‘ঝরা ফুল’
বিনতে ফিরোজ
৩০.
ডাক্তার বলে দিয়েছেন বাকি জীবনটা এভাবেই কা’টবে। যতদিন মঈনুল বেঁচে থাকবে ততদিন তাকে থাকতে হবে আরেকজনের ঘাড়ের বোঝা হয়ে। গোঙানি জাতীয় শব্দ ছাড়া আর কোনো আওয়াজ তিনি করতে পারবেন না। ইশারা করতে পারবেন শুধুমাত্র পলক ফেলে। মস্তিষ্কের স্থায়ী ক্ষতির বহিঃপ্রকাশ।
এই কয়েকটা দিন মিতু হাসপাতালেই কা’টা’লো। মঈনুলের স্ত্রীর অপ্রকাশিত অসন্তুষ্টি উপেক্ষা করে সে সুযোগটা লুফে নিল। বাবার সাথে পার করা শিশুকালের কিছুই তার মনে নেই। অন্তত বাকি জীবনে যেনো বাবা বলতে হৃদয়ে কিছু স্মৃতি থাকে সেজন্যই এই পরিশ্রম।
বাদ গেলো না মামুনও। হায়দার আলমকে কিছুই করতে হলো না। চিকিৎসার খরচ নিয়ে একটু চিন্তায় পড়েছিলেন। মামুন আসার পর সেটুকু স্রেফ ঝড়ে উড়ে যাওয়া পাতার মতো অদৃশ্য হয়ে গেলো। মামুন প্রস্তাব দিয়েছিলো সপরিবারে রাজশাহী চলে যাওয়ার জন্য। যেহেতু তার পক্ষে স্থান পরিবর্তন এই মুহূর্তে সম্ভব নয়। কিন্তু মঈনুলের স্ত্রী তীব্র বিরোধিতা করলেন। দুদিনের জন্য স্বামীর অন্য ঘরের সন্তানদের উপস্থিতি মেনে নিলেও সারাজীবন তাদের সাথে থাকতে তিনি রাজি নন। এটুকু তো স্পষ্ট যে মামুন তাদের সকলের দায়িত্ব নিতে চাইছে। তার মানে মামুনের কথাকেই শিরোধার্য মেনে চলতে হবে। ভদ্রমহিলা সেটা কোনোভাবেই পারবেন না। মামুন হাল ছেড়ে দিলো। হাসপাতাল থেকে রিলিজ দিলে বাড়ি পৌঁছে দিলো মঈনুলের পরিবারকে। অ্যাম্বুলেন্সে থাকাকালীন প্রতিটা ক্ষণ মঈনুলের অপলক চাহনি বিব্রত করেছে মিতু মামুন দুজনকেই। মামুনের শুধু মনে হয় তার বাবা যেনো তাকে কি একটা বলতে চায়। কিন্তু তার চোখের ভাষা তো মামুন বোঝে না।
বাড়িতে এসে হায়দার আলমের সাথে আলোচনায় বসলো মামুন।
‘ দাদাজান আপনার সাথে কিছু কথা আছে।’
‘ চলো। আমার ঘরে চলো।’ এই কয়েকদিনে বৃদ্ধ মানুষটার বয়স যেনো আরো বেড়ে গেছে। কথার শেষে ক্লান্তি ঝরে পড়ে।
‘ ঋণের টাকার আনুমানিক হিসাব কি আপনি জানেন দাদাজান?’
হায়দার আলম সোজা হয়ে বসলেন, ‘ কার ঋণ? মঈনুলের?’
‘ জি।’
তাচ্ছিল্য হেসে হায়দার বললেন, ‘ বেহিসাবি টাকা মামুন। বান্দার হক আল্লাহ মাফ করেন না। এই দুনিয়াতেই কিছু শাস্তি দিয়ে দেন। সেই শাস্তি আমার ছেলে পাচ্ছে। আমি পাচ্ছি। সামর্থ্য থাকতে তোমারে ডাকে নাই। এখন ডাকার জন্যে কাতরাচ্ছে অথচ সামর্থ্য নাই। আল্লাহর কৌশল বড় ভয়ংকর।’
মামুন এই প্রসঙ্গে কিছু বলল না। হায়দার আলম নিজেই বললেন, ‘ ঋণের হিসাব নিয়ে কি করবা?’
‘ শোধ করবো।’
চোখ বড় করে তাকালেন হায়দার আলম, ‘ কি বলো! ওর তো লাখ লাখ টাকা ঋণ!’
‘ তাও কতো হবে?’
‘ একদম ঠিকঠাক জানি না। পনেরো বিশ তো হবেই।’
মামুন দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল, ‘ এনজিওর কোনো নথিপত্র কি আছে? নাহলে ওদের খুঁজে পাওয়া কষ্টকর হবে।’
হায়দার আলমের বিস্ময় আকাশ ছুঁয়ে যাচ্ছে, ‘ এতো টাকা তুমি কোথায় পেয়েছো!’
একটু হাসলো মামুন, ‘ আমার এতো টাকা নাই দাদাজান। কিন্তু জানের ভেতরে ভয় আছে। আল্লাহর রহমতে আমি সামর্থ্যবান মানুষ। কাজ করার মতো দৈহিক শক্তি আছে। সেটা দিয়ে যদি দুই টাকা শোধ করার চেষ্টাও না করি তাহলে আল্লাহ কি আমাকে ছেড়ে দিবেন? উনি তো বিছানা নিয়েছেন। আমি এই বিবেক নিয়ে বেঁচে থাকব কিভাবে?’
হায়দার আলমের হৃদয়টা কেঁদে উঠলো। আহা! এই ছেলেকে মঈনুল যত্ন করেনি। এখন যে মামুনের প্রত্যেকটা কাজ মঈনুলের বুকে হুলের মতো ফুটবে। বৃদ্ধের চোখ ভরে উঠলো। মামুন অস্বস্তিতে পড়ল। কারো চোখের পানি দেখা অস্বস্তির। সেটা না মুছতে পারা অপারগতা। সেই অপারগতার সামনেই বারবার পড়ে মামুন। নিজেকে খুঁজে পায় অথর্ব হিসেবে।
‘ বসো। কাগজপত্র কই আছে খুঁজতে হবে।’
হায়দার আলম চলে গেলেন। মিতু দরজার কোণায় দাঁড়িয়ে সব শুনছিল। লাফ দিয়ে এসে বলল, ‘ তুমি বাবার ঋণ শোধ করবা ভাইজান?’ মিতুর চকচকে মুখের দিকে তাকালো মামুন। মেয়েটা কতো সহজে বাবা ডেকে ফেলেছে। সে কেনো ডাকতে পারছে না? কেনো পারছে না গাল ভরে একবার ডাকতে?
‘ দেখি পারি নাকি।’
‘ এতো টাকা কই পাবা? দাদাজান বলল পনের বিশ লাখ টাকা!’
‘ তুই সব শুনছিলি?’ চোখ ছোট করে তাকালো মামুন।
মিতু মুখ কালো করে বলল, ‘ আমি বাবার কাছে থাকলে উনি যেনো কেমন করে। আমি কি বাবাকে নিয়ে যাবো বলো ভাইজান? নিতে তো পারবো না।’
মামুন মুখ গোল করে শ্বাস ছাড়লো। মনে মনে চিৎকার করে উঠলো, ‘ বাবা! বাবা! বাবা!’
মিতু গেলো না। মামুনের পাশেই দাঁড়িয়ে রইলো। ধা করে মামুনের মনে পড়ল মিতুর একটা কথা।
‘ এই তুই বলেছিলি একটা ছেলে তোকে কলেজের বাইরে ডিস্টার্ব করে! ভুলেই তো গেছি। আজকে যেয়ে তো আর হবে না। কালকেই ওটাকে ধরবো। মনে করবি।’
‘ আজকেই আমরা চলে যাবো!’
‘ হ্যাঁ।’
‘ এখানে কয়েকদিন থাকবো না?’
‘ কার কাছে থাকবি? তুই তো বললি ভদ্রমহিলা আমাদের দেখতে পারছেন না।’
মিতু চুপ করে গেলো। কিছুক্ষণ পর চাপা কণ্ঠে বলল, ‘ ভাইজান বাবার তো প্রতিমাসে অনেক টাকার ওষুধ লাগবে। সেগুলো কিভাবে জোগাড় করবে?’
সহসাই উত্তর দিলো না মামুন। খানিকক্ষণ চুপ থেকে বলল, ‘ আমি চেষ্টা করবো ইনশাআল্লাহ্।’ মামুন টের পেলো তার কাঁধে রাখা মিতুর হাত ক্রমশ শক্ত হচ্ছে।
হায়দার আলম অনেক খোঁজাখুঁজি করে সেই কাগজের বান্ডিল পেয়েছেন। প্রায় পনেরো বছর আগের কাগজ। কলমের কালি ছড়িয়ে গেছে। সাদা কাগজের রং মলিন হয়ে তার বয়স জানান দিচ্ছে। বেশ কিছু গুরুত্ত্বপূর্ন কাগজ পেলো মামুন। যারা টাকা দিয়েছিলো তাদের পূর্ণ পরিচয় আছে। হাঁফ ছাড়লো সে। আশা করা যায় মানুষগুলোকে খুঁজে পেতে বেশি কষ্ট হবে না। টাকার পরিমাণ অনেক। আঠারো লাখের কিছু বেশি। মামুন মনে মনে হিসাব করলো। সারাজীবনে কি এই ঋণ শোধ করতে পারবে সে?
যাবার আগে মঈনুলের কাছে হায়দার আলমকে নিয়ে বসলো মামুন। সবাই ছিলো সেখানে। মামুন বলল, ‘ মিতু আর আমি কয়েক বছর ধরে একসাথেই থাকছি। আপনাদের নিয়ে যেতে চেয়েছিলাম। সেটা তো আর হচ্ছে না।’
হায়দার আলম বললেন, ‘ মিতুর মায়ের কি হয়েছে? কবে থেকে ও তোমার সাথে থাকে?’
‘ উনার বিয়ে হয়েছে আরো আগেই। তিন চার বছর হবে মিতু আমার কাছে আছে।’
হায়দার আলম ছেলের চোখের দিকে তাকালেন। ছেলেটা অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে।
‘ ওষুধপত্রের খরচ নিয়ে চিন্তা করবেন না। এটা আমার পরিবার। একসাথে থাকলেও আমার, না থাকলেও আমার। আমার একটা বোন আছে, আরো একটা ভাই আছে। বোনের দায়িত্ব আল্লাহ আমাকে দিয়েছেন। ভাইয়ের দায়িত্ব আমি এড়িয়ে যেতে পারি না। ওকে যথা সময়ে স্কুলে ভর্তি করাবেন। আমি মাসের শুরুতেই খরচ পাঠানোর চেষ্টা করবো ইনশাআল্লাহ্। যদি কখনো মনে হয় আমার কাছে রাজশাহী যেতে চান নির্দ্বিধায় জানাবেন। আমি এসে নিয়ে যাবো।’
মঈনুলের স্ত্রী বড় সংকটময় অবস্থা পার করছিলেন। কর্মক্ষম স্বামী, সংসার, ছেলেকে নিয়ে চিন্তায় করেছিলেন। বাবার বাড়ি থেকে সাহায্য করলেও কতই বা করতেন। একটা অসুস্থ মানুষের দায়িত্ব তো নিতে চাইতেন না। হয়তো তাকে চলে যেতে হতো ছেলের জন্য। মামুনের কথা শুনে সমূহ ভয় এক নিমেষেই দুর হয়ে গেলো। সতীনের ছেলেটাকে এই মুহুর্তে নিজের বলেই মনে হলো।
মামুন বলল, ‘এবার আসল কথায় আসি।’
হায়দার আলম তার দিকে তাকালেন। মঈনুলও তাকিয়ে আছেন শুরু থেকেই।
‘ মিতুর বয়স হয়েছে, বুদ্ধি হয়েছে। গত মাসের শেষে ওর ঊনিশ বছর পূর্ণ হয়ে গেছে। আমি ভাবছিলাম মিতুর জন্য পাত্র খোঁজার কথা।’
এতক্ষণ মিতু পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল। এই কথা শুনে সে বি’স্ফো’রি’ত দৃষ্টিতে তাকালো। হায়দার আলম বললেন, ‘ মিতু রাজি থাকলে তো সমস্যা নাই। খোঁজা শুরু কর।’
‘ আপনারা আমার মুরুব্বী। কোনো পাত্র খুঁজে দিলে আমি না করবো না। মিতুর যেখানে ভালো হবে সেখানে আমার কোনো না নেই।’
হায়দার আলম দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন, ‘ আমার আর শক্তি নাই মামুন। তোমার বাপ তো আরো আগেই হাল ছেড়ে দিলো। তুমিই দেখো।’
মামুন এক পলক মঈনুলের দিকে তাকালো। সরাসরি চোখের দিকে। নেতিবাচক কোনো লক্ষণ খুঁজে পেলো না। অবশ্য লক্ষণ প্রকাশ তো মঈনুল এখন ব্যর্থ। তবে একবার পলক ফেলা দেখে মনে হলো তিনি মামুনকে আশ্বাস দিলেন।
বের হওয়ার সময় হায়দার আলম মামুনের হাত ধরলেন, ‘ কি কাজ করো দাদা?’
মামুন হাসলো, ‘ ছাত্র পড়াই দাদাজান।’ সেই হাসি দেখে বৃদ্ধের বুঝতে কেঁদে উঠলো। ঠিক যেনো মঈনুল! আহা! তার ছেলেটা আর কখনই এভাবে হাসতে পারবে না।
বাসে উঠে মিতু রাগান্বিত কণ্ঠে বলল, ‘ তুমি আমার বিয়ে দিয়ে দিবা ভাইজান?’
‘ কেনো? বিয়ে করবি না?’
‘ এখনই কেনো?’
‘ একটা হীরা পেয়েছি। রাস্তায় পড়ে আছে। অন্য কেউ নেয়ার আগেই সেটা নিয়ে নিতে হবে। এজন্য এখনই।’
মিতু জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। মামুন ধীর আওয়াজে বলল, ‘ আমার উপরে তোর বিশ্বাস নেই মিতু?’
মিতু কোনো উত্তর দিলো না। এই প্রশ্নের উত্তর কি শুধু হ্যাঁ-তেই সীমাবদ্ধ? মুখ ঘুরিয়ে মিতু বলল, ‘ এক শর্তে রাজি হতে পারি।’
‘ কি শর্ত?’
‘ আমিও তোমার জন্য পাত্রী খুঁজবো।’
‘ খুঁজিস।’
~
বন্ধু বন্ধুকে জোর করে বিয়ে দেয় এমন কোথাও দেখেনি নিশান। সে মোটামুটি ধরনের বোবা হয়ে গেছে। প্রথমে ভেবেছিল মামুন মজা করছে। কিন্তু যখন দেখলো ছেলেটা আসলে সিরিয়াস তখন থেকে যে চুপ হয়েছে, তার মুখে আর কোনো কথাই আসছে না।
মামুন বাড়ি থেকে ফিরেই তড়িঘড়ি শুরু করেছে। জাহানারার সাথে যোগাযোগ করেছে। যৎসামান্য কেনাকাটা করে নিশানের মেসে হা’ম’লা দিয়েছে।
‘ মামুন তুই কি জানিস আমার বেতন কতো?’
‘ কতো? দারিদ্র্য সীমার নিচে?’
নিশ্বাস ছাড়ল নিশান, ‘ মাত্র পঁচিশ।’
‘ তুই কি অন্য কোথাও পরীক্ষা দিবি না? এখানেই স্যাটিসফাইড?’
‘ এই জি হুজুর মার্কা চাকরি বেশিদিন করতে পারব বলে মনে হয় না। অন্য কিছু করার ট্রাই করব ভাবছি।’
‘ গুড।’
‘ কিন্তু বউ নিয়ে থাকবো কই? এই মেসে?’
‘ না উপরের ফ্ল্যাট খালি আছে। আমি কথা বলে এসেছি।’
‘ আটঘাট বেঁধেই নামছো তুমি। কিন্তু পাত্রী কে দোস্ত? আমার যে ঘরবাড়ি নাই এইটা কি তারা জানে?’ বিছানায় টানটান হয়ে শুয়ে পড়ল নিশান। তার ট্রলি হাতড়ে ম’রছে মামুন একটা পরিষ্কার জামা খোঁজার জন্য।
‘ কুফু মিলে গেছে দোস্ত। পাত্রীরও ঘর বাড়ি নাই। থাকার ভেতর খালি একটা ভাই আছে। তুই যৌতুক পাচ্ছিস না।’
মাছি তাড়ানোর ভঙ্গিতে হাত নেড়ে মুখ বাঁকাল নিশান, ‘ আমার মেরুদন্ড এখনও পিঠেই আছে। কিন্তু কথা সেইটা না। কথা হলো এইটা যে আমার ছেলেমেয়ে দাদা নানা পাবে না। আহা! এখনই আমার ছেলেমেয়ের জন্য দুঃখে বুকটা ফেটে যাচ্ছে।’
একটা সাদা শার্ট স্ত্রী করা ছিল। সেই শার্ট হাতে নিয়ে নিশানের দিকে তাকিয়ে বিজয়ীর ভঙ্গিতে হাসলো মামুন। নিশান তড়াক করে উঠে বসলো। চোখ বড় বড় করে বলল, ‘ শালা পাত্রী কে!’
‘ এখন থেকে সম্বন্ধী বলে ডাকবি।’
~
মামুন সবসময় ডাইনিং রুমে থাকে। মিতু বারবার বলেও তাকে ঘরে নিতে পারেনি। সবাই ঘুমিয়ে গেলে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এলো মিতু। মামুনের মাথার কাছে দাঁড়ালো। ডিম লাইটের হালকা আলোয় চারপাশ দেখা যাচ্ছে। ছোট লেপটা গা থেকে সরে গেছে। মিতু সেটা টেনে মামুনের গায়ে দিলো। চুপচাপ বসে রইলো ভাইয়ের সামনে। বাবার জন্য যে তার ভাইজান কষ্ট পায় এটা মিতু বুঝতে পারে। তার কাছে যদি কোনো ক্ষমতা থাকতো তাহলে সে এক নিমেষে ভাইজানের মনের সব দুঃখগুলো মুছে দিতো। আস্তে করে মামুনের মাথায় হাত রাখলো মিতু। আজকে কলেজে সেই ছেলেটার সাথে তার কথা হয়েছে। তার বোনের সাথেও কথা হয়েছে। মিতু সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললো। বহুদিন পর রাতজেগে চিঠি লিখতে বসলো।
______________
নিশানের খুবই লজ্জা লাগছে। সাদা টুপিটা পড়ার পর থেকে তার মনে হচ্ছে তার মুখ লাল হয়ে গেছে। এভাবে বিয়ের চক্করে ফেঁসে যাবে জানলে আগে থেকেই পালিয়ে যেতো। মামুনকেও অনেকবার বলেছে যে সে কোনো কালেই বিয়ে করবে না। এজন্যই মামুন ধরো তক্তা মা’রো পেরেক থিওরি অ্যাপ্লাই করেছে। সফলভাবেই করেছে বলতে হবে। মামুনের সাবলেট ফ্ল্যাটের একটা রুমে একা একা বসে আছে নিশান। আত্মীয়দের জানানোর সুযোগ দিয়েছিলো অবশ্য। কাছাকাছিই কয়েকজন আছে। তারা আসলে যে মামুন মিতুর পরিবার নিয়ে যে একটা আকর্ষণীয় আলোচনা হয়ে যাবে নিশান জানে। অতি উৎসাহী ধরনের কিছু আত্মীয় ঝামেলা করতে পারে। তার চেয়ে তাদেরকে আপাতত না জানানোই ঠিক মনে করেছে নিশান। বউ আর মিষ্টি নিয়ে ঘুরে আসবে এক সময়। তাহলেই হলো। বউ কথাটা মনে হতেই দুচোখ বন্ধ করলো নিশান। সবাই কি বুঝে ফেলছে লজ্জায় যে সে ম’রে যাচ্ছে?
মামুন আবেদার আলী আর রাকিবকে দাওয়াত দিতে চেয়েছিল। আবেদার আলী যে হজ্জ্বে গেছেন আর ফিরে আসেননি। রাকিব খোঁজার চেষ্টাও করেনি। বিয়ের ব্যাপারেও তাকে উৎসাহী বলে মনে হলো না। নিশান আর তার কয়েকজন বন্ধুকে দাওয়াত দিলো মামুন।
ঘরটা বাচ্চাদের জিনিসপত্রে ভরপুর। এক অ’স্ত্রধারী বাচ্চা কিছুক্ষণ পরপর এসে ঘুরে যাচ্ছে। তার দিকে তাকিয়ে থাকছে তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে। যখনই আসছে তখনই চোখ ছোট করে বলছে, ‘ দুলা?’ তার বাপ বেচারা খুব চেষ্টা করেছে আঙ্কেল বলানোর জন্য। তাতে সে ডাকে, ‘ আঁতেল!’ নিশান আঁতকে উঠে, ‘ বলেছে দুলাই ডাক বাপ!’ ফলে মায়ের দুলাভাই তারও দুলাভাই এই যুক্তি জিতে গেছে।
সুমন বাবুকে জামাকাপড় পড়ানোর চেষ্টাও কম করেনি। ছেলেটা গায়ে কিছুই রাখতে চায় না। এ কেমন স্বভাব! আছিয়াকে কিছু বলাও যাচ্ছে না। ননদের বিয়ে নিয়ে সে মহাব্যস্ত। আবার নিশানকে বলছে দুলাভাই। সুমন একবার নরম কণ্ঠে বলেছিল, ‘ ননদের বর কি দুলাভাই হয় বলো বউ?’ তাতেও আছিয়া ক্ষেপে বাঘ।
‘ বাবুর গায়ে একটা জামা চড়াতে পারো না আবার আমাকে দুলাভাই না কি সেটা শেখাতে আসো?’ সেই থেকে সুমন চুপ করে আছে। ছেলেকে জামাকাপড় না পড়াতে পারা তার চরম ব্যর্থতা।
মামুন সুমন বা আছিয়া কারো সাথেই খুব একটা কথা বলে না। আজ তাকে খুব উৎফুল্ল বলে মনে হচ্ছিল। সে একটা ছোট গামছা নিয়ে সুমনের সামনে এসে দাঁড়ালো। সুমনের কোলে থাকা বাবুকে বলল, ‘ দেখো আমি লুঙ্গি পড়ে আছি। তোমার আব্বুও পড়েছে। তুমি না পড়লে সবাই তোমাকে ছোট বলবে। আজকে একটা লুঙ্গি বিয়ে হবে। তুমি পড়বা না?’
বাবু খুব হিসাব নিকাশ করলো। অতঃপর ধীর গতিতে মাথা নাড়ল। সে রাজি। সুমন হাঁফ ছেড়ে বলল, ‘ লুঙ্গিই কম কিসে!’
মিতু ফোন সামনে নিলো। জাহানারা দেখলেন লাল শাড়ি পড়া মিতুকে। আলো যেনো ছুটে আসছে মেয়েটার চেহারা থেকে! তার মানে মিতু খুশি। গলায় পাতলা একটা চেন আর কানে ছোট এক জোড়া দুল নিয়েই তার মেয়েটা খুশি।
মিতু বলল, ‘ তুমি কোথায় মা?’
‘ সৌদি এসেছি। সায়রার বাবার কাছে।’
‘ কবে গিয়েছ?’
‘ চার পাঁচ মাস হবে।’
‘ ওখানেই থাকবে?’
‘ না। সাইফুল চলে যাবে আর কিছুদিনের মধ্যেই। সবাই একসাথেই ফিরবো।’
মিতু চুপ করে গেলো। কথা খুঁজে পেলো না। কথারা ফুরিয়ে গেছে।
‘ তুই খুশি মিতু?’ যেনো ফিসফিস করে বললেন জাহানারা।
‘ হ্যাঁ। মায়িদা ফুপু কেমন আছে?’
‘ ও তো ভালো আছে। কপাল পু'ড়ে'ছে মনিরার। ওর জামাই আরেকটা বিয়ে করেছে। এখন সেই বউয়ের কাছেই থাকে। ছাড়াছাড়ির কথাও শুনেছিলাম। কি জানি কি করে!’
মিতু চুপচাপ শুনলো। মানুষের দুঃখের কথা শুনতে আর ভালো লাগে না। সে নিজে ভালো থাকতে চায় আর সকলের ভালো খবর শুনতে চায়। চাপা কণ্ঠে বলল, ‘ আমাকে দোয়া করে দাও মা।’
জাহানারা অপলক মেয়েকে দেখলেন, ‘ দোয়া করি।’ মিতু ফোন রেখে দিলো। মায়ের জন্য কষ্ট হচ্ছে। তার চেয়ে বেশি কষ্ট হচ্ছে মামুনের জন্য। মামুন আবার একা হয়ে যাবে। নিজের মনকে শান্ত করলো মিতু। কয়েকটা দিনই তো!
আয়োজন সম্পন্ন হলে মামুন মিতুর কাছে এলো। সামনে বসে মিতুর হাত দুটো মুঠোয় নিলো।
‘ নিশানের বেতন খুব বেশি না মিতু। কিন্তু ওর মনটা ভালো। কর্মঠ। মনের ভেতরের বিবেকটা ম’রা না। একটা শক্ত মেরুদন্ড ওর আছে। আমার বিশ্বাস আল্লাহ তোকে ভালো রাখবেন। বড় আশা নিয়ে তোকে ওর কাছে পাঠাচ্ছি মিতু। ওর যত্ন নিস।’
মিতু মনে মনে বলল, ‘ তুমি যাকে হীরা বলেছ আমি তাকে হীরাই বললাম ভাইজান। বাকি দুনিয়া তাকে তামা ভাবলেও আমার কিচ্ছু যায় আসে না।’
মিতুর কানের ছোট্ট দুল আর গলার চেনটা বানিয়ে দিয়েছে মামুন। মিতুর জন্য আগে থেকেই সে সঞ্চয় করে আসছে। গায়ের শাড়িটা আছিয়া তাকে কিনতে দেয়নি। মামুন আর জোর করেনি। তাদের জীবনে স্নেহের দানের বড় অভাব। যেচে আসা স্নেহকে তারা কিভাবে ঠেলে দেয়? ফলে সম্মতি পেয়ে নিজে থেকেই আয়োজনের চূড়ান্ত করেছে আছিয়া। খাবার দাবারের ব্যবস্থা তারাই করেছে। তবে সুমন বড় ভাই হতে পারেনি। মামুন পাশে পাশে সে ছোট ভাইয়ের মতো লেগে থাকছে। এক পর্যায়ে সুমন মামুনকে বলল, ‘ মামুন মোহরের বিষয়টা ক্লিয়ার হয়ে গেছে তো?’ মামুনের টনক নড়ল। এই নিয়ে তো কোনো কথাই হয়নি। ছুটে গেলো বন্ধুর কাছে।
‘ এই তোর টাকা পয়সা কিছু জমানো আছে তো?’
করুন মুখ করে নিশান বলল, ‘ থাকার কথা।’
‘ কতো আছে?’
‘ পঁচিশ হাজার তিনশ।’ ভেবে চিন্তে বলল নিশান।
‘ পঁচিশ হাজার আজকের মোহর। আর তিনশ টাকা দিয়ে আমার বোনকে একটা ফুলের বুকে কিনে দিবি। আজকেই।’ চলে যেতে যেতে বলল মামুন। নিশান মাথা নাড়ল। তার তো আর কিছু করার নেই।
খুব অনাড়ম্বর ভাবেই মিতুর বিয়েটা হয়ে গেলো। একদিনের পুতুল খেলা সত্যি হতে দেখলো মিতু। খুব করে মনে পড়ল জেসমিনের মুখটা। পাট ভাঙা সাদা শার্ট পড়ানো নিশানকে যখন তার পাশে বসানো হলো তখন প্রথমবারের মতো মিতুর দিকে তাকালো নিশান। সেই দৃষ্টির মোকাবেলায় মিতু টিকতে পারল না। মুখ নামিয়ে আশ্রয় নিলো জামদানীর ঘোমটার আড়ালে।
বোনকে যখন বন্ধুর হাতে তুলে দিলো তখন মুখ দিয়ে একটা শব্দও বের করতে পারল না মামুন। ঢোক গিললো বারংবার। চোখে বর্ষা নামতে চাইলেও আটকে রাখলো ধৈর্যের বাঁধনে। তবে নিশানের চোখ এড়িয়ে যেতে পারল না। নিশান তো সবকিছুর সাক্ষী। মামুনের দুবেলা খাওয়া, জ্বরের ঘোরে বকা প্রলাপ, বাঁচিয়ে রাখা ভাঁপা পিঠা অথবা হঠাৎ হঠাৎ কিনে ফেলা এক মুঠো চুড়ি। সবকিছুর সাক্ষী নিশান। সে জানে মামুন তাকে তার কলিজার অর্ধেক না, পুরোটাই দিয়ে দিচ্ছে। সে এক হাতে সদ্য বিবাহিত স্ত্রী আরেক হাতে বন্ধুর হাত ধরলো। শক্ত করে। মিতু, মামুন দুজনেই টের পেলো সেই স্পর্শে ভরসার কি দৃঢ় অবস্থান।
রিকশায় ওঠার আগে মিতু মামুনের কাছে ফিসফিস করে বলল, ‘ আমার ঘর কিন্তু কমেনি ভাইজান। বেড়েছে। আগে তোমার বুকে থাকতাম। পরেও থাকবো। আমাকে তুমি কোনোদিনই তোমার বুক থেকে নামাতে পারবো না।’
মামুন দেখলো ছোট্ট রিকশায় মিতু চলে যাচ্ছে। তার নিজের সংসারে।
নিশান বেজায় লজ্জা পাচ্ছে। তার যে কিছুই নেই এটা কি মামুন মিতুকে বলেছে? শো শো করে বাতাস বইছে। সেই হিম বাতাসে কাঁপুনি ধরছে দুজনের মাঝেই। নিশান একটু দুরত্ব কমিয়ে বলল, ‘ আজকেই নতুন বাসা নিয়েছি তো। ফার্নিচার বলতে কিছুই নেই। ঘর একদম ফাঁকা।’
নিশান শুনতে পেলো কুয়াশার জাল ছিন্ন করে একটা কণ্ঠ বলছে, ‘ আমার ভাইজান বলেছে আজ থেকে আমার কাছে হীরা আছে।’
নিশানের মনে হলো কুয়াশা তার চোখে জমাট বেঁধেছে। রাস্তার মাঝের আইল্যান্ডে সারি সারি রোড লাইট। সেসব কিছুকে নিশান ঝাপসা দেখছে। অথচ মনে হচ্ছে এর চেয়ে সুন্দর দৃশ্য আর হতেই পারে না।
~
ফাঁকা ঘরে আসতেই মামুনের বুকটা হাহাকার করে উঠলো। সুখ দুঃখ মাখা কেমন একটা ব্যাথা। মঈনুলের হঠাৎ দু'র্ঘ'ট'না মামুনকে ভয় ধরিয়ে দিয়েছিল। মনে হয়েছিল এভাবেই তার কিছু একটা হয়ে গেলে মিতুর কি হবে? সেই ভাবনাই তাকে বাধ্য করলো ভেবে রাখা কল্পনাকে বাস্তবে আঞ্জাম দিতে।
টেবিলে বসলো মামুন। ঘরে আর কেউ নেই। মিতু ‘পথের পাঁচালী’ আর পড়েনি। বহুবার পড়া বইটাই আবার টেনে নিলো মামুন। আজ একলা রাতটা দূর্গা আর অপুর সাথে কাটানো যাক।
প্রথম পৃষ্ঠা ওল্টাতেই একটা কাগজ হাতে এলো। চিঠিটা খুব যত্ন করে চাপা দেয়া ছিল। এক ভাঁজ খুলতেই দৃশ্যমান হলো দু লাইনের লেখা।
‘ এখন চিঠিটা পড়বে না ভাইজান। কাল সকাল নয়টায় ইবলিশ চত্বরে যাবে। ওখানে যেয়ে এটা পড়বে। খুলবে না কিন্তু!’
মিতুর কথা রাখলো মামুন। নয়টা বাজার আগেই ইবলিশ চত্বরে যেয়ে পৌঁছুলো। আবহাওয়াটা কেমন যেনো মন খারাপ করা। রোদ উঠবে বলে মনে হচ্ছে না। মামুন ভাবলো বাসাটা পাল্টে ফেলবে। একটা মেসে উঠলেই হয়ে গেলো।
একটা জায়গা বেছে বসে পড়ল মামুন। পকেট থেকে বের করলো চিঠিটা। হাত যেনো জমে গেছে। চিঠির ভাঁজ খুলতেও কষ্ট হলো।
‘ আমার মায়ার ভাইজান,
আমি যেভাবে তোমাকে বিশ্বাস করি তুমিও আমাকে সেভাবে বিশ্বাস করো তাই না? আমি জানি করো। কিন্তু ভাইজান, তোমার ওপর একটা অভিযোগ আছে। আমি তো ভাবতাম তুমি কাউকে কষ্ট দিতে পারো না। কিন্তু একজনের মনে এতো কষ্ট দিয়ে বসে আছো এটা জেনে আমি খুবই আশাহত হয়েছি। লজ্জায় আমার নাক কা’টা গেছে। যাইহোক, এখন সেই কা’টা নাক জোড়া লাগানোর দায়িত্ব তোমার। এই গুরুদায়িত্ব পালন না করতে পারলে কিন্তু তোমাকে কঠিন শাস্তি পেতে হবে ভাইজান!
আমাকে যে একটা ছেলে বিরক্ত করতো সেটা কিন্তু তোমার জন্যই। তুমি ভুলে গিয়েছিলে তাই না? আল্লাহই ভুলিয়ে দিয়েছেন। একদম ঠিক করেছেন। তুমি যেমন তোমার বোনের কষ্ট কমাতে চাও সেই ভাইও তো তার বোনের কষ্ট কমাতে চায়। সেজন্যই আমার সাথে কথা বলতে চেয়েছিল। সেই ভাই আর তার বোনকে তোমার কাছে পাঠিয়েছি। তাদের সাথে সুন্দর করে কথা বলবে। একদম ত্যাড়া ত্যাড়া কথা বলবে না যেনো! এরপর আমাকে একটা বিয়ের কার্ড ছাপিয়ে পাঠাবে। আর কাউকে না পাঠালেও আমাকে পাঠাতেই হবে। নাহলে কিন্তু তোমার বিয়েতে যাবো না বলে দিলাম! এবার সামনে তাকিয়ে অপেক্ষা করো। চেনার চেষ্টা করো।
ইতি
মিতু
পুনশ্চ: বানান যে একটাও ভুল হয়নি এটা কি খেয়াল করেছো?’
সাইকেলের বেলের শব্দে সামনে তাকালো মামুন। চেষ্টা তাকে করতে হলো না। হালকা দাঁড়ি গোঁফ উঠেছে। চোখ, হাসি একইরকম আছে। সিয়াম দরাজ গলায় সালাম দিয়ে বলল, ‘ ওস্তাদ! আপনি যে ডুব দিলেন ডুবুরি দিয়ে খুঁজিয়েও তো আর পেলাম না।’
মামুন উঠে যেয়ে সিয়ামকে আলিঙ্গন করলো। ছেলেটার ভাব ভঙ্গি একদম বদলে গেছে। কথার ভাঁজে অহংকারের বদলে আন্তরিকতার ঠাঁই মিলেছে।
‘ তোমার কি খবর সিয়াম?’
‘ আমার খবর ভালো। কিন্তু আমার বোনের অবস্থা তো টাইট। আমি আসলাম আপনার কাছে সুপারিশ করতে। শুধু একবার কবুল বলবেন আর আমার বোনটাকে নিয়ে রেলস্টেশনে চলে যাবেন। ব্যস! প্রাক্তন ছাত্রর এই আবদারটা রাখবেন না স্যার!’
সিয়াম সরে দাঁড়ালো। মামুন দেখলো রাস্তার ওপাশে চেনা এক জোড়া চোখ। খুব চেনা আবার যেনো পুরোটাই অচেনা। সেই অচেনা চোখজোড়া তাকে ডাকছে শীতের দিনের উষ্ণতার মতো। একটা নতুন শুরুর জন্য।
|সমাপ্ত|