ফন্ট সাইজ:
থিম:
আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ

৫৭তম পর্ব

লেখক: অরাত্রিকা রহমান

#আত্মার_অঙ্গীকারে_অভিমোহ (18+) #Soul_bound_obsession

#Oratrika_Rahman_অরাত্রিকা_রহমান

#Part_57 (1st)

(কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ)

(প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য উন্মুক্ত)

বিকেল থেকে সন্ধ্যা হয়ে গেছে মিরায়া এর মাঝে আর ঘর থেকে বেরই হয়নি লজ্জায় আর রায়ান তাকে জোর ও করে নি। একে তো ঠিক মতো হাঁটতেই পারছে না তার উপর সবার সামনে গেলে হাজারো প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে। এইদিকে রিমি সোরায়া অনেকবার মিরায়ার সাথে দেখা করার চেষ্টা করেছে কিন্তু রুদ্র আর মাহির এর জন্য বিভিন্ন কারণে আর দেখা করা হয়ে উঠে নি।

আজ পাহাড়ে ঘোরাঘুরির শেষ দিন, তাই সোরায়া ছোট হিসেবে একটু মজা করতে চাইছিল। সোরায়া তার ছোট্ট আবদারটা মাহিরের কাছে রাখলে মাহির ও এক কথায় সম্মতি দেয় তার ছোট্ট প্রিয়সীর কথায়। তারপর সন্ধ্যায় কটেজে বারবিকিউ এর আয়োজন করা হয়। রিমি আর সোরায়া চিকেন ম্যারিনেশন করে রেডি করে রেখেছে রুদ্র আর মাহির ও ছাদে সুন্দর করে বসার আয়োজন করেছে সাথে গ্রিল করার জন্য আগুনের ব্যবস্থা ও করেছে। রায়ান নিজের ল্যাপটপে ব্যস্ত, বেচারা জ্ঞান ফেরার পর থেকে চার দিক থেকে কাজের চাপে জর্জরিত হয়ে পড়েছে। সাইটের কাজ সম্পূর্ণ হতে আর খুব একটা সময় লাগবে না তাই শেষের দিকের কাজগুলো গুছিয়ে নিতে রায়ান একটু ব্যস্ত।

সব ঠিক মতো গোছানো হয়ে গেলে সোরায়া রায়ানের কাছে গিয়ে তার সামনে দাঁড়িয়ে কোমরে হাত দিয়ে উৎকণ্ঠিত হয়ে জিজ্ঞেস করলো-

"ভাইয়া ল্যাপটপ টা কি রাখবে তুমি? ঢাকা যাওয়ার পর তো কাজ আর কাজই করবে, এখন অন্তত এই সময়টা উপভোগ করো। আর সকাল থেকে আপুর দেখা নেই। আমার আপু কে তোমার কাছে বিয়ে দিয়ে কি পর করে দিয়েছি নাকি? তার দেখা ও কি মিলবে না এখন?"

রায়ান কি বলবে না বুঝে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মাহিরের দিকে তাকিয়ে ইশারায় কিছু বলল। মাহির সোরায়ার কথায় মুচকি হেঁসে রায়ানের ইশারা খেয়াল করল। কিন্তু এইবার নিজের প্রিয়সীর তালেই তাল মিলালো-

"তাই তো রায়ান, আমরা ভাবিকে এখন আমাদের মাঝে চাই। ভালোয় ভালোয় নিয়ে আয় নাহলে রিমি আর সোরায়াই গিয়ে নিয়ে আসবে।"

সোরায়া আর রিমি চেঁচিয়ে উঠলো-

"অবশ্যই।"

রিমি উল্টো বারিয়ে বলল-

"বনু চল, তুই আর আমিই যাই। ভাইয়া যেহেতু কাজ করছেন বিরক্ত না করাই ভালো।"

-"ঠিক আছে চলো রিমি আপু। ভাইয়া তুমি কাজ করো। আমরাই যাচ্ছি।"

সোরায়া আর রিমি মিরায়াকে আনতে নিচে যেতে উদ্যত হতেই

রায়ান চট জলদি ল্যাপটপ বন্ধ করে ধপকরে দাঁড়িয়ে গেলো-

"ওই Wait, wait, wait, wait...!"

রিমি সোরায়া দাঁড়িয়ে গেলে রায়ান মাহিরের দিকে বিরক্ত মুখে তাকিয়ে বিড়বিড় করলো-

"এক মাঘে শীত যায় না। সময় আমারও আসবে তখন দেখবো কি করিস তুই।"

মাহির কোনো পাত্তা না দিয়ে নিজের মতো ব্যস্ত হয়ে পড়লে রায়ান রিমি আর সোরায়া কে পিছনে ফেলে নিচে নামতে নামতে বলল-

"তোরা থাক এখানেই। আমার বউ কে আমিই আনতে যাচ্ছি।"

সোরায়া আর রিমি রায়ান আচরণে মুখ টিপে হেঁসে আবারো নিজের জায়গায় গিয়ে বসলো।

----

মিরায়া মুখ ভার করে জানালা দিয়ে তাকিয়ে আকাশ দেখছে। শরীরের ব্যাথা কমেছে অনেকটা কিন্তু কিছু একটা নিয়ে মন মেজাজ ভালো নেই, হয়তো সকাল থেকে কারো মুখমুখি হয় নি বা কথা বলে নি এই জন্য। রায়ান দরজা খুলে ঘরে ঢুকলে মিরায়া একনজর রায়ানের দিকে তাকিয়ে আবার জানালার বাইরে মন দিয়ে জিজ্ঞেস করলো-

"ঘরে এলেন যে? বাইরে কি হচ্ছে?"

রায়ান ধীর পায়ে মিরায়ার কাছে এসে বলল-

"দেখবে চলো কি হচ্ছে বাইরে। আমার চোখ দিয়ে তো আর তুমি দেখতে পাবে না।"

মিরায়া অশ্রু সিক্ত চোখে রায়ানের দিকে তাকালো কিন্তু কিছু বলল না যেন তার পরিস্থিতির জন্য অভিযোগ জানাচ্ছে। রায়ান মিরায়ার চোখের কথা ভালোই বুঝতে পারলো। কিন্তু তার কিছু করার নেই। দীর্ঘশ্বাস ফেলে মিরায়াকে কোলে তুলে নিতে চাইলে মিরায়া গম্ভীর কন্ঠে বলল-

"খবরদার কোলে তোলার চেষ্টা করবেন না।"

রায়ান থেমে গিয়ে সোজা হয়ে বলল-

"সোরা আর রিমি আসতে চেয়েছিল তোমাকে নিয়ে যেতে। আমি আটকেছি। এখন যদি আমার সাথে না যাও ওরা নিতে আসবে। আমার মনে হয় না সেটা তোমার খুব একটা পছন্দ হবে বলে।"

মিরায়া রায়ানের কথার প্রেক্ষিতে বলল-

"আপনি যান আমি আসছি।"

রায়ান বুকে আড়াআড়ি ভাবে হাত বেঁধে কোমল সুরে বলল-

"আচ্ছা, যাচ্ছি। তবে তুমি আগে হাটো। তোমার পিছু পিছু আসছি।"

মিরায়া তর্ক করতে চাইলো না। চুপচাপ দরজার দিকে এক পা দুটা আগাতেই পা কেমন কেঁপে কেঁপে উঠছে। তাও চেষ্টা করছে স্বাভাবিক ভাবেই হাঁটতে। রায়ান মিরায়াকে নিজের উপর এমন শক্ত হতে দেখে দাঁতে দাঁত চেপে তার সামনে গিয়ে হুট করে কোলে তুলে নিয়ে বলল-

"Ok fine my little headache, I admit you can walk... But you know what- I can't let you walk.. That's the problem..."

মিরায়া কাঁদো কাঁদো মুখ করে রায়ানের গলা জড়িয়ে ধরলো। রায়ানের কথায় মুখ বাঁকিয়ে বলল-

"আমি আপনার কোলে উঠে যাবো না বাইরে। সবাই কি ভাববে?"

রায়ান কোনো কথা না শুনে দরজার পার করে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে উঠতে বলল-

"এভাবে দেখলে যা ভাববে, তোমাকে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটতে দেখলে তার চেয়ে আরো বেশি কিছু ভাববে। শুধু শুধু সবার সামনে নিজের বর কে বদনাম করার ইচ্ছে প্রকাশ করো না বউ।"

মিরায়া মুখ বাঁকিয়ে রায়ানের থেকে চোখ সরিয়ে বিড়বিড় করলো-

"অপকর্ম করে বদনামের ভয় করা আপনার মতো নির্লজ্জ লোকের মানায় না।"

-"আমি শুনতে পেয়েছি হৃদপাখি...!"

-"আমি শোনানোর জন্যই বলেছি হাবি...!"

-"That's more like my lady.."

রায়ান ঠোঁট কামড়ে হেঁসে ছাদে উঠে গেলো।

___

ছাদে সবার মাঝে রায়ান মিরায়াকে কোলে নিয়ে প্রবেশ করতেই সকলে হাততালি দিয়ে উঠলো। মিরায়া লজ্জায় রায়ানের গলায় মুখ গুজে লুকিয়ে রাখলো নিজেকে। রায়ান মিরায়াকে নিয়ে গিয়ে সোজা ছাদে বিছানো ম্যাট্রেস এ বসে একটা কম্ফোরটারে নিজেদের মুড়িয়ে নেয়। সোরায়া মিরায়াকে সারাদিন পরে দেখে চিন্তিত গলায় জিজ্ঞেস করলো-

"আপু, তুমি ঠিক আছো তো? শরীর ঠিক আছে? জ্বর এসেছে তোমার?"

মিরায়া হালকা হেঁসে বলল-"ঠিক আছি। লম্বা জার্নির পর একটু খারাপ লাগছিল তাই ঘুমিয়েছি একটু।"

তারপর আর কেউ কোনো প্রশ্ন করেনি। সবাই চিকেন বারবিকিউ করছে, মিরায়াও আগুনের কাছে যেতে চেয়েছিল কিন্তু রায়ান ওকে যেতে দিচ্ছিল না। কিন্তু মিরায়া জেদ দেখিয়ে বারবিকিউ গ্রিল করতে চাইলো। যেই না সে রায়ানের হাতের বাঁধন ছেড়ে উঠতে যাবে তখনই উরুর মাঝে ব্যাথার অনুভূতিতে আবার নিজ জায়গায় বসে পরলো মেয়েটা। রায়ান মিরায়ার এই অবস্থা দেখে করুণা করে একটু বাঁকা হেঁসে বলল-

"কি হলো বেইবি? উঠতে পারছো না বুঝি?"

মিরায়া বাঁকা চোখে বিরক্তি সহ রায়ানের দিকে তাকাতেই রায়ান নিজের দুই হাত দুই দিকে উঁচু করে তুলে ধরে নিরপরাধ ঠাওর করালো নিজেকে। মিরায়া আবার সামনের দিকে তাকাতেই রায়ান মিরায়া কে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে কানের লতিতে চুমু দিয়ে বলল-

"কালকের পর তোমার হাঁটতে কষ্ট হওয়ার ব্যাপারটা এতো সুন্দর কেন লাগছে, আমাকে বলতে পারে হৃদপাখি?"

মিরায়া রায়ানের ঠোঁটের থেকে একটু মাথা কাত করে নিয়ে বলল-

"আপনি একটা অসভ্য তো, তাই আপনার কাছে সুন্দর লাগছে ব্যাপারে টা।"

রায়ান ঠোঁট কামড়ে হাসলো। এরপর সবাই গল্প করতে করতে বারবিকিউ করে খাচ্ছিল। হঠাৎই সোরায়া রুদ্র কে গান গাইতে জোর করলে রুদ্র নিজের গিটার টা নিয়ে এলে একটা ভালো গানের আড্ডা জমে উঠলো। মাঝে মাঝে রায়ান মিরায়া ও গাইছে আবার মাহির সোরায়া ও গুনগুন করছে। সোরায়া মাহির পাশাপাশি বসেছিল‌। এমন সময় হঠাৎ সোরায়া নিজের হাতের উপর কিছু একটার ছোঁয়া অনুভব করতেই দেখলো মাহির নিজের অনামিকা আঙুল দিয়ে রেখেছে সোরায়ার হাতে। মেয়েটা মুচকি হেসে নিজের হাতের উপর চাদর ফেলে দিলো যেন কারো নজরে না পড়ে এই দৃশ্যটা। কিন্তু এতে মাহিরের প্রেমীক মনের যেন অবনতি হলো। মাহির হঠাৎ করেই সোরায়ার হাত ধরে ফেলল শক্ত করে। কম সময়ে ঘটনাটা হয়েছে বলে সোরায়া ও অবাক হয়ে সাথে সাথে চোখ বড় বড় করে শিরদাঁড়া সোজা করে বসে মাহিরের দিকে প্রশ্ন সূচক দৃষ্টিতে তাকালো। কিন্তু মাহির তার দিকে তাকিয়ে নেই বরং দিব্বি মেয়েটার নরম হাত নিজের আয়ত্তে রেখে গান বাজনা উপভোগ করছে। সোরায়া মাহিরের থেকে হাত ছাড়াতে চেষ্টা করলে মাহির উল্টো আঙুলের ভাঁজে আঙ্গুল ঢুকিয়ে বন্ধন টা আরো শক্ত করে নেয়। এই দিকে সোরায়া সবার দৃষ্টি যাচাই করছে কেউ তাদের দেখছে কিনা। মাহির নিজের হাতের বাঁধন আরো শক্ত করলে সোরায়া লজ্জায় মিটিমিটি হাসতে শুরু করে। হঠাৎ রিমি সোরায়ার দিকে একটা চিকেন এর পিস এগিয়ে দিলো।

-"বনু, এটা তুই খা‌। তোর লেগ পিস।"

কিন্তু সোরায়া কিভাবে নেবে সেটা- ডান হাত তো মাহির এর হাতে‌। বেচারি বোকা বনে গেলো পুরো। এই দিকে মাহির নিজে থেকেও মেয়েটার হাত ছাড়ছে না। মাহির রিমির থেকে লেগ পিস টা নিয়ে সোরায়ার মুখের কাছে ধরে জিজ্ঞেস করলো-

"খাবে..?"

সোরায়া মাহিরের দিকে তাকিয়ে বলল-"উঁহু...!"

মাহির কথা শুনলো না উল্টো জোর করলো-

"আআআ করো।"

সোরায়া হা করলে মাহির সোরায়াকে খাইয়ে দেয় চিকেন টা।

রিমি সবাইকে চিকেন দিয়ে রুদ্র আর নিজের টা নিয়ে গিয়ে রুদ্রর দিকে তাকিয়ে বলল-

"রুদ্র নিন, এটা আপনার।"

রিমি রুদ্রর দিকে তাকাতেই খেয়াল করলো রুদ্র তার দিকেই তাকিয়ে আছে। রিমি একটু বিরক্ত হয়ে বলল-

"আমার দিকে এভাবে কেন তাকিয়ে থাকেন? এভাবে দেখলে কি যে করতে ইচ্ছে করে..! উফফফ্...!"

রুদ্র চুরি ধরা পড়েছে এমন ভাবে থতমত খেয়ে হুট করে বলল-

"আমায় অন্ধ করে দাও।"

রিমি অবাক হলো তুমি সম্বোধন শুনে সাথে কথাটাতেও-

"কিহ্...!"

রুদ্র কথা ঘোরাতে চট জলদি গিটারের স্ট্রিং এ টুংটাং সুর তুলে গান ধরলো-

"উড়বো বলে ঝাঁপ দিয়েছি

মরব না কে জানে

এই আমায় দেখে হঠাৎ এমন

চমকে ওঠার মানে ...!

সে তো সবাই জানে...

সবাই জানে অংক কঠিন মিলবে না একটাও

সবাই জানে অংক কঠিন মিলবে না একটাও

আমার তোমায় দেখে আস মেটে না

কোথায় যাবে যাও..!

আমায় অন্ধ করে দাও, আমায় অন্ধ করে দাও।

দৃষ্টি কেড়ে নাও গো আমায় অন্ধ করে দাও..!

আমায় অন্ধ করে দাও, আমায় অন্ধ করে দাও।

দৃষ্টি কেড়ে নাও গো আমায় অন্ধ করে দাও..!"

গানের কলিটা গাইতেই সবাই তালি দিতে শুরু করলে‌ রুদ্র রিমির দিকে ঝুঁকে গিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল-

"আমার আপনাকে দেখে আস মেটে না এখানে আমার কি করার আছে বলুন? চাইলে অন্ধ করে দিতে পারেন।"

রিমি রুদ্রর কথা শুনে না চাইতেও মুচকি হেঁসে দিলো। রুদ্র ও সাথে হেঁসে উঠলো। এভাবেই অনেক টা সময় কেটে গেলে রায়ান খেয়াল করলো ছাদের কুয়াশায় আর ঠান্ডা বাতাসে মিরায়ার শরীর মৃদু কাঁপছে। সে চিন্তিত হয়ে জিজ্ঞেস করলো-

"হৃদপাখি..! তোমার কি খারাপ লাগছে? শরীর কাঁপছে কেন?"

-"না, ওই ঠান্ডা পড়েছে তো তাই।"

-"আচ্ছা নিচে চলো। অনেক হয়েছে আর থাকতে হবে না ছাদে। ঠান্ডা লেগে যাবে।"

মিরায়া সম্মতি দিলে রায়ান সবার উদ্দেশ্যে বলল-

"এই তোরা কি আরো থাকবি এখানে? ঠান্ডা পড়ছে, এখন নিচে যাওয়া দরকার। কাল আবার ঢাকায় যাওয়ার জন্য রওনা দিতে হবে।"

সোরায়া বাচ্চা মেয়ে তাই জেদ ধরলো-

"না না, আরো একটু থাকি না ভাইয়া, প্লিজ।"

রায়ান সোরায়াকে কিছু বলল না কিন্তু মিরায়া শাসন করলো-

"কি আরো থাকবে হ্যাঁ? দেড়মাস এর বেশি হয়েছে পড়াশোনার খবর নেই। ঢাকা যাওয়ার পর পরই যে পরীক্ষায় বসতে হবে সেই খেয়াল আছে?"

সোরায়া পড়ার কথা উঠতেই মুখ ভার করে নিলে মাহির সোরায়াকে দেখে ঠোঁট কামড়ে হেঁসে মিরায়াকে বলল-

"সেটা নিয়ে ভাববেন না ভাবি। আমি না হয় ঢাকা ফেরার পর কিছু দিন ওকে গাইড করবো। আশা করি গ্যাপ ফিল হয়ে যাবে।"

মিরায়া মজা করে বলল-

"সে কি মাহির ভাই, আপনি জানেন না? আপনার ছাত্রী পড়াশোনার ক্ষেত্রে ভীষণ অলস আর অমনোযোগী।"

মাহির সোরায়ার দিকে তাকিয়ে অবাক ভাব ধরলো-

"তাই নাকি?"

সোরায়া মাথা নিচু করে নিজের অপমান সহ্য করছে দেখে মাহির হেঁসে মিরায়াকে বলল-

"কি করে জানবো ভাবি বলুন তো, আমার ক্লাসে তো সম্পূর্ণ মনোযোগ রাখে আমার উপর। তাই মনে হয় নি কখন যে সে পড়া চোর।"

সোরায়া একটু লাজুক মুখে মাহিরের দিকে তাকালে রায়ান সবাইকে সব গুছিয়ে নিচে আসতে বলে। আর সে আর ছাদে অবস্থান না করে মিরায়াকে আবারো কোলে তুলে নিয়ে নিচে নেমে আসে। মিরায়া আর কিছু বলল না রায়ানকে- জানে বলেও লাভ নেই।

মাহির রায়ান কে মিরায়াকে কোলে নিয়ে নিচে চলে যেতে দেখে একরাশ হতাশায় বিড়বিড় করলো-

"হাহ্! না আছে বউ, না আছে গরম, না আছে শরম- পুরো জীবনটাই শীত।"

সোরায়া মাহিরের কথায় হেসে উপহাস করলো-

"আহা রে...তো বিয়ে করে নিচ্ছেন না কেন?"

মাহির সোরায়ার হাত ছেড়ে দিয়ে উঠে দাড়িয়ে বলল-

"বউ আমার ছোট্ট, শীতে বড় কষ্ট। আহ্..! আর ভাল্লাগে না। এই শোনো তাড়াতাড়ি বড় হও বুঝেছ?"

সোরায়া মাহিরের দিকে তাকিয়ে হেঁসে মাথা নাড়িয়ে বলল-

"আচ্ছা..!"

মাহির সোরায়ার সামনে দাঁড়িয়ে হাত বাড়িয়ে দেয় সোরায়া মাহির হাতে হাত রেখে উঠে দাঁড়ালে মাহির সোরায়া কে নিজের দিকে টেনে নিয়ে জিজ্ঞেস করলো-

"কালকের মধ্যে বড় হতে পারবে আমার জন্য প্লিজ?"

সোরায়া মাহিরের বুকে মৃদু ধাক্কা দিয়ে নিচে নামার জন্য সিঁড়ির দিকে যেতে যেতে বলল-

"হবে না। সময় লাগবে।"

সোরায়া নেমে গেলে মাহির নিজের চুলে হাত রেখে চুল ঝাঁকিয়ে বিড়বিড় করলো- "এই সময় টাই তো দিতে পারছি না আর। কাল যদি তোমাকে বউ করে ঢাকায় নিজের বাসায় নিয়ে যেতে পারতাম সারা জীবনের মতো তাহলেই হতো।"

__________

কিছুক্ষণ বাদে রুদ্র আর রায়ান দুই ভাই একসাথে হয় ড্রয়িং রুমে। রুদ্র রায়ানকে কিছু বলতে ডেকেছে। কিন্তু প্রায় ১০ মিনিট ধরে রায়ান রুদ্রর সামনে দাঁড়িয়ে থাকার পরও রুদ্র রায়ানকে কিছুই বলতে পারছে না। রায়ান এক পর্যায়ে বিরক্ত হয়ে বলল-

"তোর যদি কিছু না বলার থাকে, আমি আমার বউয়ের কাছে যেতাম আর কি! রাত হয়েছে যথেষ্ট।"

রুদ্র ও বিরক্ত বোধ করছে তা বলতে চাইছে তা বলতে না পেরে-

"সারা দিন এতো বউ বউ করো কেন ভাইয়া? আমি কি তোমরা কেউ না? একমাত্র ছোট..!"

-"হয়েছে, আর ইমোশনাল হতে হবে না। বলবি এবার কি হয়েছে?"

-"ভাইয়া, আমি না রিমিকে প্রপোজ করে ফেলেছি।"

রায়ান হতবাক হয়ে রুদ্রর দিকে তাকালে রুদ্র আরো বলল-

"প্রপোজ তো করেছি কিন্তু রিমি রাজি হচ্ছেন না। ওনার কাছে ফ্যামিলির বিষয়টাই বড় হয়ে দাঁড়াচ্ছে বারবার কিন্তু আমি জানি উনিও আমাকে পছন্দ করেন।"

রায়ান মাথায় হাত রেখে সোফায় বসে পড়লে মাহির যেন কি ভেবে হন্তদন্ত হয়ে এসে রায়ান কে বলল-

"রায়ান, আমি সোরায়া কে সামনের বছরই বিয়ে করবো। তুই ম্যানেজ কর যেভাবে পারিস।"

রায়ান আড় চোখে মাহিরের দিকে তাকালো। তার মাথা যেন যায় যায় অবস্থায়। রায়ান বিরক্ত হয়ে মাহিরকে বলল-

"তোর ম্যাটার বাদ, সোরা এখনো ছোট। বড় হক আগে পরে দেখছি কতটুকু ম্যানেজ করা যায় তোর জন্য।"

মাহির রায়ানের কথায় পাল্টা বলল-"ওর বড় হতে হতে যদি আমি পৃথিবী থেকেই চলে যাই তাহলে?"

রায়ান স্বাভাবিক কন্ঠে বলল-"আমার মনে হয় না তুই এতো

তাড়াতাড়ি পৃথিবীকে তোর ভার থেকে মুক্তি দিবি।"

মাহির আর কিছু বলার আগে রায়ান রুদ্র কে জিজ্ঞেস করল-

"আর তুই, তুই কখন রিমি কে প্রপোজ করলি?"

রুদ্র মাথা একটু নিচু করে বলল-

"কাল রান্নাঘরে রিমির রান্না করার সময় বলেছি।"

রায়ান মাথায় হাত দিয়ে আওড়ালো -

"আমার ভাই হয়ে তুই রান্নাঘরে প্রপোজ করেছিস? তাও আবার আমার বউএর ব্রেস্ট ফ্রেন্ড কে? মান ইজ্জতের ফালুদা করে দিলি চৌধুরী বাড়ির।"

মাহির রুদ্রর কথা শুনে নিমেষে হতাশা থেকে বেরিয়ে এলো। হাসতে হাসতে রুদ্রর কাঁধে হাত রেখে জিজ্ঞেস করলো-

"তারপর বল, কি কুকিং হলো রান্নাঘরে? গরম হাতার চেকা খাসনি তো আবার?"

রুদ্র ঠোঁট উল্টে বলল-"ওই চেকা তো তাও সহ্য করার মতো কিন্তু যেই চেকা খেয়েছি তা তো সহ্য হচ্ছে না।"

মাহির রায়ানের পাশে সোফায় বসে হাত মুঠো করে মাইকের ন্যায় মুখের সামনে ধরে জিজ্ঞেস করলো-

"তো মিস্টার চৌধুরী, ছোট ভাইয়ের প্রেম নিবেদন প্রত্যাখ্যান হওয়াতে আপনার কি কোনো বিশেষ মতামত আছে?"

রায়ান বাঁকা চোখে মাহিরের দিকে দেখে সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে ড্রয়িং রুম ত্যাগ করতে করতে বলল-

"মাহির ওকে বলে দে, আকাম যেহেতু করেছে রিমি কে যেন ভাই বউ হিসেবে চৌধুরী বাড়িতে দেখি। নইলে আমার জুতা আর ওর গাল। রায়ান চৌধুরীর ভাই হয়ে রিজেকশন কিভাবে মানছে ও? কি লজ্জা..!"

কথাটা বলেই রায়ান চলে গেলো। এই দিকে মাহিরও রুদ্র কাছে গিয়ে তার কাঁধে চাপড়ে বলল-

"রিমি কে তোর বউ হিসেবে চৌধুরী বাড়িতে না দেখলে। তোর এক গাল আর রায়ানের জুতা, আর এক গাল আর আমার জুতা। গুড নাইট।"

এই বলে মাহির ও চলে গেল নিজের ঘরে । রুদ্র বেচারা একা একা ড্রয়িং রুমে দাড়িয়ে।

-"ধুর ধুর, এইগুলো বড় ভাই না অন্য কিছু। কি একটু স্বান্তনা নিতে আসছিলাম, উল্টো প্যারা দিয়ে দিলো।"

___________

রাতের খাবার খেয়ে যে যার যার ঘরে চলে গেছে। মিরায়া ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। রায়ান তখনও ঘরে আসে নি। মিরায়া আর সেই দিকে মন না দিয়ে ঘমানোর উপযোগি কিছু একটা পড়তে লাগেজ ঘটলে তেমন কিছু পেলই না। কি মনে করে যেন সে রায়ানের লাগেজ খুলে কাল রাতের মতোন রায়ানের শার্ট পরবে বলে সেখান থেকে একটা কালো শার্ট বের করে পড়ে নিলো। কাল শার্ট পড়ে তার খুব কম্ফোরটেবল লেগেছে। মিরায়া শার্টটা পড়েই কলারটা টেনে নাকের কাছে নিয়ে একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস নিলো, শার্টে রায়ানের শরীরের একটা ঘোর লাগানো ঘ্রাণে মিরায়া মুচকি হাসলো।

-"হাহ্! কি মিষ্টি একটা সুবাস‌। কি পারফিউম ইউজ করেন উনি?"

নিজে নিজে কথা বলে মিরায়া বিছানায় গিয়ে হেড বোর্ডে হেলান দিয়ে বসতেই রায়ান ঘরের ভেতর প্রবেশ করলো। রুদ্রর জন্য মেজাজ খারাপ হয়ে ছিল তাই মিরায়ার দিকে না তাকিয়েই সোজা আয়নার সামনে গিয়ে হাতের রোলস রোয়েলস এর ঘড়িটা খুলে রেখে পড়নের শার্টের বোতাম খুলতে লাগল। মিরায়া ফোন থেকে চোখ সরিয়ে রায়ানের দিকে তাকালো। রায়ানের মুড ভালো ঠেকলো না বিধায় প্রশ্ন করলো-

"কিছু হয়েছে...?!"

রায়ান মিরায়ার কথার কোনো উত্তর দিলো না। মিরায়াও আর কিছু জিজ্ঞেস করলো না। সবার একটা পার্সোনাল স্পেস আছে, সেটার সম্মান করা উচিত। রায়ান শার্ট খুলে একটা সফ্ট টি শার্ট পড়ে ওয়াশ রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে বেড়লো। ভেজা মুখ টাওয়াল দিয়ে মুছতে মুছতে মিরায়াকে উদ্দেশ্যে করে বলল-

"তোমার ভার্সিটির খবর নিয়েছ রিমির থেকে? অনেক দিন হয়েছে গ্যাপ দিয়েছ। সেমিস্টার ফাইনালে এটা এফ্যাক্ট করবে। বাড়ি ফিরে পড়ায় মনোযোগী হতে হবে তোমার। একটু কষ্ট হবে সব মানিয়ে নিতে।"

মিরায়া চুপ ছিল ঠিক যেমন রায়ান প্রথমে তার সাথে কথা বলে নি।

-"কি হলো? কথা বলছো না কেন?"

রায়ান বিছানায় মিরায়ার দিকে তাকাতেই দেখলো মিরায়া কাত হয়ে শুয়ে আছে। আর পড়নে তার শার্ট। রায়ান একটু অবাক হলো মিরায়াকে নিজের শার্টে দেখে। রায়ান মিরায়ার কাছে যেতেই দেখলো মিরায়া চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে। সে যে ঘুমায় নি তা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে কিন্তু রায়ান মিরায়ার কথা না বলার কারণ বুঝতে পারলো না। রায়ান আরো কয়েক বার মিরায়াকে ডাকার পরও যখন প্রতি উত্তর পেল তখন তার মাথায় এক দুষ্টু বুদ্ধি খেলল। রায়ান বিছানার পাশে হাঁটু গেড়ে বসে মিরায়ার ঠোঁটের দিকে অগ্রসর হলে মিরায়া ধপ করে বিছানায় উঠে বসে প্রশ্ন করলো-

"সমস্যা কি হ্যাঁ? যখন তখন আমার ঠোঁটে কি? আমি ঘুমোচ্ছিলাম দেখতে পাচ্ছিলেন না?"

রায়ান মিরায়ার দিকে ভালো করে তাকিয়ে বলল-

"হুম, দেখতে তো পাচ্ছি, ঠিক কতটা ঘুমের ঘোরে ছিলেন আপনি। তা মেডাম অসময়ে এমন ঘুমের কারণ?"

মিরায়া অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে বলল-

"যেখানে আমার অস্তিত্বের মূল্য নেই, আমি কি বলছি, কি জিজ্ঞেস করছি তার কিছুই কারো কানে যায় না সেখানে ঘুমনো ছাড়া আর কি করবো।"

রায়ান মিরায়ার কথা বুঝে মাথা নাড়িয়ে বলল-

"ওহ আচ্ছা আচ্ছা, তা নাহয় বুঝলাম। কিন্তু আমার বদলে আমার শার্ট আপনার শরীর উপর কি করছে?"

মিরায়া চোখ ছোট ছোট করে বলল-

"আমার বরের শার্ট আমি পড়েছি। বেশ করেছি। আমি আমার শরীরে আমার বরকে রাখবো না তার শার্ট সেটা আমার ব্যাপার। আপনি বলার কে?"

রায়ান ঠোঁট কামড়ে হেসে ঘরের বাইরে চলে গেল। আর মিরায়া সেই দিকেই তাকিয়ে রইল। বেশ কিছুক্ষণ পরে রায়ান এক গ্লাস গরম দুধ নিয়ে ঘরে এসে সাইড টেবিলের উপর রেখে মিরায়াকে কে বলল-

"গ্লাসে গরম দুধ রাখা আছে,খেয়ে নাও ঠান্ডা হওয়ার আগে।"

মিরায়ার মুড অফ তাই জেদ ধরে বলল-

"আমি খাব না আপনিই খান দুধ।"

রায়ান স্বাভাবিক কন্ঠে মিরায়ার কথার প্রেক্ষিতে তাকে আরো খেপাতে দুষ্টু হেসে বলল-

"Right or left..orr both?"

মিরায়া বিছানায় রাখা বালিশটা হাতে নিয়ে রায়ানের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বকলো-

"অসভ্য, অশ্লীল লোক কোথাকার!"

রায়ান বালিশটা কেচ ধরে ফেলে আদেশ মূলক কন্ঠে বলল-

"যা বলেছি তা করো।"

মিরায়া আবার আরেকটা বালিশ ছুঁড়ে মারলো-

"বলেছি না খাব না আমি।"

রায়ান আলোর গতিতে মিরায়ার কাছে এসে মিরায়ার কোমর জড়িয়ে নিজের কাছে টেনে ঠোঁটে ঠোঁটের সংঘর্ষে বলল-

"Talk less my little headache, or your legs gonna pay.."

রায়ানের হঠাৎ কাজে মিরায়া একেবারে ঘাবড়ে গিয়ে বলল-

"খাচ্ছি খাচ্ছি খাচ্ছি। ছা... ছাড়ুন।"

-"Be quick.."

রায়ান ছাড়তেই মিরায়া ফটাফট দুধ টা খেয়ে গ্লাসটা রেখে ধপ করে চিত হয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লো। রায়ান মিরায়াকে দেখে মুচকি হেঁসে লাইট টা অফ করে বিছানায় এলো। রায়ান বিছানায় আসতেই মিরায়া অন‌্য দিকে ঘুরে গেলো। রায়ান পিছন থেকে মিরায়ার কোমর ধরে টেনে নিজের বুকের সাথে মিরায়ার পিঠ মিশিয়ে নিয়ে শুলো। মিরায়া কিছু বলতে পারে না মনের দ্বিধায়- না জানি সে কিছু বললে রায়ান কি করবে তার সাথে। কিন্তু রায়ানের সাথে মিশে থাকাতে তার একটু অস্বস্তি হচ্ছিল যার জন্য একটু নড়াচড়া করছিল। হঠাৎই রায়ান মিরায়ার কানের দিকের চুল গুলো সরিয়ে কানের লতিতে হাল্কা ভেজা চুমু দিয়ে বলল-

"বেশি নড়াচড়া করে আমাকে জাগিয়ো না পাখি। এমনিতেই নিজের শার্ট টা তোমার গা থেকে খুলতে পারছিনা বলে মনে আফসোস এর শেষ হচ্ছে না। খুব কষ্টে সামলে রেখেছি নিজেকে। তোমার প্রতি আমার যত্ন আমাকে বড্ড কষ্ট দিচ্ছে। তা কি তুমি জানো?"

রায়ানের কথা শুনে মিরায়ার কেন জানি খুব মায়া হলো‌। রায়ানের থেকে দূরে যাওয়ার আর চেষ্টা করলো না উল্টো রায়ানের কাছে গেল।

রায়ান ভেবেছিল হয়তো সে ঘুমিয়ে যেতে পারবে কিন্তু কোনো একটা কারণে ছেলেটা আর ঘুমতে পারলো না। রায়ান বিরক্ত হয়ে মনে মনে বিড়বিড় করছে-

"এক রাতে এমন অভ্যাস কিভাবে হলো? ধুর.. একটুও ঘুম আসছে না বালিশে শুয়ে।"

মাঝে রাতে না পারতে রায়ান মিরায়াকে ডাকলো আলতো করে-

"হৃদপাখি...সোনা..ঘুমিয়ে গেছ?"

মিরায়ার কোনো আওয়াজ নেই। রায়ান আবারো ডাকলো-

"ও বউ পাখি..! ঘুমিয়ে গেছ?"

মিরায়া ভাঙা ভাঙা গলায় আওয়াজ করলো-"হুম, ঘুমিয়ে গেছি।"

রায়ান একটু মুখ উঁচু করে বলল-

"ঘুমির মাঝে কথা বলা কেমন অভ্যাস?"

মিরায়া অল্প ঘুরে পাল্টা প্রশ্ন করলো-

"ঘুমিয়ে থাকা মানুষ কে সে ঘুমিয়ে গেছে কিনা জিজ্ঞেস করা কেমন অভ্যাস?"

রায়ান চুপ থাকলো। মিরায়া নরম কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো-

"কি হয়েছে? কি চাই?"

রায়ান ইনিয়ে বিনীয়ে মিরায়ার হাতে আঙ্গুল দিয়ে কিছু একটা আঁকিবুঁকি করতে করতে বলল-

"আমি একটু আসি?"

মিরায়া অবাক হয়ে প্রশ্ন করলো-"কোথায়?"

রায়ান আঁতকা মিরায়াকে সোজা করে শুইয়ে দিয়ে মিরায়ার বক্ষ যুগলের উপর মাথা রেখে বলল-"তোমার বুকে।"

মিরায়া হতভম্ব- এটা কি হলো তার সাথে! মিরায়া রীতিমতো মতো কাঁপতে শুরু করলে রায়ান বলল-

"কাঁপছে কেন তোমার শরীর? আমি কি কিছু করেছি বলো? কিছু করবো ও না আজ। ট্রাস্ট মি বেইবি। শক্ত বালিশে ঘুম আসছে না। এগুলো অনেক নরম।"

মিরায়া রায়ানের কথা বুঝেও যেন বুঝলো না। লোকটা কি বলতে চাইছে তাকে- এক রাতে বালিশ শক্ত হয়ে গেল! মিরায়া ওইভাবেই রায়ান কে বলল-

"বা..বালিশ তো অনেক নরম, এর চেয়ে আর কি নরম?"

রায়ান আরো গভীর ভাবে মিরায়ার বুকের মাঝখানে মুখ গুঁজে দিয়ে বলল-

"These sweet butter balls.. Which are mine now..

তুমি ঘুমাও নিশ্চিন্তে। I swear, I won't do anything to them just gonna sleep.."

কথাটা বলে মিরায়ার একটা হাত নিজের মাথায় দিয়ে বলল-

"একটু মাথায় হাত বুলিয়ে দেও। গুড নাইট।"

এই বলে চুপ করে গেল। মিরায়ার হৃৎস্পন্দন যে বেড়েছে তা রায়ান আর মিরায়া দুইজনেই টের পাচ্ছে। রায়ানের জন্য বিষয়টা কোনো সফ্ট মিউজিক এর কাজ করলো। মিরায়া পাথরের মতো শুধু শুয়ে আছে আর রায়ানের কথা মতো তার মাথায় হাত বুলিয়ে যাচ্ছে। মেয়েটা একে বাড়ে রাত শেষে একটু ঘুমের দেখা পেয়েছে। রায়ানের মাথার ভারে বুকে চাপ লাগায় অনেক ব্যাথা হয়ে গেছে তার উপর মাঝে মাঝেই রায়ানের অবাধ্য নড়াচড়ায় মেয়েটা ঘুমাতে পারেনি। অবশেষে চোখে ঘুম জুড়ে এলে সে ঘুমিয়ে যায়। কিন্তু মনে মনে বেশ রেগে ছিল রায়ানের উপর।

__________

সকালটা স্বাভাবিক শান্ত। তবে সবার মাঝে ফিরার তাড়া। সকালের নাস্তা করে সবাই বের হবে বলে তাড়াতাড়ি নাস্তা সেরে নিয়েছে। সকাল থেকে মিরায়া রায়ানের সাথে কোনো কথা বলেনি। নাস্তা করার সময় ও না। রায়ান মিরায়ার সাথে অনেক ভাবেই কথা বলার চেষ্টা করছিল কিন্তু তাতে খুব একটা লাভ হলো না। মিরায়া ইচ্ছে করেই রায়ান কে ইগনোর করছে। রাতের জন্য একটু রাগ আর এমনি শুধু শুধু একটু জ্বালাতন করতে এই ধরনের ভাবনা এসেছে মেয়েটার মাথায়। মেয়ে মানুষের মাথায় কখন কি ঘুরে তা যদি ছেলেরা বুঝতো তাহলে তো হয়েই যেত। স্বাভাবিক ভাবেই রায়ানও বুঝলো না। তার কাছে বিষয়টা খুবই সিরিয়াস। বউ তার সাথে কথা বলছে না পাত্তা দিচ্ছে এটা তার জন্য মেনে নেওয়া কষ্টকর।

রায়ান মিরায়ার এমন আচরণে ধীরে ধীরে বিরক্ত হচ্ছে কিন্তু কিছু বলছে না। মিরায়া নাস্তা শেষে আগে আগে উঠে যায় শাওয়ার নিয়ে বাড়ি যাওয়ার জন্য রেডি হতে। পর পর রায়ান ও উঠে ঘরে চলে আসে‌। খাবার টেবিলের সবাই একে অপরের মুখ চাওয়া চাউয়ি করছে।

মিরায়া ঘরে গিয়ে নিজের লাগেজ থেকে একটা থ্রি পিস নিয়ে ওয়াশ রুমে যেতে চাইলে রায়ান মিরায়া্য পথ আটকে জিজ্ঞেস করলো-

"কি হয়েছে তোমার? সকাল থেকে দেখছি, এমন উগ্র ব্যবহার এর কারণ কি জানতে পারি?"

মিরায়া রায়ানের দিকে তাকালোও না সোজা ওয়াশ রুমে চলে গেল রায়ানের সাইড কাটিয়ে। মূলত মিরায়া রাগ করে আছে রায়ান রাতে তাকে ছাড়ে নি কেন? বেচারি সেই জন্য ঘুমাতেও পারে নি। তাই ইগনোর করছে ছেলেটাকে। রায়ানও ছাড়ার পাত্র নয় মিরায়ার পিছন পিছন গিয়ে মিরায়াকে ওয়াশ রুমের দরজা লক করতে না দিয়ে নিজে জোর করে ওয়াশ রুমে ঢুকে যায়।

-"হচ্ছে টা কি? আমি শাওয়ার নেব এখন। আপনি ভিতরে এলেন কেন?"

রায়ান কিছু না বলে হঠাৎ করে মিরায়ার ঠোঁটে হামলে পড়লো। মিরায়া চোখ বন্ধ করে নিয়েছে। মেয়েটার বুঝতেও কিছুটা সময় লাগলো কি হচ্ছে তার সাথে। মিরায়া বারবার ছোটার চেষ্টা করেও ঠোঁট বা শরীর কিছুই রায়ানের দখল থেকে মুক্ত করতে পারছে না। রায়ান ও পাগল হয়ে গেছে- একদিনের তৃষ্ণা মেটাতে একে বারে ক্ষুধার্ত বাঘের মতো হামলা চালাচ্ছে। মিরায়া চোখ খুলতেই দেখলো রায়ান চোখ বন্ধ করে আছে। ধীরে ধীরে সে শান্ত হলে রায়ানের পাগলামি কমে গেল, এখন শুধু নিজের চাওয়া টুকু পুরোন করছে। প্রায় ত্রিশ মিনিট পর রায়ান মিরায়ার ঠোঁট ছেঁড়ে কপালে কপাল ঠেকিয়ে নিঃশ্বাস ফেলতে ফেলতে বলল-

"সকাল থেকে এই কারণে ইগনোর করা হচ্ছিল বুজি?"

মিরায়া হাঁপিয়ে উঠেছে। জোরে জোরে নিঃশ্বাস ফেলছে। এরই মাঝে রায়ান শাওয়ার টা ছেঁড়ে দিয়ে মিরায়ার ঠোঁটে আবারো ডুব দেওয়ার আগে ফিসফিস করলো-

"আমি নিজেকে ধরে রাখার আর কোনো কারণ দেখছি না। So handle me like a good wife.. okay?"

মিরায়া রায়ানের দিকে ছলছল চোখে তাকাতেই রায়ান দ্বিতীয় বারের মতো মাতলো ঠোঁটের সাথে ঠোঁটের খেলায়। মিরায়া বুঝতে পারছে না শুধু ইগনোর করাতে লোকটা এতো পাগলামি করছে নাকি আর চাইছেই না নিজেকে সামলাতে! এক পর্যায়ে রায়ান মিরায়াকে কয়েক সেকেন্ডের জন্য ছাড়লে মেয়েটা কাঁদো কাঁদো গলায় বলল-

"ইইই..ইগনোর করেছি তো কি হয়েছে? বেশ করেছি।"

রায়ানের কি হলো কে জানে, ও মিরায়ায গলায় মুখ ডুবিয়ে দিয়ে ছোট ছোট কামড়ে নিজের অধিকার বোধ দেখাতে থাকলো। মিরায়া আর কিছু বলতে চেয়েও কিছু বলতে পারছে না। রায়ানের কাঁধে চুলে খামচে ধরে আছে শুধু। রায়ান মিরায়ার কানের কাছে মুখ নিয়ে গম্ভীর গলায় বলল-

"Well done, now pay for it.."

রায়ান হঠাৎ নিজের হাত মিরায়ার দুই উরুর মাঝে দিতেই মিরায়া ব্যাথা তুর গলায় বলল-

"আআ..রা.. রায়ান, সবাই অপেক্ষা করছে নিচে। আমাদের যেতে হবে।"

রায়ান হঠাৎ মিরায়াকে সামনের থেকে জড়িয়ে কোলে নিলো। মিরায়া পা দিয়ে রায়ানের কোমরের চার পাশ জড়িয়ে ধরলো।মিরায়াকে ওভাবেই দেয়ালের সাথে চেপে ধরে রায়ান ফিসফিস করলো-

"I am not done with you yet baby.."

এরপর প্রায় ১ ঘন্টার মতো চলে গেছে। মিরায়া বা রায়ান কারোরই বাইরে আসার নাম নেই। গাড়িতে সবার লাগেজ তোলা শেষ। জুলিয়েট আর রমিও কে ও তোলা হয়েছে। রায়ান মিরায়াকে নিচে আসতে না দেখে রিমি জোরে চেঁচিয়ে মিরায়াকে ডাকলো-

"মিরা..বাইরে আয়! তোদের জন্য দেরি হয়ে যাচ্ছে। ১ঘন্টার ধরে উপরে গেছিস। এতো সময় লাগে?"

রুদ্র ও সাথে চেচালো-"মিরা ভাবি.. তাড়াতাড়ি আয়..যেতে হবে তো নাকি।"

মিরায়া রুদ্রর আওয়াজ হালকা শুনতে পেয়ে হাঁপাতে থেকেই মৃদু আর্তনাদ করলো-

"তোমার অসভ্য ভাই, আমাকে ছাড়ছে না। আমি কি করবো?"

রায়ানের এতে কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই সে মিরায়ার মাঝেই ডুবে আছে।

-"আহ্! রায়ান ছাড়ুন আর পারছি না। অনেক হয়েছে। সরি..আর ইগনোর করবো না। ঘাট হয়েছে আমার।"

রায়ান হয়তো মিরায়ার এই সহজ স্বীকারোক্তি টুকুই চাইছিল। ঠিক পর মুহূর্তেই মিরায়াকে ছেঁড়ে দিয়ে কোলে থেকে নামিয়ে দিয়ে জড়িয়ে ধরে বাঁকা হেঁসে মিরায়ার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল-

"কেন করবে না শুনি। অবশ্যই করবে, তা নাহলে এই ইগনোর করার ফায়দা কিভাবে উঠাবো আমি? কালকের দিনটা খুব অসহ্যকর ছিল। আজকের সকালটা সুন্দর করার জন্য তোমাকে ধন্যবাদ। মাঝে মাঝে এমন দুষ্টু করতেই পারো। ভালো লাগবে আমার।"

রায়ান যে কি বলল তা সে নিজেই জানে। রায়ান একটা টাওয়াল কোমরে পেঁচিয়ে বেড়িয়ে যাওয়ার আগে বলল-

"তাড়াতাড়ি বের হও, নয়তো ঠান্ডা লেগে যাবে। আমি নিজে রিস্ক নিচ্ছি না, নাহলে দেখা যাবে আজও হাঁটতে পারবে না। আর যদি এতো টুকু তেই কষ্ট হয় হাটতে ডাকবে আমাকে বুঝেছ?"

মিরায়া কিছু বলার আগেই রায়ান বেরিয়ে গেল। মেয়েটা ফেল ফেল করে তাকিয়ে আছে। সে কি ভেবেছিল আর কি হলো তার সাথে। এই মুহূর্তে রায়ানের তার কাছে ক্ষমা চাওয়ার কথা ছিল কালকের জন্য, আর এই দিকে উল্টো নিজেই ইগনোর করেছে বলে ক্ষমা চাইলো। সব ঘেঁটে ঘ। মিরায়া নিজের মাথায় কয়েক বার বারি দিয়ে বকাঝকা করলো নিজেকে। তার পর শাওয়ার নিয়ে নিলো।

চলবে..

পাখিরা আমি ঠিক নেই। জানি না কি লিখেছি। পড়ে জানাও কেমন লেগেছে। react 2k and comment 300 করে দিও। love you pakhis ❤️ 🥰

#আত্মার_অঙ্গীকারে_অভিমোহ (১৮+) #Soul_bound_obsession

#Oratrika_Rahman_অরাত্রিকা_রহমান

#Part_57 (2nd)

(কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ)

(প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য উন্মুক্ত)

ওয়াশ রুম থেকে বের হয়ে রায়ান রেডি হয়ে তাড়াতাড়ি নিচে নেমে এলো। রুদ্র রায়ান কে নিচে আসতে দেখেই গাড়ির দিকে যেতে যেতে রিমিকে বলল-

"রিমি! ভাইয়া এসে গেছে। চলুন আমরা এবার রওনা দেই।"

রিমি রায়ানের দিকে তাকিয়ে রুদ্র কে বলল-

"এক মিনিট... ভাইয়া তো একা। মিরা কোথায়?"

রায়ান রিমি আর রুদ্রর কাছে এসে বলল-

"মিরা ভেতরে আছে। ওয়াশ রুমে। আসছে এখনি। তোরা চলে যা।"

রুদ্র রায়ানের দিকে খেয়াল করে দেখলো- রায়ানের চুল ভেজা, মনে হচ্ছে মাত্র শাওয়ার নিয়েছে। কিন্তু রায়ান মাত্র বলল মিরায়া ওয়াশ রুমে, তাহলে রায়ান কি করে শাওয়ার নিল? রুদ্র কৌতুহল থেকে রায়ান কে প্রশ্ন করলো-

"তোমার চুল ভেজা কেন? মিরা ভাবি ওয়াশ রুমে থাকলে তুমি ভিতরে কি করছিলে?"

রায়ান ছোট ভাইয়ের প্রশ্নের সহজ জবাব দিল- "Help.."

রুদ্র বুকে আড়াআড়ি হাত বেঁধে-"কেমন হেল্প? শাওয়ার নিতে?"

রায়ান রুদ্রর মাথায় গাট্টা মেরে বলল-

"কথা কম কাজ বেশি। যেতে বলেছি না? গাড়িতে বোস গিয়ে।"

রিমি ফিক করে হেঁসে দ্রুত পায়ে গাড়ির দিকে চলে গেল লজ্জায়। রুদ্র মাথায় হাত ঘষতে ঘষতে আবারো জিজ্ঞেস করলো-

"না..আগে বলো মিরা কোথায়। কি করেছ ওর সাথে?"

রায়ান দাঁতে দাঁত চেপে রাগ সংবরণ করে নিজের বাহুর দ্বারা রুদ্রর গলা পেঁচিয়ে ধরে বলল-

"তোর ভাবির একা ভয় লাগছিল ওয়াশ রুমে তাই কাম্পানি দিচ্ছিলাম একটু। এতো দরদ দেখাতে হবে না বোনের জন্য। যা করার ভয় পাচ্ছিস তা আগেই করা হয়ে গেছে আমার । এখন জাস্ট সব রিপিট হবে। বুঝেছিস নাকি আরো..."

রায়ানের কথা শেষ হওয়ার আগেই রুদ্র তাকে থামিয়ে দিল-

"থাক থাক হয়েছে। ভাই হয়ে এসব না শুনলেও হবে আমার। কি করেছ তা তো দেখেইছি। হাঁটতে পর্যন্ত পারে নি মেয়েটা।"

-"তোর বোন কে কি হেঁটে চলার কষ্ট করতে দিয়েছি আমি? আমার কোলে কোলেই তো ছিল‌। বোনের জন্য মায়া হয়, ভাইয়ের জন্য মায়া হয় না তোর?"

রুদ্র রায়ানের হাত কাঁধ থেকে সরিয়ে দিয়ে গাড়ির দিকে যেতে যেতে বলল-

"আসছে আমার মায়ার দাবিদার। মায়া ভীকটিম এর জন্য হয় আক্রমণকারীর জন্য না।"

রুদ্র শেষের কথাটা একটু জোরেই বলল রায়ান কে শুনিয়ে শুনিয়ে বলতে। রায়ান রুদ্রর কথা আর গায়ে মাখলো না। মাহির গাড়িতেই ছিল, পাশে সোরায়া বসে। রুদ্র কে বিরক্ত হয়ে গাড়ির দিকে আসতে দেখে চেঁচিয়ে জিজ্ঞাসা করলো-

"কি রে, তোর কি হলো হঠাৎ?"

রুদ্রও একই ভাবে চেঁচিয়ে জবাব দিলো-

"কিছু হয় নি। তোমার বন্ধু আমাদের এগোতে বলেছে। চলো রওনা দেওয়া যাক।"

মাহির রুদ্র "তোমার বন্ধু" সম্বোধন থেকেই বুঝতে পারলো কিছু একটা হয়েছে কিন্তু তার এখন সেসবে নজর দেওয়ার সময় নেই। রুদ্র কথা শুনে মাহির গাড়ি স্টার্ট দেয়। পর পর রুদ্র ও রিমি কে নিয়ে বেরিয়ে যায়। ঢাকা ফিরে রিমিকে তার বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে তাকে বাড়ি ফিরতে হবে।

কিছুক্ষণ পরেই মিরায়া তাড়াহুড়ো করে নিচে আসে। তার হাঁটার মাঝে কেমন যেন একটা কোমল ভাব হয় তো তেমন প্রেশার দিচ্ছে না পায়ে এমন। রায়ান মিরায়াকে এভাবে হাঁটতে দেখে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো-

"I wasn't that rough just now..এতো টুকুতেই আবার হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে?"

মিরায়ার ভেতরে কেমন একটা রাগ কাজ করছে কিন্তু দেখাতে পারছে না। বলা যায় না কখন রায়ানের মন পরিবর্তন হয়ে যাবে। সে রায়ানের কথার জবাব না দিয়ে ইগনোর করে চারদিকে চোখ ঘুরিয়ে জিজ্ঞেস করলো-

"বাকিরা কোথায়? কাউকে দেখছি না যে?"

রায়ান মিরায়াকে এক ঝটকায় কোলে তুলে গাড়ির দিকে এগোতে এগোতে বলল-

"বাকিরা চলে গেছে। এখন আমাদের ও যেতে হবে। ঢাকায় গিয়ে অনেক কাজ আছে আমার।"

মিরায়া রায়ানের গলা জড়িয়ে ধরে একটু বিরক্তি নিয়ে বলল-

"আপনি সবসময় আমাকে হুটহাট এমন কোলে তুলে নেন কেন?"

-"মজা পাই আমি। আমার অনেক ভাল্লাগে।"

রায়ান মিরায়াকে গাড়ির ভেতরে বসিয়ে দিয়ে নিজের জবাব দিলো। মিরায়া হা করে তাকিয়ে আছে-"মানুষ টা নির্দ্বিধায় এমন কথা কিভাবে বলে? কোলে নিলে মজা লাগে এইটা কি ধরনের কথা হলো?"

রায়ান নিজে ড্রাইভিং সিটে বসে মিরায়ার সিটবেল্ট টা লাগিয়ে দিয়ে নিজের সিট বেল্ট টা লাগিয়ে গাড়ি স্টার্ট দিয়ে মিরায়ার ধ্যান ভঙ্গ করতে বলল-

"আমার বউ, আমার যখন ইচ্ছে করবে তখন কোলে নেব। এতে কারো কোনো অবজেকশন থাকলেও আমি তা শুনছি না। আমার কোলে নেওয়াতে কারো সমস্যা হলে তাকে নিজ ইচ্ছায় আমার কোলে উঠে বসে থাকার আমন্ত্রণ রইল।"

মিরায়া অবাক দৃষ্টিতে রায়ানের দিকে তাকিয়ে থাকলো। ভাবা যায়, এই লোক নাকি তাকে একসময় ডিভোর্স দিতে চেয়েছিল! মিরায়া একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মুচকি হেঁসে সামনের দিকে তাকালো। গাড়িও শব্দ করে পিছনে কালো ধোঁয়া উড়িয়ে পাহাড়কে বিদায় জানিয়ে বেরিয়ে গেল এক ইট পাথরের শহরের উদ্দেশ্যে।

___

মাহির মন দিয়ে গাড়ি চালাচ্ছে কিন্তু নজর মাঝে মাঝেই সোরায়ার দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। দুইজনের মনেই চাঁপা নীরবতা, হবে নাই বা কেন- এই প্রথম তারা রিলেশনশিপে থাকা অবস্থায় গাড়িতে ট্রাভেল করছে। একটা অদ্ভুত অনুভুতি দুইজনের মনে- কি বলবে বা কি করবে তার কিছুই মাথা ঢুকেছে না।

সোরায়ার হাত তার উরুর উপর ছিল, মাহির বেশ কয়েকবার নিজের হাত বাড়িয়েছে তার হাতটা ধরতে কিন্তু ধরছে না। কেন ধরছে না সে উত্তর দেওয়া মুশকিল। সোরায়া বিষয়টা শুরু থেকেই খেয়াল করছে। সে নিজের হাত সরাচ্ছে না উল্টো একটু একটু করে কাছে আনছে যাতে মাহিরের হাতটা ধরতে একটু সুবিধা হয়। কিন্তু মাহির যেন তার কিছুই বুঝলো না। সোরায়া মনে মনে বেশ টিটকারী কাটলো-

"কাল রাতে তো কোনো নোটিশ ছাড়াই হুট করে হাত ধরে বসে ছিল, তাও সবার সামনে। আর এখন কেউ নেই তবু এতো দ্বিধা দ্বন্দ্ব। ধুর ভাল্লাগে না।"

সোরায়া মাহিরের অবস্থা দেখে আর সামলাতে পারলো না মনের ভাব। ফট করে জিজ্ঞেস করে বসলো-

"আপনার কি আমার হাত ধরতে ইচ্ছে করছে?"

মাহির হুট করে এমন প্রশ্নের সম্মুখীন হয়ে থতমত খেয়ে সোরায়ার দিকে তাকায়‌। আর বেশ তাড়াহুড়ো তেই মাথা ঝাঁকিয়ে সম্মতি দিল-

"হুম, খুব।"

সোরায়া এবার একটু বিরক্ত হয়ে জোরে গলায় বলল-

"ইচ্ছে যখন করছে তো ধরছেন না কেন? কাল রাতেও তো হাত ধরেছেন সবার সামনে। কই তখন তো মনে এতো ভাবনা ছিল না।"

মাহির শুকনো ঢোক গিলে আনমনে বিড়বিড় করলো-

"সবার সামনে ধরে ছিলাম দেখেই এখনো ঠিক আছো। এখন গাড়িতে একা থাকা অবস্থায় হাত ধরলে পরে কি থেকে কি করে ফেলবো নিজেই জানি না। এমন সময় রিস্ক নিবে কে!"

সোরায়া মাহিরের দিকে তাকিয়ে আবারো বলল-

"কি হলো? এখনো কেন চুপ করে আছেন?"

মাহির দীর্ঘশ্বাস নিয়ে নিজেকে সংবরণ করতে বারবার। মাহির সোরায়াকে স্বাভাবিক ভাবে বোঝাতে তার দিকে তাকাতেই নজর আঁটকে গেলো সোরায়ার লিপ গ্লস দেওয়া গোলাপি ঠোঁট জোড়ায়। ছেলেটা কয়েকবার বড় বড় শ্বাস নিলো। সোরায়া অনবরত কিছু না কিছু বলে যাচ্ছে তবে মাহিরের কানে ঠিক সেগুলো শব্দের রূপে পৌঁছালো না বরং, সেই ঠোঁট জোড়ার নড়াচড়া গুলোই মূল মন্ত্র হয়ে ধরা দিলো মাহিরের চোখে। পুরুষ মনের জাগরণ বড্ড খারাপ। মাহির হাজার চেয়েও নিজেকে মানাতে পারছে না, দুষ্টু মনটা যেন বলছে-

"এক্ষুনি ওই ঠোঁট জোড়া নিজের দখলে নিয়ে এর নড়চড় থামিয়ে দে মাহির‌। সব শব্দের নীরবতা পূর্ণতা পাক সেই অবাধ্য ছোঁয়ায়। ওগুলো তোর, শুধু তোর।"

মাহির মনের ডাকে সাড়া দেওয়ার তাগিতে সোরায়ার দিকে ঝুঁকে যাওয়ার সময়ই হঠাৎ হর্ণ বাজলো জোরে। মাহিরের ধ্যান ভঙ্গ হলে মাহির দ্রুত স্টেয়ারিং ঘুরিয়ে গাড়ি সামলে নিলো সামনে একটা ট্রাক আসছিল। সোরায়াও ভয়ে চিৎকার করেছে। মাহির সোরায়া কে প্যানিক করতে দেখে শান্ত করতে বলল-

"চিল চিল, কিছু হয় নি। চিল।"

সোরায়া হঠাৎ মাহিরের অসাবধানতা দেখে নিজের চোখে আর ঠোঁট পরপর আঙ্গুল দেখিয়ে বলল-

"আমার চোখ উপরে, ঠোঁটের জায়গায় না। এইদিকে তাকিয়ে ছিলেন কেন? আর একটু হলেই মরে যেতাম দুইজনে।"

মাহির দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বিড়বিড় করলো-

"মরে তো গেছি আমি। ধ্যাতিরিকি, ভাল্লাগে না। আল্লাহ তুমি আমারে রক্ষা করো।"

মাহির সোরায়াকে উদ্দেশ্যে করে প্রশ্ন করলো-

"ঠোঁটে কি দিয়েছ ওটা? এমন চিকচিক করছে কেন ঠোঁট গুলো?"

সোরায়া অবাক হয়ে গিয়ে নিজের ঠোঁটে আঙুল দিয়ে চেক করে বলল-

"এটা তো লিপগ্লস। কেন কি হয়েছে?"

-"মুছো ওটা এখনি।"

-"ও মা কেন? সুন্দর লাগছে না?আমি তো ভাবলাম হয়তো আপনার ভালো লাগবে।"

-"এতো ভেবে চিন্তে আমাকে মার্ডার করার প্লেন করেছ বলে আমি ধন্য। এবার মুছো।"

-"না আমি মুছবো না। আগে বলুন সমস্যা কোথায়? আমাকে কি খারাপ লাগছে?"

-"মারাত্মক সুন্দর লাগছে জান। আমি নিতে পারছি না ওটা। এবার তো মুছো।"

সোরায়া মাহিরের মুখে জান ডাক শুনে সঙ্গে সঙ্গে মুখে হাত বাঁধলো অবাক হয়ে।

-"আপনি কি ডাকলেন আমাকে?"

মাহির সোরায়ার দিকে একবার তাকিয়ে আবারো সামনের দিকে নজর দিয়ে হুমকি দিয়ে জিজ্ঞেস করলো-

"তুমি তোমার ঠোঁট থেকে ওটা নিজে মুছবে নাকি আমি মুছবো? And If I do it, I won't use my hands..So think thoroughly.."

সোরায়া সাথে সাথে হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে নিজের ঠোট মুছে নিলো। মাহির ও আর এই নিয়ে কথা বাড়ালো না। চাইছিল তার মাথা থেকে সেই দৃশ্য চলে যাক। এর পরে মাহির ড্রাইভিং এ বেশি মনযোগী হয়ে উঠলো। সোরায়া বেচারি কি করবে ভেবে পাচ্ছিল না। ভয়ও লাগছিল বেশ, তাই মাহিরের এক হাতের মাঝে নিজের ছোট্ট হাতটা প্রবেশ করিয়ে বলল-

"আমি আর কখনো লিপগ্লস দিবো না।"

মাহির সোরায়ার ছোঁয়ায় একটু নরম হয়ে এলো। সোরায়ার দিকে তাকিয়ে সোরায়ার হাতটা ধরে টেনে নিজের কাছে এনে বলল-

"যখন তুমি বড় হয়ে যাবে, আমার হয়ে যাবে, তখন পড়বে এগুলো। ওকে?"

কথাটা বলে মাহির সোরায়াকে সাইড থেকে জড়িয়ে নিলো নিজের বুকে। সোরায়া মাহিরের ইঙ্গিত বুঝলো কিন্তু কারণ বুঝলো না।

-"ওকে। কিন্তু এমন কেন? তখন কি হবে?"

-"কিছু হবে না। শুধু অধিকার থাকবে- তোমার ঠোঁটে কিছু অসহ্যকর লাগলে তা নিজের মতো করে মুছে ফেলার। ব‌্যাস, এতো টুকুই।"

-"ওহ আচ্ছা।"

এরপর আবারো দুইজন চুপ করে গেল। মাহির সোরায়াকে ওইভাবে জড়িয়েই গাড়ি চালালো। হোরায়রা সরতে চাইলেও মাহির ছাড়েনি। ছোট্ট মেয়েটা আর কি করবে, ওভাবেই গুটিয়ে রইল মাহিরের বুকে।

___

দুপুরের সময় হয়ে এসেছে। রাস্তায় বিরতিহীনভাবে চলছে রায়ানের গাড়ি। চট্টগ্রাম পার করে এসেছে তারা। গোটা সময়টা রায়ান মিরায়ার সাথে বাড়তি কোনো কথা বলে নি। এই নিয়ে মিরায়ার মন বেশ খুটখুট করছে। সে অপলক দৃষ্টিতে রায়ানের দিকে তাকিয়ে চিন্তা করে যাচ্ছে-

"মানুষ টার হঠাৎ কি হলো? কিছু নিয়ে রাগ করছে? না বিজনেস রিলেটেড কিছু ? এমন রাফ অ্যান্ড টাফ হয়ে আছে কেন?"

রায়ান এমনিতে এমনি শুধু মিরায়ার সাথে থাকলেই তার মুড সুইং ঘটতে দেখা যায়। মিরায়া রায়ানকে এতো গম্ভীর দেখে রায়ানের কোর্ট দুই আঙ্গুলে ধরে একটু টানলো তার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে। রায়ান স্বাভাবিক ভাবেই মিরায়ার দিকে তাকালো। মিরায়ার চকচকে চোখে চোখ পরতেই রায়ান হঠাৎ গম্ভীরতা থেকে বেরিয়ে এলো। এক হাতে স্টেয়ারিং ধরে মিরায়ার গালে একহাত দিয়ে মিরায়াকে প্রশ্ন করলো -

"কি হয়েছে বেইবি? কিছু লাগবে?"

মিরায়ার কি হলো কে জানে, রায়ানের হাতটা গাল থেকে সরিয়ে নিয়ে রায়ানের হাতের উল্টো পিঠ ঠোঁটের কাছে এনে একটা ছোট্ট চুমু খেয়ে আবারো নিজের গালে হাতটা ছোয়াল। রায়ান আশ্চর্য হয়ে তাকিয়ে আছে-"এমন হঠাৎ আদরের মানে কি?"

রায়ান না বুঝেই প্রশ্ন করে বসলো-

"Baby, are you in the mood?"

মিরায়া রায়ানের কথা শুনে তৎক্ষণাৎ হেঁসে উঠে বলল-

"আমি কি রায়ান চৌধুরী যে সব সময় মুডে থাকবো?"

রায়ান দীর্ঘশ্বাস ছেঁড়ে সামনের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করলো-

"I wish যদি তুমি সব সময় মুডে থাকতে!"

রায়ানের বিড়বিড় করে বলা কথা মিরায়ার কানের আগচরে গেলো না। মিরায়া হালকা হেঁসে রায়ানের বাহু নিজের ছোট দুই হাতে পেঁচিয়ে ধরে রায়ানের কাঁধে মাথা রেখে বলল-

"সকালের জন্য সরি। আমি বুঝিনি ইগনোর করাতে আপনার এতো খারাপ লাগবে।"

রায়ান অবাক হয়ে মিরায়ার দিকে আর চোখে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো-

"কে বলেছে তোমাকে যে আমার খারাপ লেগেছে?"

-"আপনার ব্যবহারে মনে হয়েছে। হঠাৎ এতো এগ্রেসিভ হয়ে গেলেন যে তখন, এখন আবার চুপচাপ ড্রাইভ করছেন। খারাপ না লাগলে এমন কেন করবেন আপনি?"

রায়ান বউয়ের এতো বিচক্ষণতা দেখে ঠোঁট কামড়ে হেঁসে মিরায়ার কপালে আর মাথায় ছোট ছোট চুমু দিয়ে বলল-

"ওই হিসেবে তো আমারও সরি বলা উচিত তোমাকে।"

-"কেন?"

-"এই যে সকাল সকাল ফরজ গোসল করতে হলো। তার উপর কতটা সময় ভেজা অবস্থায় থাকতে হয়েছে আমার জন্য।"

মিরায়া লজ্জায় মুখ লুকিয়ে নিলে রায়ান নিজের হাতটা মিরায়ার থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে সেই হাত দিয়ে মিরায়াকে জড়িয়ে ধরে বলল-

"শোনো মেয়ে, তোমার বরের শুধু অযুহাত চাই তোমাকে ছোঁয়ার। এসব মন খারাপ টারাপ কিছু না, সব ভন্ডামি। তুমি আমার বুকে ছুরি দিয়ে আঘাত করলেও আমার খারাপ লাগবে না বরং আরো খুশি মনে চলে যাব পৃথিবী থেকে। বুঝেছ?"

রায়ান পৃথিবী ছাড়ার কথা বলতেই মিরায়ার মুখ মন ভার হয়ে গেল। এতো ভালো একটা সময় এমন কথা বলা তার কি উচিত হয়েছে? মিরায়া ছলছল চোখে রায়ানের দিকে তাকালে রায়ান ও মিরায়ার দিকে তাকায়। মেয়েটার ঠোঁট জোড়া ঠান্ডা বাতাসে শুকিয়ে আছে, কিছু টা কাঁপছে শিহরণে। রায়ানের মনে হঠাৎ নিষিদ্ধ অনুভূতিরা দেখা দিলো। রায়ান তাড়াতাড়ি গাড়িটা সাইড করলো। মিরায়া অবাক হয়ে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো-

"কি হলো? গাড়ি থামালেন কেন?"

রায়ান নিজের সিটে বেল্ট খুলে ঝটপট খুলে মিরায়াকে সিটে ঠেলে বসিয়ে মিরায়ার উপরে এসে মেয়েটার ঠোঁটের কাছে ঠোঁট নিয়ে ফিসফিসিয়ে বললো-

"I can't risk it baby.. Specially when it's about you..I need my time.."

কথা বলেই মেয়েটার ঠোঁট নিজের ঠোঁটের মাঝে নিয়ে নিলো। মিরায়া সম্পূর্ণ অবাক রায়ানের গলা কাঁধ আঁকড়ে ধরেছে সাথে সাথে- হঠাৎ করে কি হয়ে গেল লোকটার কে জানে। একটু পর পর মিরায়া রায়ানকে থামতে বলছে, হাত দিয়ে দূরে ঠেলছে কিন্তু রায়ানের ঠোঁট ছাড়ার কোনো নাম নেই। এর মাঝেই মিরায়া নিজের শরীরে রায়ান শীতল হাতের বিচরণ অনুভব করলো, যেটা জামার ভেতরে প্রবেশ করে উদর হতে ধীরে ধীরে উপরে উঠছে। রায়ান চোখ বন্ধ করেই একবার মেয়েটার উপরের ঠোঁট আর একবার নিচের ঠোঁটে মত্ত। কয়েকবার কামড়েছে তবে তীব্রতার সাথে নয় মিরায়ার যেন কষ্ট না হয় সেভাবেই। রায়ানের হাতের স্পর্শ মিরায়ার বক্ষ যুগলের উপর পড়তেই মিরা অতিরিক্ত ছটফট করে রায়ান কে দূরে সরিয়ে দিতে চাইলো। তবে এতে যেন রায়ানের মুষ্ঠি আরো দৃঢ় হলো মিরায়ার বক্ষ স্থলে। মিরায়ার চোখ থেকে অশ্রু কণা গড়িয়ে পড়লো। চিৎকার করার সুযোগ টুকু পাচ্ছে না। ২০মিনিট পর রায়ান হঠাৎ মিরায়ার ঠোঁট ছেড়ে দিয়ে উষ্ণ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে করতে বলল-

"ওভাবে আর কখনো আমার দিকে তাকাবে না। তোমার ওই চাহুনি আমি নিতে পারি না। একটুও না। Just don't make that face, ok?"

মিরায়ার জান যায় যায় অবস্থা। নিঃশ্বাস নিতে পেরে সে অস্থির হয়ে শ্বাস নিচ্ছে। রায়ানের কথার মানে তার কাছে অস্পষ্ট- সে কখন কি করলো! কোন চাহুনি? কি ফেইস? কিভাবে তাকানোর কথা বলছে, কিচ্ছু না বুঝেই স্বীকারোক্তি দিলো হাঁপাতে হাঁপাতে-

"ওওওকে..ওকে।"

রায়ান দীর্ঘশ্বাস নিয়ে মিরায়ার গলায় মুখ রেখে মিরায়া জড়িয়ে ধরলো। মিরায়াও জড়িয়ে ধরলো। করবেই বা কি, বরের পাগলামি সহ্য করতে তার যেমন শান্তি লাগছে তেমন অস্বস্তি। নারী জীবনের পূর্ণতা হয়তো এটাই। রায়ান মিরায়ার মাথায় হাত বুলিয়ে গলায় ছোট ছোট চুমু দিয়ে আদর করতে করতে জিজ্ঞেস করলো-

"খারাপ লাগছে? বেশি লেগেছে?"

মিরায়া চোখ বন্ধ করে নিয়ে মাথা না সূচক নাড়ালো। রায়ান হঠাৎ মিরায়ার কানের কাছে মুখ এনে জিজ্ঞেস করলো-

"একটু ব্যাক সিটে আসবে পাখি?"

মিরায়া রায়ানের কথার ইঙ্গিত বুঝতে কাঁদো কাঁদো মুখ করে রায়ানের দিকে তাকালো। রায়ান মিরায়ার চোখের ভাষা বুঝতে পারলো- হয়তো প্রথম প্রথমের হিসেবে মেয়েটার উপর সে একটু বেশি চাপ ফেলছে। রায়ান নিজেকে শান্ত করে একটা বড় দীর্ঘশ্বাস ফেলে মিরায়ার কপালে আর দুই গালে ছোট্ট চুমু খেয়ে তার উপর থেকে সরে এসে ড্রাইভিং সিটে বসে নিজেকে ঠিক ঠাকই করে নিলো-

"জামা ঠিক করে নাও। কিছু করছি না আর এখন।"

মিরায়া নিজের জামা ঠিক করে নিয়ে বসে রইল চুপচাপ, তার নিশ্বাস এখনো ভারী। রায়ান গাড়ি স্টার্ট করে মনে মনে আফসোস করে বিড়বিড় করলো-

"বউ মায়াবী হলে যে এতো জ্বালা কে জানতো। এমন কাঁদো কাঁদো মুখ দেখলে কিছু করা সম্ভব নাকি..! Oh Allah.. How can she turn me on like that, any time?..That's why, I love her more and more and more.."

মিরায়া চুপচাপ আবারো রায়ানের হাত জড়িয়ে ধরে রায়ানের কাঁধে মাথা রেখে বসলো। রায়ান মিরায়াকে একহাতে জড়িয়ে নিলো আর দেরি না করে এক হাতে স্টেয়ারিং ধরে গাড়ির স্পিড বাড়িয়ে চালাতে শুরু করলো।

___

এই দিকে বাকি দুটো গাড়ির থেকে একদম বিপরীত দৃশ্য রুদ্রর গাড়িতে দেখা যাচ্ছে। গাড়িতে যে আদোতেও কেউ আছে তা বলা মুশকিল। রুদ্র বা রিমি কেউই কথা বলছে না। রুদ্রর মাথায় এক চিন্তা ঘুরছে- রাতে রায়ান আর মাহির তাকে যা বলেছে তা না করতে পারলে মানসম্মান কিছু থাকবে না আবার এই দিকে রিমিকে কিভাবে রাজি করাবে বা তার মনের কথা কিভাবে বের করবে তাও বুঝতে পারছে না‌‌। এতো শক্ত মন মানসিকতার মেয়ে সে এর আগে দেখে নি, হয়তো এই জন্যই রিমিকে তার পছন্দ। রিমি গাড়ির মাঝে ছিল বলেও মনে হয় নি কারণ তার নজর ছিল বাইরের প্রকৃতিতে। রুদ্র ও আর কিছু বলতে পারলো না। এতো লম্বা সফর কেউ কারো সাথে কথা না বলে কাটিয়েছে. কি ভাবা যায়! কি জানি কোন ঝড়ের পূর্বের নীরবতা ছিল এটা।

___

বিকেল-৪টা

ঢাকার রাস্তার জ্যামের কারণে বাড়িতে ফিরতে ফিরতে বিকেল হয়ে গেছে। এর মাঝে দুপুরের খাওয়ার জন্য বিরতী নিয়েছিল সবাই। রায়ান আর মাহিরের গাড়ি চৌধুরী বাড়ির সামনে এসেই থামে তবে রুদ্র রিমিকে তার বাড়িতে পৌঁছে দিতে গেছে। রায়ান আর মিরায়া গাড়ি থেকে নামতেই দেখলো বাড়িটা বেশ সুন্দর করে সাজানো বাইরে থেকে। ঠিক বিয়ে বাড়ির মতো নয় তবে বলা যায় এর কম আয়োজন ও নয়। গাড়ির আওয়াজে বাড়ির ভেতর থেকে রামিলা চৌধুরী রায়হান চৌধুরী তাড়াহুড়ো করে ভীষণ উৎসাহ নিয়ে বেড়িয়ে আসেন। মিরায়া এতো দিন পর রামিলা চৌধুরীকে দেখে বেশ শান্তি অনুভব করছিল যেন নিজের মায়ের কাছে ফিরে এসেছে। রামিলা চৌধুরী একপ্রকার দৌড়ে এসে মিরায়াকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বললেন-

"আল্লাহ.. আমার বাড়ির লক্ষ্মী আমার বাড়িতে ফিরেছে। আমি স্বপ্ন দেখছি না তো!"

মিরায়াও কেঁদে ফেলল-"মামণি...আমি সরি। আমি ঠিক করি নি।"

রামিলা চৌধুরী মিরায়ার দুই গালে হাত রেখে বললেন-

"তুই সরি বলছিস কেন মা। আমি সরি। আমি ঠিক করি নি তোর সাথে। আমার জন্য...!"

কথাটা শেষ করার আগেই রায়ান মাকে কিছু একটা ইশারা করলো যেন অ্যাকসিডেন্ট এর কথা টা মিরায়ার সামনে না আসে। সব সুন্দর স্বাভাবিকভাবে চলছে এর মাঝে পুরোনো কাসুন্দি ঘাটলে আবার বিগড়ে যাবে। রামিলা চৌধুরী না বুঝেও চুপ করে গেলেন। এই দিকে মিরায়া ভেবেছে হয় তো রামিলা চৌধুরী বিয়ের বিষয়টা লুকানোর কথা বলছেন। মিরায়া রামিলা চৌধুরীকে জড়িয়ে ধরে আশ্বাস দিলো-

"আমি আর কখনো বাড়ি ছেড়ে যাব না মামণি। তুমি কেঁদো না। আমি জানি তুমি কষ্ট পেয়েছ। তোমার ছেলে তো আমাকে আনতে যায় নি একবারও। কেন পাঠাওনি আমাকে ফিরিয়ে আনতে?"

রামিলা চৌধুরী মিরায়ার অভিযোগে অবাক হলেন। রায়ান মাকে বোঝাতে চাইলো মিরায়া কিছু জানে না। আসলে রায়ান সত্যি বলতে চাইছে না তার একমাত্র কারণ এতে করে মা আর বউয়ের মাঝে সুসম্পর্ক নষ্ট হতে পারে। অতীতে যা ঘটেছে পুরোটাই ভুল বুঝাবুঝি, ওটা কেন্দ্র করে আরো ভুলবোঝাবুঝি যেন তৈরি না হয় তাই রায়ান কিছু বলে নি মিরায়াকে। রামিলা চৌধুরী নিজের ভুলের জন্য যথেষ্ট অনুতপ্ত, মায়ের মন- ছেলের জন্য যেমন কাঁদে, মেয়ের জন্যও তাই। রামিলা চৌধুরী মিরায়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে নিজের চোখের পানি মুছে বললেন-

"সরি মা, ওকে মেরে পাঠানো উচিত ছিল তোকে আনতে। আমি পারি নি। মাফ করে দে তোর মামণিকে। আর হবে না। তুই ঠিক আছিস তো?"

মিরায়া উল্টো রায়ানের দোষ দিয়ে রামিলা চৌধুরীকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল-

"আমি ঠিক আছি মামণি। তুমি সরি বলো না। তোমার ছেলে তো আমাকে ভালোই বাসে না তাই যায় নি। সব দোষ উনার আমি জানি।"

রায়ান অপলক দৃষ্টিতে মা আর বউয়ের মিল দেখছে। সকল পুরুষের স্বপ্ন সে বাস্তবতায় উপভোগ করছে। এর চেয়ে শান্তি যেন আর কিছুতে নাই। এর জন্য সব দোষ নিজের ঘাড়ে নিতেও তার বিন্দুমাত্র দ্বিধা নেই। রায়হান চৌধুরী রায়ানের কাঁধে হাত রেখে নীরব সাবাসি দিলেন- তার আজ ছেলের বিচার বিবেচনা নিয়ে গর্ব হচ্ছে খুব। যে ছেলে মা আর বউয়ের মধ্যকার সম্পর্কে মিষ্টতা আনতে সক্ষম সেই সাংসারিক জীবনে বিজয়ী। রায়হান চৌধুরী রায়ানকে জড়িয়ে ধরে ধীরে বললেন-

"I am so proud of you my son..."

রায়ান ও বাবাকে জড়িয়ে ধরলো -

"Thank you, Abbu..তোমার থেকেই শিখা সব।"

বাবা ছেলে নীরব হেঁসে একে অপরকে ছাড়লে রায়হান চৌধুরী মিরায়ার কাছে গিয়ে বললেন-

"কই দেখি দেখি, আমার বউমা কে।"

মিরায়া রায়হান চৌধুরী কে সালাম দিয়ে জড়িয়ে ধরে জিজ্ঞেস করলো-

"বাবা... তোমার শরীর ঠিক আছে? সব ওষুধ ঠিক সময়ে খেয়েছ তো?"

রায়হান চৌধুরী হালকা হেসে বললেন-

"আমি ঠিক আছি মা। সবই ঠিক আছে। বাড়িতে শুধু তোর কমতি ছিলো এখন সেটাও পুরন হয়ে গেল।"

রায়হান চৌধুরী মিরায়াকে পা থেকে মাথা অব্দি দেখে রামিলা চৌধুরীকে উদ্দেশ্য করে বললেন-

"রোকেয়া তো ভুল বলে নি, দেখেছে রামিলা শরীরের কি হাল করেছে মেয়েটা? যা ছিল তাই কম ছিল এখন তারও অর্ধেক হয়ে গেছে।"

রামিলা চৌধুরীও মিরায়াকে দেখে চোখে চিন্তা ভাব নিয়ে মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিলেন। রায়হান চৌধুরী রায়ানের মাথা একটা গাট্টা মেরে বললেন-

"ওর শরীরের এই অবস্থা কেন খাওয়াস নি কিছু এই কয় দিন?"

রায়ান নিজের মাথা হাত ঘষতে ঘষতে মিরায়ার দিকে তাকালো। মিরায়া অবাক রায়ান কে দেখে মিটিমিটি হাসছে দেখে রায়ান মনে মনে বিড়বিড় করলো-

"ওকে খেয়েই কুল পাইন নি। খাওয়াব কি?"

রায়ান মনের কথা মনে দাফন করে অভিযোগ সূচক গলায় বলল-

"তোমার বউ মা খায় না। আমি কি খেতে না করি? তার জেদ বেশি। সব সময় খাবে না বলে জেদ ধরে থাকলে কিভাবে হয় বলো। আমি পারি নি, তাই তোমাদের কাছে দায়িত্ব দিলাম। তোমরা সামলাও।"

রামিলা চৌধুরী সবার মধ্যকার মিল দেখে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন-

"আজ কত দিন পর বাড়িটাকে বাড়ি মনে হচ্ছে, বলে বোঝানো যাবে না। খুব মনে পরেছে আগের দিন গুলো।"

-"বউমা কে পেয়ে মেয়ে ভুলে যেও না মামণি! আমার কথা মনে পরেনি তাই না।"

পিছন থেকে সোরায়া জোরে চেঁচিয়ে কথা টা বলে দৌড়ে রামিলা চৌধুরীর কাছে এলো। মাহির গাড়ি থেকে নেমে এসে রায়হান চৌধুরীকে সালাম দিয়ে কোলাকুলি করে কুশল বিনিময় করতে থাকলো। রামিলা চৌধুরী সোরায়ার মুখটা দেখে মুচকি হেঁসে বুকে জড়িয়ে নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন-

"কেমন আছিস মা? তোর কি মনে হয় তোর মামণি চাইলেও তোকে ভুলতে পারবে।"

সোরায়া রামিলা চৌধুরীকে জড়িয়ে ধরে জবাব দিল-

"একদম না। আমি ভালো আছি মামণি। তোমাকে দেখে আরো ভালো লাগছে। তুমি ভালো আছো?"

রামিলা চৌধুরী সোরায়ার কথায় হ্যাঁ বললেন। তারপর সবার উদ্দেশ্যে রায়হান চৌধুরী বললেন -

"অনেক হয়েছে, আর ইমোশনাল হয়ে বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে না। সবাই ভেতরে এসো। মাহির তুই ও আয়।"

মাহির একটু তাড়া দেখিয়ে বলল-

"না আংকেল আজ না, বাড়িতে ফিরতে হবে। আম্মু খুব চিন্তায় আছেন। আব্বু যে কি বলবে তা জানি না। এই কয় দিন না বিজনেস দেখেছি আর না কলেজে গেছি। অনেক কিছু সামলাতে হবে। অন্য দিন আসবো।"

মাহিরের কথায় সোরায়া একটু দুঃখ পেলো। তারপর সবাই মাহিরের থেকে বিদায় নিয়ে ভেতরে চলে যেতে নিলে মাহির সোরায়ার হাত ধরে আঁটকে নেয়। সবাই এগিয়ে গেছে সোরায়ার দিকে কারো নজর নেই। মাহির সোরায়াকে টেনে একটু আড়ালে এনে বলল-

"আমি রাতে মেসেজ দিবো ঠিক আছে? এখন যেতে হবে।"

সোরায়া মুখ ফুলিয়ে বলল-

"জি আপনি এই মাত্রই সবাইকে বলেছেন। আমি শুনেছি। আবার বলার কি আছে?"

-"সবার সামনে বলা মানে তুমিও বাকিদের মতো হয়ে গেলে। তুমি আমার জন্য বাকিরা নও তাই আবার বলছি আলাদা করে।"

সোরায়া চুপ থাকলো বলে মাহির সোরায়ার গালে হাত রেখে নিজের দিকে ফিরিয়ে বলল-

"মুখ ভার কেন শুনি? একদম মন খারাপ করবে না। কাল সকালে নিতে আসবো। কলেজের জন্য রেডি থাকবে।"

হঠাৎ মাহির নিতে আসার কথা শুনে সোরায়া অবাক হলো-

"আপনি কেন নিতে আসবেন। আমি যেতে পারবো। আসতে হবে না।"

মাহির গভীর গলায় বলল-

"তোমার মতামত চাওয়া হয় নি কেবল জানানো হয়েছে। কাল নিতে আসবো আমি আর তুমি আমার সাথেই কলেজে যাবে। And that's final..ভেতরে যাও এখন। আমাকে যেতে হবে।"

সোরায়া আর কি বলবে, চুপ করে মাথা নেড়ে চলে আসতে নিলো-"আচ্ছা, ঠিক আছে।"

সোরায়াকে যেতে দেখে মাহির হঠাৎ পিছু ডাকলো-

"জান বাচ্চা...!"

সোরায়ার পা থমকে গেলো। মাহির তাকে কি নামে ডাকলো এটা! ঘুরে দাঁড়ানোর মতো শক্তি পাচ্ছিল না বলে আর ফিরলো না শুধু দাঁড়িয়ে থাকলো। মাহিরের নিজের ও হঠাৎ এমন পরিবর্তনে কেমন অদ্ভুত লাগছে তবে সে জানে সময়ের সাথে সাথে এটা কেটে যাবে। মাহির সোরায়ার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো -

"ডাকলাম তো সাড়া দিলে না যে?"

সোরায়া লজ্জায় মাথা নিচু করে বলল-

"এমন ডাকে কিভাবে সাড়া দেয় আমার জানা নেই।"

মাহির অবাক হলো না, এর থেকে বেশি আর কি আশা করবে। সে নিজেও জানে না কেমন ধরনের সাড়া আশা করছিল সে। মাহির সোরায়ার মাথায় হাত রেখে নিজের হাতের উপরে চুমু দিয়ে বলল-

"এবার যাও। রাতে মেসেজ দিলে সাথে সাথে রিপ্লাই করবে। আমি যাচ্ছি।"

সোরায়া মাহিরের চুমুর আওয়াজ পেল তবে স্পর্শ নয়। এই নিয়ে অভিযোগ করার সাহস ও নেই তার। তাই নীরবে মাহির কে বিদায় দিয়ে বাড়ির ভেতরে চলে এলো।

_________

বিকেল-৫টা

রুদ্রর গাড়ি ঠিক রিমির বাড়ির মোড়ে গিয়ে থেমেছে। রিমি লম্বা সফরে ক্লান্ত হয়ে গাড়িতেই ঘুমিয়ে গেছে। প্রায় ১ঘন্টা ধরে রুদ্রর গাড়ি একই মোড়ে দাঁড়ানো। পলকহীন চোখে রুদ্র তার সামনে একঘুমন্ত পরীকে দেখে যাচ্ছে এই এক ঘন্টা ধরে। বাড়ি চলে এসেছে এমন তাড়া দিয়ে রিমিকে ঘুম থেকে ডেকে তোলার চেষ্টা সে করে নি বরং আরো নীরব পরিবেশ চাইছে যেন আরো কিছু টা সম। রিমিকে দেখে তার সাথে কাটাতে পারে। হঠাৎ রিমি একটু নড়ে উঠতেই তার এক গুচ্ছ চুল মুখের উপর এসে পড়লো যা রুদ্র কে তার খুব কাঙ্ক্ষিত দৃশ্য দেখা থেকে বাঁধা দিচ্ছে। রুদ্র রিমির চুল গুলোতে আলতো হাতে দিতে রিমির দিকে এগিয়ে গেলে হঠাৎ তার হাত স্লিপ করে যায় আর সে ব্যালেন্স হারিয়ে রিমির উপরে চলে আসে। রিমি তখনও উঠে নি। রুদ্র চোখ খুলতেই রিমিকে নিজের খুব কাছে আবিষ্কার করলো। তারপরই তার খেয়াল হলো তার ঠোঁট রিমির ঠোঁট কে স্পর্শ করছে। রুদ্র চোখ বড় বড় করে নিয়ে রিমির ঠোঁটের উপর থেকে নিজের ঠোঁট সরিয়ে নিয়ে নিজের মুখ হাত দিয়ে ঢেকে ফেলল-

"I...Kissed her...Did I just kiss her? না এটা কল্পনা। আমি..কিস..না না!"

রিমি নিজের মুখের উপর উষ্ণ নিঃশ্বাস এর উপস্থিতিতে ধীরে ধীরে চোখ খুলল। রিমি ঠিক মতো কিছু বোঝার আগেই রুদ্র রিমিকে ঘুম থেকে জাগতে দেখে ওভাবে রিমির কাছাকাছি থাকা অবস্থাতেই চেঁচিয়ে উঠলো -

"আমি কিছু করি নি..কসম খোদার! রিমি, আমি কিছু করি নি। আমার কথা বিশ্বাস করুন আমি ইচ্ছে করে করিনি।"

রিমি ঘুমের ঘরে রুদ্র কে তার কাছে এমন ভাবে চেঁচাতে দেখে নিজেও থতমত খেয়ে গেল-

"আপ..আপনি আমার এতো কাছে কেন? কি হচ্ছে এখানে? আমি কোথায়? কি করেছেন আপনি আমাকে। অসভ্য ইতর লোক।"

রুদ্র রিমির চেঁচানো যে আরো ঘাবড়ে গেল। রিমির মুখে হাত রেখে রিমিকে চুপ করিয়ে বলল-

"চেচাবেন না প্লিজ। let me explain myself..আমি আপনাকে কিছু করি নি। শান্ত হয়ে আমার কথা শুনুন প্লিজ।"

রিমি প্রথমে রুদ্রর মুখ চেপে ধরাতে ভয়ে ছটফট করলেও রুদ্রর কথায় ধীরে ধীরে একটু শান্ত হয়। রিমি শান্ত হলে রুদ্র নিজের হাত সরিয়ে নিয়ে তাকে বুঝিয়ে বলতে চেষ্টা করলো-

"আমরা আপনার বাড়ির মোড়েই আছি। আপনি ঘুমাচ্ছিলেন তাই ডাকিনি‌। আমরা চলে এসেছি।"

রিমি ডানে বামে না তাকিয়ে হুট করে গাড়ি থেকে নেমে গিয়ে রুদ্র কে বলল-

"অনেক হয়েছে, এবার বাড়ি যান। আর থাকতে হবে না এখানে। রুদ্র নিজের দিকে থেকে কিছু বলবে তার আগেই রিমি আরো জোরে চেঁচিয়ে বলল-

"কোনো কথা না, যেতে বলেছি আমি। এখনি যান এখান থেকে।"

রুদ্রর হৃৎপিণ্ড বাইরে বেরিয়ে আশার উপক্রম। কয়েক সেকেন্ডে কি হয়ে গেল তার কিছুই মাথায় ঢুকছে না। রিমি হাইপার হয়ে যাচ্ছিল বলে রুদ্র না পারতে তাড়াতাড়ি গাড়ি ঘুরিয়ে রাস্তার দিকে চলে গেল। রুদ্রর চলে যাওয়ার পর রিমি নিজেও হতবাক, সে রুদ্রর উপর চেচালো কেন? রুদ্র কিছু করেনি এমন বলল কেন? কিছুই তার জানা হলো না। তাহলে গাড়িতে এমন কি হয়েছে?

রুদ্র স্টেয়ারিং ঠিক মতো ধরতে পারছে না তার হাত কাঁপছে। মাথায় শুধু কিছু সময় আগের দৃশ্য। রুদ্র এক হাতের কাঁপা কাঁপা আঙুল ছুয়ালো নিজের ঠোঁটে। তার বিশ্বাস হচ্ছে এমন কিছু হয়েছে।

-"না, না আমি কিছু করি নি। এমন হলেও সেটায়ামি করি নি। অ্যাকসিডেন্টে হয়ে গেছে। ওহ আল্লাহ কি করে ফেললাম এটা?"

রুদ্র বিরক্তি যে কয়েকবার নিজের গালে থাপ্পড় বসালো।

-"আমি কি রিমির ঘুমের সুযোগ নিলাম? উফফফ্! কি হয়ে গেল এটা? শেষে কিনা এভাবে আমার কপালে প্রথম চুমু লিখা ছিল! না কোনো অস্বস্তি না কোনো ফিলিংস, how can this happen just like that! এই চুমু কি চুমু হলো নাকি।"

রুদ্র গাড়িটা চালিয়ে বেশ অনেক টা দূরে এসে গাড়ি থামিয়ে নিজেকে অনেক বুঝিয়েও শান্ত করতে পারছে না। বারবার একই চিন্তা একই দৃশ্য মাথায় ও চোখে ভাসছে। রুদ্র বিরক্তি যে নিজের মাথা খামচে ধরে নিজের সাথে কথা বলছে-

"আমার কি খুশি হওয়া উচিত? না অনুতপ্ত হওয়া উচিত? পছন্দের মানুষের ঠোঁট স্পর্শ করে সামান্য খুশি হলে কি পাপ হবে? ধুর...হওয়ারই যদি ছিল তাহলে ভালো করে হলো না কেন? এই আফসোস কোথায় রাখবো আমি! রিমি কিচ্ছু জানে না, কেন জানে না? ওনার জানা উচিত উনার উপর শুধু আমার অধিকার এখন।"

রুদ্র কি থেকে কি চিন্তা করছে সে জানে না। রিমির কাছাকাছি যাওয়াতে খুশি হওয়ার অধিকার টুকু সে দাবি করতে পারছে না।

-"না না, রিমিকে জানাতে হবে। I touched her, what touch- I kissed her, so she is mine now, for forever..রিমিকে আমারই হতে হবে সেটা যেকোনো মূল্যে হক।"

____________

রাত-১০টা

বাড়িতে ফিরে সকলেই অনেক সুখ দুঃখের আলাপ করেছে। রাতের খাওয়া শেষ হয়েছে সবার। রায়ান উপরে নিজের ঘরে। রামিলা চৌধুরী, মিরায়া আর সোরায়া কেবল রান্নাঘরে সব গোছগাছ করছে। মিরায়া সোরায়াকে ধমক দিয়ে ঘুমাতে যেতে বলল-

"বনু, ঘুমতে যা এখন। আমি আর মামণি করে নেব বাকিটা। কাল থেকে কলেজ যাবি। পড়া লেখা সব চাঙ্গে তুলা শেষ। এখন বইগুলো একটু খুলে দেখ। ধুলো পরে গেছে হয়তো।"

সোরায়া রামিলা চৌধুরীর কাছে অভিযোগ করলো-

"দেখেছ মামণি আপু কেমন করে। আজকের দিনে আর কি করবো?"

মিরায়া উল্টো বলল-

"তোকে কি পড়তে বসতে বলেছি? বললাম বইগুলোর কি অবস্থা একটু দেখ গিয়ে। ইঁদুরে গেল নাকি আবার কে জানে।"

রামিলা চৌধুরী দুইবোনের কথা শুনে হেঁসে খাবার টেবিলের কাছে গেলেন সব থালা বাসন গুলো আনতে। উনি যাওয়ার পর সোরায়া মিরায়াকে একা পেয়ে প্রশ্ন করলো-

"পড়াশোনা থেকে বিয়ে অনেক ভালো। পড়াশোনার চাপ বহন করা অনেক কষ্টকর। তাই না আপু?"

মিরায়া দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সোরায়ার ভ্রান্ত ধারণা দূর করতে বিয়ের বাস্তবিক দিক তুলে ধরতে বলল-

"পড়াশোনার চাপ বহন করা ৮০ কেজির একটা মানুষের চাপ বহন করার চেয়ে বেটার। তুই এখন বুঝবি না বনু।"

সোরায়া কিছু বোঝেনি এমন ভাব নিলেও মনে মনে মুচকি হাসলো। মিরায়া আবার সাথে সাথে নিজেকে শুধরে নিয়ে বলল -

"ও বাবা, আমি আবার কাকে বলছি সে বুঝবে না। এসবে তো PHD করছিস তুই ওই সব ডার্ক বই পড়ে পড়ে।"

সোরায়া মিরায়ার কথায় ভেংচি কেটে নিজের ঘরে যেতে যেতে বলল-

"পারলে তুমিও একটু পড়ো। কাজে দেবে। আমার উপন্যাস পড়া নিয়ে খোটা দিবা না। হুউ্!"

মিরায়া সোরায়ার কথায় পাত্তা না দিয়ে কাজে মন দিলো। চুল গুলো তাকে জ্বালাতন করছিল বলে একটা কাঁটা দিয়ে সেগুলো উপরে বেঁধে নিলো। রামিলা চৌধুরী টেবিল থেকে। সব থালা বাসন এনে বেসিনের উপর রাখার পর মিরায়ার দিকে তাকাতেই খেয়াল করলো মিরায়ার গলা ঘাড়ে আর পিঠের দিকে টানা কয়েকটা কালো দাগ। প্রথমে বুঝতে পারেন নি বলে মিরায়ার কাছে গিয়ে দাগ গুলোর উপর আঙ্গুল দিয়ে দেখে মিরায়াকে চিন্তিত গলায় প্রশ্ন করলেন-

"মিরা...তোর গলায় এই গুলো কিসের দাগ?"

মিরায়া চোখ বড় বড় করে নিয়ে একটু দূরে সরে গেল। হাত দিয়ে দাগ গুলো ঢাকার বৃথা চেষ্টা করলো। এখন এই প্রশ্নের কি উত্তর দেবে তা ভাবতেই তার ভিতরে সব গুলিয়ে যাচ্ছে। মিরায়ার এমন ভয়ার্ত মুখ দেখে রামিলা চৌধুরী বাকিটা বুঝে নিলেন। মিরায়া নিজের মতো করে কিছু একটা বানিয়ে বলার চেষ্টায় আমতা আমতা করে বলল-

"কিছু না মামণি, মশা কামড়েছে হয়তো।"

রামিলা চৌধুরী মেয়েটাকে এমন ঘাবড়ে গিয়ে মিথ্যা বলতে দেখে ঠোঁট কামড়ে হেঁসে সেই উত্তর মেনে নিলেন-

"ওহ আচ্ছা, মশা..কামড়েছে!"

মিরায়া চুল গুলো আবার খুলে দিয়ে বাসন গুলো ধুতে শুরু করে দেয়। এই দিকে মিরায়া এখনো ঘরে আসছিল না বলে রায়ান অধৈর্য হয়ে ঘর থেকেই মিরায়াকে কল করলো তাড়াতাড়ি ঘরে আসতে বলবে বলে। ফোনটা হঠাৎ বাজতেই রামিলা চৌধুরী মিরায়াকে বললেন-

"তোর ফোন এসেছে, রিসিভ কর।"

মিরায়ার হাতে ফ্যানা ছিল বলে সে রামিলা চৌধুরীকে দেখতে বলল কে কল করেছে-

"কে কল করেছে মামণি..? দেখো তো।"

রামিলা চৌধুরী রায়ানের নাম স্ক্রিনে ভাসতে দেখে ফোনটা এগিয়ে দিয়ে বললেন-

"তোর মশা কল করেছে। নে কথা বল।"

মিরায়ার ভেতরকার অনুভুতির আসলে বর্ণণা হয় না। এমন লজ্জায় হয়তো সে কখনো পড়েনি। মিরায়া তাড়াতাড়ি হাত ধুয়ে ফোনটা নিয়ে রায়ানের কলটা কেটে ফোন সাইলেন্ট করে দিলো। রামিলা চৌধুরী মিরায়ার কর্মকাণ্ড দেখে মনে মনে হাসছেন। মিরায়া লজ্জায় লাল হয়ে গেছে। রামিলা চৌধুরীর চোখে চোখ পড়তেই বানোয়াট হেঁসে বলল-

"সরাসরিই কথা বলে নেব মামণি। কল ধরতে হবে না এখন।"

রামিলা চৌধুরী আর কিছু বললেন না। মিরায়ার মুখ দেখে তার মায়া হলো- মনে হচ্ছে লজ্জায় মাটির নিচে চলে যাবে মেয়েটা। রায়ান অনেক বার কল করার পরও যখন মিরায়াকে করে পেল না। বাধ্য হয়ে নিচে চলে এলো। আর রান্নাঘরে উঁকি ঝুঁকি মারতে শুরু করলো। রায়ান কে এমন ভাবে উঁকি মারতে দেখে রামিলা চৌধুরী রায়ানকে উদ্দেশ্যে করে প্রশ্ন করলেন-

"আমার রান্নাঘরে কি তোর? উঁকি দিয়ে কি দেখিস?"

মিরায়া রায়ানের দিকে তাকিয়ে দেখলো। রায়ান বরাবরের মতো ঠোঁট কাঁটা, মায়ের সামনে তো আরো বেশি। কি যে বলবে তারা ভয় পাচ্ছিল মিরায়া। রায়ান মিরায়ার ভয়কে সত্যি প্রমাণিত করে সোজা সরল ভাষায় বলল-

"তোমার রান্নাঘরে আমার বউ আছে। ওটাই দেখছি। আমাকে আমার বউ দিয়ে দাও। তোমার রান্নাঘরে ফিরেও তাকাবো না।"

মিরায়া মাথা হাত দিয়ে দিলো। আজ সবাই এভাবে তাকে লজ্জায় ফেলছে কেন তার মাথায় ধরছে না। রামিলা চৌধুরী এমন বেপরোয়া ছেলের কি করবে নিজেও ভেবে পেলেন না । নিজের সম্মান রক্ষার্থে নিজেই ওখান থেকে নিজের ঘরে চলে গেলেন।

মা চলে যাওয়ার পর রায়ান সোজা রান্নাঘরে গিয়ে মিরায়াকে জড়িয়ে ধরে জিজ্ঞেস করলো-

"কতগুলো কল দিয়েছি ফোন কোথায় তোমার ? দেখনি কেন?"

মিরায়ার কথা বলতেই ইচ্ছে করছিল না রায়ানের সাথে তখন তাই চুপ রইল। হঠাৎ রায়ান কেমন বাচ্চা দের মতো করে বলল-

"I missed you baby..."

মিরায়া অবাক হয়ে প্রশ্ন করল-

"মাত্র কয়েক মিনিট হয়েছে উপরে গেছেন। এতটুকু সময়ই মিস?"

রায়ান মিরায়ার গলায় মুখ গুজে মিরায়ার কোমরে নিজের হাতের বিচরণ করতে শুরু করলো। ওভাবেই মিরায়ার কোমর দুই হাতে আঁকড়ে ধরে প্রশ্ন করলো-

""বেইবি, তোমার কোমর এতো চিকন কেন? একটু মোটা তো হও।"

মিরায়া বেশ চালাকি করে নিজের শরীরের গঠন পারফেক্ট আছে বোঝাতে বলল-

"কেন? আপনি ওই গানটা শোনেন নি?"

রায়ান কৌতুহলে মিরায়ার গলার থেকে মুখ উঠিয়ে জিজ্ঞেস করলো-

"কোন গান?"

মিরায়া সুরে সুরে গাইলো-

"আরে এইটা- kamar patli, Ho jitni bhi, Maza utna

Nashila hai..."

রায়ান তো বউয়ের এই রূপ দেখে অবাক-

"আসতাগফিরুল্লা, তওবা তওবা।"

মিরায়াও অবাক হলো যেন ভূতের মুখে রাম নাম -

"ইসস্! কি ভালো মানুষ।"

রায়ানের বুকে ধাক্কা দিয়ে বলল।

রায়ান ঠোঁট কামড়ে হেঁসে বলল-

"ভালো না হয়ে উপায় আছে? নাহলে পরের লাইন আমাকে

গাইতে হবে।"

-"কোন লাইন?"

রায়ান ও একই সুরে পরের করি গাইলো-

"এইযে এইটা- Main karu to sala

Character dhila hei.."

দুইজনেই একসাথে হাসলো। রায়ান মিরায়ার ঠোঁটের দিকে অগ্রসর হলো। হঠাৎই তখন কলিং বেল বেজে মিরায়া রায়ানকে সরিয়ে দিয়ে দৌড়ে দরজা খুলতে যায়।

দরজা খুলেই মিরায়া আশ্চর্যতার চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে গেলো-

"রুদ্র ভাইয়া...রিমি..তুই?"

চলবে...

পাখিরা। বল কেমন হয়েছে। আর পরের পর্ব টা একদম চমলোক্ক হবে। পরের পর্ব তাড়াতাড়ি পেতে 2k react 300 comment done করে আমিকে খবর দিও। এর আগে পাবা না। love you pakhis 🥰 ❤️

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৫৭তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন