ফন্ট সাইজ:
থিম:
আলতো ছোঁয়ায় সমুদ্রকথন

২৪তম পর্ব

লেখক: নুসরাত সুলতানা সেঁজুতি

#আলতো_ছোঁয়ায়_সমুদ্রকথন__(২৪)

#নুসরাত_সুলতানা_সেঁজুতি 
পিউ রুমে যেতে যেতে চোখ পড়ল বাড়ির রুফটপ টেরেসে। ভূতুড়ে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে কেউ। খোলা হাওয়ায় গায়ের ওরনা উড়ছে। মেয়েটা থামে ওখানেই। কপাল কুঁচকে ভাবে, আপু না ওটা? টেরেসের আলো জ্ব্বালায়নি কেন,ওখানে লাইট আছে তো। পরপর ভাবল, হয়ত ইকবাল লাইনে। ফোনে কথা বলছে। কিন্তু তাহলে তো এরকম খোলামেলা জায়গায় পুষ্পর থাকার কথা না। বরং ভাইয়া কল দিলে পুষ্প সবার আগে ঘরের দরজা চাপিয়ে বসে, রুমের আলোও নিভিয়ে দেয়। সেই সতর্ক মানুষ এভাবে এখানে দাঁড়িয়ে প্রেমালাপ করবে? 
খুব আগ্রহ নিয়ে পিউ পা টিপে টিপে বোনের পেছনে এসে দাঁড়াল। গায়েবি আলোয় পুষ্পর ফরসা গালে চকচক করা অশ্রু দেখে চমকে উঠল অমনি। উদ্বেগ নিয়ে বোনের হাত টেনে নিজের দিকে ফেরাল পিউ। ভারি অবাক হয়ে বলল,
“ আপু? কী হয়েছে,কাঁদছিস কেন?” 
পুষ্পর কান্না বেড়ে গেল সহসা। হুহু করে ভেঙে এলো শরীর। পিউ মরিয়া হয়ে বলল,“ কী হয়েছে বল না! কেউ কিছু বলেছে?” 
“ ইকবালটার অবস্থা দেখলি?সেদিন একটু রাগ করে ব্লক করেছিলাম,আর আজ প্রায় দুদিন হয়ে যাচ্ছে ও আমাকে একটা টেক্সট অবধি করেনি!” 
“ কী! আসলেই?” 
“ তবে কি আমি মিথ্যে বলছি? আগে মেসেঞ্জারে ব্লক দিলে হোয়াটসঅ্যাপ করতো। সেখানে ব্লক করলে ইনস্টায় আসতো। ফোনে টেক্সট করতো,কল দিতো। নাহলে বিকাশে টাকা পাঠিয়ে লিখতো,মাই লাভ ব্লকটা খুলে দাও প্লিজ! কিন্তু এবার… 
ও আমাকে ভুলে গেছে পিউ। ও মনে হয় অন্য কাউকে পেয়েছে।” 
“ আরে না না ভাইয়া অমন ছেলেই না। উনি তোকে ভীষণ ভালোবাসেন। মনে হয় ব্যস্ত এখন।” 
“ কীসের ব্যস্ত? ওকে আমি চিনি না! সম্মেলনে ভাষণ দিতে যাওয়ার আগ অবধি আমাকে টেক্সট করে যায়। সে ছেলে দুদিন আমার খোঁজ নেবে না,এমনি এমনি?” 
পিউ বলল,
“ তাহলে তুই ফোন কর না। সব সময় ভাইয়ারই কেন এগিয়ে আসতে হবে? এবার হয়ত ভাইয়া চাইছেন তুই তাকে সরি বল ।” 
বিস্ময়কর ভাবে পুষ্পর চোখদুটো জলে ডুবে গেল। ভেজা কণ্ঠে জানাল,
“ করেছিলাম। ও আমাকে ব্লক করে দিয়েছে।” 
পিউয়ের ধাক্কা লাগে। তাজ্জব বনে আওড়ায়,
“ হ্যাঁ? সত্যি! ইকবাল ভাইয়া,মানে ইকবাল ভাই তোকে ব্লক করেছে,তোকে?” 
কান্নাভেজা মুখটা নুইয়ে মাথা নাড়ল পুষ্প।
“ হুউউউউ!” 
পিউ কিছু ক্ষণ হতাশ চিত্তে দাঁড়িয়ে রইল। এরকমটা ওর প্রত্যাশায় ছিল না। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“ ভাইয়া মনে হয় এবার বেশিই কষ্ট পেয়েছে রে আপু। তুই- ই বা কথায় কথায় এত ব্লক করিস কেন? বেচারার আর কী দোষ! কিছু হলেই ব্রেকাপের হুমকি আবার ব্লক। এমনিও সারাক্ষণ খ্যাচখ্যাচ করতেই থাকিস।” 
পুষ্প আকুল স্বরে বলল,
“ শুধু ওটাই দেখলি? আমি যে ওকে খুব ভালোবাসি সেটা দেখলি না?” 
পিউ বোনের চোখ মুছিয়ে দিতে দিতে বলল,
“ আচ্ছা আচ্ছা কাঁদে না,আমি ফোন করছি চল।” 
পুষ্পর হাত টেনে পিউ নিজের ঘরে নিয়ে এলো। বিছানায় বসাল ওকে। সামনে ফোন নিয়ে বসতেই উতলা নয়নে চেয়ে রইল পুষ্প। 
কল ঢুকেছে,রিং হচ্ছে। দুবোন যখন উৎসুক,তার মাঝেই খট করে লাইন কেটে দিলো ইকবাল। বদলে দু সেকেন্ডের একটা ছোট্ট ভয়েস পাঠাল,
“ পিউপিউ আমি একটু ব্যস্ত আছি,পরে কথা হবে।” 
সে কী গমগমে কণ্ঠ! হাস্যরসের রাজা ইকবাল যেন কোথাও হারিয়ে গেছে এখানে। পিউ মহা আশ্চর্য হয়ে বোনের পানে চাইল। পুষ্প গাল জলে ভাসিয়ে বলল,
“ দেখলি, অজুহাতটা দেখলি?” 
পিউ আগ বাড়িয়ে ম্যাসেজ দিলো,
“ ভাইয়া, আমার যে একটু জরুরি কথা ছিল। আপুর ব্যাপারে কিছু বলতাম!” 
ওপাশ থেকে ছোট্ট জবাব,
“ পরে শুনব।” 
পিউয়ের চেহারা মলিন হয়ে গেছে,খেয়াল করতেই হাত থেকে ফোনটা ছিনিয়ে নিলো পুষ্প। শেষ উত্তরটা দেখে হৃদয় ভেঙে এলো নিরাশায়। মূহুর্তে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল মেয়েটা। পিউ দিশাহারিয়ে ফেলল,বোনকে সামলাবে কীভাবে! গায়ে-মাথায় হাত বুলিয়ে “, কাঁদিস না, কাঁদিস না” করে গেল বারবার। 
কিন্তু এই কান্না কীভাবে যেন মিনার কানে পৌঁছে গেল। কোত্থেকে ভূতের মতো এসে দাঁড়ালেন রমণী। কর্কশ স্বরেও বিস্ময় নিয়ে বললেন,
“ কী চলছে এ ঘরে! এমন মরা কান্না কাঁদছে কে?” 
মায়ের কণ্ঠে পিলে সুদ্ধ চমকায় ওদের। পিউ ঝটপট বোনের দিকে পিঠ ফিরিয়ে বসে,ঢেকে দেয় ওকে। সেই ফাঁকে ত্রস্ত হাতে চোখদুটো মুছে ফেলল পুষ্প। 
মিনা ভ্রু কুঁচকে নিলেন। পিউ বোকাবোকা হাসল। আমতাআমতা করে শুধাল,
“ আম্মু,তুমি! আমার ঘরে, এখন!” 
“ ক্যানো, তোমার ঘরে আসতে হলে আমাকে বুঝি চিঠি পাঠাতে হবে?” 
“ না, তা বললাম নাকি!” 
মিনা সন্দেহী চোখেই এগিয়ে এলেন। পুষ্প চিবুক গলায় ঢুকিয়ে রেখেছে। সন্দেহ আরো গাঢ় হতেই চট করে মেয়ের থুতনি ওপরে তুলে ফেললেন তিনি। পুষ্প ঘাবড়ে গেল খুব। 
ওর লাল লাল ফোলা চোখ দেখেই মিনা বুঝে গেলেন, কাঁদছিল তা। পুরু কণ্ঠে শুধালেন,
“ তুই কাঁদছিলি তাই না?” 
