প্রেয়সীর শোকে পাগলপ্রায় হয়ে যায় আরিয়ান। সে খাওয়া-দাওয়া একদম বন্ধ করে দেয়। তার কেবলই মনে হতে থাকে—কেন এমন করল পূর্ণিমা? কেন সে এত বড় বিশ্বাসঘাতকতা করল? সে তো পূর্ণীমাকে কম ভালোবাসেনি! বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠতে থাকে পূর্ণিমার মুখটা। আরিয়ানের এই ধ্বংসপ্রায় অবস্থা নীলিমা আর লুকিয়ে দেখতে পারল না। সে আর আড়ালে থাকতে পারল না; এবার সে নিজেই আরিয়ানকে সামলানোর দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিল। ছেলের এমন শোকে আরিয়ানের মা-ও প্রায় অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।
নীলিমা এক গ্লাস পানি নিয়ে সোজা গিয়ে বসল আরিয়ানের সামনে। তখনও আরিয়ানের চোখ দুটো জলে ভেজা। তার পাশে আকাশ বসে তাকে বোঝানোর চেষ্টা করছে যেন সে এমন পাগলামি না করে। নীলিমা পানির গ্লাসটা আরিয়ানের মুখের সামনে ধরে নরম গলায় বলল, "খেয়ে নাও, ভাইয়া।"
আরিয়ান মাথা নেড়ে নিষেধ করে দিল—সে খাবে না। কিন্তু নীলিমাও কম জেদি নয়! সেও নাছোড়বান্দা, আজ না খাইয়ে সে ছাড়বে না। নীলিমার এই জেদ ও পাগলামি দেখে শেষ পর্যন্ত আরিয়ান এক চুমুকে পানিটুকু খেয়ে নিল।
এরপর নীলিমা বলল, "যাও ভাইয়া, গিয়ে একটু গোসল করে আসো। আমি তোমার জন্য ভাত বাড়িয়ে রাখছি।"
আরিয়ান তখন বাধ্য ছেলের মতো ঘর থেকে চলে গেল। গোসল করে ফিরে আসার পর নীলিমা তার সামনে ভাতের থালা এনে দিল, কিন্তু আরিয়ান সেদিকে ফিরেও তাকাল না—সে খাবে না। প্রায় দুই দিন ধরে সে মুখে একটি দানাও তোলেনি।
নীলিমা শক্ত সুরে জিজ্ঞেস করল, "কেন খাবা না?"
আরিয়ান ক্লান্ত গলায় বলল, "ভালো লাগছে না তাই।"
নীলিমা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হয়ে বলল, "ভালো লাগবে, দাঁড়াও!"
এই বলে নীলিমা নিজে হাতে ভাত মেখে এক গ্রাস ভাতের থোড় বাড়িয়ে দিল আরিয়ানের মুখের সামনে। "এই নাও, খেয়ে নাও।"
আরিয়ান মাথা ঘুরিয়ে বলল, "খাবো না।"
নীলিমা নাছোড়বান্দা হয়ে বলল, "খাও।"
আবার আরিয়ান বলল, "খাবো না।"
"খাও!"
আর ঠিক তখনই আরিয়ান যখন "খাবো না" বলার জন্য মুখটা খুলল, সেই সুযোগটাই লুফে নিল নীলিমা! ঠিক সেই মুহূর্তে সে ভাতটুকু আরিয়ানের মুখের ভেতর গুঁজে দিল।
তাদের এই মিষ্টি কান্ড দেখে বাড়ির সবাই এই চরম দুঃখের মাঝেও একটু হাসল। নীলিমা তখন হাসিমুখে বলল, "ভাইয়া, শুনি তো—তোমার নাকি অনেক প্রেমের গল্প আছে! আমাকে একটু শোনো তো তোমাদের সেই প্রেমের কাহিনীর কথা। শুনেছি, দুঃখ শেয়ার করলে নাকি মন হালকা হয়।"
তারপর আরিয়ান বলতে শুরু করল তার ভালোবাসার সেই পুরনো গল্প। আর কথা বলতে বলতে নীলিমাও স্নেহের সাথে তাকে খাইয়ে দিতে লাগল।
একসময় খেয়াল করে নীলিমা হেসে বলল, "দেখছ ভাইয়া, এত কথা বলতে বলতে সব ভাতগুলো এখন কে খেয়ে নিল?"
আরিয়ান চোখ বড় বড় করে কৃত্রিম রাগ দেখিয়ে বলল, "তুমি ছলোনাময়ী! ছলোনাময়ী সেজে আমাকে খাইয়ে দিলে!"
নীলিমাও পিছু হটার পাত্রী নয়, সে জিভ কেটে বলে উঠল, "আমি ছলোনাময়ী না! তুমি একটা রাক্ষস! তাই তো সেদিন আমার সব গাজরগুলো খেয়ে ফেলেছিলে!"
কথাটা শেষ হতেই দুজনেই উচ্চস্বরে হেসে উঠল। কষ্টের মেঘ কেটে সেখানে যেন একটু হাসির আলো উঁকি দিল।
আরিয়ান এখন অনেকটাই সুস্থ। সবাই জানে, এটা কেবল নীলিমার কারণেই সম্ভব হয়েছে। নীলিমা যদি সময়মতো তার সেবা না করত এবং পাশে না থাকত, তবে হয়তো আজ আরিয়ানের কোনো অস্তিত্বই থাকত না!
আরিয়ানের সামনে নীলিমা যতই স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করুক না কেন, সে পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে পারে না। আরিয়ানও এখন কিছুটা হলেও নীলিমার মনের টান ও অব্যক্ত অনুভূতি বুঝতে পারে। কিন্তু তার তো আর কিছু করার নেই! সে যে মন থেকে কেবল একজনকেই ভালোবেসেছে এবং তিল তিল করে ভালোবেসে যাচ্ছে।
নীলিমাকে নিজের জীবনে ভালোবাসতে না পারার কারণে আরিয়ানের মনে এখন এক অদ্ভুত অপরাধবোধ কাজ করে। সে এখন আর সহজে নীলিমার চোখের দিকে তাকাতে সাহস পায় না। কারণ সে ভালো করেই জানে—নীলিমার চোখের দিকে তাকালেই সে পরিষ্কার দেখতে পাবে তার প্রতি নীলিমার সেই গভীর, নিঃস্বার্থ ভালোবাসা!
এদিকে আকাশ দূর থেকে এসব কিছু লক্ষ করত এবং সে ঠিকই বুঝতে পেরেছিল যে নীলিমা আরিয়ানকে কতটা ভালোবাসে। তবুও সে যেন নিজের মনে তা মেনে নিতে চাইত না। সে মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, পরের বার নীলিমা গ্রামে এলে সে সরাসরি সব খুলে বলবে।
কিন্তু এর মধ্যেই নীলিমা শহরে চলে এল। সে শহরে পৌঁছানোর পরদিনই বাড়ি থেকে একটা ফোন এল, আর সেই ফোন থেকেই সে জানতে পারল এক চাঞ্চল্যকর খবর—আরিয়ান বিয়ে করে ফেলেছে! আর কাউকে নয়, সেই পূর্ণীমাকেই বিয়ে করেছে সে।
ঘটনা আসলে অন্যরকম ছিল। দ্বিতীয়বার আরিয়ানের পরিবার যখন বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে গিয়েছিল, তখন মেয়ের বাবা পূর্ণীমাকে কসম দিয়ে বলেছিলেন—সে যদি আরিয়ানকে বিয়ে করে, তবে যেন জীবনেও আর বাবা-মায়ের মুখ না দেখে! বাবার সেই কসমের ভয়েই সেদিন পূর্ণিমা বাধ্য হয়ে বিয়ে করতে নিষেধ করে দিয়েছিল। কারণ পূর্ণিমাও আরিয়ানকে কম ভালোবাসত না।
নীলিমা যখন গ্রামে ছিল, তখনই আরিয়ান এই সত্যিটা জানতে পেরেছিল। এরপর আরিয়ান ও পূর্ণিমা সিদ্ধান্ত নেয় যে তারা পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করবে। আরিয়ান কোনোভাবেই নীলিমার চোখের দিকে তাকিয়ে পূর্ণীমাকে বিয়ে করতে পারত না। সে পূর্ণীমাকে ভালোবাসে ঠিকই, কিন্তু নীলিমার জন্যও তার মনে এই কদিনে এক অদ্ভুত মায়া জন্ম নিয়েছিল। তাই নীলিমা শহরে ফিরে আসার পরই তারা গোপনে বিয়েটা সেরে ফেলে।
খবরটা শোনার পর নীলিমা কিঞ্চিৎ দুঃখ পেল বটে, তবে তার চেয়ে অনেক বেশি খুশি হলো। কারণ, যার হাসিমুখ দেখতে সে এত দিন চেয়েছিল, সে তো আজ তার ভালোবাসাকে ফিরে পেয়েছে! আরিয়ানের সুখেই তো নীলিমার আসল শান্তি।
এদিকে আরিয়ানের এই বিয়েতে সবচেয়ে বেশি খুশি হয়েছিল আকাশ। কারণ তার অবুঝ মনে তখন অন্য হিসাব চলছে—সে ভাবছে, এবার হয়তো নীলিমার জীবনে আর কোনো বাধা রইল না, আর সে তার মনের কথা নীলিমাকে খুলে বলার সুযোগ পেয়ে যাবে!
এরই মধ্যে আরিয়ান একটা ভালো কোম্পানিতে চাকরিও পেয়ে গেছে। বিয়ের পর আরিয়ান তার স্ত্রীকে সাথে করে নিজের বাড়িতে নিয়ে আসেনি, বরং সে কদিন কনেপক্ষের বাড়িতেই ছিল। এদিকে মেয়েকে মেনে নেওয়া ছাড়া বাবা-মায়েরও আর কিছু করার ছিল না, তাই শেষ পর্যন্ত তারাও এই বিয়ে মেনে নিলেন। দুই পরিবারের পূর্ণ সম্মতিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো যে, খুব শীঘ্রই একটা বড় করে অনুষ্ঠান করে আনুষ্ঠানিকভাবে বউকে তুলে আনা হবে।
আরিয়ানের বিয়েতে নীলিমাও যাবে, সাথে যাবে লাবণ্য। লাবণ্য ভীষণ খুশি, কারণ এতদিন যাদের গল্প সে শুধু নীলিমার মুখেই শুনেছে, আজ সে তাদের চাক্ষুষ দেখতে পারবে। আর নীলিমা খুশি সেই সৌভাগ্যবতী মেয়েটিকে দেখার জন্য। সে মনে মনে ভাবছে, বর-কনে হিসেবে এই দুজনকে একসঙ্গে কত না সুন্দর লাগবে!
গ্রামে এসে পৌঁছানোর পর নীলিমা একে একে সবার সাথে লাবণ্যের পরিচয় করিয়ে দিল। তুলি লাবণ্যকে দেখামাত্রই চিনে ফেলল, কারণ নীলিমার মুখে সে তো লাবণ্যর কত কথাই না শুনেছে! এরপর নীলিমা, তুলি ও লাবণ্য মিলে বেরিয়ে পড়ল গ্রাম দেখতে।
গ্রামের মেঠো পথ ধরে হাঁটতে লাবণ্যর বেশ ভালোই লাগছিল। হাঁটতে হাঁটতে তারা এসে পৌঁছাল সবুজ ধানক্ষেতের মাঝখান দিয়ে চলা এক সরু রাস্তায়। ঠিক তখনই দূরে দাঁড়িয়ে থাকা আরিয়ানের ওপর তাদের চোখ পড়ল। আরিয়ান তখন কার সাথে যেন ফোনে কথা বলছিল। তিন বান্ধবী মিলে সোজা গিয়ে হাজির হলো তার সামনে।
নীলিমা কিছুটা ঠেস দিয়ে বলে উঠল, "কী গো ভাইয়া! কতক্ষণ হলো আমরা এসেছি, অথচ তোমার দেখা নেই! এখানে দাঁড়িয়ে কী করছো?"
আরিয়ান ইশারায় বুঝিয়ে দিল যে সে পূর্ণীমা—অর্থাৎ তার হবু বউয়ের সাথে কথা বলছে। তখন নীলিমা আরিয়ানের সাথে লাবণ্যের পরিচয় করিয়ে দিল। লাবণ্য আরিয়ানকে আগে থেকেই চিনলেও, আরিয়ান তাকে চিনত না। লাবণ্য হাসিমুখে আরিয়ানকে সালাম দিল। আর এই ফাঁকে সুযোগ বুঝে নীলিমা ছোঁ মেরে আরিয়ানের হাত থেকে মোবাইলটা কেড়ে নিয়ে বলল, "অনেক কথা বলেছ, এবার আমরা কথা বলব!"
বলেই তারা পূর্ণীমার সাথে কথা বলতে শুরু করল। ভিডিও কলে পূর্ণীমাকে দেখে লাবণ্য তো মুগ্ধ! মেয়েটা দেখতে ঠিক চাঁদের মতো উজ্জ্বল, গায়ের রং ফর্সা আর গঠনও চমৎকার। লাবণ্য এই প্রথম পূর্ণীমাকে সামনাসামনি দেখল।
কথার একপর্যায়ে নীলিমা দুষ্টুমি করে বলে উঠল, "ভাবি, তোমার জামাইকে একটু বলো না আমাদের পদ্মবিলে ঘুরতে নিয়ে যেতে? দেখছ, আমাদের সাথে নতুন মেহমান এসেছে, ওকে পদ্মবিল দেখাতে নিয়ে যেতে হবে।"
পূর্ণীমা সানন্দে অনুমতি দিয়ে দিল এবং ঠিক হলো—আজ বিকেলে তারা সবাই মিলে পদ্মবিলে ঘুরতে যাবে। মজার ব্যাপার হলো, বিকেলে যাওয়ার জন্য নীলিমা আগেই তিনজনের জন্য মিলিয়ে একদম এক রঙের—কালো রঙের শাড়ি এনে রেখেছে। কালো রঙটা যে তাদের তিনজনকে অপূর্ব মানায়!