ফন্ট সাইজ:
থিম:
চৈত্রিকা

৫ম পর্ব

লেখক: বোরহানা আক্তার রেশমি

#চৈত্রিকা (৯)

#বোরহানা_আক্তার_রেশমী

_____________

২১.

সকাল বেলা গোসল সেড়ে রুমে থাকা একটা লাল শাড়ি পড়ে চৈত্রিকা। অর্থি সেই ভোর বেলা থেকে ডেকে ডেকে চৈত্রিকাকে তুলেছে। প্রহর নিশ্চিন্ত মনে তখনো ঘুমাচ্ছে। চৈত্রিকা চোখ মুখ কুঁচকে একবার প্রহরের দিকে তাকিয়ে চুপচাপ মাথায় ঘোমটা টেনে ঘরের দরজা খুলে বের হয়। ভেজা চুলগুলো তখন এলোমেলো করে রাখা। অর্থির ঘর কোনটা তা জানেনা চৈত্রিকা। তবে ভাগ্যবশত ঘর থেকে বের হওয়ার পর সামনে পরে অর্পিতা। অর্পিতাকে দেখে সৌজন্যমূলক হেঁসে বলে,

'আপু অর্থির ঘর কোনটা? আসলে 'ও' আমাকে ডেকে আবার চলে গেছে তো!'

অর্পিতা কিছুক্ষণ চেয়ে থাকে চৈত্রিকার মুখপানে। কি স্নিগ্ধ মেয়েটার মুখ! গোসলের পর যেনো মেয়েটার সৌন্দর্য আরো কয়েকগুণ ধরা দিয়েছে। অর্পিতা মুচকি হেঁসে চোখের কাজল নিয়ে চৈত্রিকার ঘাড়ে লাগিয়ে দেয়। চৈত্রিকা খানিকটা চমকালেও পরমুহুর্তে অর্পিতা কি করছে বুঝতে পেরে নিজেকে সামলে নেয়। অর্পিতা হেঁসে বলে,

'মাশাল্লাহ। কারো নজর না লাগুক! অবশ্য আপনি যতটা সুন্দর তাতে সবার নজর লেগে যাবেই। আর আমাকে আপু বলে ডাকছেন কেনো বড় ভাবীজান? আমি তো সম্পর্কে আপনার ছোট ননদ!'

'সম্পর্কে আপনি আমার ছোট হলেও বয়সে তো বড়! তাই আপু বলতে সমস্যা নেই৷'

অর্পিতা ঠোঁট প্রসারিত করে হাসে। নাহ! মেয়েটার আচার-আচরণও বেশ ভালো। সে ভেবেছিলো এতো সুন্দরী মেয়ের নিশ্চয় অনেক অ'হং'কার হবে! কিন্তু তাকে ভুল প্রমাণ করে দিয়ে মেয়েটা খুবই মিশুক এবং ভালো মনের বের হলো। দুজনে আরো কিছুটা গল্প করে একসাথেই অর্থির ঘরে আসে। অর্থি তখন বিছানার ওপর সবগুলো বই ছড়িয়ে ছিটিয়ে নিয়ে বসে আছে। অর্পিতা ফিক করে হেঁসে দিলেও চৈত্রিকা খানিকটা ভ্রু কুঁচকালো। অর্থির মুখের অবস্থা দেখে তার ভালো ঠেকে না। অর্থি চৈত্রিকা আর অর্পিতাকে দেখেই ঠোঁট ফুলায়। কাঁদো কাঁদো মুখ করে বলে,

'ওহ ভাবীজান দেখুন নাহ আম্মাজান আমারে বই নিয়ে বসিয়ে দিয়েছে! আপনিই বলেন তো বড় ভাইজানের বিয়ের সময় কেউ পড়তে বসে?'

অর্পিতা অর্থির মাথায় গাট্টা মে'রে বলে, 'বিয়েটা তো তোর ভাইয়ের তোর তো আর না! তাহলে পড়তে সমস্যা কি?'

চৈত্রিকাও এগিয়ে এসে অর্থির পাশে বসে। অর্থি অর্পিতার কথা পাত্তা না দিয়ে বেশ উত্তেজিত স্বরে বলে, 'এটাই! এটাই তো আমার সমস্যা। পড়া!'

চৈত্রিকা বুঝতে পেরে নিজেও ফিক করে হেঁসে দেয়। হাসতে হাসতেই বলে, 'পড়াটাই তোমার সমস্যা? তবে তোমার ভাইজানকে বলে বিয়ের ব্যবস্থা করি?'

'হ্যাঁ! করো করো, আমার সমস্যা নেই।'

অর্থির ফট করে এমন কথায় চৈত্রিকা খানিকটা ঘাবড়েই যায়। অর্পিতা অর্থির মাথায় ফের গাট্টা মে'রে বলে, 'বিয়ে বিয়ে না করে পড়! এতো আগে জেঠাই তোর বিয়ে দেবেন না। তাই পড়ে পড়েই শহিদ হও ছোট বোন।'

অর্থি এবার বেশ বড় সড় করে গাল ফুলালো। তার গাল ফুলানো দেখে চৈত্রিকা আর অর্পিতা দুজনই শব্দ করে হাসে। অর্থি হা করে তাকায় চৈত্রিকার দিকে। গালে হাত দিয়ে সেদিকে তাকিয়েই বলে,

'আপনার হাসিটা অনেক সুন্দর ভাবীজান।'

চৈত্রিকার হাসি বন্ধ হয়ে যায়। মুখ অন্যদিকে ফিরিয়ে নেয়। অর্পিতা নিঃশব্দে হাসে। তারপর অর্থিকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে বলে, 'তোমার ভাবীজানের শুধু হাসি কেনো? সে পুরোটাই সুন্দর। এখন তুমি পড়ো নয়তো বড় আম্মুকে পাঠাচ্ছি আমি!'