পুষ্প ঢোক গিলতে গিলতে বলল, 
“ না মানে,কই? না মানে কই?” 
 সাথে বুক ঢিপঢিপ করছে। আতঙ্কে মরমর অবস্থা। পিউ তক্ষুনি বলল,
“ হ্যাঁ কাঁদছিল,আম্মু। খুব কাঁদছিল!” 
পুষ্প ভয় পেয়ে গেল। পিউটা আবার বলে দেবে নাকি! চোখের ইশারায় অনুনয় বিনয় করল যেন না বলে। অথচ পিউ বলল,
“ আরে আপু,আম্মুর থেকে লুকোনোর কী আছে? এই দুনিয়ায় আম্মুর মতো আপনজন আমাদের কেউ আছে বলতো! আম্মুর মতো আমাদের ভালো আর কে চাইবে!” 
মিনা আশ্চর্য ভঙ্গিতে চেয়ে বললেন,
“ তোরা এসব বুঝিস!” 
“ ক্যানো বুঝব না? তুমিই তো বোঝো না আমাদের। বোঝোই না আমরা তোমায় কত ভালোবাসি! এইত, আপু একটা রিলসে দেখল, এক মেয়ের বিয়ে হয়ে যাচ্ছে। বিদায়ের সময় মা-মেয়ে দুজন দুজনকে ধরে কী কান্না! ওটা দেখেই তো আপুও কেঁদে ফেলল আম্মু। বলছিল,ওর যখন বিয়ে হয়ে যাবে তখন তুমিও এভাবে কাঁদবে। কষ্ট পাবে! 
তারপর আবার আমিও চলে যাব। তখন আবার কাঁদবে। কিন্তু আমি ওকে এত বার বোঝালাম, 
আমি কোথাও যাব না। বিয়ের পরেও এই বাড়ি থাকব,শুনছেই না।” 
শেষের টুকু বেশি হয়ে গেল। পুষ্প এতক্ষণ বোনকে গোলগোল চোখে দেখলেও,এইবার চটক কাটার ন্যায় চাইল সে। মিনাও ভীষণ ভড়কে গেলেন। বুঝতে না পেরে বললেন,
“ বিয়ের পরেও এ বাড়ি থাকবি?” 
পিউ থতমত খেয়ে বলল,, 
“ আমি বলতে চাইছিলাম যে,বেশি করে আসব। শ্বশুর বাড়ি কম কম যাব। নাহলে আমাদের ছাড়া তোমার তো কষ্ট হবে আম্মু।” 
মিনা গলা ঝারলেন। মুখটা গম্ভীর রেখে বললেন,
“ মোটেও কষ্ট হবে না। বরং তোরা দুটো বিদেয় হলে বেঁচে যাব আমি। আর তোর লাজলজ্জা কিছু নেই পিউ? এই বয়সে তখন থেকে বিয়ে বিয়ে করছিস। আর তোর কি কান্নাকাটির বিষয় কিছু অভাব পড়েছে? তাহলে আয়,পিঠে দুটো দিই। অন্যের বিয়ের ভিডিও দেখে কেঁদে বাড়ি ভাসাচ্ছেন উনি। 
যত্তসব….” 
মিনা আরো অনেক কিছু বললেন। বিড়বিড় করতে করতে ঘর ছাড়তেই, পিউ দুই ঠোঁট ফুলিয়ে স্বস্তির শ্বাস ফেলল। ঘামটা মুছল কপালের। বাবারে,এক জীবনে এত মিথ্যে এর আগে বলেনি। 
তক্ষুনি পেছন থেকে দুইহাত বাড়িয়ে ওর গলা জড়িয়ে ধরল পুষ্প। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলল,
“ তুই আমার সেরা বোন!” 
পিউ হাসল। মনে মনে ভাবল,
“ ইকবাল ভাইয়ের ব্যাপারটা ওকে জানতে হবে! মানুষটা তো এমন নন। জান দিয়ে ভালোবাসে আপুকে। তাহলে আজ হঠাৎ এমন করছে কেন?” 
ওর চিন্তার মাঝেই পিউয়ের ফোন টুং করে উঠল। পুষ্প ভাবল, ইকবাল ম্যাসেজ করেছে। চকিতে মাথা তুলেই মোবাইল হাতে তুলল নিজের। কিন্তু ঘটনা ভিন্ন। একটা আনসেভ নম্বর থেকে ম্যাসেজ এসেছে। কেউ লিখেছে,
“ আজ তোমাকে সাদা কামিজে শুভ্র মেঘের মতো লাগছিল প্রহর্ষা! আল্লাহ তোমায় বড্ড যত্ন নিয়ে বানিয়েছেন! যত দেখি বান্দা মুগ্ধ হয়ে যাই!” 
পুষ্পর দুই ঠোঁট ফাঁকা হয়ে বসল। তাজ্জব হয়ে চাইল বোনের দিকে। পরপর নাক ফুলিয়ে বলল,
“ কে এটা?” 
পিউ নম্বর দেখল আগে। মাথা নাড়ল দুপাশে,
“ জানি না।” 
“ জানিস না, নাকি বলবি না? সত্যি সত্যি বল,প্রেম করছিস? ছেলেটা কে? বাসা কোথায়? বাবা কী করেন?” 
“ আরে,আমি
সত্যি বলছি! চিনি না। ইদানীং প্রায়ই একেকটা আনসেভ নম্বর থেকে ম্যাসেজ আসছে জানিস আপু। দাঁড়া দ্যাখাই।”
পিউ ফোন নিয়ে একেকটা নম্বরের ইনবক্স বের করে দেখাল। সব আলাদা আলাদা সিম নম্বর। 
ম্যাসেজ গুলোর প্রত্যেকটা পুষ্প পড়ল,আর মাথায় হাত দিলো। যেন আড়ালে লুকিয়ে থাকা পিউয়ের প্রেমে কোনো দিওয়ানা সে।  
মেয়েটা যেখানে যায়,যেভাবে যায় দেখতে পায়। কখন কী করছে বাইরে,তাও জানে। 
পুষ্প হতবাক হয়ে বলল,
“ লোকটা তো তোকে ফলো করছে পিউ। এতদিন বলিসনি কেন আমাকে?” 
“ আমি নিজেও জানি না এটা একজনই কিনা। নাকি আলাদা আলাদা কেউ। চিনি না,কোনো আইডিয়াই নেই। কী বলতাম তোকে?” 
“ রাস্তাঘাটে এমন কাউকে দেখিসনি,যাকে দেখে লেগেছে, একটু সন্দেহজনক?” 
পিউ চিন্তায় পড়ল। হুট করে ওর মনে পড়ল বাঁধনের কথা। চার-পাঁচ বার ওকে কলেজ আর কোচিং-এর সামনে দেখেছিল সে। তাও দু তিন মাস আগে বোধ হয়। ও,নাকি অন্য কেউ? 
“ চল, আব্বুকে জানাই। পরে একটা বিপদ হলে!” 
“ আরেহ আপু,এসব ম্যাসেজ আরো আগে থেকে আসছে। এতদিনেও কেউ সামনে আসেনি যখন আর আসবেও না। নিশ্চয়ই দূর থেকে ফাত্রা ছেলেপেলে মজা করছে। করতে দে,ইগ্নোর। এদের গায়ে মাখলেই সমস্যা। আর আব্বু যা ঝামেলায় থাকে,প্যারা দিয়ে লাভ নেই।” 
পুষ্প তাও নিশ্চিন্ত হলো না। ওর মন বলছে এটা একজনেরই কাজ। আব্বুকে না জানাক,অন্তত ইকবালকে ও জানাবে। ওদের মান-অভিমান মিটলেই জানাবে। কিন্তু, মিটবে তো? ইকবাল আসবে তো ওর কাছে? 
**** 
নতুন বাড়ি,আর এক গাদা নতুন নতুন মুখ! মারিয়ার ছটফট লাগছিল ভীষণ। তারওপর মা-ভাইকে ছাড়া ও কোথাও কোনোদিন থাকেনি। ধূসরকে তো ভালো করে চেনেও না। হুট করে ভাইয়া পাঠিয়ে দিলো এভাবে। যদিও এ বাড়ির মানুষগুলো বেশ ভালো। কী চমৎকার তাদের ব্যবহার! কেবল ঐ একজন ছাড়া। সাদিফের কথা ভাবতেই প্রথমে সারামুখ লাল হয়ে গেল মারিয়ার। পরপর বুকটা ভেঙে এলো হতাশার তোড়ে। সাদিফ যে এখানে থাকবে মারিয়া দুঃস্বপ্নেও ভাবেনি। এখন ও কীভাবে কাটাবে কটাদিন? ওই লোকটা কী এখানে ওকে আরামে থাকতে দেবে? কোনো না কোনো শয়তানি মনে পূষছে মারিয়া নিশ্চিত। কিন্তু ও কাউকে এসব বলতেও পারবে না। ভাইয়া একটা কাজে গেছে,সেখানে এসব জানিয়ে কী লাভ! শুধু শুধু চিন্তায় রাখা হবে। মারিয়ার খুব অসহায় লাগছিল। বিপদে পড়লে বরশী গিলে ফেলতে হয় শুনেছে! নিজেরও যে কপালে এমন দূর্দশা লেখা কে জানতো! 
রাগে-শোকে ঘরের আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়ল মেয়েটা। রাত আনুমানিক সাড়ে বারোটা পেরিয়েছে তখন। ঘুমে চোখ লেগে আসতে যাবে,হুট করে জানলার খোলা কপাট এসে সজোরে বাড়ি খেলো দেওয়ালে। কলিজা ছলাৎ করে উঠল মারিয়ার। তড়াক করে শোয়া থেকে বসল উঠে। হকচকিয়ে দেখল চারিদিক। নৈসর্গিক আলোয় বোঝা যাচ্ছে,জানলা বন্ধ করেনি। ও নেমে এলো তড়িৎ। নিচ তলার গেস্টরুমের জানলায় থাই গ্লাস ছিল না। সুন্দর সুন্দর লোহার কপাট লাগানো তিনখানা। মারিয়া আটকানোর জন্যে হাত বাড়াল,কোত্থেকে সাদাটে একটা রক্তমাখা হাত এসেই খপ করে কব্জি চেপে ধরল ওর। অপ্রত্যাশিত এই ঘটনায়,মেয়েটার মেদুর মুখখানা
কাগজের মতো সাদা হয়ে যায়। হৃদপিণ্ড থমকায় মূহুর্তের মাঝে। গলা ফাটিয়ে আয়ায়ায়া বলে চিৎকার ছুড়ল মারিয়া। পিছিয়ে আসার চেষ্টা করল,টানল হাতটা। কিন্তু সেই রক্তে মাখা বিভৎস হাত ওকে ছাড়ল না। মারিয়া আরো জোরে চ্যাঁচানোর চেষ্টা করল,গলা দিয়ে আওয়াজ এলো না। ভয়ে-আতঙ্কে চেহারা পাংশুটে। বুকের স্পন্দন কমছে। আচমকা রক্তাক্ত হাতটা ছেড়ে দিলো ওকে। অপ্রস্তুতিতে ছিটকে পেছনে পড়ে গেল মারিয়া। একদম মেঝেতে থুবড়ে পড়ল বেচারি। পরপর উঠে চাইল এদিক-ওদিক। ফ্যাসফ্যাসে শ্বাস নিতে নিতে ছুট্টে গিয়ে আলো জ্বালাতে চাইল,মাঝপথেই জানলার কপাট একটার সাথে একটা বাড়ি খায় আবার। যেন ঝড় ছুটেছে। অথচ বাইরে বাতাস নেই আজ। ঠান্ডা প্রকৃতি। মারিয়ার ত্রাসে অজ্ঞান হওয়ার উপক্রম। ভূত-প্রেতের অভিজ্ঞতা ওর কোনোদিন হয়নি। এ বাড়িতে কী ভূত আছে! 
ও কাঁপা কাঁপা গলায় বলল 
“ কে? কে?” 
ভূত কি আর উত্তর দেয়! মারিয়া সাহস নিয়ে ছুট্টে সুইচবোর্ডের কাছে এলো। ঠকঠক করা আঙুল বাড়িয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে সুইচ টিপল, কিন্তু আলো জ্বলল না। ভয়ে নীল হয়ে গেল বেচারি! এই তো একটু আগেই সুইচ টিপে আলো নেভাল। হলো কী এখন? ও মরিয়া হয়ে সবগুলো সুইচ টিপল। কোনোটাতেই কাজ হলো না। ফ্যানটাও চলছে না। এসিও বন্ধ হয়ে গেছে। তক্ষুনি লাল রক্তের মতো কড়া আলো ছুটে এলো জানলার ওইপাশ হতে! 
চোখে এসে পড়তেই হাত দিয়ে মুখটা আড়াল করল মারিয়া। কাঁপতে কাঁপতে আঙুলের ফাঁক দিয়ে দেখার চেষ্টা করল ওখানে কী আছে। তক্ষুনি সেই সাদায় মোড়ানো রক্তাক্ত হাতটা জানলার গ্রীল চেপে ধরে। মারিয়া চমকে থমকে পিছিয়ে দেওয়ালে সেটে যায়। সাথে সাথে কেউ ভূতূরে গলায় হিসহিস করে ডাকে - মা রি য়া! মা রি য়া! 
মারিয়ার শরীরটা বজ্রের ন্যায় কাঁপছিল। হাতপা অবশ হওয়ার জোগাড়। তাও ঢোক গিলতে গিলতে বলল - ককে, ককে ডাককে?” 
কিছুক্ষণ চুপচাপ, নিস্তব্ধ সব। তারপরপরই বিদ্যুৎ চমকানোর মতো আচানক সাদা জুব্বায় মোড়ানো একটা শরীর জানলার ওপর হেলে পড়ল। যেন ভেঙেচুরে ভেতরে আসবে সে। এই দৃশ্য দেখার পর
মারিয়ার আর সাহস হলো না দাঁড়িয়ে থাকার। আর এক সেকেন্ড থাকলে ও নিজেই মরে যাবে। 
আয়ায়ায়ায়ায়া বলে এক ছুট্টে দরজা খুলে হাওয়ার বেগে বেরিয়ে গেল সে।  
মারিয়া শুধু পেছনে চেয়ে ছুটছিল,সামনে পাহাড় না নদী তা দেখার ফুরসত নেই। 
আর ওভাবেই একটা তুলতুলে শরীরে ধাক্কা লাগল হঠাৎ। সাথে সাথে প্লাস্টিকের কিছু একটা ছিটকে পড়ে গেল ফ্লোরে। মারিয়া কেঁপে ওঠে। ফিরে চায় উদ্ভ্রান্তের মতো। পিউ তাজ্জব হয়ে গেল ওর চোখমুখ দেখে। বড়ো উদ্বীগ্ন হয়ে বলল,
“ মারিয়াপু,কী হয়েছে?” 
চেনা একটা মুখ দেখে এতক্ষণে যেন প্রাণে পানি এলো মেয়েটার। সঙ্গে সঙ্গে পিউয়ের ছোট্ট শরীরটা জাপটে ধরল ও। দম নিতে নিতে বলল,
“ ওখানে,ওখানে কেউ, কেউ আছে পিউ। কেউ আছে ওখানে।” 
পিউ টের পেলো মারিয়া কাঁপছে। বৈদ্যুতিক শক লাগলে যেমন হয়,অমন করছে শরীরটা। ও গায়ে মাথায় হাত বোলায়। আরো ব্যাকুল হয়ে বলে,
“ কোথায়? কোথায় কে? কী হয়েছে আপু? কী হয়েছে?” 
“ ভূত আছে, তোমাদের বাড়ি ভূত আছে।” 
পিউ এই কথা এ জন্মে আগে শোনেনি। বিভ্রান্তির সাথে সাথে হোচট খেলো বিস্ময়ের। 
“ কী বলছো? ভূত প্রেত এসব হয় নাকি!” 
“ ওটা 
আমার নাম ধরে ডাকছিল,এই এই যে আমার এখানে চেপে ধরেছে। আমি, আমি স্পষ্ট দেখেছি পিউ বিশ্বাস করো।” 
  “ আচ্ছা আচ্ছা শান্ত হও শান্ত হও।” পাশের চেয়ারটা এক হাত দিয়ে টেনে আনল
পিউ। ধরে বসাল ওকে। মারিয়াকে দেখতে বিধ্বস্ত লাগছে। মাথার চুল সব এলোমেলো হয়ে লেগে আছে মুখে। ঘামে জবুথবু। ভয় পেয়েছে ভীষণ! তখনো বিড়বিড় করছে - আমি দেখেছি,আমি স্পষ্ট দেখেছি। 
পিউ এদিক-ওদিক চাইল। কাকে ডাকবে এখন? এই সময়টাতেই কেবল বাড়ির গৃহীনিরা একটু বিশ্রাম নেন। ধূসর ভাইও ফেরেননি এখনো। পুষ্পর শোকের কান্না থেমেছে কিনা ও জানে না। 
কী যে করবে! সব মিলিয়ে পিউ নিজেই  
গুলিয়ে গেল কী করবে! ওহ,সবার আগে মারিয়াকে শান্ত করতে হবে তো। 
ও খাবার টেবিলের দিকে যেতে নিলো,মারিয়া হাতটা টেনে ধরে বলল,
“ আমাকে একা রেখে যেও না, প্লিজ পিউ যেও না।” 
পিউ ঠোঁটে হাসি টেনে বলল,
“ আমি যাচ্ছি না আপু। এখানেই আছি।” 
মোমের মতো সুন্দর চোখমুখে আশ্বাস দেখে হাতটা ছাড়ল মারিয়া। পিউ পানি আনতে গিয়ে দেখল,জগ খালি। ও নিজেও নেমেছিল,বোতলে পানি ভরতে। এখন রান্নাঘরের ফিল্টার থেকে পানি আনতে হবে। জগটা হাতে নিয়ে সেদিকে এগোলো,হঠাৎ মনে হলো কোথাও একটা খটখট শব্দ হচ্ছে। আরো স্পষ্ট ভাবে শোনার চেষ্টা করল ও। শব্দটা বাড়ল ক্রমে। পিউ দু পা এগিয়ে এসে আশেপাশে উঁকি দিতেই,দেখল বাড়ির পেছনের দোর ঠেলে ঢুকছে কেউ। অমনি মেরুদণ্ড সোজা হয়ে গেল ওর। চোখজোড়া প্রকট করে ভাবল,ওটা কী আবার? সেকেন্ডে
 একটা সফেদ কাপড়ে মোড়ানো একটা বিশাল শরীর বাড়ির ভেতরে ঢুকল। ভয়ে হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেল পিউয়ের। মুঠো থেকে জগটা পড়ে গেল মাটিতে। অমনি চট করে ওই মানুষটা তাকাল এদিকে। পিউ ঠোঁট মেলতে গেল,চিৎকার দেয়ার আশায়… মানুষটা উড়ে আসার মতো করে পেছন থেকে ওর মুখ চেপে ধরল অমনি। হড়বড় করে বলল, 
“ আমি, আমি চ্যাঁচাস না!” 
কণ্ঠ শুনে পিউ বুঝল এটা সাদিফ। আরো আশ্চর্য হলো এবার। চোখ মারবেল করে আপাদমস্তক দেখল ওর। গায়ে জুব্বার মতো পাঞ্জাবিটা সেজো চাচ্চুর বোধ হয়। মাথা চাদরে মোড়ানো। হাতের গ্লাভসে লাল লাল কী যেন লেগে! এ কেমন বেশভূষা? 
জগ পড়ার শব্দ পেয়ে মারিয়া উঠে এসেছিল। তারপরের দৃশ্যে চোখ ফেটে বেরিয়ে এলো তার। ঐ সাদা ভূতটা পিউকে চেপে ধরে আছে। অতি আতঙ্কে মারিয়ার মাথা সুদ্ধ বিকল হলেও, মনে হলো আগে পিউকে বাঁচানো উচিত। দোয়া পড়ার জন্যে গলায় শব্দভাণ্ডার শূন্য। ও হন্যে হয়ে তাকাল চারিপাশে। শেষে ধড়ফড় করে রান্নাঘরের দিকে ছুটল। ঐ ছুটন্ত পায়ের আওয়াজে পিউ-সাদিফ ওইভাবেই তাকাল সেথায়। সাদিফ পরিষ্কার করে বুঝল না ব্যাপারটা। চোখে চশমা নেই। দেখছেও আবছা। তবে বুঝল কিছু একটা দৌড়ে গিয়েছে। বিড়বিড় করল,
“ ওটা কী পুষ্প?” 
এরপরই শব্দ হলো সামনে। দুজন আবার ফিরল সেদিক। সদরের দোরে চাবি ঘুরিয়ে মাত্রই ভেতরে এসেছে ধূসর। দরজা চাপিয়ে ফিরতেই বেখেয়ালি নজর অদূরের মুখোমুখি পড়ল। অমনি থমকে দাঁড়িয়ে গেল সে। 
জুব্বায় প্যাঁচানো কেউ একজন,পিউয়ের মুখ চেপে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। ধূসরের তামাটে মুখায়ব বিবর্ণ হয়ে গেল অমনি। বাড়িতে কি কেউ হামলা করেছে? ধূসর পাথরের মতো শক্ত হয়ে জায়গায় গেড়ে রয়। ওইভাবেই চোখের মণি ডানে ঘুরিয়ে চাইল,পরেরবার বামে। বোঝার চেষ্টা করল,সাথে দলবল এসেছে কিনা! অন্যদিকে সাদিফ বলদ বনে গেছে। একই সময় বাড়ির এত মানুষ নিচ তলায় থাকে ওর জানা ছিল না। 
অদূরের পুরুষকে ঝাপসা দেখলেও,দৈহিক গঠনে ও নিশ্চিত এটা ধূসর ভাই-ই হবে। এরকম বডিশডি এ বাড়িতে ধূসরেরই আছে। কিন্তু এখন ও কী করবে? গুলিয়ে চড়িয়ে যাওয়ায় ছেলেটা ভুলেই গেল পিউয়ের মুখটা চেপে রাখার কথা। নির্বোধের মতো চেয়ে রইল শুধু। আর এত জোরে ধরেছিল,পিউ নিজেও ছাড়াতে পারল না। বড়ো বড়ো দৃষ্টি জোড়া নেড়ে উম,উম করল। ধারালো চোখদুটো মেলে একভাবে তাকিয়ে রইল ধূসর। ওইভাবে খুব সন্তপর্ণে ওর হাতদুটো প্যান্টের পেছনের হোলস্টারে ঢুকল। ইস্পাতের তৈরি যন্ত্রটা ধরে এক টানে বের করল,তক্ষুনি ওপাশে দ্রিম করে উঠল কোনো কিছু। হতবুদ্ধি হয়ে গেল ধূসর। তার চেয়েও বেশি চমকাল পিউ। সেই সাথে টলমল হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে গেল সাদিফ। হতভম্বতায় দুইহাত তুলে নিজের মুখ চেপে ধরল পিউ। বিকট চোখ ঘুরিয়ে পিছু ফিরে চাইল। পিতলের কড়াইটা হাতে নিয়ে হিঁসহিঁস করে শ্বাস নিচ্ছে মারিয়া। হাঁপাচ্ছেও খুব। ত্রস্ত বেগে দুই হাঁটুগেড়ে সাদিফের কাছে বসে পড়ল পিউ। চাদর টাদর সরিয়ে গাল চাপড়ে ডাকল,
“ ভাইয়া,সাদিফ ভাইয়া!” 
বসার ঘরে ছোট্ট একটা বাজ পড়ল সবেগে। সাদিফের চেহারা দেখে ভড়কে গেল ধূসর। ছুটে এলো সে। মারিয়ার চোয়াল ঝুলে পড়ল দুহাত। গোল চোখে জিভ কাটল ও। বাড়িময় ঝকঝকে আলো জ্বলে উঠল তখনই। এত শব্দে সবার ঘুম ছুটে গেছে। যে যেভাবে পারছে,সিঁড়ি বেয়ে নামছে দ্রুত। কী হয়েছে কী হয়েছে রবে ভরে গেছে লিভিংরুম। মারিয়া পানসে মুখটা আরো মলিন হয়ে গেল। চট করে ওরনার নিচে কড়াই লুকিয়ে ফেলল সে। ঢোক গিলে চাইল সাদিফের দিকে। এক বাড়িতে অজ্ঞান হয়ে গেছে ছেলেটা। কেমন লটকে পড়ে আছে মেঝেতে। ধূসর ওর মুখে পানি ছেটাচ্ছে,ডাকছে। পিউয়ের চোখ টলমল। ভাইয়া, ভাইয়া করতে করতে কণ্ঠে বুজে যাচ্ছে। মারিয়া ভয়ডরে চুপসে গেল। কাঁদোকাঁদো চোখে ভাবল,
  “ সাদা মূলাটা কি ওর এক বাড়িতেই মরে গেল? একটা খুন করে ফেলল ও! 
হায় আল্লাহ, এখন এরা না ওকে আবার জেলে ভরে দেয়! 
ভাইয়ায়ায়ায়ায়া….” 
চলবে…

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২৪তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন