ফন্ট সাইজ:
থিম:
আলতো ছোঁয়ায় সমুদ্রকথন

২২তম পর্ব

লেখক: নুসরাত সুলতানা সেঁজুতি

#আলতো_ছোঁয়ায়_সমুদকথন__(২২)

#নুসরাত_সুলতানা_সেঁজুতি 
পার্টি অফিসে ইকবালের কামরা এসির শীতেল হাওয়া বিশিষ্ট। শত হোক,অফিস প্রধাণ বলে কথা। একটা কালো ফোমের তিন পায়ার কেদারা, যাতে চাকা লাগানো আছে। একটা কাচের টেবিল। ছোটোখাটো একটা সোফাসেট, আর একটা শেল্ফ আছে এখানে। ওহ,স্ট্যান্ড ফ্যানও আছে একটা। এটা আবার ব্যাটারি চালিত। লোডশেডিং হলে বাতাস পাওয়া যায়। এত আরামের জায়গা ইকবালের জীবনে,অথচ বেচারার মনে দুদণ্ড আরাম নেই। স্বস্তি নেই কোথাও। কাজবাজ ফেলে সেই তখন থেকে পিঠে দুই হাত বেঁধে পায়চারি করছিল ছেলেটা। সে কী চিন্তা তার! হঠাৎ থেমে পাশ ফিরে চাইল। সোফায় বসা ধূসর ফোনে মগ্ন। ওর দিকে কোনো খেয়ালই নেই। ও যে চিন্তায় মরছে,একবারও ভাবছে সেসব? কষ্টে ইকবালের বুকটা হুহু করে উঠছিলই,সচেতন হলো পরপর। ধূসর ওকে নিয়ে ভাববে কেন? ও তো ওর চিন্তার আগাগোড়া জানেও না কিছু। যদি জানতো,পুষ্পর সাথে তার নিজের বন্ধু লাইন মারছে চিন্তার বদলে তখন মেরে পাছার হাড্ডি নাড়িয়ে দিত না? থাক, চিন্তার দরকার নেই,এভাবেই ভালো।
এর মাঝেই দরজায় টোকা পড়ল। বিরক্ত হয় ইকবাল। চ সূচক শব্দ করে বলে,
“ খোলা আছে।” 
সোহেল মাথা ঢুকিয়ে উঁকি দেয়। জিজ্ঞেস করে,
“ লিস্টটা দেখেছিস?” 
“ কীসের লিস্ট?” 
“ মানে কী,ত্রাণের লিস্ট না দেখে দিতে বললাম।” 
“ লিস্ট কোথায়?” 
সোহেল তাজ্জব হয়ে বলল,
“ সকালে না তোকে দিয়ে গেলাম?” 
মনে পড়েছে এমন ভাবে জিভ কাটল ইকবাল। 
“ আরেহ,সরি ভুলেই গেছিলাম। দেখে দিচ্ছি,যা।” 
সোহেল চলে গেল। ইকবাল পোড়া শ্বাস টানল বুকে। ভুলে তো যাবেই। কাজের কাজ মনে নেই,মন পড়ে আছে অন্যদিকে। যখন থেকে শুনেছে পুষ্প গ্রামে যাবে,শান্তিই পাচ্ছে না। শুভর যা হাবভাব দেখেছিল সেদিন,যদি ওর মাই লাভকে ওখানে একা পেয়ে পটিয়ে নেয়? 
উফ, এত অশান্তি নেয়া যায় না জীবনে। ইকবাল মাথা চুলকাতে চুলকাতে বেখেয়ালি নজর ঘুরিয়ে ফের ধূসরের পানে ফেলল। কপাল বেঁকে বসল অমনি। এত কিছু ঘটে গেল,তাও ধূসরের মনোযোগ যেন ফোনেই পড়ে আছে। ভ্রু কুঁচকে, চোখ ছোট করে কী একটা কঠিন ভাবে দেখছে সে। ইকবালের আগ্রহ হলো জানার। পা টিপে টিপে এসে ধূসরের পেছনে দাঁড়িয়ে উঁকি দিলো। চমকে গেল মূহুর্তে।  
একটা ইনস্টাগ্রাম আইডি,নামটা গোটা গোটা অক্ষরে লেখা - Prohorsha Shikder Piyu! 
