ফন্ট সাইজ:
থিম:
ঝরা_ফুল

১ম পর্ব

লেখক: কানিজ_ফাতেমা

”ডিভোর্স চাও তুমি? একটা সন্তানের মূল্য আমাদের ভালোবাসা, সংসারের চেয়ে বেশি ইমপোর্টেন মাহফুজ? এই আমার চেয়ে তোমার নিকট একটা বাচ্চা আগে?

কথাটা বলেই উত্তরের প্রতিক্ষায় থাকে অরিন। দীর্ঘ তিন বছরের সংসার। দুই বছরের প্রেম। একটা মানুষের সাথে পাঁচ বছর পথ চলার পর শুনতে হচ্ছে বাচ্চার জন্য ডিভোর্স চাই? নিয়তির কি নির্মম পরিহাস?

মাহফুজের চোখে মুখে কাঠিন্য ভাব ফুটে ওঠে।এই মাহফুজের হাত তো অরিন সেদিন ধরেনি। সন্তানের আগে অরিণের মূল্য আগে হওয়ার কি কথা না?

“ এসব কথার কোনো মানেই হয়না অরিন। তোমার জন্য তো আমি বাচ্চার বাবা হওয়ার ইচ্ছে ত্যাগ করতে পারিনা। চিকিৎসা তো করলে কোন সুরাহা কি হয়েছে? হয়নি। এমনিতেও তোমাকে নিয়ে থাকা যায়না। তোমাকে বিয়ে করে বোধহয় সেদিন সবচেয়ে বড় ভুল আমি করেছিলাম।

অরিন ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। মাটি কি ফাঁক হতে পারে না এই মুহূর্তে? অরিন বধির হয়ে যাচ্ছে না কেন? আল্লাহ কেন এই মানুষটাকে এত অচেনা করছে অরিনের নিকট? ভরসায় জায়গা এভাবে অচল করছে কেন? কেন হচ্ছে এগুলো?

“ ভুল করেছো আমাকে বিয়ে করে?

“ হ্যা সবচেয়ে বড় ভুল। শ্বশুর বাড়ি কেমন আজ পর্যন্ত তা অনুধাবন করতে পারিনি। নিজের প্রয়োজনে কখনো হেল্প পায়নি। আমার বন্ধু রা আজকে যে জায়গায় পৌঁছেছে বেশির ক্ষেত্রে শশুরবাড়ি থেকে সাহায্য নিয়ে। আর আমি তো ভালো মন্দ দিয়ে পেট ভারে একবেলা ক্ষেতেও পারিনি।

এমনিতেও তুমিও কখনো আমার জন্য কিছু করছে বলে মনে হয়নি। বিয়ের পর থেকে তোমার জন্য নানারকম ঝুট ঝঞ্ঝাটের মধ্যদিয়ে আমাকে দিন পার করতে হয়েছে।

অরিন হতবাক। অরিন কে নিয়ে কত অভিযোগ লোকটার কাছে। অরিন তো চাইলে প্রতি পদক্ষেপে অভিযোগের ঝুলি নিয়ে বসতে পারতো। অরিন তো তা করেনি? তবে কি ভালোবাসার ক্ষেত্রে ঘাটতি ছিল? থাকলেও সেটা কার দিকে থেকে।

আচমকা অরিন প্রশ্ন করে — “কি চাও?

“ ডিভোর্স চাই‌। শুনতে আর বুঝতে পেরেছো নিশ্চয়ই! এত প্রবলেম নিয়ে মানিয়ে নেওয়া গেলেও কোনো সন্তান দেওয়ার ক্ষেত্রে অক্ষম নারীকে নিয়ে নিশ্চয়ই মানিয়ে নেওয়ার প্রশ্নই আসে না? তাই না?

