ফন্ট সাইজ:
থিম:
তোমার নামের রোদ্দুরে

৫৫তম পর্ব

লেখক: আশফিয়া হিয়া

#তোমার_নামের_রোদ্দুরে

#আশফিয়া_হিয়া

#পর্ব_৫৫

( কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ)

আজ আহি ও ইয়াজের বিয়ে। বিয়েতে বড় করেই শেখ বাড়িতে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। বাড়িতে পাড়া - প্রতিবেশী ও আত্মীয় স্বজনে গিজগিজ করছে। আরু নিজের ঘরে তৈরী হচ্ছে। আহিকে সাজানোর জন্য পার্লার থেকে লোক আনানো হয়েছে। আরু বলেছে সে নিজেই সাজবে দুটো বাচ্চা সামলে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে বসে সাজার সময়টুকু তার নেই। রুদ্র ও আদ্রিতা বিছানায় বসে শান্ত হয়ে খেলা করছে। আরু নিজে নিজেই শাড়ি পড়ছে আয়নার দেখে দেখে। এত ভারী শাড়ি একা একা পড়তে যদিও কিছুটা হিমশিম খাচ্ছে তবুও নিজেই সামনে নিচ্ছে সকলেই এখন ব্যস্ত রয়েছে। এই সময়ে কেই বা তাকে সাহায্য করতে আসবে। শাড়ির কুঁচিটা আবারও নষ্ট হয়ে গেল। আরু এবার বিরক্ত হয়ে বেডের ওপর বসে বলল,

- ' ধ্যাঁত।'

বাচ্চারা আরুরদিকে এগিয়ে তার শাড়ি ধরে বলল,

- ' মাম্মাম বাবাকে আচতে বুলি?'

আরু ছেলের কথায় অবাক হয়ে বলল,

- ' ওমা বাবাকে কেনো আসতে বলবে? বাবা কাজে ব্যস্ত আছে না এখন। '

আদ্রিতা আরুর কোল বেয়ে উঠে গলা জরিয়ে ধরে বলল,

- ' বাব্বাহ তুমাকে ছাড়ি পরিয়ে দিব্বে।'

আরু বাচ্চাদের কথা শুনে শব্দ করে হেসে দিল। তার বাচ্চা দুটো কি পাকা পাকা কথা শিখেছে। এখনই এই অবস্থা ভাবা যায়, আরও কিছুদিন পরে কি হবে তাহলে? তখনি দরজায় কড়াঘাতের শব্দ শোনা গেল। বাচ্চারা চিৎকার করে বলল,

- ' বাব্ববাহ এচেচে।'

আরু শাড়ি দিয়ে ভালো করে শরীর ঢেকে নিয়ে দরজা খুলে দিল। রুদ্ধ ঘেমে - নেয়ে ভেতরে প্রবেশ করল। বাইরে প্রচুর গরম ছিল রোদের তাপে তার ফর্সা মুখটা একদম লাল হয়ে গিয়েছে। আরু তার অবস্থা দেখে উদিগ্ন হয়ে বেড এর ওপর থেকে নিজের ওড়না নিয়ে রুদ্ধর কপালে ও মুখের ঘামটুকু খুব যত্ন করে মুছিয়ে দিল। রুদ্ধ আরুর পা - মাথা পর্যন্ত চোখ বুলাতেই কপালে ভাঁজ ফেলে বলল,

- ' এই অবস্থা কেনো?'

আরু ঠোঁট উল্টে বলল,

- ' শাড়িটা পড়তেই পারছি না। '

বাচ্চারা রুদ্ধর পা জরিয়ে ধরল। রুদ্ধ এক সঙ্গে দুজনকেই কোলে তুলে নিল। আদ্রিতা রুদ্ধর মুখটা নিজের চোখ হাত দিয়ে নিজের দিকে ঘুরিয়ে বলল,

- ' বাব্বাহ মাম্মাকে ছাড়ি পলিয়ে দাও।'

রুদ্ধ মেয়ের কথা শুনে হাসল। রুদ্র ও তাল মিলিয়ে বলল,

- ' মাম্মাম পলতে পারচে না তুমি পরিয়ে দাও। '

আরু রুদ্ধর কোল থেকে ছেলেকে নিয়ে গালে টপাটপ কয়েকটা চুমু খেয়ে নিল। রুদ্ধর কোল থেকে আদ্রিতাকেও অনেকগুলো চুমু খেয়ে বলল,

- ' এত পাকা পাকা কথা কে শিখিয়েছে তোমাদের?'

রুদ্ধ মুখে হাত দিয়ে হেসে বলল,

- বাব্বাহ।'

রুদ্ধ ছেলের নাক টিপে দিয়ে বলল,

- ' হ্যাঁ আপনাদের সব তো বাবাই শেখায়। '

এখন একটু বাইরে যাও তো বাবারা তোমাদের ছোট্ট বাবা তোমাদেরকে খুঁজছে। দুজনই কল থেকে নেমে আচ্চা বলে ঘর থেকে বের হলো। ছেলে - মেয়েরা ইয়াজের ঘরে যেতেই রুদ্ধ দরজা বন্ধ করে দিল। আরু চোখ পাকিয়ে বলল,

- ' দরজা বন্ধ করলেন কেনো?'

রুদ্ধ তার দিকে এগিয়ে আসতে আসতে বলল,

- ' দরজা খুলেই শাড়ি পড়তে চাচ্ছিস?'

আরু এক পা পিছিয়ে মাথা দুদিকে নেড়ে বলল,

- ' না না সেটা বলিনি, বাচ্চাদের বাইরে পাঠিয়ে দিলেন কেনো?'

রুদ্ধ আরুর শাড়ির আচলে এক ঝটকায় সরিয়ে দিয়ে বলল,

- ' বাচ্চাদের এখনো মা - বাবার রোমান্স বোঝার মতো বয়স হয়নি তাই। '

আরু ঢোক গিলে বলল,

- " আ.. আমি নিজেই শাড়ি পড়ে নিতে পারব। আপনি আপনার কাজ করুন। '

রুদ্ধ তার কোমর জরিয়ে ধরে গলায় নাক ডুবিয়ে বলল,

- ' আমি আমার কাজটাই করছি। '

আরু রুদ্ধর পিঠের কাছের পাঞ্জাবিটা মুঠো পাকিয়ে ধরল। রুদ্ধ নিজের কাজে বহাল। শেষমেষ দেখা গেল শাড়ি পড়াতে এসে উল্টো শাড়িটা আরও অনেক বেশী এলোমেলো হয়ে গেল। আরু বিরক্ত হয়ে বলল,

- ' ছাড়ুন না। আমাকে আহির কাছে যেতে হবে মেয়েটা একা একা কি করছে কে জানে। '

রুদ্ধ তার ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে দিল। অনেকটা সময় পর সরেও এল। আরু জোরে জোরে শ্বাস নিতে নিতে রুদ্ধর বুকে মৃদ্যু ধাক্কা মে*রে বলল,

- ' আপনি সময় অসময়টাও বোঝেন না?'

রুদ্ধর চুলগুলো কপালে জড়োসড়ো হয়ে আছে। সে বৃদ্ধাঙ্গুল দিয়ে নিজের ঠোঁট মুছতে মুছতে বলল,

- ' অসময়কে সময় কিভাবে বানাতে হয় সেটা রুদ্ধ ভালো করেই জানে?' আরু সেটা শুনে ভেংচি কাটল।

এরপর আরুর হাত থেকে শাড়িটা নিয়ে বলল,

- ' আমি হেল্প করে দিচ্ছি৷ '

- ' না থাক অনেক হেল্প করেছেন আমার। বাকিটুকু আমি নিজেই করে নিতে পারব। '

রুদ্ধ তার বারণ শুনল না। আরুর হাত থেকে শাড়ি নিয়ে খুব সুন্দর করে শাড়িটা পড়িয়ে দিতে লাগল। এতগুলো বছরে শাড়ি পড়ানোটা সে খুব ভালো করেই শিখে নিয়েছে। এমন অনেক দিন গিয়েছে রুদ্ধ নিজের হাতেই আরুকে শাড়ি পড়িয়ে দিয়েছে। রুদ্ধ এবার আর আরুকে কোনোরকম জ্বালাতন করেনি। আরু এক ধ্যানে রুদ্ধর মুখটার দিকে দেখছে। রুদ্ধর পুরো ধ্যান আরুকে শাড়ি পড়িয়ে দেয়ায়। যেন মনোযোগ একটু এদিন - ওদিক হলেই কোনো ভুল হয়ে যাবে। আরুর মুখে তৃপ্তির হাসি ফুটে রয়েছে৷

শাড়ি পড়ানো শেষ হতেই রুদ্ধ আরুর হাত ধরে আয়নার সামনে নিয়ে গেল। পেছন থেকে আরুকে জরিয়ে ধরে কাঁধে থুতনি রেখে বলল,

- ' এবার দেখো তো কেমন লাগছে?'

আরু লাজু হেসে মাথা নিচু করে বলল,

- ' শেখ রুদ্ধ মাহতাবের বউ বউ লাগছে৷ '

রুদ্ধ নিজেও হাসল। পেছন থেকে আরুকে শক্ত করে জরিয়ে ধরল।

**********

ইয়াজ নিজের ঘরে তৈরী হয়ে বসে আছে। সঙ্গে তার বন্ধুরাও রয়েছে। রুদ্র ও আদ্রিতা ইয়াজের কোলে উঠে বসে আছে। ইয়াজই তাদের আটকে রেখেছে। নিহান বাচ্চাদুটোকে দেখে মুখ গোমড়া করে বলল,

- " এই বাচ্চা দুটোই আরুর তাই না?'

ইয়াজ হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খেয়ে বলল,

- ' হ্যাঁ। পরপরই বাচ্চাদের দিকে তাকিয়ে বলল,

- ' বাবারা এটা তোমাদের একটা মামা হয়, মামা ডাকো তো সোনা পাখিরা। '

রুদ্র ও আদ্রিতা এক সঙ্গেই বলে উঠল,

- ' মামাহহ?'

নিহানের মুখটা আবারও চুপসে গেল। ইয়াজসহ তার বাকি বন্ধুরা শব্দ করে হাসছে। নিহান ইয়াজের দিকে বালিশ ছু*ড়ে মে*রে বলল,

- ' শালা মজা নিচ্ছিস নে, আমারও দিন আসবে। আজ যদি আহির সঙ্গে তোর বিয়েটা না হতো তাহলে ওর বাচ্চারাও তোকে মামাই ডাকত।'

ইয়াজ ভাব নিয়ে বলল,

- ' নো চান্স। ওর জন্মই হয়েছে আমার বাচ্চাদের মা হওয়ার জন্য। '

নিহান বলল,

- ' বাবাহ এতো কনফিডেন্স? '

ইয়াজ মাথা ঝাঁকিয়ে বলল,

- ' অবশ্যই আমার বড় ভাইয়াকে তো দেখেছিসই ভাইয়ার থেকেই শিখেছি কিভাবে নিজের জিনিস নিজের করে রাখতে হয়। যেন অন্যকেউ চাইলেও চোখ তুলে তাকাতে না পারে। '

বাচ্চারা কোল থেকে নেমে যাওয়ার জন্য ছটফট করছে। ইয়াজ তাদের কোল থেকে নামিয়ে দিল। বেড সাইডের টেবিলের ওপর থেকে একটা লাল গোলাপ ফুল নিয়ে বাচ্চাদের বলল,

- ' এই ফুলটা তোমাদের ছোট্ট মাকে দেবে বুঝেছো।'

রুদ্র ও আদ্রিতা দুদিকে মাথা নাড়াল, যার অর্থ তারা বুঝেনি। রুদ্র অবুঝ স্বরে বলল,

- " চোট্ট মা কেহ?'

ইয়াজ কপাল চাঁপড়ে বলল,

- ' ওরেহহ আমার পটলের বাচ্চারা ছোট্ট মা কে এটায় জানিস না। আহি হলো তোমাদের ছোট্ট মা বুঝেছো?'

আদ্রিতা কোমড়ে হাত রেখে বলল,

- ' এতা তো মিম্মি। '

- ' এখন থেকে ছোট্ট মা বলবে ঠিক আছে?'

- ' নায়ায়া মিম্মিই বুলবো।'

ইয়াজের নাস্তানাবুদ অবস্থা দেখে ওর বন্ধুরা হেসেই চলেছে। ইয়াজ আবারও বলল,

- ' ছোট্ট মা ডাকলে তোমাদের অনেক চকোলেট দেব। এই যে এই গুলো বলেই নিজের পকেট থেকে চকোলেট বের করে দুজনের হাতে ধরিয়ে দিল। ' রুদ্র ও আদ্রিতা নিজেদের ছোট ছোট হাতে ফুল ও চকোলেট ধরে বলল,

- ' আচ্চা। '

তারা ধীর পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে। আহির ঘরে চলে গেল। আহির সাজ তখন সম্পূর্ণ হয়েছে। আরু ও রুহানি দুজনেই তখন আহির ঘরে ছিল। রুদ্ধ ও আদ্রিতাকে দেখেই আহি কোলে তুলে নিল। আরু বলল,

- ' এত চকোলেট, ফুল কে দিয়েছে বাবা?'

- ' চোট্ট পাপ্পাহ। '

আদ্রিতা আহির দিকে ফুল বাড়িয়ে দিয়ে বলল,

- ' চোট্ট মা এটা তুমার।'

আহি ভ্রু কুঁচকে বলল,

- ' এই ডাক কে শিখেছে তোমাদের?'

রুদ্র বলল,

- 'চোট্ট পাপ্পাহ বুলেচে তুমাকে চোট্ট মা বুললে চতলেট দেবে তাই৷'

আহি আরু রুহানির সামনে লজ্জা পেয়ে গেল। আরু ও রুহানি মিটিমিটি হেসে বলল,

- ' বাব্বাহ কি প্রেম দেখেছিস বিয়ে এখনো হয়নি, এখনি ছোট্ট মা ডাক শেখাচ্ছে। '

*******

আহি ও ইয়াজের পড়নে আজ কিছু ভিন্ন পোশাক। ইয়াজ অফ হোয়াইট রঙের ব্লেজার ও প্যান্ট পড়েছে। আহি ইয়াজের সঙ্গে মিলিয়ে অফ - হোয়াইট রঙের লেহাঙ্গা পড়েছে৷ আহি ও ইয়াজের বিয়েটা অনেক আগেই সম্পূর্ণ হয়েছে। দুজনকেই পাশাপাশি অসম্ভব সুন্দর লাগছে। যেই ই দেখছে তার চোখ দুটোতে মুগ্ধতা ছড়িয়ে পড়ছে। দুজনের মুখেই প্রাপ্তির হাসি ফুটে উঠেছে। কবুল বলার সময় কেউই সময় নেই নি ঝটপট কবুল বলে দিয়েছে৷ বিয়েটে কারোরই কোনো কষ্ট নেই সকলেই আনন্দে আছে৷ সাধারণ বিয়ে বাড়িটা আনন্দের সঙ্গে সঙ্গে বিষন্নতায় ছেয়ে থাকে তবে শেখ বাড়ির দুটো মেয়ে বিয়েতেই বাড়ির কারোর কষ্ট হয়নি মেয়ে দুটো তাদের চোখের সামনেই থাকছে। তবে রুহানির বিয়েটা ব্যাতিক্রম ছিল, সেখানে কষ্ট অনেকগুণ বেশী হয়ে ধরা দিয়েছিল।

আহিকে ইয়াজের ঘরে বসিয়ে রাখা হয়েছে। এখন ঘড়ির কাটায় রাত দশটা বাজচ্ছে। ইয়াজের ঘরের সামনে আরু রুহা, রুহানি এবং তাদের অন্যান্য কাজিনরা দরজা ঘেরাও করে রেখেছে। আহি তাদের দেখে ভেতর থেকে ছুটে এল। রুহানি অবাক হয়ে বলল,

- ' ওমা তুই এখানে এসেছিস কেনো?'

আহি শাড়ির আচল কোমরে গুজে বলল,

- ' তোমরা তো আমাকে আটকে রেখেই টাকা উসুল করবে তাই না? বলছিলাম কি এই টাকার ভাগটা কি আমি পাব না?'

আরু তার মাথায় গাট্টা মে*রে বলল,

- ' ইশস শখ কত নিজের বিয়ের টাকা নিজেই চাইছে। আমার বিয়েতে আমাকে এক টাকাও দিয়েছিলি? সবটায় তো তোরা নিজেরাই ভাগ করে নিয়েছিলি। '

আহি দাঁত কেলিয়ে বলল,

- ' তখন অতকিছু বুঝতাম নাকি? আর তুইও তো চাস নি, আমি কিছু জানি না আমাকে টাকার ভাগ দিতেই হবে। '

রুহা বলল,

- 'উফফ আপু তুমি যাও তো, ইয়াজ ভাইয়া এসে পড়বে। '

আহি গেল না ওখানেই দাঁড়িয়ে রইল। ইয়াজ ঘরের সামনে এসেই যা বোঝার বুঝে গেল। তাকে আসতে দেখে সকলেই আহিকে আড়াল করে দাঁড়াল। আহি সকলের আড়ালেই চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। ইয়াজ ভ্রু উঁচিয়ে বলল,

- ' কি চাই?'

আরু এগিয়ে এসে বলল,

- ' নিজের ঘরে যেতে চাইলে টাকা দিয়ে প্রবেশ করতে হবে নয়তো ঘরেও যেতে পারবি না আর বউকেও পাবি না। '

- ' কি আজব নিয়ম! ঘর আমার বউ আমার সেখানে যেতে নাকি টাকা দিতে হবে। আমি ওসব টাকা - পয়সা দিতে পারবো না বুঝেছিস? আমার পকেট এখন ফাঁকা। '

রুহা বলল,

- ' এটা কিন্তু ঠিক নয় ভাইয়া, আমরা এত সুন্দর করে আপনাদের ঘরটা সাজিয়ে দিয়েছি সেই হিসেবেও আমাদের কিছু টাকা প্রাপ্য তাই না?'

ইয়াজ ভাব নিয়ে বলল,

- 'ওকে সেই হিসেবে কিছু টাকা দেয়ায় যায়। ' ইয়াজ পকেট থেকে পাঁচশত টাকার একটা নোট বের করে ধরিয়ে দিল। সকলে তাজ্জব হয়ে গেল। ইয়াজকে মানিব্যাগ বের করতে দেখে ভেবেছিল সত্যি সত্যই বোধ হয় টাকাটা দেবে। আরু তেড়ে গিয়ে বলল,

- ফাজমালি পেয়েছিস? চট জলদি দশ হাজার টাকা বের কর, নতুন নতুন কাজে জয়েন্ট করেছিস সেই হিসেবে কমই চেয়েছি, এখন টাকা বের কর নয়তো ঘরে যেতে পারবি না। '

ইয়াজও হাই তুলে বলল,

- ' পাঁচশত টাকা নিলে নে নয়তো সর ঘুম পেয়েছে বা*ল।'

আহি আর ধৈর্য ধরে পেছনে দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না, সে সবাইকে টপকে সামনে চলে এল। ইয়াজ আহিকে দেখে তব্দা খেল। আহি কোমরে হাত গুজে ঝ*গড়ার ভঙ্গিতে বলল,

- ' ওদেরকে ওদের টাকা বুঝিয়ে দাও নয়তো আমি তোমার ঘরেই থাকবো না। '

- ' এইটা কেমন বউ আমার কপালে এসে জুটল স্বামীর টাকার মায়াই নেই। '

আহি রে*গে বলল,

- ' আমি এসে জুটেছি নাকি তুমি আমাকে জুটিয়েছো?'

- ' আমি কবে তোকে বলেছি আমার জীবনে এসে জীবনটাকে ধন্য করে দিয়ে যা, নিজেই তো আমার পিছু পিছু ঘুরে আমাকে পটিয়েছিস। '

- ' কি বললে তুমি আমি তোমাকে পটিয়েছি? তুমি নিজেই তো আমাকে পটানোর জন্য পিছু পিছু ঘুরতে।'

দুজনের তুমুল ঝগড়া লেগে গেল। সবাই মাথায় হাত দিয়ে সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল। সবাই এই প্রথম বিয়ের পর ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বর - বউকে ঝগড়া করতে দেখছে। কারোরই থামার নাম নেই। কেউ কাউকে এক বিন্দুও ছাড় দেয়ার পাএ রুহা বলল,

- ' এরা প্রেম কি করে করেছে বলো তো, বিয়ের দিন এভাবে কেউ ঝগড়া করে?'

রুহানি বলল,

- ' ওরা বোধহয় ঝগড়া করার জন্যই বিয়েটা করেছে৷'

ওদের থামাতে চাইলেও কেউ থামল না। শেষনেষ ওরা বিরক্ত হয়ে সেখান থেকে চলেই গেল। আহি ও ইয়াজ এখনো ঝগড়া করেই চলেছে। আহি ঝগড়ার মাঝে আরুকে টেনে বলল,

- ' এই আপু তোরা চুপ করে আছিস কেনো কিছু তো বল?'

ইয়াজ বলল,

- ' ও কি বলবে... কথাটা সম্পূর্ণ করার আগেই চারপাশে কাউকে দেখতে না পেয়ে থেমে গেল। আহি অবাক হয়ে বলল,

- ' ওমা এরা সবাই কোথায় চলে গেল?'

ইয়াজ তৎক্ষণাত আহিকে পাজা করে কোলে তুলে নিল।আহি হতবাক হয়ে বলল,

- ' কি করছো কোলে নিলে কেনো?'

ইয়াজ তাকে নিয়ে ঘরে যেতে যেতে বলল,

- ' ভালো হয়েছে ওরা চলে গিয়েছে,আমাকে আর টাকা দিতে হবে না। আজ বিনা পয়সায় বাসর করবো। '

- ' ছিহ্ কিসব বলছো। '

ইয়াজ তাকে বেডের ওপর বসিয়ে দিয়ে বলল,

- ' যখন আসল কাজ শুরু করবো তখন ছি্হ বলিস। '

আহি লজ্জা পেয়ে, নাক - মুখ কুঁচকে বসে রইল।ইয়াজ শব্দ করে হাসতে হাসতে ওয়াশরুমে চলে গেল।

*******

ইয়াজ ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে এসে দেখল, আহি বিয়ের পোশাকেই ঘুমিয়ে পড়েছে। সারাটাদিন বিষণ ক্লান্ত ছিল তার জন্যই বোধ হয় এই ঘুম। নিজের ঘরে আজ বিশাল এক পরিবর্তন পরিলক্ষিত হচ্ছে তার। আগে এই বিছানায় সে ছাড়া আর কেউ থাকত না, তবে সেখানে এখন থেকে তার সবচেয়ে কাছের মেয়েটা থাকবে। ভাবতেই ভেতরটা অদ্ভুত ভালো লাগায় ভরে উঠেছে। আহিকে তার কাছে ছোট্টখাটো আদুরে এক পুতুল মনে হচ্ছে। ইয়াজ বেডে উঠে বসল আহির পাশে বসে তার কপালের চুলগুলো সরিয়ে দিয়ে হালকা হাসল। ঘুমের মাঝে আহি কিছুটা নড়ে চড়ে উঠল তবুও ঘুম ভাঙল না। ইয়াজ এবার বিরক্ত হয়ে তাকে ডাকতে লাগল। আহি ধরফর করে উঠে বসল।

- ' কি হয়েছে? '

ইয়াজ তার মাথার ঘোমটা ফেলে দিয়ে বলল,

- ' কি হয়েছে জানিস না? বাসর রাতে কেউ ঘুমায়?'

- ' ঘুমায় না তো কি করে? আমার ভীষণ ঘুম পেয়েছে। তোমারও নিশ্চয় ঘুম পেয়েছে? তুমিও ঘুমিয়ে পড়ো। '

আহি আবারও শুয়ে পড়তে নিলে ইয়াজ তাকে টেনে তুলল। আহি বিরক্ত হয়ে বলল,

- ' আবার কি হয়েছে? '

ইয়াজ মুখ গোমড়া করে বলল,

- ' আমার ঘুম পাচ্ছে না অন্যকিছু পাচ্ছে। '

আহি ভ্রু কুঁচকে বলল,

- ' কি পাচ্ছে? '

ইয়াজ আহির কানে ঠোঁট ছুঁইয়ে ফিসফিস করে বলল,

- ' দেখাচ্ছি কি পাচ্ছে। '

আহির পিঠ ঠেকে গেল নরম বিছানায়। নিজের ওপর ইয়াজের ভার অনুভব করতে পেরে গাল দুটো লজ্জায় লাল হয়ে গেল। ইয়াজ তার মুখটার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে কপালে গাঢ়ভাবে ঠোঁট ছোঁয়াল। আহি আবেশে নিজের চোখ বন্ধ করে নিয়েছে। এক সময় নিজের সমস্ত শরীরে ইয়াজের স্পর্শ টের পেল সে। আহির ঠোঁটের হাল বেহাল করে ছাড়ল শ্বাসটুকু নেয়ার সময়টুকু পেল না মেয়েটা। পুরো শরীরে ইয়াজের হাতের ও ঠোঁটে স্পর্শ পেয়ে বিছানার চাদর আকড়ে ধরে পড়ে রইল। এক সময় তাদের শরীর থেকে সমস্ত আবরণ খসে পড়ল। ইয়াজ আহিকে নিজের সর্বোচ্চ কাছে টেনে নিল। আহি ও আজ নিজের সবটা ইয়াজের মাঝে বিলিয়ে দিল।

*******

নিচের সমস্ত কাজ শেষ করে আরু সবেমাএ নিজের ঘরে এল। তবে ঘরের দৃশ্য দেখে বেশ অবাক হলো। বাচ্চাদের নিয়ে রুহানি তার ঘরে শুয়ে আছে সঙ্গে মিশিও আছে। তিন পিচ্চিই আরামে ঘুমাচ্ছে। রুহানি আরুকে দেখতে পেয়ে বলল,

- ' আজ আমি বাচ্চাদের সঙ্গেই থাকব, ভাইয়া তোর জন্য বাগানে অপেক্ষা করছে। '

আরু বুঝতে পারছে না কি হচ্ছে রুদ্ধ হঠাৎ করে তাকে বাগানে ডাকছে কেনো? আরু রুহানিকে কোনো প্রশ্ন না করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। আত্মীয় - স্বজনও অর্ধেক চলে গিয়েছে। বাড়িটা আপাতত নিরবই রয়েছে। আরু বাগানে গিয়ে দেখল রুদ্ধ উল্টো ঘুরে দাঁড়িয়ে রয়েছে। পড়নে এখন আর পাঞ্জাবি নেই কালো শার্ট ও প্যান্ট পড়ে আছে। আরু রুদ্ধর দিকে এগিয়ে পিঠ মৃদ্যু ধাক্কা দিয়ে বলল,

- ' ধাপ্পা। '

তার বাচ্চামি দেখে রুদ্ধ হাসল। আর বলল,

- ' কি ব্যাপার এত রাতে হঠাৎ করে বাগানে ডাকলেন?'

রুদ্ধ আরুর হাত ধরে মেইন গেটের বাইরে চলে এল। সেখানে রুদ্ধর বাইক রাখা রয়েছে। নিজে হেলমেট পড়ে আরুকেও পরিয়ে দিল। আরু অবাক হয়ে তার দিকে তাকাতে রুদ্ধ বলল,

- ' কয়েক বছর আগে এমন একটি মুহুর্ত আমাদের জীবনে এসেছিল। তখন আমরা কেউই আমাদের মনের অনুভূতি একে অপরের কাছে প্রকাশ করতে পারি নি তবে অনুভব ঠিকই করেছি। আজ মনে হলো সেই দিনটাতে আবারও ফিরে যায়। '

আরুর চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়ল। পুরোনো দিনগুলো নিজের চোখের সামনে একে একে ভাসতে শুরু করেছে। রুদ্ধর প্রতি তার পাগলামি। রুদ্ধর তাকে করা এক একটা শ্বাসন। কাছে আসার মুহুর্ত সবটা চোখের সামনে ভেসে উঠল।

ফাঁকা রোডে বেশ স্প্রীডেই বাইক চালাচ্ছে রুদ্ধ। আরুর শাড়ির আচল বাতাসে উড়ে বেড়াচ্ছে। রুদ্ধর পছন্দ অনুযায়ী চুলগুলো অনেক আগেই বাঁধনমুক্ত করে দিয়েছে। এক হাতে রুদ্ধর পেট জরিয়ে ধরে আরু এই মুহুর্তটা গভীরভাবে অনুভব করতে লাগল। রুদ্ধ বাইকটা একটা লেকের সামনে দাঁড় করাল। নিজের হেলমেট খুলে আরুর হেলমেটও খুলে দিল। রুদ্ধ তাকে একটু দাঁড়াতে বলে পাশের টোঙের দোকানে গেল দু কাপ চা আনতে। আরু শাড়ির আচল দিয়ে কাঁধ ডেকে নিল তার ভীষণ ঠান্ডা লাগছে। কিছুক্ষণ বাদেই রুদ্ধ চা নিয়ে হাজির হলো। দুজনেই লেকের পাড়ে বসল। আরু রুদ্ধর কাঁধে মাথা রেখে সময়টাকে উপভোগ করছে। আরু হঠাৎ করেই বলল,

- ' আপনি আমার জীবনে না এলে, এত সুন্দর পৃথিবীটা বোধ হয় উপভোগই করা হতো না। ভাগ্যিস আপনি আমার নসিবে ছিলেন। '

রুদ্ধ প্রাণ ভরে শ্বাস নিয়ে বলল,

- ' তুই আমার জীবনে না এলে হয়তো জানতামই না আমি কাউকে এতটা ডেস্পারটলি ভালোবাসতে পারবো। কাউকে এক পলক না দেখতে পেলে আমার ভেতরটা হাঁসফাস করবে। অন্য কারোর সঙ্গে কথা বলতে দেখলে বু*কের ভেতরটা জ্বলে পুড়ে যাবে। '

আরু হাসল। নিজের মাথাটা রুদ্ধর বুকে এলিয়ে দিয়ে বলল,

- ' একবার ভালোবাসি বলুন না?'

রুদ্ধ তাকে শক্ত করে জরিয়ে ধরে বলল,

- ' বলতেই হবে?'

- ' হুহ।'

- ' তবে আমি তো সবার মতো মুখে ভালোবাসি বলে জাহির করাতে বিশ্বাসী নই একটু অন্যভাবে বলি?'

- ' অন্যভাবে?'

রুদ্ধ আরুকে পেছন থেকে আরও একটু শক্ত করে জরিয়ে ধরে কানের কাছে ঠৌঁট ছুঁইয়ে গেয়ে উঠল,

তোমাকে ছেড়ে আমি কী নিয়ে থাকব?

ভালোবেসে যাব ওগো যত দিন বাঁচব

হেসোনা হেসোনা তুমি, জেনে রাখো তা

বলে তো দিয়েছি আমি হৃদয়ের কথা

হৃদয়ের কথা

চাঁদেরও আলো দিয়ে মুখ খানি দেখব

পেয়ো নাকো লজ্জা, খুব কাছে রাখব

হো... চাঁদেরও আলো দিয়ে মুখ খানি দেখব

পেয়ো নাকো লজ্জা, খুব কাছে রাখব

আরু নিজেকে ধরে রাখতে পারল না রুদ্ধর দিকে ঘুরে শক্ত করে গলা জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে বলল,

- ' ভালোবাসি। আমি আপনাকে নিজের থেকেও বেশি ভালোবাসি। ভালোবাসি আমার রাজপুএ ও রাজকন্যার বাবাকে। '

রুদ্ধ আরুকে নিজের সঙ্গে আগলে নিয়ে শব্দ করে হেসে বলল,

- ' জানি তো। '

|

একই চাদরের মাঝে দুটো মানব - মানবী শুয়ে আছে। আহির মাথাটা ইয়াজের ঠিক বুকের মাঝখানে রয়েছে। কারোর চোখেই ঘুম ধরা দিচ্ছে না। ইয়াজ আহিকে নিজের সঙ্গে আরও একটু চেপে ধরল। আহি ব্যাথা পেলেও মুখ দিয়ে কোনো শব্দ করল না। ইয়াজ আবদারের স্বরে বলল,

- ' রুদ্র ও আদ্রিতাকে দেখেছিস কি সুন্দর পুরো বাড়িটাকে মাতিয়ে রেখেছে। কি সুন্দর আদো আদো স্বরে কথা বলে তখন আমার ভেতরটা ভালো লাগায় ছেয়ে যায়, ভাইয়াকে কি সুন্দর করে বাবা বলে ডাকে। আমিও বাবা হতে চাই আহি। আমাকে সেই সুযোগটা দিবি?'

আহি মাথা উঁচু করে ইয়াজের মুখের দিকে এক পলক তাকিয়ে বলল,

- ' এভাবে বলছো কেনো? আমিও চাই আমাদের মাঝে কেউ আসুক।'

ইয়াজ তাকে বালিশে ফেলে নিজে আহির ওপরে উঠে বলল,

- ' সত্যি? তাহলে আরও একবার শুরু করি?'

আহি তড়িঘড়ি করে বলল,

- ' এই না না প্লিজ আমার পুরো শরীর ব্যাথা.. ইয়াজ তার বারণ শুনলে তো? আহির মাঝে আরও একবার ডুব দিল। এক সময় আহিও সয়ে নিল প্রিয় মানুষটার ভালোবাসাময় অত্যাচারগুলো।

সমাপ্ত।

(অনেকেই হয়তোবা আমার ওপর রেগে থাকবেন গল্পটা শেষ করার জন্য তবে এই গল্পটা সৌন্দর্য এতটুকুই ছিল এর বেশি লিখলে আপনারাই বোরিং হয়ে যেতেন। এটা আমার প্রথম উপন্যাস ছিল গল্পটা এতদূর আগাবে আমি নিজেই ভাবতে পারিনি। যারা এই গল্পটার পাশে ছিলেন তাদের জানায় অসংখ্য ধন্যবাদ ও ভালোবাসা। ওদের নিয়ে সিজন - ২ লেখার ইচ্ছে আছে। সিজন - ২ আনতে হলেও তো এটা শেষ করতে হবে৷ আর সিজন - ২ ভিন্নভাবেই আসবে। আশা করি কেউ আর রেগে থাকবেন না আমার অন্য গল্পগুলোর পাশে এভাবেই থাকবেন 🫶❤️)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৫৫তম পর্ব শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন