ফন্ট সাইজ:
থিম:
আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ

১৩তম পর্ব

লেখক: অরাত্রিকা রহমান

#আত্মার_অঙ্গীকারে_অভিমোহ

#Soul_bound_obsession

#Oratrika_Rahman_অরাত্রিকা_রহমান

#Part_13(1st)

(কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ)

(প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য উন্মুক্ত)

— “ওর আবার কি হলো হঠাৎ?” (মনে মনে)

মাথা নাড়তে নাড়তে সে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এল। ড্রইংরুমে এসে দেখে, সোফায় বসে আছেন রামিলা চৌধুরী, আর পাশে দাঁড়িয়ে আছে মিরায়া। দুজনেই যেন অস্বস্তিতে ছিল, রুদ্রর আচরণে স্পষ্টই ওরাও অবাক হয়েছে।

রায়ান কাছে গিয়ে সরাসরি জিজ্ঞেস করল,

— “আম্মু, রুদ্রর কি হয়েছে? এমন কটকটে হয়ে উপরে চলে গেল কেন?”

রামিলা চৌধুরী গভীর নিঃশ্বাস ছেড়ে মাথা নাড়লেন। চোখে-মুখে চিন্তার ছাপ। আর পাশে দাঁড়ানো মিরায়ার মুখেও বিস্ময়ের ছাপ পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছিল—সে-ও বুঝতে পারছিল না ঠিক কী ঘটল যে রুদ্র এতটা অস্বাভাবিক আচরণ করছে।

ঘরের পরিবেশে তখন এক ধরনের ভারী নীরবতা নেমে এল, সবাই যেন অজানা প্রশ্নে আটকে গেল।

রামিলা চৌধুরী রায়ানের প্রশ্ন শুনেও কোনো উত্তর দিলেন না। চোখ নামিয়ে নিজের হাতের আঙুল ঘষতে লাগলেন, যেন অস্বস্তি লুকোচ্ছেন।

রায়ান একটু বিরক্ত হয়ে আবার বলল, এবার কণ্ঠে চাপা উঁচু স্বর,

— “আম্মু, আমি জিজ্ঞেস করছি রুদ্রর কি হয়েছে? তুমি কিছুই বলছো না কেন?”

এবার রামিলা চৌধুরী চোখ তুলে তাকালেন। গলায় স্পষ্ট রাগ আর অভিমান মিশে ছিল,

— “রায়ান, তোকে আমি কতবার বলেছি আমার সাথে কথা বলার সময় তোর গলার স্বরটা ঠিক রাখতে। আমি তোর মা। আমার সাথে এইভাবে কথা বলবি না।”

রায়ান হতভম্ব হয়ে কিছু বলার আগেই তিনি আবার বলতে শুরু করলেন—

— “তোদের দুই ভাইয়ের আচরণে আমি কিচ্ছুই বুঝি না। রুদ্রর কি হয়েছে সেটা আমায় কে বলবে? তোরা কেউ আমাকে কিছু জানানো প্রয়োজন মনে করিস ? বড় ভাই যখন ইচ্ছে দেশ ছেড়ে আমেরিকা চলে যায়, কিছু না বলেই। আর ছোট ভাই খেতে বললে খাবে না, মুখ ভার করে ঘরে চলে যাবে। আমি কি শুধু বসে আছি তোদের এসব রংবেরং এর কাহিনী সহ্য করার জন্য?”

কথাগুলো বলার সময় তার কণ্ঠে আঘাত, অভিমান আর ক্লান্তি মিশে যাচ্ছিল। যেন ভেতরে জমে থাকা অতীতের ছেলে না বলে বিদেশ চলে যাওয়ার কষ্ট এক মুহূর্তে বেরিয়ে এলো।

এবার আর দাঁড়ালেন না তিনি। শেষ কথাগুলো বলে হঠাৎ করেই উঠে দাঁড়ালেন আর নিজের রুমের দিকে চলে গেলেন। পদক্ষেপগুলো ভারী হলেও স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল—তিনি রেগে আছেন, কষ্ট পেয়েছেন।

রায়ান এক জায়গায় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। চোখে বিস্ময়, মুখে অবাক অভিব্যক্তি। সে যেন বিশ্বাসই করতে পারছিল না, এতটুকু প্রশ্নের জবাবে আম্মু হঠাৎ আমেরিকা চলে যাওয়ার পুরনো প্রসঙ্গ তুলে দিলেন। রুদ্রর উপর তার ক্ষোভ ছিল, কিন্তু সেই ক্ষোভ যেন আচমকাই তার উপর এসে পড়ল।

চোখ নামিয়ে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল রায়ান। কেবল এক দৃষ্টিতে মায়ের চলে যাওয়া পিঠের দিকে তাকিয়ে থাকল। তার মনে হচ্ছিল, এই বাড়ির প্রতিটা সম্পর্ক যেন ধীরে ধীরে জট পাকিয়ে যাচ্ছে, আর সে দাঁড়িয়ে কিছুই করতে পারছে না।

একদিকে বউ থেকেও নেই , বাবা বাড়িতে নেই যে সব সমাধানের জন্য কথা বলবে, ভাইটা যাও একটু ঠিকঠাক ছিল এখন সেও অন্য রকম আচরণ করছে আর এখন মাও রেগে গেলো। তার যেন আর শান্তি হচ্ছে না।

রামিলা চৌধুরী রাগী ভঙ্গিতে নিজের রুমে চলে যাওয়ার পর ড্রইংরুমটা হঠাৎ একেবারে নিস্তব্ধ হয়ে গেল। রায়ান এক জায়গায় দাঁড়িয়েই রইল, মায়ের চলে যাওয়া পিঠের দিকে তাকিয়ে। তার মুখে তখনো অবাক ভাবটা লেগে ছিল। কয়েক মুহূর্ত এমন চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকার পর হঠাৎ তার চোখ পড়ল সামনেই দাঁড়ানো মিরায়ার দিকে।

মিরায়াও তখন পুরো ঘটনাটা চুপচাপ দেখে যাচ্ছিল। রায়ানের দৃষ্টি নিজের দিকে পড়তেই সে হঠাৎ একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেল। কারণ রায়ানের চোখে যে ক্লান্তি, যে অস্থিরতা ছিল তা যেন মুহূর্তেই মুছে গিয়ে অন্যরকম এক শান্তি ভেসে উঠল—আর সেই শান্তির কেন্দ্রবিন্দুই যেন সে নিজে।

রায়ান কিছু বলল না, শুধু স্থির চোখে তাকিয়ে থাকল মিরায়ার দিকে। একরাশ অশান্তির ভেতর থেকেও এই মেয়েটার মুখের দিকে তাকানো মাত্র তার ভেতরটা যেন ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে আসছিল। যেন সমস্ত ঝড় থেমে গিয়ে একটু ঠাণ্ডা বাতাস বইছে।

কিন্তু মিরায়ার জন্য ব্যাপারটা সহজ ছিল না। হঠাৎ এমন গভীর দৃষ্টিতে রায়ান তাকে দেখছে, এটা তার অভ্যস্ত নয়। বুকের ভেতরটা কেমন যেন ধড়ফড় করে উঠল। নিজের হাতদুটো পরিহিত ওড়নায় গুটিয়ে আনল, মাথা সামান্য নিচু করল, যেন দৃষ্টি এড়াতে চাইছে—কিন্তু তবুও নিজের ভেতরে অদ্ভুত একটা আলোড়ন টের পাচ্ছিল।

এইভাবে কয়েক সেকেন্ড কেটে গেল—ড্রইংরুমে আর কোনো শব্দ নেই, শুধু নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকা দু’জন মানুষ, একজনের চোখে প্রশান্তি খোঁজার দৃঢ়তা, আরেকজনের ভেতরে লুকোনো কেঁপে ওঠা অনুভূতি।

ড্রইংরুমে কিছুক্ষণ নীরবতা ভেসে বেড়াচ্ছিল। রায়ান তখনো চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল মিরায়ার দিকে তাকিয়ে। কিন্তু অবশেষে সে নিজেই নীরবতা ভাঙল, কণ্ঠস্বরটা ছিল শান্ত, একেবারে নরম—

— “কিছু খেয়েছো?”

হঠাৎ প্রশ্নটা শুনে মিরায়া যেন চমকে উঠল। চোখ কুঁচকে তাকালো রায়ানের দিকে, তারপর আচমকা নিজের ভঙ্গিটা সামলাতে গিয়ে একটু আমতা আমতা করে উত্তর দিল—

— “না… মানে… এখনো খাইনি। খাবার নিতে এসেছিলাম।”

তার কণ্ঠে যেন লজ্জা আর অপ্রস্তুত ভাব মিশে গিয়েছিল। রায়ান ঠোঁটের কোণে হালকা একটা মৃদু হাসি টেনে বলল—

— “আমারও তো কিছু খাওয়া হয়নি। চলো তাহলে, হৃদপাখি, একসাথে খেয়ে নিই।”

“হৃদপাখি” শব্দটা রায়ানের ঠোঁট থেকে বেরোনোর পর মুহূর্তেই বাতাসে একটা অদ্ভুত মিষ্টি অনুভূতি জমাট বাঁধল। মিরায়ার বুকের ভেতরটা কেমন যেন হালকা দোলা খেল। গাল লাল হয়ে উঠল, সে সামান্য নিচু গলায় বলল—

— “না… আমার পেট ভরে গেছে। আমি খাব না।”

কথাগুলো বলে মিরায়া চোখ নামিয়ে নিল, তারপর ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল সিঁড়ির দিকে। হাঁটার ভঙ্গিতেই বোঝা যাচ্ছিল, সে লজ্জা লুকাতে চাইছে।

মিরায়া সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠছিল। তার ভঙ্গিটা কেমন যেন লজ্জায় ভরা—মুখটা নিচু, চোখ মাটিতে স্থির, বুকের ভেতর অদ্ভুত কাঁপুনি কাজ করছে। ঠিক তখনই রায়ানের গলা শোনা গেল, নরম অথচ দৃঢ় সুরে—

— “মিরা… থামো।”

কথাগুলো শুনে মিরায়ার পা আচমকা থেমে গেল। যেন অজান্তেই থামতে বাধ্য হলো। কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থেকে সে ধীরে ধীরে শ্বাস নিল, তারপর ধীরে মাথা তুলল।

রায়ান এবার নিচু গলায়, কিন্তু গভীর একটা টান নিয়ে বলল

— “আমার দিকে ঘুরে তাকাও।”

মিরায়া দ্বিধা করছিল। বুকের ভেতর কেমন যেন গুলিয়ে যাচ্ছিল, তবুও ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল। তার চোখ নামানো, ঠোঁট কাঁপছে সামান্য।

রায়ান তখন দুই-একটা ধাপ এগিয়ে এল, আরেকটু কাছে এসে দাঁড়াল। তার চোখ দুটো তীক্ষ্ণ অথচ নরম, এক অদ্ভুত মিশ্রণ। সে স্পষ্ট উচ্চারণে বলল—

— “লুক অ্যাট মি, হৃদপাখি।”

মিরায়ার বুক হঠাৎ জোরে ধক করে উঠল। সে চোখ তুলতে পারছিল না, ভেতরের লজ্জা তাকে গ্রাস করে ফেলছিল। ঠোঁট কামড়ে সে দৃষ্টি ঘুরিয়ে নিল পাশে।

রায়ানের কণ্ঠ এবার আগের চেয়ে গাঢ়, প্রায় নির্দেশের মতো কিন্তু ভালোবাসায় মোড়ানো অধিকার খাটিয়ে বলল

— “হার্টবার্ড… আই সেইড, লুক অ্যাট মি।”

কথাগুলোয় এমন এক অদৃশ্য টান ছিল যে মিরায়ার বুকের ভেতর আরও জোরে কেঁপে উঠল। ধীরে ধীরে, অনেক দ্বিধার পর সে অবশেষে চোখ তুলল। আর তখনই তাদের দৃষ্টি এক হলো—

মিরায়া চোখ তুলতেই মুহূর্তের জন্য সবকিছু যেন থমকে গেল। দু’জনের দৃষ্টি আটকে গেল একে অপরের চোখে। মীরার বুক জোরে ধকধক করছে, যেন হৃদস্পন্দন স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে চারপাশে।

রায়ান সামনের দিকে আরেকটু এগিয়ে এলো। রায়ানের মিরায়ার কাছে আস্তে আস্তে এক পর্যায়ে তাদের মধ্যে দূরত্ব প্রায় নেই বললেই চলে। মিরায়ার নিশ্বাস ভারী হয়ে উঠছে। চোখের পাতা কাঁপছে, ঠোঁট শুকিয়ে গেছে যেন।

রায়ানের চোখ দুটো গভীর— নরম, এক চূড়ান্ত মুহূর্তে দাবিদার। সে নিচু স্বরে, একদম গম্ভীর কিন্তু টানভরা সুরে বলল—

— “ আই ডোন্ট লাইক রিজেকশন, হার্ট-বার্ড। আমি কিছু বললে সেটার প্রতি উত্তর কখনো 'না' যেন না হয়। বলার পরও এভাবে আমার থেকে চোখ সরানো খুব বিপজ্জনক, হৃদপাখি।

You are not allowed to do that”

মিরায়ার ঠোঁট সামান্য কেঁপে উঠল। কিছু বলতে গিয়েও গলার স্বর আটকে গেল। শুধু চোখ নামিয়ে ফেলার চেষ্টা করছিল, কিন্তু রায়ানের চাহনির টান থেকে মুক্ত হওয়া অসম্ভব হচ্ছিল।

রায়ানের হাত অজান্তেই একটু উঠল, প্রায় ছুঁয়ে ফেলতে যাচ্ছিল মিরায়ার গালটা। কিন্তু মাঝপথে থেমে গেল। আঙুলের ডগা যেন কয়েক ইঞ্চি দূরে কাঁপছে।

মিরায়ার নিঃশ্বাস গরম হয়ে কানে লাগছিল রায়ানের। রায়ান সামান্য ঝুঁকে এলো, তার কানের পাশে মুখ নিয়ে গিয়ে শ্বাস ফেলে বলল—

— “তুমি বুঝতে পারছো না আমি কতোটা কষ্টে কন্ট্রোল করছি নিজেকে?”

মিরায়ার পুরো শরীর কেঁপে উঠল। ঠোঁট হালকা ফাঁক হলো, চোখ বন্ধ হয়ে এল অজান্তেই। মুহূর্তটা এতটা টানটান যে, মনে হচ্ছিল সামান্য ভুল হলেই সব বাঁধ ভেঙে যাবে।

রায়ানের চোখ আটকে গেছে মিরায়ার দিকে। মিরায়া সামান্য নিচে তাকিয়ে আছে, কিন্তু তার ঠোঁট কাঁপছে, শ্বাসপ্রশ্বাস দ্রুততর হয়ে উঠছে। বুকটা ওঠানামা করছে যেন সে নিজের ভেতরের ঝড় লুকাতে পারছে না।

রায়ান তাকিয়েই বুঝতে পারছে—এই মুহূর্তে তার স্ত্রীর দেহ ভেতর থেকে কাঁপছে, আর সেই কাঁপন যেন তার বুকের ভেতরেও বাজছে।

রায়ানের চোখ স্থির হয়ে রইল মিরায়ার ঠোঁটে। স্নিগ্ধ, নরম, গোলাপি ঠোঁট, সামান্য ফাঁক হয়ে আছে। বুকের ভেতর অদম্য আকাঙ্ক্ষা জেগে উঠল। মনে হলো, এখনই যদি এগিয়ে গিয়ে সেই ঠোঁটের মিষ্টতা নিজের ঠোঁটের মাঝে বন্দী করতে পারত… যদি একবার ডুবে যেতে পারত সেই অচেনা স্বাদের গভীরে…

মুহূর্তে শরীর কেঁপে উঠল রায়ানের। এক পা এগিয়ে গেল। মিরায়া নিঃশ্বাস আটকে তার দিকে তাকাতে চাইলো, কিন্তু পারলো না। দৃষ্টি নিচু করল, অথচ দেহ যেন অজান্তেই রায়ানের কাছে টেনে নিচ্ছে তাকে।

দুইজনের মাঝে ফাঁকা দূরত্বটা তখন আর থাকছে না, যেন দমের টানে ঘনিয়ে আসছে। রায়ান এতটা কাছে চলে এলো যে তার নিশ্বাস মিরায়ার কানের পাশে লাগছে। মিরায়ার হঠাৎ শরীর শিউরে উঠল। ঠোঁট কাঁপতে কাঁপতে সামান্য নড়ল, দেয়ালে পিঠ ঠেকলো, আর তার বুকের কাঁপন যেন আরও জোরালো হয়ে গেল।

রায়ানের ভেতরে তখন ঝড়। হাত বাড়ালেও ঠোঁট ছুঁয়ে ফেলতে পারত। কিন্তু ঠিক তখনই বুকের ভেতর একটা বোধ তাকে আটকালো।

“না… এটা সঠিক সময় নয়। আমি যদি এখন নিজের ইচ্ছের কাছে হেরে যাই, তাহলে ওর চোখে আমি ছোট হয়ে যাবো। ও ভয় পাবে। না… আমি পারবো না।”

রায়ান চোখ শক্ত করে এক মুহূর্তের জন্য নিঃশ্বাস নিল। তারপর ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি এনে ধীরে গলায় বলল—

— “যেহেতু তোমার খিদে নেই, আমারও খিদে নেই। আমার জন্য এক কাপ কফি বানিয়ে আমার রুমে নিয়ে এসো।”

এই হঠাৎ কথাটা যেন মুহূর্তেই বাতাস চিরে অন্য দিকে ঘুরে গেল।

রায়ান সিঁড়ি বেয়ে উপরে নিজের রুমে চলে গেল।

মিরায়া কেঁপে উঠল আবার। কিছুক্ষণ স্তব্ধ থেকে ধীরে মাথা নাড়ল হ্যাঁসূচক। তারপর রায়ান হালকা পদক্ষেপে সিঁড়ির দিকে এগোতে লাগল। তার বুক তখনো দমে দমে কাঁপছে, ঠোঁট শুকিয়ে আসছে।

সে ঠোঁট কামড়ে নিয়ে হঠাৎ তার বুকের ভেমিরায়া কেঁপে উঠল আবার। এক অদ্ভুত অনুভূতি কাজ করল। নিজের হাতের তালুতে চাপ দিল, নিজেকে সামলাতে মনে ভাবতে লাগল—

“কি হলো একটু আগে আমার? আমি কেন এভাবে কাঁপছিলাম? কেন নিজেকে সামলাতে পারলাম না? ইস্! রায়ান ভাইয়া কি ভাববে এখন আমাকে নিয়ে।”

মুখে হাত রাখল, ঠোঁট এখনো কাঁপছে। তারপর নিজেই মাথায় একটা ঠুক্কা মেরে ফিসফিস করে বলল—

— “মিরা তুই কি পাগল হয়ে গেছিস? এভাবে কাঁপতে শুরু করলি কেন? কিসের ভয়? একটা মানুষকে দেখলেই বুক কাঁপে উঠতে হবে? , ঠোঁট শুকিয়ে আসবে! উফফ… এভাবে চললে তো তুই একদিন নিজের পাগলামিতেই লজ্জিত হয়ে মরে যাবি।”

বলেই হালকা লজ্জায় মুখ ঢাকল, যেন নিজের শরীরের প্রতিক্রিয়াতেই অবাক হয়ে গেছে। হাসি আর লজ্জার মিশেলে তার গাল লাল হয়ে উঠল।

নিচে meanwhile রায়ান সোফায় বসে গভীর নিঃশ্বাস ফেলছে। ভেতরে ভেতরে ভাবছে—

“আমি তো কখনো এভাবে রিয়েক্ট করিনি… কেন ওর সামনে হলে নিজেকে কন্ট্রোল করতে কষ্ট হয়? কেন এই শরীর অন্যরকম আচরণ করে?”

ঠোঁটের কোণে একটুখানি ক্লান্ত অথচ অদ্ভুত তৃপ্তির হাসি।

রায়ান ভাবতে পারেনি মিরায়া তার ইশারায় সাড়া দেবে। সে মাথার চুল গুলোকে উপরের দিকে পড়িয়ে বলল-

"বউ জান আমার, তুমি এভাবে সাড়া দিলে নিজেকে আটকে রাখতে পারবো না আমি । প্লিজ ডোন্ট টেইক মাই টেস্ট।"

তারপর রায়ানের মাথায় হঠাৎই আসলো- "মিরা কি ঠিক এমন ভাবেই আমার হবে একদিন। আমি তার স্বামী জানার পর কি সে আমাকে মানবে? আমার তাকে দশ বছর আগে অস্বীকার করার বিষয়টা কি সে মানবে?

রায়ানের শরীর অন্য রকম জ্বালা করতে থাকে। নিজের শরীর এর জ্বালা ভাব মিটাতে রায়ান একটা কোল্ড শাওয়ার নিয়ে টাওয়াল নিয়ে ওয়াশরুমে চলে যায়।

________

মিরায়া ধীরে ধীরে বন্ধ করে নিজের আবেগ সামলাতে লাগল। ঠোঁটের কোণে হালকা লজ্জা, বুকের ভেতর উত্তেজনার এক অদ্ভুত কেঁপন—সব মিলেমিশে তার হৃদস্পন্দন আরও দ্রুত। রায়ানের কথার অনুসারে, সে রায়ানের জন্য এক মগ কফি বানিয়ে সে নিজেকে একটু শান্ত করে রায়ানের রুমের দিকে এগোল। হাতে কফির মগটা, যা সে নিজের জন্য নয়, রায়ানের জন্য বানিয়েছে।

রুমের সামনে এসে মিরা দরজায় হালকা নক করল।

“রায়ান ভাইয়া… আমি কফি নিয়ে এসেছি।”

কোনো সাড়া নেই। দরজার পাশে একটু থেমে সে ভ্রু কুঁচকালো, তারপর নিজের সাহস বাড়িয়ে ধীরে ধীরে দরজা ঠেলে খুলল। দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে সে পা বাড়াল ভিতরে। প্রথমবার রায়ানের রুমে ঢুকতে এসে মিরা খানিকটা অবাক। সাধারণত ছেলেদের ঘর একটু অগোছালো, বইপত্র ছড়ানো, জামা কাপড় ছিটিয়ে থাকে—কিন্তু রায়ানের ঘর একেবারে ভিন্ন।

সবকিছু পরিপাটি, প্রতিটি জিনিস নিজের স্থান পেয়েছে। ডেস্কের উপরে ল্যাপটপ, নোটবুক, কলমপেন্সিল—সবকিছু সুশৃঙ্খল। শেলফে বইগুলো সাজানো, চারপাশে কোনো অগোছালো জিনিস নেই। ফ্লোরে একটি মোটা কার্পেট, সোফার উপর ছোট কয়েকটা কুশন। এমন পরিপাটি পরিবেশ দেখে মিরায়া নিজেও অবাক হয়ে মুখে হালকা হাসি ফেলল।

কফির মগটি হাতে ধরে সে ধীরে ধীরে সাইড টেবিলের উপরে রাখল। তারপর চারপাশে চোখ বুলিয়ে রুমটাকে নিজের চোখে ধরতে লাগল। হঠাৎ তার কান শুনল—ওয়াশ রুম থেকে ঝরনার জল পড়ার আওয়াজ। মিরায়া মুহূর্তে বুঝতে পারল, রায়ান সম্ভবত সাওয়ার নিচ্ছে।

সাইলেন্ট রুমে ঝরনার আওয়াজের সাথে মিরায়ার হৃদস্পন্দন মিলেমিশে এক অদ্ভুত উত্তেজনা তৈরি করল। সে ধীরে ধীরে কফির মগটার দিকে তাকিয়ে, এক হাত দিয়ে সামান্য চুল বেধে, চারপাশ ঘুরে দেখল। ডেস্ক, শেলফ, জানলার দিকে চোখ বুলল, যেন রায়ানের ব্যাক্তিত্ব এবং যত্নশীলতা প্রত্যেক জায়গায় ফুটে উেছে।

মিরায়া মনে মনে ভাবলো,

—“এভাবে, রায়ানের ঘরে থাকা, এই শান্ত পরিবেশে… সত্যিই অদ্ভুতভাবে শান্তি মেলে।”

মিরায়া হালকা নিঃশ্বাস ফেলে রুমের কোণ দিয়ে ধীরে ধীরে তাকিয়ে রুমের প্রতিটি জায়গায় চোখ বুলাল। এই প্রথমবার, রায়ানের ব্যক্তিগত জায়গায় প্রবেশ করে সে একটি ছোট্ট কিন্তু গভীর অনুভূতি অনুভব করছে—এক ধরণের নীরব, শান্ত অথচ উত্তেজনাপূর্ণ সংযোগ।

চলবে...

Part-13 দুইটা অংশে আসবে পাখিরা।। আমি একটু ব্যস্ত তাও দিলাম গল্প শুরু মাত্র নিজের কথা ভঙ্গ করা হবে এবং তোমরা কষ্ট পাবে বলে।😩 অনেক অপেক্ষা করিয়েছি তবু সম্পূর্ণ শেষ হলো না । আমার ব্যর্থতা এটা। সরি পাখিরা।🥲

কেমন লেগেছে জানিস আর পসিবল হলে গল্পের রিলেটেড ও এই পার্ট টুকু নিয়ে কমেন্ট কোরো next part চাইতে হবে না লিখা হয়ে যাবে।🥰🤗

love you Heart-Birds ❤️

#আত্মার_অঙ্গীকারে_অভিমোহ

#Soul_bound_obsession

#Oratrika_Rahman_অরাত্রিকা_রহমান

#Part_13 (2nd)

(কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ)

(প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য উন্মুক্ত)

মিরায়া ধীরে ধীরে কফির মগটি সাইড টেবিলে রেখে রুমের চারপাশে চোখ বুলাচ্ছিল। পরিচ্ছন্ন, পরিপাটি ঘরটি তার নজর কাড়ে। ধীরে ধীরে তার চোখ এক কোণে থাকা বড় বুক সেলফের দিকে যায়। সেলফটা neatly সাজানো বইগুলো একদম প্রতিটি সেলফের স্থান অনুযায়ী স্থিরভাবে রাখা।

মিরায়া ধীরে ধীরে সেলফের কাছে এগোয়। হাত দিয়ে হালকা স্পর্শ করে বইগুলো ধরে দেখে। তার চোখ আটকে যায় সেলফের একটি বিশেষ স্থানে—সেই চারটি বই পাশাপাশি সাজানো।

তার আগ্রহ আরও বাড়ে। প্রথমেই সে প্রথম বইটি তুলে দেখে। বুকের উপরের লেখা পড়ে, “Twisted Series: Love”। মিরায়ার চোখে অদ্ভুত এক উচ্ছ্বাসের ঝিলিক ফুটে ওঠে। এই প্রথমবার সে রায়ানের পড়া এই ছোট্ট অংশের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে।

এরপর সে বাকি তিনটি বইতে নজর দেয়। প্রত্যেকটি বই একই সিরিজের—Twisted Series: Game, Twisted Series:hate, আর Twisted Series: lies।

মিরায়া হালকা নিঃশ্বাস ফেলে বইগুলো আবার সেলফে রাখে, এক মুহূর্তের জন্য থেমে থাকে, এবং মনে মনে ভাবতে থাকে—“রায়ান কত যত্নশীলভাবে নিজের জিনিসগুলো সাজায়… আর তার পছন্দগুলো, এই বইগুলো, আমাকে অদ্ভুতভাবে আকর্ষণ করছে।”

একটু কৌতূহল আর শৌখিন চোখে সে চারটি বই আরও ঘেঁষে দেখে। “Love… Game… hate… lies… সবকিছু ঠিকমতো রাখা, যেন প্রতিটি বই যেন নিজেই গল্প বলতে চায়,” মনে মনে বলল।

মিরায়ার মনে অদ্ভুত এক অনুভূতি ঘুরপাক খায়। বইগুলো দেখে, রায়ানের রুচি আর সাজানো পদ্ধতি তার প্রতি আগ্রহ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। সে কিছুক্ষণ সেলফের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে, প্রতিটি বইয়ের নাম মনোযোগ দিয়ে পড়ে, যেন বইগুলোর মধ্য দিয়ে সে রায়ানের ভেতরের দিকটা জানার চেষ্টা করছে।

বলা চলে একপ্রকার কৌতূহলের বসেই মিরায়া সেলফ থেকে Twisted Series: Love বইটা আস্তে করে টেনে বের করল আবার।

পাতাগুলো উল্টাতে উল্টাতে হঠাৎ মাঝামাঝি এসে তার হাত থেমে গেল। সেখানে একটা সোনালী রঙের বুকমার্ক গুঁজে রাখা ছিল। বুকমার্কটা বের করতেই চোখে পড়ল পাতার ভেতর কিছু লাইন হাইলাইট করা।

হাইলাইট করা লাইনটা পড়তে গিয়ে মীরার বুক যেন ধক করে উঠল।

পাতায় লেখা—

“His lips were so close to mine that the line between breath and desire blurred. I knew if I touched him in that moment—I would never be able to stop.”

“তার ঠোঁট আমার ঠোঁটের এত কাছে ছিল যে নিঃশ্বাস আর আকাঙ্ক্ষার সীমারেখা মুছে যাচ্ছিল। আমি জানতাম, যদি সেই মুহূর্তে ছুঁই—তাহলে আর থামতে পারব না।”

মিরায়া লাইনটা পড়ে আচমকাই চমকে উঠল। বুকের ভেতরটা কেমন অদ্ভুতভাবে কেঁপে উঠল তার। দু’চোখে যেন এক মুহূর্তে রায়ানের চাহনি ভেসে উঠল। ঠোঁট… নিঃশ্বাস… আকাঙ্ক্ষা—এই শব্দগুলোই তার গালকে টকটকে লাল করে দিল।

মিরায়া পাতাটা বন্ধ করে দিতে চাইল, কিন্তু হাত আবার বইয়ের ভেতরকার কয়েকটা হাইলাইটেড লাইনে আটকে গেল।

পাতায় লেখা ছিল—

“His gaze burned into me, as if the whole world had stopped. Only a breath away… and I knew, if he leaned in, everything would shatter.”

“তার চোখে আটকে গিয়েছিলাম, যেন পুরো পৃথিবীটা থেমে গেছে। আমাদের মাঝে শুধু নিঃশ্বাসের ফাঁকিটুকু বাকি ছিল, আর আমি জানতাম—একটু এগোলেই সব ভেঙে পড়বে।”

মিরায়া নিঃশব্দে গিলে ফেলল লাইনটা। বুকের ভেতরটা অদ্ভুতভাবে ধড়ফড় করতে লাগল। রান্নাঘরে রায়ান যখন মৃদু গলায় বলেছিল “Heartbird, look at me”, সেই মুহূর্তটা যেন আবার ফিরে এলো।

পাতা উল্টাতেই চোখে পড়ল আরেকটা হাইলাইটেড অংশ—

“His fingers brushed against mine, and it felt like fire. I couldn’t pull away even if I tried.”

“তার আঙুল ছুঁয়ে গিয়েছিল আমার হাতে, আর সেই ছোঁয়া ছিল আগুনের মতো। আমি চাইলেও আর সরে আসতে পারিনি।”

লাইনটা পড়েই তার মনে হলো, ঠিক যেমন রান্নাঘরে রায়ানের হাত তার হাতের পাশ ঘেঁষে গিয়েছিল। সে ইচ্ছে করলেও সরে আসতে পারেনি।

মিরায়ার হাত হঠাৎ শিউরে উঠল। বুকের ভেতর কেমন অদ্ভুত এক গরম ঢেউ বয়ে গেল। তার মনে পড়ে গেল রায়ানের ঠান্ডা অথচ গভীর কণ্ঠের টান—

“থেমে যা… আমার দিকে ঘুরে তাকাও।”

শেষে চোখ আটকালো তৃতীয় লাইনে—

“We both wanted it. I could feel it. But maybe the time wasn’t ours… still, the desire to claim him was unbearable.”

“আমি জানতাম, আমরা দুজনেই চাই। কিন্তু সময় হয়তো আমাদের জন্য নয়। তবুও ইচ্ছে হচ্ছিল সবকিছু ভেঙে তাকে শুধু নিজের করে নিতে।"

মিরার নিঃশ্বাস আটকে গেল, ঠোঁট হালকা কাঁপতে লাগল। মনে পড়ে গেল রায়ানের চোখের গভীর চাহনি, তার কাছে এগিয়ে আসার ভঙ্গি।

গাল লাল হয়ে উঠল, নিঃশ্বাস ভারী হলো। বুক ধড়ফড় করতে লাগল অকারণে।

সে ফিসফিস করে বলল—

“হায় আল্লাহ…! এসব ভাবার কি দরকার ছিল এখন…”

মিরায়া যেন নিজের লজ্জা লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। কিন্তু তার ভেতরটা গলে যাচ্ছিল সেই লাইনগুলোর সাথে নিজের ও রায়ানের কিছু সময় আগের মুহূর্তগুলো মিশিয়ে ফেলে।

মিরায়া হঠাৎ বইটা বন্ধ করে নিজের অজান্তে ফিসফিস করে উঠল,

—“আল্লাহ মাফ করো! আমি এসব কি পড়ছি … এই লোক কত পরিমাণ নির্লজ্জ! এই ধরনের ডার্ক রোমান্স বই পড়ে! ছিঃ…”

সে মাথা নাড়তে লাগল, কিন্তু গাল আর কান পর্যন্ত আগুনের মতো লাল। বুকের ভেতর এখনও কাঁপন থামছে না।

বইটা তখনো মিরায়ার হাতেই ছিল হঠাৎ ওয়াশরুমের দরজা খোলার শব্দ এলো। মিরায়া তখনো লজ্জায় আচ্ছাদিত তাই সে রায়ানের সম্মুখিন হতে চায়নি।

সে তাড়াতাড়ি বইটা আবার বুকশেলফে গুঁজে দিল, কিন্তু মনের ভেতর সেই লাইনটা যেন বাজতেই থাকল। ঠোঁটের কোণে হালকা কাঁপন আর বুকের ভেতর ধড়ফড়ানি থামছিল না।

মিরায়া রুম থেকে বের হওয়ার সেই পরিমাণ সময় না থাকায় দ্রুত কিছু একটা ভেবে ধপ করে রায়ানের খাটের নিচে ঢুকে লুকিয়ে গেল। সাবধানতার সাথে নিজের ওড়না ও গুটিয়ে নেয় নিজের সাথে। মিরায়া ভেতর থেকে মনে মনে প্রার্থনা করছিল, “শুধু এখন আমায় রায়ান ভাইয়া যেন দেখে না।”

ওয়াশ রুমের দরজা খুলে ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো রায়ান।

তার গায়ে তখন শুধু কোমর জড়ানো সাদা তোয়ালে। ভেজা শরীর থেকে এক ফোঁটা ফোঁটা পানি বুক বেয়ে নেমে আসছে। প্রশস্ত কাঁধ, শক্ত বাহু আর সিক্স-প্যাকের স্পষ্ট রেখা বুক থেকে কোমর অবধি দাগ টেনে নামছে। ভেজা চুলগুলো থেকে টুপটাপ পানি পড়ছিল কপালে, সে আরেকটা তোয়ালে দিয়ে মাথা মুছছিল ধীর ভঙ্গিতে।

রায়ানের দেহের কাঠামোতে একটা অদ্ভুত আকর্ষণ ছিল—যেন প্রতিটা মাংসপেশীর নিচে লুকিয়ে আছে শক্তি আর আত্মবিশ্বাসের ছাপ। তার চলাফেরার ভঙ্গিমা এমন, যে দেখে মনে হচ্ছিল একদিকে প্রচণ্ড পুরুষালি, অন্যদিকে নির্লিপ্ত এক সহজ স্বাভাবিকতা।

মিরায়া খাটের নিচ থেকে রুমে কি হচ্ছে বুঝতে পারছিল না তাই রায়ানের অবস্থান পর্যবেক্ষণের জন্য বিছানার নিচ থেকে হালকা উঁকি দিয়ে তাকিয়ে দেখতে চাইল।

মিরায়া ভীত ভাব নিয়ে কাঁপা কাঁপা হাতে বিছানার চাদর উঠিয়ে রায়ানের উদ্দেশ্যে তার পাশে চোখ বুলাতে থাকলে হঠাৎ তার নজর আঁটকে যায় ড্রেসিং টেবিলের সামনে রায়ানের তার নিজের ভেজা চুল তোয়ালে দিয়ে মুছতে থাকা দৃশ্যে।

মিরায়া আচমকা রায়ানকে এভাবে দেখে চোখ বড় বড় করে ফেলে। সে লজ্জায় চোখ সড়িয়ে ফেলতে চায়, কিন্তু চোখ ফেরাতেও পারলো না।

নিজের অজান্তেই সে রায়ানের পা থেকে মাথা অবদি পর্যবেক্ষণ করতে থাকলো যেন স্কেন করছে রায়ানকে।

তার বুকের ধকধক বেড়ে যাচ্ছিল। ঠোঁট শুকিয়ে এলো।

মিরায়া চোখ রায়ানের দিকে রেখেই মনে মনে- "এমন করে একটা উলঙ্গ ছেলেকে দেখছি কেন আমি?"—মনের ভেতরে ঝড় বইতে লাগলো।

আর রায়ান? সে একেবারেই স্বাভাবিক ছিল। তোয়ালে দিয়ে চুল মুছতে থাকলো আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে । তারপর হাতের আঙুল দিয়ে ভেজা চুলগুলো একপাশে সরিয়ে দিল। তার শরীরের প্রতিটা ভাঁজে জলের ফোঁটা চিকচিক করছিল, যেন সেগুলোও নিজের জায়গা ছেড়ে দিতে চাইছে না।

এ দৃশ্য দেখে মীরার বুক কেঁপে উঠলো। মনে হলো—আর একটু হলে সে হয়তো নিজেকে সামলাতে পারবে না।

রায়ানের কেমন যেন অস্বস্তি বোধ হলো হঠাৎ। সে যেন অনুভব করতে পারলো তাকে কেউ দেখছে। রায়ান নিজের মনের সন্দেহ বজায় রেখে চারপাশটা দেখলো।

রায়ানের নজর বারের সেলফ এ যেতেই সে বুঝতে পারলো এই ঘরে কেউ এসেছে- কারণ তার সব জিনিস ই জায়গায় গুছানো থাকে তবে এখন বইয়ের সেলফের একটা জায়গা একটু এলোমেলো, বুঝাই যাচ্ছে কেউ হাত দিয়েছে।

আসলে রায়ানের ওয়াশরুম থেকে বের হওয়ার কথা ভেবে মিরায়া তাড়াহুড়োতে বই সেলফে ঠিকমতো হাতের বইটা রাখতে পারেনি একটু এলোমেলো হয়েছিল।

রায়ান আরো সূত্র খুঁজতে চোখ সড়াতেই তার চোখ গেল সাইড টেবিলের উপর রাখা কফি মগের উপরে। রায়ানের তখন আর বুঝতে বাকি রইল না যে কে তার রুমে প্রবেশ করেছে।

রায়ানের মুখে আশ্চর্যতা ছিল না বরং ছিল একটা মিষ্টি হাসি।

এরপর রায়ান ব্যস্ত চোখে তার রুমে খুঁজতে লাগলো তার হৃদপাখিকে।

তখনি হঠাৎ মিরায়া বিছানার নিচে অল্প জায়গায় থাকতে না পেরে একটু নড়ে উঠলো তার কারণে তার পায়ে পড়ে থাকা নূপুর মৃদু শব্দ করে উঠতেই রায়ানের নজর গেল বিছানার দিকে।

সে বুঝতে পারলো কোনো একটা কারণে বিছানার নিচে লুকিয়েছে তার বউ কিন্তু কেন- সেটা বুঝে উঠতে পারছে না।

সে আবার বই সেলফে নজর দেয়। টুইস্টেড সিরিজের বইগুলো একটু এলোমেলো ঢাকায় সে বুঝল তার বউ ঠিক কি কারনে খাটের নিচে লুকিয়ে আছে।

রায়ানের মিরায়ার ডার্ক রোমেন্স বই দেখে লজ্জা পেয়ে লুকানোর ব্যাপারটা বেশ মজার মনে হল। সে মিরায়াকে আরো লজ্জায় ফেলার জন্য মাথায় একটা দুষ্ট বুদ্ধি আটে।

রায়ানের মুখে একটা বাঁকা হাসি ফুটে ওঠে। সে হঠাৎ বিছানার দিকে এগোতে থাকে। বিছানার কাছে আসার একপর্যায়ে সে হঠাৎ তার পরিহিত সাদা তোয়ালে টা খুলে মাটিতে ফেলে দেয়।

অন্যদিকে মিরায়া হাতের নিচের থেকে ফ্লোরে রায়ানের দেহে পরিহিত শুধু মাত্র তোয়ালেটা দেখে চোখ বড় বড় করে ফেলে। মিরায়া মনে মনে চিন্তা করতে লাগলো- "রায়ান কি এই মুহূর্তে কিছুই পড়ে নেই?" মিরায়া নিজের মনে রায়ানকে সম্পূর্ণ বস্ত্রহীন কল্পনা করার মুহূর্তের মধ্যে নিজে দুই হাত দিয়ে নিজের মুখ ঢেকে নেয় লজ্জা।

কয়েক মিনিট এভাবে পার হওয়ার পর, ঘরের মধ্যে কারো কোনরকম উপস্থিতি বুঝতে না পেরে মিরায়া ভাবে রায়ান হয়তো এখন আর ঘরে নেই বাহিরে চলে গেছে।

এরপর মিরায়া ভয়ে ভয়ে বিছানার নিচ থেকে তার মাথা অল্প একটু বের করে ঘরে চারপাশের পরিবেশ বোঝার জন্য। অন্যদিকে রায়ান ও তার দুষ্টু বুদ্ধি খাটিয়ে বিছানার উপরে উঠে বিছানার নিচে মিরায়ার দিকে মুখ করে থাকে।

মিরায়া বিছানা নিচে থেকে মাথা বের করতেই তার সামনে ভেসে ওঠে রায়ানের কুটিল হাসতে থাকা মুখ। মিরায়াকে এমন ভাবে দেখে রায়ান মুখ ভরে হেসে বলে ওঠে-

"টুকি...! মাই হার্ট-বার্ড।"

________

সোরায়ার ঘর তখন একেবারে শান্ত। জানলার পর্দা আধখোলা, ভেতরে হালকা বাতাস ঢুকছে, আর পড়ার টেবিলের ওপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বইগুলো তার অস্থির মনের সাক্ষী দিচ্ছে। সে অনেক চেষ্টা করছিল পড়ার দিকে মন বসাতে, কিন্তু শব্দের লাইনগুলো চোখের সামনে এলেও মাথায় যাচ্ছিল না। বাইরে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো, রাস্তায় প্রথম বারের মতো একজন অচেনা ছেলেকে ভালো লাগা—সব মিলিয়ে তার মাথার ভেতর যেন ছোটখাটো ঝড় বইছিল।

ঠিক সেই মুহূর্তে দরজার কপাটে হালকা ঠেলা দেওয়ার মতো শব্দ হলো। সোরায়া ভ্রু কুঁচকালো, তারপর ঘাড় ঘুরিয়েই দেখলো— ছোট্ট জুলিয়েট একা একাই তার রুমে ঢুকে পড়েছে। তার নরম লোমশ পা দুটো মেঝেতে হালকা শব্দ তুলছিল, লেজটা ধীরে ধীরে দুলছিল। চোখ দুটো চঞ্চল এদিক ওদিক ঘুরছে যেন কাউকে খুঁজে বেড়াচ্ছিল অনেকক্ষণ ধরে।

সোরায়ার মুখে সঙ্গে সঙ্গেই একটা উজ্জ্বল হাসি ফুটে উঠলো। সে টেবিল থেকে চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়ালো আর তাড়াতাড়ি জুলিয়েটের দিকে এগিয়ে গিয়ে কোলের ভেতরে তুলে নিলো।

—“আরে আমার ছোট্ট রাজকুমারী! কে এল রে?”—সোরায়া মিষ্টি গলায় বলে উঠলো।

জুলিয়েট হালকা মিঁউ করে সাড়া দিলো, তার নরম থাবা দিয়ে সোরায়ার গলা স্পর্শ করলো।

সোরায়া আবার হেসে বললো,

—“আহা! আমার সোনার পাখি… আমার ছোট্ট ডল। হঠাৎ আমাকে দেখতে এলি যে? মাকে খুঁজে পাচ্ছিস না বুঝি?”

সে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো জুলিয়েটের মোলায়েম লোমে। আঙুল বুলাতে বুলাতে বারবার আলতো করে ডাকছিল—

—“শোন জুলু, … জানিস তুই কত আদরের?”

জুলিয়েট যেন সত্যিই তার কথাগুলো বুঝছিল। একবার গলা ফেলে সোরায়ার কোলের ভেতর গুটিসুটি মেরে বসল, তারপর চোখ আধবোজা করে শান্তভাবে গরগর শব্দ করলো।

সোরায়ার বুক ভরে গেল এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে। মাহিরের কথা ভেবে তার যে অস্থিরতা হচ্ছিল, মুহূর্তের জন্য যেন সব উধাও হয়ে গেল। জুলিয়েটকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বললো,

—“তুই না এলে আমি কেমন একা একা চিন্তাতে মরে যেতাম… এই মুহূর্তে আমি আমার মনের অবস্থা কাউকে বলতে পারছি না অথচ এখন আমাকে সঙ্গ দিতে তুই এলি… জানিস, তুই একেবারে আমার হার্ট হিলার।”

সে মজা করে জুলিয়েটের লেজ টেনে আবার আলতো করে ছেড়ে দিলো।

—“বল তো, কিরে ছোট্ট জাদুকরী, তুই কি সত্যি আমায় শান্ত করতে এসেছিস? নাকি মাকে খুঁজে না পেয়ে ভাবছিস, খালার কাছে গেলেই ভালোবাসা পাবি এই ভাবে, হুঁ?”

জুলিয়েট মাথা ঘষে দিলো সোরায়ার গালে, আর সে হাসতে হাসতে চোখ বন্ধ করে ফেললো—মনে হলো এই নরম উপস্থিতিটুকুই এখন তার কাছে সবচেয়ে বড় স্বস্তি।

জুলিয়েট তখন সোরায়ার কোলের ভেতর শান্তভাবে বসেছিল। চোখ আধবোজা, গরগর শব্দ করছে, যেন পুরো পৃথিবীর প্রশান্তি এখন তারই কোলের ভেতরে লুকিয়ে আছে। সোরায়াও একরকম ভুলে গিয়েছিল চারপাশ—মনে হচ্ছিল, শুধু সে আর তার ছোট্ট জুলিয়েট।

কিন্তু হঠাৎ করেই, যেন ভিতরে কোথাও মিরায়ার অভাব টের পেয়ে গেল ছোট্ট প্রাণীটা। এক মুহূর্তে ঝটকা দিয়ে সোরায়ার কোলে থেকে লাফ দিলো।

—“আরে জুলু, কোথায় যাচ্ছিস!”—সোরায়া অবাক হয়ে ডাক দিলো।

জুলিয়েট লেজ উঁচু করে, কান খাড়া করে, তাড়াহুড়োয় ছুটতে শুরু করলো দরজার দিকে। তার ছোট্ট পায়ের শব্দ টাপটাপটাপ করে করিডোরে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল।

সোরায়া তাড়াহুড়ো করে উঠে দাঁড়ালো।

—“আরে দাঁড়া! কোথায় যাচ্ছিস?”

সে বুঝতে পারলো না হঠাৎ কেন এমন করলো জুলিয়েট, কিন্তু তার চোখে মনে হচ্ছিল—ছোট্টটা যেন মিরায়ার গন্ধ পেয়েছে কোথাও, সেই টানেই ছুটছে।

জুলিয়েট সোজা দৌড়ে গেল লম্বা করিডোর পেরিয়ে, আর তার পেছনে দৌড়তে লাগলো সোরায়া। চুল খুলে গিয়েছিল, পায়ে স্যান্ডেলও ঠিক ছিল না, তবু থামলো না সে।

করিডোরের বাতাসে গলার আওয়াজ কেঁপে উঠলো—

—“জুলিয়েট! থাম না! কোথায় যাচ্ছিস?”

কিন্তু জুলিয়েট থামলো না। সে যেন নিশ্চিত কোথায় যেতে হবে। করিডোর পেরিয়ে একেবারে সোজা রায়ানের রুমের দিকে এগোলো।

সোরায়া দম নিতে নিতে প্রায় তার পেছনে পৌঁছে গেল, আর অবাক চোখে দেখলো—ছোট্টটা সত্যিই রায়ানের রুমের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে পড়েছে। দরজাটা আধখোলা, ভেতর থেকে হালকা আলো বেরোচ্ছে, আর ভেতরের অদ্ভুত উত্তেজনাপূর্ণ নীরবতা যেন বাইরের বাতাসকেও ছুঁয়েছে।

_______

মিরায়া ওমন অবস্থায় হঠাৎ রায়ানের মুখ নিজের চোখের সামনে দেখতে পেয়ে জোরে চিৎকার করে ওঠে।

"আআআআ..."

রায়ানও মিরায়ার চিৎকারে হক চাকিয়ে উঠে বলল-

"ওই ছেমরি চিৎকার করিস কেন? চুপ কর মানসম্মান আমার সব খেয়ে ফেলবি নাকি!"

রায়ান নিজে তাড়াহুড়ো করে বিছানা থেকে নেমে মিরায়াকে

বিছানার নিচে থেকে বের হতে সাহায্য করে। আর বের করার সাথে সাথেই নিজের সামনে সোজা করে দাঁড়া করিয়ে বলল-

"ওই! আমি কি তোকে কিছু করেছি চিৎকার করার মতো? কেউ শুনতে পেলে আমাকে চরিত্রহীন মনে করবে। আমার কেরেক্টারে দাগ লাগানোর ধান্দা থাকলে এখনি বল। তোকে নিয়ে কট খেয়ে বিয়ে করে নেই।"

মিরায়া এমনিতেই ভয় পেয়েছিল তার জন্য তার শ্বাস প্রশ্বাস বেরে গিয়েছিল । সে রায়ানের এমন সোজা ভাবে এত বড়ো কথা ফেলার পর কেমন উত্তর দিবে তা ভেবে না পেয়ে শুধু বলল-

"সরি ভাইয়া, আসলে আমি...!"

মিরায়ার কথা শেষ করতে পারলো না তার আগেই রায়ান রেগে মিরায়াকে টেনে দেয়ালের সাথে ঠেকিয়ে বলল-

"বালের এই ভাইয়া ডাকা কি করলে বন্ধ হবে তোর হে?

এখন কি সেসব কাজ গুলো তোর সাথে করবো যা একজন ভাই তার বোনের সাথে দুঃস্বপ্নেও করে না? তাহলে ভাইয়া ডাকা বন্ধ করবি?"

মিরায়ার চোখে একগুচ্ছ জল বাসা বাঁধে রায়ানের এমন কথায় কিন্তু সে কথার সূত্র, বা অর্থ কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না। রায়ানের তার প্রতি এমন অধিকার বোধ তার বোধগম্যের বাইরে।

রায়ান মিরায়ার চোখে পানির আভাস দেখে তাকে ছেড়ে দিয়ে। তার নিজেকে অপরাধী মনে হয় কারণ সে চায়নি কখোনো তার জন্য তার হৃদপাখি একটুও কষ্ট পাক। রায়ান মনে মনে চিন্তা করতে লাগল- "আমি কি বেশি বেশি করছি ওর সাথে প্রথম দিনেই?"

রায়ান নিজেকে সামলে মিরায়ার মুখ সামান্য তার দিকে তুলে কিছু বলতে চাইল-

"মিরা আমি ...!"

তবে বলে শেষ করে উঠতে পারলো না।

জুলিয়েটের ছোট্ট শরীরটা এক মুহূর্তে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে গেল। টাপটাপ শব্দে ছুটে গিয়ে একেবারে রায়ান আর মিরায়ার মাঝখানে থেমে দাঁড়াল যেন সে মিরায়াকে রক্ষা করতে চাইছে।

মিরায়া তখনো রায়ানের সামনে দাঁড়িয়ে, ঠোঁট কামড়ে নিচ্ছে, আর রায়ানের চোখ তার দিকে একদম গভীরভাবে আটকে ছিল। মুহূর্তটার চারপাশে নীরবতা এত ঘন হয়ে ছিল যে দুজনের নিঃশ্বাসও যেন শোনা যাচ্ছিল।

হঠাৎ করেই সেই নীরবতা ভাঙলো—

—“জুলিয়েট!”

সোরায়া দম নিতে নিতে রুমে ঢুকলো। ঢুকেই তার চোখ আটকে গেল সামনে দাঁড়ানো দুটো চেহারায়। রায়ান আর মিরায়া দুজনেই একসাথে চমকে উঠলো, যেন ধরা পড়ে গেছে কোনো গোপন মুহূর্তে।

রায়ান প্রথমেই জুলিয়েটকে দেখলো, তারপর ধীরে ধীরে তার দৃষ্টি গেল সোরায়ার দিকে। একেবারে মাথা থেকে পা পর্যন্ত অচেনা একটা মেয়েকে দেখে তার চোখ প্রশ্নে ভরে গেল। ভ্রু কুঁচকে, ঠোঁট সামান্য ফাঁক করে সে তাকিয়ে রইলো—

“ওটা আর এটা… কে?”

তার দৃষ্টির ভেতরে একটা বিভ্রান্তি, আবার সামান্য সতর্কতাও ছিল।

মিরায়া হঠাৎ করে অপ্রস্তুত হয়ে পড়লো। ঠোঁট শুকিয়ে গেল, চোখ নামিয়ে নিল, কিন্তু সেই মুহূর্তের টানটাও যেন সরে গেল না পুরোপুরি।

সোরায়া এক মুহূর্ত রায়ানের দিকে তাকিয়ে থাকলো, তারপর গিয়ে জুলিয়েটকে তুলে নিলো। বুকের কাছে জড়িয়ে ধরে বললো—

—“তুই আবার এমন করে পালিয়ে এলি কেন রে!”

কিন্তু ভেতরে ভেতরে সেও বুঝতে পারছিল—এখানে এমন কিছু চলছে, যা সে আগে কখনো কল্পনাও করেনি।

হঠাৎ জুলিয়েট সোরায়ার কল থেকে নেমে মিরায়ার পায়ের কাছে গিয়ে নিজের শরীর ঘষতে লাগলো যেন মিরায়াকে বলতে চাইছে- "আমাকে একটু কলে নিয়ে আদর দেও।"

জুলিয়েটকে দেখার পর মিরায়ার মুখেও মৃদু হাসি ফুটে উঠলো চোখের পানি উধাও হয়ে গেল। মিরায়া নিচু হয়ে জুলিয়েটকে কোলে নিয়ে তার উদ্দেশ্যে বলতে লাগলো-

"ওরে আমার সোনা বাচ্চা, আমার ময়না পাখি, তোমার কথা তো আমার মাথা থেকে বের ই হয়ে গেছিল, সরি সোনা। আর হবে না মাম্মা তোমার সাথেই থাকবো এখন থেকে।"

রায়ান অবাক হয়ে মিরায়ার জুলিয়েটকে নিঃস্বার্থ আদর করা দেখছিল। তবে মিরায়ার কথা কানে যেতে সে ভ্রু কুঁচকে বলল-

" ময়না পাখি? এইটা তো বিড়াল ছানা। চোখ কই তোমার ? আর মাম্মা মানে? এই বিড়ালের মা কেন হতে যাবে তুমি, আমাকে কি বিড়াল নাকি যে বাচ্চা বিড়াল হবে? মানলাম আস্তে একটু দেরি হয়েছে আমার তাই বলে বিড়ালের সাথে পরকীয়া মানা যায়?"

মিরায়া রায়ানের কথায় অনেক বিরক্ত হলো সে রেগে কিছু বলবে থির আগে সোরায়া তাদের মাঝে এসে মিরায়ার হয়ে উত্তর দিলো উৎসাহ নিয়ে -

"আরে না , সোনা পাখি তো আদুরে ডাক। ওর নাম জুলিয়েট। ওর কেউ ছিল না তাই এখন আমরাই ওর সব ও আমাদের বাচ্চার মতো। মিরা আপু ওকে রাস্তায় পেয়ে বাড়িতে এনেছে তাই ও আপুর বেবি।"

রায়ান সোরায়ার কথা চুপচাপ শুননে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো। সে ও জুলিয়েট এর দিকে আদুরে চোখে তাকাল। জুলিয়েট যেন রায়ানের তাকানোরই অপেক্ষায় ছিল । সে রায়ানের দিকেই চাতোক পাখির ন্যায় তাকিয়ে ছিল যেন চাইছিল রায়ান তার দিকে তাকাক।

রায়ান জুলিয়েট এর দিকে থেকে নজর সড়িয়ে এবার সোরায়ার দিকে তাকিয়ে বলল-

"ওর পরিচয় তো দিলে। তবে তোমার পরিচয়টা কে বলবে চড়ুই পাখি?"

সোরায়া রায়ানকে ভেঙেয়ে উত্তর করল-

" আমি মিরায়ার লিটল ভার্শন-আমার নাম সোরায়া, ইন সোরট সোরা। কোনো চড়ুই পাখি টাখি না আমি , হুঁ। "

রায়ান সোরায়ার উত্তরে ঠোঁট কামড়ে হেঁসে উঠল। সে মনে মনে ভাবল-

"তাহলে এই হলো আমার দশটা না পাঁচটা না একটা মাত্র শালি। আহা! কি জীবন আমার বউ নিজে এত সুন্দর তার উপর একটা ছোট চড়ুই পাখির মতো শালিও আছে দেখি। শুনেলে যে কেউ বলবে 'মামা জিতছেন!'।

রায়ান সোরায়া কে নিজের পরিচয় দিতে বলল-

" হাই মাই মিসেসেস লিটল ভার্শন আই এম রায়ান চৌধুরী তোমার বিগ ভার্সন..(এতটুকু বলে মিরায়ার দিকে তাকিয়ে মিরায়ান রাগি চোখ দেখে রায়ান কথা ঘুরিয়ে কথা শেষ করল).. তোমার বিগ ভার্সন এর মামণির বড় ছেলে।

সোরায়া উৎসাহ নিয়ে বলল- "ওহ্! আপনিই তাহলে আমেরিকা ফেরত রায়ান ভাইয়া? ওয়াও দেখা তাহলে হয়েই গেল।"

সোরায়া নিজের থেকে উৎসাহ নিয়ে আরো কিছু বলতে যাবে এমন সময় সোরায়াকে থামিয়ে দিয়ে মিরায়া সোরায়ার হাত ধরে জুলিয়েট কে করে নিয়ে রায়ানের রুম থেকে বের হয়ে আসতে চায়।

সোরায়া- "আহ্ আপু কি কর লাগে তো। কোথায় নিয়ে যাচ্ছো? আমার কথা শেষ হয়নি তো।"

রায়ান উৎসুক হয়ে সোরায়া কে বলে-

"কি বলবে বল না চড়ুই পাখি আমি শুনছি তো।"

মিরায়া রেগে সোরায়ার উদ্দেশ্যে বলে-

"আর কিছু বলতে হবে না তোকে। তোর না কোন অংকতে সমস্যা ছিল অর্থনীতির । চল আমি বুঝিয়ে দিবো।"

রায়ানের দিকে আর না তাকায়ে মিরায়া সোরায়ার হাত ধরে রায়ানের রুমটা ত্যাগ করে। আর সোরায়ার রুমে চলে যায়।

আর রায়ান নিজের বিছানায় বসে হাসতে থাকে একটু আগে হওয়া ঘটনা চিন্তা করে।

______

সোরায়ার ঘরে যাওয়ার পর মিরায়া তাকে অংক বুঝাতে বসবে এমন সময় তার মাথায় আসে বিকালেই রুদ্র তাকে তার রুমে দেখা করতে বলে ছিল রিমির ব্যাপারে কিছু বলবে বলে।

মিরায়া কপালে হাত দিয়ে-

"যা চলে! আমিতো ভুলেই গেছি রুদ্র ভাইয়া আমাকে ডেকে ছিল।"

সোরায়া ছলছল চোখে-

"আর আমার না বোঝা অংক?"

মিরায়া সোরায়াকে একটু মৃদু হাসি দিয়ে বলল -

"রুদ্র ভাইয়ার কথাটা শুনেই এসে তোকে সব পানির মতো সহজ করে বুঝিয়ে দিবো। ঠিক আছে বনু? তুই বাকি অন্য পড়া শেষ কর। আমি যাই ।

এই বলে মিরায়া সোরায়ার ঘর ত্যাগ করে রুদ্রর ঘরের দিকে গেল।

চলবে..

দেরি হয়ে গেল পাখিরা সরি। লিখা শেষ হয়নি তাই দিতে পারি নি এখন লিখে দিলাম তাই। কোন দৃশ্য টা বেশি ভালো লেগেছে জানিও কেমন।। love you pakhis

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৩তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন