঢিল ছুঁড়লে নিজের দিকে পাটকেল ফিরে আসে। তোমার মেয়ে না শুধরালে ওর কপালে যে কি আছে আল্লাহই জানেন।’
গজরাতে গজরাতে ব্যাগ গোছালো মায়িদা। আরেকবার মিতুর মাথায় হাত বুলিয়ে তখনই চলে গেলো।
সাইফুল বেশ কয়েকবার মনিরার কাছে ক্ষমা চেয়েছে। আকাশের কাছে কিছু বলতেই তার লজ্জা লাগছে। তার বাড়িতে এসে কেমন একটা বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ে গেলো ছেলেটা।
মনিরা সন্ধ্যা হলেই ছেলে আর আকাশকে নিয়ে সাহেবের বাড়িতে চলে গেলো। সাইফুলের হাজার অনুরোধের তোয়াক্কা না করেই চলে গেলো। ‘ তোমার টিনের চালের থেকে শীতে জমে যাওয়ার কোনো ইচ্ছাই আমার নেই। ঐ খুপড়ির ভেতর তুমি তোমার রূপসী বউ নিয়ে সোহাগ করো।’ মনের কথাটা আর মুখে বলল না মনিরা।
সন্ধ্যার পরপর মিতুর ঘুম ভাঙ্গলো। সময়টা ধরতে পারল না সে। রাত নাকি? হঠাৎ ঘরের বাতি জ্বলে উঠলে চোখ কুঁচকে নিলো মিতু। সাথে সাথেই মাথায় টান লাগলো। একে একে সবটা মনে পড়ল। মনের ক্ষতের সামনে শরীরের ব্যাথাটা নিমিষেই তুচ্ছ হয়ে পড়ল। উঠে বসতেই ইসমত আরাকে দেখতে পেলো সে। কিছু না বলে জামাকাপড় নিয়ে গেলো কলপাড়ে। একেবারে ওযু করে ফিরে এলো। ইসমত আরার ঘরে ঢুকলো না। প্রথম যে ঘরটায় রাতে থেকেছিল সেই ঘরে যেয়েই জায়নামাজ বিছিয়ে দাঁড়ালো। বুকের খাঁচায় জমা করা বেদনার জলের সবটুকু ঢেলে দিলো আঁখির স্রোতের মাঝে। ঠিক কবে এতটা কেঁদেছিল মিতু? মনে করতে পারে না। বাবা মায়ের ডিভোর্সের সময় সেসব বোঝার বয়স তার হয়নি। যখন থেকে বুঝতে শিখেছে তখন থেকে দুজনকে আলাদা থাকতে দেখেই অভ্যস্ত হয়ে গেছে। তাই কষ্টটা সেভাবে হয়নি। কিন্তু আজ যেন নতুন অভিজ্ঞতা পেলো মিতু। ছোট্ট মিতু বুঝলো তাকে একটা সিন্দুক বানাতে হবে। রেখে দিতে হবে বুকের খুব গহীনে। সেই সিন্দুক থাকবে সবসময় তালাবন্ধ। উপরে একটা ছিদ্র করবে। সেই ছিদ্র দিয়ে ঢুকিয়ে দেবে এই জীবনে পাওয়া সব তিক্ত অভিজ্ঞতা। কোনোদিন সেটাকে খুলে দেখবে না। কোনোদিন না।
নামাজ শেষে ইসমত আরার ঘরের দরজায় দাঁড়ালো মিতু। বৃদ্ধা বিছানা ঝাড় দিচ্ছিলেন। মিতু ভগ্ন কণ্ঠে বলল, ‘ আমাকে কি আপনার সাথে নেবেন দাদী?’
ইসমত আরা কিছু বললেন না। সন্তর্পনে দুটো বালিশ রাখলেন পাশাপাশি।
জাহানারা লজ্জায় সাইফুলের সাথে বিকেল থেকে কথা বলেননি। এতোটা সময় মনে মনে গুছিয়েছেন কি বলবেন। মনিরা যে এসব প্যাঁচ বাধিয়েছে সেটা কিছুতেই বলা যাবে না। তার কাছে শক্ত প্রমাণ নেই। নিজের মেয়েকে তিনি চেনেন। সাইফুল চেনে না। প্রথমেই বোনের বিরুদ্ধে কিছু বললে তাকে বিরূপ দৃষ্টিতে দেখতে পারে সাইফুল। জাহানারা সেটা চাননা। আবার এটাও চান না সাইফুল ভাবুক নিজের মেয়ের জন্য তিনি সাইফুলের বোনের বিরুদ্ধে বিষোদগার করতে এসেছেন। তার সংসারের ভিত এখনও মজবুত হয়নি। কোনোভাবেই আগে এই কাজটা হোক। তারপর মনিরাকে তিনি দেখে নেবেন। আপাতত মিতু দোষীই থাকুক।
সাইফুল গায়ে লোশন মাখছিলেন। জাহানারা সেটা নিজের হাতে টেনে নিলেন। সাইফুলের পিঠে দিয়ে দিতে দিতে বললেন, ‘ সাইফুল।’
‘ হুঁ।’
‘ তুমি কি আমার উপর রাগ করে আছো?’
‘ নাহ।’
‘ তাহলে কথা বলছো না কেনো?’
‘ তুমিও তো বলছো না।’
লোশনের বোতল রেখে সাইফুলের হাত ধরলেন জাহানারা। এগিয়ে গিয়ে দূরত্ব মেটালেন।
‘ আসলে মেয়েটা এমন একটা কাজ করলো। লজ্জায় তোমার সাথে কি বলব বুঝতে পারছিলাম না। তুমি এমন করে থেকো না।’
‘ ছোট আছে। কোনটা ভালো কোনটা খারাপ এখনই বুঝিয়ে দেবে। নাহলে এই স্বভাব থেকে যাবে।’
মস্তিষ্ক জ্বলে উঠলেও চেহারায় সেটার প্রভাব পড়তে দিলেন না জাহানারা। চোয়ালটা মুহূর্তের জন্য শক্ত হয়েই আবার মিলিয়ে গেলো।
‘ তোমার অসভ্য বোনকে সেটা বোঝোওনি কেনো?’ মুখে কথাটা চলেই এসেছিল। জিহ্বা দিয়ে ঠেলে সেটাকে পেটের ভেতর ঢুকিয়ে দিলেন তিনি। সাইফুলের সামনে এসে গলায় দুহাত রেখে নরম গলায় বললেন, ‘ বলবো। ভালো মতো বুঝিয়ে দেবো।’
সারাদিনের ব্যস্ততা, বিকেলের হাঙ্গামায় সাইফুল এমনিতেই ক্লান্ত এবং বিরক্ত ছিলেন। একটু আরাম দরকার ছিল। জাহানারার স্বীকারোক্তিতে বিরক্তিটা কমে গেলো। ফলে নবপরিণীতার আহ্বান তিনি ফিরিয়ে দিতে পারলেন না।
রাতের তখন দ্বিপ্রহর। ইসমত আরার ঘরে একটা ভাঙা মোমবাতি দেখেছিল মিতু। দেয়াশলাই দিয়ে সেটা জ্বে’লে চিঠি লিখতে বসলো সে। মনে মনে হাজার খানেক বাক্য গুছিয়ে নিলো। অথচ কাগজে ‘ ভাইজান! আমার ভাইজান..’ লেখার পর আর কিছুই লিখতে পারলো না। মাঝরাতের মানসিক পীড়া তাকে চারপাশ থেকে জাপটে ধরলো। মুখে হাত চেপে ধরলেও চোখজোড়া থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় অশ্রু গড়িয়ে পড়ে চিঠির পাতা ভিজিয়ে দিলো। লিখে দিলো এক অব্যক্ত উপাখ্যান।
ইসমত আরা অল্প শব্দেই জেগে যান। মিতু যে উঠেছে এটা তিনি অনেক আগেই টের পেয়েছেন। শুধু দেখতে চাইছিলেন মেয়েটা কি করে। মিতুকে মুখে হাত চেপে বসে থাকতে দেখে উঠে বসলেন তিনি। শীতল কণ্ঠে বললেন, ‘ কার কাছে চিঠি লিখছিস?’
মিতু হকচকিয়ে গেল। টলমল আঁখি নিয়ে ভ'য়া'র্ত দৃষ্টিতে তাকালো ইসমত আরার দিকে। কিন্তু ইসমত আরার শীতল চোখজোড়া হয়তো তাকে ভয় পাওয়াতে পারলো না। ঝরঝর করে কেঁদে দিল মিতু। হেঁচকি তুলে বলল, ‘ আমার একটা ভাইজান আছে দাদী। আমার নিজের ভাইজান।’
|চলমান|