ফরেনসিক ল্যাব থেকে বেরিয়ে আসতেই অয়নের মাথার ভেতর প্রশ্নগুলো যেন একেকটা ধারালো তীরের মতো বিঁধতে লাগল।
একজন নিখুঁত পেশাদার সার্জন…
শরীরের প্রতিটি শিরা-উপশিরার নিখুঁত জ্ঞান…
এবং সম্পূর্ণ রক্তশূন্য একটা লাশ…
সবগুলো খণ্ড খণ্ড প্রমাণ যেন আড়ালে থাকা কোনো এক মাস্টারমাইন্ডের দিকে ইঙ্গিত করছে।
বাইরে এসে অয়ন দেখল মাহির বেঞ্চে বসে গভীর মনোযোগ দিয়ে মোবাইল ঘাঁটছে। অয়ন কাছাকাছি আসতেই মাহির বেশ তড়িঘড়ি করে ফোনটা পকেটে চালান করে দিল।
অয়ন চোখ সরু করে জেরা করার ভঙ্গিতে বলল
"কী লুকাচ্ছ, মাহির? পুলিশ ফোর্সে থেকে সত্য লুকানোর চেষ্টা না করাই ভালো।
মাহির একটা শুকনো হাসি দিয়ে আমতা আমতা করে বলল—
"কিছু না স্যার… নিজের ব্যক্তিগত কিছু ঝামেলা আর কি।"
অয়ন আর কথা না বাড়িয়ে গম্ভীর গলায় আদেশ দিল—
"ব্যক্তিগত ঝামেলা পরে দেখবে। গাড়ি স্টার্ট দাও। আমাদের এখনই কুয়েত বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতালে যেতে হবে।"
মাহির কিছুটা চমকে উঠে বলল—
"হাসপাতালে? স্যার, আপনি কি নিশ্চিত যে খুনি ওই মেডিকেল লাইনেরই কেউ? স্পেসিফিক কোনো সন্দেহভাজন আছে আপনার তালিকায়?"
অয়ন গাড়ির দরজা খুলতে গিয়েও হাতটা থামিয়ে দিল। মাহিরের চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে পেশাদার পুলিশের মতো নিচু কিন্তু দৃঢ় স্বরে বলল
"যেভাবে ভ্যাকুয়াম ডিভাইস ব্যবহার করে রক্ত বের করা হয়েছে, তা কোনো আনাড়ির কাজ নয়। খুনি অ্যানাটমি আর সার্জারি খুব ভালো করেই জানে। সে আমাদের চোখের সামনেই ঘুরছে, মাহির। কোনো ক্লু মিস করা যাবে না।"
মাহির মুখে কিছু বলল না, তবে গাড়ি চালাতে চালাতে তার মনের ভেতর একটা নাম বারবার হাতুড়ি পেটাতে লাগল— আদ্রিয়ান শিকদার।
কারণ হাসপাতালে বাকি কোনো ডাক্তার এই সন্দেহের তালিকায় নেই
হাসপাতালের কেবিনে বসে আছে আদ্রিয়ান।
টেবিলে রোগীর ফাইল খোলা থাকলেও তার চোখ দুটো যেন শূন্যতায় তাকিয়ে আছে।
তার কানের কাছে বারবার প্রতিধ্বনিত হচ্ছে এভলিনের সেই কণ্ঠস্বর—
> "ভালোবাসি ডাক্তার সাহেব।"
আদ্রিয়ান নিজেও বুঝতে পারছে না তার কেনো অস্থির লাগছে
আদ্রিয়ান কিছুটা বিরক্ত এবং বিভ্রান্ত হয়ে নিজের চুলে হাত চালাল।
ঠিক তখনই কেবিনের দরজায় মৃদু নক করার শব্দ হলো।
আদ্রিয়ানের পারমিশন পেয়ে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল নীরা। তার হাতে এক ফুলের তোড়া, আর মুখে এক কৃত্রিম উজ্জ্বল হাসি।
ভেতরে ঢুকেই নীরা বেশ নাটকীয় ভঙ্গিতে বলে উঠল—
"ডাক্তার আদ্রিয়ান! আজকে আপনাকে কেন জানি আরও বেশি হ্যান্ডসাম লাগছে!"
আদ্রিয়ান কপালে হাত দিয়ে মনে মনে দীর্ঘশ্বাস ফেলল—
"একটা আপদ বিদায় হতে না হতেই আরেকটার আগমন!"
আদ্রিয়ান নিশ্চুপ রইলো কোনো উত্তর দিল না
মা ফারহানার ফোন এসেছিল তার কাছে তাই কিছুই অজানা নয় আদ্রিয়ান এর!
হাসপাতালের মেইন গেটের সামনে এসে কড়া ব্রেক কষল পুলিশের জিপ।
গাড়ি থেকে বেশ মাপা পায়ে নেমে এল অয়ন। তার চোখ জোড়া স্থির হয়ে রইল হাসপাতালের বিশাল বহুতল ভবনটার দিকে।
কুয়েত বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতালের করিডোর ধরে এগিয়ে যাওয়ার সময় অয়নের বুটের শব্দে এক ধরণের তাড়া ছিল। তার ঠিক এক কদম পেছনে ফাইল হাতে হাঁটছিল মাহির। অয়নের চোখ জোড়া চারপাশের ডাক্তার আর নার্সদের গতিবিধি তীক্ষ্ণভাবে পর্যবেক্ষণ করছিল।
তারা সোজাসুজি সার্জারি বিভাগের মেইন কাউন্টারের সামনে এসে দাঁড়াল। অয়ন কাউন্টারে কর্তব্যরত সিনিয়র নার্সকে নিজের আইডি কার্ড দেখিয়ে প্রশ্ন করল—
"আপনাদের হাসপাতালের নিউরোসার্জন ডাক্তার আদ্রিয়ান শিকদার কি এখন ওনার কেবিনে আছেন?"
