ফন্ট সাইজ:
থিম:
চৈত্রিকা

১৭তম পর্ব

লেখক: বোরহানা আক্তার রেশমি

#চৈত্রিকা (৩৩)

#বোরহানা_আক্তার_রেশমী

________________

৮৮.

চৈত্রিকাকে সত্যি সত্যিই পল্লবী ২য় বারের মতো বরণ করে ঘরে তুলেছে। সবাই খুশি হলেও চয়ন, পিয়াস, সাদিক শুধু পারছে না সবাইকে চোখ দিয়েই ভ'স্ম করে দিতে! কিন্তু প্রহরের সামনে তাদের কোনো কিছুই যে চলবে না এটা তারা ভালো মতোই জানে। নাসিমা পালিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। যতটুকু সম্ভব নজড় এড়াচ্ছে অনিমের। কিন্তু অনিম বার বার ওই নাসিমার দিকেই তাকাচ্ছে। ওহ হ্যাঁ! অনিম যেহেতু চৈত্রিকার ফুপাতো ভাই হয় তাই বোনের শ্বশুরবাড়ি হিসেবে সেও এসেছে জমিদার বাড়িতে। এতে কেউ তেমন কিছু না বললেও নাাসিমা সাদিককে বারণ করেছিলো। সাদিক নাসিমার কথা শুনেও কাউকে কিছু বলেনি। নাসিমা ব্যবহার তার কাছে সন্দেহজনক লেগেছে কিন্তু পুরো বিষয়ে তাকে কিছুই বলেনি। এখন সে অযথা কারণে যদি অনিমকে জমিদার বাড়িতে যেতে নিষেধ করে সেটা ভালো দেখায় না। এদিকে অনিমের মাথা হ্যাঙ হয়ে গেছে। চৈত্রিকার বিয়ের কথা শুনে আর নাসিমাকে দেখে সে রীতিমতো আকাশ থেকে পড়ছে। যতবারই সব ভাবছে ততবারই তার হাত পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়তে ইচ্ছে করছে। নিজের মাথায় এতো প্রেশার না দিয়ে সে ছুটলো চৈত্রিকার কাছে। চৈত্রিকা তখন কেবলই নিজের ঘরের উদ্দেশ্যে হাঁটা লাগিয়েছে। অনিম হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসে চৈত্রিকার সামনে দাঁড়ায়। চৈত্রিকা ভড়কে গিয়ে দু কদম পিছিয়ে দাঁড়ায়। কোনো রকমে বলে,

'কি হয়ছে অনিম ভাই? তুমি এমন ছুটে এলে কেনো?'

'তুই আমাকে এটা জিজ্ঞেস করছিস! তোরা মা মেয়ে মিলে যে আমার মাথার ১২ টা বাজিয়ে দিয়েছিস তার কি হবে শুনি!'

চৈত্রিকা সতর্কিত দৃষ্টিতে চারপাশ নজর বুলিয়ে বলে, 'এসব কথা বলো না ভুল করেও৷ এটা কিন্তু বাড়ি কম শ'ত্রুবাড়ি বেশি। এখানে একেকটা ইট পাথরও আমাাদের জন্য ভ'য়ং'কর। তাই এসব কথা বলো না এখানে।'

অনিম ফোঁস করে শ্বাস নেয়। গাল দুটো কিছুটা ফুলিয়ে বলে, 'তো জমিদারের বউ এবার আমাকে নিজের ঘর দেখায় দে! আমি একটু ঘুমিয়ে মাথাটা ঠান্ডা করতে চাই।'

'ওমা! এই অবেলায় ঘুমাবে? আর একটু পর তো আযান দেবে!'

'দিক! তুই আমারে ঘর দেখায় দে।'

'আচ্ছা চলো! নীরা আপুকে ডেকে তোমাকে ঘর দেখাচ্ছি।'

অনিম মাথা নেড়ে চৈত্রিকার পিছু পিছু হাঁটা লাগায়। তারপর হুট করেই আবার চৈত্রিকার পাশাপাশি এসে বলে, 'চৈত্রিকা একটা জিনিস খেয়াল করছিস?'

'কি জিনিস?'

'ছোট বেলায় তোকে কোনো কাজ দিলে তুই না করলে তখন আমি তোকে 'জমিদারের বউ' বলতাম! এখন দেখি তুই সত্যি সত্যিই জমিদারের বউ হয়ে গেছিস। ওয়াও! এই তুইও আমারে জমিদারের মেয়ে জামাই বল! তাহলে আমিও জমিদারের মেয়ে জামাই হয়ে যাবো। হাউ সুইট!'

অনিমের কথার ধরণ শুনে চৈত্রিকা হেঁসে ফেলে। নীরার ঘরের সামনে গিয়ে বলে, 'আমার কিন্তু একটা ননদিনী আছে অনিম ভাই!'

অনিম লাফিয়ে ওঠে। চৈত্রিকাকে কিছু বলার আগেই চৈত্রিকা নীরার ঘরের ভেতর চলে যায়। অনিম যায় নাহ। সে বাহিরে থাকতেই চৈত্রিকা আর নীরা একসাথে বের হয়ে আসে। অনিম আর কিছু বলতে পারে না। এরপর নীরার সাথে চৈত্রিকা অনিমকে ঘর দেখিয়ে আবার নীরার সাথেই ফিরে আসে। অনিমের পেট গুড়গুড় করা শুরু করে। বিছানায় চিৎপটাং হয়ে শুয়ে এপাশ ওপাশ করে। বিড়বিড় করে বলে,

'এই মেয়েটা নিজের ননদিনীর কথা বলে গেলো কিন্তু দেখিয়ে গেলো না! আহা জমিদারের মেয়ে জামাই!'

৮৯.

রাতে সবাই খেতে বসার পর পল্লবী খাবার নিয়ে চিত্রর ঘরের দিকে যায়। অর্পিতা অনেকক্ষণ থেকেই উসখুস করছিলো চিত্রর ঘরে যাওয়ার জন্য কিন্তু কোনো ভাবেই যেতে পারছিলো না৷ মূলত যাওয়ার কোনো কারণ খুঁজে পাচ্ছিল না। পল্লবীকে খাবার হাতে যেতে দেখে অর্পিতা দৌড়ে আসে। পল্লবী হুট করে অর্পিতাকে সামনে চলে আসতে দেখে খানিকটা চমকালেও নিজেকে সামলে হাসার চেষ্টা করে বলে,

'কিছু বলবি অর্পি?'

অর্পিতা মাথা নিচু করে দৃষ্টি এদিক ওদিক করে। ফাঁকা ঢোক গিলে আমতা আমতা করে বলে, 'খাবারটা আমাকে দাও বড় আম্মু! আমি নিয়ে যাই?'

পল্লবী প্রথমে না করতে গিয়েও আবার থেমে যায়। অর্পিতার ইতস্তত করার কারণ বুঝতে পেরে হাসি মুখে খাবারের প্লেট অর্পিতার হাতে ধরিয়ে দেয়। তারপর অর্পিতার থুতনীতে হাত রেখে বলে,

'দেখ মা! তখন চিত্রকে পাচ্ছিলাম না বলেই টেনশনে তোকে যা তা বলে দিয়েছি। তুই কিছু মনে করিস না কিংবা বড় আম্মুর ওপর রাগও রাখিস না। আমি মা তো! আমার ভেতরটা বুঝবি না। আর চিত্রর ঘরে যেতে এতো ইতস্তত করার কি আছে? মাঝের সবটুকু ভুলে যাওয়ার চেষ্টা কর। দুজনে আবার আগের মতো হওয়ার চেষ্টা কর!'

অর্পিতা মাথা নাড়ায়। পল্লবী হেঁসে নিচে চলে যায়। অর্পিতা খাবার হাতে বড় বড় কয়েকটা শ্বাস নিয়ে ঘরের সামনে যায়। প্রহর যেহেতু এই সময় বাড়িতে তাই দরজার সামনে আর কোনো পাহাড়াদার নেই। অর্পিতা ঘরের বাইরে থেকে গলা পরিষ্কার করে দরজায় টোকা দেয়। ছোট্ট করে বলে,

'চিত্র ভাই আসবো!'

শ্বাস আটকে রেখে চোখ বন্ধ করে ফেলে অর্পিতা। হঠাৎ করেই তার কি হয়েছে কে জানে! নিজের অনুশোচনাবোধের জন্য এমন হচ্ছে নাকি অনুভূতির জন্য বুঝে ওঠে না। ওপাশ থেকে এতোগুলো দিন পর অর্পিতার কন্ঠস্বরে থমকায় চিত্র। নিজের অনুভূতিদের সংযত করতেই ঘরের মাঝ থেকে অর্থি ছুটে গিয়ে দরজা খুলে দেয়। দুরন্ত গলায় বলে,

'আসো আসো! জলদি আসো! আমি আর চিত্র ভাই একা একা প্রচুর বিরক্ত হচ্ছিলাম। এবার তুমি এসে গেছো আমরা একসাথে আড্ডা দিবো।'

অর্পিতার হাত ধরেই ঘরের ভেতর আনে অর্থি। অর্পিতা একবারের জন্য মাথা উচু করে তাকায় না। চিত্র কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে চোখ নামিয়ে নেয়। অর্থি আরাম করে বিছানার ওপর বসে। অর্পিতা ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে নিজের জায়গায়। অর্থি অর্পিতার দিকে তাকিয়ে বলে,

'ওই আপু! দাঁড়িয়ে আছো কেনো? এখানে আসো! আর তুমি কি ভাইয়াকে খাইয়ে দেবে?'

অর্পিতা এবারও কিছু বলে না। চিত্র নিজেই অর্থিকে বলে, 'আপু নিচে যাও! খেয়ে আসো।'

অর্থি কিছু বলতে গিয়েও বলে না। চুপচাপ ভদ্র মেয়ের মতো মাথা নাড়িয়ে ঘর থেকে বের হয়ে যায়। অর্পিতা তখন নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে মেঝেতে নখ খুটছে। কিছুটা সময় ওভাবে যাওয়ার পরও যখন অর্পিতার কোনো হেলদোল হয় না তখন চিত্র গম্ভীর স্বরে ডাকে,

'ওখানেই দাঁড়িয়ে থাকবি? এদিকে আয়!'

অর্পিতা ছোট ছোট পা ফেলে এগোয়। চিত্রর সামনে দাঁড়িয়ে মাথা নিচু করে থাকে। চিত্র ভ্রু কুঁচকে বলে, 'খাইয়ে দে।'

অর্পিতা চমকে তাকায়। চিত্র চোখ দিয়ে ঈশারা করে। অর্পিতা বিনাবাক্যে বসে পড়ে। কোনো কথা ছাড়াই হাত ধুইয়ে খাইয়ে দিতে থাকে। পুরোটা সময় দুজন চুপ করেই কাটায়। খাওয়ানো শেষে অর্পিতা প্লেট, গ্লাস নিয়ে চলে যাওয়ার জন্য উদ্যত হয়। এতোগুলো দিন পর দুজনেই বুঝতে পারে না একে অন্যকে কি বলা উচিত! কি করা উচিত! অর্পিতা বের হয়ে আসতে নিলে চিত্র পেছন থেকে ডাকে। অর্পিতা ফিরে তাকাতেই বলে,

'আমাদের মাঝে কবে থেকে এতো দূরত্ব হয়ে গেছে অর্পি?'

৯০.

রাতে চৈত্রিকা খেয়ে আগে এসে বিছানা ঠিক করে। প্রহর তখনো ঘরে আসেনি বলে আলমারি খুলে তা আবার ঠিকঠাক করে গুছিয়ে রাখতে শুরু করে। আলমারি গোছানোর সময়ই চৈত্রিকা কিছু কাগজপত্র আর পুরোনো একটা ডায়েরী পায়। চৈত্রিকা উল্টে পাল্টে কাগজ গুলো দেখার আগে ডায়েরীটা দেখতে থাকে। ভ্রু কুঁচকে প্রথম পৃষ্ঠা উল্টাতেই চোখে পড়ে প্রহরের নাম। পরের পৃষ্ঠা উল্টাতেই মহুয়ার হাসি মুখের একটা ছবি বেড়িয়ে আসে। চৈত্রিকা ভালো মতো পর্যবেক্ষণ করে ছবি। বিড়বিড় করে বলে,

'মহুয়া বুবুর ছবি এখনো এতো যত্ন করে রেখেছে! এখনো তাকেই ভালোবাসে নাকি? কিন্তু উনি তো নিজেই...!'

চৈত্রিকা নিজের ভাবনা সরিয়ে ফের পরের পৃষ্ঠা উল্টায়। কয়েকটা বাক্যে লেখা নি'ষ্ঠুর বাণী, 'আমি ভালোবাসাকেও মে'রে ফেলতে জানি। যদি ভালোবাসার মানুষটা বি'শ্বাসঘা'তক হয়! আমি ভালোবেসে আমরণ বিরহ পুষতে পারি যদি ভালোবাসার মানুষ সঠিক হয়। তবে আমি এই পাথর হৃদয়েই বি'শ্বাসঘা'তকতার শা'স্তি হিসেবে মৃ'ত্যু দিতে পারি। কে'টে টু'করো টু'করো করে সেই র'ক্তে গো'সলও করতে পারি। তুমি আমার সাথে বি'শ্বাসঘা'তকতা করার শা'স্তি নিজের মৃ'ত্যু দিয়ে পাবে! তোমার র"ক্তে র'ঞ্জিত হবে জমিদার বাড়ির পুকুর।'

গায়ের লোমকূপ দাঁড়িয়ে যায়। বাক্যগুলোতে এমন কিছু ছিলো যা চৈত্রিকার মনে দাগ কেটে যায়। পরের পৃষ্ঠা উল্টানোর আগেই দরজা খোলার শব্দ হয়। চৈত্রিকা তাড়াহুড়ো করে ডায়েরী আর কাগজগুলো নিজের পেছনে লুকায়। প্রহর ঘরে ঢুকে চৈত্রিকাকে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে বলে,

'ওখানে কি করছো?'

চৈত্রিকা প্রথমে নিজেকে শান্ত করে। তারপর শান্ত ভঙ্গিতে বলে, 'তেমন কিছু না। আলমারিটা অনেক এলোমেলো হয়ে আছে বলে ঠিক করছি।'

'ঘুমাবে কখন?'

'এই তো আসছি!'

প্রহর আর কিছু না বলে গোসলখানায় ঢুকে যায়। চৈত্রিকা ডায়েরী আর কাগজপত্র সাবধানে রেখে আলমারি বন্ধ করে এসে বিছানায় বসে। প্রহর বেশ কিছুক্ষণ বাদেই হাত মুখ মুছতে মুছতে বের হয়। চৈত্রিকা নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করে। ছোট্ট করে জিজ্ঞেস করে,

'নিবিড় ভাই কোথায়? জানেন কিছু!'

'হঠাৎ নিবিড় ভাইয়ের খোঁজ?'

'নাহ মানে উনাকেও তো পাওয়া যাচ্ছে না।'

প্রহর নিজের কাজে মন দিয়ে বলে, 'পরশু চলে আসবে।'

দুজনে আবার চুপ। প্রহর চুপচাপ এসে বিছানায় শুয়ে পড়ে। চৈত্রিকা কিছুক্ষণ ওভাবে বসে থাকলে প্রহর হাতে টেনে শুইয়ে দেয়। এক হাতে নিজের বক্ষে টেনে নিয়ে চোখ বন্ধ করে থাকে। কয়েক সেকেন্ডের এই কাজে চৈত্রিকা হতভম্ব। পরমুহূর্তে নিজেই মুখ গুজে দেয় প্রহরের প্রশস্ত বুকে। প্রহর চোখ বন্ধ অবস্থাতে হাসে। কোনো কথা বলে না।

বেশ অনেকটা সময়ের মধ্যেই প্রহর ঘুমিয়ে পড়ে। চৈত্রিকার নিজেরও ঘুম পেয়ে যায়। কিন্তু হুট করেই সেই ডায়েরী আর কাগজপত্রের কথা মনে পড়তেই ঘুম উড়ে যায়। ভীষণ আলগোছে প্রহরের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে ধীরে ধীরে উঠে বসে। একবার ভালো মতো প্রহরকে পর্যবেক্ষণ করে নিজে উঠে সরাসরি দাঁড়ায় আমলারির সামনে। সাবধানে সেখান থেকে কাগজপত্র আর ডায়েরী নিয়ে চেয়ারে বসে। ডায়েরী পৃষ্ঠা উল্টিয়ে পরের পৃষ্ঠায় আসে। দু পাতায় কিছু না থাকলেও পরের পাতায় ছোট করে লিখা,

'প্রহর রেনওয়াজের সাথে এই ভ'য়ং'কর গেইম খেলা উচিত হয়নি মহুয়া।'

চৈত্রিকা কপাল কুঁচকে নেয়। প্রহরের সাথে মহুয়া আবার কোন গেইম খেলেছিলো? উত্তর নেই। চৈত্রিকা আবারও পৃষ্ঠা উল্টায়। পরের ৪/৫ পৃষ্ঠা ফাঁকার পর একটা ছোট্ট নোট করা, 'প'র'কী'য়ার মতো জ'ঘন্য'তম কাজ! আমার বউ হয়েও তুমি আমার ছোট ভাইয়ের সাথে যে সম্পর্কে জড়িয়েছো এর পরিণতি ভ'য়ং'কর হবে। এতোটাই ভ'য়ং'কর যে তোমার বুক কেঁপে উঠবে শুধু মৃ'ত্যুর কথা ভাবলেই!'

চৈত্রিকা জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নেয়। কয়েক পৃষ্ঠা উল্টাতেই বাকি সব ফাঁকা। চৈত্রিকা ভাালো মতো দেখতেই কানে আসে, 'এরপর! এরপর তোমার মৃ'ত্যুর দিন। যখন তোমার শিরায় শিরায় ছিদ্র করছিলাম তখন তুমি কা'টা মুরগীর মতো করছিলে! তোমার শিরা উপশিরা দিয়ে যখন র'ক্তের স্রোত বয়ে যাচ্ছিলো তখন আমি প্রশান্তি অনুভব করেছিলাম। তুমি বাঁচার জন্য ছটফট করছিলে আর আমি তোমার মৃ'ত্যুর জন্য ছটফট করছিলাম! প্রহর রেনওয়াজের সাথে বি'শ্বাসঘা'তকতার পরিণাম দিয়েছিলাম তোমাকে।'

চৈত্রিকা চমকে চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ে। প্রহর বিছানায় হেলান দিয়ে বসে তার দিকে তাকিয়ে আছে। প্রহরের হঠাৎ এমন নৃ'শং'স রুপের বর্ণনা শুনে হাপাতে থাকে। প্রহর শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। ছোট্ট করে বলে,

'ভয় পাচ্ছো কেনো? তুমি তো আমার সাথে বি'শ্বাসঘা'তকতা করোনি! তবে ভয়ের কি আছে চৈত্র?'

চৈত্রিকা হঠাৎ করেই স্বাভাবিক হতে পারে না। ঘনঘন শ্বাস নিয়ে প্রহরের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। মানুষটা রহস্যময় ছিলো কিন্তু এতো ভ'য়ং'কর! মহুয়ার মৃ'ত্যু কল্পনা করেই চৈত্রিকার শিরা উপশিরা কেঁপে ওঠে। প্রহর হেঁসে বলে,

'অতো ভয় পাওয়ার কি আছে চৈত্র? যে খেলায় নেমেছো সে খেলায় এর থেকেও বেশি ভ'য়ং'কর হতে হয়! এর থেকেও বেশি নৃ'শং'স হতে হয়! আর তো ক'দিন তারপর নিজেই কেমন করে ভ'য়ং'কর হয়ে উঠবে নিজেও জানো না!'

চলবে..

(আসসালামু আলাইকুম। ভুলত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন। আজ একটু ছোট হয়ছে পর্ব 😑 অনেক সরি। লিখাও অনেক অগোছালো হয়েছে। দুঃখিত।)

typo by: Sadia Siddiqa আপু🖤#চৈত্রিকা (৩৪)

#বোরহানা_আক্তার_রেশমী

_______________

৯১.

ঝড় বাদলের দিন। চারদিকে অন্ধকার হয়ে আছে। বাতাসে পুরো গ্রামকে এলোমেলো করে দিয়ে যাচ্ছে। গোটা জমিদার বাড়ি খা খা করছে। কোথাও কোনো জনমানব নেই। নাসিমা ঘরের দরজা আটকে দরজার পাশ ঘেষেই বসে ফুপাচ্ছে। বাহির থেকে চৈত্রিকার আওয়াজ আসছে,

'আর কতক্ষণ ঘরের মধ্যে লুকিয়ে বসে থাকবে মা? বের হয়ে আসো! তোমার সব পা'পের শা'স্তি তোমার কাছে আসার জন্য ছটফট করছে। তাড়াতাড়ি আসো মা!'

নাসিমা দুদিকে মাথা নাড়াতে থাকে বারংবার। কান্নারত গলায় বলে, 'তুই এরকমটা করতে পারিস না চৈত্র। আমি তো তোর মা হই। তোকে জন্ম দিয়েছি! তুই আমাকে মা"রতে পারিস না। আমাকে ছেড়ে দে মা!'

চৈত্রিকা হেঁসে ওঠে। ফাঁকা বাড়িতে চৈত্রিকার হাসি ভুতুড়ে লাগে। গায়ের লোপকূপ দাঁড়িয়ে যায়। চৈত্রিকা তলোয়ার দিয়ে ঘরের দরজায় আ'ঘাত করে চোয়াল শক্ত করে বলে,

'হ্যাঁ তুমি তো সেই মা যে নিজের সন্তানকে অন্য পুরুষের জন্য মে'রে ফেলতে চাইছিলে! তুমি তো সেই নি'কৃষ্ট মহিলা যে প'র'কী'য়ায় পড়ে আমাদের নিঃস্ব করে দিতে চেয়েছিলে! তোমাকে এতো সহজে ছেড়ে দিলে আমার বাবা শান্তি পাবে না তো। তাই তোমার শা'স্তি তোমার পেতেই হবে।'

পর পর দু বার আঘাত করে দরজায়। তলোয়ারটা এতো বেশি ধারালো ছিলো যে দরজার এপাশ ওপাশ হয়ে যায়। কিছুটা জায়গা ভেঙে যায়। চৈত্রিকা সেই ফুটোতে চোখ রেখে অদ্ভুত কন্ঠে বলে,

'মা! এবার কোথায় যাবে?'

নাসিমা পেছনে তাকিয়ে শুধুমাত্র চোখ দুটো দেখে ভয়ে চিৎকার করে ওঠে। চৈত্রিকা হাসতে শুরু করে। মিনিট খানেকের মাঝেই কেমন করে যেনো দরজাটা খুলে যায়। নাসিমা চৈত্রিকার সামনে পড়ে বার বার মিনতি করতে থাকে তাকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য। কিন্তু চৈত্রিকা সে কান্নায় গলে না। তলোয়ার দিয়ে আ'ঘাত করে একদম বু'ক বরাবর। নাসিমার আ'ত্মা ছটফট করতে থাকে। মুখ দিয়ে র'ক্ত উঠে যায় তবুও চৈত্রিকা থামে না। পরপর আরো দু বার তলোয়ার চা'লিয়ে দেয়। বিকট শব্দে ক্রো'ধ নিয়ে বলে,

"তুমি মা নামের ক'লঙ্ক। তুমি আমার সুন্দর, গোছালো জীবনটা একদম এলোমেলো করে দিয়েছো। তোমার মৃ'ত্যুতে তোমার সকল পা'প, লো'ভ ধুয়ে মুছে ছাফ হয়ে যাবে।'

এ পর্যায়ে লাফিয়ে ওঠে নাসিমা। হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বার বার বলতে থাকে 'আমাকে মা'রিস না চৈত্র। আমি তোর মা হই। আমাকে মা'রিস না।' ঘুমের ঘোর তখনও তার যায়নি। নাসিমার চিৎকারে সাদিকেরও ঘুম ভেঙে যায়। উঠে বসে আগলে নেয় নাসিমাকে। দু বাহুতে হাত রেখে ঝাকাতে ঝাকাতে বলে,

'কি পাগলের প্রলাপ বকছো নাসিমা? কি হয়েছে? এমন করছো কেনো? নাসিমা!'

সাদিকের ধাক্কায় নাসিমা আরো জোড়ে কাঁদতে থাকে৷ সাদিকের হাতে আকড়ে ধরে বলে, 'আমাকে বাঁচাও সাদিক! আমাকে বাঁচাও! চৈত্রিকা আমাকে মে'রে ফেলবে। দেখো 'ও' কেমনে তলোয়ার নিয়ে এগিয়ে আসছে!'

সাদিক নাসিমার কথার আগা মাথা বোঝে নাহ। কোনো রকম বলে, 'কোথায় চৈত্রিকা? সামনে দেখো কেউ নাই।'

'আরেহ 'ও' ওইখানে দাড়িয়ে... '

নাসিমা সামনে তাকিয়ে চুপ করে যায়৷ খানিকটা সময় নিয়ে চুপ করে বসে থাকে। সাদিক বুঝতে পারে নাসিমা স্বপ্ন দেখেছে। তাই নাসিমার চোখ মুছিয়ে দিয়ে বলে, 'চৈত্রিকা তোমাকে মা'রবে কেনো নাসিমা? 'ও' তো তোমার মেয়ে। তুমি খা'রাপ স্বপ্ন দেখেছো! শান্ত হও। শুয়ে পড়ো! সকাল হওয়ার আরো অনেকটা বাকি।'

'তুমি ওকে এখনো চেনো নি সাদিক? চৈত্র ওর বাবাকে যতটা ভালোবাসে আমাকেও ততটা বাসতো কিন্তু আমি যা করেছি তাতে 'ও' আমাকে প্রচন্ড ঘৃ'ণা করে। আগে 'ও' এমন ছিলো নাহ। কিন্তু এখন ওর কঠোরতার মাপ অনেক বেড়েছে। আমাকে ছাড়বে না 'ও'।'

সাদিক সব কথা ঘুরিয়ে দেয়। নাসিমাকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে শুইয়ে দেয়। নিজেও লাইট অফ করে শুয়ে পড়ে৷ নাসিমা চোখ বন্ধ করতেই আযানের ধ্বনি কানে আসে। ভয়ে চোখ খুলে ফেলে। ভোরের স্বপ্ন নাকি সত্যি হয়! তবে কি এই স্বপ্নটাও সত্যি হবে? ভয়ে, আতঙ্কে নাসিমা জড়োসড়ো হয়ে যায়। ভেতরে মৃ'ত্যু ভয় ঢুকে যায়।

৯২.

সকাল সকাল অর্থিকে পড়তে বসাতে নিয়ে পল্লবী পুরো বাড়ি ছুটে বেড়াচ্ছে। অর্থিকে পড়তে বসতে বলায় সে ফাঁকি দিয়ে পুরো বাড়িতে চক্কর দিচ্ছে। কেউ বলবে এই মেয়ের আর দুদিন বাদেই মাধ্যমিক! পল্লবী অর্থির পেছনে ছুটতে ছুটতে হাঁপিয়ে গেলেও অর্থি হাপায় না। সুন্দর করে মায়ের চোখ ফাঁকি দিয়ে এ ঘর, ও ঘরে চক্কর কাটতে শুরু করে। এক পর্যায়ে ঢুকে পড়ে অনিমের ঘরে। অনিম তখন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াচ্ছে আর হিবিজিবি গান গাচ্ছে। অর্থি নিজেদের বাড়িতে হুট করেই অপরিচিত এমন কাউকে দেখে 'চো'র' বলে চিৎকার করে ওঠে। অর্থির চিৎকারে অনিমের হাত থেকে চিড়ুনি পড়ে যায়। অনিম ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে ছুটে এসে অর্থির মুখ চেপে ধরে। অর্থি মুখ থেকে হাত সরানোর চেষ্টা করতে করতে ওভাবেই অস্পষ্ট শব্দ করতে থাকে। অনিম ধমক লাগায়,

'এই মেয়ে চুপ! এমন বো'বার মতো করতেছো কেন? ভালো ভাবে কথা বলতে পারো না?'

অর্থি ভ্রু কুঁচকে চুপ করে যায়। অনিম ভ্রু উচিয়ে জিজ্ঞেস করে 'কি?' অর্থি কোনো কথা না বলেই কা'মড় বসিয়ে দেয় অনিমের হাতে। অনিম হাত সরিয়ে নিয়ে আর্তনাদ করে ওঠে। অর্থি অনিমের পা থেকে মাথা পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করে বলে,

'একে তো আমাদের বাড়িতে চু'রি করতে এসেছেন আবার আমাকে বো'বা বললেন! একদম বড় ভাইজানকে ডেকে এনে আপনাকে ছাঁদ থেকে ফে'লে দেওয়ার ব্যবস্থা করবো।'

অনিম ভ্রু কুঁচকে থাকে। অর্থির মুখের দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করে এটা কে! আগে দেখেছে কি না! কিন্তু মনে পড়ে নাহ। তাই ঝাঁঝালো স্বরে বলে, "এই মেয়ে! এটা তোমাদের বাড়ি মানে কি? এটা আমার ছোট বোনের শ্বশুড়বাড়ি। আর আমাকে দেখতে কি চো'রের মতো লাগে? আমি ভদ্র বাড়ির পড়ালেখা জানা ছেলে। চো'র নই। বুঝছো!'

অর্থি ভেংচি কাটে। বিছানার ওপর পা তু্লে বসে বলে, 'এটা আমাদের বাড়িই বুঝছেন! আপনার কোন বোনের শ্বশুড়বাড়ি এটা? বড় ভাবীজানেরও কোনো ভাই নাই, মেজো ভাবীজানদেরও তো কোনো ভাই নাই। তাহলে আপনি কোন ভাবীজানের ভাই? চু'রি করতে এসে মিথ্যা বলা হচ্ছে!'

'চৈত্রিকার ভাই হই আমি।'

অর্থি সটান করে লাফিয়ে ওঠে। এক লাফে সরাসরি অনিমের সামনে দাড়িয়ে আঙুল তার দিকে করে বলে, 'বড় ভাবীজানের ভাই আপনি? বড় ভাবীজানের ভাইও আছে!'

অনিম উত্তর দেয় না। অর্থি এক আঙুল দিয়ে অনিমের পেটে গুতো দিয়ে বলে, 'পেট মোটা!'

বলেই খিলখিল করে হাসতে থাকে। অনিম কটমট করে ওঠে। অর্থি মুখে হাত চেপে হাসে। অনিম ফের ধমক দেয়। অর্থি চমকে উঠে হাসি থামিয়ে দেয়। তারপর চোখ ছোট ছোট করে বলে,

'আপনি আমাকে ধমকাচ্ছেন কেনো? আমি কিন্তু বড় ভাইজানকে বলে দিবো!'

এর মাঝেই অনিমের ঘরে চৈত্রিকা আসে। অর্থিকে এই ঘরে এই সময় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে একটু অবাকই হয়। অর্থির কাছে যেতে যেতে জিজ্ঞেস করে,

'এই সময় তুমি এখানে! তোমাকে না আম্মাজান খুঁজছে অর্থি! পড়তে বসবা কখন?'

অর্থি এসে চৈত্রিকার কাছ ঘেঁষে দাঁড়ায়। তারপর চোখ নামিয়ে অনিমের দিকে আঙুল তুলে বলে, 'এটা আপনার ভাই হয় বড় ভাবীজান?'

চৈত্রিকা মাথা নাড়ায়। অর্থি গাল ফুলিয়ে বলে, 'আপনার ভাই আমাকে বকা দিয়েছে। আপনি উনার কান মুলে দিন!'

অনিম হা করে তাকায়। ফোঁস করে উঠে বলে, 'এই মেয়ে! তুমি যে আমাকে চো'র বললে তার বেলায়!'

'তো দেখতে পেট মোটা চো'রের মতো হলে চো'র বলবো না?'

অবস্থা বেগতিক দেখে চৈত্রিকা দুজনকেই থামিয়ে দেয়। তারপর অর্থিকে বলে, 'আচ্ছা আমি ভাইয়াকে বকে দিবো। তুমি যাও পড়তে বসো! আম্মাজান কিন্তু খুজতেছে তোমাকে। সামনে তোমার মাধ্যমিক না!'

'ভালো লাগে না পড়তে। এরওপর মাষ্টারমশাইটাও নেই। উনি না থাকলে আমার আরো পড়তে ইচ্ছে করে না বড় ভাবীজান।'

অর্থি মন খারাপ করে বিছানার ওপর বসে। চৈত্রিকা অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে তাকে নিজের ঘরে পাঠায়। অর্থি চলে যেতেই অনিম তেড়ে এসে বলে, 'এটা তোর ননদ নাকি অন্যকিছু! ছিঃ ছিঃ। আমার জমিদারের মেয়ে জামাই হওয়ার শখ মিটে গেছে। আমাকে কি না চো'র বলে! শেষ মেশ চো'র!'

চৈত্রিকা হাসতে হাসতে বলে, 'এতো তাড়াতাড়ি শখ মিটে গেলে হবে অনিম ভাই? জমিদারের মেয়ে জামাই হতে হবে তো নাকি!'

অনিম ভেংচি কাটে। হুট করেই কালকের কথা মনে পড়াতে চেপে ধরে চৈত্রিকাকে। চৈত্রিকাকে বিছানায় বসিয়ে দিয়ে বাহিরটা একবার দেখে আসে। চৈত্রিকা হঠাৎ অনিমের এমন ব্যবহার ধরতে পারে নাহ। বুঝতেও পারে নাহ৷ অনিম দ্রুত চৈত্রিকার কাছে এসে বলে,

'তোদের মা মেয়ের কাহিনি বল জলদি! কাল থেকে আমার পেট গুড়গুড় করতেছে সব কিছু শোনার জন্য। এখন বল তাড়াতাড়ি!'

'এখন!'

'হ্যাঁ। এখনই। তুই এখনই বলবি আমাকে সব! এখন মানে এখন।'

চৈত্রিকা দীর্ঘশ্বাস নেয়। তারপর বলে, 'কি কি জানতে চাও?'

'ওটা কি সত্যিই মামী ছিলো? মামীই যদি হয় তাহলে বেঁচে আছে কেমন করে? সবাই তো জানতো মামা, মামী সবাই মা'রা গেছে! তোর এতো পরিবর্তন কেনো? কেমন করে? কিসের জন্য? তুই আমাদের না জানিয়েই বিয়ে করে নিলি কেনো?'

'ওটা মা-ই৷ মায়ের সেদিন কিছুই হয়নি। যেদিন বাবা আগুনে পু'ড়ে মা'রা যায় ওইদিন বাড়িতে আরো অনেক কিছু হয়েছিলো। বাবা সাংবাদিক হওয়ার সুবাদে সবাই ভেবে নিয়েছিলো কোনো শ'ত্রুপক্ষ আমাদের বাড়িতে আ'গুন লাগিয়ে দিয়েছে কিন্তু সেদিন এমন কিছুই হয়নি। মাধ্যমিক শেষ হয়ে যাওয়ায় কোনো কাজ ছিলো না আমার। সারাদিন বাড়িতে বসে বসে কাটাতাম। সেদিন যখন আমি ঘরে বসে বই পড়ছিলাম তখন বাড়িতে কেউ আসে। আমি সাধারণ ভেবে ঘর থেকে বের হইনি। একটু পরই হুট করে চেঁচামেচির, ভাঙচুরের আওয়াজ পাই। কিন্তু ঘর থেকে বের হতে নিলে আর বের হতে পারি নাহ। বাহির থেকে দরজা আটকে দেওয়া। বাহিরে কি হচ্ছিলো কিচ্ছু বুঝতে পারতেছিলাম না। হুট করেই বাবার আর্তনাদ পাই। আমি অস্থির হয়ে বের হওয়ার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হই। এক পর্যায়ে বাড়িতে আগুন লেগে যায়। আগুনের ধোঁয়ায় আমার শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। বাড়িতে যখন পুরোপুরি আগুন লাগেইনি তখন বাবা ঘরের দরজা খুলে দেয়। বাবার পুরো শরীর র'ক্তে মাখা।'

চৈত্রিকা আর কিছু বলতে পারে না। গলা ভার হয়ে আসে। অনিম বুঝতে পেরে পানি এগিয়ে দেয়। চৈত্রিকা পানি না খেয়েই নিজেকে শক্ত করে। বাবার র'ক্ত মাখানো শরীরটা এখনো চোখে ভাসে। সেই দৃশ্যের মতো ভ'য়ং'কর কিছু বোধহয় পৃথিবীতে আর একটিও নেই। চৈত্রিকা বড় করে শ্বাস নেয়। অনিম জিজ্ঞেস করে,

'তুই বের হলি কেমন করে? আর মামী?'

'বাবার ওই অবস্থা দেখে আমার মাথা ঘুরিয়ে যায়। বাবাকে ধরতে গেলে বাবার প্রথম কথা ছিলো 'পালিয়ে যা চৈত্র।' আমি যেতে চাইনি। কিন্তু মৃ'ত্যু মুখী বাবা জোড় করে আমার ঘরের জানালা দিয়ে আমাকে বের করে দিলেন। আর তিনি পড়ে রইলেন সেখানে। আগুন ঝ'লসে দিয়ে যায় আমার বাবাকে। পুরো সময়টাতে আমি মা'কে কোথাও পাইনি৷ আর এখানে আসার পর মায়ের সাথে দেখা হয়ে যায়। বিয়েটা দরকার ছিলো বলেই করেছি অনিম ভাই।'

অনিম সন্দেহজনক দৃষ্টিতে তাকায়। বলে, 'সব সত্যি বলছিস নাকি কিছু লুকোচ্ছিস?'

'কি লুকাবো অনিম ভাই? যা সত্য ছিলো সবই তোমাকে বললাম। এর বেশি কিছুই হয়নি।'

অনিম মেনে নেয়। তারপর নিজে থেকেই কথা ঘুরিয়ে অন্য কথা শুরু করে। চৈত্রিকা অনিমের মুখের দিকে তাকিয়ে মনে মনে আওড়ায়,

'তোমাকে চাইলেও সব সত্য বলা সম্ভব না অনিম ভাই। যতটুকু তোমার জানার দরকার তুমি ততটুকু জেনেই খুশি থাকো। যতটুকু গোপন আছে ততটুকু আমি গোপন রেখেই না হয় এগোবো!'

দু ভাই বোন স্বাভাবিক হয়ে কথা বলতে শুরু করে। দুজনের কেউই জানে না তাদের কথাগুলো শুধু তারা একা নয় তৃতীয় আরেকজনও শুনেছে। চৈত্রিকার পুরো ঘটনার বিবরণ শুনে তার ভ্রু কুঁচকেছে। দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে বিড়বিড় করে বলে,

'চৈত্রিকা যদি কিছু না-ই দেখে থাকে তবে প্রতি'শো'ধের নেশা কেনো? আদৌও কি সত্যি চৈত্রিকা কিছু দেখেনি নাকি অন্য কোনো উদ্দেশ্যে পা রেখেছে এ বাড়িতে!'

৯৩.

বিকেলে চৈত্রিকা নিজের ঘরে বসে বসে আকাশ দেখছিলো। বাহিরে আজ রোদ আছে। সূর্য তীক্ষ্ণ আলো দিচ্ছে। আকাশ একদম পরিষ্কার। চৈত্রিকা আনমনে সেদিকে তাকিয়েই বসে ছিলো। প্রহর ঘরে এসে চৈত্রিকাকে এক ধ্যানে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে ভ্রু কুঁচকায়। ঘামে ভেজা শার্ট খুলতে খুলতে বলে,

'চোখে তাপ লাগছে না? ওভাবে আকাশের দিকে চেয়ে আছো কেনো?'

চৈত্রিকা চোখ ফিরিয়ে নেয়। টুপ করে চোখ থেকে পানি পড়ে। দ্রুত চোখ মুছে প্রহরের দিকে তাকায়। প্রহর উদোম বুকে ধপাস করে শুয়ে পড়ে বিছানায়। চৈত্রিকা লাফিয়ে সরে বসে। ব্যস্ত গলায় বলে,

'এই এই উঠুন! বাহিরে থেকে এসে হাত মুখ না ধুয়েই শুয়ে পড়ছেন কেনো? জলদি উঠুন!'

প্রহর শুয়ে থাকা অবস্থাতেই ভ্রু কুঁচকে তাকায়। চৈত্রিকার কথা পাত্তা না দিয়ে চুপচাপ শুয়ে থাকে। চৈত্রিকা ফুঁসে ওঠে। ফের বলে, 'একদম ত্যাড়ামো করবেন না জমিদার সাহেব। জলদি গিয়ে আগে হাত মুখ ধুয়ে আসেন!'

প্রহর ফোঁস করে শ্বাস করে। তারপর বিরক্তি নিয়ে উঠে বসে। কোনো কথা ছাড়াই গোসলখানায় চলে যায়। চৈত্রিকা চোখ মুখ কুঁচকে বলে, 'বুঝি না কিছু! জমিদার সাহেব নিজে তো কোনো কাজ করে না তাহলে এমন ঘেমে আসে কোন মহাকার্য করে!'

প্রহর হাত মুখে ধুয়ে এলে চৈত্রিকা তোয়ালে এগিয়ে দেয়। প্রহর কোনো রকমে হাত মুখ মুছেই শুয়ে পড়ে। চৈত্রিকা ছোট করে জিজ্ঞেস করে,

'আজ এমন হুটহাট শুয়ে পড়ছেন কেনো? কি হয়েছে?'

'ক্লান্ত লাগছে। একটু এদিকে আসো তো!'

প্রহরের অলস গলা। চৈত্রিকা কোনো কথা ছাড়াই এগিয়ে যায়

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৭তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন