তিতলি পা টিপেটিপে দরজার সম্মুখে দাঁড়িয়ে বড্ড সতর্কতায় রুমের ভেতরে উঁকি দিলো। বাপের বাড়ি যাওয়ার জন্য শাশুড়ির হাতে শাড়ি পরে সেজেগুজে এসেছে। এর মাঝে আরো কয়েকবার রুমে আসলেও তখন ফারাজ বাড়িতে ছিলো না। দুপুরে কোথায়ও বেরিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু কিছুক্ষণ আগে সে ড্রয়িংরুমে ফারাজের কন্ঠ শুনেছে। তাহলে এখন রুমে দেখছে না কেন? ফারাজকে রুমে না দেখে তিতলি আনন্দ সমেত নাচতে নাচতে ভেতরে ঢুকলো।
ব্যাগে নিজের পার্সোনাল জিনিসপত্র গুছিয়ে ঠোঁট উল্টে আনমনে বিড়বিড় করে বলল,
"নিজের তোয়ালে খুলে পরে গেছে, মনে হচ্ছে সব আমার দোষ আমার! কেমন করে তাকায়, যেন আমি ওনার তোয়ালে টেনে খুলে দিয়েছি! হুহ!ভাল্লুক কোথাকার!"
বলে পেছনে ফিরতেই চমকে উঠল তিতলি। একদম সম্মুখে দাঁড়িয়ে ফারাজ। তিতলি যত্রতত্র নুইয়ে গেল। ভয়ে প্রাণ শুকিয়ে যাওয়ার যোগাড় বেচারির। চোরা চোখে একবার তাকাতে গিয়ে নাগাল পেলো ফারাজের শক্ত চিবুকের। তিতলি দুরুদুরু চিত্তে পাশ কাটিয়ে যেতে চাইল। গুনে গুনে মাত্র একখানা কদম বাড়াল সপ্তদশী, আর ওমনি পেছন থেকে তার নরম তুলতুলে হাতের কব্জিতে টান পড়ল ভীষণ। তিতলি থমকায়। ভয়ে ভয়ে শুকনো ঢোক গিলল অলক্ষ্যে। মনে মনে আল্লাহ, আল্লাহ করে নিজের হাত টানাটানি করা শুরু করল।
ফারাজ হাতের বাঁধন আরো দৃঢ় করল। রাগ তরতর করে বাড়ল। এক ঝটকায় বউকে নিজের সামনে এনে দাঁড় করালো তক্ষুনি। তিতলি চোখ খিঁচে বন্ধ করে নিয়েছে ততক্ষণে। ফারাজ বা হাতে তিতলির কোমর পেঁচিয়ে এনে নিজের সাথে চেপে ধরে। ডান হাতে তিতলির নরম চোয়ালখানা উঁচু করে কিছুক্ষণ অমত্ত চেয়ে রইল সে। পরপরই শক্ত কন্ঠে প্রশ্ন ছুড়লো,
"সমস্যা কী তোমার? বারবার আমার কথার অবাধ্য হচ্ছো কোন সাহসে? ভয় লাগে না আমায়?"
তিতলির বুক কেঁপে উঠল থরথর করে। ওই সময় তো খোঁচা মারা কথা শুনিয়ে পালিয়েছে। সে কি ইচ্ছে করে শুনিয়েছে? যা হওয়ার হোক! এমনিতে তো এখন ভাল্লুকের সাথেই তাকে বাপের বাড়ি যেতে হবে। কামড় দিয়ে দৌড় দিলে যদি পরে যেতে না দেয়। তাই কাঁপা কাঁপা গলায় শুধায়,
"আমার লজ্জা, লজ্জা লাগছে, আপনার সামনে দাঁড়াতে তাই! আপনার বুঝি লজ্জা করে না?"
ফারাজের কপাল কুঁচকে গেল এমন কথা শুনে। জিভের ডগায় গাল ঠেলে, দৃষ্টি করল তীক্ষ্ণ। পরক্ষণেই তিতলির কোমর ছেড়ে দিয়ে এবার চেপে ধরলো কোমল দুবাহু। অসামন্য পায়ের গতিতে তক্ষুনি পাশের দেওয়ালের সাথে চেপে ধরল।
বড্ড শক্ত করে ধরেছে। তিতলি ব্যাথা পেল। তাও চুপ করে রইল। ফারাজ সামান্য ঝুঁকে এসে বাঁকা কন্ঠে বলল,
"আমার জানামতে লজ্জা বলতে এমন কোনো ওয়ার্ড এখনো আমার ডিকশনারিতে আসে নি। কজ তুমি আমার বিয়ে করা বউ! আমার সামনে তুমি ছিলে, অন্য কেউতো ছিলো বলে আমার মনে হচ্ছে না?"
তিতলির বুক ধুকপুক করছে। এবারও আগের মতো নিষ্পাপ জবাব দিলো,
"আপনার কোনো লজ্জা নাই থাকতে পারে। আমার...আমার অনেক লজ্জা লাগে।"
তিতলির কথা শেষ হওয়ার পরপরই ফারাজ কপট রাগ দেখিয়ে হিসহিসিয়ে শুধালো,
"এত লজ্জা কই থেকে আসে তোমার? যে আমার সামনেই দাঁড়ানো যাবে না? ফারদার রুমে আসার আগে তোমার সব লজ্জা বাইরে রেখে আসবে। নয়তো তোমার কোনো লজ্জার ধার ধারবো না আমি।"
তিতলি নিশ্চুপ। ফারাজ বলল,
"কলেজে যখন আমার পেছনে পেছনে ঘুরছিলে তখন লজ্জা করে নি?"
তিতলি দাঁত দিয়ে নিচের ঠোঁট ঈষৎ কামড়ে ধরল এবার। জেদ ধরে রেখে নিচু কণ্ঠে স্বীকারোক্তি দিলো,
"না করেনি। আপনাকে আমি ভালোবাসি তাই ঘুরেছি। সবসময় আমি আপনার পেছনে ঘুরবো।
তাতে আপনার কী? হুহ!"
বলে তিতলি ফারাজের হাত দুটো সরাতে চাইল নিজের বাহু থেকে। ফারাজের সুদর্শন মুখের ধারালো নেত্রদ্বয় কেমন গভীরভাবে তাকিয়ে আছে তার দিকে। এভাবে তাকাচ্ছে কেন? সে শুকনো ঢোক গিলল। ভয় পেয়ে চোখ মুখ খিঁচে বলল,
"আমাদের দেরি হয়ে যাচ্ছে তো!"
ফারাজ সে-কথা আদৌ শুনলো কিনা কে জানে। তিতলির মুখে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে মাথাটা সামান্য নিচু করে নিজের মুখ এগিয়ে আনলো মুখের একদম কাছে। ফারাজের নেওয়া প্রতিটা উষ্ণ নিশ্বাস যতবার তিতলির মুখে পড়ছে ততবার সে চোখজোড়া খিঁচে বন্ধ করে নিচ্ছে। সে হাঁসফাঁস করে দুহাতে ফারাজের বুক চেপে সরাতে চাইল। কিন্তু বালাইষাট। পাহারসম বলিষ্ঠ পুরুষ তো সরলোই না উল্টো তিতলির নরম গালে নিজের খোঁচা খোঁচা দাড়িতে আবৃত চোয়ালখানা আলতো করে ছুঁয়াল। তিতলি হালকা ব্যাথা পায় দাঁড়ির খোঁচাতে। কেঁপে উঠে সমস্ত কাঁপা দেহ। ফারাজ নিজের নাক,গাল ঘষছে তিতলির পুরো মুখে। তা ধীরে ধীরে নেমে এলো গলায়। পরপর গলায় নরম কিছুর স্পর্শে তিতলি থরথর করে কেঁপে উঠে। ফারাজের পুরুষালী নরম ঠোঁটের বিচরণে তিতলি নিশ্বাস আটকে নিলো।
হাঁসফাঁস করে কোনোরকমে বলল,
"ছাড়ুন প্লিজ!"
ফারাজ তখন নিজের কাজে ব্যস্ত। ডিস্টার্ব পেয়ে গলায় মুখ গুঁজে রেখে বলল,
"উমমমম! সবসময় ছাড়ুন ছাড়ুন বললে ধরবো কখন বেয়াদব? নির্লজ্জ বলতে পেরেছো, এখন সহ্য করো আমায়। লেট মি ডু মা'ই ওয়ার্ক!"
বলে ফারাজ আচমকা তিতলির ঘাড়ের বড্ড কাছে মুখ নিয়ে কামড় বসিয়ে দিলো। কামড়টা জোরে ছিল না তবে তিতলি ব্যাথা পেলো। নাকমুখ কুঁচকে মুখ ফস্কে বেরিয়ে এলো,
"আহহ!"
বেয়াদব বউকে এমন আওয়াজ করতে দেখে ফারাজ ঘাড় থেকে মুখ তুলে দুষ্ট কন্ঠে ফিসফিস বলল,
"নেগেটিভ আওয়াজ করছো কেন? আমিতো এখনো কিছুই করিনি।"
তিতলি সরু নাকের পাটাটা সামান্য ফুলিয়ে বলল,
"আপনি..আপনি আমাকে কামড় দিয়েছেন কেন?"
"এটা তোমার শাস্তি। আমার কথা না শোনার, বারবার অবাধ্য হওয়ার।"
তিতলি চুপ করে রইল। ফারাজ ভ্রু কুঁচকে বলল,
"ব্যাথা পেয়েছো?"
তিতলি ত্যাড়া জবাব দিলো,
"না আরাম পেয়েছি!"
ফারাজ তিতলির ত্যাড়া কথায় বিরক্ত হয়ে তৎক্ষণাৎ হাতের জোর বাড়াল। এবার ঠোঁটের কাছে মুখ এগিয়ে আনতেই হঠাৎ দরজার কাছ থেকে পায়ের আওয়াজ আসে। ফারাজ সাথে সাথেই তিতলিকে ছেড়ে দেয়। ছকিনা খাতুন বুড়ো মানুষ চোখে কম দেখলেও কিছু আন্দাজ করেছেন। তিতলি ছাড়া পেয়ে লজ্জায় মাথা নিচু করে তক্ষুনি দৌড় দিলো। ছকিনা খাতুন পান চিবুতে চিবুতে নাতবউয়ের যাওয়া দেখে নাতিকে রসিকতা করে বললেন,
"নাতবউ'ডা কি সরম পাইলো। আমার এহন আইয়া পরা ঠিক অয় নাই। দরজা কান লাগাইয়া রাইখবি না। তুই এহনো দাঁড়াইয়া আছিস ক্যান? শ্বশুর বাড়িত কি রাইতে যাইবি নে?"
ফারাজ কপাল কুঁচকে তাকায় নানির দিকে। অসময়ে রসিকতা মোটেও পছন্দ হলো না। তার সবেমাত্র জাগ্রত হওয়া ফিলিংটা দিয়ে বউকে কাবু করতে চেয়েছিল। অনেকটা সফলও হয়েছিল কিন্তু হঠাৎ করে নানির এন্ট্রিটা তার উঠতি রাগের কারণ হলো। দরজাটা লাগিয়ে রাখলে আজ আরেকটু সময় নিয়ে এই বউকে নির্লজ্জতা কাকে বলে বুঝাতো না সে। এখন তো সবে শুরু এ বউকে সে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে শেষ করে দিবে না? প্রতিদিন একটা একটা করে বুঝাবে না তার নির্লজ্জাতা। নানির কথা শুনে তৎক্ষণাৎ রুম থেকে ধুপধাপ পা ফেলে বেরিয়ে আসলো।
.
.
ঘড়িতে সন্ধ্যা ছয়টা।
শেখ বাড়ির একমাত্র আদরের মেয়ে সহ বাড়ির জামাই আসবে সে আনন্দে বাড়িতে অনেক তোড়জোড় চলছে। আলেয়া শেখ মেয়ের পছন্দের সব খাবার রান্না করেছেন। সাথে জামাই আদরের সব আইটেম তো আছেই। ড্রয়িংরুমে রমরমা আড্ডার শেষ নেই। তিতলি আসবে শুনে তিতলির খালা ইশা বেগম এসেছে আজ। বিয়ের সময় আসতে পারেনি। কারণ তিনি বিদেশ ছিলেন স্বামীর সাথে।
ড্রয়িংরুমে বসে আছেন ফরিদা বানু। আলেয়া শেখ আর তিতলির খালা ইশা বেগম কিচেনে নাস্তা পানি তৈরি করছেন। ফরিদা বানু ছেলেকে যেতে দেখে বললেন,
"নাতিন এহনো আইতাছে না ক্যান? ফোন কইরা দেখ তো! আইজকা যদি নাতজামাই নাতিনেরে নিয়া নো আইয়ে সোজা আমি গিয়া নাতিনেরে লইয়া আমু।"
তৌসিফ শেখ বাইরে যাচ্ছিলেন। মায়ের কথা শুনে বললেন,
"আসতেছে আম্মা। আমি ফোন করে কথা বলেছি জামাইর সাথে। মনে হয় চলেও এসেছে আমি বাইরে গিয়ে দেখতেছি।"
বলে তৌসিফ শেখ সদর দরজা পেরিয়ে বাইরে গেলেন।
শেখ বাড়ির মেইন গেইটে গাড়ি থামতেই তিতলি সাথেসাথেই নেমে গেল। খুশিতে তার তর সইছে না। বাবাকে গাড়ির ভেতর থেকে দেখেই চোখ-মুখ উজ্জল হয়ে গেলো তার। ফারাজকে রেখেই দৌড়ে বাবার কাছে গিয়ে আগে আগে খুশিতে বলল,
"কেমন আছো আব্বু?"
তৌসিফ শেখ পরম আদরে মেয়ের মাথায় হাত রাখলেন। মেয়েকে কতটা ভালোবাসেন তিনি। মেয়ের কথা শুনে বুকটা ভরে গেল। মনে হলো অনেকদিন পর মেয়ের মাথায় এভাবে হাত রেখেছেন। আজকাল বাড়িতে আর ওনার ভালো লাগে না। মেয়েকে চোখের সামনে দেখেন মনে হয় এইতো এখন খেতে আসবে। আব্বু আব্বু বলে এটা সেটা আবদার করবে। কিন্তু না কেউ কিছু বলে না। মন খারাপ করে তখন রুমে চলে গিয়ে মেয়েকে ফোন করেন। ফোনে কথা বললেও মন ভরে না। স্নেহমাখা হাতদুটো মেয়ের মাথায় বুলিয়ে দিয়ে আদুরে গলায় বললেন,
"আলহামদুলিল্লাহ ভালো! আছি তুমি কেমন আছো আম্মু?"
বাবার স্পর্শ পেয়ে তিতলির চোখ ভিজে উঠেছে। মুখ ফুলিয়ে বলল,
"ভালো আব্বু!" তোমাকে অনেক মনে পড়েছে আব্কু! আমি অনেকদিন থাকবো। যাবো না।
আমারও তোমাকে অনেক মনে পড়েছে আম্মু। তোমার যতদিন মন চাই ততদিন থাকবা ঠিক আছে।
তিতলি দুপাশে মাথা দুলিয়ে আড়চোখে ফারাজের দিকে তাকিয়ে মুখ বাঁকাল। নিজের বাড়ি এসে এখন আর ফারাজকে পাত্তা দিচ্ছে না। দৌড়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেল।
ফারাজ খান এগিয়ে শ্বশুরের সাথে কৌশল বিনিময় করল। শ্বশুর বাড়িতে আসতে যতকিছু লাগে সব নিয়ে এসেছে ফলমূল মিষ্টি যা যা লাগে সব।
.
.
তিতলি ড্রয়িংরুমে গিয়ে সবার সাথে কথা বলল। আলেয়া শেখ মেয়েকে জড়িয়ে কেঁদে দিলেন প্রায়।
ফরিদা বানু নাতিনকে বললেন,
"কীরে নাতজামাই কই? তুই একলা কা?"
তিতলি দাদুর কথা শুনে বলল,
"বাইরে দাদু।"
"এক লগে আইবি না? নাতজামাই লজ্জা পাইতো নো এহন?"
তিতলির মনে পরল ফারাজ তাকে বলেছে আমার কোনো লজ্জা নেই। তাই দাদুকে বলল,
"ওনি বলেছেন ওনার কোনো লজ্জা নেই দাদু।"
বলে উপরে চলে গেল। বিয়ে হয়ে গেছে এমনো কোনো ভাব ওর মধ্যে নেই।
আলেয়া শেখ মেয়ের যাওয়া দেখে বললেন,
"মেয়েটা এখনো বড় হইলো না। চালচলন সব আগের মতোই। কে জানি শ্বশুর বাড়িতে কি কি অঘটন করেছে।"
.
.#পর্ব_৩১ এর প্রথম অংশ
ফারাজ শ্বশুরের সাথে ড্রয়িংরুমে এসে সবার সাথে নতুন জামাইর মতো কথা বলে এখন সোফায় বসেছেন। ডাইনিং টেবিলে হড়েক রকমের নাস্তা- পানি মিষ্টি, ফলমূল দিয়ে ভরা।
ফরিদা বানু নামজামাইকে বললেন,
"নাতজামাই আইয়ো আমরা একলগে গপ্পো করি।"
ফারাজ মোবাইলের স্ক্রিন থেকে চোখ তুলে পাশ ফিরে তাকালো। বৃদ্ধমহিলাটা তার সাথে গল্পও করবে? যেমন নাতিন তেমন দাদি। সেটা সে বিয়ের দিন থেকেই টের পেয়েছে। কিছু না বললে খারাপ দেখায়। তাই সে সম্মতি জানাতেই ফরিদা বানু আস্তে করে করে বললেন,
"মোর নাতিন কেমন নাতজামাই?"
ফারাজের শৈলপ্রান্ত বেঁকে গেল এমন কথায়। গম্ভীর স্বরে বলল,
"আলহামদুলিল্লাহ আপনার নাতিন লাখে একটা।"
ফরিদা বানু খুশি হলেন। মনে করিয়ে দিয়ে ফের বললেন,
"আগে কইছিলাম না আমার নাতিন লাখে একটা দেইখলা কীভাবে মিল্লা গেল? তোমার দাদাশ্বশুর ও দেইখতে তোমার লাহন ছিলো। মাস্টারি কইরতো।"
তাদের কথার মাঝেই তুষার আসলো তখন। অয়নকে সাথে করে এনেছে। রাতে এখানে থাকবে অয়ন। ফারাজ ভাইকে দেখেই তুষার ও অয়ন দুজনেই সালাম দিলো,
"আসসালামু আলাইকুম! কেমন আছেন ফারাজ ভাই?"
"আলহামদুলিল্লাহ ভালো তুমি কেমন আছো?"
তুষার ভদ্রতায় গম্ভীর সুরে বলল,
" এইতো ভালো!"
অয়ন পাশ ফিসফিস করে বলল,
"আরে শালা এখনো ফারাজ ভাই ভাই করে ডাকছিস? তোর ছোট বোনের জামাই! নাম ধরে ডাক!"
তুষার অয়নকে উত্তরে বললো,
"একটা বললেই তো হয়ছে! ফারাজ ভাই বয়সে আমার বড় হয়, শালা! বয়স বা ছোট বোনের জামাই সেটা মেটার করে না সম্মান সবচেয়ে বেশি মেটার করে। ছোট বড় বলে কথা নেই।
অয়ন তুষারের দিকে তাকিয়ে বলল,
"বুঝলাম।"
তুষার ফারাজ ভাইকে বলল,
"আপনি বসেন ফারাজ ভাই! আমি উপর থেকে চেঞ্জ হয়ে আসি।"
তুষার চলে যেতেই তৌসিফ শেখ মেয়ের জামাইর পাশে বসে বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলতে শুর করলেন।
.
.
তিতলি শাড়ি চেঞ্জ করে এমব্রয়ডারি গোল জামা পরে গলায় ওড়না জড়িয়েছে। ওসব শাড়ি পরে থাকা যায় না। সে তো পরতেই পারে না। কেউ পরিয়ে দিলেও একঘন্টা পর কিভাবে যেন সব কুচি খুলে যায়।
রুম থেকে বেরিয়ে ভাইয়ের রুম দিয়ে যেতে দরজা খোলা দেখে ভেতরে উঁকি দিয়ে দেখলো রুমে অয়ন বসে আছে।
অয়ন তিতলিকে লক্ষ্য করে চোখ নামিয়ে নেয়। না দেখার মতো পা দুলাতে থাকে।
তিতলি ভেতরে ঢুকে অয়নকে দ বলল,
"অয়ন ভাইয়া তুমি কখন এসেছো?"
অয়ন আড়চোখে তিতলির দিকে তাকায়।
মুচকি হেসে বলল,
"এখন আসলাম। তো কেমন আছেন ভাবি?"
তিতলি লজ্জায় মুখ লাল করে নিলো ভাকি ডাক শুনে। নিজেকে ফারাজের বউ বউ লাগে। এমনিতে তো বউ। তবে ভাবি ডাক শুনলে কেমন যেন লাগে তার। পরক্ষণেই বলল,
"ভালো আছি ভাইয়া। তুষার ভাইয়া কই?"
"ওয়াশরুমে গোসল করছে। আসার পথে প্রেমিকার সাথে কথা বলতে বলতে ময়লার ডাস্টবিনে পরে গেছে।"
তিতলি অয়নের কথা শুনে চেঁচিয়ে বলল,
"কিহহহ! কার সাথে প্রেম করছে?"
"প্রেম করছে না শুধু! বিয়ে করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে।"
তিতলির জানামতে তার ভাইয়ের কারো সাথে কখনো প্রেমের সম্পর্ক ছিলো না। এখন এসব শুনে অবিশ্বাস নিয়ে বলল,
"সত্যি? কার সাথে একটু বলেন না অয়ন ভাইয়া?"
পেছন থেকে তুষার বেরিয়ে এলো। ওয়াশরুম থেকে প্যান্ট গেঞ্জি পরে বের হয়ছে। দতোয়ালে দিয়ে মাথার ভেজা চুল মুছতে মুছতে পেছন থেকে তিতলির মাথায় টোকা দিয়ে বলল,
"তুই জেনে কি করবি?"
তিতলি পেছনে ফিরে ভাইকে বলল,
"বাহ রে আমার ভাইয়া কার প্রেমে পড়ে ডাস্টবিনে পরেছে সেটা আমি জানতে চাইবো না? দেখি সে মেয়ের বাড়ি চলো দুইটা কথা শুনিয়ে আসি।"
অয়ন চোখ বড় বড় করে ফেলল। তবে তুষারের মুখে বিন্দুমাত্র পরিবর্তন দেখা গেলে না। সে আগের মতোই বলল,
"বেশি বুড়ি হয়ে গেছিস তিতলি।"
তিতলি নাক ফুলিয়ে বলল,
"আমাকে বুড়ি না? তুমি ১০০ বছরের বুড়া ভাইয়া।
আমি এখন নিচে গিয়ে আব্বুকে নালিশ দিবো তুমি প্রেম করো। বলে তিতলি বেরিয়ে এলো।
.
.
এর ভেতরে আরো একদিন কেটে গেছে। তিতলি এখনো বাবার বাড়িতেই। ফারাজ প্রথম রাত থাকতে পারেনি। আফজাল খানের প্রেসার বেড়েছিল সেদিন রাতে। তাকে নিয়ে হাসপাতলে যেতে হয়েছে অনেক রাতে। তাই আসতে পারেনি। কিন্তু আজকে আসার কথা। এখনো আসছে না কেন?
এখন রাত নয়টা। তিতলি লেডিস গেঞ্জি পরে বিছানায় কোলবালিশ জড়িয়ে শুয়ে শুয়ে ফেসবুক স্ক্রল করছে। এটা তার আগের ফোন। বিয়ের পর ফারাজ ফোন একটা কিনে দিলেও সেটায় ফেসবুক একাউন্ট খুলে নি।
ফারাজকে দুবার কল করেছে একবার রিসিভ করেনি। ফোন বিজি দেখাচ্ছে। মেসেজও সিন করে রিপ্লাই করিনি। কেন ফোন রিসিভ করেনি মেসেজ দেয় নি। তাই তার কিশোরী মনে প্রচন্ড অভিমান জমেছে। চোখ ভিজে এসেছে। তখন নিধির কল এলো।
তিতলি ফোন রিসিভ করে কানে ধরলো,
ওপাশ থেকে নিধি বলল,
"কি খবর বেইবি?"
তিতলি: "ভালো নাই।"
নিধি: "দুলাভাই..থু্ক্কু ফারাজ স্যার কোথায়?"
তিতলি: "আমি কি জানি!"
"তুই জানবি না আর কে জানবে? কতটুকু ঘায়েল করতে পেরেছিস? পুরুষ মানুষ কিন্তু চম্বকরের মতো। দুলাভাই যদি তোকে এখনো কিছু না করে তাহলে সিস্টেমে সমস্যা আছে।"
"কল রাখ নিধি! আজকে আমার মন ভালো নেই।"
বলে তিতলি ফোন কেটে দিলো। তিতলি ফেসবুকে আবার ঢুকে ফারাজের আইডিতে ঢুকলো। এক্টিভ দেখাচ্ছে। হোয়াসঅ্যাপ এ তার কল রিসিভ করছে না। তিতলির হঠাৎ মনে পড়ল ফেইক আইডির কথা। কিছু একটা ভেবে ফেইক আইডি লগইন করলো। ভাল্লুককে মেসেজ দিবে। তাকে তো চিনে না? একটু পরিক্ষা করে দেখা যাক। অনেক ভেবেচিন্তে লিখলো,
"শুনলাম আপনি বিয়ে করে ফেলেছেন? হাউ ডেয়ার ইউ? আমার ফিউচার আলু-পটলের বাপ হয়ে অন্য একটা মেয়েকে বিয়ে করলেন? থাক ব্যাপার নাহ! আপনার বিবাহিত জীবন কেমন চলছে শুনি? বউ কি রোজ ঝাড়ি দেয়? মেয়ে আমার মতো কিউট তো?"
পাশে দুইটা দুঃখের ইমোজি দিয়ে সেন্ড করে দিলো।
.
.
ফারাজ খান শ্বশুর বাড়ির গেইটে নিজের বাইক থামিয়ে আফজাল খানের সাথে কি নিয়ে যেন কথা বলে ফোন রাখতেই হঠাৎ নোটিফিকেশনে বেজে উঠছে দেখে ভ্রু কুঁচকে এক নজরে পুরো মেসেজ পড়লো। সহসা যুবক ঠোঁটের কোণ বাঁকিয়ে ক্রুর হাসল। ভেতরে যেতে যেতে ব্যস্ত হাতে টাইপ করে লিখলো,
"আলহামদুলিল্লাহ! বিবাহিত জীবনে আপনার কার্বন কপি একটা বেয়াদব বউ পেয়েছি। এখন তার কাছেই যাচ্ছি দুই গালে দুইটা থাপ্পড় দিতে। পরে কথা হবে অচেনা বউ!"
.
.
তিতলি মোবাইল নিয়েই বসে ছিলো। ভেবেছিলো কোনো মেসেজ আসবে না। কিন্তু এখন টুং করে মেসেজের শব্দ হয়ে সে দেখলো ফারাজের মেসেজ। তিতলি চোখ পিটপিট করল বিস্ময়ে। নাক টানল। কোটর সব ভরে উঠেছে। অভিমান হলো তার। অনুরাগের পাহাড় এত উঁচু হলো যে সব ছেড়ে ছুড়ে বেদুইন হতে মন চাইল। তার কল রিসিভ করে না। মেসেজ সিন করে রিপ্লাই দেই না। এখন ফেইক আইডি থেকে মেসেজ দিতেই সাথেসাথে রিপ্লাই দিলো। না জানি আর কত মেয়ের সাথে কথা বলে। আবার অন্য মেয়ের কাছে বলে সে বেয়াদব। বিছানা থেকে নেমে ড্রয়ার থেকে ইনজেকশন নিয়ে বসে থাকলো। মনে মনেনে বিড়বিড় করে বলল,
"আজকে আসুক! এই ইনজেকশন দিয়ে আমি ছাড়া মনের সিন্দুকে আর কয়টা বেডি আছে সব একটা একটা করে বের করবো।".....
পাখিরা পেইজের অবস্থা ভালো না, প্লিজ সবাই একটু রিভিউ অপশন থেকে একটা করে রিভিউ দেও।
#চলবে...
#রাগে_অনুরাগে
#পর্ব_৩১ (শেষ অংশ)
#সুহাসিনি__ফাতেহা
"আজকে আসুক! এই ইনজেকশন দিয়ে আমি ছাড়া মনের সিন্দুকে আর কয়টা বেডি আছে সব একটা একটা করে বের করবো।"
বিড়বিড় করে তিতলি সম্পূর্ণ রুম জুড়ে পায়চারি শুরু করল। বুকের ভেতর দাউদাউ করে জ্বলছে। ফাঁকাফাঁকা লাগছে মস্তিষ্কের মধ্যে। মাথায় অনেক চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে। কিন্তু কিছুই বুঝতে চাইছে না, জানতে চাই না, ভাবতে চাই না। সে শুধু জানে ফারাজ তাকে কেন কল করলো না সারাদিনে। সে দিলেও ধরে নি। আর যখনই ফেইক আইডি থেকে মেসেজ দিলো সাথে সাথে রিপ্লাই? আবার বলে তাকে থাপ্পড় দিতে আসছে এখন? তিতলির হাতজোড়া নিজের নরম দুগালে চলে গেল। সত্যি কি তাকে মারবে? মারলে সেও মারবে। সে ভয় পাবে না একদম! শেষমেষ আবার বিছানায় এসে বসল। কেঁদেকেটে ভাসিয়ে ফেলেছে। একসময় নাকের পানির জ্বালায় উঠে টিস্যু নিয়ে বসলো৷ আমতাআমতা করে বলল,
"কান্না করেও শান্তি নেই৷"
আচমকা দরজায় টোকা দিলো কেউ। তিতলি নিজের দুঃখে বাঁচেনা। এখন সে রুম থেকে বেরোতে পারবে না। বিছানায় বসে থেকেই তিতলি নাক টেনে বলল,
"আমি ঘুমিয়ে গেছি আম্মু! উঠতে পারবো না।"
আবার দরজা ধাক্কালেন কেউ। শোনা গেল ফরিদা বানুর কন্ঠ,
"দেহি দরজা খোল নাতজামাই আইছে। পরে ঘুম যাইতে পাইরবি।"
তিতলি বসা থেকে দাঁড়িয়ে পড়ল দাদুর কথা শুনে। অভিমানে বুক কেঁপে উঠলো সপ্তদশীর। নাতজামাই আসুক, টাতজামাই আসুক, নাহলে নদীতে ভাসুক! সে দরজা খুলবে না। অচেনা বউয়ের কাছে যাক। আমার কি? দরজার কাছে গিয়েও আবার ফিরে এসেছে। গলা ছেড়ে দিয়ে বলল,
"তো আমি কি করবো? গেস্ট রুমে পাঠিয়ে দাও।"
ফরিদা বানু একবার নাতজামাইর দিকে তাকালেন। পাশে দাঁড়িয়ে আছে। নাতিনের কথা শুনে কি ভাবছে কে জানে। নাতিনকে আবার বললেন,
"এগিন কি কস নাতজামাই গেস্টরুমে থাইকতো যাইবো ক্যান?"
তিতলি বিছানায় বসে পা দুলাতে থাকে। আজকে যেভাবেই হোক ইনজেকশনটা বুক বরাবর পুশ করে দিবে। কিভাবে কি করবে সব বুদ্ধি খাটিয়ে ভাবলো। আবারও একই ভাবে উত্তর দিলো,
"মেহমানরা তো গেস্ট রুমে থাকে দাদু!"
ফারাজ খান দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন ফরিদা বানুর সাথে। কাল আসলেও উপরে উঠা হয়নি। তাই তিতলির রুম কোনটা সেটায় অবগত নয়। ফারাজের রাগ হচ্ছে তিতলির কথা শুনে। হাতজোড়া মুষ্টিবদ্ধ হয়েছে তার আনমনে। তাও অনেকটা শান্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। তার সুদর্শন গম্ভীর মুখখানা আরো গম্ভীর হয়েছে এবার।
ফরিদা বানু নাতজামাই কে বললেন,
"নাতিনের কথায় কিচ্ছু মনে কইরো না নাতজামাই! নাতিন মনে হইতাছে ঘুমের ঘোরে আবলতাবল বকতেছে।"
ফারাজের চিবুক শক্ত! কত যে ঘুম যাচ্ছে সে খুব ভালো করেই সে জানে। ইচ্ছে করে এসব বলছে। শুধু দরজাটা খোলুক তারপর জন্মের ঘুম পাড়াবে সে। দাদি শাশুড়ির কথা শুনে ভদ্রতা দেখিয়ে গম্ভীরস্বরে বলল,
"কিছু মনে করার নেই।"
তিতলি রুমে বসে বসে শুনল সব। মুখ ভেঙিয়ে নিজেও বলল, কিছু মনে করার নেই! কিছু মনে করবে কেন? সে দরজা না খুললে তো ওনি আরো খুশি। চলে যাবেন। তিতলি এবার উঠে এলো দরজার কাছে। হাতের ইনজেকশন টা পেছনে লুকিয়ে রেখেছে। দরজার ছিটকিনি খুলতে গিয়ে হাত কাঁপছে তার। দরজা খুলে দিয়ে আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকল।
ফরিদা বানু নাতজামাইকে হাসিমুখে বললেন,
"ঢুইকা পড়ো নাতজামাই! আমি যাই তাইলে।"
ফরিদা বানু চলে গেলেন। ফারাজ রুমের ভেতরে ঢুকে পুরো রুমে একবার নজর বুলালো। বিছানার চাদরের অবস্থা বেগাতিক। কোলবালিশ মেঝেতে পড়ে আছে। মনে হচ্ছে এখনই রুমের ভেতর কোনো ছোটখাটো যুদ্ধ হয়েছে। বেয়াদব বউকে দেখছে না কেন? হঠাৎ দরজার আড়ালে তিতলির ফর্সা পা দুটো দেখল। সহসা ধারালো দাঁতের স্পর্শে নিজ নিম্নাংশের ঠোঁটখানা পিষ্ট করল যুবক। দরজাটা সুশব্দে লাগিয়ে দিয়ে নজর বন্দী করল তিতলির দিকে। কাঁদতে কাঁদতে লাল টুকটুকে ভাব ধরেছে সপ্তদশীর সরু নাকের ডগাটা। ঠোঁট ফুলে কলাগাছ! ফুসছে নাক। যেন কেঁদে উঠবে।
অশ্রুসিক্ত নয়নে মেঝেতে তাকিয়ে আছে তিতলি। ফারাজ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে। গায়ে ওড়না নেই। তারউপর একটা গেঞ্জি পরা। মাথার ঘনকালো কেশরাশি গুলো খোঁপা করে বাঁধা। গালের দুপাশে বিক্ষিপ্ত আকারে আছড়ে পড়েছে ছোটবড় কিছু চুল। পুরো পিচ্চি মেয়ে লাগছে তার বউকে। আশ্চর্য! মেয়েটার এহেন রুপ তার বড্ড মনে ধরল। কেমন গভীরদৃষ্টে তাকিয়ে থেকে বিড়বিড় করে আওড়াল,
এই পিচ্চি বউ বড় হবে কবে? ভাবছিলো, রুমে এসে দু গালে দুইটা থাপ্পড় বসিয়ে দিবে। তবে এইমুহূর্তে তার রাগী চেহারায় পরিবর্তন দেখাল। তৎক্ষণাৎ দু কদম এগিয়ে এসে একদম তিতলির সম্মুখে এসে দাঁড়াল। তিতলি কেঁপে উঠল। হাত বাড়িয়ে চোয়ালখানা ধরতে গেলেই তিতলি পেছনে সরে যায়। হাত একটা পেছনে লুকিয়ে রেখেছে। ইনজেকশন দিয়ে সুযোগ বুঝে কাজ করবে। অভিমানে তার কন্ঠে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে,
"কেনো এসেছেন আপনি? আপনাকে কি আমি আসতে বলছি?"
ফারাজের ভ্রুযুগলে সূক্ষ্ম ভাঁজ পড়েছে। তিতলির কথাটা গায়ে না মেখে ফের কাছে যেতে চাইলে তিতলি দরজার দিকে ঘুরে গেল। সরু নাকের পাটাটা সামান্য ফুলিয়ে, মুখ ঝামটি মে'রে বলে বসে,
"খবরদার ছোঁবেন না আমায়!"
অলক্ষ্যে ঠোঁট পিষে হাসল ফারাজ। বউকে জ্বালানোর জন্য তার অশান্ত মনটা খুবই অস্থির হয়ে উঠেছে। এমন সুযোগ হাত ছাড়া করবার মানুষ কি আর সে? তক্ষুনি তিতলির একদম পেছনে এসে দাঁড়লো। ফর্সা তুলতুলে ঘাড় উন্মুক্ত। লম্বা করে নিশ্বাস ফেলল সেখানে। নারীদেহের ঘায়েল করা স্মেল নাকে এসে ঠেকল। তার ইচ্ছে হলো বাড়াবাড়ি করে অনেক কিছু করে ফেলতে। সেদিনের কামড়ের জায়গা টা এখনো লাল দাগ হয়ে আছে। সেখানে নজর রেখেই হিসহিসিয়ে শুধালো,
"তাহলে অন্য কাউকে ছুঁতে হবে মনে হচ্ছে?"
তিতলি ঘুরে তাকাল। তার চোখজোড়া লাল হয়ে গিয়েছে। হিসফিস করছে মুখশ্রী। অন্য মেয়েকে ছুঁতে হবে তো? এখনও তো অচেনা বউকে মেসেজ দিয়ে তার কাছে এসেছে। যদিও মানুষটা সে নিজেই কিন্তু এটা তার কিশোরী মন মানতে নারাজ।
কন্ঠে রাগ তেজ সব মিশিয়ে বলল,
"তো যান! আপনার অচেনা বউকে কোলে নিয়ে বসে থাকুন! আমার কি?"
ফারাজের ভ্রজোড়া কুঁচকে গেলো কৌতুকে। বিদ্বিষ্ট চাউনী গভীরতা পেলো। তিতলিকে ঘুরিয়ে এনে নিজের মুখোমুখি দাঁড় করাল। দরজার সাথে মিশে গেল তিতলি। ফারাজ দরজার দুপাশে বলিষ্ঠ দুহাত রেখে সামান্য ঝুঁকে এসে তিতলির মুখের দিকে তাকালো। কিছুই জানে না এমন ভাব-ভঙ্গিমা ধরে রেখে বলল,
"অচেনা বউটা কে আবার? নাম বলো?"
তিতলি নিশ্চুপ! কিছু বলছে না। মূলত কোনো কথায় খুঁজে পাচ্ছে না এবার। অচেনা বউ তো সে নিজেই। তাহলে কি সত্যিটা বলে দিবে? না কিছুতেই বলবে না সে। আরো পরিক্ষা করবে। এবারও ফারাজের চোখে চোখ রাখল না। নিচের দিকে তাকিয়ে থেকে নাক টেনে বলল,
"আপনার অচেনা বউ কে সেটা আমি কীভাবে জানবো? যার সাথে কথা বলার জন্য আমার ফোন ধরেন নি তার কাছে যান।"
জিভের ডগায় গাল ঠেললো ফারাজ। ঘাড়টা সামান্য কাত করে, দৃষ্টি করল তীক্ষ্ণ। ভ্রু নাচিয়ে শুধাল,
"কার কাছে যাবো হুমম ? আমার বউ কে? ওকে বউ তুমি যেহেতু বলছো যেতে তাহলে যাচ্ছি।"
বলে ফারাজ চলে যাওয়ার অভিনয় করলো। এবার তিতলি রাগে ফেটে পড়ে। হিংস্র বাঘিনীর ন্যায় তক্ষুনি ফারাজের সামনে এসে দাঁড়ালো। পাহাড়সম বলিষ্ঠ পুরুষের সামনে সে বড্ড ছোট। যুবকের প্রশস্ত বুকে মাথা এসে ঠেকেছে তার। নাক মুখ সব ফুলিয়ে ডানহাতে ফারাজের শার্টের কলার টেনে ধরল। কেঁদে দিবে এমন ভাব। এত্ত বড় সাহস তাকে রেখে চলে যাবে? বা হাতে লুকিয়ে রাখা ইনজেকশন টা সোজা ফারাজের বুক বরাবর ধরল।
ওদিকে ফারাজ রেগে গেলো শার্টের কলার ধরায়। যেখানে সবাই তার কথায় উঠে বসে। এই বেয়াদব বউয়ের কত বড় স্পর্ধা তার কলার টেনে ধরে আজকে তো সে ছাড়বে না এই বউকে। কাঁচা চিবিয়ে খেয়ে ফেলবে না? রাগ কন্ট্রোলে আনতে তৎক্ষণাৎ ধারালো নেত্রদ্বয় বন্ধ করে হাতজোড়া মুষ্টিবদ্ধ করে নিলো। ফের খুলতেই তার রাগী চোখদুটো অস্বাভাবিক ভাবে শান্ত হয়ে এলো। তিতলি তার বুকে ইনজেকশন ধরে রেখেছে। হাসবে নাকি রাগবে ঠিক বুঝতে পারছে না সে। তার পাতলা ঠোঁট জোড়া কাঁপছে ধমক দেওয়ার জন্য। গলায় ধমক আটকে রেখে শান্ত ভাবে বলল,
"কলার থেকে হাত নামাও। আমাকে রাগিয়ো না।"
তিতলি কলার আরো জোরে চেপে ধরল এবার। ফুপিয়ে কেঁদে উঠল সে। কান্নার তোড়ে শরীর কাঁপছে। ইনজেকশন মেরে দিবে এমন ভাব নিয়ে বলল,
"কার..কার কাছে যাবেন বলছেন? আবার বলেন?
"কারো কাছে যাচ্ছি না আমি।"
তিতলি সে-কথা শুনেও শুনলো না। ইনজেকশনটা এবার সত্যি সত্যি মেরেই দিবে। না মারলেই যেন নয়। বুক ফুলিয়ে বলল,
"মুখের কথা বিশ্বাস হয় না। আমি ছাড়া আপনার মনের সিন্দুকে আর কয়জন বেডি আছে দেখি তো।"
তিতলি কথা শুনে ফারাজের ভ্রুজোড়া এবার মাত্রাতিরিক্ত কুঁচকে গিয়েছে। এই বউকে কি করতে মন চাই? মনের সিন্দুক? শুনেই তার গম্ভীর মুখে ভীষণ হাসি পেলো। সহসা একঝটকায় তিতলির হাত থেকে ইনজেকশনটা কেড়ে নিলো। তিতলি অন্যমনস্ক ছিলো বিধায় হাত থেকে কেড়ে নিতে ফারাজের কোনো অসুবিধা হয়নি। ইনজেকশনটা আঙুলে ঘুরাতে ঘুরাতে বাঁকা হাসির রেশ ধরে বলল,
"মনের সিন্দুক আবার কি? মনের সিন্দুক কাকে বলে হুমম?"
তিতলিও দমে গেলো না। এবার ফারাজকে বলল,
"মাথাটা একটু নিচে নামান কানে কানে বুঝিয়ে দিচ্ছি। মনের সিন্দুক!"
"মুখে বলো।"
"না মুখে বলা যায় না।"
ফারাজ ভ্রু গুছালো। বউ যেহেতু বলছে দেখি কি বুঝিয়ে দেয়। মনের সিন্দুকে আসলেই কে আছে সেটা সে পরে প্যাক্টিক্যালি বুঝাবে! এখন মাথা নামিয়ে ঝুঁকে এলো তিতলির দিকে। তিতলি পা উঁচু করলো অনেকটা। কানের কাছে মুখ নিয়ে যাবে এমন ভাব-ভঙ্গিমা ধরে রেখেই আচমকা ফারাজের পুরুষালি নাকে কামড় বসিয়ে দিলো। বড্ড জোরে কামড় দিয়েছে সে। নাকের দুপাশে তার ছোট ছোট ইদুরের দাঁতের দাগ বসেছে।