নার্স অফিসার অয়নের গম্ভীর চেহারা আর পুলিশের উপস্থিতি দেখে কিছুটা ঘাবড়ে গেলেন। তিনি কম্পিউটারের স্ক্রিন থেকে চোখ তুলে বিনীতভাবে বললেন, "হ্যাঁ স্যার, ডাক্তার আদ্রিয়ান এখনো ওনার কেবিনেই আছেন। তবে আজ ওনার ডিউটি শেষ, একটু পরেই হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে যাবেন।
অয়ন কাউন্টারের ওপর একটু ঝুঁকে নিচু স্বরে আবার জিজ্ঞেস করল, "ডাক্তার আদ্রিয়ান মানুষ হিসেবে কেমন? মানে ওনার কাজের রেকর্ড বা সহকর্মীদের সাথে ওনার ব্যবহার কেমন, এ ব্যাপারে কিছু বলুন।
নার্স কিছুটা ইতস্তত করে বললেন, "স্যার, ডাক্তার আদ্রিয়ান অত্যন্ত ভালো ডাক্তার এবং ভালো মানুষ
অয়ন নার্সের কথাগুলো শুনল, কিন্তু তার মনের ভেতরের খটকাটা কাটল না। সে আড়চোখে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মাহিরের দিকে তাকাল। মাহির তখন বেশ চিন্তিত মুখে দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে আছে।
অয়ন এর বিরক্ত লাগলো মাহিরের বোকার মতো দেওয়াল এর দিকে তাকিয়ে থাকা দেখে
অয়ন মাহিরকে একটু আড়ালে ডেকে নিয়ে নিচু স্বরে বলল, "মাহির, আদ্রিয়ান একজন নিউরোসার্জন— ব্রেইনের ডাক্তার। ফরেনসিকে রায়হান যে একজন ব্রেইনের ডাক্তার কি এত নিখুঁতভাবে এই কাজটা করতে পারবে?
মাহির একটু ভেবে বলল, "স্যার, মেডিকেল সায়েন্সে একজন সার্জন চাইলে অন্য বিভাগের সার্জারি সম্পর্কে ধারণা রাখতেই পারেন। কিন্তু আদ্রিয়ানের মতো একজন ঠান্ডা মাথার ব্রিলিয়ান্ট ডাক্তার কেন এই নোংরা খুনের সাথে জড়াতে যাবেন? আমার মনে হয় এর পেছনে অন্য কোনো বড় রহস্য আছে।"
অয়ন আর কথা বাড়াল না। সে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, "ডাক্তার এখনো ভেতরে আছেন যখন, চলো ওনার কেবিনেই যাওয়া যাক। সামনাসামনি কথা বললেই বোঝা যাবে ওনার চোখের পেছনে কী লুকিয়ে আছে।"
৩০৪ নম্বর কেবিনের ভেতরে তখন এক অদ্ভুত নীরবতা। নীরা টেবিলের ওপর ফুলের তোড়াটা রেখে আদ্রিয়ানের কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়েছে। আদ্রিয়ানের এই পাথরের মতো নিশ্চুপ ভাব দেখে সে কিছুটা অস্বস্তিতে পড়ল।
নীরবতা ভেঙে নীরা আলতো স্বরে বলল
"কী ব্যাপার ডাক্তার আদ্রিয়ান? এত চুপচাপ কেন? শুভ ভাইয়া দুপুরে আপনার বাড়িতে গিয়েছিল, আন্টি আপনাকে কিছু বলেননি?
আদ্রিয়ান এবার নীরার দিকে চোখ তুলে তাকাল। তার দৃষ্টিতে কোনো কোমলতা ছিল না, বরং ছিল এক ধরণের শীতল দূরত্ব। আজ দুপুরে শুভ নীরাকে নিয়ে তাদের বাড়িতে যে কাণ্ডটা ঘটিয়েছে, তা সে ইতিমধ্যেই জেনে গেছে। জানিয়েছেন। মায়ের কাছ থেকে শুভর সেই প্রস্তাব আর আভিজাত্যের আস্ফালনের কথা শুনে নিজের রাগ আর বিরক্তিটা সে কোনোমতে চেপে রেখেছে।
ফারহানা জানিয়েছে শুভ কতটা দাম্ভিকতার সাথে বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে গেছে
আদ্রিয়ান অত্যন্ত ধীরস্থির কণ্ঠে বলল—
"মা আমাকে সব জানিয়েছেন, নীরা। মিস্টার শুভ আমার বাড়িতে গিয়ে যে আভিজাত্যের নাটক করে এসেছেন, সেটাও আমি জানি। আমি একজন নিউরোসার্জন, মানুষের মগজের জটিলতা দূর করা আমার কাজ। কার মাথায় কী রোগ বা নোংরামি চলছে, তা আমি খুব ভালো করেই বুঝতে পারি। তাই আমার পরিবারকে তোমাদের এই নোংরা খেলার বাইরে রাখলে খুশি হব।"
নীরার মুখের উজ্জ্বল হাসিটা মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল । সে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল,
কিন্তু পারল না চোখ দুটো থেকে অঝোরে বৃষ্টির মতো অশ্রু দ্বারা গড়িয়ে পড়ছে
বড্ড অভিমান হলো
নীরার ছুটে বেরিয়ে গেল
কেবিন থেকে কোনো হুঁশ নেই তার হঠাৎ কারো সাথে জোরে ধা
ক্কা লাগল নীরার কারো প্রশস্ত বুকে মাথাটা ঠেকে গেল নীরার