ফন্ট সাইজ:
থিম:
আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ

৫৪তম পর্ব

লেখক: অরাত্রিকা রহমান

#আত্মার_অঙ্গীকারে_অভিমোহ #Soul_bound_obsession

#Oratrika_Rahman_অরাত্রিকা_রহমান

#Part_54

(কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ)

(প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য উন্মুক্ত)

রায়ান মিরায়া কে কাছে টেনে নিয়ে বলল-

"তোমার ঠোঁটের তুলনায় কম মিষ্টি ছিল। অনেক হালুয়া খেয়েছি এবার কাছে এসো, তোমার ঠোঁটের মিষ্টত্ব নিতে হবে আমার।"

মিরায়া ঘাবড়ে গেল। রায়ান মিরায়ার ঠোঁটের দিকে ঝুকে এলে মিরায়া রায়ানের ঠোঁটের উপর হাত দিয়ে তাকে আটকে দিয়ে নিজের মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে সিঁড়ির দিকে তাকিয়ে বলল-

"পাগলামি কেন করেন আপনি? রান্নাঘরে আছি আমরা।বাড়িতে আমরা ছাড়া আরো অনেকে আছে, ভুলে যাবেন না। কেউ চলে এলে?"

রায়ান মিরায়ার কথায় ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে ইশারা করে হাতটা মুখ থেকে নামাতে বললে মিরায়া নিজের হাত নামিয়ে নেয়। রায়ান মিরায়ার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল-

"পাখি, তোমার কথা তে যা বোঝা গেলো, আমরা রান্নাঘরে না থাকলে তুমি আমাকে আটকাতে না। তাই না?"

মিরায়া চোখ বড় বড় করে নিয়ে রায়ানের দিকে চাইলে রায়ান মজার ছলে বলল-

"বেড রুমে চলো। কেউ আসবে না ওখানে।"

মিরায়া নিজের কথায় ফেসে গেছে বুঝতে পেরে চুপ করে গেল। রায়ান আরো কিছু বলতে যাবে তার আগেই সোরায়া আর মাহির বাহির থেকে বাড়ির ভেতরে এলো- তারা এতোক্ষণ বাগানেই ছিল, চারপাশটা একসাথে ঘুরে দেখেছে এতো টুকুই। সোরায়া মিরায়া আর রায়ান কে রান্নাঘরে দেখে একটু চিন্তায় পরে যায়- আবার দুজনের মাঝে কিছু হয়েছে কিনা এই ভেবে। সোরায়া রান্নাঘরের দিকে আসছে দেখে মিরায়া রায়ান কে একটু দূরে ঠেলে দিয়ে বিড়বিড় করলো-

"বনু আসছে, দূরে যান।"

রায়ানও মিরায়ার থেকে এক পা সরে দাঁড়ালো বউয়ের কথা রাখতে। সোরায়া রান্নাঘরে এলে মিরায়া নিজ থেকে জিজ্ঞেস করলো-

"বনু, তুই বাইরে কি করছিলিস এই সময়?"

সোরায়া কিছু বলার আগেই মাহির রান্নাঘরে এসে বলে উঠলো-

"আমার সাথে ছিল ভাবি, সুতরাং নিশ্চিত থাকতে পারেন আপনি।"

রায়ান মাহিরের দিকে বাঁকা চোখে তাকিয়ে তাড়াতাড়ি সোরায়ার কাছে গিয়ে সোরায়াকে ঘুরিয়ে পা থেকে মাথা অব্দি দেখে জিজ্ঞেস করলো-

"তুই সত্যি ঠিক আছিস তো সোরা?"

সোরায়া মাথা নাড়লো হ্যাঁ সূচক।

মাহির ভ্রু কুঁচকে তাকালো রায়ানের দিকে। মিরায়া কিছু বুঝছে না তবে সোরায়া তার টিচার এর সাথে ছিল যেহেতু তাই মাথা ঘামালো না। সেও মাহিরের কথায় বলল-

"আপনার সাথে যেহেতু ছিল চিন্তার আর কোনো কারণ তো দেখছি না মাহির ভাই।"

মাহির মিরায়ার কথায় হালকা হেঁসলো।

মাহিরের চোখে রায়ানের চোখ পড়তেই রায়ান বিড়বিড় করলো-

"ও তো নিজেই একটা চিন্তার কারণ।"

মাহির বুকে আড়াআড়ি হাত বেঁধে ভ্রু নাচিয়ে রায়ানকে একটু খেপালে রায়ান সোরায়াকে স্পষ্ট গলায় সাবধান করল-

"শোন বনু, ছেলেদের থেকে দূরে থাকবি। টিচার হোক বা হকার ছেলে মানুষ ছেলে মানুষই হয়। জাতটাই খারাপ। তাই দূরে থাকবি বুঝেছিস?"

রায়ানের কথায় মাহিরের হাত ফোস্কে যায় বুকের উপর থেকে। সোরায়া মিরায়া বোকা বোকা চেহারা করে দাঁড়িয়ে আছে। মাহির রায়ানের কথায় খোঁচা দিয়ে জিজ্ঞেস করলো-

"তুই কি অন্য জাতের মানুষ?"

রায়ান সাথে সাথে নির্দ্বিধায় পাল্টা প্রশ্ন করলো-

"আমি কি বলেছি আমি ভালো?"

মাহির আর কি বলবে তর্কে যাওয়ার আগেই তো শেষ। মাহির কে তবুও খুব কনফিউজড দেখাচ্ছিল বলে রায়ান বলল-

"আমি যে খারাপ, বিশ্বাস না হলে তোর ভাবিকে জিজ্ঞেস কর। যার সাথে ওমন আচরণ করি সে ভালো বলতে পারবে।"

সোরায়া রায়ানের কথায় ফিক করে হেঁসে দেয়, কিন্তু মিরায়া বেশ লজ্জায় পড়ে গেছিল। মিরায়া সোরায়ার মাথায় গাট্টা মেরে বলল-

"খুব হাসি পাচ্ছে তাই না? বড্ড পেকে গেছিস। বয়স হোক আর একটু, বিয়ে দিয়ে দিবো, ঠিক আছে?"

মাহির বিয়ের কথায় বেশ উৎসাহ নিয়ে মিরায়াকে জিজ্ঞেস করলো-

"কবে হবে ওর বিয়ের বয়স ভাবি?"

সোরায়া মিরায়া দুইজনেই অবাক, মিরায়া তো কথার কথা বলেছে খেপানোর জন্য।

রায়ান চোখ ছোট ছোট করে মাহিরর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো-

"তোকে কেন বলবে কবে হবে বিয়ের বয়স?"

মাহির মিরায়ার সামনে কোনো মতো বিষয় টা সামাল দিতে বলল-

"আরে বিয়ের জন্য ছেলে লাগবে না? আমি খুঁজতে হ্যাল্প করবো, তাই আর কি।"

রায়ান বানোয়াট হেঁসে বলল-

"So kind of you... কিন্তু তোর হ্যাল্পের কোনো দরকার নেই।"

মিরায়া কেবল মাত্র রায়ানের কথার বিপরীতে যাবে বলেই মাহিরের হয়ে কথা বলল-

"কেন দরকার হবে না শুনি? আজকাল বিয়ের জন্য ছেলে পাওয়া মুশকিল। মাহির ভাই আপনি এই ক্ষেত্রে অবশ্যই আমাকে সাজেস্টে করতে পারেন।"

মাহির রায়ানের কথায় আর পাত্তা না দিয়ে মিরায়ার কথায় খুশি মনে সম্মতি দিলো। সোরায়া মনে মনে বেশ উপভোগ করছে মাহিরের এই কান্ড গুলো। মনে শত লাড্ডু ফুটছে তার আর সাথে পেটের মাঝে প্রজাতির উড়া উড়ি তো চলছেই। রায়ান মনে মনে মাহির কে বেশ গালিগালাজ করলেও সামনা সামনি কথা বাড়ালো না।

হঠাৎ রুদ্র উপর থেকে নেমে এসে হটকারিতা দেখিয়ে রায়ানকে ডাকলো-

"ভাইয়া...! ভাইয়া....! কোথায় তুমি?"

রায়ান অবাক হয়ে ড্রয়িং রুমের দিকে তাকালো রুদ্রর দিকে- হাতে ফোন মুখে একটু গাম্ভীর্যের রেশ দেখে রায়ান দ্রুত রান্না ঘর থেকে ড্রয়িং রুমে এলো-

"কি হয়েছে? এতো হাইপার হয়ে আছিস কেন? বাড়িতে কিছু হয়েছে?"

মাহির, সোরায়া আর মিরায়াও চট জলদি ড্রয়িং রুমে চলে এলো। রুদ্র সবাইকে একসাথে দেখতে পেয়ে একটু অবাক হলো-

"তোমরা সবাই একসাথে, এখানে!"

হঠাৎ রিমির কথা মাথায় আসতেই রুদ্র ওর কথা জিজ্ঞেস করলো-

"তোমরা সবাই এখানে কিন্তু রিমি নেই কেন?"

রায়ান চোখ কুঁচকে তাকিয়ে রইল রুদ্রর দিকে। মিরায়া রিমিকে ডাকলো সাথে সাথে-

"রিমি...রিমি...জানু নিচে আয়।"

রিমি মিরায়ার ডাক শুনে উপর থেকে স্বাভাবিক ভাবেই সাড়া দিলো-

"আসি জান, ওয়েট..!"

রুদ্র রায়ান সাথে সাথে মিরায়ার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন সূচক কণ্ঠে পর পর জিজ্ঞেস করলো-

রায়ান-"জানু...!? ও জানু হলে আমি কি?"

রুদ্র -"জান...!? মিরা জান হলে আমি কি হবো?"

মিরায়া বাঁকা চোখে ওদের দিকে তাকিয়ে দেখে আবার রিমিকে ডাকার দিকে মন দিলো-

"ওই... তাড়াতাড়ি আয়।"

রিমি সিঁড়ির রেলিং ধরে নামতে নামতে বলল-

"আরে আসছি তো। বলল কি হয়েছে।"

মিরায়া রিমির দিকে একটু নাটকীয় হেঁসে বলল-

"রুদ্র ভাইয়া আমাদের সবার মাঝে তোকে দেখতে না পেয়ে বেশ চিন্তায় পড়ে গেছিল হয়তো তাই ডাকলাম তোকে।"

রুদ্রর দিকে তাকিয়ে বলল-

"নাও ভাইয়া তোমার রিমি কে ডেকে এনেছি। এবার বলো হয়েছে কি?"

"তোমার রিমি" কথাটা রুদ্রর খুব ভালো লাগলো কিন্তু রিমি ভ্রু কুঁচকে মিরায়ার দিকে তাকিয়ে একটু বিরক্তি প্রকাশ করলো, তবে মিরায়ার তাতে যায় এলো না। সবাই রুদ্রর দিকে মন দিলো।

-"ভাইয়া বান্দরবানের শেষ দিকে আমাদের একটা কটেজ আছে তোমার মনে আছে?"

-"হ্যাঁ, তো কি হয়েছে?"

-"আমি ওখানে যাওয়ার প্লেন করছিলাম। ভেবেছিলাম বাইকে যাবো কিন্তু বাইক মেনেজ হচ্ছিল না। একটু আগে কল এলো বাইক মেনেজ করা হয়ে গেছে। আমরা একটু পর কটেজের উদ্দেশ্যে রওনা দিতে পারবো।"

রায়ান, মাহির আর মিরায়ার চোখ জলজল করে উঠলো বাইকের কথা কানে পৌঁছাতেই কিন্তু সোরায়া আর রিমির কোনো উত্তেজনা লক্ষ্য করা গেল না। তবে রায়ান রুদ্র মাথায় একটা গাট্টা মেরে বলল-

"এই নর্মাল কথাটা বলতে এতো নাটক করতে হয়?"

-"আআহহহ্!" রুদ্র মৃদু আর্তনাদ করে মাথায় হাত ঘষতে লাগলো। সবাই হেঁসে উঠলো সাথে সাথে। মিরায়া হঠাৎ কিছু না চিন্তা করেই বলল-

"রুদ্র ভাইয়া বাইক যেহেতু মেনেজ করা যাচ্ছে একটা এক্সট্রা বাইক মেনেজ করো।"

রুদ্র অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো-

"কেন? ৩টে বাইক হলেই তো হবে আমাদের। ভাইয়া আর তুই একটায়, আমি আর রিমি একটায়, আর মাহির ভাই সোরা একটায়।"

মাহির রুদ্রের পরিকল্পনায় খুশি মনে সম্মতি দিলো। কিন্তু সোরায়া বা রিমি কারোরই সায় ছিলো না। মিরায়া জোর গলায় প্রতিবাদ করে বললো-

"তোমরা যার সাথে ইচ্ছে যাও আমি কারো সাথে যাচ্ছি না। আমার জন্য আলাদা বাইক এ্যারেঞ্জ করতে পারলে করো নাহলে আমি যাবো না।"

মিরায়া বাইক রাইডার এ কথা রায়ান সোরায়া জানলেও রুদ্র মাহির বা রিমি কেউই জানে না। রায়ান কিছু বলছিল না কারণ সে দেখতে চাইছিল মিরায়া বাইক রাইড করে এটা সে সবার সামনে স্বীকার করবে কিনা তা দেখতে। রুদ্র অবাক হলো মিরায়ার আবদারে-

"আরে এক্সট্রা বাইক মেনেজ করলেই কি, তোকে নিয়ে কে যাবে আমরা ছেলে তিন জন। তুই তো আর বাইক চালাতে পারিস না।"

রায়ান একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। সোরায়ার মুখে হতাশা। মিরায়া ড্রয়িং রুম থেকে চলে যেতে যেতে বলল-

"কি পারি আর কি না পারি তা পরে দেখাচ্ছি। আপাতত আমার জন্য বাইক মেনেজ করো।"

মিরায়া নিজের মতো কথা বলে ঘরে চলে গেলে সোরায়া রুদ্র কে উদ্দেশ্য করে বলল-

"তোমার ধারণা নেই রুদ্র ভাইয়া, আপু কি কি করতে পারে বাইক দিয়ে। যা বলেছে তাই করো।"

সোরায়া যাওয়ার সময় মাহিরের দিকে তাকিয়ে বলল-

"আর হ্যাঁ, আমি আপুর সাথেই যাবো।"

রিমিও সোরায়ার পিছন পিছন বলল-

"সোরা আর মিরা একসাথে গেলে আমিও ওদের সাথেই যাব।"

এই বলে সোরায়া আর রিমি নিজেদের মতো মিরায়ার পিছন পিছন চলে গেল।

রুদ্র মাহির রায়ান ঠায় দাঁড়িয়ে থাকলো কিছুটা সময়। রায়ান একটু পানি খেয়ে রুদ্র কে বলল-

"ভাবি যা বলল তাই কর বাকিটা আমি দেখছি। চারটা বাইক আনা। আজ এসপার নয় ওসপার, কিছু একটা তো হবে।"

রুদ্র আর কিছু না পেরে নিজের শর্ত রাখলো রায়ানের সামনে-

"সে না হয় করলাম, তাতে আমার লাভ কি? রিমি তো বলল ও মিরা ভাবির সাথে যাবে। আমার তো উল্টো ক্ষতি হবে। যদি কথা দাও রিমি আমার সাথে যাবে তাহলে ভেবে দেখতে পারি।"

রুদ্রর পর মাহির ও রায়ানকে সোরায়ার কথা বলতে চাইলো। রায়ান ভালোই বুঝলো দুনিয়ার সবাই স্বার্থপর। বেচারার মুখে আর কোনো ভাষা বাকি রইল না যা ব্যবহার করে নিজের বিরক্তি প্রকাশ করবে। হার মেনে নিয়ে বলল-

"আল্লাহর দোহায় লাগে, মাফ কর আমারে তোরা। যা করতে বলছি কর, তোদের যা লাগবে পেয়ে যাবি। আমি ব্যবস্থা করে দিবো।"

মাহির রুদ্র আর কেউ কিছু বলল না। রায়ানের কথা মেনে নিল। যদিও রুদ্র মিরায়ার রাইডার হওয়ার ব্যাপারটা এখনো পরিষ্কার করে বুঝে নি তবুও চারটা বাইকের ব্যবস্থা করলো।

___________

সকাল গড়িয়ে দুপুর হয়েছে। খাওয়া দাওয়া শেষ করে সবাই যার যার মতো ঘরে চলে গেছে রেডি হতে কটেজের উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়ার জন্য। রায়ান রুদ্র আর মাহির এক ঘরে রেডি হচ্ছে, অন্যদিকে মিরায়া রিমি সোরায়া এক ঘরে রেডি হচ্ছে- যেহেতু শীতের দিন তাই সবাই চেষ্টা করেছে মোটা জ্যাকেট, প্যান্ট পড়ে বের হওয়ার। মেয়েদের ক্ষেত্রেও তাই।

রায়ান কালো রঙের জ্যাকেট, মাহির নীল আর রুদ্র লাল রঙের জ্যাকেট পড়েছে। রুদ্র এক প্রকার প্লেন করেই মেয়েদের জন্য ম্যাচিং রঙের জ্যাকেট এনেছে- মিরায়ার কালো, সোরায়ার নীল, আর রিমির জন্য লাল জ্যাকেট।

সব কাপলদের জন্য আলাদা ম্যাচিং জুতা ও কিনেছে রুদ্র।

___

ছাদ ঘরে~

মিরায়া একদম রাইডার দের মতো ড্রেস আপ করে নিয়েছে। সোরায়া ও বলা চলে সম্পূর্ণ রেডি মিরায়া সোরায়া কে সাহায্য করছে রেডি হতে। সোরায়া মিরায়াকে রাইডার রুপে দেখে অভ্যস্ত কিন্তু রিমি মিরায়াকে হঠাৎ যেন অন্য রুপে দেখছে। তার চোখ বাইরে বেরিয়ে আসার উপক্রম। মিরায়া রিমিকে তার দিকে এমন ফেল ফেল করে তাকিয়ে থাকতে দেখে জিজ্ঞেস করলো-

"কি রে, ভুত দেখছিস নাকি?"

রিমি চমকে উঠলো হঠাৎ সাথে সোরায়া হেঁসে উঠলো। রিমি কৌতুহল থেকে মিরায়াকে জিজ্ঞেস করলো-

"মিরা, তুমি কি সত্যি বাইক চালাতে পারিস?"

মিরায়া রিমির কথা শুনে সোরায়ার সাথে চোখাচোখি করে একসাথে হেঁসে বলল-

"wait and see."

রিমি অধৈর্য হলো, তার আর এমন সাসপেন্স ভালো লাগছে না। রিমি ধপ করে বিছানায় বসে গিয়ে মুখ ফুলিয়ে বলল-

"এখনই বলবি আমাকে সব নাহলে আমি যাবো না।"

মিরায়া হালকা হেসে বলল-

"আহা, কি জ্বালায় পড়লাম। পারবো না কেন শুনি? বাইক চালানো কি এমন আহামরি কিছু।"

রিমি মিরায়ার দিকে তাকিয়ে দ্বিতীয় বার নিশ্চিত হতে জিজ্ঞেস করলো-

"তার মানে সত্যি সত্যি বাইক চালাতে পারিস তুই?"

সোরায়া রিমির কাছে গিয়ে বিছানায় পাশে বসে কাঁধে হাত রেখে বলল-

"শুধু চালাতে পারে এমন না গো, বাইক রাইডার রায়া নামে ফেমাস আমার আপু। আজ অব্দি কোনো বাইক রেসে হাড়ে নি জানো।"

রিমি মিরায়ার দিকে আরো আশ্চর্য হয়ে তাকায় মিরায়া মুচকি হেঁসে সোরায়াকে বলল-

"হয়েছে হয়েছে, একসাথে এতো সোক নিতে পারবে না ও। চুপ কর।"

সোরায়া হাসলো এই দিকে রিমি তো থ খেয়ে গেছে মিরায়ার রাইডার হওয়ার কথা শুনে। এরপর মিরায়া রিমি কে টেনে তুলে ওকে রাইডের জন্য রেডি করিয়ে দেয়। তিনজন সুন্দর মতো রেডি হয়ে বসে আছে।

সোরায়া বিরক্ত হয়ে বলল-

"আর কতক্ষন বসে থাকবো এভাবে আপু? বোর লাগছে আমার। ভাইয়ারা এখনো রেডি হয় নি?"

মিরায়া মুখ বাঁকিয়ে বলল-

"তুই দেখে আয় গিয়ে। আমি কিভাবে বলবো?"

-"আমি যাবো না একা। তুমিও চলো।"

-"আমি যাবো না।"

রিমি দুই জনের মাঝে বলল-

"একসাথে যাই চল। আর কতক্ষন বসে থাকবো।"

তারপর আর কি তিনজন একসাথে গেলো নিচে ছেলেদের রুমে। একই সময় ছেলেদের রুমের চিত্র ভিন্ন ধরনের। তিন জনে একসাথে রুম হিটার চালু করে দিয়ে খালি গায়ে বসে ভিডিও গেম খেলছে। খেলার তালে তাদের যে একটু পর বের হতে হবে সেই দিকে খেয়াল ও নেই। এই নিয়ে প্রায় পাঁচ বার গেম খেলা হয়েছে প্রতিবার রায়ান জিতেছে, এই নিয়ে রুদ্র মাহির একটু বিরক্ত তাই জিতার নেশায় তিন জনই একের পর এক রাউন্ড খেলছে। অবশেষে রায়ান শেষের রাউন্ড ও জিতে গেল।

-"ooohhooo...I won...!"

মাহির রায়ানের আনন্দে বিরক্তি প্রকাশ করে রুদ্র কে বলল-

"তোর ভাইকে চেঁচাতে না কর রুদ্র। মাথা গরম হয়ে যাচ্ছে আমার।"

রুদ্র মুখ ভার করে বসে আছে। রায়ান মাহিরের কথায় খোঁচা মেরে বলল-

"কেন রে, জ্বলে?"

-"জ্বলে আমার জুতা। আমার কেন জ্বলবে? আজকের দিনটা তোর জন্য ভালো তাই জিতেছিস। লাক ভালো তোর।"

রায়ান মাহির কথা মেনে নিলো-

"তা তো অবশ্যই, ভাগ্য আমার বরাবরই ভালো। সাকসেস পেয়ে গেছি, বউ পেয়ে গেছি, এখন সব গেম জিতে গেছি, আর কি লাগে। তোরা সাকসেসফুল হয়েই বা কি এমন করেছিস আমার সাহায্য ছাড়া তো বউ ও পাবি না দুইজন। তাই তো যখন তখন আমাকে ফান্দে ফেলার ধান্দা করিস।"

রুদ্র একটু আগে যে রিমিকে নিয়ে শর্ত দিয়েছিল তা নিয়ে রায়ান খোটা দিলো তা আর বুঝতে বাকি নেই। রুদ্র খেপে গিয়ে রায়ান কে বলল-

"বাড়তি কথা বলো না ভাইয়া। তোমার বউ যে বাইক চাইলো তার পরিবর্তে চেয়েছি রিমিকে। তোমার তো বউয়ের চাওয়া পুরন না করলে পেটের ভাত হজম হয় না। তার কথা তো বলছো না।"

মাহির রুদ্রর কথায় তাল দিয়ে বলল-

"রাইট, নিজে বউ বউ করবে সব সময় আমরা কিছু করতে চাইলেই দোষ। আমরা তো শুধু ভালো সময় কাটাতে চাইছি। ভবিষ্যতে বিয়েও করবো।"

রায়ান মাহিরের দিকে এগিয়ে গিয়ে বলল-

"তোর কাছে আমি আমার শালির বিয়ে দেবই না। করবি কিভাবে?"

মাহিরও রায়ানের দিকে এগিয়ে বলল-

"তুই তোর বউকে কিভাবে বিয়ে করেছিস ওই ভাবেই করবো প্রয়োজনে।"

রায়ান মাহিরের মধ্যে এই নিয়ে বন্ধু বন্ধু এক প্রকার খুনসুটি ময় ঝগড়া মারামারি লাগলে একজন অন্য জনেরউপর চোড়ে যায়। রুদ্র ওদের থামাতে গিয়ে ওদের মাঝে পড়ে যায়। বিছানায় উপর তিনজন ছেলে মানুষ যুদ্ধ করছে বলা চলে। এমন সময় হঠাৎ মিরায়া, রিমি, সোরায়া দরজা খুলে ঘরে ঢুকে যায়।

-"সূর্য ডুবে যাচ্ছে বের হতে হবে না নাকি? কোথায় মরে গেছেন আপনারা?"

রায়ান রুদ্র মাহির একসাথে দরজার দিকে তাকালো। মিরায়া রিমি আর সোরায়া হা হয়ে আছে তাদের চোখের সামনের দৃশ্য দেখে। তিনজন ছেলে খালি গায়ে বিছানায় একজন আরেকজনের উপরে এমন ভাবে অবস্থান করছে, যে কেউ দেখলে এই দৃশ্যটা অত্যন্ত দৃষ্টি কটু ও লজ্জাজনক লাগবে। মেয়েগুলোর মুখ হা হয়ে আছে, স্তব্ধতার বিচরণ সম্পূর্ণ ঘরে। রায়ান রুদ্র আর মাহির নিজেদের অবস্থান দেখে সাথে সাথে হড়বড়িয়ে বিছানার কম্বল নিজেদের উপরে নিয়ে নিলো খালি গা ঢাকতে। মেয়েরা একই সাথে নিজেদের চোখ দুই হাতে আড়াল করে নিয়ে বলল-"আসতাগফিরুল্লা ..!"

কিন্তু আবারো আঙুলের ফাঁকা দিয়ে দেখার চেষ্টা চালাচ্ছে। বিছানার উপর খালি গায়ে ছেলেগুলোকে যেমন অদ্ভুত লাগছিল এখন তিন জনকে এক কম্বলের নিচে দেখতে আরো অদ্ভুত লাগছে।

রায়ান নিজেদের দিকে তাকিয়ে কম্বল ফেলে দিয়ে চেঁচিয়ে বলল-

"Just get out of this room.. Nowww.."

মিরায়া চোখ খুলে রায়ানের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সাথে সাথে রিমি আর সোরায়া কে ঘুরিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।

____

প্রায় মিনিট ত্রিশেক পর, তিন জনই রেডি হয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। সবার মুখে একটা চাপা অস্বস্তি। রায়ান সবার চেহারা দেখলো, তার মনে হলো বিষয়টা স্বাভাবিক করা দরকার তাই একবারে সবার উদ্দেশ্যে বলল-

"এতো অস্বস্তির কি আছে? আমাদের ছেলেদের মাঝে মজা ফাজলামো চলতেই থাকে। ভুল সময়ের দূর্ঘটনা ছাড়া এটা আর কিছুই না। অনেক টা রাস্তা যেতে হবে সুতরাং চিল মাইন্ডে রাইড করা দরকার।"

মিরায়া মেয়েদের হয়ে বলল-

"হ্যাঁ সেটাই, বাদ দে তো তোরা ওসব। এতো ভাবার মতো কোনো দৃশ্য ওইটা ছিল না। রাইডের দিকে মন দে।"

এরপর পরিবেশ কিছু টা স্বাভাবিক হলে মিরায়া বাইক গুলো দেখে নিজের পছন্দ মতো একটা বাইকের সামনে গিয়ে বলল-

"আমি এই বাইকটা নিচ্ছি।"

বলেই বাইকের হেলমেট পড়তে থাকলো। রুদ্র মিরায়াকে ওইভাবে দেখে একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো-

"মিরা...না মানে মিরা ভাবি..তুই সিওর তুই রাইড করবি?"

মিরায়া হেলমেট পড়ে নিয়ে বলল-

"কেন রুদ্র ভাইয়া ছেলেরা ছাড়া কেউ বাইক চালাতে পারবে না এমন কি কোথাও লিখা আছে?"

রুদ্র-"না তা কেন হবে আমি তো তা বলি নি..!"

রায়ান রুদ্রর কথার মাঝে বলল-

"রুদ্র তোর ভাবিকে বল মেয়েরাও বাইক চালাতে পারে কিন্তু ছেলেদের সাথে রাইড করা এক কথা নয়।"

রায়ান ইচ্ছে করে মিরায়াকে উস্কে দিতে এভাবে কথা বলল। সে জানে মিরায়া রাইডিং এর ক্ষেত্রে এমন পক্ষপাতীত্ব সহ্য করবে না। আর হলো ও ঠিক তাই।

মিরায়া রায়ানের কথায় এক গাল বাঁকা হেঁসে বিড়বিড় করলো-"অলরেডি, আপনার সাথে জেতা হয়ে গেছে হাবি। বউয়ের ব্যাপারে না জেনে বউকে উস্কানি দিয়ে কি ঠিক করলেন?"

মিরায়া রুদ্র কে পাল্টা উত্তরে বলল-

"রুদ্র ভাইয়া, তোমার ভাইয়াকে বলল আমাকে যেন চ্যালেঞ্জ না করে ফল ভালো হবে না।"

রায়ান নিজের কথায় কাজ হতে দেখে বলল-

"রুদ্র বলে দে তোর ভাবিকে, রায়ান চৌধুরীর এতো খারাপ দিন আসে নি যে মেয়ে মানুষকে চ্যালেঞ্জ করতে হবে।"

রুদ্র ভাইয়া ভাবির মাঝে মেসেজ ট্রান্সফার করার মেশিন হয়ে আছে যার কোনো কাজ নেই। যেখানে মিরায়া রাইড করতে পারে তা নিয়েই দ্বিধা দ্বন্দ্ব সেখানে রাইডিং চ্যালেঞ্জ রুদ্রর মাথার উপর দিয়ে গেল। মিরায়া এবার বেশ ট্রিগার হয়ে গিয়ে রায়ানকে সরাসরি বলল-

"Let's see who wins...I am in, are you?"

রায়ান যেন এটাই চাইছিল। সে অনায়েসেই মিরায়ার প্রস্তাব মেনে নিলো-

"Of course babe, I am always all in for you."

মিরায়া কুটিল হেঁসে রুদ্রর দিকে হাত বাড়িয়ে বলল-

"চাবি..!"

রুদ্র কি হলো মাত্র কিচ্ছু বুঝতে পারলো না। মিরায়ার দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে চাবি দিলো। মাহিরও রায়ানের কাজ কর্ম কিছু বুঝতে না পেরে রায়ানের কানে কানে বলল-

"কি করছিস এটা তুই। ভাবি কেমন লেভেলের রাইডার তুই কি জানিস? ভাবি কি আদতেও রাইড করতে পারে দেখেনে আগে। সবাই রাইডার কুইন রায়া না যে তোকে টেক্কা দেবে।"

রায়ান এক গাল হেসে গর্বিত ভাব নিয়ে মাহির কে বলল-

"সবাই রায়া কেন হবে! তোর ভাবি ই রায়া। একমাত্র ওরই ক্ষমতা আছে রায়ান চৌধুরী কে টেক্কা দেওয়ার।"

মাহির হতবাক -"মানে?"

রায়ান বিরক্তি প্রকাশ করে বলল-

"বসে বসে তোকে সব কথার মানে বোঝাবো ওই বয়স তোর নেই। বুঝলে বুঝ পাতা না বুঝলে তেজ পাতা।"

মাহির রায়ানের কথায় সোজা যা বুঝেছে তাই জিজ্ঞেস করলো -

"মিরায়া রায়া একজনই?"

রায়ান এখনো চোখে গর্বিত ভাব নিয়ে বলল-

"wooow.. ভালোই বুদ্ধি আছে দেখি। নাহ যতটা ভেবেছি অতো বোকাও তুই না।"

-"What...? seriously...!?"

মাহিরের সত্যি টা মানতে কষ্ট হচ্ছিল কিন্তু সে মানতে বাধ্য। রায়ান মিরায়া নিজেদের বাইকে উঠে গেলে রায়ান রুদ্র আর মাহির কে উদ্দেশ্য করে বলল-

"মাহির..তুই বনুকে আর রুদ্র তুই রিমিকে সাবধানে নিয়ে আয়।"

মাহির আর রুদ্র রায়ানের কথায় ভদ্রভাবে মাথা নাড়ালো। রিমি সোরায়া দুইজন অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে রইল তাদের বলার বা করার মতোও কিছু নেই। মিরায়া যেহেতু রায়ানের সাথে এখনো পাল্লা দিয়ে বাইক রাইড করবে তাদের মিরায়ার সাথে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই অগত্যা সোরায়াকে মাহিরের আর রিমিকে রুদ্রর সাথেই যেতে হবে। বাগান বাড়ি থেকে দুটো বাইক ঝড়ের গতিতে বের হলো আগে পিছনে ধুলো উড়িয়ে- একটা রায়ানের আর একটা মিরায়ার। মিরায়ার বাইক রাইডিং রুদ্র মাহির আর রিমির জন্য অন্য রকম চমকপ্রদ ছিল।

রুদ্র মাহির নিজেদের হেলমেট পড়ে নিয়ে এক্সট্রা হেলমেট হাতে নিয়ে সোরায়া আর রিমির সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। মাহির সোরায়াকে আর রুদ্র রিমিকে হেলমেট পড়িয়ে দিয়ে নিজেদের বাইকে গিয়ে বসলো। রিমি আর সোরায়া ঠায় দাঁড়িয়ে আছে কেউ বাইকে গিয়ে বসছে না। মাহির সোরায়াকে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বিরক্ত হয়ে বাইক থেকে নামতে নামতে বিড়বিড় করলো-

"বেডি জাত এতো ত্যারা তাও বেডা জাত এদের উপরেই মরে! সব হরমোনের উত্তেজনা.."

মাহির খটমট করে হেঁটে সোরায়ার কাছে গিয়ে পিছন ফিরে সোরায়াকে পিঠে তুলে নিলো এক ঝটকায়। সোরায়ার মুহূর্তের মধ্যে কিছু বোঝার আগেই হড়বড়িয়ে গিয়ে মাহিরের গলা জড়িয়ে ধরলে দুইজনের হেলমেটে হেলমেটে বাড়ি লাগলো।

-"আউউউ্...!"

-"লাগলো..?"

-"উহু...নিচে নামান আমাকে। এতো কষ্ট করতে হবে না আপনার। আমার পা আছে, পিঠে তুললেন কেন?"

মাহির সোরায়ার কথা না শুনে ওভাবেই সামনে এগিয়ে গিয়ে বাইকে উঠতে নিলে সোরায়ার পা ছেড়ে দেওয়ার পর খেয়াল করলো সোরায়া পা ঝুলিয়ে রেখেছে জেদ ধরে এমন হলে বাইকে উঠা সম্ভব না বলে মাহির গম্ভীরভাবে বলল-

"lock your legs now if don't want me to cross the line."

সোরায়া মাহিরের হুমকিতে ভয় পেয়ে তাড়াতাড়ি পা মাহিরের কোমরের চারপাশে পেঁচিয়ে নিলো। মাহির বাইকে উঠে সোরায়া কে সিটের উপর বসিয়ে দিয়ে সোরায়ার হাত নিজের গলা থেকে নামিয়ে বুকের কাছে এনে রাখতে রাখতে বলল-

"আপনার যে পা আছে তা আমি জানি মেডাম। তবে সেটা একটু আগে কাজ করছিল দেখে আমাকে এই কষ্ট টুকু করতে হলো।"

সোরায়া মাহিরের বুকের উপর থেকে হাত সরিয়ে নিয়ে সোজা হয়ে বসতে চাইলে মাহির সোরায়ার হাত শক্ত করে আঁকড়ে ধরে বলল-

"Keep your hands there.. Don't dare to move.."

সোরায়া জেদ করার আগেই মাহির বাইক স্টার্ট দিলো যার ফলে সোরায়া না চাইতেও পড়ে যাওয়ার ভয়ে মাহির কে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল প্রথম বারের মতো। সোরায়া মুচকি হেঁসে নিজের হাত মাহিরের বুকের উপর রাখলো‌। মাহির হেলমেটের আড়ালে মুচকি হেসে বাইক স্টার্ট দিলো।

মাহির আর সোরায়া যাওয়ার পর রুদ্র বাইকের উপর থেকেই রিমির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো-

"এই যে মেডাম? আপনিও কি এমন কিছু চাইছেন? I won't hold back if I get off the bike now.. Think thoroughly.."

রুদ্র কথাটা বলে বাইক থেকে নামতে নিলে রিমি তাড়াতাড়ি বাইকের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলল-

"এই না না, আমি আসছি, আমি আসছি। আপনার কিছু করতে হবে না।"

-"পায়ে না ব্যাথা? আপনি সিওর?"

-"নেই ব্যাথা, কোনো ব্যাথা নেই। এইতো চলে এসেছি। হিহিহি।"

রিমি ভয়ার্ত হেঁসে তাড়াতাড়ি গিয়ে বাইকের পিছনে বসে পড়লো রুদ্রর কাঁধে হাত রেখে। কিন্তু রুদ্র কিছু একটা নিয়ে অখুশি ছিল তাই বাইক স্টার্ট দিচ্ছিল না। রিমি রুদ্রর দিকে ঝুঁকে প্রশ্ন করলো-

"কি হলো? বাইক স্টার্ট দিন তাড়াতাড়ি। চলুন...!"

রুদ্র মুখ ভার করে বলল-

"কিভাবে চালাবো বাইক! রাইডিং এর ফিল তো পাচ্ছি না। ধুর..!"

রিমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো-

"রাইডিং এর ফিল কিভাবে আসে?"

রুদ্র রিমির হাত নিজের কাধ থেকে নামিয়ে কোমরের দুই দিকে থেকে জড়িয়ে দিয়ে বলল-

"এভাবে আসে রাইডিং এর ফিল। এমন থাকুন।"

রিমির কিছু বলার সুযোগ ছিল না। সেও রুদ্র কে জড়িয়ে ধরে বসলো বাইকের পিছনে মুখে মিষ্টি একটা হাঁসি নিয়ে। রুদ্র ও খুশি মনে বাইক চালানো শুরু করলো।

___________

দুপুর গড়িয়ে বিকেলের দিকে। বান্দরবানের পাহাড়ি রাস্তা তখন রোদ আর ছায়ার খেলায় মত্ত। একদিকে সবুজ পাহাড়, অন্যদিকে গভীর খাদ—মাঝখানে সরু, বাঁকানো রাস্তা।

রায়ান প্রথমেই গতি বাড়াল। একটা বাঁক কেটে সে সামনে চলে এলো। রায়ান হেলমেটের ভেতর থেকে চেঁচিয়ে—

"পিছনে পড়ে গেলে নিজের বউ বলে কিন্তু অভিযোগ মানবো না!"

মিরায়া ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল। গিয়ার নামিয়ে দিল এক ধাক্কায়।

মিরায়া— "দিবাস্বপ্ন কম দেখুন। চট্টগ্রাম আমার শহর, পাহাড় আমাকে চেনে, আপনাকে না! সুতরাং সাবধানে..!"

একটা তীক্ষ্ণ বাঁকে মিরায়া হঠাৎ পাশ দিয়ে স্লিপ করে এগিয়ে গেল। তার বাইকের চাকা থেকে হালকা ধুলো ছিটকে পড়ল রায়ানের জ্যাকেটে। রায়ান মিরায়ার দিকে তাকিয়ে বলল— "Don't break the riding rules."

মিরায়া হাসতে হাসতে বলল— " I have only one rules when I ride.. And that is- not following any riding rules.. So suit your self.."

রায়ান আর এক সেকেন্ডও দেরি করল না। ইঞ্জিনের গর্জন বাড়িয়ে সোজা রাস্তায় সে গতি তুলল। পাহাড়ি বাতাস তার জ্যাকেট ফুলিয়ে দিল। একটা খোলা স্ট্রেচে এসে সে আবার ছাড়িয়ে গেল। রায়ান মনে মনে বিড়বিড় করল—

"আমার হৃদপাখির হৃদয় যেমন আমার, রেসের লিডও তেমনই!"

মিরায়া চোখ কুঁচকে তাকাল। আরেকটা বাঁক, এইটাই সুযোগ। হঠাৎ ব্রেক, শরীর হেলিয়ে নিখুঁত টার্ন। মুহূর্তেই সে আবার সামনে। দুজনের হাসি বাতাসে মিশে গেল। কখনো রায়ান এগিয়ে, কখনো মিরায়া- রাস্তাটা যেন তাদের খুনসুটির সাক্ষী। রোদ্দুর, পাহাড় আর গতি- সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত রোমান্টিক যুদ্ধ। বান্দরবানের পাহাড়ি রাস্তায় তখন দুপুরের রোদ হেলে পড়েছে। গাছের ফাঁক গলে আলো এসে পড়ছে আঁকাবাঁকা রাস্তায়—কখনো ঝলসে দিচ্ছে, কখনো ছায়ায় লুকিয়ে পড়ছে। রায়ান হঠাৎই গতি বাড়াল। ক্লাচ ছেড়ে একটানে বাইক টেনে নিল সামনে। তার বাইকের পেছনের চাকা ঘুরে ধুলো ছিটিয়ে দিল বাতাসে। রায়ান হেলমেটের ভেতর, গলার স্বর ভারী—

"আজ কিন্তু কোনো ছাড় দিচ্ছি না তোমাকে বউ। পাহাড়ি রাস্তা হোক বা তুমি—দুটোই জিতবো।"

মিরায়া গিয়ার নামিয়ে শরীরটা সামনের দিকে ঝুঁকিয়ে দিল।একটা টাইট বাঁক, রায়ান লিন করল গভীরভাবে, বাইক প্রায় রাস্তায় শুয়ে পড়ল। সে এখন এগিয়ে। কিন্তু পরের মুহূর্তেই মিরায়া হঠাৎ ওভারটেক করল—ডান দিক দিয়ে, একেবারে ঝুঁকি নিয়ে। রায়ান চোখ বড় করে তাকাল—

"ওই...পাগল নাকি! এভাবে কাট দিলে কেন? স্লিপ করে যেতো চাকা আর একটু হলেই।"

মিরায়া হাসি চেপে মনে মনে বিড়বিড় করলো—

"ভয় পেলে না প্রেম হয়, আর না জেতা। এতো সিম্পল ফান্ডা না বুঝলে সংসার কিভাবে হবে হাবি!?"

একটা ছোট ঢাল। মিরায়া বাইকটা সামান্য তুলল—হালকা হুইলি করলে তার চুল হাওয়ায় উড়ে গেল। রায়ান দাঁত চেপে হাসল- তার বউটা কে বাইকের উপর যেন অন্য রকম সুন্দর লাগছে তার। চ্যালেঞ্জটা তার রক্তে লেগে গেছে। সে গতি বাড়াল, ব্রেক ছেড়ে ঢালের নিচে নামল- ডাউনহিল স্টান্ট।

বাইক কাঁপল, কিন্তু নিয়ন্ত্রণ একচুলও ছাড়ল না। রায়ান পাশ দিয়ে আবার ছাড়িয়ে গেল।

মিরায়া চোখ সরু করল। মিরায়া নিঃশ্বাস থামিয়ে একের পর এক নিখুঁত টার্ন নিল। শেষ বাঁকে সে আবার সামনে।

রায়ানের বুকের ভেতরটা কেমন মোচড় দিল—রাগ না, উত্তেজনা না, কিছু একটা ব্যথার মতো। এই মেয়েটা তাকে হারাতে পারে—এই সত্যিটাই সবচেয়ে মধুর।

রায়ান গলা নরম হয়ে এলো হঠাৎ, সে মিরায়ার উদ্দেশ্যে বলল— "বউকে বাইক নিয়ে তাড়া করার মধ্যে একটা সুখ আছে। যদিও তুমি বুঝবে না তাও বললাম।"

মিরায়া একটু পেছনে তাকাল, চোখে দুষ্টু আলো—

"বরকে হারানোর মধ্যেও একটা সুখ আছে। যদিও আপনি বুঝবেন না তাও বললাম।"

দুটো বাইক পাশাপাশি ছুটছে এখন। হ্যান্ডেল এত কাছে যে হাত বাড়ালেই ছুঁয়ে ফেলা যায়। রায়ান হঠাৎ হাত ছেড়ে এক হাতেই চালাতে লাগল— "ভয় পাচ্ছেন?"

মিরায়া এক মুহূর্তও দেরি না করে দু’হাত ছেড়ে দিল—"কি বললেন? আবার বলুন তো।"

রায়ান মিরায়ার মাইন্ড ডিস্ট্রিক্ট করতে সাথে সাথে বলল-

"বলছিলাম.. আপনি কি ভয় পাচ্ছেন মিস রায়া..."

রায়ানের মুখে হঠাৎ করে "মিস রায়া" ডাক শুনে মিরায়ার ব্যালেন্স বিগড়ে গেল। মিরায়া হড়বড়িয়ে বাইকের হ্যান্ডেল

ধরে বাইক ব্রেক করলে রায়ান বাইক না থামিয়ে সোজা চলে যেতে যেতে জোরে বলল-

"Be care full, my rider queen... Suit your self babe.."

মিরায়ার চোখ কপালে উঠার উপক্রম। মিরায়াই রায়া এই কথা রায়ান জানলো কি করে তার বোঝার বাইরে। মিরায়া আবার বাইক স্টার্ট দিতে দিতে চেচালো রায়ান উদ্দেশ্যে -

"এই থামুন। কি ডাকলেন আমাকে আপনি। ওইই... আমি বলছি বাইক থামান রায়ান।"

রায়ান তো ওই রাস্তা পার করেছে অনেক আগে। মিরায়া বাইকের স্পিড বাড়িয়ে দিলো রায়ানের কাছে পৌঁছাতে। মিরায়া হঠাৎ একটা বিকট আওয়াজ শুনতে পেলো সামনের পাহাড়ের অপর পাশ থেকে। মিরায়া কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে পাহাড়টা পার করে বাইক থামিয়ে দিলো। তার চোখের সামনের দৃশ্য তার বুকের অন্তঃস্থল অব্দি কাঁপিয়ে তুললো।

রায়ানের বাইকটা খাদের নিচে পড়ে গিয়ে সাথে সাথে ব্লাস্ট করলো। মিরায়া চিৎকার করে উঠলো -

"নাআআআ... রায়ানননন...!"

তার শ্বাস প্রশ্বাসের গতি বাড়ালো। ভিতরে দম যেন আটকে আসছে। মিরায়া চট জলদি বাইক থেকে নেমে দৌড়ে খাদের দিকে গিয়ে নিচে দেখলো। এই সময় এক মুহুর্তের জন্য মিরায়ার মাথা ঘুরিয়ে গেলে সে ধপ করে রাস্তার ধারে বসে পড়লো চোখে অশ্রু কণা ছলছল করছে, হাত পা ঠান্ডা বরফের মতো নিস্তেজ হয়ে কাঁপছে। খাদের নিচে এখনো বাইকের জ্বলন্ত অগ্নি রেখা স্পষ্ট। মিরায়া সেই দিকে এক নজরে তাকিয়ে আছে। হঠাৎ কি মনে করে মিরায়া নিজের চোখের পলক ফেলে অশ্রু কণা দের মুক্তি দিয়ে আমতা আমতা বিড়বিড় করলো -

"না না, আমার রায়ানের কিছু হয় নি। কিছু হয় নি।"

মিরায়া খাদের দিকে ঝুঁকে তাকিয়ে চিৎকার করে ডাকতে লাগলো-

"রায়ান... রায়াননননন... সাড়া দিন। প্লিজ এমন করবেন না আমার সাথে। সাড়া দিন প্লিজ। রায়াননন..!"

রায়ানের সাড়া পাওয়ার আশা পুরোন হলো না মিরায়ার। মিরায়া প্যান্টের পকেটে থেকে ফোন বের করে রুদ্র কে কল করলো। কিন্তু পাহাড়ি এলাকায় নেটওয়ার্কের সমস্যার জন্য ফোন ঢুকছে না কারো ফোনে। মিরায়ার নিজেকে ওই মুহূর্তে বড্ড অসহায় মনে হলো। তার চোখে রায়ানের হাস্যোজ্জ্বল মুখ, প্রতিটা কথা, প্রতিটা কাজ ভেসে উঠতে লাগলো। এরই সাথে মেয়েটা একা রাস্তায় কান্নায় ভেঙে পড়লো। মিরায়া নিঃশব্দে কাঁদে যাচ্ছে হাওমাও করে।

-"নাহ, রায়ান আপনি এমন টা করতে পারেন না আমার সাথে। আমি মানবো না এই বার। আপনি আমাকে বিয়ের সময় বলেছিলেন আমি আপনাকে স্বীকৃতি দিলে আপনি আমাকে ছেড়ে যাবেন না, বিশ্বাস রাখতে বলেছিলেন আপনার উপর। আমি তো করেছিলাম বিশ্বাস আপনাকে। সব কিছুর পরও, তাহলে কেন? কেন এখন আমাকে ছেড়ে যাওয়ার পাঁয়তারা করছেন আপনি?"

এক পর্যায়ে মেয়েটা আকাশের দিকে তাকিয়ে খোদার কাছে আর্তনাদ শুরু করলো-

"ওওও আল্লাহ, কেননন? কি দোষ করেছি আমি? কেন আমাকে তুমি সব সুখ দিয়ে আবার কেড়ে নাও। আমার বর কেন আমার জন্য শাস্তি পাবে? তুমি আমার উপর নারাজ হলে আমাকে শাস্তি দেও। কিন্তু এভাবে কেন?"

-"আমি মানবো না এখন কথার খেলাপ করলে। রায়ান প্লিজ ফিরে আসুন। আমি সব মেনে নেব। কোনো প্রশ্ন করবো না, কোনো উত্তর চাই না আমার, আমার শুধু আপনাকে চাই, আর কিচ্ছু না। প্লিজজজ এতো বড় শাস্তি দেবেন না। আপনার হৃদপাখি আপনার সব কথা শুনবে, কখনো কিচ্ছু নিয়ে নালিশ করবে না, ফিরে আসুন প্লিজ। আমি বাঁচব না আপনাকে ছাড়া। আমি সব সহ্য করে নেব, আপনি যা বলবেন তাই শুনবো। প্লিজ আমার থেকে দূরে যাবেন না।"

মেয়েটার গলা ভেঙে এসেছে কাঁদতে কাঁদতে। চোখের পানির থামার নাম নেই।

-"এই... কেন আসছেন না আপনি। বললাম তো আমি আর আপনার সাথে জেদ করবো না। আপনার অনুপস্থিতি আমার জীবনের অন্ধকার হয়ে ছিল এতো দিন আমি ওই জীবন চাই না। আমি আপনার সাথে সুন্দর স্বাভাবিক একটা জীবন চাই। সংসার করতে চাই, আমার এখনো সংসার করা হয়নি আপনার সাথে। এসব কিছুর দাবি আছে আমার। আপনি আমাকে নিজের জীবন হিসেবে কবুল করে আমাকে মাঝে পথে এভাবে ছেড়ে যেতে পারেন না।। কোনো অধিকার নেই আপনার।"

মিরায়া নিজের মাথায় হাত দিয়ে লুটিয়ে পড়লো রাস্তায়। কাঁদতে কাঁদতে হাঁপিয়ে উঠেছে মেয়েটা। মিরায়া ওই অবস্থাতেই মাহির আর রুদ্রর নাম্বারে কল করার চেষ্টা করে যাচ্ছে কিন্তু কল ই ঢুকছে না।

_________

মাহির আপন মনে বাইক চালাচ্ছে তার ঠিক পেছনেই রুদ্রর বাইক। সোরায়া মাহির কে একই ভাবে জড়িয়ে ধরে বসে আছে। সোরায়া মাহির দুইজনেই রাইড খুবই উপভোগ করছে। মাহির বাইকের আয়না ঠিক করে নিলো নিজের অনুযায়ী যেন সোরায়াকে পিছন থেকে দেখা যায়। সোরায়া সেটা খেয়ালও করলো। মাহির আয়নায় নজর রেখে প্রশ্ন করলো-

"সোরা...তোমার বাইক রাইড কেমন লাগে?"

সোরায়া উৎসাহ নিয়ে বলল-

"অনেককক ভালো লাগে। আপু যখন থেকে রাইড করে তখন থেকে আপুর সাথে সাথে আমি রাইডে যেতাম। কিন্তু কখনো চালাতে ইচ্ছা করেনি। আমি ঘুরতেই পছন্দ করি।"

মাহির হেঁসে বলল-"আমার মতো কারো সাথে গোটা জীবন এভাবে রাইড করার সুযোগ পেলে কেমন হবে ভেবে দেখেছ?"

সোরায়া স্বাভাবিকভাবে বলল-"যা হবে না তা আমি ভাবি না। আপনিও ভাবা বাদ দিন।"

মাহির একটু বিরক্ত হয়ে বলল-"আমাকে মানতে সমস্যা কোথায় তোমার?"

সোরায়া আসল কারণ টাই নির্দ্বিধায় বলল- "আপনি আমার টিচার।"

মাহির আয়নায় সোরায়ার দিকে তাকিয়ে বলল--"আমি এই চাকরিই ছেড়ে দেবো। আমার বিজনেস আছে। টাকার অভাব বা দরকার কোনোটাই নেই। আর কিছু?"

সোরায়া মজার ছলে মনের মধ্যে একটা উদ্ভট কারণ বানিয়ে বলল-

"আপনি অনেক লম্বা, আমার ঘাড়ে ব্যথা করবে আপনাকে দেখতে গিয়ে।"

মাহির এই কারণটা শুনেও বেশ সিরিয়াসলি উত্তর করলো-

"তাতে কি আমি ঝুঁকে যাবো প্রয়োজনে।"

সোরায়া ঠোঁট কামড়ে মিটিমিটি হাসছে হেলমেটের ভিতরে। সে আরো একটু বাজিয়ে দেখতে বয়সের কথা তুলল-

"তা ছাড়াও, আমি আপনার থেকে অনেক ছোট।"

মাহির জানে এটাও একটা কারণ হতে পারে তবে বয়সের উপর কারো হাত তো নেই। তাই মনে যা এলো তাই বলল-

"আমি সামলে নেবো ছোট্ট তুমিকে।"

সোরায়া ভেতরে ভেতরে মাহির উত্তর গুলো যে আরো মন হারাচ্ছে। সে নিজের সম্পর্কে একটু বাজে দিক তুলে ধরলো এই আশায় হয়তো মাহির একটু সংকচে পড়বে-

-"আমি বাচ্চামিতে সেরা।"

কিন্তু না, মাহির সোরায়ার এই কথা বলার ঠিক প্রো মুহূর্তে বলল-

"আমি যদি আরো প্রশ্রয় দেই তাহলে হবে না?"

সোরায়া চুপ হয়ে গেল। মাহির হঠাৎ সোরায়াকে চুপ দেখে সোরায়াকে ডাকলো-

"এই...কিছু বলছো না কেন? আর কি সমস্যা আছে বলো..।"

সোরায়া চমকে উঠে মাথা না সূচক নেড়ে বলল- "আর কিছু নেই । এগুলোই।"

মাহির হেঁসে বলল-"এগুলোই? তার মানে তোমার কোনো সমস্যা নেই!"

সোরায়া ভাব নিয়ে বলল-"আমি তা কখন বললাম!?"

-"তোমার ব্যক্তিগত কোনো সমস্যা আছে তা তো বলোও নি। সুতরাং, তোমার উত্তর তো হ্যাঁ ই দাঁড়ালো।"

-"কিসের উত্তর?"

মাহির আরো কিছু বলতে যাবে তার আগেই হঠাৎ তার ফোন বেজে উঠলো। অনেক চেষ্টার পর মিরায়ার কল মাহিরের নাম্বারে ঢুকেছে। কল রিং হতে শুনেই মিরায়া উঠে বসলো চোখ মুছে। মাহির সোরায়াকে বলল ফোন পকেট থেকে বের করে তার হেলমেট এর ভেতরে ঢুকিয়ে দিতে, সোরায়াও তাই করলো।

-"হ্যালো!"

-"হ্যা..লো মা..মাহির ভাই। রা...য়ান.. রায়ানের বাইক খাদে প..পড়ে গেছে! আপনি প্লিজ তাড়াতাড়ি আসুন।"

-"জি ভাবি? কি বলছেন.. শোনা যাচ্ছে না। আবার বলুন।"

-"রা...য়ান.. রায়ানের বাইক খাদে প..পড়ে গেছে! আপনি প্লিজ তাড়াতাড়ি আসুন। প্লিজ।"

মিরায়ার আধো আধো কথা মাহির কানে পৌঁছেতেই মাহির মিরায়ার আওয়াজ শুনেই বুঝতে পারলো কিছু খারাপ হয়েছে হয়তো। মাহির রুদ্র কে বলল বাইক জোরে চালাতে। মাহির বাইকের স্পিড বাড়িয়ে নিলো।

__________

কয়েক মিনিট পরেই মাহির রুদ্ররা মিরায়ার লোকেশনে পৌঁছায়। মিরায়াকে খাদের ধারে বসে থাকতে দেখে সবাই দৌড়ে মিরায়ার কাছে এলো। মিরায়া তখনও অঝড়ে কেঁদে যাচ্ছে। রিমি সোরায়া গিয়ে মিরায়াকে সাথে সাথে জড়িয়ে ধরলো।

-"কি হয়েছে মিরা? এখানে এভাবে বসে আছিস কেন?"

-"আপু, কাঁদছো কেন? কি হয়েছে?"

-"ভাবি বলুন কি হয়েছে.. আর রায়ান কোথায়?"

মিরায়া ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে তার কাঁপা কাঁপা হাত উঁচু করে খাদের দিকে ইঙ্গিত করল। সবাই খাদের দিকে তাকিয়ে দেখলো নিচে কিছু একটা যে আগুন জ্বালছে দাও দাও করে। একটু ভালো করে খেয়াল করলে বোঝা গেলো ওইটা একটা বাইক। মাহির আতংকিত কণ্ঠে মিরায়াকে জিজ্ঞেস করলো-

"মানে কি এসবের ভাবি? রায়ান কোথায়? বাইক খাদে পড়লো কিভাবে? রায়ান কোথায় যদি বাইক খাদে পড়ে গিয়ে থাকে।"

মিরায়ার কান্নার গতি বাড়তেই রুদ্র আচমকাই বলে উঠলো-

"ভাইয়া...!"

মাহির রুদ্র দিকে তাকালো। রুদ্রর চোখ রাস্তার অপর দিকে ছিল। মাহির রুদ্রর দৃষ্টি অনুসরণ করে ওই দিকে তাকিয়ে দেখলো রায়ান পাহাড়ের গায়ে হেলান দিয়ে বসে মিটিমিটি হাসছে। রুদ্র আর মাহিরের নজর নিজের দিকে দেখে একটু বিরক্ত হয়েই বিড়বিড় করলো-

"ধেত্তিরিকি..এই হারামি গুলোর জন্য বউয়ের মনের কথা গুলো আর শোনা হবে না।"

রুদ্র মাহির একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। মাহির রুদ্রর কাঁধে হাত দিয়ে বলল-

"আমাকে সামলে নে রুদ্র, তোর ভাইকে আমি মেরে ফেলতে পারি যেকোনো সময়।"

মিরায়া এখনো রায়ান কে খেয়াল করে নি। সে লাগাতার কেঁদে যাচ্ছে। রুদ্র মিরায়ার দিকে একবার তাকিয়ে দেখে মাহির কে বলল-

"তুমি কি করবে আমারই তো সহ্য হচ্ছে না। আমার বোনটা এভাবে তার জন্য কাঁদছে আর সে মজা দেখছে বসে বসে।"

ঘটনাটা ঠিক এমন ছিল~

পাহাড়ি রাস্তায় ছোট ছোট পাথর থাকে এমন একটা পাথরেই রায়ানের বাইকের চাকা লেগে গেছিল। যেহেতু অনেক স্পিডে বাইক চলছিল তাই রায়ান বাইক থেকে ছিটকে পাহাড়ের দিকে পড়ে যায় আর বাইক অপর দিকে খাদে পড়ে যায়। পাহাড়ে মাথা লাগার কারণে হালকা কেটেও গেছে কপাল রায়ানের তবে গুরুতর কিছু নয়। এতোক্ষণ শুধু মিরায়ার তার প্রতি ভালোবাসা দেখার জন্যই কিছু বলে নি।

রুদ্র মাথা নামিয়ে নিয়ে মিরায়াকে বলল-

"কান্না থামা তুই বোকা কোথাকার। ওই যে তোর প্রাণের স্বামী, চেয়ে দেখ।"

রায়ান বাঁকা হাসলো। মিরায়া ভেজা চোখে পিছন ফিরে রায়ান কে দেখলো। হঠাৎ তার দেহে যেন প্রাণ ফিরলো । মিরায়া উঠে দৌড়ে গিয়ে রায়ান কে জড়িয়ে ধরলো। রায়ান সম্পূর্ণ হতভম্ব - সে ভেবেছিল মিরায়া রাগ করবে কিন্তু হলো উল্টো। প্রিয় মানুষের অনুপস্থিত চিন্তা করলেও মানুষ ভেঙে পরে আর এইখানে তো মিরায়া বাইক ক্র্যাশ দেখেছে চোখের সামনে। মিরায়া রায়ানকে নিজের সর্ব শক্তি দিয়ে জড়িয়ে ধরেছে। পর মুহূর্তেই আবার আলাদা হয়ে রায়ানের হাত পা শরীরে চোখ বুলিয়ে দেখলো তার লেগেছে কি না। রায়ান মিরায়ার কর্ম কান্ড দেখছে অপলক দৃষ্টিতে।

মিরায়া পাগলের মতো কাদতে কাদতে জিজ্ঞেস করলো-

"কোথায় লেগেছে? বলুন আমায় কোথায় লেগেছে আপনার?"

মিরায়ার চোখ পরলো রায়ানের কেটে যাওয়া কপালের দিকে। মিরায়া সাথে সাথে আঙুল ছোয়ালো সেখানে। রায়ান মৃদু আর্তনাদ করলো- "আউউ...!"

মিরায়া রায়ান কে আবারো জড়িয়ে ধরে চিন্তিত গলায় জিজ্ঞেস করল- "অনেক ব্যাথা করছে?"

রায়ান হালকা হেঁসে জবাব দিল- "যদি অনেক ব্যাথা হয় তাহলে কি এভাবে জড়িয়ে ধরে থাকবে?"

মিরায়া রায়ানের গলায় মুখ গুজে দিয়ে মাথা হ্যাঁ সূচক নাড়াতেই রায়ান নাটকীয় ভাবে বলল-"আআহহহ্! অনেক ব্যাথা করছে। শক্ত করে জড়িয়ে ধরো।"

রায়ান মিরায়াকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরলো মিরায়ার শরীরে হাড় ভেঙে যাওয়ার উপক্রম তবুও মিরায়া কিছু বলল না। হঠাৎ মিরায়া রায়ান গলা ছেড়ে মুখ উঁচু করে রায়ানের সম্পূর্ণ মুখে ঠোঁট ছুঁইয়ে আদর করতে থাকলো। রায়ান মুচকি হেঁসে তার প্রিয়তমার এমন অতর্কিত হামলা মেনে নিলো। মিরায়া রায়ানের কপালে, গালে, নাকে, গলায় সব জায়গায় চুমু খেলো বারংবার। রায়ানের নিঃশ্বাস হঠাৎ ভারী হয়ে এলো। রায়ান মিরায়া কে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে নিজের কাছে টেনে নিলো। রায়ান তৎক্ষণাৎ মিরায়ার ঠোঁটে ঠোঁট ছোঁয়াতে চাইলে মিরায়া রায়ান কে বাঁধা দেয়। রায়ানের মুখ সাথে সাথে ভার হয়ে গেলে মিরায়া আমতা আমতা করে কাঁদো কাঁদো মুখে বলল-

"সবাই আছে।"

রায়ান মাহির রুদ্রর উদ্দেশ্যে করে আকুতি ময় গলায় বলল-

"আল্লাহর দোহায় লাগে, এখন অন্তত যা। তোদের কাছে তো তোদের গুলো আছে। আবার কি?"

রিমি সোরায়া এমনিতেই অস্বস্তির চূড়ান্ত পর্যায়ে ছিল। মাহির আর রুদ্র সোরায়ার রিমির চোখ নিজেদের হাত দিয়ে ঢেকে দিয়ে অন্য দিকে ঘুরিয়ে দিয়ে বলল-

"You guys Carry on."

রায়ান দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে এবার মিরায়ার দিকে তাকিয়ে বলল-

"Are we fine now?"

মিরায়া লজ্জায় কিছু বলতে পারলো না। তবে আর মনে আজ কোনো দ্বিধা নেই। সম্মতি স্বরূপ স্নিগ্ধতায় নিজের চক্ষু জোড়া বন্ধ করলো সে। রায়ান বুঝতে পারলো সেই ইশারা। তার পর? তারপর আর কি... এই সন্ধিক্ষণে প্রথমবারের মতো উভয়ের সম্মতিতে মিলিত হলো দুটি মানুষের ওষ্ঠদ্বয় হয়তো তাদের হৃদয় রূপে।

চলবে..

কেমন হয়েছে বলো। খাপ ছাড়া লাগলে ক্ষমা কইরো। আমি চেষ্টা করেছি🥹Love you pakhis ❤️ 😘

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৫৪তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন