ফন্ট সাইজ:
থিম:
আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ

৭ম পর্ব

লেখক: অরাত্রিকা রহমান

#আত্মার_অঙ্গীকারে_অভিমোহ

#Soul_bound_obsession

#Oratrika_Rahman_অরাত্রিকা_রহমান

#Part_7(1st)

(কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ)

(প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য উন্মুক্ত)

গাড়ির জানালার কাঁচে একবার নিজের প্রতিচ্ছবি দেখতে পায় রায়ান। তীব্র বৃষ্টিতে সেই প্রতিচ্ছবিও যেন ধুয়ে মুছে যাচ্ছে—যেমনটা ভেতরের রায়ান এখন ধুয়ে যাচ্ছে এক অনামা আবেগে।

ঠিক তখনই দরজা খুলে গাড়িতে উঠে পড়ে মাহির।

মাহির চুল থেকে বৃষ্টি ঝেড়ে, গাড়ি স্টার্ট দিতে দিতে বলে —

“বৃষ্টির কারণে ইঞ্জিনে পানি ঢুকে গেছিল। এখন গাড়ি চলবে।”

রায়ান তাকিয়ে থাকে গাড়ির জানালার ওপাশে, চোখ এখনো খুঁজে বেড়াচ্ছে সেই অনাবৃত, অপার্থিব মেয়েটিকে। যেন তার অস্তিত্ব একবার ধরা দিয়েই আবার বাতাসে মিশে গেছে।

রায়ান হঠাৎ জিজ্ঞেস করে —

“তুই… সামনের ফুটপাথটা দেখছিস?”

মাহির অবাক হয়ে তার দিকেই চেয়ে বলে —

“দেখছি তো, কিন্তু তুই কি খুঁজছিস? কি হয়েছে”

রায়ান গলা একটু নিচু করে, ধীরে ধীরে প্রশ্ন করে—

“সামনে একটা মেয়ে ছিল। ভিজছিল। নাচছিল। তুই কিছু দেখলি না?”

মাহির একরাশ বিরক্তি নিয়ে বলে —

“তোর মাথায় ঠিক আছে তো? তোর বউ এখনো আইনত তোর। সেটাই সামলাতে পারছিস না, আবার অন্য মেয়েকে দেখছিস?”

রায়ান মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে এখন বউয়ের কথা শুনে রাগ করলো না। কিন্তু চুপ করে না থাকে। গলার স্বরটা কেমন যেন অচেনা রকম কোমল করে বলল—

“আমি মেয়ে দেখছিলাম না মাহির? হয়তো ,আমি দেখছিলাম একটা অনুভব, একটা হাওয়া, এক ফোঁটা জল, একটা ছায়া,

যা বুকের ভেতর ঝড় তুলে দিয়ে চলে গেল—

আর রেখে গেল সেই ঝড়ের শব্দ।”

মাহির এবার একটু থমকে যায়। গাড়ির গতি বাড়ায়, কিন্তু মুখে একটা অদ্ভুত অভিব্যক্তি —

“তোর কবিতা লেখার স্বভাব তো ছিল না। এখন হঠাৎ এত ভাবুক কবে হইলি রে?”

রায়ান তাকায় না, শুধু জানালার বাইরে এক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে। তার চোখে তখনও সেই নাচের প্রতিচ্ছবি ভেসে চলেছে।

---

গাড়ি চলতে থাকে…

রায়ানকে অন্যমনস্ক দেখে মাহির প্রশ্ন করে-

"এখন কোথায় যাচ্ছি আমরা? কিছু তো বলছিস না।"

রায়ান নিজের থেকে স্পষ্ট করে বলল-

"ডিভোর্স ফাইল করেছি আমেরিকায় থাকা কালীন। এখন পেপারস আনতে আমার লিগ্যাল এডভাইজারের কাছে যাচ্ছি আমরা। যদিও শুরুরটা আমার হাতে হয়নি তবে সম্পর্কের শেষ আমার হাতেই হবে।"

মাহির রায়ানের দৃঢ় চেতা মনোভাব দেখে অন্য কিছু বলার সাহস পেল না। সে চুপচাপ গাড়ি চালিয়ে যেতে থাকে ।

গন্তব্যস্থলে পৌঁছানোর পর রায়নার হাতে ডিভোর্সের পেপারস বুঝিয়ে দেওয়া হয় । সে ডিভোর্স ফাইল করে রেখেছিল আগেই তাই কাজটা আরো সহজ হয়ে গেছে। রায়ানের লিগ্যাল এডভাইজার এর পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট রায়ানের হাতে ডিভোর্স ফাইলটা ধরিয়ে দেয়। এবং তাকে সকল কাগজপত্র চেক করে নিতে বলে।

কিন্তু রায়ানের ভেতর চলতে থাকে একটা ভিন্ন যাত্রা।

কাজের ফাইল খোলে রায়ান, কাগজে চোখ রাখে, কলম তোলে…

কিন্তু কলম যেন অচেনা কিছু লিখে ফেলতে চায়—

“ভিজে চুল, ঘূর্ণি নৃত্য, মায়াবী চোখ…”

নিজেই নিজেকে ধমক দেয় সে।

“ফোকাস কর রায়ান, তুই তো এসেছিস ডিভোর্স পেপারস নিতে। আর এখনি মনে আরেকটা মেয়ে ঘুরছে, ছ্যা।

এখানে এসেছিস তোর অতীতকে শেষ করতে,

তাহলে অন্য জীবন নিয়ে ভাবছিস কেন?”

রায়ান ডিভোর্স এর সব পেপারস চকে করে নেয় এবং ঠিক করে বাড়িতে গিয়েই মার হাতে পেপারস দিয়ে মিরায়ার থেকে সাইন করিয়ে আনতে বলবে। ঠিক যেমন ভাবে না বলে বিয়েটা হয়েছে।

নিজের ডেস্কে বসে একটা খোলা উইন্ডোর দিকে তাকিয়ে থাকে সে।

আকাশ তখনও মেঘলা।

কিন্তু তার হৃদয়ের আকাশ যেন একদম ভিন্ন—

একটা চঞ্চল পাখি সেখানে উড়ছে,

যার পাখায় লেগে আছে কিছু জল, আর একটা মুখ—

একটা অপার্থিব মুখ, যে মুখ কোনো সাজে গড়া না,

তবু সমস্ত সাজকে হার মানিয়ে দিয়েছে।

-"তার হৃদপখি!"

রায়ান আনমনে বলে ওঠে-

“সে কে ছিল?

“তাকে দেখেছি আমি, যেন কবিতার প্রথম চরণ।

কিন্তু বাকিটা কে লিখবে?”

_________

বৃষ্টিতে নাচার সময় মিরায়ার ফোন হঠাৎ বেজে ওঠে। মিরায়ার আস্তে দেরি হচ্ছিল বলে মিরায়ার ফোনে কল আসতে থাকে। তাই বৃষ্টিতে ভেজা শেষ করে মিরা হাঁটতে থাকে বাসার দিকে। বুকটা তখনও ভরে আছে একরাশ আনন্দে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাওয়া— এ এক স্বপ্নের মতই। মাথার ওপর মেঘ, পায়ের নিচে কাদা, তবু তার মনে সেই অনুভূতি— যেন সে মাটিতে হাঁটছে না, ভাসছে।

বাসায় পৌঁছেই দরজায় দাঁড়িয়ে হাঁক দেয় —

“মামণি! আমি এসে গেছি...!”

ওর কণ্ঠে এমন এক উচ্ছ্বাস, যেন শব্দগুলোও নাচতে নাচতে বেরিয়ে আসছে মুখ থেকে।

ভেতর থেকে দ্রুত পায়ের শব্দ আসে। দরজা খুলে যায়। রামিলা চৌধুরী তাকিয়ে দেখেন ভেজা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে, মুখে সেই চিরপরিচিত দুষ্টু হাসি।

রামিলা চৌধুরী একটু গম্ভীর গলায় বলে—

“একি মিরা! এভাবে ভিজে এলি কেন! ঠান্ডা লেগে যাবে তো!”

মিরায়া ঘাড় কাত করে বলে—

“আরে মামণি, জানো! আমি চান্স পেয়ে গেছি! ৪৫ তম! ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়! আইন বিভাগ! Wohhohh!”

রামিলা চৌধুরী বিস্ময় আর আনন্দে ওকে বুকে জড়িয়ে ধরেন।

“আলহামদুলিল্লাহ!”

“তুই তো পারবিই! চল, আগে ফ্রেশ হ, তারপর খেয়ে নিস, গায়ে তো কাঁপুনি দিচ্ছে!”

মিরা ঝটপট মাথা নাড়ে—

“ওকে।”

মিরায়া ঘরে ঢুকতেই ছোট্ট একটা ছায়া দৌড়ে এসে ওর পায়ে লেপটে যায়।

“আহারে জুলিয়েট তুই তো তোর মতোই! আমি তো ভিজে-ভিজে এসেছি, তাও তুই আদর করতে এসেছিস?”

মিরায়া জুলিয়েটকে কোলে তুলে নেয়।

একটা নরম সাদা বিড়াল, গা ছুঁয়ে থাকা লোম যেন তুলো দিয়ে গড়া। গলায় ছোট একটা ঘণ্টা, হালকা টিং টিং শব্দ হয় যখন নড়ে।

“জুলিয়েট তুই জানিস? আজ তোর মা ইউনিভার্সিটিতে চান্স পায়েছে! ঢাকা ইউনিভার্সিটি! হাহা! এখন থেকে আর কেউ আমায় পাত্তা না দিলে বলবো, 'আমি ঢাকা ইউনিভার্সিটির ছাত্রী!’”

জুলিয়েট কেমন যেন বুঝতে পেরে চোখ টিপে দেয়।

মিরা হেসে বিড়ালের কপালে একটা চুমু দেয়—

“তুই অনেক কিউট। আমার কুট্টুস টা, আমার বাচ্চা টা, আমার মাম্মা, উম্মাহ!”

জুলিয়েটকে আদর করে মিরায়া ওকে নিচে নামিয়ে দেয় পরক্ষণেই সোরায়া রুমে প্রবেশ করে-

"আপু! একা একা ভিজে এলে আমাকে নিলে কি এমন হতো?

সোরায়া মুখটা সামান্য ভার করে কথা টা বলতেই-

মিরায়া সামান্য হেসে সোরায়ার হাত ধরে ঘুরতে ঘুরতে বলল-

“সোরা বনুরে? শুন শুন! আমি চান্স পেয়ে গেছি ! ঢাকা ইউনিভার্সিটি!”

সোরায়া খুশিতে চিৎকার—

“সত্যি!? ঢাবি!? Wow! এখন নতুন কলেজে ভর্তি হলে আমি সবাইকে বলতে পারব আমার আপু ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে পড়ে।”

“হাহা, আমি তো বলছিলাম! তোর আপু গরিব হতে পারে, স্টাইল কম হতে পারে, কিন্তু ব্রেনের আছে।”

“আমি তো বলি, "বাইক রাইড করতে করতে ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে চান্স!" খবর ছাপানোর মত শিরোনাম।”

“তোর মুখে ঝাল লাগুক। আমি কত কষ্ট করেছি তুই জানিস?"

সোরায়া দুষ্টু হাসি হেসে মিরার কাছে আসতে গেলে-

"আরে আরে কি করিস! আমার সম্পূর্ণ শরীর ভেজা এখন তুইও ভিজে যাবি। সর এখন, ফ্রেশ হয়ে এসে আদর করব।”

সোরায়াকে কথাটা বলেই মিরায়া ফ্রেশ হতে চলে যায়।

শাওয়ারে পানি পড়ে, কাঁধ থেকে বেয়ে নামতে নামতে তার মনের ক্লান্তিও যেন ভেসে যায়। মাথার চুলগুলো ধুয়ে দেয়। চোখ বন্ধ করে কল্পনা করে —

এই ক্যাম্পাস, এই শহর, এই নতুন শুরু।

“নতুন জীবন শুরু হলো বুঝি... আজকের মতো দিন তো আর সব সময় আসে না।”

ফ্রেশ হয়ে আয়নার সামনে এসে দাঁড়ায়। চুল খোঁপা করে বাঁধে। একটুও সাজে না, তবুও নিজের মুখটা দেখে হালকা হাসে।

“ভেতর থেকে হাসলেই মুখটা সুন্দর লাগে”— বলে আয়নাকে।

তারপর মিরায়া নিচে নেমে যায় খাওয়ার জন্য। দুপুরের খাওয়া দাওয়া শেষ করে সে একটা লম্বা ঘুম দেয়। বৃষ্টিতে ভেজার কারণে আজকে খুব শান্তির ঘুম এসেছে তার চোখে। তবে মাথাটা ভার হয়ে আছে।

(এদিকে দূরে কোথাও রায়ান তখনো জানে না, এই মেয়েটিই তার ভাগ্যকে উল্টে দিতে চলেছে...যার জন্য তার খাওয়া দাওয়া হারাম হওয়ার পথে)

________

ঢাকার অদূরে,একটা বিশাল খোলা জায়গা। নতুন নির্মাণাধীন ভবনের জন্য নির্ধারিত জমি। এখানে হতে যাচ্ছে "Rayan Industry's" – রায়ানের আমেরিকান কোম্পানির বাংলাদেশ শাখার অফিস হেডকোয়ার্টার।

চওড়া গেট, আধা-পাকা রাস্তা, পাশে বাঁশে ঘেরা পাইলিং এরিয়া আর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা কিছু হেলমেট-পরা শ্রমিক। মাটি কাটার মেশিনগুলো চলছে গম্ভীর গর্জনে।

রায়ান সাদা শার্টের ওপর কালো কোট পরে, সানগ্লাসে ঢাকা চোখে, পাশে মাহির আর দুইজন লোকাল ইঞ্জিনিয়ার।

একজন ডিলার দেখায়—

“স্যার, এই জায়গাটা মূল ভবনের জন্য বরাদ্দ। পেছনে পার্কিং আর ডান পাশে অফিস ব্লক প্ল্যান।”

রায়ান মাথা নেড়ে বলে—

“Okay. Soil testing এর রিপোর্ট কালকে দিবে তো?”

“জি স্যার। কাল সকাল দশটায়।”

কথা হচ্ছে, হাত নেড়ে প্ল্যান বোঝাচ্ছে সবাই… কিন্তু এই সময়টা রায়ানের জন্য যেন একটা অদ্ভুত ঘোলাটে স্তরে কেটে যাচ্ছে।

সে দাঁড়িয়ে থাকে, চোখে সানগ্লাস, মুখে স্থিরতা— কিন্তু ভেতরটা? ওখানে তখনই ঝড় চলছে।

মনে পড়ে — সেই দৃশ্য...

বৃষ্টির মধ্যে সাদা জামা পরা মেয়েটি, চোখ বন্ধ করে ঘুরছে, হাসছে, নাচছে… নিজের জন্য, কারো সামনে নয়।

সেই হাসি—যা ঠোঁট দিয়ে নয়, চোখ দিয়ে ঝরে পড়ে।

সেই ভেজা চুল, কপালের টোল, সেই উষ্ণ চোখের গভীরতা— রায়ানের বুকের মধ্যে যেন হালকা কাঁপুনি দিয়ে ওঠে।

কাজের কথা শোনা যাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু মাথার ভেতরে চলছে অন্য মুভি—

“এই মেয়ে কি পাগল ছিল?”

“কে নাচে এইভাবে রাস্তায়?”

“তবুও... এত সুন্দর লাগছিল কেন?”

“তাকে কেন মনে পড়ছে এতবার?”

"আমি কি সত্যি প্রেমে পরে গেছি?"

---

মাহির পাশ থেকে বলে ওঠে—

“ভাই, তুই শুনছিস তো? এই ডিলার বলছে ওরা ৩ দিনের মধ্যে সাইট ক্লিয়ার করবে।”

রায়ান কেঁপে ওঠে যেন ঘুম থেকে জেগে উঠেছে।

“হুম? হ্যাঁ… হ্যাঁ শুনছি।”

তারপর আবার গম্ভীর মুখে ডিলারের দিকে তাকায়,

“ঠিক আছে, আমি কাল পুরো প্ল্যান একবার দেখে সিদ্ধান্ত নেবো।”

ডিলাররা মাথা নেড়ে চলে যায় অন্যপাশে।

মাহির তার পাশে দাঁড়িয়ে চুপচাপ কিছুক্ষণ দেখে, তারপর হেসে বলে—

“তুই আবার কোথায় হারালি বল তো? সেই রাস্তার মেয়েটা ভাবনায় ঢুকছে বুঝি? তাহলে কি আমার পুরনো ভাবিকে জীবন থেকে তারিয়ে নতুন ভাবি আনতে চাইছিস?”

রায়ান গলা খাঁকারি দেয়, কিন্তু কিছু বলে না। আবার কি ভেবে যেন এক ফাঁকে বলেই ফেলে—

“কোথাও হারাইনি... কেবল ভাবছিলাম, কত অদ্ভুতভাবে কেউ কারো ভেতরে ঢুকে পড়ে... বিনা অনুমতিতে। এমন ভাবি দিতে পারলে মন্দ হতো না।”

মাহির হাসে, কিন্তু এবার আর ঠাট্টা করে -

-"ইস্! তাহলে তো বলতে হবে মেয়েটা বেশ সুন্দর। আমি দেখতে পারলাম না । বড়ো একটা মিস হয়ে গেল।"

রায়ান মাহিরের কথায় চোখ কুঁচকে ওর দিকে তাকিয়ে বলে-

"মুখ সামলে কথা বল। যা আমার তা আমারি তোকে জিজ্ঞেস করেছি নিশ্চিত হওয়ার জন্য যে তুই আমার হৃদপাখিকে দেখিসনি।"

মাহির চোখ বড়ো করে-

"আমার হৃদপাখি!"

রায়ান - "তোর না গাধা আমার হৃদপাখি, শুধু আমার। আচ্ছা চল আবার ওই রাস্তা দিয়ে যাবো যদি আমার হৃদপাখিকে আর একটা বার দেখতে পাই।"

মাহির - "দেখতে পেলে কি করবি?"

রায়ান-" আমার কাছে রেখে দিব যত্ন করে।"

মাহির -"যদি না থাকে , যদি উড়ে যেতে চায়?"

রায়ান কুটিল হেঁসে উত্তর দেয় -

"জোর করে আমার হৃদয়ের খাঁচায় বন্দিনী বানিয়ে রাখবো। তবুও ওকে আমার হতে হবে। ওর ইচ্ছে থাকুক বা না থাকুক।"

সামনে বিশাল ফাঁকা জমি,

পেছনে সবার হাঁটাচলা, অথচ রায়ানের চোখ যেন খুঁজে ফেরে....

"হৃদয়ের আকাশে মুক্তভাবে উড়তে থাকা তার হৃদপাখির খেয়ালে।"

সে একবার আকাশের দিকে তাকায় —

“বৃষ্টি হলে কি ও আবার নাচবে? আমার হৃদপাখি আর একটা বার কি আমাকে দেখা দেবে?”

________

সময় – রাত ৯:৫০

বৃষ্টি থেমেছে। চৌধুরী বাড়ির বারান্দা থেকে টিপটিপ জল ঝরছে।

রায়ান দীর্ঘ দশ বছর পর আজ চৌধুরী বাড়ির দরজায়।রায়ান ঢুকল দোরগোড়া পেরিয়ে। তার চোখে নতুন জায়গার প্রতি কোনো বিস্ময় নেই—এটা তার পরিচিত ঠাঁই, তবু অচেনা হয়ে গেছে সময়ের সাথে।

সামনে দাঁড়িয়ে আছেন একজন—রামিলা চৌধুরী।

তার মা। মাকে এত বছর পর সামনাসামনি দেখেই রায়ানের বুক কেঁপে উঠল। চোখে গাঢ় ফ্রেমের চশমা, ঠোঁটে হালকা লিপস্টিক, মুখে সেই কঠোর অভিজাত ভাব

রায়ান কিছুটা অপ্রস্তুত ভাবে বলে ওঠে:

"আম্মু..."

রামিলা চোখ তোলে রায়হানকে নিঃশব্দে জড়িয়ে ধরে বললেন-

"এসেছিস? দশ বছর অনেক লম্বা সময়, রায়ান । কিভাবে পারলি মাকে কষ্ট দিতে?"

রায়ান মাথা নিচু করে বসে পড়ে সামনে।

কোনো প্রতিক্রিয়া না দিয়ে বলে:

"তোমার শরীর ভালো তো, আম্মু?"

রামিলা ঠান্ডা গলায়:

"শরীর ঠিকই আছে। মনটাই পুরনো হয়ে গেছে বোধহয়।"

একটা দীর্ঘ নীরবতা…দুজনের মাঝে আবেগ ।

রায়ান জানে, এই সম্পর্ক আর আগের মতো নয়।

মা, হয়তো তার অপেক্ষা করেছেন, কিন্তু আজ মুখে হাসি নেই।

রামিলা চৌধুরী- "ফ্রেশ হয়ে খেতে আয়। খাবার দিচ্ছি। তুই আসবি বলে আজ সব তোর পছন্দের রান্না করেছি।"

রায়ান মিষ্টি হেঁসে বলল- "আচ্ছা, আমি এখুনি আসছি।"

ডাইনিং টেবিল – পরবর্তী দৃশ্য

রায়ান বসে খাচ্ছে। ঘরের পরিবেশ তবু ভারী।

রায়ান পকেট থেকে সেই নীল খাম বের করে রাখে টেবিলে।

রামিলা চৌধুরী বিস্মিত মুখে জিজ্ঞেস করেন-

"এটা কি রায়ান?"

রায়ান স্বাভাবিক স্বরে বলল

"এইটা ডিভোর্স পেপার, মা। আমি আমার কথা কথিত বউকে মুক্তি দিতে চাই আর নিজেও এই বাঁধন থেকে ছাড়া পেতে চাই। তুমি চট্টগ্রাম এ গিয়ে সাইন করিয়ে নিও। আমি আর এই সম্পর্ক রাখতে চাই না।"

রামিলা খামটা খুলে দেখে, এক মুহূর্তে চুপচাপ। তারপর উঠে দাঁড়ায়।

"সাইন আমি কাল সকালেই নিয়ে দেব। সে এই বাড়িতেই আছে, upstairs."

রায়ান হঠাৎ থেমে যায়।

চোখ সরু হয়ে আসে।

"সে এই বাড়িতে?"

"মানে... ও এখানে আছে এখন?"

রামিলা কাঁচা গলায় উত্তর দেয়:

"হ্যাঁ, কেন? এতদিন যে ছিল না, এখন এলেই সব মুছে যাবে—তুই এমন ভাবিস না। সে তোর বউ। কাগজে কলমে। আমিই দায়িত্ব নিয়ে রেখেছি তাকে এই বাড়িতে।

কাল সকালে ওকে ডেকে সাইন করিয়ে দেবো। তুই এসে নিয়ে যাস। ও এই বাড়ির মেয়ে হয়ে এই বাড়িতে থাকবে।"

রায়ান দাঁড়িয়ে পড়ে। চোখে রাগ।

"তুমি আমাকে না জানিয়ে কেন… কেন এখানে রাখলে তাকে?"

রামিলা গম্ভীর গলায়:

"কারণ ও আমাদের দায়িত্ব। তোমার পালিয়ে যাওয়াতে আমরা তা অস্বীকার করতে পারি না।"

রায়ানের কণ্ঠ ফাটে:

" ঐ অনাথ মেয়ের জন্য তোমার ছেলে দশ বছর অনাথের মতো দেশের বাইরে একা ছিল আম্মু। আমি আর নিতে পারছি না । এই সম্পর্কটা শেষ করতে এসেছি। আর সহ্য হচ্ছে না। আর এই বাড়িতে ওই মেয়ে থাকলে আমি থাকবো না। কালই চলে যাবো।"

পিছন থেকে রায়হান চৌধুরী হঠাৎ বলে উঠলেন-

"রামিলা ওকে বলো চলে যেতে এত বছরে ওর এই বাড়িতে না থাকায় কারো কোনো সমস্যা হয়নি এখনো হবে না।"

নিজের বাবার মুখে এমন কথা শুনে রায়ান পিছনে তাকিয়ে ডেকে উঠলো-

"আব্বু...।"

রায়হান চৌধুরী ছেলের সাথে অন্য কোন প্রকার কুশল বিনিময় না করেই পিছন ফিরে নিজের রুমে চলে গেলেন।

রামিলা হেসে ফেলে একরকম:

"ভালোই তো... অবশেষে তুই একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছিস।

আমি তোর সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করব না। শুধু মনে রাখিস, যে মেয়েটা তোর বিয়ে করা বউ,আর তার একান্ত ভাবে কেবল তুই আছিস। যেটা না সে জানে আর না জানার উপায় রাখছিস তুই।"

রায়ান আর কিছু বলে না। শুধু নিঃশব্দে উঠে চলে যায় নিজের রুমে।

চলবে.....

কি মনে হৃদপাখি কি সকালে দেখা দিবে না রাতেই? ইনশাল্লাহ নেক্সট পার্ট থেকে তোমরা রায়ানের মিরায়ার প্রতি পাগলামিটা বুঝতে পারবে। আজকের পর্বটা কেমন লাগলো জানাবেন অবশ্যই কমেন্টে। আপনারা comment কেন করেন না । আপনাদের মতামত আমার জন্য উৎসাহ। ধন্যবাদ সময় দেওয়ার জন্য।☺️

#soul_bound_obsession #আত্মার_অঙ্গীকারে_অভিমোহ #Oratrika_Rahman_অরাত্রিকা_রহমান #part_7_1st #everyoneシ゚viralシviralシfypシ゚viralシalシ #foryoupageシforyou #উপন্যাসপ্রেমিক #গল্পফ্যাক্ট

#আত্মার_অঙ্গীকারে_অভিমোহ

#Soul_bound_obsession

#Oratrika_Rahman_অরাত্রিকা_রহমান

#Part_7(2nd)

(কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ)

(প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য উন্মুক্ত)

অন্যদিকে...

চৌধুরী বাড়ির দোতালায় রায়ানের রুমের একদম পাশের রুমটাতে মিরায়া। ঘরটা আধো অন্ধকার। জানালার পাশে একটা বালিশে হেলান দিয়ে বসে আছে মিরায়া।

চোখে হালকা ক্লান্তি। সারাদিনের চাপা আনন্দে শরীরটা আজ হালকা গরম গরম লাগছে।

জ্বর ঠিক নেই—তবু শরীর কেমন যেন ভেতরে ভেতরে কাঁপছে।

খেতে ইচ্ছে করেনি। নিচে যাবার মতো শক্তি পাচ্ছিল না।

তাই আজ সে ডাইনিংয়ে নামেনি। তাকে খাওয়ার জন্য ডাকা হয়েছিল—এটাই স্বাভাবিক। তবে সে নামেনি ।

এবং সে জানেও না, নিচে সেই মানুষটা এসে গিয়েছে, যাকে ১০ বছর আগে কাগজে কলমে তার জীবনে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল।

---

রাত – ১২:৪০ মিনিট

ঘুম আসছে না।

মাথাটা ভার ভার লাগছে। মুখ শুকিয়ে আসছে। পেট কেমন যেন কুঁকড়ে আসছে। ক্ষুধা পেয়েছে।

মিরায়া ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়।

চোখে হালকা ক্লান্তি, হাতে একটা পাতলা শাল। পা টিপে টিপে নিচে নামে।

---

ফ্রিজের সামনে – রান্নাঘর

চৌধুরী বাড়ির মেইন কিচেন আধো আলোয় ভরা।

ফ্রিজটা খুলে দেখে– এক পাশের রেকে রাখা আছে ডাল, রোস্ট, ডিম ভুনা। একটা প্লেট টেনে নেয়, পাশে রাখা রাইস কুকারে হাতে গরম ভাত আছে।

সাবধানে নিয়ে মাইক্রোওয়েভে গরম করে।

অল্প ভাত মিরায়া নিজের প্লেটে তুলে বসে পড়ে ডাইনিং টেবিলের কোণে।

একটা নিঃশব্দ রাত…

সবাই ঘুমিয়ে, আর সে চুপচাপ বসে খাচ্ছে একা।

তবু শান্তি লাগছে তার—পেটের ক্ষুধা কমছে, মনটাও একটু হালকা হচ্ছে।

সে জানে না, উপরের ঠিক পাশের রুমেই, দরজার ওপাশে একজোড়া চোখ আজ ঘুমাতে পারেনি, শুধু একজন ভেজা মেয়ের রূপ আর নামহীন টান তাকে ঘুমে ভাসতে দিচ্ছে না, আর সে নাম না জানা সরসী সে নিজেই।

চৌধুরী ভবন, গভীর রাত। একই সময় – ১২:৪৭

ঘুম আসছে না। রায়ান বিছানায় এপাশ-ওপাশ করছিল।

শরীর ক্লান্ত হলেও মন ছিল অদ্ভুত রকমের ব্যস্ত। তার মাথার ভেতরে যেন একটি দৃশ্য লুপ হয়ে বারবার ফিরে আসছিল।

বৃষ্টির নিচে ঘূর্ণি ঘূর্ণি ঘুরে বেড়ানো এক মেয়ে।

ভেজা কাঁধ, এলোমেলো চুল, খোলা চোখ, আর... ঠোঁটের কোণে এক অসহ্য সুন্দর হাসি। রায়ান আজকে সকালেও বুঝতে পারেনি, সে কী দেখেছে।

"কে ছিল সে?

পাগল? শিল্প? শাস্তি? নাকি… মুক্তি?"

রায়ানের কণ্ঠে ফিসফিস ছিল না, ছিল এক ধরণের পোড়া আকুলতা।

হঠাৎ তার গলা শুকিয়ে আসে।

পানি খেতে ইচ্ছে করে, প্রচণ্ডভাবে।

রুমের পানির জগ খালি।

আস্তে করে দরজার লক খুলে নিচে নামে।

---

রান্নাঘর

ঘরটা প্রায় অন্ধকার।

শুধু ফ্রিজের আলো আর এক কোণে রাখা ছোট টেবিল ল্যাম্প।

রায়ান প্রথমে বুঝতে পারেনি কেউ সেখানে আছে।

তার পা থেমে যায়। কিছু একটা আলো আটকে পড়েছে তার চোখে।

একটা মেয়ে টেবিলের এক কোণে বসে আছে।

সাদা ঘরের পোশাক, মাথায় হালকা ওড়না টানা, আর হাতের পাতায় ভাত।

সে ধীরে ধীরে খাচ্ছে। চোখে ক্লান্তি, মুখে শান্তি।

রায়ান প্রথমে তাকিয়ে বুঝতেই পারেনি—ওই মেয়েটিই… সেই রেনড্রপ।

তার মুখের কোণ ঝাপসা, তবু ঠোঁটের সেই মিষ্টি তিলটা, অল্প আলোতে জলজল করছে শান্ত বাদামি চোখ জোড়া—

রায়ার বিস্মিত হয়ে চোখ বড়ো বড়ো করে তাকিয়ে মিরায়ার খাওয়া দেখছে। হঠাৎই তার মনে পরল- এটা তো চৌধুরী মেনশন এখানে তার হৃদ পাখি কিভাবে আসবে। তবে কি সে ভুল দেখছে।

এমন ভেবে রায়ান নিচে তাকিয়ে মাথা না সূচক নাড়ায় কয়েকবার এবং পরবর্তীতে আবার খেতে থাকা অপরূপ সুন্দরীর দিকে তাকিয়ে দেখে। সে তখন একইভাবে খেয়ে যাচ্ছে।

-"একটা মানুষকে খেতে দেখার দৃশ্য কি এত স্নিগ্ধ হয়? ও কি সত্যিই আমার সকালে দেখা অপ্সরা?"

রায়ান হঠাৎ একটু কেঁপে উঠে পেছনে সরে যায়, যেন নিজের হৃদয়ের শব্দ নিজেই শুনে ফেলেছে। তার ভিতরে কিছু একটা গুঞ্জন তুলল। শরীরো যেন খুব অদ্ভুত আবদার জানাচ্ছে তাকে ছুঁয়ে দেখার, কাছে টেনে নেওয়ার।

---

সে তাকিয়ে আছে খুব ইচ্ছা নিয়ে যেন পারলে এখনি নিজের ভিতর নিয়ে নেবে মিরায়াকে। তার খুব করে একটু ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে করছে তার স্বপ্নের পরীকে।

যেন কেউ তার কামনার ফুটন্ত রক্তের মধ্যে পানি ঢেলে দিচ্ছে। আগুনের মধ্যে আলো জ্বলছে।

> এই মেয়েটি একই মানুষ—যাকে সে বৃষ্টিতে দেখেছিল।

কিন্তু তখন সে ছিল এক রূপক, আর এখন সে এক বাস্তব।

> মুখে ক্লান্তি, কিন্তু সেই মুখে একটা ভয়হীন নিরবতা।

যেন পৃথিবীর সব জোর সে হারিয়েছে, তবু কিছুই ছাড়েনি।

তার চোখে আজ আর ঘূর্ণি নেই, আছে মায়া।

তার হালকা গোলাপি ঠোঁটে আর হাসি নেই, তবু সেই নীরব ঠোঁট কেমন যেন কাঁপছে—একটা নিঃশব্দ মোহ বয়ে বেড়াচ্ছে।

> তার ওড়নার কোণে আলো পড়ে এক ধরণের সফেদ পবিত্রতা তৈরি করছে। সে খাচ্ছে—ভাতের এক চামচ যেন দীর্ঘ অভ্যাসে নয়, এক ধরণের অনিচ্ছার সাথে গিলে নিচ্ছে।

> এবং রায়ান নিজেকে ধরে রাখতে পারে না।

এ মেয়েকে দেখে কারো মনে কামনার আগুন জ্বলে উঠবে—সে স্বীকার করে। কিন্তু সেই আগুনে আজ একটা অদ্ভুত জলের রেখা এসে ধাক্কা মারছে। যেন এই মেয়েটিকে ছুঁয়ে ফেলার তীব্র ইচ্ছা, তার সুখ যন্ত্রনার কারণ হওয়া জরুরি।

> এই মেয়ে শুধু "সুন্দর" না। এই মেয়ে – অসহ্যকর সুন্দর।

তবে রায়ান এসব চিন্তা বাদ দিয়ে মাথা ঝাঁকায়। রায়ান চট জলদি ফিরে যায়।

কিন্তু কোনো এক অলক্ষ্যে – মিরায়ার হাত থেমে যায় এক চামচ ভাতের আগে।

সেও জানে না কেন। মৃদু আওয়াজ করে-

"কে..কে ওখানে?"

ততক্ষণে রায়ান নিজের রুমে চলে যাওয়ার সে শুনতে পেল না মিরায়ার ডাক।

---

রায়ান উপরে এসে রুমের দরজা লক করে ভাবতে থাকে- " আমি কি ওকে নিয়ে এত বেশি ভাবছি যে এখন আমি কল্পনা করছি তাকে আমার বাড়িতে? হ্যালুসিনেশন হচ্ছে আমার?— কল্পনা না বাস্তব?

কাঁধে ভার, চোখে অস্থিরতা। কিন্তু মাথায় তখনো ভাসছে সেই রান্নাঘরের দৃশ্যটা। একটা মেয়ে—চুপচাপ এক কোণে বসে খাচ্ছিল। তবে… এখন মনে হচ্ছে, সবটাই কি কল্পনা?

“না… নাহ্, ওখানে কেউ ছিল না।

আমি হয়তো সকালবেলার বৃষ্টিভেজা মেয়েটাকে এত বেশি ভাবছি… যে কল্পনাতেই রান্নাঘরে বসিয়ে ফেলেছি…”

তার বুকের ভেতর এক অদ্ভুত চাপ অনুভূত হয়।

হয়তো একটু ভয়—এই অনুভূতিটা যদি সত্যিই কেবল কল্পনা হয়? কিন্তু কিছু একটা চঞ্চল করে তুলছে তাকে।

রায়ান আবার নিচে নামে। আস্তে পা ফেলে রান্নাঘরে আসে। তবে এবার—ফ্রিজের আলোয় কেউ নেই।

টেবিল খালি, প্লেট নেই, চামচ নেই, এমনকি কোনো গন্ধও নেই যেন কিছু রান্না হয়েছিল।

সে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে, নিঃশব্দে।

তারপর ফিসফিস করে নিজেকেই প্রশ্ন করে—

> “সত্যিই কল্পনা করছিলাম… এতটাই কি গভীরে গিয়েছি আমি?”

একটা দীর্ঘশ্বাস তার ঠোঁট ছুঁয়ে বেরিয়ে আসে।

---

মিরায়া খাওয়া শেষ করে সবকিছু গুছিয়ে নিজের রুমে ঘুমোতে চলে যায়। বিছানায় শোয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই মিরায়া ঘুমের রাজ্যে পাড়ি দেয়। তবে পাশের রুমে থাকা তার আইনগত স্বামী নিজের স্ত্রীকেই অন্য মেয়ে হিসেবে ভাবতে ভাবতে এক ঘুমহীন রাত পার করে।

_______

সকাল সাতটা পঁচিশ

চৌধুরী ভবনের সকালটা যেন আজ একটু বেশি হালকা।

রোদের গায়ে ছিল না কোনো তেজ—বরং যেন মোলায়েম এক ছোঁয়া।

সবার ঘুম ভাঙে ধীরে ধীরে।

রায়ান বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল। সারারাত একফোঁটা ঘুম হয়নি তার নাম না জানা প্রিয়সীর চক্করে। তার হাতে এক কাপ কফি, চোখে কিছু অনাহুত চিন্তা।

আজকের সকালটা অন্যরকম। আজ মায়ের কাছ থেকে ডিভোর্স পেপারে সই করিয়ে নিয়ে যেতে হবে। তার জীবনের এক "অচেনা" সম্পর্ক আজ শেষ হবে।

---

নাস্তার টেবিলে সকলকে নাস্তার জন্য ডাকা হলো।

রুদ্র এখনো নিচে নামেনি ঘুমাচ্ছে সম্ভবত। রায়হান চৌধুরী ব্যবসার কাজে কাল রাতেই চট্টগ্রাম গেছেন।

রামিলা চৌধুরী চুপচাপ, যেমনটা তার স্বভাব। রায়ানও খুব একটা কিছু বলছে না, তবে সে সুযোগ খুঁজছে কখন বলবে সইয়ের কথা।

নাস্তা শেষ হতেই সে বলে,

-“আম্মু, আমি অফিসে যাবো এক ঘণ্টার মধ্যে। ওর থেকে সইটা করে দাও, আমি নিজে সাইন করে দিয়েছি। কাগজটা তোমার কাছেই থাক।”

রামিলা চৌধুরী চুপ থেকে কিছু সময় অতিবাহিত হওয়ার পর বলেন-

"রায়ান বিয়েটা ছেলে খেলা নয়। আমি তোর আব্বুকে তোর এই সিদ্ধান্ত সম্পর্কে জানিয়েছি। তিনি মোটেও খুশি নন। আমরা দুজনেই চাই তুই আরো একটু ভেবে দেখ।"

রায়ান স্বাভাবিক ভাবেই -

"আমি যা সিদ্ধান্ত নিয়েছি ভেবেই নিয়েছি। তা পরিবর্তন হবে না। আশা করি তোমরা দুজন আমার সিদ্ধান্তের সম্মান জানাবে অন্তত্য পক্ষে এখন। কারণ এখন আর আমি ছোট নেই।"

ছেলেকে বোঝাতে ব্যর্থ রামিলা চৌধুরী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন-

"ঠিক আছে, তুই যা চাইছিস তাই হক। একটু দাঁড়া আমি মিরাকে ডেকে দিচ্ছি। ও নিচে আসলে সাইন করিয়ে তোকে পেপারস দিয়ে দেব এখনি।"

১০ বছর আগে কাবিননামায় রায়ান তার বাচ্চা বউয়ের নাম পড়েছিল যা সময়ের সাথে সাথেই তার স্মৃতি থেকে লোপ পেয়েছে। আজ আবার মায়ের কাছ থেকে সেই নামটা শুনলো- "মিরা!" (মিরায়া)।

রামিলা চৌধুরী সুউচ্চ গলায় - "মিরা.. মিরা মা..!"

দোতালা থেকে উচ্চ আওয়াজে উত্তর আসে-

"জ্বি, মামণি?"

রায়ান প্রথম মিরায়ার আওয়াজ শুনে আপ্লুত। কি মিষ্টি সেই স্বর। তবে সেই মিষ্টত্ব তার মুখে প্রকাশ পেল না।

রামিলা চৌধুরী- "একটু কাজ আছে নিচে আয় তো মা।"

মিরায়া-"আসছি মামণি।"

---

উপরে, নিজের ঘর থেকে বের হয় মিরায়া। আজকের দিনটা তার স্বপ্নের প্রথম দিন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে যাচ্ছে সে।

মিরায়া আজ পরেছে স্কাই ব্লু কালারের কুর্তি, আর কাঁধে ভার্সিটির ব্যাগ। পায়ে নুপুর, হাতে সাদা চুড়ি,

চুলগুলো খোলা—নরম ঢেউ খেলানো।

কানে ছোট দুল। সাজগোজ প্রায় নেই বললেই চলে।

"তবে সে এতটাই সুন্দর, যেন সাজটাই তার অপমান।"

ধাপে ধাপে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে থাকে—একটা হালকা ছন্দে যেন।

---

সেই মুহূর্তে…

রায়ান, যেই না মাথা ঘুরিয়ে তাকায়,

ঠিক তখনই তার চোখে পড়ে সেই অপরূপ সুন্দরী নারী যার প্রতি সে আসক্ত হয়ে পরেছে প্রথম ঝলকে।

এক মুহূর্ত—দুই মুহুর্ত শুধু কিছু মুহূর্তেই যেন তার নিঃশ্বাস আটকে যায়।

"এই মেয়েটা…এই চোখ, এই হাঁসি…

যাকে আমি সেদিন বৃষ্টিতে দেখেছিলাম…

আর কল্পনায় হাজারবার চিয়েছি—

এই… মেয়েটাই, মিরা, আমার বিয়ে করা বউ?"

রায়ান অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। তাকে দেখে মিরাও এক ঝলক তাকিয়ে থাকে। বাড়িতে নতুন মুখের আবির্ভাব কখন হলো বুঝে উঠতে পারছে না। তবে

সে চোখ সরিয়ে নেয় না, দেখেই চলেছে যেন সে চেনে তাকে।

---

রায়ানের চোখ নিচে গিয়ে আটকে যায়…নুপুরের আওয়াজে। তারপর উঠে যায় চুলের দুলুনিতে…

তারপর চোখ, ঠোঁট, মুখ,গলা অবধি এসে দাঁড়ায়।

তার ভেতরটা বলে,

“আরে না! এই মেয়েটা এত সুন্দর, এত স্নিগ্ধ…

ও আমার বউ? আমার নিজের?”

পরবর্তীতে আবার নিজেই মুখে স্নিগ্ধ হাসি মুখে রেখে মনে মনে বলে -

"ধুর! কি সব বলছি। বউ অন্যের হবে কেমনে আমারি তো। আমার বউ জান, আমার হৃদপাখি।"

“...মানে... আমি কাল প্রথম দেখায় যার প্রেমে পরে খুঁজে বেড়ালাম। এখন… হঠাৎই আমার বউ হয়ে হাজির?!?তার মানে এই দাঁড়ায় কাল রাতেও আমি ভুল দেখিনি।আমার হৃদপাখি- আমার বউকেই দেখেছি।”

তার ভেতরের অনুভূতিটা এতটাই বিশ্রী মিষ্টি হয়ে পড়ে,

সে নিজের মনে হাসে । হঠাৎই তার ডিভোর্স এর কথা মাথায় আসে। রায়ান নিজের মনে মনে-—

“না না… এতো সুন্দর স্ত্রীর সাথে কার ডিভোর্স হয়? আমি আমার প্রথম প্রেম কে স্ত্রী হিসেবে পেয়েছি আরো দশ বছর আগে। না অসম্ভব! আমার বউ শুরু থেকে শেষ অব্দি আমার থাকবে।”

" সুতরাং, বউ তুমি আমার। তোমাকে আমি মুক্তি দিচ্ছি না। এই জন্মে অন্তত নয়।”

রায়ান নিজের মনে যেন সংসার বেঁধে ফেলেছে মিরায়াকে নিয়ে। মুখ হাসি দেখা না গেলেও, মন যেন শরীরে নেই- উড়ছে ।

---

রায়ান আর রামিলা চৌধুরী যেখানে দাঁড়িয়ে আছেন

মিরা সেদিকে এগিয়ে আসছে। ব্যাগ কাঁধে, চোখে উজ্জ্বলতা। তবে তার চোখ যেন পরছে না রায়ানের থেকে।

মিরায়া নিচে নেমেই সোজা রামিলা চৌধুরীর সামনে এসে দাড়িয়ে বলে-

"Good morning, মামণি। কিছু বলবে?

রামিলা:"good morning, মা। কিছু তো বলবি। আগে এটা বল এত সকালে রেডি হয়ে কোথায় যাওয়া হচ্ছে?"

মিরায়া উচ্ছসিত কন্ঠে বলল-

"আমি ভর্তির কাজটা শেষ করতে যাচ্ছি। যদিও সময় আছে এখনো তবে আমি আর দেরি করতে চাই না। আজই ভর্তি হয়ে ঢাবিয়ান হয়ে যাব।"

মিরায়ার কথা গুলো খুব মনোযোগ সহকারে শুনছিল রায়ান। আশ্চর্যতা, বিস্ময়তার চূড়ান্ত পর্যায়ে আছে সে মিরায়াকে দেখে। তারা সামনেই তার বউ, সেই প্রিয় মুখটা যা একবার দেখে তার আবার দেখার তীব্র ইচ্ছা জেগেছে মনে।

রায়ানের এই সব চিন্তা যেন এক পলকে উধাও হলো মিরায়ার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তির কথা শুনে। সে আনমনে বলল-

"ঢাবিয়ান?"

মানে তার সেই পিচ্চি বউটা এখন ভার্সিটিতে পড়তে যাচ্ছে তার আবার ঢাবিতে। খুব সম্ভবত তার মনে এক গৌরবের সৃষ্টি হলো জেনে যে- তার বউ ঢাবিতে পড়ার মতো মেধা রাখে।

রায়ানের প্রশ্ন সূচক প্রতিক্রিয়ায় মিরায়া আবার ফিরে তাকায় রায়ানের দিকে। এবার যেন দুই জোড়া চোখ এক হলো সম্পূর্ণ ভাবে। রায়ান একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মিরায়ার দিকে মিরায়াও ঠিক তাই।

দুজনের তাকানোর সময়কাল একটু দীর্ঘ হতেই রামিলা হালকা কাশি দিয়ে তাদের মনোযোগ ভঙ্গ করে বলেন-

"মিরা তোদের আগে কখনো দেখা হয়নি তাই হয়তো চিনতে পারছিস না। ও আমার বড়ো ছেলে রায়ান কাল রাতেই আমেরিকা থেকে দেশে ফিরেছে।"

মিরায়া রায়ানের কথা শুনে এক রাশ উত্তেজনায় মুখে হাঁসি নিয়ে রায়ানের দিকে তাকাতেই..রায়ান মায়ের মুখে তার পরিচিতি দেওয়ার পর অত্যন্ত উৎসুক মনে মিরায়ার দিকে তাকায়-

মনে তার এক প্রশ্ন-

"এখন মিরায়া প্রথম বারের মতো তার সাথে কথা বলবে তার উদ্দেশ্যে কিছু বলবে। কি বলবে?"

মিরায়া রায়ানের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে মিরায়া নীরবতা ভেঙে সজোরে বলে উঠলো-

" ওহ! এই তাহলে দ্যা গ্রেট রায়ান চৌধুরী? ফাইনালি দেখা পেয়েই গেলাম।

রায়ানের দিকে মুখ করে-

"আসসালামুয়ালাইকুম, কেমন আছেন রায়ান ভাইয়া?"

রায়ান-" আসতাগফিরুল্লা।"

রায়ানের মিরায়ার মুখে প্রথম দিনেই ভাইয়া ডাক শুনে কাশি উঠে যায়।

মিরায়া আর রামিলা চৌধুরী হকচকিয়ে উঠল।

মিরায়া- "ও মা, হঠাৎ কি হলো আপনার রায়ান ভাইয়া? পানি খাবেন? পানি এনে দিব?"

রায়ান- " নাউজুবিল্লা।"

বিষ এনেদে ছেমরি! সব আশায় পানি ঢেলে দিয়ে এখন পানি অফার করছে (মনে মনে)।"

রায়ানের কাশির গতি কমে এলে সে নিজেকে শান্ত করে মিরায়ার দিকে কঠিন দৃষ্টিতে তাকায়। কারণ না বুঝলেও, মিরায়া রায়ানের তাকানোতে রাগের ঝলক ঠিকই দেখতে পায়।

মিরায়া রায়ানের চোখের দিকে আর তাকিয়ে থাকতে না পেরে রামিলা চৌধুরীর দিকে ঘুরে জিজ্ঞেস করল-

"মা.. মামণি, তুমি আমাকে ডাকছিলে কেন কারণ টা তো বললে না।"

রামিলা চৌধুরী হাতে থাকা ডিভোর্স পেপার টা মিরায়ার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে কিছু বলতে যাবে তার আগেই রায়ান পেপার টা তার মায়ের হাত থেকে নিয়ে নিল ছৌ মেরে এবং নিজের পিছনে লুকিয়ে ফেলল।

রায়ানের এমন আচরণে মিরায়া ও রামিল চৌধুরী দুজনই আশ্চর্য হয়। তারা একই সাথে রায়ানের দিকে তাকালে রায়ান তাদের দুজনের চোখে পর পর তাকিয়ে তাদের প্রশ্ন সূচক চাহুনি দেখে সে নিজের এহেন কাজের মন গড় কারণ বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করতে যাবে...

এমন সময় হঠাৎ....

চলবে....

আপনাদের কাঙ্ক্ষিত পর্ব টা আপনারা পরে নিয়েছেন । এখন দ্রুত মতামত দিন কেমন লাগলো। মিরায়া আর রায়ানের সম্পর্ক টা কেমন হবে?🤭

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৭ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন