#জোনাকি_প্রদীপ (পর্ব ২২)
নুসরাত জাহান লিজা
নিজের দলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে আজমল খানকে নিয়ে এক ধরনের অনাস্থা তৈরি হয়েছে। এটা তিনি বুঝতে পারেন। দু র্নী তিসহ বিভিন্ন অনৈতিক ইস্যুতে তার নাম সরাসরি জড়িয়ে প্রকাশ্যে আসায় দল বিব্রত এখন। বস্তির বস্তা বন্দী টুকরো লা শ নিয়ে বিষয়টা ধামাচাপা দিলেও তাতে জনতার আঙুল যে তার আর তার ছেলের উপরে, তা প্রকাশ্য। তার মধ্যে ইন্ধন জুগিয়েছে রবিনের নিখোঁজ হওয়া।
সবমিলিয়ে তার অবস্থা টালমাটাল। তিনি যেকোনো উপায়ে নিজের হারানো ইমেজ পুনরুদ্ধার করতে মরিয়া। এখন সবচাইতে গলার কাঁটা হয়ে বিঁধে আছে আফনান নামের ছেলেটা। রবিনকে সরিয়ে দিয়ে এর শোধ তিনি তুলবেন বলে ঠিক করলেন। নির্বাচন শেষ হলে এই ছোকরাকেও তিনি দেখে নেবেন। হাঁটুর বয়সী একটা ছেলে, যার কোনো শক্ত ব্যাকআপ পর্যন্ত নেই। অথচ মেরুদণ্ড টনটনে সোজা।
আজমলের বয়স হয়েছে, অভিজ্ঞতায় পরিপূর্ণ একজন মানুষ। তার চুল দাড়ি বাতাসে পাকেনি। একে ঝাড়ে-বংশে নির্মূল করে তবে তিনি থামবেন। এভাবে এত সাহস যারা তার সাথে দেখিয়েছে, তাদের তিনি কড়ায় গন্ডায় বুঝিয়েছেন, আজমল খান আসলে কে।
হুইস্কির গ্লাসে আয়েসি চুমুক দিতে দিতে আগাগোড়া ভাবছিলেন, তখনই আরিফের কল এলো।
"বাবা, একটা গণ্ডগোল হয়েছে।"
"এটা ছাড়া আর কোনো সংবাদ দেবার মুরোদ তো তোমার নাই। বলো, শুনি কী গণ্ডগোল!"
"ওই রবিন যে স্বীকার করছিলো, ওর কাছে ভিডিও ক্লিপ আছে, ওইটা এখন ওর শালা না সৌম্বন্ধি, তার কাছে আছে। মনির খবর দিল।"
"ওর সাথে কথা হইসে তোমার?"
"না আব্বা, আপনেরে আগে জানাইলাম।"
"ভালো। ওই ছোকরার নম্বর দাও।"
ফোন কাটার প্রায় ত্রিশ সেকেন্ডের মধ্যে টেক্সট মেসেজে নম্বর চলে এলো আফনানের। তিনি গ্লাসের পানিয়তে শেষ চুমুক দিয়ে ডায়াল করলেন।
"ওই ছোকরা, তোমার কাছে যা আছে, চুপচাপ ফেরত দাও।"
"আপনি কে? কী ফেরত দেবার কথা বলছেন?"
"আমি আজমল খান। বেশি চালাকি করার চেষ্টা করবা না।"
"সেটা আপনাদের ডিপার্টমেন্ট। ধোঁকা দেয়া, আমার নয়।"
"কথা প্যাঁচাবি না, হা রা ম জা দা। তুই বুঝস না?"
তিনি ভব্যতার ধার ধারলেন না এবার। ঠান্ডা ইমেজ পরিহার করলেন।
"বুঝলাম, খুব ভালো মতো বুঝলাম।"
"আজকের মধ্যে ওইটা ফেরত দিবি। নাইলে তোর বোন জামাইরে আর দেখবি না।"
"আমাকে আপনি যত বোকা মনে করেছেন, ততটা বোকা কিন্তু আমি নই। শুনুন, ওই জিনিসটা আপনাদের কাছে এখন প্রাণভোমরার মতো। সেটা আমি জানি। এটা পেলেও রবিনকে ছাড়ার মতো উদার মন আপনার নেই। তাই চলেন, একটা অন্য পলিসিতে হাঁটি। গিভ এন্ড টেইক। রবিনকে অক্ষত অবস্থায় ছাড়বেন। এই জিনিসটা পেয়ে যাবেন। তখন আমার আপত্তি থাকবে না।"
"ওই বা** বাচ্চা, তুই দিবি, নাইলে পস্তাবি।"
"হতাশ হলাম। এসব ভাষা আপনার মুখে শোভা পায় না। আপনি একজন জনপ্রতিনিধি। এই রূপটা দেখলে লোকের আস্থা থাকবে?" গা জ্বালানো হাসির সাথে আফনানের এমন কথায় মেজাজের পারদ কয়েক সেন্টিগ্রেড চড়ল আজমলের।
"ছোকরা, বেশি বাড়লে কিন্তু…"
"সেটা আপনার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য স্যার। শুধু পেতে চাইলে তো হবে না, কিছু না দিলে ওমন একটা জিনিস যে আমি হাতছাড়া করব না।"
"তোর কাছ থেকে ওইটা হাতাইতে বেশি সময় লাগব না আমার।"
"আপনি তো বোকা নন স্যার। সেটা আরও অনেক জায়গায় আছে, আমার বা রবিনের কিছু হলে সাথে সাথে ওই ভিডিও পাবলিক হয়ে যাবে, প্রেস, সোস্যাল মিডিয়া সব জায়গায় আপনার মুখোশ খুব সুন্দরভাবে খুলে যাবে। সওদা করতে রাজি হলে আমিও রাজি।"
আজমল খান অতিশয় ধূর্ত মানুষ, পরিস্থিতি বুঝতে তিনি সময় নেন না। এবার তাই নরম গলায় বললেন,
"ঠিক আছে। রবিনরে ছাড়ব। কিন্তু তোমার কাছে আরও যে অনেক জায়গায় সেভ থাকবে না, তার গ্যারান্টি কী?"
"আমি আপনাদের মতো নই। ছা-পোষা মানুষ। রবিনরে অক্ষত পেলে, ওই ক্লিপের আর কাজ কী আমার। আমি ডিলিট করে দেব।"
"আচ্ছা, আগামীকাল রাত তিনটায়। রেডি থেকো ছোকরা।"
"একটা ছোকরাকে ভয় পাচ্ছেন? তাহলে বলতে হয় আমি ছোকরা নই, তাই না স্যার?"
আজমল খান কল কাটলেন। এভাবে ঘোল তিনি খাবেন না, প্ল্যান বি রেডি রাখতে হবে। প্রমাণ আর দুই স্বাক্ষী সবই যেন ঠান্ডা হয়। তিনি হারতে জানেন না।
***
আফনান ভেবেছিল হয়তো আরিফ ওকে ফোন করবে কিংবা দেখা করবে। কিন্তু আজমল খান স্বয়ং কথা বললেন। কথা বলার সময় হু ম কি তে সে ভয় পেয়েছে, কিন্তু এসব মানুষের সামনে দুর্বলতা দেখাতে নেই। তাই স্নায়ু শক্ত করে তার মোকাবিলা করেছে।
আফনান আরেকটা জিনিস নিশ্চিত হলো, মনিরকে বিশ্বাস করা যায় না। মনিরকে পেনড্রাইভের কথা বলার পেছনে আফনানের দুটো কারণ ছিল। এক, মনিরের বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাই করা। দুই, জিনিসটা যে ওর কাছে এটার জানান দেয়া। তাতে ওদের পরবর্তী পদক্ষেপ সে জানতে পারবে।
প্রথমটা যদি পজিটিভ হতো, তাহলে চালটা অন্যভাবে দিতে হতো। যাই হোক, এত সহজে যে ওরা হাল ছাড়বে না এটা তো সহজেই অনুমেয়। প্রথম চাল দেয়া হয়ে গেছে। এবার ওর লোকবল লাগবে। এই বাজি জিততেই হবে। কারণ এতে জীবন জড়িয়ে আছে। ওর, রবিনের, ওর পরিবারের, সাথে একটা অনাগত নিষ্পাপ শিশুর।
আফনান বাসায় আসতে আসতে মাথায় এক আকাশ অনিশ্চয়তার খেলা চলছিল। আকাশে আজ এই মেঘ এই রোদ্দুর। ঠিক ওর মনের মতো।
বাসায় কলিংবেল বাজানোর মিনিটখানেক সময় লাগল দরজাটা খুলতে। তবে দরজার ওপাশে যাকে দেখল, তাকে দেখবার আশা সে দূরতম সুখ স্বপ্নেও এখন ভাবেনি।
অস্ফুটস্বরে নামটা মুখ দিয়ে বেরিয়ে এলো, "নীরা…"
…….
ক্রমশ