বায়োতে ছোটো করে লেখা, 
“i'm a barbie doll, in my barbie world!” 
এই অপ্রত্যাশিত, অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয় ছেলেটা আশা করেনি। ধূসর দেখছে পিউয়ের আইডি? ও মাই গড!
চোখদুটো গোল গোল করে ফেলল ইকবাল। একবার ধূসর,আরেকবার ওর ফোনের স্ক্রিনে দেখল। পরপর
আর্তনাদ করে বলল,
“ ইইই, তুই পিউপিউকে স্টক করছিস ধূসর?” 
ইকবাল যত জোরে চ্যাঁচিয়েছিল, তাতে ধূসর কান উড়ে যাওয়ার কথা। কিংবা এমন কিছু করার পর,বন্ধুর সামনাসামনি হওয়াতে আরো অপ্রস্তুত হওয়ার কথা! কিন্তু ধূসরের কোনোটাই হলো না। বরং ওকে দেখতে শান্ত নদীর মতো লাগল। সাইড টিপে ফোনের স্ক্রিন বন্ধ করে বলল,
 “ না।” 
“ না? এইত, টেনে টেনে ওর ছবি দেখছিলি।” 
“ টেনে দেখিনি,বাড়িয়ে বলছিস কেন?” 
“ যেভাবেই দেখিস,দেখছিলি যে এটাই বড়ো কথা। কেন, কেন দেখছিলি হ্যাঁ?”
“ মানে কী!” 
“ মানে আবার কী? একটা দামড়া ছেলে,একটা সুইট কিউট মেয়ের ছবি দেখবে কখন? যখন সে মেয়েটাকে ভালোবাসবে। তুই কি পিউপিউকে ভালোবাসিস,হুম হুম?” 
ধূসর আজ রেগেমেগে যায়নি। বরং একটা স্থির জবাব ছুড়ল,
“ তুই নিজেই তো বললি,পিউকে দেখে দেখে রাখতে।” 
“ আমি কি এই দেখার কথা বলেছিলাম!” 
ধূসর চ সূচক শব্দ করল। 
“ লেট ইট বি ইকবাল! কী এক জিনিস নিয়ে পড়ে আছিস!”
ইকবাল ঢেড় বুঝল,এ শালা কথা ঘোরাচ্ছে। ধরা পড়লেও,ভাব ধরেছে সালমান খানের মতো। ব্যাটা যোচ্চর!
 বলে মনে মনে কষে একটা গালি দিলো ও। কিন্তু মুখে বলল,
“ তাহলে তুইও যাচ্ছিস?” 
“ যাচ্ছি।” 
ইকবাল দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, 
“ তোরই দিন! কখনো নিউইয়র্ক, কখনো ফ্যামিলি ট্যুর। শালা ফুটা কপাল,কতদিন পর একটু দুই বন্ধু মিলে মজ-মস্তি করছিলাম। এখন আবার আমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছিস। আমি তোকে ছাড়া কীভাবে থাকব,ধূউউউউসঅওঅঅঅঅর!” 
ইকবাল কান্নার ভান করল। কিন্তু চোখে পানি এলো না। বিরক্ত হলো নিজেই। ফের বলল 
“ তোর কথা আমার খুব মনে পড়বে। খুব মিস করব বন্ধু।” 
ধূসর উত্তর দিলো না। নাকমুখ কুঁচকে চেয়ে রইল। যেন দেখছে,ইকবাল কত অভিনয় করতে পারে। এভাবে তাকালে ছেলেটা ঘাবড়ে যায় না? থতমত খেয়ে বলল,
“ না আসলে, আমি সত্যিই তোকে ছাড়া থাকতে পারব বলে মনে হচ্ছে না। খুব ভালোবাসি তো তোকে। এদিকে এত চাপ না থাকলে তোর সাথে চলেই যেতাম রে।” 
ধূসর ছোট করে বলল 
“ আচ্ছা!” 
ইকবালের মুখ বাংলার পাঁচ হয়ে গেল। ভোতা চেহারায় ভাবল- ‘’ হতচ্ছাড়াটা বোঝেও না! না এভাবে হবে না। অন্যভাবে খেলে দেখতে হবে।” 
তারপর গলা ঝারলো ইকবাল। বলল 
“ আসলে,ভাবছিলাম দুইদিনের দুনিয়ায় কদিনই বা বাঁচব? মনে কোনো ইচ্ছে এলে ফেলে রাখা ঠিক না। আমার যখন মন চাইছে,তোর সাথে যেতে। যাওয়া উচিত না?” 
“ এই না বললি,এদিকে খুব চাপ!” 
“ চ-চাপ তো সব সময় থাকে। ট্যুর তো আর থাকে না। আমার বাপ যে কঞ্জুস,জীবনে ফ্যামিলি ট্রিপে নেবেও না। ইয়ে মানে ধূসর,আমাকেও নিয়ে যা না,প্লিজ!” 
ধূসরের ঠোঁট স্থির। তবে চোখদুটোতে জ্বলজ্বলে কৌতুক। এক হাত ছড়িয়ে সোফার হাতলে রেখে বলল, 
“ আর ত্রাণের কী হবে?” 
ইকবাল অবিলম্বে বলল,
“ ওটা খালেদ ভাইকে বলে ডেইট চেঞ্জ করিয়ে নেব। তুই আমাকে নিবি কিনা বল!” 
ধূসর হাঁ করার আগেই আবার বলল,
“ আমি তোকে একটুও জ্বালাব না। বকবক করে মাথা খাব না। ভদ্র হয়ে থাকব। তুই যা বলবি তাই শুনব। প্রমিস!”
ধূসর সন্দেহী চোখে বলল,
“ হঠাৎ গ্রামে যাওয়ার এত ইচ্ছে? তোর না গ্রাম পছন্দ নয়!” 
ইকবাল যেন আকাশ থেকে পড়ল,
“ কী বলিস আল্লাহ,গ্রাম পছন্দ না এমন মানুষ কী মানুষ নাকি! আর বরিশাল তো আমার ড্রিম প্লেস ভাই। কত রাত ঘুম বাদ দিয়ে শুধু স্বপ্ন দেখেছি,আমি বড়ো হয়ে একদিন বরিশাল যাব। তোর সাথে যাব বন্ধু। একটু দ্যাখ না,ম্যানেজ কর না। তোর হিটলার চাচাকে সামলাতে পারবি না? আমার জন্যে ধূসর?” 
“ তাতে আমার লাভ?” 
“ ঐ তো বললাম,তুই যা বলবি আমি তাই করব।” 
ধূসরের দয়া হলো। ঘাড় নাড়ল অল্প করে,
“ ওকেই,ডিল।” 
খলবলিয়ে উঠল ইকবাল,
“ তাহলে আমি যাচ্ছি?”
“ আগে দেখি,কতটা কথা শুনে চলিস। তারপর জানাব!” 
ও বের হতে যাচ্ছিল,ইকবাল শুধায়,
“ কই যাস?” 
“ বাইরে।” 
“ রওনকও তো বাইরে গেল।”
“ ও আমার গার্লফ্রেন্ড না ইকবাল। তুই তোর এই সন্দেহ করা কমা।” 
ধূসর বেরিয়ে গেল। ইকবাল বিড়বিড়িয়ে বলল,
“ ছ্যাহ! আমি এসব ভাবিও না। পৃথিবীতে তুই একমাত্র আমার বন্ধু হলে,প্রেমিক হিসেবে তুই শুধু আমার বোনের হবি। বুঝলি হতচ্ছাড়া?” 
**** 
দুপুরের চড়া রোদ নারকেল পাতার ফাঁক চিড়ে যখন বাঁধাই করা সিমেন্টে এসে পড়ল,পাশে কারো বসার শব্দ পেলো রওনক। হাতে পেপসির কাচের বোতলে একটা স্ট্র বসিয়ে,ধূসর নিজে বসল মাত্র। রওনক হাসি টানল ঠোঁটে, 
 “ কী অবস্থা ধূসর? ট্যুরে যাচ্ছো নাকি!” 
ধূসর ভ্রু কুঁচকায়,
“ ইকবাল বলেছে?” 
“ হ্যাঁ।” 
ধূসর পেপসিতে এক চুমুক দিয়ে রওনকের দিকে এগিয়ে দিলো। খেলো না ও। বলল, 
“ নো থ্যাংকিউ। গলা বসে আছে। এরপর এসব খেলে মা মারবে আমায়।” 
বলতে বলতে একটু উদাস চোখে হাসল ছেলেটা। ধূসর খেয়াল করল ঠিকই। বলল,
“ তুমি কি কিছু নিয়ে টেন্সড?” 
কিছুটা যেন চমকাল রওনক। 
“ কী করে বুঝলে?” 
“ তোমাকে দেখে যে কেউ বুঝবে।” 
“ কই,কতদিন থেকেই তো এভাবে ঘুরছি। কেউ বোঝেনি। তুমি এক্সট্রা অর্ডিনারি তাহলে।” 
ধূসর হেসে বলল, 
“ টেন্সড কী নিয়ে?” 
রওনক
বিব্রত চোখে বলল, 
“ যদি বলি কীভাবে নেবে?” 
“ আমার মতো করে নেব।” 
রওনক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, 
“ আমি আসলে একটু চাপে পড়ে গেছি।” 
“ কী নিয়ে?” 
“ আমার বোন,মারিয়া কে নিয়ে।”
ধূসর বোঝেনি,জিজ্ঞেস করল,
“ কীরকম? বিয়ের ব্যাপার,ছেলে দেখছো?” 
হেসে ফেলল রওনক। সোজাসুজি ধূসরের দিকে চেয়েই বলল, 
“ একজনকে দেখে রেখেছি। এখন সুযোগের অপেক্ষা। তবে এবার চিন্তাটা অন্য।” 
ধূসর প্রশ্নবিদ্ধ চোখ মেলে চেয়ে রইল। ও নিজেই বলল, 
“ আমি আসলে মানত করেছিলাম,সম্পাদকের পদ পেলে মাকে নিয়ে ওমরাহতে যাব। বাবার মাকে নিয়ে হজে যাওয়ার কথা ছিল। সে বছরই বাবা মারা গেলেন। হঠাৎ এই মৃত্যুতে আমরা অর্থনৈতিক এত ঝামেলায় পড়ে গেলাম! মৃত মানুষ নিয়ে গ্রামের বাড়ি দাফন করতে যাই। সেখানে লোকজন দুঃখ পাওয়ার বদলে এসে দরজায় দাঁড়াল, তারা বাবার কাছে টাকা পায় সেই দাবি নিয়ে। ফোনের পর ফোন এলো,বাবার ঋণ আছে। অথচ আমি কখনো এরকম কিছু শুনিনি যে বাবা ধারদেনায় ছিলেন। মা নিজেও জানতেন না। কিন্তু, কী করব? দাবি উঠেছে যখন,ফেরাতে তো পারব না। বাবা,মায়ের যা সঞ্চয় ছিল সব তাতে দিয়ে দিলাম। লেখাপড়া ছাড়লাম। চাকরি নিলাম,কিন্তু কূলোতে পারছিলাম না। বাবার রেখে যাওয়া ফ্ল্যাটটা না থাকলে হয়ত ঢাকাতেও থাকতে পারতাম না। শেষে এক বড়ো ভাইয়ের কথায় যোগ দিলাম,রাজনীতিতে। খাতায় নাম উঠতে ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল! তাও খেটেছি,যতটুক পারি। কনফার্ম ছিল সম্পাদক আমিই হব। এর মাঝে যখন তুমি এলে,আমি তোমাকে খুঁজে পেলাম পথের কাঁটা হিসেবে। আমিও ধরে রেখেছিলাম,নির্বাচনে জিতবে তুমিই। মানত করেছিলাম,যদি তাও কোথাও গিয়ে নিজে জিতে যাই,মাকে নিয়ে ওমরাহয় যাব। এক বছর আগে জানতে পেরেছিলাম,মহাখালীতে বাবার দুটো দোকান তোলা ছিল। ভাড়া হয়নি! সম্ভবত মা এত ঝামেলা ঝক্কিতে মনে রাখতে পারেনি। সারলাম ও দুটো। ভাড়া চলছে! 
এখন ওমরাহতে যাব ঠিক করেছি। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে,আমার তো অত বাজেট নেই। মারিয়ার পাসপোর্ট করানো হয়নি। তারওপর একটা এজেন্সির মাধ্যমে যাচ্ছি। ওরা এ সপ্তাহের তারিখ ফেলেছে। এখন এত দ্রুত মারিয়াকে কোথায় যে রেখে যাব!” 
ধূসর সব শুনে বলল,
“ ঢাকায় কোনো আত্মীয় নেই?” 
“ এটাই তো সমস্যা! যারা আছে,ওরা সব চশমখোরের দল। আমাদের এত বিপদেও একটা কেউ পাশে ছিল না। কী খাই,না খাই খবর অবধি নেয়নি! এখন ওদের দরজা মাড়ানোও আমার জন্যে পাপ,অসম্মানের। 
আমি ভেবেছিলাম,মা যেহেতু রাজনীতি পছন্দ করেন না,মাকে এই রাজনীতির উন্নয়ণ দিয়েই একটু হলেও তার স্বপ্ন পূরণ করব। কিন্তু যা বিপাকে পড়লাম! 
বোনটা বড়ো হয়েছে। এখন মেয়েরা কোথাও সেইফ না। এত তাড়াতাড়ি একটা সেফ জায়গা ,যেখানে ওকে রেখে নিশ্চিন্তে থাকব। নাহ,মাথায় কিছু আসছে না।” 
ধূসর সাথে সাথেই বলল,
“ চাইলে আমাদের বাড়িতে রাখতে পারো।” 
চকিতে চাইল রওনক,
“ তোমাদের বাড়িতে!” 
“ হ্যাঁ! আমরা তো জয়েন ফ্যামিলি। সব মিলিয়ে অলমোস্ট ১৩ জন একসাথে থাকি। বাবা,চাচ্চুদের পর সাদিফ আর আমি ছাড়া পুরুষ কেউ নেই। থাকলেও, সারাদিন বাড়ি ফাঁকাই থাকে। আমার তিন মা থাকেন! ছোটো মা,চাকরি করেন। আর বাড়িতে পিউ -পুষ্প আছে। বড়ো আব্বুর মেয়ে। তোমার বোন সম্ভবত পুষ্পর সমবয়সি হবে! তাছাড়া আমার বাড়ির সবাই ভীষণ আন্তরিক। যে কাউকেই খুব সহজে নিজের করে নেয়ার গুণ ওদের আছে। আমার মনে হয় না,ওর কোনো অসুবিধে হবে ওখানে।” 
“ তোমার বাড়ির ব্যাপারে আমি ইকবালের কাছ থেকে অনেক শুনেছি। কিন্তু,এভাবে মারিয়াকে পাঠালে ওনারা কিছু মনে করবেন না?” 
ধূসর আত্মবিশ্বাসের সাথে বলল,
“ না।” 
রওনক ভাবতে বসল। এরপরপরই বলল,
“ এই,ওয়েট তোমরা তো এই সপ্তাহেই ট্যুরে যাচ্ছো ধূসর।” 
“ নো ওরিস রওনক,মারিয়াকে কেউ রেখে যাবে না। ও পিউদের সাথে থাকবে! আর আমি নিজেও যাচ্ছি। তুমি ভেবে আমাকে জানিও।” 
রওনক বলল,
“ আর ভাবার কিছু নেই। তোমাকে চিনি,তোমার চাচাদের সম্পর্কেও জানি। তাছাড়া ইকবাল সবার প্রশংসায় সারাক্ষণই যা পঞ্চমুখ হয়ে থাকে! আমি রাজি। রাতে বাড়িতে জানাই,,তারপর কাল বিকেলে ওকে দিয়ে আসব।” 
“ ওকেই।” 
রওনক আপ্লুত হয়ে হাত বাড়াল,
“ থ্যাংকস ভাই। অনেক বড়ো চিন্তা থেকে বাঁচালে!”
ধূসর হাত মেলাল। তবে রওনকের হাসিটা বদলে গেল একটু। ধূসরের তীক্ষ্ণ চোয়ালের দিকে চেয়ে চেয়ে ঠোঁটটা আরো ছড়াল দুদিকে। 
যেখানে মিশে ছিল বিজয়, আর বিজয়ের আনন্দ। 
*** 
আজ শনিবার। এ সপ্তাহের ঠিক বৃহস্পতিবার শিকদার বাড়ির বরিশাল যাওয়ার কথা। সবে সবে আলোচনা উঠল,এখন তো চারিদিক দিক গোছগাছ বাকি! সেজন্যে বাড়িময় ইতোমধ্যেই ভালো তোরজোর শুরু হয়ে গেছে। রাদিফের কিছু হোমওয়ার্ক আগেভাগেই সেড়ে রাখছেন জবা বেগম। সুমনা পেটিশান জমা করার প্রস্তুতি নিয়েছেন। আনিস হাতের কেসে ইতি টেনে,নতুন আর কেস নেবেন না এর মাঝে। আমজাদ-আফতাব দুজনেই অফিসের কাজবাজ ম্যানেজারকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে দিচ্ছেন। ঝাড়া হাত পা ছিল পুষ্পর। ওর তো আপাতত পড়াশোনা নেই। প্রাইভেটে পড়বে বলে নিশ্চিন্ত! কিন্তু তার চেয়েও নিশ্চিন্ত দেখাচ্ছে পিউকে। ততোধিক যেন উৎফুল্ল সে। কাল থেকে বই-টই ছোঁয়নি। সারাক্ষণ ওরনা উড়িয়ে হাঁটছে। কলেজ নেই। তানহা এসেছে সকালের পরপর। দুপুরে খেয়ে যেতে বলেছেন মিনা। ওরা বসে গল্প করছিল। পিউ দুই হাতের নখ স্কয়ার শেপ করে কেটেছে। বসে বসে মনোযোগ দিয়ে ওর নখে নেইলপলিশ পরিয়ে দিচ্ছিল তানহা। মাঝেমধ্যে কিছু একটা বলছে,আর ফিক ফিক করে হাসছে দুটোতে। তবে পুষ্পর মন-মেজাজ বেজায় খারাপ। গতকালকের পর ইকবালের সাথে ওর কথা হয়নি। রেগেমেগে ছেলেটাকে ব্লক করে রেখেছে। ফেসবুকে,আর ফোন বুকে৷ কিন্তু হোয়াটসঅ্যাপে তো করেনি। একটা কি কল দেয়া যেত না? বাড়িতে তখন রান্নার গন্ধ ম ম করে ঘুরছিল। পোলাওয়ের ঘ্রাণ নাকে আসতেই বড়ো করে শ্বাস নিলো পিউ। স্ফূর্ত চিত্তে বলল,
“ পোলাও? গন্ধ শুনেই খিদে পেয়ে গেল!” 
পুষ্প গোমড়ামুখে খাটে বসেছিল। কোলে কুশান। উত্তর দিলো না। রাদিফ হেলেদুলে ঢুকেই বলল,
“ হাই গার্লস,তোমরা কী করছো?” 
পিউ বলল,
“ রাদিফ,কী রান্না হচ্ছে রে?” 
“ অনেক কিছু! বিরিয়ানি, ডিমের কোরমা,কাবাব,রোস্ট! উম,আর… ওই.. 
ধুর অত খাবারের নাম আমি জানি নাকি!” 
পুষ্প অবাক হয়ে বলল, 
“ এত আয়োজন কার জন্যে? আজ তো শুক্রবারও নয়। বাবার কি কেউ আসবে? নাকি তানহার জন্যে?” 
পিউ বলল,
“ তানহা এসব খাবে? ওতো ডায়েট করেই কূল পায় না। আর ও এলোই কিছুক্ষণ। আম্মুকে তো সকাল থেকেই ছোটাছুটিতে দেখছিলাম। নিশ্চয়ই অন্য কেউ আসবে!”
রাদিফ জানাল,
“ হ্যাঁ, আসবেই তো। ধূসর ভাইয়ের গেস্ট আসবে একজন। আসলে মাংসের এত ঘ্রাণ বের হচ্ছিল,আমি কিচেনে একটু চাইতে গেছিলাম,তখন মা বলেছে।” 
পিউ সাগ্রহে বলল,
“ ধূসর ভাইয়ের গেস্ট! কে আসবে রে?” 
পুষ্প বলে,
“ ইকবাল,ইকবাল আসবে মনে হয়।” 
রাদিফ মুরুব্বিদের মতো বলল,
“ ছি আপু,তোমার চেয়ে বয়সে বড়ো হয় না? রেস্পেক্ট দাও।” 
পুষ্পটা থতমত খেয়ে গেল। পিউ বলল, 
“ ইকবাল ভাই তো আমাদের ঘরের ছেলেই। তাকে সেজো মা গেস্ট কেন বলবেন?” 
তানহা এবার মহাবিরক্ত হয়ে বলল,
“ যে আসার আসবে। তুই গবেষণা বাদ দিয়ে সোজা হয়ে বস। নেইলপালিশ থেব্রে যাচ্ছে।” 
“ ওহ সরি সরি!” 
পিউ সোজা হয়ে বসলেও মনঃস্থির করতে পারল না। ধূসর ভাইয়ের গেস্ট আবার কে? কেমন হবে? আবার রাজনীতির কেউ নাতো? বাবা জানেন তো! কিন্তু এক ইকবাল ছাড়া রাজনৈতিক কাউকে তো এভাবে উনি বাসায় আনেন না। অনুষ্ঠান হলে ভিন্ন কথা! এরকম তো হয় না কখনো। এই গেস্ট কি তবে বিশেষ কেউ? 
**** 
দুপুর দুটো বাজে তখন। তানহা, পুষ্প, রাদিফ মাত্রই খেয়ে উঠল। তবে বারবার খেতে বললেও,টেবিলে এসে বসেনি পিউ। ধূসরের গেস্ট নিয়ে নাকি এখনই আসার কথা। মানুষটা যখন আসছেই,ও নাহয় তার জন্যে আরেকটু অপেক্ষা করল। এমনিতে তো খুব একটা দুপুরের ভোজনে পায় না তাকে। 
খুব সুন্দর একটা জাম রঙের চুরিদার পরে পিউ বসেছিল সোফায়। লম্বা চুলে ঢিল করে ঘাড়ের সাথে নুইয়ে দুপাশে দুটো পনিটেইল করা। কলেজে ওঠা থেকেই পিউ চুরিদার ধরেছে। টপ-জিন্স পরেই না। চুলও খুলে রাখে না,সেদিন ধূসরের ঝারি শোনার পর। সব সময় এভাবে ঢিল করে দুটো পনিটেইল করে রাখে। বড্ড লক্ষ্মী হয়ে থাকে। মান্যি করে তাকে। ততক্ষণে তানহা ওরা পিউয়ের পাশে এসে বসল। পুষ্প ফের শুধাল,
“ কী রে,খেলি না কেন?” 
“ একটু পরেই খাচ্ছি।” 
তানহা ফিসফিস করে বলল, 
“ ধূসর ভাইয়ের গেস্ট যেন একটা হ্যান্ডু ছেলে হয়। আমার সিঙ্গেল জীবনটার একটা ইতি ঘটা উচিত।”
এর মাঝে মিনা এলেন। ঘেমেনেয়ে মুখটা একাকার। ব্যস্ত স্বরে বললেন,
“ পিউ,পুষ্প! আমি গোসল করে আসি। ধূসর এলে মায়েদের হাতে হাতে সাহায্য করে দিস।” 
দুজন একইসাথে ঘাড় কাত করল। মিনা যেতে যেতে বিড়বিড় করলেন,
“ রাধলাম তো কত কী! মেয়েটার ভালো লাগলেই হলো।” 
অমনি চটক কাটার ন্যায় মায়ের দিকে ফিরে চাইল পিউ। মেয়ে? কোন মেয়ে! ডোরবলেওটাও বাজল একইসাথে। এসেছে ধূসর। পিউ ভাবল,ওই গিয়ে খুলবে। তবে রুবায়দা আগে চলে গেলেন। চট করে পুষ্প,তানহা,রাদিফ সবাই দাঁড়িয়ে গেল। পিউ ঢেকে গেল একদম। 
রুবায়দা দোর খুলতেই,ওপাশ থেকে একটা নারীকণ্ঠ বলল,
“ আসসালামু আলাইকুম আন্টি,কেমন আছেন?” 
“ ওয়ালাইকুমুস সালাম,আলহামদুলিল্লাহ। তুমিই মারিয়া?” 
ঐ গলার স্বর আর নাম শুনেই ছ্যাৎ করে উঠল পিউয়ের বুক। ঝট করে দুইহাত দিয়ে দুপাশের পুষ্প আর তানহাকে ঠেলে সামনে এলো সে। ধূসর লাগেজ হাতে ভেতরে ঢুকল তক্ষুনি। পিছু চেয়ে বলল - এসো। 
রুবায়দার জন্যে পিউ দেখতে পারছিল না। অস্থির চিত্তে উঁকিঝুঁকি দিলো। ভদ্রমহিলা সরলেন সেসময়। বেরিয়ে এলো মারিয়ার সুশ্রী মুখ। পায়ে চটি জুতো,পরনে ফারসি সালোয়ার স্যুট,এক পাশে কোমর সমান বেনুনি সমেত ভেতরে ঢুকল সে। পিউয়ের মাথা চক্কর কাটে। ধূসর ভাইয়ের সাথে এই মেয়ে আবার কোত্থেকে এলো? কেন এলো? লাগেজ কেন ওনার হাতে! মারিয়া এদিক-ওদিক চেয়ে চেয়ে দেখল। চোখেমুখে নার্ভাসনেস। জবাকেও সালাম দিলো হাত তুলে। রুবায়দার দিকে বাড়িয়ে দিলো ফলমূল ভরা বড়ো সাদা পলিটা। রিনরিনে স্বর নেড়ে বলল,
“ ভাইয়া দিলেন!” 
“ এসবের আবার কী দরকার ছিল?” 
ধূসর বলল,
“ মারিয়া,বসো।” 
এত মোলায়েম স্বর! কই পিউয়ের সাথে তো এভাবে কথা বলে না। ওর ভেতরটা ঢিপঢিপ করে উঠল,কোনো কিছু হারিয়ে ফেলার ভয়ে। ত্রাসে ফ্যাকাশে চোখ ঘুরিয়ে তানহার পানে চাইল সে। মেয়েটা ওর দিকে আগেই চেয়ে আছে। চোখেমুখে চিন্তা তারও। 
 পুষ্প তক্ষুনি ফিসফিসিয়ে বলল,
“ এত সুন্দর একটা মেয়ে? এর কথা তো আগে শুনিনি। ধূসর ভাই তুমি করে বলল না,পিউ? এই, এটা আবার ওনার গার্লফ্রেন্ড নাকি?” 
পিউ,আর পিউয়ের প্রেমিকার মন দুটোই ঝুপ করে তলিয়ে গেল কোনো নিকষ অন্ধকারে। তপ্ত শিখায় কান ঝাঁঝিয়ে ভাবল,
“ ধূসর ভাইয়ের গার্লফ্রেন্ড!” 
চলবে…

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২২তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন