#শ্রাবণ_ধারার_রূপকথা
#পর্ব_৫০
#কলমে_অনামিকা_তাহসিন_রোজা
হাওয়ায় ভাসছে ধারা। রীতিমতো মাথা কাজ করছে না মেয়েটার। চোখে অন্ধকার দেখতে শুরু করেছে তখন থেকেই। কিন্তু নিজেকে কোনোমতে সামলে সে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে। চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে ব্যস্ত শহর দেখছে আনমনে। দুহাত কচলে কচলে অস্থিরতার দোলাচালে দীর্ঘশ্বাস ফেলল ধারা। ঠোঁট ভিজিয়ে বিষয়টা আবারো বোঝার চেষ্টা করলো। ডক্টর সাবরিনা কে বিদায় জানিয়ে সালমা বেগম বোরখা পড়ে রওয়ানা দিলেন তার বোনের বাসায়। ধারার দেখাশোনার জন্য লোক রাখবেন তিনি। সেসবেরই আলোচনায় বেরিয়ে পড়লেন। রাতে বের হতে মানা করল শ্রাবণ। কিন্তু শোনেন নি সালমা বেগম। অনায়াসে বেরিয়ে পড়েছেন, এবং যাওয়ার আগে শ্রাবণকে সাবধান করে সতর্কবাণী ছুঁড়ে দিয়ে বলেছেন— ধারার খেয়াল রাখ যা। রাতে খাইয়ে দিবি খাবারটা। না খেয়ে যেনো না থাকে।
কিন্তু শ্রাবণ নিজেই এখনো স্বাভাবিক হতে পারে নি। সে চিন্তিত। ভীষণরকম চিন্তিত। সেই সময় খবরটা শোনা মাত্রই তার হৃদয়ে একটা প্রশান্তির হাওয়া বয়ে গেলেও মাথার মধ্যে তৎক্ষণাৎ এসেছে এক অজানা দুশ্চিন্তা। আনন্দের শীতল হাওয়াটা অনুভব করার সাথে সাথে উপলব্ধি করতে পেরেছে আঁধারের এক টুকরো কালো ছায়া। মনের মধ্যে খচ খচ করা শুরু করেছে ইতিমধ্যে। সালমা বেগম বাড়ি থেকে চলে যাওয়া মাত্রউ শ্রাবণ দরজা লাগিয়ে কিছুক্ষণ ড্রয়িং রুমের ঠিক মাঝখানে থম মেরে দাঁড়িয়ে থাকল। হাত-পা অসাড় হয়ে গিয়েছে তার। এত ঠান্ডার মধ্যেও রীতিমতো ঘামতে শুরু করেছে লোকটা। একটুতেই যেন অস্থির হয়ে কেমন যেন অগোছালো হয়ে গেল।
শ্রাবণ শেখের এমন অস্থিরতা মোটেই অস্বাভাবিক নয়, আবার স্বাভাবিক বলেও নেওয়া যাচ্ছে না। সে কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে দীর্ঘশ্বাস ফেলল সিঁড়ি ভেঙে উঠে গেল উপরে। ধারা বারান্দায় রেলিং য়ের পাশে দাঁড়িয়ে হেলান দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ভাবছিল। সেও শ্রাবনের মত চিন্তিত। কিন্তু হতে পারে দুজনের চিন্তার কারণ ভিন্ন।
শ্রাবণ ঘরে এসেই দরজা লাগালো। বিছানায় ধারা কে না দেখে ভ্রু কুঁচকে তাকালো। আশেপাশে তাকিয়ে কিছুক্ষণ খুঁজলো, এরপর বারান্দায় এগিয়ে গেলো। ধারাকে দেখে কয়েক মুহুর্তের জন্য স্থির হলো। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে ধারাকে দেখল। কেমন যেন হুট করেই সবকিছু হয়ে গেল। ধারার চুলগুলো বড্ড এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে গিয়েছে পিঠে। পড়নে থাকা পোশাকটাও অগোছালো লাগছে। কোনোমতে রেলিঙে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে মেয়েটা। শ্রাবণ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অনাকাঙ্খিতভাবে হয়ে যাওয়া তার ভালোবাসার বউটাকে দেখল। উপলব্ধি করতে পারলো সময় খুব তাড়াতাড়ি বয়ে গিয়েছে। মনে হচ্ছে এইতো কয়েকদিন আগেই সে বাসর ঘরে ঢুকে একটা বাচ্চা মেয়েকে দেখে রাগারাগি করেছিল বেশিদিন তো হয়নি, মেয়েটার সাথে সম্পর্ক ঠিক হওয়ার। তবে কেনো এত তাড়াতাড়ি এত দূর চলে আসলো তারা? সময় কি তাড়াতাড়ি চলে যাচ্ছে, নাকি তারা এতটাই সুখী ছিল যে সময়ের দীর্ঘতা টের পায়নি কেউই? সুখ ক্ষণস্থায়ী! সকলেই জানে তা। কিন্তু যেই সুখে জীবন গুছিয়ে ওঠে, সেই সুখ দীর্ঘস্থায়ী নয় কেনো? কেনোই বা দুঃখকে আসতেই হবে?
শ্রাবণ দীর্ঘশ্বাস ফেলে এগিয়ে গিয়ে ধারাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরলো। চমকে উঠলো ধারা। আঁতকে উঠে কিছুটা নড়েচড়ে উঠলো। সে জানে জড়িয়ে ধরা লোকটা শ্রাবণ ছাড়া কেও হতেই পারে না। কিন্তু হুট করে হওয়াতে একটুখানি আঁতকে উঠেছে, যা লক্ষ্য করেছে শ্রাবণ। সে এবারে ধারার গালে সময় নিয়ে ঠোঁট চেপে ধরে রাখলো। চুমু খেয়ে জিজ্ঞেস করলো আলতো স্বরে,
—" কী হয়েছে বউজান?"
ধারা জোরপূর্বক হাসলো বোধহয়। ঠোঁট কাঁমড়ে বলল,
—" উহু। কিছু না।"
আরো কিছুক্ষণ নীরবতার পর ধারা নিজে থেকেই এবারে অধৈর্য হয়ে মিনমিন করে চোখমুখ কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো,
—" আচ্ছা, কীভাবে কী হয়ে গেলো?"
শ্রাবণের মাথায় দুষ্টুমির ভূত চাপলো। ঠোঁট কাঁমড়ে দুষ্টু হেসে সে ধারাকে আরো কাছে টেনে নিয়ে বলে উঠলো,
—" কী হয়েছে তা তো পরে দেখাই যাবে, আর কীভাবে হলো এটা ব্যাখ্যা করতে হলে তো তোমায় এখন আমার সাথে রুমে যেতে হবে।"
ধারা ঠোঁট উল্টে অসহায় নেত্রে চেয়ে তাকালো। শ্রাবণ এই দৃষ্টি দেখে হাসি আটকে রাখতে পারলো নাম ফিক করে হেসে ফেলে আবারো চুমু খেলো ধারার গালে। আদর করে টেনে নিয়ে আরেকটু আদুরে গলায় জিজ্ঞেস করল,
—" তুমি আমায় বলোতো, ব্যাপার টা কী হলো? আমি তো তোমায় মেডিসিন দিয়েছিলাম। পিল গুলো নাও নি তুমি?"
ধারা ঠোঁট কাঁমড়ে এলোমেলো দৃষ্টি ফেলল। পিলের ব্যাপারে সে কিছু বলবেই না। ইচ্ছে করেই খায়নি সে ওসব। শ্রাবণকে বলেছিল এই বিষয়ে ধারা। শ্রাবণ বারণও করেছিল। কিন্তু ধারা নিজেই জেদ করে আর খায়নি। তাই আমতা আমতা করে বলল,
—" আপনি খুশি হন নি?"
শ্রাবণের মুখ বিষাদের আঁধারে ঢেকে গেলো। কালো ছায়া টের পাওয়া গেলো৷ হুট করেই শুকনো ঢোক গিলল শ্রাবণ। দীর্ঘশ্বাস ফেলে ধারা কে নিজের দিকে ঘুরালো। গালে দুইহাত রেখে মেয়েটার কপালে চুমু খেয়ে চোখে চোখ রেখে বলতে শুরু করল,
—" তোমায় কে বলেছে আমি খুশি নই? খুশি হবো না কেনো বলো? আমি তো... ভীষণ খুশি। এর চেয়ে বড় খুশির খবর আমার জীবনে আসতে পারে বলো ? বাবা হওয়ার আনন্দ যে কতটা সুখের তা আমি কীভাবে বলব তোমায়? তুমি আমার বউ, তুমি আমার ধারা, তুমি মা হতে চলেছো, এটা তো আমার জীবনটাই বদলে দেয়ার মত খবর। খুশি হবো না কেনো?"
ধারা নরম চোখে তাকালো। লোকটার চোখ মুখ দেখে মনে হচ্ছে না যে বলার মত তেমন খুশি। শ্রাবণও বুঝতে পারছে যে ধারা ভয় পাচ্ছে। তাই সে আলতো করে ধারার গালটা হাতের তালুতে রেখে চাপা স্বরে বলল,
—" ধারা, শোনো.. আমার খুশির মতোই একটা ভয়ও আছে। হ্যাঁ আমি খুশি। কিন্তু, সাথে আতঙ্কিত। তোমার জন্য। তোমার শরীরের জন্য। তোমার বয়স তো কম ধারা। তুমি বুঝতে পারছো না যে এইসবে কতটা কষ্ট হয়। আমি ভয় পাচ্ছি তোমার জন্য, এত কিছু সামলাতে গিয়ে তুমি কষ্ট পাবে, ব্যথা পাবে.. তোমার শরীর যদি না পারে? তুমি যদি সামলাতে না পারো? ভীষন কষ্ট হবে ধারা, আমি কিন্তু তোমার কষ্ট দেখতে পারব না। আমি চাইনা যে এসবে তোমার কিছু হয়ে যাক। দেখো, আমি তোমায় বলেছিলাম যে এই বাচ্চাকাচ্চা অনেক পরে নেব। এমনকি কখনো কল্পনাও করিনি বাচ্চার কথা। তোমায় তো কখনো এই বিষয়ে বলিও নি। তবুও তুমি এমন একটা কাজ কেনো করলে বলো তো? পিল টা নেয়া তো উচিত ছিল বলো।"
শ্রাবণের চোখে সত্যিকারের দুশ্চিন্তার ঝিলিক স্পষ্ট। সে ধারার দুহাত চেপে ধরলো শক্ত করে। গালে হাত বুলিয়ে চোখে চোখ রেখে বলল,
—"এই জন্যই চিন্তা করছি। খুশি নই বলে নয়। তুমি এমন ভেবো না যে আমি খুশি না। আমি তো আকাশের উপরে উঠে গেছি আনন্দে, শুধু তোমার শরীর নিয়ে দুশ্চিন্তা থামাতে পারছি না। তুমি পারবে তো ধারা? শেষে গিয়ে হাল ছেড়ে দেবে না তো?"
ধারা সন্দিহান দৃষ্টিতে তাকালো। লোকটা কি তাকে দুর্বল মনে করছে? ধারার রাগান্বিত দৃষ্টি দেখে শ্রাবণ মৃদু হাসলো, সেই পরিচিত, ধারার মন গলিয়ে দেওয়া নরম হাসি। কিছু একটা ভেবে খুব অসস্থি নিয়ে শ্রাবণ আমতা আমতা করে বলল,
—" দেখো, তুমি যদি চাও তো একটা কাজ করতে পারি...আল্লাহ চাইলে পরেও তো আবার..
কথা শেষ করার আগেই শ্রাবণের মুখ চেপে ধরলো ধারা। পা উঁচু করে শ্রাবণের উচ্চতার সমান হওয়ার চেষ্টা করলো যেন। এক হাতে শ্রাবণের ঠোঁট চেপে আরেকহাত দিয়ে বুকে ভর দিলো৷ চোখ বড় করে তাকিয়ে শক্ত কন্ঠে বলে উঠলো,
—" চুপ করুন, একদম থেমে যান। আমি এই ভয়টাই এতক্ষণ পাচ্ছিলাম আপনি জানেন? মোটেই এসব উল্টোবাল্টা কথা বলবেন না আপনি। আমার বাচ্চা, আমার সন্তান! আপনার যদি সমস্যা হয় তাহলে আমি চলে যাব। তবুও খবরদার যদি এসব উল্টোবাল্টা কথা বলেছেন, তাহলে দেখবেন আমি কী করি!"
ধারার এমন রূপ দেখে শ্রাবণ অবাক হয়ে তাকালো। নিজের মুখ থেকে ধারার হাত সরিয়ে চোখ বড় করে রেখেই বলল অবাক হয়ে,
—" তুমি এই কারনে দুশ্চিন্তা করছিলে? লাইক সিরিয়াসলি?"
ধারা অন্যদিকে ফিরে বলল,
—" অবশ্যই। আর আল্লাহ চাইছে, তাই দিছে। যা হবে ভালোই হবে। শুধু শুধু টেনশন করে কোনো লাভ নেই।"
এতক্ষণ ধরে নিজেকে সামলে রেখেছিল শ্রাবণ। ধারার কথা শুনে এবারে তার মেজাজ খারাপ হলো। দাঁত খিঁচিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে শ্রাবণ বলল,
—" এই মেয়ে এদিকে তাকাও। মুরগির বাচ্চার মত শরীর নিয়ে তুমি আরো ওজন পেটের মধ্যে রাখবে কী করে হ্যাঁ? নিজের সাইজ দেখেছো? হাঁসের ছানাও তোমার থেকে বড়। টোকা দিলেই তো ভনভন করে ঘুরতে থাকো। ঝড় এলে উড়ে গিয়ে তাল গাছে লটকাবে। ফু দিলে বসন্ত বাতাসে উড়তে থাকবে। আর ভাব নিচ্ছো?"
শ্রাবণের কথাগুলো শুনে ধারা একবারেই ক্ষেপে উঠলো। লোকটা রীতিমতো টাটকা অপমান করছে। ধারা চোখ লাল করে তাকিয়ে বলল,
—" আপনি কীসব আজাইরা কথা বলছেন! হাঁসের ছানা কেনো আমি? আমি মানুষ! আর আপনিই তো সবসময় বলেন আমি পাতলা ভালো, আমি কিউট। এখন আবার এমন কথা কেনো?"
শ্রাবণ নাক টেনে হেসে বলল,
—"হ্যাঁ, পাতলাই ভালো। কিন্তু এত পাতলা যে তোমায় দেখে মনে হয়, পৃথিবীতে বাতাসই সবচেয়ে বিপজ্জনক জিনিস তোমার জন্য।"
ধারা হাত কোমড়ে দিয়ে তাকালো। ঝামটি মেরে বলল,
—" তা হলে তো আপনি আমাকে বউ বানিয়ে ভুলই করেছেন।"
শ্রাবণ সাথে সাথে পাল্টা দিলো,
—"হ্যাঁ, ভুলই করেছি। এখন সেই ভুলের ফল তোমার পেটেই এসে পড়ছে। আমাকে এখন ডাবল দায়িত্ব নিতে হবে, একটা তুমি, আর একটা তোমার ভেতরের উড়ন্ত বাদামটাকে সামলানো।"
ধারা মুখ হাঁ করে তাকালো,
—" কী? বাদাম? আপনি আমার বাচ্চাকে বাদাম বললেন?"
শ্রাবণের মন চাইলো চিৎকার করতে। তবে মেয়ে টাকে জ্বালাতে ভালো লাগছে তার। তাই কাঁধ ঝাঁকিয়ে আবারো বলল,
—" অবশ্যই বাদাম! আমি রিয়েলি তোমাকে নিয়ে টেনশনে আছি ধারা। জাস্ট থিংক তুমি এখনো তো হাঁটতে গেলে উষ্ঠা খাও।"
ধারা চিৎকার করে বলল,
—" মোটেই না। আপনার কী মনে হয় যে আমি এমন অবস্থা তেও উষ্ঠা খাব? এটা কি সম্ভব?"
শ্রাবণ গম্ভীর মুখে মাথা নেড়ে বলল,
—"তোমার ক্ষেত্রে সবই সম্ভব। তোমার শরীর এত অল্প জায়গা, সরিষার ডাঁটার সাথে তুলনা করলেও ডাঁটা লজ্জা পাবে।"
ধারা রাগে থরথর করে উঠলো। সে এবারে তর্জনী তুলে বলল,
—"আপনি… আপনি… আপনি এত খারাপ কেনো? আমায় নিয়ে মজা করছেন? আমি কি ভুল কিছু করেছি নাকি?
শ্রাবণ আবারো দুষ্টু হেসে বলল,
—"হ্যাঁ। আমার বাচ্চাটাকে না জানিয়ে চুপচাপ নিজের পেটে রেখে দিয়েছো। এটা কি কম অপরাধ?"
ধারা হাঁ করে তাকালো। তার এবার কান্না পেলো। লোকটা রীতিমতো মজা নিচ্ছে। ধারা আর মানতেই পারলো না। এবার গলা বুঁজে উঠলো। চোখ চিকচিক করতে লাগলো। টলটল চোখদুটো দেখে শ্রাবণ স্থির হলো। ইশ রে! ডোজটা বেশি হয়ে গেছে। ঠোঁট ভিজিয়ে নিজেকে ধাতস্থ করলো শ্রাবণ। আঙুল দিয়ে ধারার গাল ছুঁয়ে বলল,
—" নো নো নো। প্লিজ নো। কান্না না প্লিজ। তুমি ঝগড়া করো ধারা। যা ইচ্ছে বলো, বাট নো কান্না। প্লিজ বউ। ওকে। হয়েছে তো। আমারই দোষ।যাও আর কিছু বলবনা। কেঁদো না।"
ধারা ঠোঁট কাঁপিয়ে চিৎকার করলো,
—"আমি কান্না করছি না!"
—"হেহ! এইটা কান্না না? তবে কী? মেঘ থেকে নোনতা বৃষ্টি পড়ছে?"
ধারা আর নিজেকে সামলাতে পারলো না। হিঁচকি তুলে গড়গড় করে বলতে শুরু করলো,
—" আপনি একটা খারাপ মানুষ। আপনি খুবই খারাপ মানুষ। আপনি কি মনে করেন আমি কিছুই জানিনা? আপনি কি আমাকে এতটাই অজ্ঞ মনে করেন? ছোট থেকে কতটুকু অত্যাচার নির্যাতন সহ্য করেছি আমি? আমার শরীরে কত মার পড়েছে তা আপনি নিজেই জানেন। আমার পিঠে কোমরে খুন্তির ছ্যাঁকার দাগ যে কত রয়েছে যা নিজেও দেখেছেন আপনি। সেই দাগেগুলোতে আপনি আদর পর্যন্ত করেছেন। আজ পর্যন্ত আমার সাথে হওয়া ছোটবেলার সমস্ত জঘন্য ঘটনা আপনি জানেন। আর, আপনি খুব ভালো করেই জানেন আপনার ধারা এতটাও দুর্বল নয় যে মা হতে পারবেনা। যে মেয়েটা মাত্র সাত বছর বয়সে কড়কড়ে রোদের মাঝে উনুনে রান্না করতে পারে, সে আঠেরো বছর বয়সে মা হতে পারবে না? আপনি আমাকে কি আর পাঁচটা মেয়ের মত নমনীয় মনে করেন? আমি মোটেই অত নরম নই। মোটেই না।"
বলেই চোখের পানি মুছে ফেলল ধারা। হ্যাঁ ও ইচ্ছে করেই পিল নেয়নি। মা হতে চেয়েছে। জানতো যে শ্রাবণ রাজি হবেনা। তাই লুকিয়েই পিল নেয়া বন্ধ করেছিল। কিন্তু শ্রাবণ যে শেষমেশ তাকে এই কথাটা বলবে সে কল্পনা করেনি। অনেক কষ্ট পেলো ধারা। চোখ ঘষে আবারো বলতে শুরু করলো,
—" হ্যাঁ, এটা সত্যি যে আমি আপনার সামনে নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারি না। আমি আপনার সামনে এলে পুতুলের মত হয়ে যাই। একটু ছুঁলেই যেমন মাটির পুতুল ভেঙ্গে যায়, আমি আপনার সামনে ততটাই নরম হয়ে থাকি। কারণ আপনি আমার স্বামী, আপনাকে ভালোবাসি আমি৷ আপনার সামনে আবেগ দেখাব না তো কার সামনে দেখাবো বলুন? আমি যে আপনার সামনে আসলে, আপনার ছোঁয়া পেলে, নিজেকে ধরে রাখতে পারি না। না চাইতেও বৃষ্টির মত সবকিছু ঝরে পড়ে আপনার কাছে। আপনার হৃদয়ের কাছাকাছি এলেই বড্ড অসহায় লাগে নিজেকে। অঝোরে কাঁদতে মন চায়। একমাত্র আপনিই তো আমার আশ্রয়। আপনি বিশ্বাস করুন, ছোট থেকে অন্তত শরীরের চামড়া শক্ত হওয়ার পর থেকে আর কোনদিনও কাঁদিনি, কান্নাকাটি কখনোই করিনি। এত অত্যাচার সহ্য করার পরেও করিনি। অথচ আপনার ভালোবাসা পাওয়ার পরে, আপনার স্নেহ-আদর পাওয়ার পরে নিজেকে একটা বাচ্চা মনে হয়। কান্না পেয়ে যায় আপনার দিকে তাকালে। ইচ্ছে করে মনের মধ্যে থাকা সব বিরহ, আপনার কাছে মেলে ধরি। সমস্ত অভিযোগ, সমস্ত আকাঙ্ক্ষা, অভিমান আপনার কাছে তুলে ধরি। ঠিক এই কারণেই আমি আপনার কাছে এতটা আদুরে, এতটা স্নেহময়ী, এতটা নমনীয়। অথচ আপনি কিনা আমি আপনার সন্তানের মা হওয়ার যোগ্য না? আমি এতটাই অযোগ্য? এতটাই ইম'ম্যাচিউরড?"
শ্রাবণ পাথরের মত দাঁড়িয়ে আছে। হ্যাঁ, সে এবোরশানের কথা বলার চেষ্টা করেছিল। একবারের জন্য ভেবেছিল যে আল্লাহ চাইলে তো তাকে আবার বাবা বানাতে পারবে। তাই এবারে বাচ্চাটা না রাখলে কি এমন ক্ষতি হবে? কিন্তু ধারা যে একটা শক্ত মনের, মেয়েটা যে এতটা সংগ্রামী, তা ভুলে গিয়েছিল শ্রাবণ শেখ। সে ভুলে গিয়েছিল তার আদরের বউ হওয়ার আগে সে একজন এতিম, যে কিনা ছোট থেকে অসহনীয় অত্যাচার নির্যাতন সহ্য করে এসেছে। তার কাছে এই মা হওয়াটা মোটেই কষ্টের নয়, যন্ত্রণা নয়, বরং একরাশ না বলা আনন্দের। নিজের প্রতি ঘৃণা লাগলো শ্রাবণের। নিজের ভুলটা বুঝতে পারল। সে যে কত বড় একটা পাপ করার চিন্তা করছিল তা মাত্র টের পেলো। মনে মনে তওবা করল শ্রাবণ। শুকনো ঢোক গিলে এগিয়ে আসতে চাইলো ধারার দিকে, কিন্তু তার আগেই ধারা আবারও চেঁচিয়ে বলে উঠলো,
—" আপনার কোনো ধারনা আছে আপনার সন্তানের মা হওয়াটা আমার জন্য কতটা সুখের? আপনি বোঝেন এসব? বুঝতে পারবেন এসব? আমি নাকি সামলাতে পারব না। হ্যাঁ আমি পারবনা, আসলেই পারবনা যদি আপনি পাশে না থাকেন। আপনি আমায় মাঝরাস্তায় একা ছেড়ে দিলে তো আমি আসলেই পারব না। কিন্তু আপনি যদি সবসময়, এবং সবসময়ের মত আমার পাশে থেকে যান, তবে এই আমি পুরো পৃথিবী জয় করতে পারব ইনশাআল্লাহ।"
শ্রাবণের চোখও চিকচিক করতে থাকলো। ঠোঁটে এক আনন্দের হাসি দেখা গেলো। গর্ববোধের প্রশান্তি টের পেলো সে। মন চাইলো মেয়ে টাকে বুকে টেনে নিতে। কিন্তু বাঘিনী খেপে গেছে। ভয়ে পারলো না। ধারা এবারে খোলা চুল গুলো খোপা করে বলল,
—" আমি আপনাকে আর কিছু বলবো না! আমি চলে যাচ্ছি! থাকুন আপনি!"
ধারা নাক টেনে বারান্দা থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করতেই শ্রাবণ পেছন থেকে ওর হাত ধরে ফেললো। মুহুর্তের মধ্যে টেনে নিয়ে নিজের সাথে মিশিয়ে নিলো। কোঁমড় চেপে ধরলো আলতো করে। অথচ আর চাপতে না পেরে অজোরে কান্না করে দিলো ধারা। কান্নাভরা মুখ নিয়ে শ্রাবণের চোখে অভিমানী নয়নে তাকালো মেয়েটা। বিড়বিড় করে বলল,
—" ছাড়ুন নিষ্ঠুর লোক।"
শ্রাবণ হাসলো। ধারার খোপা করা চুলগুলো আবারো খুলে দিয়ে। গালে আর নাকে চুমু খেলো। বলল,
—" ছাড়ুন ছাড়ুন করতে করতেই এখন আমার বাচ্চার মা হয়ে যাচ্ছো। এই ডায়লগ আর দিও না। মানুষ শুনলে লজ্জা পাবে।"
ধারা ঠোঁট উল্টে তাকালো। নিজেকে ছাড়াতে হাত পা মোচড়ানো শুরু করেছে ইতোমধ্যে। কিন্তু শ্রাবণ ছাড়লো না। ধারার কপালে কপাল ঠেকিয়ে চোখ বুঁজে প্রশান্তির শ্বাস ফেলে বলল,
—" সরি। সরি বউ। আমি বুঝিনি। আমি বুঝতে পারিনি যে আমার ধারা কতটা সাহসী। সে যে কত চমৎকারভাবে জীবনকে বোঝে তা আমি ভুলে গিয়েছিলাম। আমায় ক্ষমা করুন বিবিজান। বড় বড় শহরে এমন ছোট ছোট ভুল হয়েই যায়। স্বামী মানুষ তো, ভুল তো হবেই। আপনি একটু শিখিয়ে পড়িয়ে নিন না। নতুন নতুন সংসার করছি তো। এখনো ঠিক করে শিখতে পারিনি। কিন্তু এভাবে রাগ করে চলে গেলে আমাদের বাবু তো কষ্ট পাবে।"
ধারা শান্ত হলো। মোচড়ামুচড়ি বন্ধ করেছে তখনি। চোখ পিটপিট করে আবারো তাকালো। চোখ লাল, ঠোঁট ফুলে আছে। শ্রাবণের বুকে আলতো করে কিল মেরে বলল,
—"আপনি একদম অসহ্য মানুষ।"
শ্রাবণ মুচকি হেসে ওর কপালে চুমু খেলো। বলল,
—"আর তুমি, পৃথিবীর সবচেয়ে চমৎকার নারী।"
ধারা আবারো কেঁদে উঠে বলল,
—" আপনি সত্যি খুশি তো?"
শ্রাবণ হেসে ও ধারা কে বুকে জড়িয়ে ধরলো। দুষ্টুমি করে বলল,
—" সত্যি খুশি কিনা তা বোঝাতে হলে রুমে যেতে হবে। চলো তবে, পার্সোনালি বিষয়টা নিয়ে জরুরি আলোচনায় বসি। বাকিটা নিজেই বুঝে যাবে।"
ধারা ফিক করে হেসে ফেললো। শ্রাবণ বিড়বিড় করে বলল,
—" আমার ধারা। আমার বউ। আমার বাবুর মা হতে যাওয়া ছোট্ট যোদ্ধা। ভালোবাসি। ভীষন ভালোবাসি।"
ধারা এইবার আর কথা বলতে পারলো না। শুধু নাক টেনে মাথা লুকিয়ে রাখলো শ্রাবণের বুকে। মনে মনে হয়তো বারংবার বলল,
—" বড্ড বেশি ভালোবাসি।"
চলবে...