“একদমই তাই।তুমি যা চাও তাই হবে। এত বছরেও যখন কিছু করতে পারিনি তোমার জন্য আজ না হয় কিছু করার সুযোগটা একটু কাজে লাগাই? কি বলো।

কথাটা বলেই ক্ষিণ হাসে অরিন। সেই হাসিতে লুকিয়ে আছে কিছু কষ্ট কিছু গোপন করা নিজের প্রতি আফসোস। হায় কার জন্য নিজেকে এতটা দিনের পর দিন কষ্ট দিয়েছে?

ঘর থেকে যাওয়ার তাগিদে বের হয় মাহফুজ। এত দিনের সম্পর্ক থেকে মুক্তি পেয়ে যাবে নিশ্চয় খুব খুশি ছেলেটা। চোখের কার্নিশ বেয়ে গড়িয়ে পড়ার আগেই চোখ মুছে নেয় অরিন। শক্ত ধাঁচের মেয়েরা কি কাঁদে? কাঁদে না তো। তাহলে অরিন কেন কাঁদছে? তবে কি নিজেকে ঠিক করে তৈরি করতে পারেনি অরিন।

“ দাঁড়াও মাহফুজ।

থমকে দাঁড়ায় মাহফুজ। ঘর ঘুরিয়ে তাকায় অরিরেন দিকে। বেঁকে বসবে নাতো মেয়েটা? বেঁকে বসলে যে বিরাট সমস্যায় পড়তে হবে তাকে।

“কোথায় যাচ্ছ?

“ কাজ আছে। রাতে ফিরবো না।

“ এত স্বল্প তেই আগ্রহ হারিয়ে ফেললে? ভালোবাসার মানুষ বুঝি এমনই করে?

“ তুমি ডিভোর্স দিতে কি চাইছো না?

“ ভয় পাচ্ছো মনে হচ্ছে?

“ভয় পাবো কেন?

“ তুমি ভেবে বলছো তো?

“কি?

“ আমার থেকে মুক্তি পেতে চাও?

“ হ্যা চাই। পৃথিবীর প্রতিটা ছেলেই পিতৃত্বের স্বাদ পেতে চাই। সব পুরুষই চায় নিজের একটা ছেলে মেয়ে নিয়ে সুখের সংসার হোক।

“ আমাকে ডিভোর্স দেওয়ার পর কখনো মনে হবে না তো তুমি ভুল করেছো?

কয়েক মিনিট এর জন্য নীরব থাকে মাহফুজ। নিজের সিদ্ধান্তকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে কিছু সময় ভাবনার পড়ল। কখনো কি সত্যি মাহফুজ আফসোস করবে?

“ একটা সহজ স্বীকারোক্তি দিতে এত সময় নিচ্ছো কেন?

“ কখনো আফসোস করার প্রশ্নই আসবে না অরিন। প্রতম বার ভুল সিদ্ধান্ত নিলেও এবার সিদ্ধান্ত নিতে আমি ভুল করছি না সেটা আমি জানি।

“ আমার পরিবর্তে তোমার সমস্যা হলে আমি নির্দ্বিধায় তোমার সঙ্গে হাসিখুশি মনে আমার এই ছোট্ট জীবনটা পার করে দিতাম, মাহফুজ।

“ তুমি তা করবে কারণ তোমার আমি ছাড়া কোনো গতিই নেই।

“ আমার তুমি ছাড়া কেউ নেই জানার পরেও তুমি এভাবে মাঝপথে হাত ছাড়তে একবার ভাবছো না? কি আশ্চর্য। অথচ জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত আমাকে সঙ্গ দেওয়ার কথা ছিল তোমার?

কথাগুলো বলেই চোখ বন্ধ করে নেয় অরিন। মাথাটা বড্ড ভারি ঠেকছে নিজের নিকট। পা গুলো অসাড় হয়ে আসছে।

জোরে শ্বাস নিচ্ছে মেয়েটা। নিজেকে সামলে নেওয়ার ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা মাত্র।

“ আমার ডিভোর্স চাই বুঝতে পেরেছো তুমি?

চিৎকার দিয়ে উঠলো মাহফুজ। কি এক অচেনা মানুষ ঠেকছে সামনে দাঁড়ানো ব্যক্তি কে। অরিন কিঞ্চিত হাসলো। চোখ মেলে তাকায় , সব কিছু থেকে কি অরিনের এবার নিজেকে সরিয়ে নেওয়া উচিত নয়?

দরজা খুলে দেয় মাহফুজ। তবে দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে ঘরের মাহফুজের গায়ের পরে হাসনা বেগম , মারিনা।

আচমকা ঘটে যাওয়া ঘটনায় হতবাক মাহফুজ। মা বোনের এহেন কান্ডের জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলনা মাহফুজ।

“ গেলো গেলো কোমরটা বোধহয় একেবারেই ভেঙ্গে গেলো রে মারু। ধর আমাকে ধরে তোল।

মারির হাত পা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়ায়। মাজায় লেগেছে বেশ। আড়চোখে মাহফুজ কে দেখেই ভেলকার মতো তাকায়।

“ তোরা দুজনে এখানে কি করছিলি?

“ কথা পরে বলবি আমাকে আগে তোল।

মাহফুজ মাকে ধরে তোলে। মায়ের এরুপ কাজে বিরক্তি প্রকাশ পাচ্ছে তা বুঝতে বাকি রইল না হাসনা বেগমের। তবে খুব একটা ভাবলেনা। দরজার বাইরে থেকে যতটুকু শুনেছে তাতে কয়েক দিন পর্যন্ত না খেয়েও থাকতে পারবেন। বয়স বেশি না হলে এতক্ষণ বাংলা গান ছেড়ে হয়তো নেচেও নিতেন।

দীর্ঘ তিন বছর পর নিজের ইচ্ছা পূরণ হবে। এত খুশি তিনি শেষ কবে হয়েছিলেন তা মনে করতে বেশ বেগ পোহাতে হবে।

ইয়ে মানে রাত হয়েছে তাই খেতে ডাকতে….

মাহফুজ কথা বলার ফুরসৎ দিলো না। হাতে থাকা ঘরিটায় সময় দেখে নেয়। দশটা পঞ্চাশ। এগারোটায় যাওয়ার কথা। তাই বলে — — “ খাবার আজকে বাইরে খাবো। গেস্ট রুম টা পরিষ্কার করে দাও। আজ থেকে অরিন সেখানেই ঘুমোবে।

বেরিয়ে যায় মাহফুজ।

অরিন অবাক হয়। আশ্চর্যের শেষ পর্যায়ে পৌছায়। তবে কি মানুষ চেনার অঙ্কে অরিণ এখনো কাঁচা?

এদিকে খুশিতে গদগদ হয়ে যায় হাসনা বেগম,। আজকে কার মুখ থেকে ঘুম থেকে উঠেছে তিনি? কাজ করতে বড্ড আলসেমি লাগে তার। আজকে ইচ্ছে করছে পুরো গেস্ট রুম নিজের হাতে সজ্জিত করেন। অরির যে এই বাড়ির কেউ না তা আজকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিবেন তিনি।

—-

ভোর পাঁচটা হলেই অরিনের ঘুম ভেঙে যায়। নিত্যদিনের অভ্যাস অরিনের, সারারাত জেগে থাকলেও পাঁচটা বাজলে দু চোখের পাতা কখনো এক করেনি অরিন। বেলা গড়িয়ে ঘড়ির কাঁটা দশটার ঘরে আজকে। দেখা নেই অরিনের। সকলা থেকে মুড়ি খেয়ে আছে মা মেয়েতে।

এত দিনের হেভিট সহজে কি পরিবর্তন কর যায়‌ অরিনের আসায় রান্না ঘরের চৌকাঠ মাড়ায় নি কেউ।

এবার চিন্তিত দেখা গেলো দুজন কে।

দরজায় অনবরত ধাক্কা দিতে থাকে দুজন।

“ এই যে নবাবজাদি,বেলা গড়িয়ে দুপুর হতে চললো বলি রান্না কি তোর বাবা এসে করবে? এবাড়িতে যতদিন আছো গতর খাটিয়ে কাজ করে থাকতে হবে।

“দরজা খোলো বলছি। মা মেয়েতে মিলে দরজা ভেঙে ফেলার উপক্রম। প্রায় দশ মিনিট ধাক্কা দেওয়ার পর দুজনেই বের ভয়ে জুবুথুব হয়ে যায়।

মারিন মিনমিনে গলায় বলে — — “ কি হয়েছে বলোতো? এই কুচুটিনি আবার উল্টোপাল্টা কিছু করেনি তো?

ভয় হাঁটু কাপে হাসনা বেগমের! পুলিশি ঝামেলায় জড়াতে বড্ড ভয়, ছোট থেকেই চুনোপুঁটির কলিজা‌। ককি হবে?

সারারাত বাড়ি আসেনি মাহফুজ। কিছুক্ষণ আগেই বাড়িতে পা রাখলো। অফিসে যাওয়ার তাড়া নেই না যাওয়ার কারণ আছে। অরিনক কে নিয়ে উকিলের কাছে যাবে। সব ব্যবস্থা করাই আছে। শুধু….

হৈচৈ শোনে মাহফুজ। উপরের দিকে শব্দটা হচ্ছে।আবার কি হলো? ঝামেলা করার মেয়ে অবশ্য অরিণ না? ভেবেই উপরে চলে যায় মাহফুজ।

মা বোনকে দেখে চক্ষু কপালে, দুজনে কেমন ঘেমে একাকার। তা পর দরজায় অনবরত ধাক্কা দিয়ে যাচ্ছে।

“ কি হয়েছে এখানে এভাবে হৈচৈ করছো কেন?

হাসনা বেগম সব কিছু খুলে বলে। মাহফুজ ও আঁতকে উঠে, সব প্ল্যানে জল দিয়ে দিবে অরিন । ঝোঁকের বশে যদি কিছু করে? অরিনকে যতদূর জানে আ/ত্ম/হ/ত্যা করবে এমন তো অরিন-না?

সাত পাঁচ ভাবা আপাতত বন্ধ করে মাহফুজ। মাকে উদ্দেশ করে বলে — — “ চাবি নিয়ে আসো!

চাবি আনতে যাবে তার আগেই মাথায় হাত হাসনা বেগমের — — “ এই ঘরের চাবিটা তো হারিয়ে গেছে খোকা?

মেজাজ তুঙ্গে মাহফুজের, চাবি নেই এত সহজে বলে দিলো?

শেষমেষ দরজা ভাঙার সিদ্ধান্ত নেই মাহফুজ।

“সরে দাঁড়াও দুজন!

মা মেয়েতে বুঝতে পেরে সরে দুজন।

বেশ পুরনো দরজা হওয়াতে বেগ পোহাতে হয়নি। পরপর কয়েকবার শক্তি দিয়ে ধাক্কা দেওয়াতে দরজা খুলে যায়।

তিন জন ভয়ে ভয়ে পা রাখে ঘরে। মনে মনে মাহফুজ শান্তনা দেয় এমন কিছু না হোক, পুলিশি ঝামেলায় জড়াতে আপাতত একদম অনিচ্ছুক, যতদূর জানে হাসপাতালে নিয়ে গেলে বেত যাবার পর ডিভোর্স পেতে বেশ কসরত করতে হবে ।

হুরমুরিয়ে ঢুকেই আচমকা তিন জন স্তম্ভিত। এটা কি করেছে অরিণ?

#চলবে~

#ঝরা_ফুল

#কানিজ_ফাতেমা_Kaniz_Fatema

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১ম পর্ব শেষ করেছেন।

উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন