#ছলেবলে_কৌশলে
#পর্ব ১২
#মাকামে_মারিয়া
ফরিদপুর জেলা সদরে কানাইপুর এলাকায় নাফিজদের বাড়ি। মির্জা বাড়ি নামে বেশ নামডাক রয়েছে তাদের। এর মধ্যে আজকে আবার মির্জা বাড়ির মেঝো ছেলে নওয়াজ হাসানের একমাত্র ছেলের বিয়ে। সারা পাড়ায় হৈহৈ পড়ে গিয়েছে।
মাগরিবের কিছুক্ষন আগেই মির্জা বাড়ির চৌকাঠে পা রেখেছে এ বাড়ির নববধূ মিসেস নাহিয়ান মির্জা। নাহিয়ান নাফিজের একমাত্র বিয়ে করা বউ মেহনাজ চৌধুরী এলিনা।
বড় বাড়ির বড় বৈঠক খানা, নাফিজকে কেউ পাত্তা দিচ্ছে না। পাড়া প্রতিবেশী থেকে শুরু করে আত্মীয়স্বজন সবার মধ্যে নতুন বউ দেখার খুব তাড়া। কার আগে কে দেখবে। মেহনাজ নির্বাক, নিজেকে নতুন বউ কম রোবট বেশি মনে হচ্ছে। এই যে এতো এতো হৈ-হুল্লোড়, শব্দ দূষন এতে মেহনাজের কোনো অনুভূতিই হচ্ছে না। কেবল মায়ের বিষন্ন চেহারাটা বার বার মনে পড়ছে।
মায়ের বড় মেয়ে মেহনাজ, মায়ের শাসন যেমন বেশি পেয়েছে তেমনি মায়ের আদর স্নেহ আর ভালোবাসাও মেহনাজের জন্য বেশিই ছিল। তবে মা একটু বেশি কড়াকড়ি ছিল বিধায় মাঝে মাঝে খুব অভিমান হতো। মনে হতো মা আমাকে ভালোই বাসে না। কিন্তু এই যে মা'কে ছেড়ে চলে আসলো। এখন খুব করে মনে পড়ছে। চোখ বেয়ে বার বার নোনা জলের বৃষ্টি ঝড়ছে।
এদিকে স্বর্ণা চৌধুরী সারা বাড়িতে মেয়ের শোকে কাতরাচ্ছে। মেয়ের বিয়ে নিয়ে কত আশা ছিল তার। আজ মেয়েকে বিদায় দিয়ে কেমন অসহায় লাগছে যেনো। বিদায়ের সময় মা মেয়ে টু শব্দটি অব্দি করতে পারেনি। কেবল জড়িয়ে ধরে ছিল বেশ খানিকটা সময়। আজিমউদ্দিন যখন এগিয়ে এসে বললো, স্বর্ণা ছাড়ো এবার।মেয়েকে বিদায় দিতে হবে যে।
তখন স্বর্ণা কেবল অসহায় কন্ঠে বলেছিলো, আরেকটু জড়িয়ে রাখি আমার মেয়েটাকে।
আজিমউদ্দিনের চোখেও পানি। এই ভদ্রলোক কাজের সূত্রে সব সময় বাড়ির বাহিরে থাকেন। মাসে যে ক'বার বাড়িতে আসেন ততবারই মেয়েগুলোকে বড্ড আদরে রাখেন। তাছাড়াও দূর থেকে যতটা সম্ভব মেয়েদের প্রতি সুনজর রাখনে। কিন্তু তাও কোথায় যেনো একটা শূন্যতা রয়েই গিয়েছে। সেটা বোধহয় স্বর্ণা নিজে। স্বর্ণা চৌধুরী ভীষণ একরোখা আর বদমেজাজি নারী হওয়ায় আজিমউদ্দিনের সাথে তার একটা ফারাক রয়ে গিয়েছে। সেই ফারাক স্বর্ণা মেয়েদের সাথেও অদৃশ্য ভাবে বেঁধে দিয়েছেন। যে কারণে আজিমউদ্দিন মেয়েদের দিকে তাকালে বিশেষ লজ্জিত অনুভব করেন।
স্বর্ণা বেশ কয়েকবার কল দিয়েছে নাফিজের কাছে। নাফিজ প্রতিবারই শাশুড়ীকে শান্তনা বাণী শুনিয়েছে। মেয়েকে দেখে রাখবে।
তাসফিয়া এসে মায়ের পাশে বসে ডাকলো, আম্মু!
তাসফিয়া একটু দুষ্ট প্রকৃতির হওয়ায় স্বর্ণা ততটাও পছন্দ করে না এই মেয়েকে। যদিও মেয়ে হিসেবে কম ভালোবাসেন তেমনটা কিন্তু নয়। দুই মেয়ের মধ্যে মেহনাজ ছিল শান্তশিষ্ট আর লক্ষী মেয়ে। তাসফিয়া দুষ্ট আর স্বর্ণার মতোই একরোখা স্বভাবের। স্বর্ণা মেয়েকে কাছে টেনে নিয়ে জিজ্ঞেস করলো, বোনকে মিস করছো?
তাসফিয়া বিষন্ন মুখে মায়ের হাঁটুতে মাথা রাখলো। মুখে কিছু বললো না। কিন্তু সত্যি এটাই যে শান্তশিষ্ট একটা মেয়ে বাড়ি থেকে চলে যাওয়াতেও বাড়ি এতো ফাঁকা ফাঁকা লাগতে পারে সেটা তাসফিয়ার জানা ছিল না। বোনকে ভীষণ মিস করছে। কত কটুকথা আর কত জেদ দেখিয়ে ফেলতো মেহনাজের সঙ্গে। কিন্তু মেহনাজ মোটেও রাগ দেখাতো না। খুব বেশি হলে চুপচাপ সরে পড়তো।
মালাইকা মেহরিমাকে সাথে নিয়ে বাড়ি চলে গিয়েছে মেহনাজের বিদায়ের পর পরই। জেরিন আর মকবুল রয়ে গিয়েছে। জেরিনের মনটাও খুব খারাপ। এই এলাকায় এসেছে বছর পাঁচেক হবে। এর মধ্যেই মেহনাজের মতো বন্ধু পেয়ে জেরিন যেনো চাঁদ হাতে পেয়েছিলো। সে-ই প্রানপ্রিয় বন্ধু আজকে বিদায় নিলো, এতো ভীষণ যাতনার।
মকবুল এদিক সেদিক করছে, সুযোগ বুঝে স্বর্ণার থেকে বিদায় নিবে কিন্তু সুযোগ টাই পাচ্ছে না। জেরিনের পাশে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে বললো, কিরে জরিনা! স্বর্ণারে বল আমাগোরে ছুটি দিতে।
জেরিন চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে বললো, স্বর্ণা? স্বর্ণা তাই না?? আপনার সমবয়সী তো সে। নাম ধরে বলতেছেন আস্ত বেয়াদব একটা।
আহা জরিনা! চেতিস না। উনি তো আর শুনতেছে না। আমার খুব ক্লান্ত লাগছে। বাড়ি যাইতে চাই।
জেরিন বললো, দাঁড়ান আমি বলছি।
জেরিন একটু এগিয়ে এসে বললো, আন্টি আমরা তাহলে এবার আসি?
স্বর্ণা তাসফিয়াকে সরিয়ে উঠে দাঁড়ালো।
আজকে না গেলে হয় না?? আমার মেয়ে নেই বলে তুমিও থাকবে না??
জেরিনের মনটা খারাপ হয়ে গেলো। আজ অব্দি কখনো যে মহিলাকে নরম হতে দেখেনি। সেই মহিলা আজ মেয়েকে বিদায় করে দিয়ে কি ভীষণ অসহায় হয়ে পড়েছে।
জেরিন বললো, আন্টি জানেন তো দাদী বাড়িতে একা। রাতের বেলা একা থাকতে সমস্যা হয়।
তাসফিয়া উঠে এসে বললো, আমিও তো আপুকে ছাড়া একা জেরিন আপু। তুমি আজকে থাকো আমার সাথে।
জেরিন একবার মকবুলের দিকে তাকালো। আমতাআমতা করে বললো, আসলে আমার তো কোনো সমস্যা ছিল না কিন্তু দাদী যে।
স্বর্ণা বললো, আচ্ছা যা-ও তবে। সকালে চলে এসো আমাদের এখানে। তাসফিয়ার সাথে নাস্তা খাবে।
জেরিন হেঁসে বললো, ঠিক আছে আন্টি। আমি তাহলে আসি। পাশে থাকা আজিমউদ্দিনকে উদ্দেশ্য করে বললো, আঙ্কেল আসি।
আজিম জেরিনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললো, যা-ও মা৷ সাবধানে যেও।
জেরিন ও মকবুল তাসফিয়া সহ সবার থেকে বিদায় নিয়ে বের হবে ওমনি জেরিন থেমে পিছন ফিরে বললো, দাদু ভাই কোথায়??
তাসফিয়া হাতের ইশারায় হাশেম বাহাদুর চৌধুরীর রুমের দিকে দেখালো।
জেরিন হাশেম চৌধুরীর রুমে দিকে আগাতে লাগলো। জেরিনের দাদা নানা নেই। হাশেম চৌধুরী ঠিক মেহনাজের মতোই তাকে আদর স্নেহ করে। মুরব্বি মানুষ নিশ্চয়ই আদরের নাতনিকে পরের ঘরে দিয়ে বেশখানিকটা ভেঙে পড়েছেন। একবার দেখা করে যাওয়া উচিত।
রুমের লাইট বন্ধ। বারান্দার মৃদু আলোতে জেরিন বুঝলো হাশেম চৌধুরী রুমে নেই। জেরিন বারান্দায় এসে মৃদু স্বরে ডাকলো, দাদু ভাই!!
হাশেম চৌধুরী আঁতকে উঠল। চোখ মুখ ফ্যাকাসে হয়ে আছে। জেরিন কাছে এসে বললো, কষ্ট পেয়ো না। মেহনাজকে আমরা কালকে দেখতে যাবো তো।
হাশেম চৌধুরী অসহায় কন্ঠে বললো, আমার এলিন ভাইটা কখনো বাড়ি ছেড়ে একটা রাতও কাটায়নি৷
জেরিন বললো, কি করার বলো? মেয়ে মানুষ হয়েছে যেহেতু!
হ্যাঁ সেটাই সেটাই! আল্লাহ তায়ালা আমার এলিন ভাইটাকে সুখী করুক।
জেরিন ফিসফিস করে বললো, আমিন।
রাত নয়টা, অন্ধকার রাত আকাশে চাঁদ নেই। জেরিন আর মকবুল পাশাপাশি হাঁটছে। জেরিনকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে তবেই মকবুল নিজের বাড়ির দিকে রওনা দিবে।
নীরবতা ভেঙে মকবুল বললো, মেহনাজ আপা তো শশুর বাড়ি চলে গেলো জরিনা। তুই কবে যাচ্ছিস?
জেরিন চুপচাপ হাঁটছে। কিছু বলছে না। শরীরে মৃদু ঠান্ডা বাতাস লাগছে। কিছুক্ষণ পর নীরবতা ভেঙে বললো, আপনি কবে বিয়ে করছেন মকবুল ভাই?
মকবুল হিহি করে হেঁসে উঠে বললো, আমার মতো অর্কমার ঠেকির সাথে কোন বাপ তার মেয়ের বিয়ে দিবে শুনি!
আপনি অর্কমা কেনো? হাত আছে পা আছে। কর্ম করে খান।
মকবুল দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো, তুই বুঝবি না রে জরিনা। পুরুষদের হাত পা থাকলেই শুধু হয় না। সবই কপাল।
আপনি তো লেখাপড়া জানেন। টিউশনি করলেও তো হয়। আজকাল টিউশনি করিয়েই মানুষ লাখ লাখ টাকা কামাচ্ছে।
মকবুল নিশ্বাস ছেড়ে বললো, ওই যে বললাম কপাল লাগে। আমার কপাল ভীষণ মন্দ।
কিছু হয়েছে নাকি মকবুল ভাই?
মকবুল বললো, কি হয় নাই সেটা জিজ্ঞেস কর জেরিন।
জেরিনের মন ভালো হয়ে গেলো। অদ্ভুত ভাবে মকবুল শুধুমাত্র জরিনা না বলে জেরিন বললেই মেয়েটার মন ভালো হয়ে যায়। মকবুলের রুক্ষ চেহারার দিকে তাকিয়ে বললো, চা খাবেন মকবুল ভাই??
মকবুল বুঝলো জেরিনের মন ভালো। না হয় এই মেয়ে কিনা চা খাওয়ার অফার করে। একটু দূরেই রাস্তার পাশে একটা চায়ের দোকান দেখা যাচ্ছে। হাঁটতে হাঁটতে বললো, চল খাওয়া যাক।
দুজন পাশাপাশি বসলো। মকবুল বললো, চাচা দুইটা চা দিও।
চায়ের দোকানে বসে থাকা বৃদ্ধ লোকটা দুইবার জেরিন আর মকবুলের দিকে আড়চোখে তাকালো। মকবুল কেশে বললো, চাচা! ওমনে চাওয়ার কিছু হয় নাই। স্বর্ণা চৌধুরীর মেয়ের বিয়ে ছিল জানতেন নিশ্চয়ই? ওখান থাইকা আসছি আমরা।
দোকানদার কিছুই বললো না। চা বানাতে মনোযোগ দিলো। জেরিন বললো, মকবুল ভাই বলেন এবার কি সমস্যা আপনার?
কিসের সমস্যার কথা বলছিস??
চাকরি বাকরি কিছু করছেন না যে?
আরে জেরিন কি যে বলিস! চাকরি কি মুড়ির মোয়া? চাইলাম আর পেয়ে গেলাম?? আমার চৌদ্দপুরুষে কেউ চাকরি করে নাই। আমার চাকরি পাওয়া ওতো সোজা??
জেরিন বললো, আপনার চৌদ্দপুরুষ তবে কি করে খেয়েছে??
মকবুল বললো, চুরি করে।
জেরিন হিহি করে হেঁসে বললো, আপনিও তবে চুরিতে লেগে যান।
তুই এসিস্ট্যান্ট হবি??
ইশ আমার বয়েই গেছে। আমাকে দেখে কি চোর মনে হয়??
না তোকে দেখে মনে তোকে কেউ চুরি করতে চায়।
জেরিন চুপ করে রইলো। ততক্ষণে চা চলে আসলো। জেরিন চায়ে ফু দিচ্ছে। মকবুল বললো, গরম চা মুখে দিস না জিহ্বা পুড়ে যাবে। জেরিন বেশ খানিকক্ষণ ফু দিয়ে চায়ের আদ্রা কমিয়ে আনলো।
চা খেতে খেতে জেরিন বললো, আমি তো টিউশনি করাই। চাইলে আপনাকে সাহায্য করতে পারি।
কেমন সাহায্য??
স্টুডেন্ট দিতে পারি।
মকবুল বললো, ছেলে স্টুডেন্ট দিতে পারবি??
জেরিন আগ্রহ নিয়ে বললো, মেয়ে স্টুডেন্ট হলে সমস্যা??
বিরাট সমস্যা।
কি সমস্যা??
মকবুল বললো, থাক বাদ দে।
বাদ কেন দিবো? বলতেই হবে। বলেন?
মকবুল চা শেষ করলো। হাই তুলতে তুলতে বললো, আড়াই বছর যাবৎ একটা মেয়েকে পড়াতাম। ক্লাস সিক্স থেকে শুরু করেছিলাম। এইটে উঠার পর তাকে ছাড়তে বাধ্য হয়েছি।
কেনো?
মেয়েটা খুবই চঞ্চল। মায়ের ফোন দিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে বয়ফ্রেন্ডের সাথে কথা বলতো। এটা একদিন আমি দেখে ফেলছিলাম।
জেরিন বললো, এইটুকু মেয়ের বয়ফ্রেন্ড আছে??
সবাই কি তোর মতো হাম্বা নাকি!!
জেরিন চেচিয়ে বললো, খবরদার মকবুল ভাই। আমাকে বাজে কথা বলবেন না।
তার মানে তুই হাম্বা না? তোর গরু আছে? আই মিন বয়ফ্রেন্ড?
জেরিন হাই তুলে বললো, হ্যাঁ থাকতে পারে না?? আমি কি কম সুন্দরী??
মকবুল মৃদু হাসলো কেবল। আর কিছু বললো না। জেরিন বললো, তারপর কি হলো বলেন??
আর কি হবে?? আমার কাছে ধরা পড়ে গেলো। ভেবেছে আমি যদি তার মায়ের কাছে বিচার দেই। তাই সে নিজেই আগে পাকনামি করে তার মায়ের কাছে বিচার দিয়ে দিলো আমি নাকি তাকে না পড়িয়ে ইভটিজিং করি। হাহাহা।
কথাটা বলেই মকবুল হাসতে লাগলো। জেরিন বিস্ময় নিয়ে চেয়ে আছে। এরপর কি হলো?
কি আর হবে?? আমাকে মাসের বেতন হাতে ধরিয়ে দিয়ে পড়াতে হবে না বলে দিলো। মানুষ ভালো, বেতন দিয়ে দিছে। অন্য কেউ হলে তো মাইর দিতো।
জেরিন হতাশ হয়ে বললো, আপনাকে তো একপ্রকার তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। আর আপনি হাসছেন??
তো কি কাঁদবো? পুরুষদের এতো অল্পতে কাঁদতে হয়না জেরিন।
মির্জা বাড়িতে হৈচৈ কিছুটা কমে এসেছে। পাড়া প্রতিবেশীদের ভিড় কমেছে। মেহনাজকে যে যেভাবে বলছে সেভাবেই করতে হচ্ছে। মুরব্বিরা আসছে, বলছে সালাম দেও। মেহনাজ মৃদু স্বরে সালাম দিচ্ছে। বলছে মুখটা একটু উপরে তুলো, মেহনাজকে আর মুখ উপরে তুলতে হচ্ছে না পাশ থেকে কেউ একজন মাথা ধরে মুখ উপরে তুলে দিচ্ছে। মেহনাজ মনে মনে ভাবছে, এই বুঝি বিবাহিত কাজকর্ম!!
রাত দশটা, পরিবেশ কিছুটা শান্ত। নওয়াজ হাসান পুত্র বধুর পাশে বসে আছে। তার পাশে আছে দুই বউ। বড় বউ কোহিনূর, ছোট বউ শামসুন্নাহার।
নওয়াজ হাসান কোহিনূরকে দেখিয়ে বললো, শুনো বউ! এটা হচ্ছে তোমার বড় মা ঠিক আছে?
মেহনাজ হালকা আড়চোখে শাশুড়ীর দিকে তাকিয়ে ঘাড় নাড়ায়। এরপর ছোট বউ শামসুন্নাহারের দিকে দেখিয়ে বলে এটা হচ্ছে তোমার ছোট শাশুড়ী মা।
মেহনাজের ইচ্ছে করছে জিজ্ঞেস করতে, শশুর মশাই আপনি দুইটা বিয়ে করেছেন কোন সুখে?
কিন্তু মন চাইলেই এসব জিজ্ঞেস যাবে না। তবে মেহনাজ ভেবেছে কোনো একদিন জিজ্ঞেস করবেই।
নাফিজের বড় এবং একমাত্র বোন মারজানা এসে বললো, বাবা মেয়েটাকে এবার ছাড়েন। সেই সন্ধ্যা থেকে আপনাদের ইন্টারভিউ শেষই হচ্ছে না।
নওয়াজ হাসান হেঁসে বললো, আচ্ছা আচ্ছা নিয়ে যাও মা।
মারজানা মেহনাজকে সাথে করে নিয়ে গেলো রুমে। মেহনাজ ভেবেছিলো এবার হয়তো একটু নিস্তার পাবে কিন্তু রুমে ঢুকে আরও বেশি অবাক হয়ে গেলো। নাফিজ সহ তার সব কাজিন আর বন্ধুমহল গোল হয়ে বসে আছে। বুঝাই যাচ্ছে তাদের এই মিটিং আজকে সারারাতের জন্য।
নাফিজ এগিয়ে এসে বললো, আমার তিন কবুল পড়া বউটা তাহলে এটাই?
সমস্ত রুম জোরে সমস্বরে আওয়াজ তুলে বললো, সন্দেহ আছে নাকি?
নাফিজ মেহনাজের ঘোমটা সরাতে সরাতে বললো, দেখি একটু বউ পাল্টে দিলো কিনা।
লজ্জায় মেহনাজ মাথা উঁচু করতে পারছে না। এখানে সবার চেয়ে বড় মারজানা আপু। মারজানা বললো, লজ্জা দিও না মেয়েটাকে। কি করবা দ্রুত করে ঘুমাতে যা-ও সবাই।
মারজানাকে সবাই বেশ মান্য করে আর ভয়ও পায়। নাফিজ বললো, আপু তুমিও থাকো?
মারজানা বললো, আমার ইচ্ছে করছে না। রুমে জেগেই আছি দরকার লাগলে ডেকো।
মারজানা চলে যাওয়ার আগে মেহনাজকে বলে গেলো, ওরা যদি বেশিক্ষণ জাগিয়ে রাখে তবে আমাকে ডাকবে মেহনাজ।
মেহনাজ চাচ্ছিলো মারজানা যেনো না যায়। কিন্তু ওতো বড় মেয়ে মানুষ এই বন্ধুমহলে থাকবেই বা কি করতে!
নাফিজ ঝুমাকে ইশারায় বললো মেহনাজকে নিয়ে বসাতে। ঝুমা উঠে এসে মেহনাজকে হাত ধরে নিয়ে সবার সামনে বসালো। নাফিজ এক এক করে সবার পরিচয় দিতে যাবে ওমনি রওনক থামিয়ে দিয়ে বললো, আরে শত্রু নাম্বার টু থাম। আমি পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি। নতুন জামাইদের এতো কথা বলতে হয় না। এনার্জি কমে টমে যাবে।
রওনক পরিচয় দিতে লাগলো, এটা হচ্ছে ঝুমা, বন্ধুমহলের সবচেয়ে মুখচোরা মেয়ে। আমি তাকে পেত্নী বলে ডাকি যদিও অন্যরা তাকে বেশ ভদ্র মেয়ে হিসেবে জানে।
রওনকের দেওয়া বয়ানে আবারও হাসির জোয়ার বইলো।
একে একে, রেজা, শান্ত, মনি, ঝুমা, নাফিজের কাজিন শায়লা, আয়শা, রাশেদ, সিয়ামের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়ে শেষে নাফিজকে দেখিয়ে বললো, এটা আপনার একমাত্র স্বামী ভাবি।
মেহনাজের ঠোঁটে হাসির রেখা দেখা দিলো। মানুষ গুলো সত্যি অমায়িক। কেমন উৎসবমুখর পরিবেশ করে রেখেছে। ভালো লাগছে কিন্তু ক্লান্ত কাটেনি একটুও। শরীর কেমন দূর্বল লাগছে।
নাফিজ বার কয়েক মেহনাজের দিকে তাকিয়ে বুঝলো মেয়েটা ক্লান্ত কিন্তু বন্ধুদের এখন তাড়িয়ে দিলেও হবে সর্বনাশ। কি করবে বুঝতে না পেরে মারজানকে টেক্সট দিলো, আপু এরা আজকে বের হবে বলে মনে হচ্ছে না। আমাকে পরে বকা দিও না।
মারজানা টেক্সট দেখলো। একটু পর রুমে উঁকি দিতেই সবাই বললো, আপু এইতো চলে যাচ্ছি।
সবাই উঠে রুম থেকে বের হতে থাকলো। রওনক বের হয় আর নাফিজের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসে। সবাইকে চলে যেতে দেখে মেহনাজের কেমন অদ্ভুত রকমের ভয় লাগতে শুরু করে। এতোক্ষণ তো ভালোই লেগেছিল এখন এমন কেনো লাগছে??
সবাই চলে গেলো। নাফিজ দরজা বন্ধ করে দিলো। স্বাভাবিক ভঙ্গিতে গায়ের জামাটা খুলে রেখে আড়মোড়া ভেঙ্গে মেহনাজের দিকে তাকাতেই দেখলো মেয়েটা চোখ ছোট ছোট করে তার দিকে তাকিয়ে আছে, চোখে মুখে ভয়ও আছে।
নাফিজ একটু এগিয়ে এসে যেই জিজ্ঞেস করতে যাবে, এলিন তুমি ভয় পাচ্ছো??
ওমনি মেহনাজ লাফ মেরে জায়গা থেকে সরে গিয়ে বললো, কাছে আসবেন না! চারদিকে তাকিয়ে বলতে লাগলো, আমি আম্মুর কাছে যাবো। আম্মুর কাছে যাবো।
নাফিজের মাথায় হাত, হায় এ কাকে বিয়ে করলাম আমি!!
চলবে......!
বাসর পর্ব টর্ব দিমু না বে😒 অপেক্ষা করে লাভ নাই🥱