'আজ না পড়লে কি হয়? ভাইজান তো কেবল কাল বিয়ে করলো তাহলে আর দুদিন পর থেকেই না হয় পড়ি!'

'জ্বি নাহ। এখনই পড়! তুই এমনেই ফাঁকিবাজ তারওপর কিছু পারিস না। একদম ফাঁকি দিবি না। সব পড়া পড়বি। আমি এসে পড়া নিবো! বড় ভাবীজান চলুন নিচে যায়!'

অর্পিতা উঠে দাড়ালে চৈত্রিকা নিজেও ওঠে। অর্থিকে বেশ নরম স্বরে বলে, 'পড়া শেষ করে তুমিও নিচে আসো। কেমন!'

অর্থি গাল ফুলিয়েই মাথা নাড়ে। চৈত্রিকা হেঁসে নিজের মাথার আঁচল আরও একটু টেনে নিয়ে অর্পিতার পিছু পিছু নিচে নামে। চৈত্রিকাকে দেখে খানিকটা সময় তাকিয়ে থাকে পল্লবী। মুখের দিকে তাকিয়ে কিছু বোঝার চেষ্টা করে। নিজের কাজ করতে করতে বিড়বিড় করে বলে, 'মেয়েটা খুব চতুর! এর থেকে সাবধানে থাকতে হবে।'

চৈত্রিকা নিজেও তাকায় পল্লবীর দিকে। মনে মনে হাসে সে। বেশ মজাও পায়। হল রুমের সোফায় চয়ন, পিয়াস, চিত্র বসে ছিলো। অর্পিতা আর চিত্র দুজনেই একপলক নিজেদের দিকে তাকায়। চয়ন নিজের মতো চা পান করছে। পিয়াসের চোখ তখন চৈত্রিকার দিকে। চৈত্রিকার দিকে থমকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রয়। তাদের ক্রস করে যখন চৈত্রিকা রান্নাঘরের দিকে যায় তখন পিয়াসের চোখ পড়ে চৈত্রিকার ভেজা চুলে। ব্যাস! হাত মুষ্টিবদ্ধ করে রক্তচক্ষু নিয়ে সেদিকে তাকিয়ে রয়। যেনো চোখ দিয়েই সবটা ভ'স্ম করা গেলে সে এমুহূর্তে তাই করতো! তার এই রুপ সবার নজর এড়িয়ে গেলেও এড়ালো না চৈত্রিকা আর নীরার চোখ। নীরার মনের ক্ষো'ভ বাড়লেও চৈত্রিকা মনে মনে কু'টিল হাসি হাসে। বিড়বিড় করে আওড়ায়,

'এ তো কেবল শুরু পিয়াস রেনওয়াজ। বড় ভাইয়ের সুখ সহ্য হয় না বুঝি! তোমরা যত নিজেদের মধ্যে লড়বে আমি তত এগিয়ে যাবো নিজের লক্ষ্যে। শক্তিতে নয় বুদ্ধিতেই একটু একটু করে মা'রবো তোমাদের। একটাও পা'প করে পাড় পাবে না।'

২২.

সকালের খাওয়া দাওয়া শেষে সবাই যখন নিজেদের নিজেদের কাজে বেড়িয়েছে তখন চিত্রও বাড়ি থেকে বের হয়। বেশ অনেকদিন গ্রামের কিছুই দেখা হয় না। অনেক কিছুর কি পরিবর্তন ঘটেছে নাকি আগের মতোই আছে! মনটা বিক্ষিপ্ত হয়ে রয়েছে। একটু শান্তি দরকার। তাই চুপচাপ পকেটে হাত গুজে বের হয়ে এলো বাড়ি থেকে। পেছন পেছন অর্পিতাও বের হয়ে আসে। পেছন থেকে বেশ নিচু স্বরেই ডাকে চিত্রকে। চিত্র ঘাড় বাকিয়ে পিছু তাকাতেই অর্পিতাকে চোখে পড়ে। পুরোপুরি পেছনে ফিরে ভ্রু নাঁচিয়ে জিজ্ঞেস করে, 'কি?'

'কোথায় যাচ্ছো চিত্র ভাই?'

'কোথাও না। আমি এমনিই বের হয়েছি। গ্রামটা অনেকদিন ঠিক মতো দেখা হয় না। এবার যখন অনেক দিন আছি তখন না হয় একটু ঘুরে দেখি!'

'তুমি এবার অনেকদিন থাকবে?'

'হুম।'

চিত্রর ছোট্ট জবাবে চুপ করে যায় অর্পিতা। চিত্র নিজের রাস্তায় ঘুরে যেতে যেতে বলে, 'বাড়ির মধ্যে যা!'

অর্পিতা সাহস নিয়ে ফট করে বলে, 'আমি আসি তোমার সাথে?'

পা থেমে যায় চিত্রর। কপালে ভাজ ফেলে পিছু তাকিয়ে বলে, 'তুই কেনো যাবি?'

'এম-এমনি। তুমি যাচ্ছো তাই ভাবলাম যাই! আসলে আমিও তো অনেকদিন থেকে গ্রামে আসি না। তাই আরকি!'

চিত্র কিছু বলে না। অর্পিতাকে 'আয়!' বলে নিজে হাঁটা লাগায়। অর্পিতা নিজেও ঠোঁট এলিয়ে হেঁসে চিত্রর পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করে। দুজনে বেশ অনেকটা পথ নীরবতা নিয়েই হাঁটে। গ্রামের শেষের দিকে একটা নদী রয়েছে। দুজনে ঠিক সেখানেই আসে। চৈত্র মাসের রোদের তাপে নদী শুকিয়ে গেছে প্রায়। ভ্যাপসা গরমে জান যায় যায় অবস্থা। অথচ এ রোদের মধ্যেই দুজন দাঁড়িয়ে আছে নদীর পাড়ে। চিত্র বেশ নরম স্বরে ডাকে, 'অর্পি!'

অর্পিতা চমকে তাকায়। কতগুলো দিন পর চিত্রর মুখে সেই আগের মতো আদুরে ডাক শুনে চোখ বন্ধ করে নেয়। ভেতরটা শীতলতায় ভরে ওঠে। চিত্র আড়চোখে অর্পিতার প্রশান্তি ভরা মুখ দেখে চোখ ফিরিয়ে নেয়। নিজেকে প্রস্তুত করে অর্পিতার মন ভাঙার জন্য। চোখ দুটো অন্যদিকে নিয়ে বেশ দ্রুত স্বরে বলে,

'তুই আমার কাছে যা চাচ্ছিস তা সম্ভব না অর্পি। আমি অন্য কাউকে ভালোবাসি৷ তাই তোর জন্য এটাই মঙ্গলের যে তুই আমার থেকে দুরে থাক!'

২৩.

বিকেলের দিকে চয়নের ঘরে যায় প্রহর। চোখে মুখে তার ভীষণ গম্ভীরতার ছাপ। শার্টের হাতা গুটিয়ে নিয়ে চয়নের সামনে যায়। চয়ন প্রহরকে এই সময় নিজের ঘরে দেখে ভ্রু কুঁচকায়। ছেলের দিকে তাকিয়ে বলে,

'এই সময় তুমি! কিছু হয়েছে প্রহর?'

প্রহর জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নেয়। তারপর রয়ে শয়ে বলে, 'আমাদের বউভাতের ব্যবস্থা করুন আব্বাজান। গ্রামের সকল মানুষ সহ যত আত্মীয়-স্বজন আছে সবাইকে দাওয়াত করুন!'

চয়ন অবাক দৃষ্টিতে তাকায় নিজের বড় ছেলের দিকে। সাথে ভেতরে ভেতরে বেশ চমকেও যায়। হঠাৎ প্রহরের এহেন সিদ্ধান্তের কিছুই বুঝে ওঠে নাহ। তবে কিছু বলতে নিলে প্রহর তাকে থামিয়ে দিয়ে নিজেই আবারও বলে,

'আমি যা বলেছি ভেবেই বলেছি। আপনি সবকিছুর ব্যবস্থা করুন।'

'তুমি আসলেই ভেবে বলছো প্রহর? এতে কি হতে পারে তা তুমি বুঝতে পারছো?'

'জ্বি আব্বাজান। আর হ্যাঁ! কোনো আত্মীয়কে বাদ দিবেন না। আমার জানামতে আপনার নিমন্ত্রণ কেউ ফেলতে পারবে না তাই কাউকে বাদ দিবেন না।'

চয়ন গম্ভীর দৃষ্টিতে ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। তার বুঝতে বাকি নেই তার ছেলে তাকে কি বুঝিয়ে গেলো! তবে এমন সিদ্ধান্তের আগা মাথা কিছুই তার মাথায় ঢুকলো না। প্রহর নিজের সিদ্ধান্ত জানিয়ে চুপচাপ কক্ষ ত্যাগ করে। প্রহরের যাওয়ার পানে তাকিয়ে কেউ খুব গোপনে শ'য়'তা'নী হাসি হাসে।

প্রহর নিজের ঘরে এসে দেখে চৈত্রিকা আর অর্থি বসে আছে। দুজনে জমিয়ে গল্প করছে। প্রহরকে দেখে অর্থি ছুটে আসে তার কাছে। নিজের হাত বাড়িয়ে দিতেই প্রহর হেঁসে পকেট থেকে চকলেট বের করে দেয়। অর্থি বেশ খুশি মনেই ঘর ছেড়ে বের হয়ে যায়। চৈত্রিকা নিজের মতো তখনো ঠায় বসে রয়েছে। প্রহর কোনো শব্দ না করে নিজের জামাকাপড় নিয়ে গোসলখানায় ঢুকে পড়ে। বেশ অনেকটা সময় পর এসেও সে চৈত্রিকাকে নিজের জায়গাতে বসে থাকতে দেখে বলে,

'বাহ! এখনো আছো? আমি তো ভেবেছিলাম আমি আসতে আসতে তুমি পালিয়ে যাবে!'

চৈত্রিকা ভ্রু কিঞ্চিত কুঁচকে বলে, 'পালাবো কেনো? আমি কি চো'র নাকি ডা'কাত জমিদার সাহেব? যে পালাতে যাবো!'

'সে তো তুমিই ভালো জানো। কাল রাতে যেভাবে পালাই পালাই করলে তাতে তো আমার মনে হলো তুমি আমার ঘরের বউ না কোনো শ'ত্রু!'

চৈত্রিকা চমকায়। প্রহরের ঠোঁটে হাসি৷ চৈত্রিকা নিজেকে সামলাতে সামলাতেই প্রহর এসে শুয়ে পড়ে তার কোলে। চৈত্রিকা আরো এক দফা চমকে সরে যেতে নিলে প্রহর আটকে দেয়। হাত দিয়ে কোমড় জড়িয়ে উদরে মুখ গুঁজে দেয়। চৈত্রিকা জমে যায়। কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলে,

'আপনি এমন চিপকে আসছেন কেনো? দুরে সরুন!'

প্রহর পাত্তাই দিলো না। নিজের মতো শুয়ে থেকেই বললো, 'আমার ঘুম পাচ্ছে। ঘুমাবো! এভাবেই থাকো।'

'এই অবেলায় কে ঘুমায়? আর ঘুমাবেন নিজের বালিশে ঘুমান। আমাকে ছাড়ুন!'

প্রহর ছাড়ে না। প্রহরের ভেজা চুলের পানিতে চৈত্রিকার শাড়ি ভিজে লেপ্টে যায়। চৈত্রিকা তা খেয়াল করে সব ভুলে খ্যাক করে ওঠে। রাগী স্বরে বলে,

'চুল না মুছে শুয়ে পড়েছেন কেন আপনি? আপনার চুলের পানিতে আমার শাড়ি ভিজে যাচ্ছে। উঠুন এক্ষুণি! ছাড়ুন আমাকে! চুল মুছে এসে বিছানায় মাথা দিয়ে ঘুমান।'

প্রহর কপালে ভাজ ফেলে মাথা উচু করে তাকায় চৈত্রিকার দিকে। কিছুক্ষণ চৈত্রিকার মুখের দিকে তাকিয়ে বেশ গম্ভীর স্বরে বলে, 'সমস্যা কি মেয়ে? এতো পটর পটর কেনো করো? মুখটা একটু বন্ধ রাখতে পারো না? আমার চুলের পানি নিয়ে সমস্যা হলে নিজে মুছে দাও।'

'আমি আপনার চুল মুছবো?'

'হ্যাঁ। কারণ সমস্যাটা তোমার, আমার না। তোমার শাড়ি ভিজে যাচ্ছে, আমার না।'

চৈত্রিকা কটমট করে তাকায়। প্রহর ফের নিজের মতো মুখ গুজে দিয়ে এক হাতে তোয়ালে এগিয়ে দেয় চৈত্রিকার কাছে। চৈত্রিকা কিছুতেই প্রহরের চুল মুছবে না। নিজের শাড়ি ভিজছে ভিজুক তবুও সে নিজ ইচ্ছায় এই লোককে ছুঁয়েও দেখবে না। ক্ষো'ভ নিয়েই মনে মনে আওড়ায়,

'নিজ ইচ্ছায় আপনার মতো প'শুকে আমি ছুঁবো না প্রহর রেনওয়াজ। বাধ্য না হলে আপনাকে নিজের এতোটা কাছে কখনোই আসতে দিতাম না। নেহাৎই আপনি আমার নামমাত্র স্বামী।'

তাচ্ছিল্যের সুরে হাসে চৈত্রিকা। ভেতরের আগুন যেনো দাউদাউ করে জ্ব'লছে। প্র'তিশোধের নেশায় বুদ হওয়া হৃদয়টা জ্ব'লছে তখনো। প্রহরের দিকে চেয়ে চৈত্রিকা মনে মনে কিছু ভাবে। তখনই ভেসে আসে প্রহরের কন্ঠের দু লাইন বাক্য,

'ভেতরের আগুন ভালোবাসায় না নিভে যায় চৈত্রিকা!

ভালোবাসা কিন্তু বড্ড খারাপ জিনিস, সবকিছু এক নিমিষেই না জ্বা'লিয়ে দিতে পারলে শান্তও করে দিতে পারে। সাবধান বউ!'

চলবে..

(আসসালামু আলাইকুম। ভুলত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন। নতুন নতুন কলেজ, কোচিং করছি তো সবকিছু সামলাতে বেশ হিমশিম খাচ্ছি🤧 কাল একটু বেশিই ব্যস্ত ছিলাম তাই লিখতে পারিনি। আর একটা কথা! একটা গল্প কখনোই কারো মন মতো হয় না। সবাই আমার গল্প পছন্দ করবে বিষয়টা এমনও না। যাদের মনে হবে গল্পটা কপি করা কিংবা কমন থিমের তাদের শুধু এটুকুই বলবো, 'যখন জানেনই পরবর্তীতে কি হবে তখন আর পড়ে সময় নষ্ট করে কি হবে?' আমরা গল্প লিখিই আপনাদের জন্য। আপনাদের এড়িয়ে যেতে বলবো না। তবে পড়া গল্প মনে হলে পড়েই বা কি হবে? আমি কাউকে খোঁ'চা মে'রে কিছু বলিনি তাই কেউ অন্য কিছু ভেবে বসে থাকবেন না। আমি শুধু নিজের কথাটুকু বললাম🥹 খারাপ লাগলে দুঃখিত ❤️ আর একটু গঠনমূলক মন্তব্য করলেও তো পারেন🥺 নাইস নেক্সট দেখতে দেখতে অবস্থা খারাপ🤧)#চৈত্রিকা (১০)

#বোরহানা_আক্তার_রেশমী

_______________

২৪.

চৈত্র মাসের ভ্যাপসা গরম। রোদের উত্তাপে বাহিরে থাকা মুশকিল। বাড়ির মধ্যেও সমানে ফ্যান চলছে। এই গরমের মধ্যেই অর্থি বইখাতা নিয়ে পড়ার ঘরে এসেছে। নিবিড় আজ পড়াতে আসবে। অর্থি গরমে, বিরক্তিতে চোখ মুখ কুঁচকে আছে। এর মধ্যেও কেনো নিবিড়ের পড়াতে হবে? একদিন ছুটি দিলে কি হয়! তার চিন্তা ভাবনার মাঝেই নিবিড় দরজা ঠেলে ভেতরে আসে। অর্থি চোখ মুখ কুঁচকে বলে,

'আপনার কি হুশ জ্ঞান নেই মাষ্টারমশাই? এই গরমের মধ্যে কেউ পড়ে?'

একেই তো গরমে অবস্থা খারাপ তারওপর এতো দুর হেঁটে এসে আবার অর্থির এহেন কথা শুনে আপনা আপনিই ভ্রু কুঁচকে যায় নিবিড়ের। কোনো রকমে ফ্যানের নিচে বসে আগে জিরিয়ে নেয়। দৃষ্টি তখনো অর্থির মুখের দিকে। অর্থি নিজেও ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে নিবিড়ের দিকে। গরমে শ্যাম বর্ণ মুখটা লাল হয়ে আছে। গালের খোঁচা খোঁচা দাড়ির সাথে ঘাম চিক চিক করছে। কপালে পড়া চুলগুলো নিবিড় বার বার ঠেলে সরিয়ে দিচ্ছে। অর্থি হা করে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলে,

'আপনার কি অনেক বেশি গরম লাগছে মাষ্টারমশাই?'

নিবিড়ের আর ধৈর্যে কুলালো না। দাঁতে দাঁত চেপে অর্থির দিকে খানিকটা এগিয়ে এসে বললো, 'নাহ! আমার একটুও গরম লাগছে না। আমার অনেক ঠান্ডা লাগছে। ইচ্ছে করছে লেপ, কাথা মুড়ি দিয়ে ঘুমাই।'

বোকা অর্থি নিবিড়ের রাগ তো বুঝলোই না উল্টো তার রাগ দ্বিগুণ বাড়িয়ে ছোট ছোট স্বরে বললো, 'তাহলে কি আমি ফ্যান অফ করে দিবো মাষ্টারমশাই? আম্মাজান কে বলবো লেপ, কাথা এনে দিতে?'

গরমকালে এমনিই কিছু মানুষের মেজাজ সপ্তম আসমানে থাকে। সেসব মানুষের মধ্যেই নিবিড় পড়ে। বিরক্তি আর রাগে ধমক লাগিয়ে দেয় অর্থিকে। এতো বোকা কেউ হয়? মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে মেয়েটাকে মাথায় তুলে আ'ছাড় মা'রতে নেহাৎই সে ভদ্র ছেলে নয়তো কবে যে মে'রে বসতো তার ঠিক ঠিকানা নেই। নিবিড়ের ধমকে অর্থি ভয় পেয়ে যায়৷ চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে কিছু বলতে নিলে নিবিড় চোখ গরম করে তাকায়। ভয়ে আর কিছু না বলে চুপচাপ নিজের খাতায় মন দেয়৷ বার কয়েক ঢোক গিলে অঙ্ক বই নিয়ে বসে অঙ্ক করতে নেয়। কিন্তু নিবিড়ের চোখ গরম আর ধমকে তার মাথার মধ্যে সব অঙ্কেরা জট পেকে যায়। পিটপিট করে বইয়ের দিকে আর খাতার দিকে তাকিয়ে থেকে মাথা চুলকাতে শুরু করে। নিবিড় ততক্ষণে ঠান্ডা হাওয়া গায়ে লাগিয়ে শান্ত হয়ে গেছে। অর্থির অযথা বসে থাকা দেখে গম্ভীর স্বরে বলে,

'এই মেয়ে! বসে বসে মাথা চুলকাও কেন? তোমাকে মাথা চুলকানোর কাজ দিয়েছি নাকি অঙ্ক কষতে বলেছি?'

অর্থি জবাব দেয় না। কলম মুখে পুড়ে নিজ মনে অঙ্কের দিকে চেয়ে রইলো। অঙ্কটা তার বেশ চেনা চেনা মনে হচ্ছে। অর্থির এমন এক ধ্যানে অঙ্কের দিকে চেয়ে থাকা দেখে ভ্রু কুঁচকে নেয় নিবিড়। নিজেও কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলে,

'অঙ্ক না করে বসে বসে অঙ্কের চেহারা কেনো দেখছো? কি সমস্যা?'

অর্থি বেশ উত্তেজিত স্বরে বললো, 'মাষ্টারমশাই! এই অঙ্ককে বেশ চেনা চেনা মনে হচ্ছে! আগেও কোথাও দেখেছি মনে হয়!'

নিবিড়ের গা জ্বা'লা করে উঠলো। ইচ্ছে করলো কয়েক ঘা বসিয়ে দিতে। নিজের রাগ দমন করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলো। শেষে গিয়ে চোয়াল শক্ত করে বললো,

'তোমার মতো গা'ধা, গ'র্দভ, মাথামোটা, ইডিয়েট মেয়ে আমি এজন্মে একটাও দেখিনি৷ গত এক সপ্তাহ থেকে আমি তোমাকে এই বিষয়ের অঙ্ক করাচ্ছি। এটা অন্তত পক্ষে ১০ বার করিয়েছি আর এখন এসে তুমি বলছো এই অঙ্ক তোমার চেনা চেনা মনে হচ্ছে! তোমাকে কি করা উচিত?'

অর্থি মাথা নিচু করে নেয়। নিবিড় রেগে গেছে বুঝে সে আর একটা টু শব্দও করে না। তবে মন আনচান করছিলো এটুকু বলতে, 'আপনার জন্যই তো গুলিয়ে ফেলেছি। আপনি আমাকে ধমক না দিলে কি ভুলে যেতাম!' কিন্তু বলার মতো সাহস না থাকায় চুপচাপ খাতার পৃষ্ঠা উল্টিয়ে আগের অঙ্ক দেখে নেয়। তারপর নিজ মনে অঙ্ক করতে থাকে। নিবিড় হাত মুষ্টিবদ্ধ করে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করছে। প্রায় ১ টা মাস হতে চললো অথচ এই মেয়েকে একটা অঙ্কও ঠিক ভাবে শেষ করাতে পারলো না। এভাবে কতদিন চলবে? নাহ! এবার একটা কিছু করতেই হবে। অনেক ভেবে চিন্তে একটা সিদ্ধান্তে এসে পৌছোয়। গলা পরিষ্কার করে বেশ গম্ভীর স্বরে অর্থিকে উদ্দেশ্য করে বলে,

'এ মাস শেষ হলে আমি আর তোমাকে পড়াবো না অর্থি। আমি তোমার আব্বাজানকে বলে দিবো!'

হাত থেমে যায় অর্থির। চোখ ছোট ছোট করে তাকায় নিবিড়ের দিকে৷ অজানা কারণেই বেশ খারাপ লাগে। মাষ্টারমশাই সত্যিই আর তাকে পড়াবে না? কেনো? সে কি এতোটাই খারাপ ছাত্রী! নাহ তো। অভিমানে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বিড়বিড় করে বলে,

'আমি কি খারাপ ছাত্রী নাকি? নাহ তো। আমি অনেক ভালো ছাত্রী। শুধু একটু পড়ি নাহ তাই বলে মাষ্টারমশাই আমাকে পড়ানোই বাদ দিবে? আমার না হয় একটু পড়তেই ইচ্ছে করে না তাই বলে উনি এমন করবে?'

২৫.

জমিদার বাড়ির বিশাল দীঘির সামনে এসে দাঁড়িয়ে আছে চৈত্রিকা। রোদ কমে গেছে। সূর্যও ডোবা ডোবা ভাব। গোধুলী লগ্নের হালকা আলো এসে ছড়িয়ে পড়েছে চারপাশ। চৈত্রিকা কিছুক্ষণ মুগ্ধ দৃষ্টিতে সবটা দেখে দীঘির দিকে এগিয়ে যায়। শান বাঁধানো সিড়িতে বসে পা ডুবিয়ে দেয় দীঘির জলে। স্বচ্ছ পানিতে স্পষ্ট ফুটে ওঠে তার প্রতিবিম্ব। নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে কিছু ভাবতে থাকে। ঠিক সে সময়ই ভেসে আসে এক পুরুষালী কন্ঠ। ঘাড় বাকিয়ে পিছু তাকাতেই চোখে পড়ে পিয়াসকে। চৈত্রিকা মনে মনে হাসে। তবে মুখভঙ্গির একটুও পরিবর্তন করে না। নিজের মতো উঠে দাঁড়িয়ে পিয়াসের মুখোমুখি হয়। পিয়াস দু পা এগিয়ে আসে। বেশ শান্ত স্বরে বলে,

'এই অবলোয় এখানে কি করছেন বড় ভাবী? সাঝের সময় মেয়ে বউদের বাহিরে থাকতে নেই। অন্তত আমাদের জমিদার বাড়ির বউদের তো আরো আগেই না।'

'কেনো মেজো ভাই? সাঝের সময় বাহিরে থাকতে সমস্যা কোথায়?'

পিয়াস অদ্ভুত ভাবে হাসে। নিজের শার্টের হাতা গোটাতে গোটাতে বলে, 'সে তো অনেক সমস্যা আছে। এসব ছাড়ুন। আপনার কি অবস্থা? বিয়ে তো করলেন! বড় ভাইজানের ব্যাপারে সব জানেন তো?'

চৈত্রিকা ভ্রু কুঁচকে তাকায়। হাত বগলদাবা করে বলে, 'কি জানবো?'

পিয়াস উত্তর দেয় না। শুধু হাসে। তারপর পেছনে ঘুরে চলে যেতে যেতে বলে, 'মহুয়া ভাবীজানের মৃ'ত্যু কিন্তু এই দীঘির পানিতেই হয়েছে।'

চমকে ওঠে চৈত্রিকা। সে আগেই জানতো এ দীঘির জলেই মহুয়ার মৃ'ত দেহ উদ্ধার হয়েছিলো কিন্তু পিয়াসের বলার মাঝে অন্য কিছু ছিলো। কি ছিলো? সাবধান বাণী নাকি আসন্ন বিপদের আভাস!

২৬.

কাল সকালের দিক থেকেই মনটা বিষণ্ন ছিলো অর্পিতার। চিত্রর মুখে অন্য কাউকে ভালোবাসার কথা শুনে তার যেনো হৃদপিণ্ডই কিছুক্ষণের জন্য থেমে গেছিলো। যার জন্য পুরো ৪ টা বছর সে অপেক্ষা করলো! যার ভালোবাসা পাওয়ার তৃষ্ণায় সে প্রতিটা মুহুর্ত ছটফট করলো সেই মানুষটাই কি সুন্দর এক লাইনে বললো, 'আমি অন্য কাউকে ভালোবাসি।' সুন্দর না? আসলেই তো সুন্দর। ঘরের এক কোণের মেঝেতে বসে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে আনমনে অনেক কিছুই ভাবছিলো অর্পিতা। কালকের ঘটনাগুলো মনে পড়লেই নিজের প্রতি নিজের তাচ্ছিল্যতা বেড়ে চলেছে। সে এই মানুষটাকে ভালোবাসে! যে তার ভালোবাসার মূল্যই দেয় না। নিজের ওপর নিজের আকাশ সমান রাগ হলো। কেনো তার ভেতরের আবেগ, মোহ কাটে না? কেনো বার বার এই পুরুষটার মায়াতে আষ্টেপৃষ্টে যায় সে? রাগের সাথে সাথে ভীষণ কান্নাও পেলো। ভাঙা ভাঙা স্বরে আওড়ালো,

'তোর জন্য বড্ড মায়া হচ্ছে রে অর্পিতা। তুই যে কেনো এতো বোকা! কেনো ভালোবাসার মতো ভুল করে তিলে তিলে ম'র'ছিস? কি দরকার ছিলো? এখন শান্তি পাচ্ছিস! তোর কপালে ওই এক টুকরো সুক্ষ্ম সুখই নেই। যা তুই চিত্র ভাইয়ের থেকে চাস!'

ক্ষণেই হেঁসে উঠে। রাগ, কান্না, হাসি সব যেনো একসাথে এলো। নিজেকে পাগল মনে হলো তার। অনুভূতি শূণ্যের মতো চেয়ে রইলো জানালায়। সে সময় খট করে দরজা খুলে যায়। সেদিকে একটুও ভ্রুক্ষেপ করে না অর্পিতা। অর্থি ঘর অন্ধকার দেখে বেশ ভয়ে ভয়ে ডাকে,

'ওহ আপু! কোথায় তুমি? তোমার ঘরের আলো কই? ওহ ভাবীজান আপুরে তো দেখতে পাই না!'

অর্পিতা ফট করেই জানালা থেকে চোখ সরালো। অর্থি ভাবীজান ডাকলো! চৈত্রিকা এসেছে? তার ভাবনার মাঝেই চৈত্রিকার নরম স্বরে ভেসে আসা বাক্য কানে আসে,

'ভয় পেও না অর্থি। দাঁড়াও! আমি লাইট জ্বালিয়ে দিচ্ছি। সুইচ কোন দিকে জানো তুমি?'

অর্থি বলে দেয় কোনদিকে সুইচ বোর্ড। চৈত্রিকা সে অনুযায়ী হাতড়ে হাতড়ে সুইচ অন করে। ততক্ষণ পর্যন্ত অর্থি হাত চেপে ধরে থাকে। লাইটের আলো চোখে পড়তেই অর্পিতা চোখ মুখ কুঁচকে নেয়। আর অর্পিতাকে ওভাবে বসে থাকতে দেখে আঁতকে ওঠে অর্থি। ছুটে এসে অর্পিতার পাশে বসে বলে,

'আপু! তুমি এখানে বসে আছো কেন? কি হয়ছে আপু? তোমার চোখ মুখ এমন কেন?'

চৈত্রিকাও ততক্ষণে এগিয়ে এসেছে। হাটু মুড়িয়ে বসে অর্পিতার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে। বুঝতে পারে কোনো কারণে অর্পিতা মন থেকে ভেঙে পড়েছে আর এজন্যই তার এমন বি'ধ্বস্ত রুপ। অর্থির প্রশ্নের উত্তর দেয় না অর্পিতা। চুপচাপ নিজ জায়গায় ওভাবেই বসে থাকে। চৈত্রিকা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,

'আপু উঠুন! এখানে বসে আছেন কেনো?'

অর্পিতা কোনো কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ নিজ জায়গা থেকে উঠে। তারপর ঢুলতে ঢুলতে বিছানায় খাটের সাথে হেলান দিয়ে বসে। অন্যদিকে তাকিয়ে বলে,

'লাইট অফ করে তোমরা যাও। আমি ঘুমাবো!'

অর্থি কিছু বলতে নিলে হাত আটকে থামিয়ে দেয় চৈত্রিকা। চোখের ঈশারায় চুপ করে থাকতে বলে। এরপর নিজে আস্তে করে বলে, 'লাইট টা জ্বালানোই থাকুক আপু। আপনি এভাবেই ঘুমান।'

অর্পিতা কিছু বলে না। অর্থির হাত ধরে ঘর থেকে বের হয় চৈত্রিকা। অর্থি অবুঝ স্বরে শুধায়,

'ভাবীজান আপুর কি হয়ছে? আপু এমন করলো কেনো? একা রেখে আসলেন কেনো? আপু কি সত্যিই ঘুমাবে?'

'মনে হয় আপুর মন খারাপ। তাই উনি এখন একা থাকতে চাচ্ছে। আমরা না হয় পরে উনার সাথে গল্প গুজব করবো! এখন তুমি গিয়ে পড়তে বসো। আমিও ঘরে যাই!'

অর্থি মাথা নাড়ায়। মনে পড়ে যায় নিবিড় তাকে পড়াবে না বলেছে। মনটা খারাপ হয়ে যায়। চৈত্রিকার সাথে পা মিলিয়ে নিজের ঘরের উদ্দেশ্যে হাঁটা লাগায়। মনে মনে বেশ শক্ত পোক্ত প্রতিজ্ঞা করে। এবার থেকে সে একটুও ফাঁকিবাজি করবে না। অনেক ভালো করে পড়বে আর মাষ্টারমশাইকেও দেখিয়ে দেবে সেও যে পড়ালেখা করতে জানে! হুহ।

চৈত্রিকা অর্পিতার বিষয়টা ভাবতে ভাবতেই নিজেদের ঘরে আসে। প্রহর ততক্ষণে শুয়ে পড়েছে। এতো তাড়াতাড়ি প্রহরকে শুয়ে পড়তে দেখে ভ্রু কুঁচকে যায় চৈত্রিকার। বিয়ের শুধুমাত্র ২ রাত হয়েছে এবাাড়িতে। আর এই দুই রাতেই চৈত্রিকাকে কিছুটা হলেও ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে থাকতে হয়েছে। প্রহর পুরোপুরি কাছে না আসলেও বেশ অনেকটাই কাছে আসে। ততটা সময় চৈত্রিকার আল্লাহকে স্মরণ করতে করতেই সময় কেটে যায়। আজ আগে আগেই শুয়ে পড়েছে! কিছুটা সন্দেহ হলেও স্বস্তির শ্বাস ফেলে। আজ আর তাকে ভয় পেতে হবে না। চুপচাপ নিজে কিছুক্ষণ ব্যালকনিতে ঘুরে ফিরে এসে শুয়ে পড়ে। প্রহরের চেয়ে বেশ খানিকটা দুরত্ব রাখে। অনেকটা রাত পেরিয়ে যাাওয়ার পরও ঘুম আসে না। এপাশ ওপাশ করতে করতেই সময় কাটে অনেকক্ষণ। হুট করেই গরম, উত্তপ্ত কিছু এসে ঠেকে চৈত্রিকার পেটের ওপর। চৈত্রিকা চমকে উঠে সরে যায়। খেয়াল করে প্রহর গোঙাচ্ছে আর বিড়বিড় করে কিছু বলছে। হঠাৎ প্রহরের এমন অবস্থায় বেশ ঘাবড়ে যায় চৈত্রিকা। কাঁপা কাঁপা হাতে প্রহরের হাত ছুঁয়ে দেখে গা পু'ড়ে যাচ্ছে রীতিমতো। চমকে হাত সরিয়ে কান টা এগোয় প্রহরের দিকে। ভাঙা ভাঙা ভাবে কিছু বাক্য এসে কানে বা'রি খায়,

'তুমি প্র'তারক! তোমরা প্র'তারক! আমি তোমাকে যেভাবে ভালোবেসেছি তুমি বাসোনি মহুয়া। তুমি বাসোনি।'

জ্বরের ঘোরে কথাগুলো বার বার আওড়াচ্ছে প্রহর। চৈত্রিকা সরে এসে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইলো মুখের দিকে। মহুয়া প্রহরকে ঠ'কিয়েছে! ভালোবাসেনি! কই? সে তো শুনেছিলো মহুয়া আর প্রহর একে অপরকে ভীষণ ভাবে ভালোবাসে! তবে কি এই দেখার মাঝেও আরো দেখা আছে? চারপাশে চোখ বুলায় চৈত্রিকা। বিড়বিড় করে বলে,

'এই জমিদার বাড়ির ইট, পাথরেও যেনো র'হস্যের গন্ধ। শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়াবো!'

রাত যত গভীর হচ্ছে ততই প্রহরের জ্বর বাড়ছে। গায়ের উত্তাপ বাড়ছে ক্ষণে ক্ষণে। চৈত্রিকা কি করবে ভেবে পেলো না। ইচ্ছে করলো না প্রহরের সেবা করতে আবার এভাবে কতক্ষণ তাও ভেবে পেলো না। এক মন যেনো বুলি আওড়াচ্ছে, 'প্রহর তো তোমার স্বামী তবে ওর সেবা করতে দ্বিধা কোথায়? মানলাম তুমি প্র'তিশোধের জন্য এসেছো তাই বলে কি মানুষ হয়ে মনুষ্যত্বও ত্যাগ করলে!' পরক্ষণেই যেনো বিবেক যুদ্ধ ঘোষণা করছে মনের বিরুদ্ধে। ভীষণ কড়া ভাবে তাকে শাসিয়ে বলছে, 'তুমি এসেছোই ওদের মা'রতে তবে এখন ম'রুক না হয় বাঁচুক তাতে তোমার ক

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৫ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন