এলিন রাজি?
'আপত্তি করবে না।'
'জিজ্ঞেস করা হয়েছে তাকে?'
স্বর্ণা ফোঁস করে নিশ্বাস ছেড়ে বললো, আমার মেয়ে! আমি জানি তাকে।
প্যান্টের পকেটে দুইহাত গুঁজে লম্বা চওড়া বলিষ্ঠ লোকটা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো স্বর্ণার দিকে। কিছুক্ষন মৌনতা করে জিজ্ঞেস করলো, মেয়ে আপনার অনেক বাধ্য?
স্বর্ণা গৌরবোজ্জ্বল হাসি হেঁসে বললেন, কোনো সন্দেহ নেই।
এ পর্যায়ে নাফিজ একটু হেঁসে বললো, তবে বিয়ের পর স্বামীর বাধ্য বউ হবে মনে হচ্ছে!
'আমার মেয়ে আদব কায়দা জানে নাহিয়ান!' ওদিক নিয়ে চিন্তা করতে হবে না তোমাকে।'
'তাহলে চিন্তার দিক কোনটা?'
স্বর্ণা চৌধুরী ব্রু কুঁচকে নাফিজের দিকে তাকিয়ে কিছু সময় চিন্তায় মগ্ন রইলেন। এরপর শান্ত কন্ঠে উদাস ভঙ্গিতে বললেন, 'আমার মেয়ে একটু চাপা স্বভাবের। প্রকাশ করার প্রবনতা ওর মধ্যে নেই বললেই চলে। দুঃখ কষ্ট হাসি আনন্দ শখ আহাল্দ কোনো কিছুই সে প্রকাশ করে না। বুঝে নিতে হয়। আমি বুঝে নে-ই। তুমিও বুঝে নিবে আশা করি।
নাফিজ গর্বের সঙ্গে বুক ফুলিয়ে বললো, আপনি এলিনকে কড়া শাসনে বড় করেছেন বিধায় সে আপনার কাছে প্রকাশ করতে ভয় পায়। নিজেকে আড়াল করে রাখে।
আমি তো আপনার মতো শাসন করবো না নিশ্চয়ই।
'শাসন করা উচিৎ নাহিয়ান।'
' শাসন তাদের করতে হয় যারা বেয়াদব। আপনিই তো বললেন এলিন খুব আদাবের সহিত চলাফেরা করে।'
স্বর্ণা চৌধুরী মিয়িয়ে আসলেন। নাফিজকে যতটা আলাভোলা হবে ভেবেছিলেন ততটাও নয়। সে খুবই ধূর্ত। স্বর্ণা এমনই একজন ধারালো মানুষ চেয়েছিলেন তার মেয়ের জন্য।
কথার প্রসঙ্গ পাল্টে স্বর্ণা চৌধুরী বললেন, তোমার মায়েদের সম্পর্কে জানতে চাই?
নাফিজের দৃষ্টি তখন কিছুটা দূরে। তারা বড় লম্বা লাগোয়া বারান্দায় দাঁড়িয়ে। নাফিজ কিছুটা স্বর্ণার দিকে ঘুরে দাঁড়ালো। সরাসরি তাকিয়ে বললো, 'আপনাকে তো বুদ্ধিমান বলে জানি। তাহলে বোকার মতো প্রশ্ন করছেন কেনো?'
স্বর্ণার ইগো হার্ড হলো। সে চোখ বড় বড় করে তাকালো। ধারালো কন্ঠে বললো, বোকার মতো মানে? বেয়াদবী হয়ে গেলো না?
'নাহ একদমই বেয়াদবী নয়। আর বেয়াদবী হয়ে গেলেও ক্ষমা করবেন। তবে আপনি যে-ই প্রশ্নটা করলেন। একই প্রশ্ন আপনার সন্তানকে করলে তার উত্তরটা কি আসতো বলে আপনি মনে করেন মিসেস স্বর্ণা চৌধুরী ওরফে শাশুড়ী আম্মা!
'কি বলতে চাচ্ছো নাহিয়ান? পরিষ্কার করে বলো।
'বলতে চাচ্ছি আপনি আমার মায়েদের সম্পর্কে সব জেনেও আবার আমাকে সিক্রেট কুয়েশ্চন করেছেন। আই মিন তাদের সম্পর্কে সিক্রেট কোনো কিছু জানতে চাচ্ছেন। লাইক তাদের ভালো মন্দ স্বভাব নিয়ে। কিন্তু আপনার কি মনে হয় কোনো সন্তান তার মায়ের দোষ চর্চা করে?
অস্ফুট স্বরে স্বর্ণা বললো, আমার সন্তানরা বোধহয় করে।
নাফিজের কর্ণগোচর হলো কথাটা। সে একটু থেমে বললো 'হয়তো এটাও আপনার ভুল ধারণা কিংবা আপনি তাদের সাথে এমন কিছু করেছেন যেটার জন্য তারা আপনাকে অপছন্দ করে। কিন্তু আমি এই ধারণাতে বিশ্বাসী নই। কারণ কোনো মা তার সন্তানের খারাপ চায় না। আপনিও চান নাই। তেমনি ভাবে আমার মায়েরাও আমার খারাপ চাইতেই পারে না। উনারা আমাকে অসম্ভব স্নেহ আর ভালোবাসেন। নিসন্দেহে উনারা আমার নিকট প্রিয়পরিজন। কিন্তু সে-ই উনারাই আপনার মেয়ের জন্য কতটা কল্যাণকর হতে পারবে, আপনার মেয়ের মা হয়ে উঠতে পারবে কিনা! আপনার মেয়েকে আমার মতোই ভালোবাসতে পারবে কিনা সেটার গ্যারান্টি আমি দিতে পারছি না। কারণ উনারা আমার মা। আপনার মেয়ের মা নয়। মা হওয়ার চেষ্টা করতে পারে কেবল।
স্বর্ণা চৌধুরীর বুকটা কেমন হালকা হয়ে আসলো। ঠিক এমন ভাবে বুঝবে,বাস্তবতা জানবে, মানবে।এমন একটা মানুষই তিনি মেয়ের জন্য চেয়েছিলেন। আর শাশুড়ী? হ্যাঁ এটাতেও সমান ভাবে জোর দিয়েছিলেন। তবে আশা করা যায় এই সমন্ধটাই পারফেক্ট।
স্বর্ণা এবার কথাবার্তা গুছিয়ে আনলেন। দ্রুতই সমাপ্তি ঘটবে। বিদায় নেওয়ার আগে আরও একবার পিছন ফিরে নাফিজকে অকপটে জিজ্ঞেস করলেন 'আর তুমি ভালোবাসবে তো আমার মেয়েকে? বুঝবে তো তাকে?
নাফিজ নিশ্বাস ছাড়লো, বুক ফুলিয়ে বললো 'আপনার মেয়েকে ভালোবাসা আমার পবিত্র দায়িত্ব শাশুড়ী আম্মা। চিন্তা করবেন না। আমি ছাড়া পৃথিবীতে অন্য কেউ রবে না যে তাকে বুঝবে। একমাত্র আমিই তাকে বুঝতে চাই।
স্বর্ণা চৌধুরী হাফ ছাড়লেন। মনে হচ্ছে বিশাল বড় একটা দায়িত্ব নিজ কাঁধ থেকে অন্য কারো কাঁধে দিয়ে এবার নিশ্চিতে ঘুমাতে পারবে একজন মেয়ের মা।
_________
'কি নিয়ে ঝামেলা করলে ক্লাসে?'
তাশফিয়া ফোন স্ক্রিনে তাকিয়ে খাবার চিবাচ্ছিলো। মেহনাজের প্রশ্নে মাথা নিচু রেখেই বললো, 'ক্লাসে একটা স্মার্ট ছেলে আছে বুঝলে! ওই ছেলেকে নিয়ে যত সমস্যা।'
'কি সমস্যা?'
তাশফিয়া ফোনে মগ্ন। মেহনাজ বিরক্ত হলো। একে তো খাবারের প্লেট সামনে নিয়ে বসে আছে। তারউপর প্রশ্নের ঠিকঠাক জবাব দিচ্ছে না।
'ফোনটা রাখো তাশফু।খাওয়ার সময় ফোন দেখা আম্মু একদম পছন্দ করেন না।'
'আম্মু তো দেখতেছে না আপু এতো চাপ নিও না তো।'
'আম্মু এলো বলে।' এসেই কষিয়ে থাপ্পড় মারবে।'
'বললেই হলো? আমাকে থাপ্পড় মারতে পেরেছে আজ অব্দি?'
'তোমাকে নয়! আমাকে মারবে।'
'কেনো?তুমি কি করলে?'
'এই যে আমার সামনে বসে ফোন দেখছো আর খাচ্ছো। আমাকেই দোষ দিবে! বলবে আমি কেনো তোমাকে শাসন করিনি।'
তাশফিয়া ফোনটা রেখে দিলো। আরেকটা লোকমা মুখে পুড়ে নিয়ে বললো, 'ছেলেটা অনেক সুন্দর! আমাদের ক্লাস টপার অর্পাকে চিনো তো?
'হুম! ভীষণ মেধাবী।'
'ধূর! ওর প্রশংসা করবা না একদম। আমি নিতে পারিনা ওকে। অর্পা পারে না ওই ছেলেকে কোলে বসিয়ে রাখে।' বিরক্তিকর!
'কোলে বসিয়ে রাখে মানে?'
'আরে বুঝো না? মানে ওই ছেলে, সাদমান। ক্লাসের সবাই ছেলেটার উপর ক্রাশ খেয়েছে।' সবাই আহাল্দ করে তাকে। অর্পা সব সময় ওর সাথে ঘেঁষে থাকে। অন্যদের মিশতে দেয় না। কথা বললেও পছন্দ করে না। টেনে নিজের কাছে নিয়ে যাবে যেকোনো বাহানায়।
'বাচ্চা ছেলে নাকি? এরকম টানাটানি করার কি আছে?'
'বাচ্চা নয়! আমাদের দুই ইয়ার সিনিয়র সে। ইন্টারে দুই বছর গ্যাপ গিয়েছে তার।'
'এই ফেলটুসকে নিয়ে এতো আধিখ্যেতার কি আছে?'
'ফেইল করেনি আপু। তার নাকি সমস্যা হয়েছিলো তাই এসএসসির পর ইন্টারে আর এডমিশন নিতে পারেনি।
'যাইহোক! এসব নিয়ে আর ক্যাচাল করবে না। পড়াশোনায় মনোযোগী হও! নতুন নতুন কলেজে উঠলে এসব একটু আকটু হয়।'
তাশফিয়া কিছু বলতে যাবে ওমনি স্বর্ণা চৌধুরী বাসায় ফিরলেন। হাতের ব্যাগটা সোফায় ফেলে রেখে চেচিয়ে ডাকলেন, 'মেহনাজ! মেহনাজ! এদিকে আসো।
মেহনাজ দ্রুত হাত ধুয়ে উঠে পড়লো। তাশফিয়া তড়িঘড়ি করে ফোন লুকিয়ে রেখে দিলো রুমে।
বসার ঘরে হাশেম বাহাদুর, স্বর্ণা চৌধুরী বসে আছেন। মেহনাজ শান্ত ভাবে প্রবেশ করতেই স্বর্ণা বললেন, 'তোমার বোন কোথায়? তাকেও ডাকো। বাসায় মানুষই তিন চারজন। সবাইকে একসাথে নিয়েই আলাপ হবে।
তাশফিয়াও উপস্থিত হলেন। স্বর্ণা বড় মেয়ে মেহনাজকে কাছে ডেকে পাশে বসালেন। পিঠে আহাল্দের হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, বিয়ের পাকা কথা বলে এসেছি।
'ওয়াওও সত্যি আম্মু? বিয়ে কবে তাহলে?'
স্বর্ণা তাশফিয়ার দিকে তাকিয়ে কড়া কন্ঠে বললেন, আলহামদুলিল্লাহ পড়তে হতো। ওয়াওও নয়।'
তাশফিয়া বিরবির করে পড়লো, আলহামদুলিল্লাহ।
স্বর্ণা মেহনাজের উদ্দেশ্যে জিজ্ঞেস করলো, তোমার কোনো আপত্তি নেই তো?
'আমার কিসের আপত্তি থাকবে আম্মু? '
'সেটাই তো! আজ অব্দি আমার কোনো সিদ্ধান্তে তোমার আপত্তি ছিল না সে আমি জানি। এ জন্যই তো তোমাকে আমার লক্ষী মেয়ে বলি।'
তাশফিয়া বেশ উৎসাহ নিয়ে বললো, 'তারপর ওদের সম্পর্কে কিছু বলো আম্মু?'
স্বর্ণা এবার রাগ দেখালেন না। হাসি মুখে বললেন, 'ছেলে তো দেখেছো তোমরা। নাহিয়ান নাফিজ! বেশ বুদ্ধিমান ছেলে।
'আর ভাই বোন নেই? ফ্যামিলি কত বড় ওদের?'
'একটা বোন আছে। নাহিয়ানের বড় বোন। বিবাহিত কিন্তু মির্জাদের বাড়িতেই থাকে। ফ্যামিলিতে নাহিয়ানের দুই মা আর এই বোনই থাকেন।'
তাশফিয়া কৌতুকের স্বরে বললো, 'দুই মা কেন আম্মু?'
এরকম প্রশ্ন স্বর্ণার তেমন পছন্দ হলো না বোধহয়। অসন্তুষ্টের স্বরে বললেন, দুটো বিয়ে করেছে বিধায় দুই মা হয়েছে নাহিয়ানের।'
'তাহলে নাফিজ ভাইয়ার আসল মা কোনটা হবে?'
'একটু বেশি প্রশ্ন করছো তাশফিয়া! বেয়াদবীর একটা সীমা আছে।'
আচমকা স্বর্ণার ধমকে মেয়েটা কেঁপে উঠল। তাৎক্ষণিক মাথা নিচু করে নিলো তাশফিয়া।
মেহনাজ এতোক্ষণ নিরব ভূমিকা পালন করলেও এবার নড়েচড়ে উঠে বললেন, আমি তাহলে এখন যা-ই আম্মু? পরে দরকার হলে ডেকে নিয়েন।'
'হ্যাঁ যা-ও! আর শুনো নাহিয়ান তোমার নাম্বার রেখেছে। তাকে রেসপন্স করবে বুঝছো?'
দুহাত কচলাতে থাকা মেহনাজের মাথা কেমন ভনভন করছে। হাত দুটোও কেমন কাঁপছে যেনো।এখন আর রুমে যেতে ইচ্ছে করছে না। মনে হচ্ছে এখানেই থেকে যাক। রুমে গেলেই তো দেখবে ওই মফিজ নামক হনুমান কল বা টেক্সট দিয়েছে। তখন মেহনাজ কি বলবে? আদোও কথা বলতে পারবে সে? ভাবতেই তো অস্বস্তি হচ্ছে। এমনটা হওয়ার তো কথা ছিল না। ফোনে টেক্সট বা কল আসলে সেটার রেসপন্স করা অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু এই লোকের বেলায় সব যেনো তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে।
মেহনাজ শান্ত পায়ে কিছুটা ভয়ে ভয়ে রুমে প্রবেশ করলো।যেনো নিজেরই রুম আজ ভূতেদের দখলে।
রুমে ঢুকতেই দখিনা ধমকা হাওয়া এসে হৃদয় শীতল করে দিলো। হুট করে প্রচন্ড শীত শীত লাগছে যেনো। অথচ নাকের ডগায় শিশির বিন্দুর মতো ঘাম ঝরছে। মেহনাজ আশ্চর্য হয়ে ভাবতে লাগলো এ কেমন অনুভূতি! এই অনুভূতি তো আগে কখনো অনুভব করেনি সে।
বালিশের উপর ফোনটাতে টুংটাং করে নোটিফিকেশন এর আওয়াজ পেতেই সমস্ত শরীর কেমন কেঁপে উঠল মেয়টার। ফোনের কাছে যাবে সেই শক্তিটুকু যেনো পায়ে নেই। মনে হচ্ছে কেউ টেনে ধরে রেখেছে।
ফোনটা হাতে নিতেই দেখলো আননোন নাম্বার থেকে টেক্সট আসছে —
'আমার পরান! বিবাহের প্রস্তুতি নেন!
আমার রাজপ্রাসাদে আপনার আগমনের শুভেচ্ছা জানাচ্ছি।
অজানা শিহরণে মেহনাজের চোখ চিকচিক করে উঠলো। ঠোঁটে অদ্ভুত হাসি। এ কিসের হাসি, আনন্দের নাকি অন্য কোনো অনুভূতির.....!
চলবে.........
#ছলেবলে_কৌশলে
#পর্ব ০৬
#মাকামে_মারিয়া