#আত্মার_অঙ্গীকারে_অভিমোহ #Soul_bound_obsession
#Oratrika_Rahman_অরাত্রিকা_রহমান
#Part_51
(কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ)
(প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য উন্মুক্ত)
মিরায়া-"আ..আমার অসহ্য লাগছে। নড়ছেন কেন? থামুন।"
রায়ানের ঘুমের ঘোর এখনো কাটেনি, মিরায়ার গলার আওয়াজে বিরক্ত হচ্ছে কিন্তু অস্বাভাবিক লাগছে না তার- হয়তো খেয়ালই নেই যে মিরায়া অজ্ঞান ছিলো। রায়ান আরো গভীর ভাবে নিজের মুখ মিরায়ার পেটে ডুবিয়ে দিয়ে ঘুম আড়ষ্ট স্বরে বলল-
"আর.. একটু ঘুমাবো। ডেকো না পাখি, প্লিজ।"
রায়ানের অঙ্গসঞ্চালনের দরুন মিরায়ার শরীর এমনিতেই কাঁপছে শিহরণে তার উপর শখের পুরুষের এমন অদ্ভুত নেশা ত্বক ঘুম আড়ষ্ট গলার স্বরে করা আবদার মেয়েটাকে আরো দূর্বল করে দিচ্ছে। মিরায়া যখন বুঝলো রায়ানকে এভাবে তুলা সম্ভব নয় তার পক্ষে - না পাড়তে রায়ানের চুল মুঠো পাকিয়ে খামচে ধরে চেচালো-
"আর একটুও না। এখনি উঠবেন আপনি। উঠুন বলছি।"
রায়ানের চুলে টান পড়তেই ছোট্ট আর্তনাদ করলো সে-
"আআউউ..who the fu** are you?"
রায়ানের চোখ এখনো বন্ধ। তবে মিরায়া বেশ রেগে গিয়ে উত্তর দিলো-
"It's me, Miraya Rahman.. নিজের চোখ খুলুন, অশ্লীল লোক কোথাকার।"
মিরায়ার নাম টা কানে জেতেই রায়ান চট করে নিজের চোখ খুলে মিরায়ার দিকে তাকালো, মিরায়া ও প্রশ্ন সূচক দৃষ্টিতে রায়ানের দিকে তাকালো রাগি ভাব নিয়ে। রায়ান অবিশ্বাস্যে কয়েকবার পলক ফেলে হকচকিয়ে উঠে বসে আরো একবার মিরায়াকে পরোখ করে দেখে- হাত বাড়িয়ে মিরায়াকে ছুঁয়ে দেখতে চাইলে মিরায়া মুখ ফিরিয়ে নিল।
-"কি করছেন আপনি এটা? এটা কোথায়? আমি এখানে কেন? আপনি কোথা থেকে এলেন? কেন এলেন?"
মিরায়া একটানা এতো গুলো প্রশ্ন রায়ানের দিকে ছুঁড়ে দিলো তবে রায়ানের যেন কিছুই যায় আসলো না। রায়ান একগাল হেসে হঠাৎ মিরায়াকে নিজের বুকে টেনে নিয়ে জড়িয়ে ধরে মিরায়ার গলার ভাঁজে মুখ ডুবিয়ে বলতে লাগলো-
"পাখি তোমার জ্ঞান ফিরেছে? সত্যি তোমার জ্ঞান ফিরেছে? তুমি আমার সাথে কথা বলছো?"
রায়ানের এমন আচমকা আলিঙ্গনে মিরায়া হতভম্ব। রায়ানের প্রতিটা নিঃশ্বাস মিরায়ার ঘাড়ে পড়ছে আর মেয়েটা কেঁপে উঠছে। নিজের প্রশ্নের উত্তরের বদলে এমন পাল্টা প্রশ্নের ঝড় দেখে সে অবাক। হঠাৎ রায়ান মিরায়াকে বাঁধন মুক্ত করে তার দুই হাতের মাঝে মিরায়ার ছোট্ট মুখটা নিয়ে এলোপাথাড়ি চুমু খেতে থাকলো। এতে মিরায়া আশ্চর্যের চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে গেলো। সব এতো তাড়াতাড়ি হচ্ছে তার সাথে যে ঠিক ভাবে বুঝতেই পারছে না কি হচ্ছে তার সাথে। রায়ান নিজের মন মতো আদর করে মিরায়ার কপালে কপাল ঠেকিয়ে নিঃশ্বাস ফেলতে থাকলো আর ঘোর লাগা কন্ঠে বলল-
"জানো সারাটা রাত নিজের ধৈর্যের সীমা দেখে অবাক হয়ে গেছি। মনে হচ্ছে মাত্র অক্সিজেন পেলাম।"
রায়ান আবার মিরায়ার কপালে একটা চুমু এঁকে দিলো। আর নিজের মতো করে উল্টো প্রশ্ন করলো-
"এক চুমুতে অজ্ঞান হয়ে যেতে হয় নাকি? আমি কি অন্য কিছু করেছিলাম?"
সম্পূর্ণ টা সময় মিরায়া বিছানার চাদর খামচে ধরে ছিলো যেন তার সাথে যা কিছু হচ্ছে তা কোনো মতো মেনে নিয়ে আপাতত সহ্য করছে। মুখে একটা শব্দ নেই। মনে মনে পরিস্থিতি প্রেক্ষাপট ভাবতে ভাবতে মাথা গুলিয়ে যাচ্ছে তার। এদিকে রায়ানের মুখে খুশি স্পষ্ট। রায়ান মিরায়ার আবারো শক্ত করে জড়িয়ে ধরলে মিরায়া ছোট্ট আর্তনাদ করে বলল-
"উউউহহহ..লাগছে আমার।"
রায়ান মিরায়া ব্যাথা লাগার কথা শুনে সাথে সাথে মিরায়াকে ছেঁড়ে ও দিলো, হয়তো চাইছিল না এখন মিরায়ার কোনো কষ্ট হক। মিরায়া হঠাৎ খেয়াল করলো তার বুকের কাছে ওড়না নেই। একটু ইতস্তত হয়ে দুই হাত আড়াআড়ি করে বুকে রেখে রায়ান কে বলল-
"আমার ওড়না কোথায়? দিন আমাকে।"
রায়ান মিরায়ার কথা শুনে কিছু না ভেবেই বলল-
"কিন্তু পাখি তুমি সারা রাত এভাবেই ছিলে। আমি তো...!"
-"আমি বলেছি আমার ওড়না দিতে। সারা রাত কিভাবে গেছে তা জানতে চাই নি।"
মিরায়া রায়ানের কথা শেষ করার আগে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে চেঁচিয়ে উঠলো। রায়ানের কাছে ওড়নার বিষয় টা বড় কিছু ছিল না, তার অনুযায়ী- "তার বউ তার সামনে খালি গায়ে থাকলেই সমস্যা কোথায়।"
যদিও রায়ান রাতে মিরায়ার অসুবিধা হতে পারে এই ভেবেই গা থেকে ওড়না সরিয়েছে। এখন মিরায়া কথা মতো আবার বিছানার অন্য পাশ থেকে ওড়না টা এগিয়ে দিলো। মিরায়া ছিনিয়ে নেওয়ার মতো জোরে তার হাত থেকে ওড়না টা গায়ে জড়িয়ে নিলো। রায়ান মিরায়ার দিকে তাকিয়ে আবারো কাছে বসে মিরায়ার মাথায় হাত রাখতে চাইলে মিরায়া মাথা কাত করে সরিয়ে নেয়, মুখে কোনো কথা নেই তার। রায়ান নিজের হাত নামিয়ে না নিয়ে উল্টো জোরপূর্বক মিরায়ার মাথায় হাত রেখে বলল-
"তোমার শরীর অনেক দূর্বল হৃদপাখি। একটু বসো চুপচাপ, আমি খাবার আনছি তোমার জন্য। কিছু মেডিসিন আছে, খাবার খেয়ে তার পর খেতে হবে।"
রায়ান কথাগুলো বলে উঠে ঘর থেকে বাইরে চলে গেলো। মিরায়া অবাক চোখে দরজার দিকে তাকিয়ে আছে। হঠাৎ করেই সব ঠিক ঠাকই হয়ে যাওয়া মিরায়ার খুব গায়ে লাগছে-
"এতো স্বাভাবিক?... এতো তাড়াতাড়ি সব ঠিক হবে ভাবলো কিভাবে? ভালোবাসি তাই? হাহ্! ভালোবাসি বলে এতো তাড়াতাড়ি সব মিটে যাবে আশা করলো কিভাবে?"
মিরায়া রায়ানের দিকে থেকে এমন শান্ত স্বাভাবিক আচরণ নিতে পারছিল না। তার গত এক মাসের হিসেব চাই যেটা নিয়ে রায়ানের কোনো হেল দোল মিরায়া দেখতেই পারছে না।
___________
সোরায়ার রুম~
সোরায়া রাতে বড্ড ক্লান্ত মুখে বেঘোর ঘুমের দেশে চলে গেছে। একটা মাস তারও ঠিক মতো ঘুম হয়নি। আজ হয়তো মিরায়ার পাশে থাকার জন্য রায়ান আছে বলে একটু নিশ্চিন্ত হয়ে ঘুমাচ্ছে। সূর্যের কিরণের দ্বারাও সেই ঘুম নষ্ট করার কোনো জো নেই। তবে দৃশ্য পরিবর্তন হয়েছে একদিকে,
দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে একনাগাড়ে এই ঘুমন্ত পরীটাকে দেখে যাচ্ছে মাহির।
ঘুম ভাঙার পর নিজের ঘরে মন টিকছিলো না বলে দেখতে এসেছিলো বাকিরা কেউ উঠেছে কিনা। রুদ্রর ঘরে রুদ্র কে ঘুমাতে দেখে সোজা সোরায়ার ঘরেই এসেছে। যদিও প্রথমে মন মানে নি তবে পছন্দের মানুষের ক্ষেত্রে সবাই রীতিনীতি ভুলে যায় হয় তো। মাহিরের ইচ্ছে ছিল ঘুম থেকে ডেকে তোলার তবে তার চোখের সামনের পরিবেশ তা করার উপায় রাখে নি।
-"ঘুমের মাঝেও এতো সুন্দর দেখায় নাকি মানুষ কে। ও কি আদতেও মানুষ না কোনো জীন পরী?!"
মাহিরের মনের ভাব অস্পষ্ট ভাবে মুখের বুলি হয়ে বেড়িয়ে এলো। তবে তার ভ্রু কুঁচকে এলো সোরায়ার জড়িয়ে রাখা বালিশটা দেখে। সোরায়ার অভ্যাস এটা- কিছু জড়িয়ে না ধরে ঘুমাতে পারে না, তার ভয় করে। কিন্তু তার এই অভ্যাস মাহিরের মনে অজানা আগুন জ্বালাচ্ছে। এইদিকে মাহির প্রথমবার একটা বালিশের জন্য তার মধ্যে হিংসে অনুভব করে নিজেই নিজের মজা উড়িয়ে বলল-
"Literally, জীবনে প্রথমবার কোনো non-living বস্তুর জন্য জেলাসি হচ্ছে। আর কি কি দেখা বাকি আছে আমার নিজের মধ্যে।"
না পারতে আর দাঁড়িয়ে না থেকে ঘরে থেকে বের হয়ে গেলো মাহির। সোরায়ার চিন্তা গুলো দিন দিন নিজেদের রাজত্ব করে নিচ্ছে তার মাথায়, যদিও এতে তার কোনো অভিযোগ নেই তবে নিজেকে সামলাতে কষ্ট হচ্ছে ষোলোআনা।
_________
খাবার ঘর~
মাহির পানি খেতে খাবার ঘরের সামনে আসতেই রায়ান কে দেখতে পেলো। খেয়াল করে দেখলো রায়ান খুব মনোযোগ সহকারে একটা প্লেটে খাবার তুলে নিচ্ছে। সব খাবার একটু একটু করে সাজিয়ে তুলছে। একটু অবাক হয়ে রায়ানের কাছে এগিয়ে গিয়ে বলল-
"কিরে? কখন বাইরে এলি? রাতে তো আর তোর দর্শন হলো না। সকাল সকাল খিদে পেজে বুঝি?"
রায়ান মাহিরের দিকে তাকালো ও না উত্তর ও করলো না। কিন্তু মাহির কথা বলার চেষ্টা থামালো না-
"ওই..! কিছু বলিস না কেন? রাতে খেতে এলিনা, বেরোলি না। খিদে পেয়েছে বললেই তো কাকা খাবার ঘরে দিয়ে আসতো।"
রায়ান বিরক্ত হয়ে মাহির কে বাধ্য হয়ে উত্তর দিলো-
"খাবারের প্রয়োজন এখন পড়েছে তাই এখন নিচ্ছি। মিরার খাবার খাওয়া দরকার মেডিসিন নেওয়ার জন্য।"
মাহির মিরায়ার কথা শুনে চিন্তিত ভঙ্গিতে প্রশ্ন করলো-
"ভাবির জ্ঞান ফিরেছে?"
রায়ান হ্যাঁসূচক মাথা নাড়লো-"হুম।"
মাহির আবার প্রশ্ন করলো-"কখন জ্ঞান ফিরেছে? কিছু জানালি না কেন আমাদের? এখন কেমন আছে?"
রায়ান প্লেটে খাবার নেওয়া শেষ করে মাহির কে সোজা কথায় উত্তর দেয়-
"একটু আগেই জ্ঞান ফিরেছে। আমার বউয়ের জ্ঞান ফিরেছে এইটা কি ঢাকঢোল পিটিয়ে জানান দিতে হবে আমার?"
পিছন থেকে রুদ্র হঠাৎ বলে উঠলো-
"মিরার...(রায়ান ঘার কাত করে রুদ্র দিকে বাঁকা চোখে চাইতেই কথার স্বর পাল্টে) মিরা ভাবির জ্ঞান ফিরেছে?"
রায়ানের হয়ে মাহির বলল-"হ্যাঁ।"
রুদ্র রায়ান কে জিজ্ঞেস করলো-"কখন জ্ঞান ফিরেছে ভাইয়া?"
-"একটু আগেই ফিরেছে। আমি খাবার নিতে এসেছিলাম ডক্টরের দেওয়া মেডিসিন গুলো কাকা কে দিয়ে আনিয়ে রাখ।মিরাকে দিতে হবে।" রায়ান বলল।
রুদ্র মাথা নাড়ালো। রায়ান আর কিছু না বলে খাবার নিয়ে ঘরে চলে গেলো মিরায়ার কাছে। রুদ্র ও কেয়ারটেকার কাকার কাছে গিয়ে মেডিসিন গুলো এনে রাখতে বলতে যাবে তার আগেই ঘরের ভেতর থেকে কিছু ভাঙার বিকট আওয়াজ হলো। এমন হঠাৎ আওয়াজে মাহির রুদ্র দুইজনেই চমকে উঠলো আর এইদিকে সোরায়া আর রিমির ঘুমও আঁতকা ভেঙে গেলো। কি হলো হঠাৎ কেউ বুঝতে পারলো না। সোরায়া নিজের ঘর থেকে দৌড়ে নিচে নামলো। আর রিমিও নিজের ঘর থেকে বের হলো।
সোরায়া কাঁপা গলায়-"কি..কি হয়েছে? কিসের শব্দ ছিলো রুদ্র ভাইয়া?"
রুদ্র কিছু না জানা ভাবে মাথা নেড়ে বলল-"জানি না।"
মাহির একটু আন্দাজ করে বলল-
"ভালো রকমের একটা যুদ্ধ লাগবে এবার।"
রিমি কিছু না বুঝতে পেরে প্রশ্ন করলো-
"কি নিয়ে যুদ্ধ হবে, মাহির ভাই? আবার কি হয়েছে!"
মাহির রিমির উদ্দেশ্যে বলল-
"মিরা ভাবির জ্ঞান ফিরেছে সকালে। এতো সহজে সব ঠিক হবে না। দুইজনের মধ্যে যুদ্ধ লাগা তো আবশ্যক।"
সোরায়া চিন্তিত গলায় বলল-
"এইভাবে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকলে কিভাবে হবে। চলুন না ভেতরে। আমি আপুর সাথে কথা বলবো।"
সোরায়া রায়ান মিরায়ার ঘরের দিকে পা বাড়ালে মাহির তার হাত ধরে বাঁধা দেয়-
"সোরায়া..এই দিকে কোথায় যাচ্ছো!?"
সোরায়া অবাক হয়ে মাহিরের দিকে তাকিয়ে বলল-
"কোথায় যাচ্ছি মানে? কি প্রশ্ন এটা? আপু আর রায়ার ভাইয়ের মধ্যে ঝগড়া হয়ে যাবে। থামাতে যাচ্ছি।"
মাহির সোরায়ার হাত টেনে ধরে নিজের সামনে দাঁড়া করিয়ে বলল-
"পাগলামো করো না। ওরা স্বামী-স্ত্রী। ওদের সমস্যা ওদের ঠিক করতে দেও। তৃতীয় কেউ ওদের মধ্যে গেলে এখন পরিস্থিতি আরো খারাপ হবে।"
রুদ্র মাহির সাথে একমত হয়ে সোরায়া কে বলল-
"মাহির ভাই ঠিক বলেছে বনু.. ওদের ভুল বোঝাবুঝি ওদের ঠিক করতে দে। ওদের কথা বলা দরকার।"
সোরায়া থেমে গেল সবার কথায়। রিমি এগিয়ে গিয়ে সোরায়াকে জড়িয়ে ধরে বলল-
"চিন্তা করে কি হবে। ছেড়ে দে, যা হওয়ার ভালোই হবে। তুই চিন্তা করিস না।"
সবাই নিজেদের জায়গায় মানিয়ে নিলেও ভেতর ভেতর খুবই চিন্তিত ছিল। আর ভেতরে কি হচ্ছে তার ধারণা করার চেষ্টা চালাচ্ছে।
___________
ঘরের ভেতরে~
ফ্লোরে খাবার, প্লেটের ভেঙে যাওয়া টুকরো গুলো চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। ঘরে দুটো মানুষের উপস্থিতি যেন চোখের চাহুনিতে নিবদ্ধ।
একটু আগে রায়ান খাবার নিয়ে মিরায়ার কাছে যেতে মিরায়া রায়ানের চোখে চোখ রেখে খাবারের প্লেটটা ঠেলে ফেলে দেয়। রায়ানের মুখে কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। সে আশা করেছিল মিরায়ার দিক থেকে কোনো না কোনো রিয়েকশন ঠিক আসবে তবে সে চাইছিল মিরায়া খাবারটা অন্তত খেয়ে নিক, তার পর সব কথা বলা যাবে। রায়ান চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে মিরায়ার সামনে মিরায়া রায়ানের দিকে একবারও না তাকিয়ে ঘর থেকে বের হওয়ার জন্য দরজার দিকে পা বাড়ালে রায়ান মিরায়ার হাত আঁকড়ে ধরে প্রশ্ন করলো-
"কোথায় যাচ্ছো?"
মিরায়া পিছনে না তাকিয়ে হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে বলল-
"ছাড়ুন আমাকে। আমি বাড়ি যাবো।"
রায়ান একটানে মিরায়াকে নিজের সামনে নিয়ে এসে বলল-
"তুমি বাড়িতেই আছো। এটা আমাদের বাগান বাড়ি।"
মিরায়া হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করছে কিন্তু লাভ হচ্ছে না-
"আমি আমার নিজের বাড়ি যাবো। ছাড়ুন আমাকে।"
রায়ান মিরায়ার হাত ছাড়ানোর চেষ্টা দেখে বিরক্ত হয়ে একেবারে কাছে টেনে এনে মিরায়ার কোমর আঁকড়ে ধরে বলল-
"মিসেস রায়ান চৌধুরী, this is your house. নিজের বলতে তোমার স্বামীর ঘর ছাড়া আর কোনো ঘর নেই আপাতত। সুতরাং, তোমাকে এখানেই থাকতে হবে। কিছু দিন এখানে কাটিয়ে সোজা চৌধুরী বাড়িতে পা রাখবে তুমি। বুঝেছ?"
মিরায়ার রায়ান কথা শুনে হঠাৎ হাসতে শুরু করলো তুচ্ছার্থে-
"কিহ্? কি নামে ডাকলেন? মিসেস রায়ান চৌধুরী..!"
আবারও হাসলো এক দফা। রায়ান দাঁতে দিয়ে ঠোঁট কামড়ে কেবল দেখে যাচ্ছে।
মিরায়া হঠাৎ অনেক জোরে রায়ানকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিয়ে বলল-
"কিসের মিসেস রায়ান চৌধুরী! কে হন আপনি আমার? কোথা থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসেছেন হঠাৎ?"
রায়ান বুঝতে পারে মিরায়া বেশ উত্তেজিত হয়ে গেছে যেটা স্বাভাবিক তবে এই মুহূর্তে এমনভাবে উত্তেজিত হওয়া মিরায়ার শরীরের জন্য ঠিক নয়। রায়ান মিরায়াকে শান্ত করতে এক পা মিরায়ার দিকে এগোতে এগোতে বলল-
"হৃদপাখি, শান্ত হও। আমার কথা শোন।"
মিরায়া এক পা সাথে সাথে পিছিয়ে গিয়ে রায়ানকে সাবধান করলো-
"খবরদার আর এক পা এগোবেন না আমার দিকে। ভুলেও ছোঁয়ার চেষ্টা করবেন না আমাকে। আপনি কেউ নন আমার। You are no one to me. Do you get that. Just Fu*ck off."
রায়ান অবাক হয়ে মিরায়ার দিকে তাকিয়ে আছে। মিরায়া এভাবে কথা বলবে সে ভাবে নি যদিও এখন যথেষ্ট বিগড়ে গেছে পরিস্থিতি। রায়ান মিরায়ার দিকে আবারো এগিয়ে বুঝানোর জন্য বলল-
"মিরা, একবার আমার কথা শোন। তুমি সত্যি টা জানো আমি তোমার কে। তারপর ও সুবিধার্থে মনে করিয়ে দিচ্ছি- আমি রিভান চৌধুরী রায়ান, তোমার বর। শুধু শুধু এতো উত্তেজিত হইও না। শরীর খারাপ করবে। শান্ত হয়ে আমার কথাটা শোন।"
মিরায়ার গা জ্বলে যাচ্ছিল রায়ানের এমন কথা শুনে। সে চাইছিল রায়ান তাকে সবকিছু ওই সময়টাতেই খুলে বলুক কিন্তু রায়ান তা করছে না। মিরায়া আবারো দূরে সরে গিয়ে বলল-
"আমি কারো বউ নই। কোথায় ছিলেন এতো বছর? সব ভুলে যখন মেনে নিয়েছিলাম কোথায় ছিলেন এই এক মাস? কেন নিজের পরিচয় দেন নি যখন বলেছি আমি বিবাহিতা? কেন ঠকিয়েছেন আমাকে এতো গুলো দিন? এসবের উত্তর কোথায়?"
রায়ান নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করে বলল-
"সব কিছুর উত্তর...!"
মিরায়া রায়ানের কথা শেষ হও আর আগেই বলে বসলো-
"you know what! আমার কোনো কিছুর উত্তর চাই না আর। আমি মানি না ছেলেখেলার বিয়ে। কোনো সম্পর্ক নেই আপনার আমার। ডিভোর্স পেপার এনেছিলেন না? লিখে দিয়েছিলাম তো- সাইন না হলেও আমার হাতে কলমের একটা ফোঁটাও যেহেতু ওই কাগজে পড়েছে তার মানে সব সম্পর্ক শেষ। আপনি মুক্ত। আমার থেকে মুক্তি চেয়েছিলেন তো তাই না? দিয়ে দিলাম মুক্তি। আমি ডিভোর্স মেনে নিলাম।"
রায়ানের মাথায় রক্ত চড়ে গেলো ঠিক এই কথাটা কানে পৌঁছাতেই। রায়ান এক মুহূর্তে মিরায়ার কাছে গিয়ে মিরায়ার চোয়াল আঁকড়ে ধরে দাঁতে দাঁত চেপে জিজ্ঞেস করলো-
"কি বললি তুই? ওই কি বললি? সম্পর্ক শেষ মাই ফুট। তোর উত্তর চাই আমি উত্তর দিতে রাজি। যা ইচ্ছে বল। কিন্তু ডিভোর্সের কথা মুখে আনলি কোন সাহসে?"
মিরায়া এক নজরে রায়ানের দিকে তাকিয়ে আছে। তবে তার মনে দ্বিধার শেষ নেই- "যদি ডিভোর্সে এতো সমস্যা থেকে থাকে তাহলে কেন এলেন না আপনি আমাকে নিতে?"
মিরায়ার মনের দ্বন্দ্ব মুখে প্রকাশ পেল না। তবে চোখে পানি টলমল করছে তা বুকে ডাবিয়ে রাখতে গিয়ে। রায়ান মিরায়া চোখ দেখে তার চোয়াল ছেড়ে দিয়ে হাত ধরে টেনে ওয়াশ রুমের ভেতরে নিয়ে যায়। মিরায়া স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে রায়ানের কান্ড কিন্তু কিছুই বুঝতে পারছে না। রায়ান একটা বালতি তে পানি ভরে তা মিরায়া সামনে রেখে বলল-
"বলেছিলি না যেদিন তোর বর তোর সামনে আসবে এক বালতি পানি দিয়ে স্বাগত যানাবি! নে কর এবার।"
মিরায়া অবাক হলো তবে সেও কম যায় না। বালতি তুলে সত্যি সত্যি রায়ানের মাথায় ঢেলে দিল। রায়ান ও কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালো না। কিন্তু যখনই মিরায়া বালতি ফেলে ওয়াশ রুম থেকে বেড়িয়ে যেতে চাইলো তখনি আবার মিরায়ার হাত ধরে পিছনের দিকে বাঁকিয়ে ধরে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে বলল-
"কোথায় যাচ্ছিস? রাগ মেটেনি? আরো এক বালতি লাগবে?"
মিরায়া নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে বলল-
"আমি চলে যাবো আপনার থেকে অনেক দূরে। ছাড়ুন আমাকে। আমি চাই না আপনার সঙ্গ। আপনাকে আমি ঘেন্না করি।"
রায়ান মিরায়ার রাগের কথা খুব একটা গায়ে মাখলো না। উল্টো মিরায়ার কানের কাছে গিয়ে ফিসফিসিয়ে নয় বরং জোরে ও স্পষ্ট ভাষায় বলল-
"আমি চাই তোর সঙ্গ। রায়ান চৌধুরী তোর সঙ্গ চায় আর সেটা সারাজীবনের জন্য। ঘেন্না করে থাকবি না ভালোবেসে তাতে আমার বা* ছেঁড়া গেলো। তুই আমার ঠিক তখন থেকে যখন বুঝতিও না কারো হয়ে যাওয়া ঠিক কি। আর এখন সব বোঝার বয়সে নিজেকে সরিয়ে নিতে চাইলে তো খুব খারাপ হয়ে যাবে সোনা।"
মিরায়া পলক ফেলতেই তার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়লো। শরীর মন দুটোই দূর্বল হয়ে আছে কিন্তু নিজের জেদ থামছে না। মিরায়া রায়ানের থেকে বিরতিহীনভাবে ছাড়া পেতে চেষ্টা করতে থাকলো। কিন্তু রায়ান উল্টো মিরায়া জাপ্টে ধরে বাথ টাবে ইচ্ছে করে পড়ে গেল। হঠাৎ ঘটনায় মিরায়া ভয়ে রায়ানের শার্টটা খামচে ধরলো।
বাথটাবের পানিতে এখন দুইজনেই ভিজে গেছে। মিরায়া হকচকিয়ে চোখ খুলতেই নিজেকে রায়ানের বুকে আবিষ্কার করলো। ঠান্ডা পানিতে দুইজনের শরীর কাঁপছে। মিরায়া কাঁদো কাঁদো মুখ করে রায়ানের দিকে তাকালো। রায়ান মিরায়ার দিকে তাকাতেই হঠাৎ মিরায়ার মুখটা তার কাছে খুব মায়াবী লাগলো। পরিবেশের বদল ঘটলো। রায়ানের হাবভাব লক্ষ্য করলো মিরায়া কেমন যেন ঘোরের মধ্যে চলে যাচ্ছে এমন লাগছে। রায়ান আলতো হাতে মিরায়ার কাপতে থাকা ঠোঁটের উপর স্লাইড করে মিরায়াকে টেনে আরো কাছে এনে মিরায়ার গালে নাক ঘষতে ঘষতে জিজ্ঞেস করলো নেশালো স্বরে-
"হৃদপাখি, এখন ঠোঁট ছুঁলে কি আবার অজ্ঞান হয়ে যাবে তুমি?"
মিরায়া চোখ বন্ধ করে পরে আছে অদ্ভুত অনুভূতিতে। কিন্তু রায়ানের এই প্রশ্ন আর অন্তর আত্মা জ্বলে গেলো-
"বজ্জাত লোক..ছা..উমমমম!"
মিরায়া কথা টা বলেই রায়ানের বুকে আঘাত করলে রায়ান সাথে সাথে মিরায়ার ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে দেয়। আর নিজের অবস্থান পরিবর্তন করে মিরায়াকে নিচে এবং সে মিরায়ার উপরে চলে আসে। আকস্মিকভাবে এত কিছু হওয়ায় মিরায়া খানিকটা ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেল। তার চোখ বড় বড় হয়ে গেলো অনেক চেষ্টা করছে রায়ানের ঠোঁট থেকে নিজের ঠোঁট ছাড়ানোর কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। মিরায়া রায়ানের বুকে অনেক বার জোরে আঘাত করলো কিন্তু এতেও সেই সুঠাম দেহের কোনো নড়চড় নেই। বউয়ের ঠোঁটের দখলদারীত্ব ছাড়তে রায়ান রাজি ছিলো নি। কিন্তু মিরায়া অতিরিক্ত ছটফট করছিল বলে রায়ান ওইভাবেই শব্দ করলো-
"উউউউউমমম...!"(যেন শান্ত হতে বলছে)।
সাথে মিরায়া ও জেদ ধরল যেন। রায়ান হঠাৎ খেয়াল করলো মিরায়া শ্বাস নিচ্ছে না ইচ্ছে করে। অগত্যা রায়ানের ঠোঁট ছাড়তে হলো। তবে রেগে মিরায়ার চোয়াল চেপে ধরে গভীর নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে করতে বলল-
"ওই শ্বাস নিস না কেন? আমার সুখ সহ্য হয় না কেন তোর? আমার ২৭ বছরের জীবনে প্রথম মেয়ে তুই তাও আমার বউ। বুঝতে পারিস কি হয় আমার তোর সংস্পর্শে এলে? তার মাঝেও আমাকে থামানোর এতো পাঁয়তারা তোর? কেন? কেনন?"
মিরায়া দীর্ঘশ্বাস ছাড়ছে এতক্ষণ পর রায়ানের থেকে ছাড়া পেয়ে। কিন্তু রায়ানের কথা হজম করে নেওয়ার পাত্রী সে নয়। হঠাৎ রায়ানকে ঠেলে অবস্থান পরিবর্তন করে রায়ান কে নিচে দিয়ে ও রায়ানের উপরে উঠে বসে বলল-
"না হয়না সহ্য। কেন সুখ পাবেন আপনি? আপনি আমার ঠোঁট স্পর্শ করেন কোন অধিকারে? আমাদের মাঝে কোনো প্রকার সম্পর্ক নেই। আপনাকে আমি কবুল করেছি কখনো?"
রায়ান মিরায়ার কথার কোনো উত্তর না করে উল্টো মিরায়ার কোমর ধরে মিরায়া যেখানে বসে ছিলো তার থেকে একটু নিচে বসিয়ে বলল-
"এবার ঠিক জায়গায় বসেছ। it's a very comfortable position to have a conversation. Go ahead, baby."
মিরায়া রায়ানের ইঙ্গিত বুঝতে পেরে নিজের চোখ বন্ধ করে নিয়ে হঠাৎই উঠে দাঁড়ায়। রায়ান ও আর সময় নষ্ট না করে উঠে দাঁড়িয়ে মিরায়াকে কোলে তুলে নেয়। মিরায়া হকচকিয়ে গিয়ে পা নাড়াতে লাগলো-
"কি হচ্ছে টা কি এখন। নামান আমাকে।"
রায়ান শান্ত গলায় বলল-"চুপ..! ঠান্ডা লেগে যাবে আর ভিজলে।"
রায়ান মিরায়াকে কোলে নিয়ে ওয়াশ রুম থেকে বেরিয়ে এসে ভেজা শরীরেই সোফার উপর বসিয়ে দিয়ে একটা টাওয়াল এনে মিরায়ার মাথা মুছিয়ে দিতে গেলে মিরায়া রায়ানের হাত থেকে একটানে টাওয়াল টা নিয়ে নিজেই মাথা মুছতে লাগলো। রায়ান আর কিছু বলল না। শুধু মিরায়ার লাগেজ এগিয়ে দিয়ে বলল-
"ঠিক বলেছ, আমাদের এখনো কবুল বলা হয়নি।"
মিরায়া আড় চোখে তাকিয়ে দেখলো রায়ান কে-"মানে..?"
রায়ান ধীরে পায়ে হেঁটে এসে মিরায়ার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে মিরায়ার কানে কানে বলল-
"যেহেতু তুমি এটাই চাউ তাহলে তাই হক। Trust me, babe...I am dying to say "কবুল" for you."
মিরায়া রায়ানের দিকে তাকিয়ে জোর গলায় বলল-
"আমি আমার প্রশ্নের উত্তর এখনো পাই নি। যতক্ষণ না আমাকে আমার প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হচ্ছে আমি কিচ্ছু মানবো না। প্রয়োজনে আপনি যেভাবে পালিয়ে গেছিলেন আমিও পালিয়ে যাবো।"
রায়ান একটু বাঁকা হেঁসে বলল-
"Fine, let's see. আমি তোমার কোনো প্রশ্নের উত্তর দেব না। আমার মুড চলে গেছে। এখন যা কথা হবার সব কবুল বলার পর হবে। It's gonna be fun."
মিরায়া দাঁতে দাঁত চেপে বলল-
"আমি আপনাকে কবুল করবো?! Huh! In your dreams."
রায়ান উল্টো হেঁসে বলল-
"In my dreams, you do much more than that baby. ব্যাখা করলে লজ্জায় পাতালে চলে যেতে ইচ্ছে করবে তোমার। তাই আপাতত নিজের জামা কাপড় পড়ে নেও নাহলে আমি সেই দায়িত্ব নিতে রাজি আছি।"
মিরায়া মুখ হা হয়ে রইল। রায়ান চুপচাপ ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়ে দরজা লক করে দিলো সামনে থেকে।
_________
ড্রয়িং রুম~
রায়ান ঘরের দরজা লক করে ড্রয়িং রুমে আসতেই দেখলো সোফায় মাহির, রুদ্র, সোরায়া, রিমি চার জন একসাথে বসে আছে। মাহির আর রিমি তেমন অদ্ভুত আচরণ না করলেও রুদ্র আর সোরায়া একনাগাড়ে নিজেদের পা নাড়িয়ে হাতের নখ কেটে যাচ্ছে। রিমি সোরায়া কে সামলাতে ব্যস্ত আর মাহির রুদ্রর পাশে চুপ করে বসে আছে। রায়ান সবাইকে এমন ভাবে দেখে ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো-
"কি হচ্ছে এখানে?"
সবাই এবার একসাথে দাঁড়িয়ে গিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করলো-
"কি হলো ওখানে (ঘরের ভিতর)?"
রায়ান এক এক করে সবার দিকে দৃষ্টি পায় করলো-
"ওখানে কোন খানে?"
সবাই রায়ানের পা থেকে মাথা অব্দি চোখ বুলালো। কাক ভেজা হয়ে আছে রায়ান। পর মুহূর্তেই চারজন নিজেরা নিজেদের মধ্যে চোখাচোখি করলো। রায়ান সবটা খেয়াল করছে, যেটা তার কাছে বেজায় বিরক্তিকর ঠেকছিল-
"A bunch of fools..! এখানে কি তোদের?"
সোরায়া রিমি মাথা নিচু করে নিলো কিন্তু উত্তর করলো না। মাহিরের কোনো ফারাকই পড়ছে না যেন কিন্তু রুদ্র আমতা আমতা গলায় রায়ান কে প্রশ্ন করলো-
"ভা...ভাইয়া, মি.. মিরা ঠিক আছে তো? তুমি ভিজে আছো কেন?"
রায়ান বাঁকা চোখে রুদ্রর দিকে তাকিয়ে মনে মনে বিড়বিড় করল-"এটা কি আমার ভাই না আমার বউয়ের!"
রায়ানের মেজাজ এমনিতেই ঠিক নেই তাই রুদ্রর উপরে সেটা ঝাড়লো -
"তোর বোনকে জিজ্ঞেস কর গিয়ে আমি ভিজে কেন। আমার কপাল টাই খারাপ, সব নমুনা আল্লাহ আমার কপালে দিয়েছেন। বউয়ের কাছে বরের মূল্য নেই, ভাইয়ের কাছে ভাইয়ের থেকে ভাবি বড়, বন্ধু তো একটা আছে হাড় জ্বালানো, বাকি...(সোরায়া আর রিমি কে ইঙ্গিত করে).. ধুর।"
রায়ান কথাটা বলতেই রুদ্র মুখ নামিয়ে নিলো কিন্তু মাহির মুখ খুলে বলল-
"যা বাব্বা আমি কি করলাম এখানে!?"
রায়ান ওই স্থান ত্যাগ করেছে। সোরায়া দৌড়ে গেলো মিরায়ার রুমে, দরজা খোলার চেষ্টা করলো কিন্তু দরজা লক করা আর চাবি রায়ানের কাছে। সোরায়া দরজায় শব্দ করে মিরায়াকে ডাকলো-
"আপু...আপু...আমি সোরায়া। শুনতে পাচ্ছ? আপু?"
মিরায়া বাইরে থেকে সোরায়ার আওয়াজ শুনতে পেয়ে অবাক হয়ে দৌড়ে যায় দরজার কাছে। সে নিজে অনেকবার দরজা খোলার চেষ্টা করতে করতে আওয়াজ করলো-
"বনু...তুই..তুই এখানে আছিস..? কিভাবে..? এটা কোথায়..?"
সোরায়া মিরায়ার গলা শুনে শান্তি পেল। রিমিও অনেক দিন পর মিরায়ার গলার স্বর শুনে নিজেকে আটকে রাখতে পারল না-
"মিরা...জান তুই ঠিক আছিস?"
মিরায়া হঠাৎ রিমির গলা শুনে অবাক হলো জান বলে তাকে কেবল রিমি ই ডাকতো। প্রশ্নসূচক গলায় মিরায়া বলল-
"রিমি... বনু..! এটা কি রিমির আওয়াজ।"
-"হ্যাঁ আপু এখানে আমরা সবাই আছি। রিমি আপু, রুদ্র ভাইয়া, মাহির স্যার, সবাই।"
মিরায়া ঠিক বুঝতে পারলো না সবাই একসাথে কিভাবে হলো। কিন্তু সোরায়ার মাহিকে স্যার সম্বোধন করা তার মনে নতুন প্রশ্ন তৈরি করল-
"মাহির স্যার..? মাহির ভাই তোর স্যার?"
-"হ্যাঁ, আমার কলেজের প্রফেসর। আমার ক্লাস টিচার।"
রিমি মিরায়াকে উদ্দেশ্যে করে বলল-
"মিরা তুই ঠিক আছিস? সেটা বল আগে। রায়ান ভাই তো..!"
-"আমি উনাকে নিয়ে কথা বলতে চাই না। আমাকে বের কর এখান থেকে। আমি বাড়ি যাবো।"
সোরায়া আর রিমি পরস্পরের দিকে তাকিয়ে চোখাচোখি করলো। রায়ানের থেকে চাবি নিয়ে মিরায়াকে বাইরে আনা তাদের কর্ম নয়। এই দিকে মিরায়া আবার বলল-
"ওই লোকের ঘর আমি করবো না। বলে দে উনাকে। আমাকে বের কর এখনি।"
রিমি সোরায়া দৌড়ে পালিয়ে গেছে মিরায়ার কথা শুনেই। মিরায়া এই কথা রায়ানের কানে দেওয়া মানেই বিস্ফোরণ ঘটানো। দুইজনের কারোরই এই সাহস নেই। রুদ্র আর মাহির রায়ানের পিছন গেছে। রায়ানের ঘরে তো মিরায়া আছে তাই সোজা রুদ্রর ঘরে গিয়ে গায়ের ভেজা শার্ট টা খুলে অন্য একটা শার্ট পড়তে পড়তে বলল-
"রুদ্র, ৪ ঘন্টা সময় দিচ্ছি, পুরো বাগান বাড়ি ফুল আর আলোতে সাজা। ঠিক যেন বিয়ে বাড়ির মতো লাগে।"
রুদ্র অবাক কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো-
"বিয়ে বাড়ির মতো সাজাবো? হঠাৎ.. কেন কার বিয়ে?"
রায়ান শান্ত গলায় উত্তর দেয়-
"আমার আর তোর বোনের বিয়ে। বর আর কনের ভাই হওয়ার দায়িত্ব পালন কর এবার। বুঝেছিস?"
রুদ্র কিছু বুঝলো না, আবার কি করতে চলেছে রায়ান কে জানে। রায়ান মাহিরের উদ্দেশ্যে বলল-
"আর মাহির, তুই যাবি বিয়ের কেনাকাটা করতে। সুন্দর দেখে বিয়ের শাড়ি, লেহেঙ্গা, গাউন যা পাশ তাই নিয়ে আসবি। আর যা যা লাগে সেসব কিছু। ( নিজের কার্ড দিয়ে বলল) এটা থেকে বিল পে করে দিস।"
মাহির ও অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো-
"আমি...? আমি বিয়ের শপিং করবো? আমি কিছু জানি নাকি বিয়ে সম্পর্কে।"
রায়ান কোনো পাত্তা দিলো না। মাহির ও বুঝে গেল রায়ান যেহেতু বলেছে সেহেতু কাজ তো করতে হবে তবে তার মাথায় অন্য বুদ্ধি ঘুরছিল। তারই প্রেক্ষাপটে একটু সাহস করে বলে ফেলল-
""দোস্ত দেখ আমি ছেলে মানুষ, মেয়েদের কেমন জিনিস পছন্দ আমি জানি না। যদি আমার সাথে কোনো মেয়ে.. না মেয়ে না, যদি সোরায়া যায় তাহলে ভালো হতো।"
রুদ্র রায়ান দুইজনে একসাথে চোখ বাঁকা করে মাহিরের দিকে তাকাতেই মাহির হকচকিয়ে গিয়ে বলল-
"আরে, এইভাবে দেখার কি আছে? সোরায়া ওর আপুর পছন্দ ভালো বুঝবে তাই না! তোর বউকে যেন সুন্দর লাগে আর ভাবি যেন পছন্দ করে সব তাই তো বললাম।"
কথার মাঝে মিরায়ার পছন্দ উঠতেই রায়ান মাহিরের কথা মেনে নিলো-
"ঠিক আছে নিয়ে যা সোরা কে। সব মিরার পছন্দ অনুযায়ী কিনে আনবি।"
মাহির অস্পষ্ট হাসলো। কিন্তু এই দিকে রুদ্র ভ্রু কুঁচকে রায়ানের দিকে তাকিয়ে বলল-
"এটা কি হলো? মাহির ভাই সঙ্গি পেলে আমারও লাগবে। আমি একা এতো বড় বাড়ি সাজানোর কাজ করবো কিভাবে? আমি পারবো না।"
এবার মাহির রায়ান দুজন রুদ্রর দিকে বাঁকা চোখে তাকালো। রায়ান রুদ্র কে বিরক্তি নিয়ে প্রশ্ন করলো-
"তোর আবার কাকে লাগবে?"
রুদ্র স্বাভাবিক ভাবে কোন প্রকার দ্বিধা ছাড়া বলল-
"তোমার আপন শালি তোমার বন্ধু নিচ্ছে তাহলে দূর সম্পর্কের শালিটা নিজের ভাইকে দিতে কি সমস্যা?! আমার রিমিকে লাগবে।"
রায়ান রুদ্র আর মাহির এর দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে জিজ্ঞেস করলো -
"আমাকে দেখে কি মনে হয় তোদের? আমি কি শালি ব্যাবসা করি? হ্যাঁ? যার যাকে ইচ্ছে চাইছিস!"
মাহির কিছু বলল না সে সোরায়াকে শপিংএ নিয়ে যেতে পারার অনুমতি তে আনন্দে ভাসছে। কিন্তু রুদ্র জেদ ধরলো-
"আমি জানি না কিছু। রিমিকে বলো আমার সাথে সাথে থাকতে বেস। নাহলে আমার বোনের সাথে তোমার বিয়ে দেব না আমি।"
রায়ানের রাগে মাথা ফেটে যাচ্ছে এখন। অবশেষে মেনে নিলো সবার সব আবদার। কাউকে কিছু না বলেই নিজের একটা কাজে রায়ান বেরিয়ে গেলো, যাওয়ার আগে সোরায়া আর রিমিকে বলে গেছে মাহির আর রুদ্রর কাছে সাহায্য করতে। রিমি বান্ধবী হিসেবে খুশি মনে রাজি হয়ে গেলেও সোরায়া মাহিরের সাথে যেতে চাইছিল না। কিন্তু রায়ান বলে গেছে আর তার উপর বড় বোনের বিয়ে তাই না করার ও সুযোগ ছিলো না।
___________
বিকেল বেলা~
বেলা গড়িয়ে গেছে, বিকেল হচ্ছে। রায়ানের এখনো ফেরার নাম নেই, মাহির সোরায়া ও এখনো আসে নি। বাগান বাড়ি নতুন রুপে সেজে উঠেছে। আলো আর ফুলের গন্ধে চারপাশটা মো মো করছে। রুদ্র কেয়ারটেকার কাকার সাহায্য নিয়ে সম্পূর্ণ কাজটা করেছে, তাহলে রিমির কাজ কোথায়?!
আছে তো কাজ তার- রুদ্র কি করছে তা বসে বসে দেখা।
বাড়ির মূল দরজার উপরের লাইট গুলো রুদ্র ঠিক করছে আর রিমি ঠিক নিচে বাড়ির পিড়ার উপর বসে রুদ্র কে কাজ করতে দেখছে। এভাবে তার খুব বিরক্ত লাগছিল বলে মাথা নিচু করে বসে থাকায় রুদ্র রিমির উদ্দেশ্যে বলল-
"রিমি.. উপরে দেখুন। সব ঠিক আছে তো?"
রিমি ভোরকে উঠলো-
"কিচ্ছু ঠিক নেই। আমি পারবো না আর উপরে তাকাতে।"
রুদ্র রিমির কথায় ব্যস্ত হয়ে মৈ থেকে নেমে রিমির সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলল-
"কেন? কি হয়েছে আপনার? ক্লান্ত লাগছে? বিশ্রাম নেবেন একটু?"
রিমির মেজাজ আরো খারাপ হয়ে গেলো-
"ক্লান্তি?! ক্লান্ত হওয়ার মতো করেছি কিছু আমি? না করতে দিয়েছেন আপনি? ভাইয়া বলে গেলো আপনার কাজে সাহায্য করতে। অথচ একটা ফুল ও এদিক থেকে ওদিক নিতে দিলেন না আমাকে।"
রুদ্র অবাক হয়ে রিমিকে বলল-
"কি করেছেন মানে? অদ্ভুত তো এতো বড় বাড়ি টা সাজানো ঠিক হচ্ছে কি না সব সুন্দর দেখাচ্ছে কিনা পর্যবেক্ষণ করছেন আপনি। এটা কত বড় একটা দায়িত্ব যানেন? আর কি কাজ করতে দেব আপনাকে এতো বড় দায়িত্ব দিয়ে রেখেছি।"
রিমি হা হয়ে রুদ্রর কথা শুনছে, এমন কিছু ও হয় তার মাথায় ধরছে না। রিমি অভিমান করে মুখ ঘুরিয়ে চলে যেতে চাইলে রুদ্র রিমির হাত ধরে নিজের দিকে টেনে নিয়ে বলল-
"আপনি আমার পাশে ছিলেন সম্পূর্ণ সময়টা এটাই আপনার সাহায্য। বাকি অসুস্থ শরীরে এভাবে আপনাকে নিজের চোখের সামনে বসিয়ে রাখাটা আমার ভালো লাগছে না কিন্তু আপনাকে দেখতে ভালো লাগছে- কি করি বলুন তো?"
রুদ্রর কথায় রিমির গলা শুকিয়ে এলো। রুদ্রর কথায় অর্থ বোঝা দায় হয়ে দাঁড়াচ্ছে রিমির কাছে। রিমি অবাক হয়ে অস্পষ্ট রুদ্রর নাম নিলো-
"রুদ্র...কি..কি বলছেন?"
রুদ্র রিমির হাত আরো একটু শক্ত করে আঁকড়ে ধরে নিজের সাথে রিমিকে মিশিয়ে নিয়ে বলল-
"অদ্ভুত লাগছে আমাকে তাই না রিমি? আমারও খুব অদ্ভুত লাগে নিজেকে। আমি বুঝে পাই না আপনাকে..!"
হঠাৎ রিমি রুদ্রর ঠোঁটে হাত রেখে রুদ্র কে থামিয়ে দেয়। রিমি বুঝতে পারছিল কোনো এক নিষিদ্ধ অনুভূতি বাসা বাঁধছে রুদ্রর মনে যেটা তাকে অনেক আগেই কাবু করেছে কিন্তু সে মানতে চায় না সেই অনুভূতি আর না তার স্বীকৃতি দিতে ইচ্ছুক।
-"রুদ্র...চুপ করুন। অনেক কাজ করেছেন, একটু বিশ্রাম নিন। বাকিটা আমি করে নিচ্ছে। আমার কষ্ট হবে না।"
রুদ্র বুঝলো রিমি চাইছে না এখনি আরো কিছু হক। হয়তো সময় চাইছে, রুদ্র একটু হেঁসে রিমির হাত তার ঠোঁট থেকে সরিয়ে নিয়ে বলল-
"এখন বাকি বলতে কেবল বাসর ঘর সাজানো বাকি। এটা আপনাকে একা কিভাবে করতে দেই বলুন তো। চলুন একসাথে কাজ শেষ করি।"
রুদ্র রিমির হাত ধরে বাড়ির ভেতরে যেতে যেতে বলল-
"ভয় নেই। আপনার অস্বস্তি হয় এমন কিছুই বলবো না।"
রিমিও আর কিছু বলল না। চুপচাপ রুদ্রর সাথে গেল। রায়ানের ঘর যেহেতু বন্ধ তাই উপরের ছাদ ঘরে সুন্দর করে বাসর সাজানোর কাজ শুরু করলো দুইজন।
___________
শপিং মল~
মাহির সোরায়া শহরের দিকে এসেছিল বিয়ের কেনাকাটা করতে। সোরায়া মিরায়ার জন্য পছন্দ করে একটা লাল লেহেঙ্গা কিনেছে, কারণ মিরায়া শাড়ি পড়তে পারে না। সাথে ম্যাচিং জুতা। রায়ান বলে দিয়েছিল তার বউয়ের গায়ে যেন সব সোনার গহনা থাকে তাই মাহির সোরায়ার পছন্দ মতো কিছু ডিজাইনার সোনার গহনা কিনেছিল। আরো টুকটাক জিনিস পত্র যা মেয়েদের জন্য জরুরি সবই কেনা শেষ হয়েছে। এবার শুধু একটু ঘুরে দেখছিল দুইজন আরো কি ভালো লাগে কিনা।
মলে ঘুরতে ঘুরতে সোরায়ার নজর আঁটকে যায় একটা হালকা গোলাপি রঙের গাউনে। কিন্তু তার কিনার ইচ্ছে ছিল না তাই পাত্তা দেয় নি। কিন্তু সোরায়াকে একবার ওই গাউনে হাত দিতে দেখায় মাহির ওই গাউনের সামনে দাঁড়িয়ে বলল-
"সোরা...! এইটা কেমন?"
সোরায়া অবাক হয়ে পিছনে তাকিয়ে মাহির কে ওই গানটা ধরে কথাটা বলতে দেখে মিষ্টি হেসে বলল-
"হুম, অনেক সুন্দর।"
মাহির সোরায়া কে স্বাভাবিকভাবেই বলল-
"তাহলে এটা নেই চলো।"
সোরায়া মাহিরের হাতের এক গাদা শপিং ব্যাগের দিকে তাকিয়ে বলল-
"কিন্তু আমার মনে হয় না আর প্রয়োজন আছে। আপুর যা লাগবে তা সবই কেনা হয়ে গেছে।"
মাহির সোরায়া কে বলল-
"ভাবির জন্য নিতে বলি নি। তোমার জন্য বলেছি।"
সোরায়া অবাক হলো, মাহির তার পছন্দের খেয়াল রাখছিল এটা তার অদ্ভুত লাগলো কিন্তু সে গানটা নিতে চাইলো না-
"আমার দরকার নেই এটার। আর তাছাড়া এসব জামা পড়া হয়না অনুষ্ঠান ছাড়া। শুধু শুধু পড়ে থাকবে।
মাহির সোরায়ারকে জোর করতে চাইলো না, কারণ সে জানে জোর করলে সোরায়া কখনোই এটা নেবে না। মাহির উল্টো সোরায়াকে আরো ভালো লাগাতে চাইছিল গাউনটা। তাই সোরায়কে বলল-
"আচ্ছা নেও না। এক কাজ করো, একবার ট্রায়েল দিয়ে দেখ কেমন লাগে। ট্রায়েল দিতে তো সমস্যা নেই।"
সোরায়া নেহাতই বাচ্চা মেয়ে, গাউনটা তার সত্যি খুব ভালো লেগেছিল তাই মাহির ট্রায়েল দিয়ে দেখার কথা বলতেই সেও একটু ভাবুক ভাব নিয়ে রাজি হলো-
"উউউমমম, তা ঠিক। ট্রায়েল দিতে আর সমস্যা কোথায়।"
মাহির হেঁসে একজন স্টাফ কে ডেকে বলল-
"Excuse me, এই গাউনটা একটু ট্রায়েল দেওয়া যাবে?"
স্টাফ-"জি স্যার অবশ্যই। ম্যামের সাইজ টা বললে আমি সেই সাইজ টা ট্রায়েলের জন্য দেব।"
তারপর সোরায়া নিজের সাইজ অনুযায়ী গাউনটা নিয়ে ট্রায়াল রুমে গেল জামাটা পড়তে। মাহির ততক্ষণ সোফায় বসে অপেক্ষা করছিল সোরায়ার। কয়েক মিনিট পর, সোরায়া গাউনটা পড়ে ট্রায়াল রুমের থেকে বের হল তার মুখে এক অন্যরকম খুশি। হাসিতে যেন মুক্ত ঝড়ছে। নিজেই নিচু হয়ে থাকে বারবার গানটা ঘুরিয়ে দেখছিল। মাহির হঠাৎ সেই দিকে তাকিয়ে স্তব্ধ হয়ে গেল, কেবল সে নিজে- না মনে হলো যেন চারপাশে সবকিছু থেমে গেছে এমনকি সময় টাও শুধু সোরায়ার হাস্যজ্জল মুখ আর তার অস্তিত্ব অনুভব করা যাচ্ছে। মাহির আনমনে উঠে দাঁড়িয়ে গেলো, সোরায়া মাহির কে দেখে দৌড়ে পরীদের মতো মাহিরের সামনে এসে বলল-
"কেমন লাগছে? সুন্দর না বলুন?"
মাহিরের কোনো হুস নেই, তার কাছে সবকিছুই স্বপ্নের মতো ঠেকছে। সোরায়া মাহির কেমন হাওয়া হয়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে একটু ইতস্তত বোধ করে মাহিরের চোখের সামনে তুলি বাজিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করে জিজ্ঞেস করল-
"মাহির স্যার, কি হলো আপনার? কিছু বলছেন না কেন? ভালো লাগছে না?"
মাহির চমকে উঠে না বুঝেই মনে যা ছিল তাই অকপটে বলল-
"বার্বি ডল লাগছে!"
সোরায়া কয়েকবার চোখের পলক ফেলল। মাহির ঠিকই বলল তাকে সে বুঝতে পারলো না-
"কিহ লাগছে?"
মাহির হঠাৎ হকচকে গিয়ে আমতা আমতা করে বলল-
"সু.. সুন্দর লাগছে। অনেক বেশিই সুন্দর লাগছে।"
সোরায়া খুশি হয়ে গেলো মাহিরের সুন্দর লেগেছে বলে। হঠাৎ গাউনের একটা পুঁতির সাথে তার চুল আটকে যাওয়ায় সোরায়ার মুখে আওয়াজ হলো-
"আহহ্..!"
মাহির চিন্তিত কন্ঠে- "কি হলো?"
সোরায়া নিজে চুল ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে বলল-"চুল আটকে গেছে কোথাও।"
-"ঘুরে দাঁড়াও আমি ছাড়িয়ে দিচ্ছি।"
সোরায়া গুড়ে দাঁড়ালে মাহির সোরায়ার চুল পুঁতির থেকে ছাড়িয়ে দেয়। সোরায়া আয়নায় নিজেকে দেখলো গাউনটা পড়ে তার নিজেকে খুব সুন্দর লাগছে। সে আয়নায় মাহিরের প্রতিবিম্ব খেয়াল করলো- মাহির ও আয়নায় সোরায়াকেই দেখছে। সোরায়া একটু লজ্জায় মুখ নামিয়ে নিলে মাহির এক অদ্ভুত ভালো লাগায় সোরায়া আরো একটু কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলল-
"একদম পুতুল পুতুল লাগছে।"
সোরায়া মাহিরের কাছে আসার আভাস পেয়ে পিছনে ঘুরতেই মাহিরের বুকের সাথে ধাক্কা খেলো-"আআউউ..!"
মাহির ঠোঁট কামড়ে হেঁসে জিজ্ঞেস করলো-"লেগেছে? দেখি..দেখতে দাও আমাকে।"
সোরায়া মাহির কে বলল-"আপনি আমার অনেক কাছে
দাঁড়িয়ে আছেন।"
মাহির ও মজা করে বলল-"Oh really?! তুমি সরে দাঁড়াও তাহলে।"
সোরায়া বাঁকা চোখে মাহিরের দিকে তাকালো আর জেদ দেখিয়ে বলল-"আপনি ভালো করে জানেন আমি সরবো না। হুঁ...!"
মাহির ও উল্টো কথা বলল-"ঠিক এই জন্যই আমি সরে দাঁড়াচ্ছি না। তুমিও সরো না, এভাবেই থাকো।"
সোরায়া মাহিরের দিকে তাকিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করলো-
"আপনি জানেন আমার কত অস্থির লাগছে?! এভাবে কাছাকাছি দাঁড়ানোতে?"
মাহিরের কাছে সোরায়ার এই অস্বস্তি রংটা খুব ভালো লাগছিল। মিথ্যা বলার প্রয়োজন ও অনুভব করলো না সে-
"তুমি জানো তোমাকে অস্থির হতে দেখে আমার কত ভালো লাগছে ?"
সোরায়া থ মেরে গেলো মাহিরের কথায়। সোরায়া আমতা আমতা করে বলল-"আমার নার্ভাস লাগছে।"
মাহির হঠাৎ সোরায়ার কোমর আঁকড়ে ধরে নিজের সাথে মিশিয়ে নিয়ে বলল-"Should I make it worse?"
সোরায়া আরো ভয়ে কুঁকড়ে গেল। তখনি একজন স্টাফ এসে জিজ্ঞেস করল-
"ম্যাম, সাইজ ঠিক আছে? কোনো সমস্যা আছে?"
সোরায়া কিছু বলার আগেই মাহির সোরায়াকে ছেড়ে নিজে বলল-
"Pack the dress, আর হ্যাঁ এটার বিল আলাদা করবেন।"
স্টাফ চলে যাওয়ার পর মাহির সোরায়ার দিকে তাকিয়ে বলল-
"গিয়ে চেঞ্জ করে এসো।"
সোরায়া বাধ্য মেয়ের মতো মাহিরের কথা শুনে নিলো। করবেই বা কি, কিছু বলার মতো অবস্থাতেই সে ছিল না। কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা আবার বাগান বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেয়।
___________
বাগান বাড়ি~
চলবে...
বিয়ের ঘটনা টা একটু বড়। এই পর্বে লিখা সম্ভব হলো না। ওইটা বোনাস হিসেবে তাড়াতাড়ি দিবো চিন্তা কোরো না পাখিরা। আসলে আমি পড়ার চাপে পড়ে আর লিখতে পারছি না। মাথায় অনেক কিছু আছে, একটু সময় লাগবে। সময় দেও। আর প্লিজ কেমন লাগলো কমেন্ট এ জানিয়। গঠনমূলক কমেন্ট করো। আমি স্টিকার দেখতে দেখতে পেকে গেছি। 🤣 যাই হোক, Love you pakhis ❤️ 😘
#আত্মার_অঙ্গীকারে_অভিমোহ #Soul_bound_obsession
#Oratrika_Rahman_অরাত্রিকা_রহমান
#Part_51 (বোনাস)
(কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ)
(প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য উন্মুক্ত)
বাগান বাড়ি~
বিকেল গড়িয়ে যাচ্ছে, অবশেষে বিয়ের জন্য সবকিছু সুন্দরভাবে আয়োজিত হয়ে গেছে। বাসরঘর সাজানো হয়েছে, সম্পূর্ণ বাড়িও আলোতে চকমক করছে। মাহির আর সোরায়া শপিং থেকে ফিরেই বাড়িটাকে সম্পূর্ণ রূপে সুসজ্জিত দেখে অবাক হয়ে গেছিল। রুদ্র রিমি ছাদ ঘর থেকে নেমে এসেছে এখন দুই জনেই ড্রয়িং রুমে। সোরায়া ড্রয়িং রুমে রিমিকে দেখেই দৌড়ে গিয়ে রিমির পাশে বসে মাথাটা হেলিয়ে দেয় রিমির কাঁধে। শপিং করে খুব ক্লান্ত সে, রিমিও হালকা হেঁসে সোরায়া কে জিজ্ঞেস করলো-
"ক্লান্ত লাগছে বনু?"
সোরায়া চুপ থেকে মাথা নাড়ালো। রুদ্র আর মাহির ছোট্ট সোরায়ার ক্লান্তি দেখে হালকা হাসলো। মাহির বাড়ির চারদিকে টা দেখে বলল-
"বাহ্! অনেক সুন্দর সাজিয়েছিস তো। একদম বিয়ে বাড়ি বিয়ে বাড়ি ভাইব...! "
রুদ্র মাহিরের কথার বেশ গর্ব করে বলল-
"দেখতে হবে না কাজের তদারকি কে করেছে!"
রুদ্র কথাটা যে রিমিকে ইঙ্গিত করে বলল তা রিমি বুঝেছে, কিন্তু সে তো কিছুই করে নি, তাই ক্রেডিট কেন নেবে?
রিমি উল্টো মুখ ফুলিয়ে বলল-
"হ্যাঁ মাহির ভাই, তদারকি তো নয় যেন মশা মারার কাজ। হা করে শুধু দেখতে থাকো আর সব কাজ এমনি এমনি হয়ে গেল চোখের পলকে।"
রিমির খোঁচা দিয়ে কথা বলায় রুদ্র আর মাহির দুইজনেই হেঁসে ফেললো।
সবার কথায় মাঝে সোরায়া বেশ হতাশ হয়ে রিমিকে বলল-
"দেখেছ রিমি আপু, আমার ভাইয়া কত ভালো! তোমাকে কিচ্ছু করতেও দেয় নি। আর আমার পার্টনার! সব কিছু আমাকে দিয়েই করিয়ে নিলেই যেন তার লাভ।"
সোরায়া কথাটা মাহিরের উদ্দেশ্যে বলল- কারণ শপিং মলে ছোট থেকে ছোট জিনিস গুলোও বাছাই করতে মাহির সোরায়ার মতামত নিয়েছে। যদিও সেটা শুধু সোরায়ার সাথে কথা বলার ছুতো ছিল, তবে সোরায়া ভেবেছে মাহির ইচ্ছে করে সব ওকে দিয়ে করাতে চেয়েছে।
সোরায়ার কথায় রুদ্র একটু ভাব নিয়ে মাহিরকে বলল-
"কি গো মাহির ভাই, আমার বোন টার এই হাল কিভাবে? সব ওকে দিয়ে করিয়েছ কেন?"
মাহির উল্টো সোরায়াকে খোঁচা দিতে রুদ্র কে বলল-
"তোর বোনকে বল নিজের যত্ন নিতে। সব শপিং ব্যাগ বহন করলাম আমি আর শুধু শপিং ব্যাগের ভেতরে থাকা জিনিস গুলো বাচাই করে ক্লান্ত সে নিজে। আমি কোথায় যাবো বলতো?"
রুদ্র হেঁসে উঠতেই সোরায়া প্রতিবাদের সুরে বলল-
"আপনি আপনার যেখানে মন চায় সেখানে যান।"
মাহির সোরায়ার কথা শুনে সরাসরি গিয়ে সোরায়ার পাশে গিয়ে বসলো। সোরায়া আড় চোখে মাহিরের দিকে তাকাতেই মাহির বলল-
"What! What are you looking at? তুমিই না বললে যেখানে আমার ইচ্ছে যেতে?"
সোরায়া চোখ বাঁকা করে চাইলে হঠাৎ রুদ্র বলল-
"যাক গে, সব কাজ ডান, আলহামদুলিল্লাহ। এবার শুধু কাজি আসবেন আর বিয়ে হবে।"
মাহির রুদ্রর দিকে তাকিয়ে তুচ্ছ হেঁসে বলল-
"এতো কিছু যাদের জন্য তারা কই? রায়ান কোথায় গেছে? এখনো এলো না, একটা খবর দিলো না, ভাবিকে ঘরে লক করে রেখে গেছে। তার ও কোনো সারা শব্দ নেই।"
রুদ্র ও চিন্তায় পরে গেলো কিছু টা-
"ভাইয়া তো আমাকে কিছু বলে যায় নি কোথায় গেছে। আর মিরার সাথে কথা বলার সময় ও হয় নি। ঘর থেকে মিরাও ডাকেনি সারাদিনে।"
সোরায়া একটু বিরক্ত হয়ে বলল-
"If যার বিয়ে তার হুশ নেই, পাড়া পড়শীর ঘুম নেই had a face.."
রিমি একটু সিরিয়াস হয়ে বলল-
"সারাদিনে মিরা একবার ও আওয়াজ করলো না বিষয়টা কেমন না? আমার তো খেয়ালই ছিলো না।"
হঠাৎ মাহিরের ফোন বাজলো- "রায়ান কল করেছে, চুপ। কথা বলতে দে।"
সবাই চুপ হয়ে গেলে মাহির কলটা ধরলো।
রায়ান ভারী গলায় জিজ্ঞেস করলো-
"সব আয়োজন করা শেষ তোদের?"
মাহির উৎকন্ঠা হয়ে বলল-
"আমাদের কাজ অনেক আগেই শেষ। তুই কোথায়? সকাল থেকে যে হাওয়া হয়েছিস আর খবর নেই।"
রায়ান প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে বলল-
"আমি আসছি। সব ঠিক ঠাক থাকে যেন। (হঠাৎ কিছু একটা ভেবে প্রশ্ন করলো) আচ্ছা, মিরা কি কিছু খেয়েছে?"
মাহির অবাক হয়ে বলল-
"কিছু খেয়েছে মানে? আমি কিভাবে বলবো খেয়েছে কি না। খাবার ভেতরে নিয়ে গেলি তুই, আর বের হলি ভেজা অবস্থায়।"
রায়ান বিরক্ত হয়ে বলল-
"খাবার নিয়ে গেলেই খাবে এতো লক্ষ্মী আমার বউ হলে তো চাচ্চু হয়ে যেতিস কবেই। মহারানি আমার তখন সব খাবার রাগে ফেলে দিয়েছেন। তোরা সারাদিনে আমার বউটা কে কিছু খাওয়াতে পারলি না?"
মাহির রায়ানের বিরক্তি দেখে নিজে উল্টো বিরক্তি দেখিয়ে বলল-
"ছাগল তুই বউ সামলাতে পারিস না এটা কি আমাদের দোষ নাকি? আর কিভাবে খাওয়াবে কেউ তোর বউকে? দরজা লক রেখে গেছিস।"
মাহির কথা শুনে রায়ানের খেয়াল হলো সে ওদের হাতে চাবিটা দিতেই ভুলে গেছে, আর সারাদিনে খেয়ালও হয়নি নানান ব্যস্ততায়।
রায়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাহির কে বলল-
"চাবি আমার ঘরে ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ারে আছে। তাড়াতাড়ি দরজা খুলে কিছু খাওয়াতে বল রিমি কে বা সোরা কে। বিয়ের সময় অজ্ঞান হয়ে গেলে অনেক সমস্যা।"
মাহির ও রায়ানের কথা মেনে নিলো। অতঃপর চাবি সংগ্রহ করে মিরায়ার ঘরে রিমি আর সোরায়া খাবার নিয়ে গেল
-"আপু..!"
-"মিরা..!"
ঘরের অবস্থা দেখে তাদের চোখ পুরো বিস্ফোরিত হয়ে থাকলো। ফ্লোরে খাবার পড়ে আছে চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে, বিছানায় কাপড় চোপড় ছড়িয়ে আছে মিরায়ার লাগেজের যা নয় তা অবস্থা। রিমি সোরায়া একে অপরের দিকে তাকিয়ে চোখাচোখি করে শুকনো ঢোক গিলে সম্পূর্ণ ঘর আবারো খেয়াল করলো। ঘরটা জন মানব শুন্য । মিরায়া ঘরে নেই দেখে সোরায়রা রিমি ওয়াশ রুম ঘরের সব জায়গা খুঁজতে থাকলো-
"আপু...কোথায় তুমি?"
"মিরা...বাইরে আয়।"
খুঁজতে খুঁজতে বারান্দায় গেলে- দেখতে পেলো একটা বড় দড়ির মতো কিছু একটা কয়েকটা ওড়না গিট দিয়ে বানানো হয়েছে। সোরায়া ভালো করেই জানে মিরায়ার এই কাজ নতুন কিছু না। প্রায়ই এই টেকনিকে রাইডিং করতে যেত মিরায়া। তাদের বুঝতে আর বাকি নেই মিরায়া পালিয়েছে। কিন্তু তাদের গলা শুকিয়ে আসছিল এই ভেবে যে এই কথা যদি রায়ান জানতে পারে তাহলে তো কুরুক্ষেত্র লেগে যাবে।
রিমি আর সোরায়া তাড়াতাড়ি দৌড়ে বাইরে গেলো-
সোরায়া কাঁপা গলায় বলল-
"আপু ভেতরে নেই রুদ্র ভাইয়া।"
মাহির আর রুদ্র অবাক হয়ে চেয়ে জিজ্ঞেস করলো-
"নেই মানে? বন্ধ ঘর থেকে হাওয়া হয়ে যাবে নাকি?"
রুদ্র কথাটা বলতেই রিমি ওড়না দিয়ে বানানো দড়ি টা রুদ্রর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল-
"এটা বারান্দায় ঝুলে ছিলো। এটার সাহায্যে গেছে।"
রুদ্র হা হয়ে তাকিয়ে রইল-
"এইসব তো মুভি যে হতে দেখেছি। মিরা এসব ও পারে?"
সোরায়া মনে মনে বিড়বিড় করছে-
"আরো যে কত কি পারে তোমার ধারণা নেই ভাইয়া। এ কোনো সাধারণ মেয়ে নয় লা.. এ হলো রাইডার কুইন রায়া। উফ্, এই বিয়ের কি হবে এখন?"
মাহির হঠাৎ ফোন বের করতেই রুদ্র মাহির কে প্রশ্ন করলো-
"মাহির ভাই , কি করছো?"
মাহির রায়ানের নাম্বার ডায়েল করে কানে ফোন দিয়ে বলল-
"যা করা উচিত তাই করছি। তোর ভাই খুন করে ফেলবে যদি জানতে পারে ওর বউ পালিয়েছে কিন্তু ওকে জানানো হয়নি।"
রায়ান মাহিরের কল ধরতেই মাহির রায়ান কে সোজাসাপ্টা সত্যি কথা বলল হেয়ালি না করে-
"হ্যালো দোস্ত, শোন। রাগারাগী করিস না ঠান্ডা মাথায় কথা শোন আমার।"
রায়ান স্বাভাবিক ভাবেই বলল-
"হ্যাঁ বল শুনছি। কি হয়েছে?"
-"ভাবি ঘরে নেই। সম্ভবত পালিয়েছে। রিমি আর সোরায়া ঘরে খাবার নিয়ে যাওয়ার পর ঘরের ভাবিকে না দেখতে পেয়ে খুঁজতে থাকার পর বারান্দায় ওড়না দিয়ে...!"
-"ব্যাস হয়েছে, আর বলতে হবে না। সম্ভবত না, সত্যিই পালিয়েছে। কখনকার ঘটনা এটা? কখন গেছে?"
রায়ানের রিয়েকশন এতো স্বাভাবিক ছিলো যেন সে জানে এসব। জানার কথাও রেসের দিন একই ভাবে চৌধুরী বাড়ি থেকে বেরিয়ে ছিল মিরায়া সেটা তার জানা। এমন কিছু হতে পারে এটা তারা আন্দাজ করা ছিল।
-"কখন হয়েছে তা কিভাবে বলবো। সারাদিন ই তো একা ছিল ভাবি ঘরে। কখন বাড়িয়েছে কে জানে।"
রায়ান মাহির কে বলল-
"ঘরের বুক সেল্ফে দেখ ছোট্ট ক্যামেরা লাগানো আছে ওইটা দেখেই বল কখন বেরিয়েছে।"
রায়ানের কথায় মাহির অবাক হয়-"ঘরে ক্যামেরা আছে!"
আসলে মিরায়ার জ্ঞান যখন ছিলো না তখন রায়ান রাতের বেলা মিরায়ার দিকে নজর রাখতে ক্যামেরা টা সেট করেছিল যেটা আর অফ করা হয়নি।
-"হ্যাঁ আছে দেখ। ওটা দেখে বল।"
হঠাৎ রায়ানের মাথা এলো রাতের আর সকালের কিছু অন্তরঙ্গ মুহূর্তের সৃষ্টি হয়েছিল তার আর মিরায়ার মাঝে এসবও ক্যামেরা যে আছে। সবাই দেখলে বিষয়টা মোটেও ভালো দেখাবে না। তাই আবারো হকচকালো সে-
"আচ্ছা ওয়েট, শোন। তোর দেখতে হবে না। আমাকে ফুটেজ টা পাঠা।"
মাহির উত্তর করলো-"ওকে। পাঠাচ্ছি।"
কিন্তু রায়ান তাকে আবারো সাবধান করলো-
"আবারো বলছি। আমাকে পাঠাবি শুধু ফুটেজ যেন প্লে না হয়।"
মাহির বুঝতে পারেছিল শুরু তেই রায়ান কি বলতে চাইছে। আবারও একই কথা বলে অবিশ্বাস দেখালে মাহির বিরক্ত হয়ে বলল-
"বুঝেছি তো ভাই, আমি আন্দাজ করতে পারি কি থাকতে পারে ওই ফুটেজে। বিশ্বাস কর, আমার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা নেই তোদের রোমান্স দেখার।"
রায়ান দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল-"আচ্ছা ঠিক আছে পাঠা। ফাস্ট।"
মাহিরের ফোন কেটে দেওয়ার পর রায়ান গভীর নিঃশ্বাস নিয়ে স্টেয়ারিং এ জোরে আঘাত করে বলল-
"কি বউ পেয়েছি আমি হাহ! একটা চুমু, জাস্ট একটা চুমু সহ্য করতে পারে না, কিন্তু বারান্দা দিয়ে পালিয়ে যেতে পারে। ডক্টর আবার বলে ও নাকি দূর্বল। সব দূর্বলতা আমি ধরলেই আসে ওর শরীরে।"
মাহির রায়ান কে ফুটেজ টা পাঠালে রায়ান গাড়ি থামিয়ে সম্পূর্ণ ফুটেজ টা দেখলো। রায়ান ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর, মিরায়া ঘরের ভেতরে জামা কাপড় চেঞ্জ করেছে। মিরায়া জামা খুলতে শুরু করতেই ওই সময়টা রায়ান চোখ বন্ধ করে নেয় আর সাথে স্ক্রিনের উপর ও হাত রেখে ঢেকে দেয়। পৌরুষ আত্মা চাওয়ার পরও বউয়ের অনুমতি ছাড়া বউকে দেখার কোনো শখ তার ছিলো না।
-"ওয়াশ রুম থাকতে ঘরের ভেতর কেউ জামা ছাড়ে! কেমন বুদ্ধি নিয়ে চলে কে জানে?"
ফুটেজে দেখা যায়, মিরায়া জামা কাপড় বদলে কিছু টা সময় বিছানায় উঠে চুপ চাপ বসে ছিলো। তার পর হঠাৎ ঘুমিয়ে পড়ে। বিকালের দিকে ঘুম ভাঙতেই তার মাথায় পালানোর কথা আসলে সে নিজের পুরনো টেকনিক খাটিয়ে বারান্দা দিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়েছে। সম্ভবত তখন রুদ্র রিমি বাসর ঘর সাজাতে ছাদ ঘরে ছিল তাই দেখে নি। কিন্তু সময় খুব একটা আগের নয়। এখন প্রায় ৪৫ মিনিট এর মতো হয়েছে মিরায়া বাগান বাড়ি থেকে বেরিয়েছে। এই অবস্থায় বেশী দূরে যাওয়া তার পক্ষে সম্ভব ও নয় যেহেতু রাস্তাঘাট কিছুই তেমন চেনে না।
রায়ান হালকা হাসলো-"কি একটা অবস্থা, পালাবেই যেহেতু ভেবেছ আর একটু আগে পালাতে পাখি। এখন তো তোমার সাথে আমার রাস্তাতেই দেখা হয়ে যাবে। এটা কিছু হলো! থ্রিল কোথায় থাকলো আর। খোঁজার আগেই তোমাকে পেয়ে যাবো এমনটা হলে তো মজা থাকবে না।"
রায়ান টেনশন ফ্রি হয়ে গাড়ি অতি দ্রুত ছটালো বাগান বাড়ির দিকে।
____________
বাগান বাড়ি ঘন জঙ্গলের ভেতরে হওয়ায় মিরায়ার বেশ হ্যাপা পোহাতে হয়েছে রাস্তা খুঁজে বের করতে। দেখা যাচ্ছিল রাস্তা চেনেনা বলে একই রাস্তা বারবার অতিক্রম করতে হয়েছে। এক প্রকার গোলোক ধাঁধার ন্যায় ঠেকছিল জায়গাটা তার কাছে। শরীর নড়বড়ে কিন্তু শক্তি যোগাচ্ছে মন, খালি পায়ে হেঁটে যাচ্ছে জঙ্গলের ভেতর দিয়ে একা একটা মেয়ে হাটছে, চোখে মুখে ক্লান্তি আর বিরক্তি স্পষ্ট-
"ধুর! কোথায় এনেছে এটা আমাকে? বের হওয়ার রাস্তাই পাচ্ছি না। ইচ্ছে করে করেছে সব যেন চাইলেও চলে যেতে না পারি।"
হাঁটতে হাঁটতে একটু এগিয়ে আবার আওড়ালো-
"আমিও দেখে নেব। ইহহহ শখ কত বিয়ে করবে! করবো না বিয়ে আমি ওই অশ্লীল লোকটাকে। এত বছর আর এই এক মাসের হিসেব আমার চাই তা না হলে কোনো কিছু স্বাভাবিক হবে না। যখন তখন অসভ্যতামি করে। দুইবার ঠোঁট স্পর্শ করেছে আমার, সাহস কত! আমি কি অনুমতি দিয়েছিলাম চুমু খাওয়ার?! যত্তসব!"
মিরায়ার বাড়ি থেকে পালানোর উদ্দেশ্য মোটেও বিয়ে না করতে চাও ছিল না, থাকবেই বা কেন! এতো গুলো বছর এই স্বীকৃতির অপেক্ষাই তো সে করেছে,বরং রায়ান তাকে তাদের মধ্যে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টির কারণ বলে নি তাই জেদ চেপেছে মাথায় যতক্ষণ না সব পরিষ্কার হচ্ছে সে বিয়ে করতে চায় না। পালানোর চিন্তা মাথায় আনার কারণ ও এটাই রায়ান কে উত্তেজিত ও বিরক্ত করা যেন বাধ্য হয় সব বলতে।
হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ মিরায়ার পায়ে ধারালো কিছু একটা দিয়ে পায়ে আঘাত পেতেই মিরায়া অস্পষ্ট আর্তনাদ করলো-
"আআহহহ্...!"
সাথে সাথে পা মাটি থেকে তুলে নিয়ে একপায়ে লাফিয়ে লাফিয়ে একটা গাছের সাথে হেলান দিয়ে পায়ের নিচে তাকাতেই খেয়াল করলো পায়ে একটা বড় কাঁটা ফুটে গেছে। মিরায়া ছোট থেকেই বেশ শক্ত। কোনো ব্যাথা তার গায়ে লাগে না, এভাবেই বড় হয়েছে কিন্তু এখন শরীর টাই ভালো না তার তার উপর কিছু খায়নি ঠিক মতো কত দিন হয়েছে তার ঠিক নেই। পা থেকে কাঁটা টা টেনে বের করে ছুঁড়ে ফেলে আবারো হাঁটতে থাকলো। যদিও মিরায়া নিচে তাকায় নি কিন্তু বেশ ভালো রকমের রক্তপাত হচ্ছে।
কিছুটা পথ হাঁটার পর মিরায়া একটা রাস্তা পেল। আর তা ধরেই আগোতে থাকলো। এমন সময় তার মনে হচ্ছিল তার পেছন পেছন কেউ তাকে অনুসরণ করছে। তবে পিছন ফিরে দেখলো না। আচমকা দুদিক থেকে দুইজন ছেলে মিরায়ার সামনে এসে তার পথ আটকায়- দুই জনের পড়নে উগ্র পোশাক, চেহারার ভাব নমুনা, চোখের চাহনি ও কেমন অশালীন। মিরায়া ভয় না পেয়ে সোজা গলায় জিজ্ঞেস করলো-
"কি চাই? পথ আটকালেন কেন?"
ছেলে গুলো দুইজন দুইজনের সাথে চোখাচোখি করে বিকট হেঁসে বলল-
"চাই তো তোমাকেই সুন্দরী । বোঝো না তুমি? ছোট খুকি নাকি?"
মিরায়ার লড়াইয়ের ক্ষমতা আছে তবে শক্তি নেই তাই বখাটে ছেলেদের পাত্তা না দিয়ে তাদের ঠেলে সামনে এগোতে চাইলো-
"সামনে থেকে সুরুন দুইজন। আমাকে যেতে দিন।"
ছেলে গুলো মিরায়াকে দুই দিক থেকে ঘিরে ধরে তাদের একজন বলল-
"রাস্তায় নয় সুন্দরী তোমাকে বিছানায় বেশি মানাবে। যাবে নাকি?"
মিরায়ার মেজাজ বিগড়ে গেলো সাথে সাথে ছেলেটার কথা শুনে। নিজেকে আটকানোর চেষ্টা টুকু করলো না। প্রতিবাদের জন্য হাত শক্ত করে মুঠো পাকাতেই ছেলে গুলোর কাঁধে দুটো হাত পড়লো, আর তারই সাথে হওয়ায় ভেসে এলো এক পরিচিত গলা-
"তোদের কে সুন্দরীর সামনে নয়, কবরে মানাবে। যাবি নাকি?"
ছেলে গুলো পিছন ফিরে তাকাতেই তাদের দুই জনের মুখে পড়লো সজোরে এক একটা ঘুষি। মিরায়া চমকে পিছনে সরে যেতেই দেখলো রায়ান দাঁড়িয়ে। রায়ান মিরায়ার দিকে একনজর দেখেই হাত উঠিয়ে হেঁসে বলল-
"হাই, সোনা। কোথায় যাচ্ছিলে!? বিকেলে হাঁটতে বেরিয়েছ বুঝি? বর কে না বলে এভাবে বাড়ি থেকে বের হওয়া ঠিক নয় বেইবি। এইসব জানোয়ারের রাস্তায় অভাব নেই।"
মিরায়া স্তব্ধ হয়ে আছে, ওই ছেলে গুলো কে ভয় না পেলেও রায়ানের উপস্থিতিতে তার এখন ভয় করছে- তবে নিজের জন্য না বরং ছেলে গুলোর জন্য। রায়ান মিরায়ার থেকে নজর সরিয়ে লোকগুলো কে মাটিতে ফেলে এক এক করে ইচ্ছে মতো মারতে থাকে-
"হোটেলে নিয়ে যাবি তাই না? চল তোদের কবরস্থান ঘুরিয়ে আনি।"
-"মা..মাফ করে দেন স্যার আর করবো না। আর হবে না।"
কে শুনে কার কথা। রায়ান নিজের মতো হাত চালাচ্ছে। লোক গুলোর মুখও রক্তাক্ত হয়ে গেছে। মিরায়ার গলা শুকিয়ে এই দিকে কাঠ। রায়ান কে থামাবেই বা কিভাবে! আর না থামালে খুন ও হয়ে যেতে পারে। রায়ানের মারের তীব্রতা বাড়লে মিরায়া চেঁচিয়ে রায়ানকে বলল-
"থামুন না। ছেঁড়ে দিন। মরে যাবে। পুলিশের হাতে তুলে দিলেই হয়। মারছেন কেন?"
রায়ান মিরায়ার কথায় বিরক্ত হয়ে বলল-
"খুব মায়া লাগছে এদের জন্য? কই আমার জন্য তো লাগে না! আমি কি মানুষ না? আমার জন্য তোর মনে মায়া নেই কেন? পালাচ্ছিস কেন আমার থেকে? সাহস কি করে হলো! এদের তো আজকে মেরেই ফেলবো। পুলিশ মাই ফুট।"
মিরায়া রায়ানের জেদ ঠিক কোথায় তা বুঝতে পারছে না। রাগ কার উপর আর ঝাড়ছে কোথায়। মিরায়া উল্টো রেগে বলল-
"আমার উপর রাগ এদের উপর দেখাচ্ছেন কেন? আমার উপর ঝাড়ুন দরকার পড়লে।"
রায়ান মিরায়ার কোনো কথাই শুনছে না যেন। মিরায়া ও বুঝলো রাগ দেখিয়ে কাজ হবে না। রায়ান ছেলে গুলো কে মারতে মারতে অধমরা করে ফেলেছে। মিরায়া না পারতে রায়ান কে ধরতে গেল। দুই হাতে রায়ানের এক বাহু আঁকড়ে ধরে টেনে উঠাতে চেষ্টা করতে করতে বলল-
"ছেঁড়ে দিন এবার। অনেক হয়েছে, মরে যাবে। আমি যাচ্ছি না কোথাও। থামুন এবার।"
রায়ান উঠে গেলেও ছেলে গুলো কে পা দিয়ে লাথি মারতে থাকে। মিরায়া রায়ান কে টেনেও সরাতে পারছে না-
"উফফফ্, থামবেন আপনি? বলছি তো যাবো না কোথাও। আমার এতো শক্তি নেই আপনাকে সামলাব। তাই দয়া করে নিজে নিজেকে সামলান।"
রায়ান হঠাৎ মিরায়ার কোমর আঁকড়ে ধরে এক হাতে মিরায়ার চোয়াল চেপে ধরে বলল-
"তোর কি মনে হয় আমার তোকে নিজের সাথে নিয়ে যাওয়ার জন্য তোর অনুমতি লাগবে? তোর কর্ম ফল অন্য কেউ ভোগ করবে না, তুই নিজেই করবি। বাড়ি চল আগে। পরে বোঝাচ্ছি।"
মিরায়া রায়ানের চোখে তার জন্য অন্য রকম পাগলামি দেখলো আজকে কিন্তু রায়ানের কথার ভয় না পেয়ে সে স্বাভাবিক থেকে রায়ান কে শান্ত করার জন্য বলল-
"আচ্ছা ভালো কথা, নিতে হবে না অনুমতি, বাড়ি চলুন। বাড়ি গিয়ে বুঝবো যা বোঝাবেন, ওকে?চলুন, এদের বাদ দিন।"
মনে মনে ছেলে গুলো কে গালি দিচ্ছে-
"হারামজাদারা কেন এলি আমার সামনে? আমাকেও বিপদে ফেললি নিজেরাও মার খেলি। ধুর, পালাতে পারলাম না। চাচার কাছে গেলেও হতো। কপালই খারাপ।"
রায়ান মিরায়ার কথায় একটু শান্ত হলেও ছেলে গুলো কে আবার মারতে উদ্যত হলে মিরায়য়া রায়ানের কোমর জড়িয়ে আটকে দিয়ে বলল-
"আবার মারতে যায়! বললাম তো বাড়ি চলুন যা বোঝাবেন তাই বুঝবো।"
রায়ান মিরায়ার নরম গলায় গোলে গেলেও মিরায়া ইচ্ছে করে তাকে শান্ত করার জন্য মিষ্টি ব্যবহার করছে তা বুঝতে তার বাকি নেই। রায়ান মিরায়ার কোমর এবার দুই হাতে আঁকড়ে নিজের কাছে টেনে ইচ্ছা করে মিরায়াকে ভয় দেখাতে বলল-
"ওকে বেইবি, চলো। রাতে বোঝাবো সব ক্লাস রুমের বেঞ্চে।"
মিরায়া অস্বস্তিতে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো-
"রাতে ক্লাস রুমের বেঞ্চে মানে?"
রায়ান নিজের মুখ মিরায়ার কানের কাছে নিয়ে ফিসফিস করলো-
"তোমার জন্য স্পেশাল অর্থ বহন করে এগুলো বেইবি, ক্লাস রুম=বেড রুম, আর বেঞ্চ=বেড। Let's go."
মিরায়া গাল দুটো সাথে লাল হয়ে উঠলো মিরায়া আচমকা ছুটতে চেয়েও পারলো না এক সেকেন্ডে নিজেকে শুন্যে আবিষ্কার করে মিরায়া সাথে সাথে চোখ বন্ধ করে নিলো। রায়ান ঠোঁট কামড়ে হেঁসে মিরায়াকে নিয়ে গিয়ে গাড়িতে বসিয়ে দিয়ে, পুলিশে কল করে ওই ছেলে গুলোর বিষয়টা সামলে নিয়ে নিজেও গাড়িতে চড়ে বসলো।
মিরায়া গাড়িতে কিছু সময় বসার পরই খেয়াল করলো ব্যাংক সিটে কিছু একটা আছে। তার চেনা পরিচিত একটা শব্দ ভেসে আসছে সেখানে থেকে। ব্যাংক সিটে তাকিয়ে মিরায়ার চোখ দুটো কপালে উঠার উপক্রম -
"জুলি...আমার জুলিয়েট?!"
মিরায়া ঘুরে বসে ব্যাক সিট থেকে জুলিয়েট যে বক্সে আছে তা নিতে চাইলে রায়ান মিরায়া কে জোর করে ধরে সোজা করে বসিয়ে সিট বেল্ট লাগিয়ে দিতে দিতে বলল-
"তোমার জন্যই এনিছি ওকে, শান্ত হয়ে বসো। আমি দিচ্ছি।"
মিরায়া বাধ্য মেয়ের মতো রায়ানের কথা শুনলো, ঠিক পর মুহূর্তেই রায়ান জুলিয়েট যে বাস্কেট এ ছিলো সেটা সামনে এনে মিরায়ার কোলে জুলিয়েট কে দিতেই মিরায়া খুব যত্ন সহকারে আলতো হাতে জুলিয়েট কে কোলে নিয়ে পাগলের মতো আদর করতে থাকলো-
"উম্মাহ, উম্মাহ, আমার বাচ্চা, আমার সোনা মেয়ে, কেমন আছিস তুই? রাগ করেছিস বুঝি মাম্মার উপর? মাম্মা কথা রাখতে পারি নি, কি করবো বল তোর পাপা তো তোর মাম্মাকে...!"
মিরায়া চুপ হয়ে গেল হঠাৎ আর সাথে সাথে রায়ানের দিকে তাকাতেই চোখা চোখি হলো। মিরায়া রায়ানের তাকে আনতে না যাও আর কথা টাই বলতো এটা রায়ান বুঝতে পারছিল কিন্তু তার এখন এ্যাকসিডেন্ট নিয়ে কিছু বলার ইচ্ছে নেই। তাই কিছুই বললো না মিরায়া কে। মিরায়া জুলিয়েটের গায়ে হাত বুলিয়ে আদর করছে আর জুলিয়েট এতো দিন পর মিরায়াকে পেয়ে খুব আনন্দে আদর খাচ্ছে। সে স্থির নেই মিরায়ার কোলে কেমন লাফাচ্ছে হয়তো খুশিতে, উল্লাসে, মিরায়াও ওকে নিয়ে খেলছে। রায়ান গাড়ি চালাতে চালাতে আড় চোখে একবার পাশের সিটে দেখে জুলিয়েট কে আদেশ মূলক কন্ঠে বলল-
"পাপা, এতো লাফাচ্ছো কেন? মাম্মার লেগে যাবে। চুপচাপ কোলে বসে মাম্মার আদর খাও।"
রায়ানের কথায় মিরায়া জুলিয়েট দুই জনের মনযোগ রায়ানের উপর গেল জুলিয়েট রায়ানের কথা ঠিক কি বুঝলো কে জানে- চুপচাপ মিরায়ার কোলে বসে পড়লো আর নড়লো না। মিরায়া না চাইতেও বাপ মেয়ের এমন বোঝা পড়া দেখে ফিক করে হেঁসে উঠে আবারো জুলিয়েটের উপর মন দিলো। হঠাৎ বাস্কেট থেকে একটা বাড়তি আওয়াজ এলো-
"মিয়াওও..."
মিরায়া ভ্রু কুঁচকে বাস্কেটের দিকে তাকাতেই দেখলো সেখানে আরো একটা বিড়াল আছে-
"ওটা কি?"
প্রশ্নে রায়ান মিরায়ার দিকে তাকিয়ে বলল-
"ওহ্ ওটা? ওটা আমাদের জামাই বাবাজি।"
-"মানে...?"
রায়ান দ্বিতীয় বিড়াল টা বাস্কেট থেকে বের করে মিরায়ার কোলে দিয়ে বিড়ালকে উদ্দেশ্যে করে বলল-
"রমিও সোনা, এটা হচ্ছে তোমার শশুর মশায়ের বউ, হবু বউয়ের মাম্মা। সম্পর্কে তোমার শাশুড়ি হবে। সালাম দাও।"
মিরায়া রায়ানের কথা অবাক হয়ে শুনতে শুনতে রোমিও কেও কোলে নিয়ে প্রশ্ন করলো -
"কি বলছেন এসব যাতা। শশুর শাশুড়ি, জামাই, মানে কি?"
রায়ান স্পষ্ট ভাবে সব টা বুঝালো -
"দেখ বেইব, আমি জুলিয়েট কে কথা দিয়েছিলাম ওকে একটা রোমিও এনে দেব। আর আজকের থেকে পারফেক্ট দিন হয় না, আজ বাগান বাড়িতে ধুমধাম করে বাপ আর মেয়ে বিয়ে করবো ঠিক করেছি।"
মিরায়া হা হয়ে আছে। মিরায়ার এমন প্রতিক্রিয়া দেখে রায়ান আবারো বলল-
"কি হয়েছে হৃদপাখি? এমন অবাক হয়ে আছো কেন? খুশি হওনি তুমি- আজ আমাদের সাথে সাথে আমাদের মেয়ের ও বিয়ে।"
মিরায়া অকপটে মাথা নাড়ালো হ্যাঁ সূচক কিছু না বুঝেই শুধু হুজুগে পড়ে। রায়ান সাথে সাথে উত্তেজিত হয়ে বলল-
"সত্যি তুমি খুশি আমাদের বিয়েতে!? উফফফ্! শান্তি লাগলো শুনে।"
মিরায়া আহাম্মক হয়ে গেলো রায়ানের কথা শুনে, কি হলো এটা! সে তো রায়ানের কথার পেচে পড়ে গেছে। কিন্তু এর বিরুদ্ধে কিছু বলার সুযোগ রায়ান দিলে তো। রুদ্র কে কল করে রায়ান এক বাক্যে বলল-
"রুদ্র...! কাজি ডাক, তোর বোন বিয়েতে খুশি মনে রাজি।"
মিরায়া কিছু বলার সুযোগ ও পেল না শুধু এক নজরে রায়ান কে দেখে যাচ্ছে। তার মনে কথা উড়ছে -"যদি এতোই চান আমাকে কেন এসব হলো? কেন আমাকে কষ্ট দিলেন? আর এখন কেনই বা আমাকে এতো করে নিজের করতে চাইছেন?"
মিরায়া রায়ানের আনন্দ ভরা মুখের দিকে তাকিয়ে হারিয়ে গেল। চোখ দুটো ছলছল করছে তার সেটা রায়ানের চোখেও স্পষ্ট ধরা পড়ছে কিন্তু সেও কিছু বলছে না।
_____________
বাগান বাড়ি~
বাড়িতে সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়েছে সব গোছাতে। সোরায়া রিমি মিরায়ার লেহেঙ্গা গহনা সাজগোজের জিনিস গুলো বের করে রেখেছে। মিরায়ার ঘরটাও এখন পরিষ্কার। মাহির রুদ্র কাজির সাথে বিয়ের বিষয়ে কথা বলছে।
হঠাৎ ই মূল দরজা দিয়ে রায়ান মিরায়াকে কোলে করে ভেতরে প্রবেশ করায় কাজি সাহেব সেই দিকে তাকিয়ে অবাক হন, কিন্তু রুদ্র মাহির স্বাভাবিক থাকলো। রায়ান বাড়িতে ঢুকেই রুদ্র কে বলল-
"রুদ্র..গাড়িতে জুলিয়েট আর রোমিও আছে। ওদের নিয়ে আয়।"
-"হ্যাঁ...! জুলিয়েট রোমিও?"
রুদ্র অবাক হয়ে প্রশ্ন করলেও রায়ান উত্তর না দিয়েই মিরায়াকে নিয়ে মিরায়ার ঘরে গিয়ে মিরায়াকে খাটের উপর বসালো। ঘরে সোরায়া রিমি ছিলো কিন্তু রায়ানের চোখে তারা পড়লো না এমন মনে হলো।
রায়ান সাইড টেবিলের ড্রয়ার থেকে মেডিসিনের বক্স বের করে মিরায়ার পায়ের কাছে বসলো। রায়ান মিরায়ার পা হাত দেওয়ার সময় হঠাৎ মিরায়া পা কুঁচকে নিয়ে বাধা দিয়ে জিজ্ঞেস করলো-
"কি করছেন? পায়ে হাত দিচ্ছেন কেন?"
রায়ান চোখ রাঙালো আর তারই সাথে মিরায়া পা সোজা করে চুপ হয়ে গেলো। এরপর মিরায়ার পায়ের কাটা জায়গায় রায়ান ঔষধ লাগাতেই মিরায়া মৃদু কঁকিয়ে উঠলো-
"আআউউ, ইসস্...!"
রায়ানের মাথায় চিন্তার ভাঁজ পড়লো। মিরায়া পা খিচিয়ে নিতে চাইলে রায়ান পা ধরে আলতো করে ফু দিয়ে ঔষধ লাগলো। মিরায়া রায়ানের এমন যত্নবান রূপে বিমোহিত হয়ে তাকিয়ে রইল। খালি পায়ে হেঁটেছে বলে পায়ে নোংরার অভাব নেই অথচ মানুষটার তাতে কোনো ফারাক পড়ছে না।
রুদ্র মাহির জুলিয়েট কে আর রোমিও কে নিয়ে ঘরের ভিতর এলে সোরায়া রিমি ওদের দেখতে পেয়ে অবাক হয়-
সোরায়া-"জুলি? আর এই বিড়াল টা কোথা থেকে এনেছো ভাইয়া?"
রুদ্র মুখের ভাব এমন করলো যে সে জানে না। তবে রায়ান মনযোগ দিয়ে মিরায়ার পা পরিষ্কার করে ব্যান্ডেজ করতে করতে বলল-
"ও রোমিও। জুলিয়েটের হবু বর। আজ আমাদের বিয়ের পর ওদের ও বিয়ে হবে।"
সবাই হা হয়ে আছে রায়ানের কথা শুনে। মাহির অবাক হয়ে আওড়ালো-
"আজ কাল বিড়ালের ও বিয়ে হয়?"
কারো মুখে কোনো কথা নেই। হঠাৎ জুলিয়েট আর রোমিও দুইজনেই মিরায়ার কাছে লাফ দিয়ে চলে এলো। জুলিয়েট তো মিরায়ার পোষা তাই তার আবেগ মানা যায়, কিন্তু এইটুকু সময়ে রোমিও মিরায়ার কাছাকাছি থাকতে সাচ্ছন্দ্য বোধ করছে। মিরায়া রোমিওর শরীরে হাত বুলিয়ে ওকে কোলে নিয়ে প্রশ্ন করলো-
"আদর খেতে চাইছিস? মায়া তো ভালোই লাগাচ্ছিস? তোকে আদর করবো মাম্মা? একটা চুমু খাই?"
এই বলে রোমিও কে মিরায়া আদর করে চুমু খেলো। রায়ান ও মিরায়ার পায়ে ব্যান্ডেজ করে উঠতে উঠতে বলল-
"আদর তো আমিও খেতে চাই, কই কারো তো চোখে পড়ে না। হয় তো মায়া লাগাতে পারি নি এখনো। এখনকার দিনে পশুরাও ভালো জীবন যাপন করে মানুষের থেকে।"
মিরায়া মুখ উঁচু করে রায়ানের দিকে তাকালো। বাকিরা মুখ টিপে হেসে উঠতেই মিরায়া বিড়বিড় করলো-
"অশ্লীল, নির্লজ্জ, বেহায়া লোক...!"
রায়ান সোরায়া আর রিমিকে উদ্দেশ্যে করে বলল-
"আমার প্রিয় শালি সাহেবারা, আমার বউকে আমার জন্য সুন্দর করে বউ সাজিয়ে নিয়ে এসো।"
পর পরই রুদ্র আর মাহিরের উদ্দেশ্যে বলল-
"আর তোরা চল বাইরে কাজির সাথে কথা বলে আমিও রেডি হবো।"
হঠাৎ তখনি মিরায়া প্রতিবাদ করে চেঁচিয়ে বলল-
"আমি কারো জন্য বউ সাজবো না। বিয়েও করবো না।"
রায়ান মিরায়ার দিকে তাকিয়ে ঝুঁকে বলল-
"দেখ সোনা, রাগিও না আমাকে। বিয়ে তো হবেই। ভালোই ভালোই রাজি হলে শুধু তোমার আমার বিয়ে হবে। আর যদি জোর করতে হয় তোমার বোন আর বান্ধবী ওদের ও জোর করে বিয়ে দিয়ে দেব আমার বন্ধু আর ভাইয়ের সাথে। আর এতে ওদের মত না থাকলে সবাইকে খুন করে জেলে চলে যাবো। সুন্দর হবে না?"
রায়ানের কথার আগা মাথা কেউ বুঝলো না ঘরের দুইজন মানুষ ছাড়া আর সেই দুজন ছিল- রুদ্র আর মাহির। রিমি আর সোরায়া অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, রুদ্র আর মাহির একে অপরের সাথে চোখাচোখি করে কি বলাবলি করলো তারাই ভালো জানে। হঠাৎই রুদ্র মিরায়াকে উদ্দেশ্যে করে বলল-
"দেখ মিরা, তুই আমার বোন। তোকে জোর করবো নি কিছুর জন্য। ইচ্ছে না করলে বিয়ে করবি না। না বলে দিতে পারিস।"
রায়ান, মিরায়া, সোরায়া, রিমি চারজন একসাথে চোখ বাঁকা করে রুদ্রর দিকে তাকালো। কিন্তু মাহির কেবল পিছন থেকে এগিয়ে এসে রুদ্রর কথায় তাল দিয়ে বলল-
"জি ভাবি, আপনি তো আমারো বোনের মতোই। মতের বিরুদ্ধে বিয়ে করা ঠিক নয়। চাইলে বিরোধীতা করতে পারেন। আমরা আপনার সাথে আছি।"
এবার চারজনই একসাথে মাহিরের দিকে বাঁকা চোখে তাকালো। মিরায়ার মাথায় এমনিও কিছু ঢোকে নি তার উপর রুদ্র মাহিরের কথা উল্টো মুসিবত। রায়ান আহাম্মক হয়ে গেছে, সে ভাবতে পারে নি নিজের ভাই আর বন্ধু বিয়ের কথায় এইভাবে পোল্টি খাবে, মনে থেকে যেন আর্তনাদ বের হচ্ছে তার-
"ওহ্ আল্লাহ! আমার কপালে তুমি সব বিভীষণের বংশধর কেন দিয়েছ? এই দুটোই আমার ঘর শত্রু।"
রিমি আর সোরায়া এবার একসাথে চেঁচিয়ে উঠলো-
"আমরা সাথে নেই।"
সোরায়া দৌড়ে গিয়ে মিরায়ার কাছে বসে হাত ধরে বলল-
"আপু বিয়ে করে নাও। আমার বয়স মাত্র ষোলো। আমি বিয়ে করবো না।"
সোরায়ার এমন রিজেকশনে মাহিরের মনটাই ভেঙে গেলো। মনে মনে বিড়বিড় করলো-
"ডার্ক রোমান্স পড়া মেয়ে, পাকনা বুড়ি, তার নাকি বয়স কম।"
রিমিও মিরায়ার কাছে গিয়ে বলল-
"দোস্ত আমি তো তোর বিয়ে খেতে এসেছি। নিজের না। বিয়েটা করে নে। আমি বিয়ে করবো না।"
রিমির কথায় রুদ্র ও বেশ কষ্ট পেল মনে হয়, রিমির দিকে চাতক পাখির মতো তাকিয়ে মনে মনে প্রশ্ন করল- "কেন রিমি?"
রায়ান এদিকে কেমন গর্বিত চোখে সোরায়া আর রিমিকে দেখে আবেগ প্রবণ হয়ে যাচ্ছে মনে মনে-
"এরাই..এরাই আমার আসল বিপদের বন্ধু। আল্লাহ সকল বদ নজর থেকে আমার বোন গুলোকে রক্ষা করো "(রুদ্র আর মাহিরের দিকে আড় চোখে তাকিয়ে)
মিরায়া একে একে সবার চেহারার ভাব নমুনা দেখলো। নিজেকে হয়তো এর আগে কখনো তার এতো হ্যাল্প লেস মনে হয়নি, যতটা এখন লাগছে। মিরায়া বিছানায় গা হেলিয়ে দিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেঁড়ে শুয়ে পড়লো, কিছুই বলল না। এদিকে রিমি আর সোরায়া বিয়ে করার জন্য বলেই যাচ্ছে দেখে রুদ্র আর মাহির নিজেদের পক্ষে কিছু বলার আগেই রায়ান ওদের কলার ধরে দাঁতে কটমট করে বলল-
"তোদের আর কিছু বলতে হবে না। বাইরে আয় আমার সাথে বোঝা পড়া বাকি আছে আমার, নেমকহারামের দল।"
অতঃপর রায়ান রুদ্র আরা মাহিরকে নিয়ে বাইরে চলে গেলে রিমি সোরায়া ঠেলে ধাক্কিয়ে মিরায়াকে রেডি করায়। রায়ান ও এক দফা ভাই আর বন্ধুর সাথে লড়াই করে নিজে তৈরি হয়ে নিয়েছে।
রাত ৮টা~
রায়ান কাজির সাথে বিয়ে সম্পর্কে ও পরিবার গঠনের সম্পর্কে বিভিন্ন হাদিস ও ঘটনা শুনছিল মন দিয়ে। মূলত কাজির কাছে তার প্রশ্ন ছিলো ঠিক কিভাবে সে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ স্বামী হতে পারবে তার স্ত্রীর জন্য। আর যার প্রেক্ষিতেই কাজি রায়ানকে নিজের উত্তর শোনাচ্ছিলেন।
এমন সময় রিমি ও সোরায়া মিরায়াকে নিয়ে ড্রয়িং রুমে চলে রায়ান মিরায়াকে বউ সাজে দেখে সাথে সাথে উঠে দাঁড়ায়। চোখ খুলে বেরিয়ে আসার উপক্রম হয়েছে তার, হাত দুটো বুকের বাম দিকে আটকে গেছে যেন হৃৎস্পন্দন ও থেমে গেছে, মনের অজান্তেই মুখ থেকে বেরিয়ে এলো ছোট্ট, তবে মিরায়ার হৃদয় ছেদ করার মতো একটা শব্দ-
"মাশাআল্লাহ!"
শব্দটা মিরায়ার কানে পৌঁছানো মাত্র তার শরীরে কাঁটা দিলো। মিরায়া লজ্জায় মাথা নিচু করে নিলো, মনে অদ্ভুত এক অনুভূতি যা এর আগে কখনো হয় নি। চির তরে কারো হয়ে যাওয়ার জন্য যে সাজে সেজেছে সে এই প্রথমবার তাও সেটা তার শখের পুরুষের জন্য। রায়ান খেয়াল করলো বাকি সবাই ও মিরায়াকে দেখছে। রায়ান ভ্রু কুঁচকে বাকিদের উদ্দেশ্যে বললো-
"মাশাআল্লাহ বল, নজর লেগে যাবে আমার বউয়ের।"
মাহির আর রুদ্র হেঁসে রায়ানের কাঁধে হাত রাখলো। মাহির উল্টো বলল-
"মাশাআল্লাহ, মাশাআল্লাহ জিকির তুই কর। যেভাবে দেখছিস সবার আগে তোর নজরই লাগবে।"
রায়ান কি ভাবে যেন মাহিরের কথা খুব সিরিয়াসলি নিয়ে সত্যি সত্যি মাশাআল্লাহ মাশাআল্লাহ জিকির করতে থাকলো। ঘরের সবাই মিরায়া সহ হেঁসে উঠলো। বেচারা রায়ান বুঝতে পারে নি মাহির মজা উড়িয়ে বলেছে কথা টা। রিমি মিরায়ার কানে কানে বলল-
"না কিভাবে করবি জান? এতো কিউট লোকটা। শুধু তোর জন্য।"
মিরায়া মুখে প্রকাশ না করলেও মনে মনে সম্মতি জানালো। রায়ান সবার হাসি দেখে লজ্জা বোধ করলো না বরং সাথে সাথে মিরায়ার কাছে গিয়ে পকেট থেকে এক বান্ডিল টাকা বের করে মিরায়ার মাথায় চারদিকে ঘুরিয়ে বলল-
"আল্লাহ আমার বউয়ের উপর যেন কারো নজর না লাগে। ওকে সব বদ নজর থেকে হেফাজত করার ক্ষমতা দিও আমাকে।"
রায়ান টাকা গুলো সোরায়া আর রিমির হাতে দিলে সোরায়া আর রিমি মুচকি হেঁসে সরে দাড়ালো। রায়ান নিজের হাত এগিয়ে দিলো মিরায়ার দিকে। মিরায়া চেয়েও নিজের হাত রায়ানের হাতে দিলো না, রায়ান ও অপেক্ষা না করে সাথে সাথে মিরায়াকে কোলে নিয়ে নিলো। মিরায়া হকচকিয়ে গেলো কিন্তু বাকিরা হাততালি দিচ্ছে। কাজি সাহেবও বেশ আবেগ নিয়ে বিয়ের জোড়া দেখছেন।
রায়ান চিন্তিত কন্ঠে মিরায়াকে প্রশ্ন করলো-
"কষ্ট হচ্ছে তোমার হৃদপাখি?"
মিরায়া বুঝলো না কোলে নিলো রায়ান কষ্ট তার কেন হবে-
"কিসের কষ্ট?"
রায়ান স্পষ্ট করে বলল-
"এত ভারী লেহেঙ্গা পড়েছ, কষ্ট হচ্ছে না বহন করতে?"
মিরায়া কি বলবে বুঝতে পারলো না। ঘরের বাকি সবাই লাইভ মুভি দেখছে কোনো, এমন ভাবে তাকিয়ে আছে। যে কোলে নিয়েছে সে, যে লেহেঙ্গা পড়ে আছে তাকে জিজ্ঞেস করছে তার বহন করতে কষ্ট হচ্ছে কিনা!
মিরায়া আরো লজ্জিত হয়ে মাথা না সূচক নাড়িয়ে বোঝালো তার কষ্ট হচ্ছে না। রায়ান মিরায়াকে নিয়ে গিয়ে ফুল দিয়ে সাজানো সোফায় বসিয়ে মিরায়া লেহেঙ্গা, ওড়না, ঘোমটা সব ঠিক করে দিয়ে নিজেও তার পাশে বসলো। মিরায়ার মনে খচখচানি যাচ্ছে না কিছুতেই। সবাই নিজেদের জায়গায় বসলে রায়ান কাজি সাহেবর উদ্দেশ্যে বলল-
"কাজি সাহেব বিয়ের কাজ শুরু করুন।"
কাজি সাহেব স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন করলেন-
"বিয়ের দেন মোহর কত লিখবো বাবা?"
মিরায়া মনে মনে ভাবলো এবার রায়ান কে একটু হলেও জব্দ করতে পারবে যদি কথা ধন-সম্পদের হয় যে কারো গায়ে লাগবে- "বিয়ে করার খুব শখ তাই না! দেখাচ্ছি বিয়ের করতে কত মজা!"
রায়ান কিছু বলার আগে মিরায়া বলল- "কাজি সাহেব..বিয়ে আমার তো দেন মোহরও আমি ঠিক করবো।"
রায়ান ভালো করেই জানে মিরায়ার মনে জিলাপির পেচ চলছে এখন তবে হিসেবে যখন বউ আছে তার হারানোর মতো কিছু নেই। রায়ান মিরায়ার কথার উপর বলল-
"Of course, baby..তুমি যা চাইবে তাই দেন মোহর ধরা হবে। তবে আগে আমি বলি, পরে আরো কিছু লাগলে যোগ তুমি করে দিও।"
মিরায়াও রাজি হলো। কাজি সাহেব রায়ান কে বললেন-
""জি, বলুন। দেন মোহর কত লিখবো?"
রায়ান কোনো প্রকার কপট ছাড়া বলল-
""হ্যাঁ, লিখুন। রায়ান চৌধুরীর স্থাবর অস্থাবর সকল সম্পত্তি, রায়ান চৌধুরীসহ তার অনাগত এক ডজন বাচ্চা- এগুলো বিয়ের দেন মোহর।
(আল্লাহর রহমতে সন্তান সংখ্যা বেড়ে গেলে সেটা
তার জন্য বোনাস তার স্বামীর তরফ থেকে)।"
নিজের মতো একটানে কথাগুলো বলে মিরায়ার দিকে ফিরে বলল-
"Baby? Did I miss anything? তোমার আর কি চাই? যা ইচ্ছে এ্যাড করো, তোমার বর সব দেবে।"
মিরায়া থ মেরে গেছে। কি ভাবলো আর কি হলো কিছুই বুঝলো না। রুদ্র,মাহির হাইফাই করে একে অপরকে আগাম সাধুবাদ জানালো-
"ভবিষ্যতে এক ডজন আন্ডা বাচ্চার চাচ্চু হওয়ার অভিনন্দন রুদ্র।"
-"তোমাকেও মাহির ভাই। তুমি ব্রেক করবে নাকি রেকর্ড?"
মাহির সোরায়ার দিকে একনজর চেয়ে ফিসফিসিয়ে বলল-
"নাহ থাক, চাপ হয়ে যাবে।"
সোরায়া বুঝলো না কি বলল মাহির তার দিকে তাকিয়ে। মাহির রুদ্র কে জিজ্ঞেস করলো -
"তোর ইচ্ছে আছে ব্রেক করার?"
রুদ্র রিমির দিকে আড় চোখে তাকিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল-
"না থাক, চাপ হয়ে যাবে।"
রিমি সোরায়ার সাথে বসে রায়ানের কথা নিয়েই হাসা হাসি করছে। কাজি সাহেব নিজের এতো বছরের অভিজ্ঞতায় এমন দেন মোহর শোনেন নি বলে বেশ বিস্মিত- "এ..এক ডজন?"
কাজি সাহেব-"বাবা, ইসলামের নিয়ম অনুযায়ী বউকে স্পর্শ করার আগে তাকে তার দেন মোহর পরিশোধ করতে হয়।"
রায়ান একটা কাগজ বের করে তাতে সাইন করে দিয়ে বলল-
"নিন এতে সব কিছুর মালিকানা ওকে দেওয়া হয়ে গেছে। আর নিজের মালিকানা কবুল বলার সাথে সাথে ওকে দিয়ে দেব। বাকি.."
শান্ত ভাবে বলল-"আমার বউ যদি আগে দেন মোহর চায় তার পর বিয়ে আমার সমস্যা নেই। দশ বছর সময় দিক আমাকে দেন মোহর পরিশোধ করে পরে আবার প্রকৃত বউ হিসেবে স্পর্শ করবো।"
সবাই হেসে উঠল একসাথে। কাজি সাহেব আর মিরায়াই নিজেদের জগতে হা হয়ে আছে। অতঃপর কাজি সাহেব মিরায়াকে বললেন উপদেশ দিয়ে বললেন-
"মা, আমার পাঁচ বাচ্চা। সব কয়টা হাড়ে বজ্জাত। এক ডজন অনেক বেশি। কথা বলে কমাও।"
মিরায়া কাজি সাহেবর কথা শুনল কিন্তু সে ভালো ভাবেই জানে রায়ান ইচ্ছে করে এমন করছে। মিরায়া রায়ানের সাইন করা কাগজ টা নিয়ে ছিঁড়ে ফেলে দিয়ে কাজি সাহেব কে বলল-
"কাজি সাহেব, ইসলামের অনুযায়ী ঠিক যতটুকু দেন মোহর দেওয়ার নিয়ম আছে ততটুকুই লিখুন। আর আমার সিদ্ধান্তই শেষ সিদ্ধান্ত।"
রায়ান ঠোঁট কামড়ে হাসলো, যেন পুরো টা তার কল্পনা করা ছিলো। মিরায়ার কথা মতো ইসলামের নিয়ম অনুযায়ী সব কার্যক্রম সম্পন্ন হলে কাজি বিয়ে পড়ানো শুরু করেন।
চলবে...
পাখিরা গল্প কেমন লেগেছে জানিও বানানে ভুল হলে ক্ষমা করো। কমেন্ট দেখার অপেক্ষায় থাকবো। যেহেতু পরীক্ষা খুব কাছে এর পরে গল্প দেব কি না ঠিক নেই যদি টার্গেট না পুরো হয়। ইচ্ছে করেই বেশি টার্গেট দিচ্ছি বলতে পারো। 2k react 500 comments. পুরোন হলে গল্প পাবে নাহলে গল্প চেয়ে লাভ নেই। আর আমি পারলে তো দেবই। Love you pakhis ❤️😘