ফন্ট সাইজ:
থিম:
আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ

৬৬তম পর্ব

লেখক: অরাত্রিকা রহমান

#আত্মার_অঙ্গীকারে_অভিমোহ #Soul_bound_obsession

#Oratrika_Rahman_অরাত্রিকা_রহমান

#Part_66 (1st)

(কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ)

(প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য উন্মুক্ত)

ফেব্রুয়ারি, ১২~

সকাল প্রায় সাতটা। শীত আর গরমের মাঝামাঝি এই সময়টায় আবহাওয়ার ভেতর এক অদ্ভুত মিশ্র অনুভূতি থাকে। বাতাসে হালকা শীতল ছোঁয়া, কিন্তু রোদের ভেতর আবার নরম উষ্ণতা। পূর্ব আকাশে সূর্যটা ধীরে ধীরে ওপরে উঠছে, তার আলো মাটির ওপর সোনালি আস্তরণ বিছিয়ে দিচ্ছে।

মিরা আর রায়ানের বেড রুমের টাইলছেও সূর্যের কিরণের চাকচিক্যতা ফুটে উঠছে। বিছানার সাদা কম্ফোরটারের মাঝে রায়ানে উন্মুক্ত পিঠটা উঁকি দিচ্ছে। ছেলেটার চোখে মুখে ক্লান্তি আর শান্তি দুটোই উপস্থিত। হঠাৎ রায়ান মুখের উপর ধাপ করে একটা কাপড় এসে পড়লো। রায়ান ঘুমের ঘোরে চমকে উঠে বিগড়ানো মেজাজে বলে উঠলো-

"Who the fu** is here..?!"

সাথে সাথে আরেকটা কাপড় উড়ে এসে তার মুখের উপর পড়লো। একটা মেয়েলি কন্ঠ ভেসে এলো-

"Fu** কি হ্যাঁ!? আমি আপনার বউ।"

রায়ান ঘুম ঘুম চোখে সোজা তাকিয়ে দেখলো মিরা বিরক্ত মুখে আলমারির সব জামা কাপড় এলো মেলো করছে। ভেজা চুল থেকে টপটপ করে পানির ফোঁটা গুলো বেয়ে বেয়ে পড়ছে। রায়ান চোখ কোচলে মিরাকে ভারী কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো-

"রোজ সকালে একা শাওয়ার নেওয়ার জন্য বকা শুনো আমার থেকে। আজকেও একই কাজ করেছ কেন জানতে পারি?"

মিরা বাঁকা চোখে রায়ানের দিকে তাকিয়ে বলল-

"আমি রোজই আপনাকে ডাকি। আপনিই তো বলেন আপনার ঘুম পুরো হয়নি আরো ঘুমাবেন। আমি কি করবো তাহলে?"

রায়ান উঠে বিছানায় হেলান দিয়ে বলল-

"কিছু করতে হবে কেন? যতক্ষণ আমি শুয়ে থাকবো তুমি আমার সাথে শুয়ে থাকবে।"

মিরা সোজা উত্তর দিল-"পারবো না। আপনার অফিস আপনার তাই যখন খুশি যেতে পারবেন, আমার ক্যাম্পাসে এসব চলে না।"

রায়ান মনে মনে বিড়বিড় করলো-"সবকিছুর উত্তরেই এক কথা, পারবো না। পারবে টা কি তাহলে!?"

মিরা রায়ানের দিকে আর পাত্তা না দিয়ে আলমারি তে মনোযোগ দিলো। রায়ান চারপাশে চোখ বুলিয়ে দেখলো সম্পূর্ণ বিছানায় জাগায় জাগায় এলোমেলো জামা কাপড় পড়ে আছে সাথে মিরার ইনার গুলো ও ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। রায়ান ভ্রু কুঁচকে মিরাকে জিজ্ঞেস করল-

"কি অবস্থা করেছ রুমটার! কি খুঁজছো আলমারি তে?"

-"পড়ার জন্য জামা খুঁজছি।"

রায়ান অবাক হয়ে বলল-

"কই যাবা তুমি?"

মিরা চোখ ছোট ছোট করে রায়ানের দিকে তাকিয়ে বলল-

"এখন একদম নিজের কথা থেকে নড়বেন না বলে দিচ্ছি। আজকে আমার জীবনের প্রথম ভোট দিতে যাওয়ার কথা। ভুলে গেছেন?"

রায়ান মাথা চুলকাল- তার মনে পড়লো গত রাতের কাহিনী। মূলত গতকাল দুজনের ছোট খাটো একটা কথাকাটাকাটি হয়েছিল- মিরা তার প্রথম ভোট দিতে যেতে চায় আর রায়ান চায় না সে বাইরে বের হোক ভোটের সময় (যেহেতু ওই সময় পরিবেশ খুব বিশৃঙ্খল থাকে)। অবশেষে দুজনের মাঝে ডিল হয়েছিল সাড়া রাত যদি মিরা রায়ানের কথা শোনে তাহলে কাল সাড়া দিন রায়ান মিরার কথা শুনবে। রাত তো পাড় হয়েই গেছে। গোটা রাত মিরা লক্ষ্মী বউয়ের মতো রায়ানের সব আবদার রেখেছে। এবার রায়ানের কথা রাখার পালা।

রায়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে মিরাকে বলল-

"ওহ হ্যাঁ, মনে পড়েছে। তা এতো জামা কাপড়ের মধ্যে যেকোনো একটা পড়ে নিলেই তো হয়। সবকিছু এলোমেলো করেছ কেন?"

মিরা চোখে মুখে বিরক্তি আর হতাশা নিয়ে বলল-

"ধুর, একাও হয় না আমার। কি হয়েছে কে জানে কোনো জামা পড়ে শান্তি নেই। অসহ্য লাগে। আমি কি মোটা হয়ে গেছি?"

রায়ান আশ্চর্য চোখে মিরাকে পা থেকে মাথা অব্দি দেখে বলল-

"তোমার এই দুই রতির শরীর আমাকে সহ্য করে নেয় এটাই আমার অনেক বড় ভাগ্য।"

মিরা হতাশায় দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বিছানায় এসে ধপ করে বসে পড়লো। রায়ান মিরার কাছে গিয়ে মিরাকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে জিজ্ঞেস করলো-

"আমার মিল্কিবার, কি হয়েছে? লাগলে আরো ড্রেস কিনে নিও। এগুলো আর পড়তে হবে না। ঠিক আছে? মন খারাপ করে না।"

মিরা মুখ ভার করেই রইল। রায়ান মিরাকে খেপাতে নিজের হাত গুলো উঁচু করে নিজের সামনে ধরে নিজের হাতের উদ্দেশ্যে বলল-

"Well done, Great job..so proud of you.."

মিরা রায়ানের দিকে তাকিয়ে অবাক গলায় জিজ্ঞেস করলো-

"পাগল হয়ে গেছেন নাকি? কিসব বলছেন?"

রায়ান সন্তুষ্ট মনে মিরাকে জড়িয়ে ধরে বলল-

"আমাকে আগে অনেকেই বলেছে আমার হাতের রাশি ভালো‌। আজ প্রথম সেটার প্রমাণ পেলাম।

মিরা চোখ বাঁকিয়ে রায়ানের দিকে মাথা ঘুরিয়ে তাকালো-

"Excuse me Mr. Chowdhury..কি নিয়ে কথা বলছেন আপনি?"

রায়ানের চোখ দুটো চকচক করে উঠলো। সে মিরার প্রশ্নের জবাবে মিরার গলা ও পেটের মাঝ বরাবর অংশে চোখ রেখে বলল-

"My sweet little butter balls are growing up..খেয়াল করেছ বেইবি?"

মিরার গাল দুটো লজ্জায় লাল হয়ে উঠলো। রায়ানের বুকে মৃদু আঘাত করে দূরে ঠেলে দিয়ে বলল-

"যার মাথায় যা চলে তার খেয়াল তো সেদিকেই থাকবে। আমার মাথায় এসব চলে না তাই খেয়ালও করি নি। অসভ্য একটা!"

রায়ান এক গাল হেঁসে বলল-

"ওমনি অসভ্য হয়ে গেলাম। তোমার কোনো আইডিয়া আছে, আমি কত হার্ড ওয়ার্ক করেছি ওদের বড় করতে?"

মিরা মেজাজ দেখিয়ে বিছানা থেকে উঠে গিয়ে বলল-

"জি, আছে। আপনি সব হার্ড ওয়ার্ক আমার উপরেরই করেছেন।"

মিরা রেগে আলমারি টা লাগিয়ে দিয়ে ঘর থেকে বের হতে যাবে তখনি রায়ান পিছন থেকে চেঁচিয়ে জিজ্ঞাসা করলো-

"হৃদপাখি, বলে তো যাও এর পরের বার কত সাইজ আনতে হবে?"

মিরা রায়ানের প্রশ্নে আরো রেগে ফ্লোর থেকে আরেকটা জামা তুলে রায়ানের দিকে ছুঁড়ে মেরে চেঁচিয়ে বলল-

"আপনার দাদিকে গিয়ে জিজ্ঞেস করুন কত সাইজ লাগবে।"

রায়ান ঠোঁট কামড়ে হেঁসে বলল-

"দাদির টা তো দাদা জানতো। তা দিয়ে আমার কাজ নেই। তুমি আমাকে তোমারটা বলো।"

মিরা আরেকটা জামা ফ্লোর থেকে তুলে ছুড়ে মেরে ঘর থেকে ফুঁসতে ফুঁসতে বের হলো-

"কি এক নির্লজ্জের সাথে বিয়ে হয়েছে আমার। মুখে কিছুই আটকায় না।"

মিরাকে সকাল সকাল জ্বালিয়ে রায়ানের বেশ স্বস্তি অনুভব হলো। সেও উঠে ফ্রেশ হতে গেলো।

________

আজ ভোট বলে সবকিছু বন্ধ। সোরায়াও আজ কলেজে যেতে পারবে না, মাহিরের সাথে দেখাও হবে না তার আজকে। বেচারির মুখে বিষন্নতা চেয়ে গেছে। একা একা জানালার সামনে দাঁড়িয়ে থেকে আনমনা হয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে ফোনটা উঠিয়ে মাহির কে মেসেজ করালো। কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে অপর পাশ থেকে রিপ্লাই ও এলো।

সোরায়া মাহিরের রিপ্লাই পেয়ে পুলকিত হয়ে জিজ্ঞেস করলো-

"আপনি কি বাসায়? কি করছেন এখন?"

মাহির গাড়িতে ছিল। একহাতে স্টেয়ারিং ঘুরিয়ে গাড়ি চালাতে চালাতে বলল-

"নাহ, বাইরে। এই তো ড্রাইভ করছি। আমার জান কি করে?"

সোরায়া মাহিরের রিপ্লাইয়ের জবাবে বলল-

"সে আপাতত কিছু করছে না। আচ্ছা, আপনি সাবধানে ড্রাইভ করুন। বাড়িতে ফিরে টেক্সট দিয়েন কেমন?"

অপর পাশ থেকে সাথে সাথে রিপ্লাই এলো-

"আমি বাম হাতে টেক্সট করছি। আর সাবধানেই ড্রাইভ করছি। আমার জান পাখির কি কিছু হয়েছে?"

সোরায়ার মুখে স্বাভাবিক ভাবেই একটা মিষ্টি হাঁসি ফুটে উঠলো। জানালার সামনে থেকে সোজা বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়লো মেসেজ টাইপ করতে করতে।

-"তেমন কিছু না। এমনি ভালো লাগছে না কিছু।"

মাহির উদ্বিগ্ন হয়ে গাড়ি থামিয়ে মেসেজ টাইপ করলো-

"কেন? কি হয়েছে?"

-"কিছু হয় নি।"

-"কল দিবো জান?"

-"নাহ, আপনি ড্রাইভ করুন সাবধানে।"

-"কিছু খাবা? চিপস? আইসক্রিম? ফুল লাগবে?"

সোরায়া হাসতে থাকলো নিজে নিজে। কিছু হাসির ইমোজি সেন্ড করে দিয়ে লিখলো-

"আহা, কিছু লাগবে না। কলেজ নেই তাই একটু বোর হচ্ছি।"

-"আচ্ছা, শুনো না। বাইরে যাবা? ওহ, না, আজ তো ভোট। আজকে না। বাড়িতে দুই ভাই ভাবি আছে, আপু আছে ওদের সাথেই থাকো কেমন।"

সোরায়া একটা সেড ইমোজি দিয়ে লিখলো-

"I am missing you.."

মাহির একটা হার্ট ইমোজি লাগিয়ে লিখলো-

"I am coming.."

সোরায়া মাহিরের মেসেজটা পড়ে ফট করে উঠে বসলো। সোরায়া ফটাফট মেসেজ লিখলো-

"কিহ্! মানে কি?"

অপর পাশ থেকে সোজা জবাব এলো-

"মানে, I am missing you too.. তোমাকে মনে পড়ছে মানে তোমাকে দেখতে হবে আমার। আসছি আমি। বাই।"

সোরায়া বোকা বনে গেল। মাহির তাকে দেখতে আসছে এটা নিয়ে খুশি কিন্তু বাড়ির সবাই বিষয়টা কিভাবে নেবে তা নিয়ে সে দ্বিধায় ছিল।

____________

এই দিকে সকালের দৃশ্য রিমি আর রুদ্রর ঘরে সম্পূর্ণ বিপরীত। এই কয়েক মাসে দুজনের বেশ ভালোই ভাব হয়েছে। এখন দুজনেই সুন্দর মতো সংসার করছে। নির্ঘুম রাত পার করে দুজনেই ক্লান্ত হয়ে ঘুমাচ্ছে। রিমি আরামে রুদ্রর বুকের উপর ঘুমিয়ে আছে রুদ্র ও রিমি জড়িয়ে ধরে আছে। আজ রিমির ও মিরার সাথে ভোট দিতে যাওয়ার কথা। কিন্তু তার ঘুম এখনো ভাঙেনি।

দুজনেরই ঘুমের বেঘাত ঘটলো দরজার শব্দে। মিরা দরজায় ধাক্কা দিয়ে রিমিকে ডাকলো-

"রিমি...রিমি... ওই মরা..! উঠবি না? কবে ভোট দিতে যাবো? সবাই ভোট দিয়ে শেষ করে ফেলল বেলট পেপার, ওদের মার্কারের কালিও শেষ হয়ে যাবে। উঠ না।"

মিরার আওয়াজে রিমির ঘুম ভাঙলো। রিমি মিটিমিটি চোখ খুলে হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে চোখ কচলে রুদ্রর বুকের উপর থেকে মাথা তুলতে নিলে রুদ্র রিমিকে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ঘুম ঘুম গলায় বলল-

"উমম্! কই যাও!? শুয়ে থাকো না..!"

রিমি ও ঘুমের ঘোরে বলল-

"উফফফ্! ছাড়ুন। সকাল হয়ে গেছে তো। কে যেন ডাকছে।"

রুদ্র রিমিকে ছাড়লো না। মিরা আবার দরজায় ধাক্কা দিয়ে বলল-

"ওই..রিমি..!"

রিমি আবারো উঠতে চাইলে রুদ্র বিরক্ত হয়ে রিমিকে ছেড়ে দিয়ে উল্টো দিকে ফিরে উপুড় হয়ে শুয়ে রিমিকে বলল-

"ধুরু বাল...যাও..! আমাকে তো তুমি ভালোইবাসো না।"

রিমি আহাম্মকের মতো তাকিয়ে রইল- আর কিভাবে নিজের ভালোবাসা প্রকাশ করবে সে?! রিমি জেদ করে একটা বালিশ উঠিয়ে রুদ্রর পিঠে ঠাস করে মেরে বলল-

"সারা রাতের জ্বালাতন সহ্য করার পর বলছেন আমি আপনাকে ভালোইবাসি না। তাই না?"

রুদ্র আর্তনাদ করে বলে উঠলো-

"আউউউ্, রাতের খোটা দেও কেন? তখন কন্ট্রোল থাকে না তাই তো কষ্ট হয় তোমার। তা নাহলে আমি কি তোমাকে কষ্ট দেই বলো?"

রিমি বিছানা থেকে নেমে মেজাজ দেখিয়ে সোফায় পড়ে থাকা ওড়না টা গায়ে জড়িয়ে নিয়ে দরজার দিকে যেতে যেতে বলল-

"হ্যাঁ হ্যাঁ, আপনি তো ভাজা মাছটাও উল্টে খেতে জানেন না। ভালো মানুষ একদম। আর তাও বলবে আমি ভালোবাসি না তাকে।"

রুদ্র উল্টো হয়ে শুয়ে থেকেই বলল-

"ভাজা মাছ খাওয়ার ইচ্ছাও নেই আমার। আমি আমার ডাল ভাত খেয়েই খুশি।"

রিমি চোখ বাঁকা করে রুদ্রর দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করলো-

"ভেবে ছিলাম হয়তো ভদ্র লোক। আস্ত শয়তান একটা বেডা।"

মিরা আবার দরজায় হাত দিয়ে যাবে রিমি গরম মেজাজে ঠাস করে দরজাটা খুলে মিরার উদ্দেশ্যে বলল-

"ওই..কি হয়েছে তোর?"

মিরাও এক মেজাজ নিয়ে বলল-

"কি হয়েছে মানে? তুই না আজকে ভোট দিতে যাস?"

রিমি ভোট দেওয়ার কথা শুনেই নিজের রাগ ভুলে গেল। তার মাথাতেই ছিলো না আজ যে ১২ তারিখ। রিমি মাথায় হাত দিয়ে বলল-

"এই যা...মনে নাই তো।"

মিরা তাড়া দিয়ে বলল-"যাবি কিনা তাই বল।"

রিমি নিজের দিকে চেয়ে মিরাকে নরম গলায় বলল-

"মিরু, জান, তুই গিয়ে রেডি হো। আমি ৫ মিনিটে ফ্রেশ হয়ে আসছি।"

মিরা ছোট ছোট চোখ করে তাকিয়ে বলল-

"দরজা খুলেই আমার উপর চেঁচিয়ে এখন জান মারাও না?"

রিমি মিরার উদ্দেশ্যে দাঁত বের করে হিহি করে বানোয়াট হেঁসে বলল-

"রাগ করে না জান। মেজাজ খারাপ ছিল তোর ভাইয়ার জন্য। তুই অপেক্ষা কর একটু আমি আসছি।"

মিরা মনে মনে বিড়বিড় করলো- "দুই ভাই একই রকমের।"

________

সবাই ভোট দিতে বাইরে যাবে তাই সবাই তৈরি হয়েই রয়েছে। খাবার টেবিলে সবাই গবেষণা করছে ভোট কোন দলে দিবে। গবেষণায় শুধু রায়ান কোনো অংশগ্রহণ করছে না। সে দশটা কথার মাঝে একটা দুটো কথা বলছে সেটাও শুধু মিরা যেন ভোট দিতে না যায় তার জন্য রামিলা চৌধুরী ও রায়হান চৌধুরীকে উস্কানি দিতে। মিরা রায়ানের কথার ধরন ঠিকই বুঝতে পারছে। রায়হান চৌধুরী মিরাকে উৎসাহিত করতে বললেন-

"মিরা, তোর অনুভূতি বলতো মা। কেমন লাগছে প্রথমবার ভোট দিবি।"

মিরার চোখ দুটো চকচক করে উঠলো। নিজের জবাবে কিছু বলতে যাবে তার আগেই রায়ান নিজের বাবার উদ্দেশ্যে বলে উঠলো-

"আব্বু...তুমি আর ওকে উস্কানি দিও না তো। বাচ্চা মেয়ে, ওর ভোট দিতে যেতে হবে কেন এতো ভীরের মাঝে? ও না গেলেও ওর ভোট হয়ে যাবে। শুধু শুধু কেন লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দিতে হবে ওর আমার মাথার ধরছে না।"

রায়ানের কথায় মিরা চোখ মুখ কালো করে নিয়ে বলল-

"আপনার মাথা ছোট তাই ধরছে না বুঝেছেন? আমি যাবো মানে যাবোই।"

রায়হান চৌধুরী রামিলা চৌধুরীর সাথে চোখাচোখি করে মিটিমিটি হাসলেন। তখনি সদর দরজা দিয়ে মাহির বাড়ির ভেতরে ঢুকলো।

-"গুড মর্নিং এভরিওয়ান।"

সবাই এক সাথে মাহিরের দিকে ঘুরে তাকালো। সোরায়া মাহিরের উপস্থিতে নিজের মাথা নিচু করে নিল। মাহির খাবার টেবিলের দিকে এগিয়ে আসলে রামিলা চৌধুরী চেয়ার থেকে উঠতে যান। তখনি মাহির ওনাকে বাঁধা দিয়ে বলল-

"আরে আন্টি তুমি উঠছ কেন? বসো বসো।"

রামিলা চৌধুরী বসে পড়লেন। মাহির গিয়ে রায়ানের কাঁধে জোরে হাত রেখে বলল-

"তুই ওঠ। এতো বড় ছেলে থাকতে মা কেন উঠবে?"

রায়ান মাহির দিকে তাকিয়ে মুখ বাঁকিয়ে বানোয়াট হেঁসে বলল-

"হবু সম্বন্ধীর বাচ্চা..!একবার তোকে একা পাই পরে বোঝাবো।"

মিরা সোরায়ার দিকে খেয়াল করলো। সোরায়া আর নিজের মাথা তোলে নি। মাহিরের হাতে ব্যাগ ভর্তি স্নেক্স। রায়ান মাহিরের হাত থেকে ব্যাগ গুলো নিয়ে আড় চোখে সোরায়ার দিকে তাকালো। তারপর মাহিরের উদ্দেশ্যে বলল-

"হাহ্! বাচ্চা মানুষ কে বউ করতে চাইলে যা হয় আর কি।"

মাহির রায়ানের কথা তুচ্ছ জ্ঞ্যান করে বলল-

"তোর কি? আমার বউ যা চায় তাই খাবে। I will spoil her.."

-"বউ না, হবু বউ..!"

মাহির সোরায়ার কাছে গিয়ে ওর পাশের চেয়ারটা টেনে বসতে বসতে বলল-

"হয়ে যাবে। তুই চিল কর।"

মাহির পাশে বসতেই সোরায়া মাথা তুলে আড় চোখে মাহিরের দিকে তাকালো। মাহির সোরায়ার মাথায় হাত দিয়ে তার চুলে হাত বুলিয়ে চোখ টিপে ইশারা করলো। সোরায়া তৎক্ষণাৎ লজ্জায় মাথা আরো নিচু করে নিল। মাহির মুচকি হেঁসে সবার উদ্দেশ্যে বলল-

"Please don't mind us.."

সবাই না পারতেই হেঁসে উঠলো। রায়হান চৌধুরী মাহিরের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করলেন-

"মাহির, সোরা মায়ের কলেজ তো প্রায় শেষ। তোমরা চাইলে এবার পারিবারিক ভাবে বিষয় টা আগানো যায়। এখনো সোরায়ার চাচা চাচি কে কিছু জানানো হয়নি। ওনাদেরও তো জানাতে হবে। কি বলো?"

সোরায়া বিয়ের বিষয়ে কথা উঠতেই একটু মেয়েলি স্বভাবে নিজেকে মুড়ে নিল। মাহির আর সোরায়ার ব্যাপারে রামিলা চৌধুরী আর রায়হান চৌধুরী দুজনেই জানেন। সোরায়ার বয়সের জন্য এখনও বিষয় টা উভয় দিক থেকে এগোয়নি। মিরা সোরায়ার জন্য সময় চেয়েছিল আর মাহির তাতে কোনো আপত্তি করে নি।

মাহির নিজের উত্তরে খুব দৃঢ়তা নিয়ে বলল-

"আংকেল আমি তো কবে থেকেই রা..!"

পুরোটা শেষ করার আগেই সোরায়া মাহিরের হাতে চিমটি কাটলো। মাহির মৃদু আর্তনাদ করলো- "আউউউ্.."

সবাই মাহিরের দিকে তাকালো। সোরায়া কিছু না জানার ভাব ধরে বসে রইল মাথা নিচু করে। মাহির বুঝলো সোরায়া চাইছে না সে কোনো ঠোঁট কাঁটা কথা বলে তাকে লজ্জায় ফেলুক। মাহির আবার নতুন করে নিজের জবাব সাজিয়ে বলল-

"সরি। আসলে আংকেল সোরার পরীক্ষা ছিল তাই আমি আর এই ব্যাপারে আগাই নি। যদি আপনারা ভাবি চাচা চাচি সবাই সম্মতি দেন তাহলে আমার কোনো আপত্তি নেই।"

রামিলা চৌধুরী মাঝ থেকে বললেন-

"মাহির, রোকেয়া আর শফিক ভাইয়ের সাথে কথা বলতে হবে এই নিয়ে কিন্তু আমরা রাজি হলেই তো হলো না। সীমা ভাবি আর ভাইজানের ও তো তাদের ছেলেকে নিয়ে একটা আশা আছে। বাড়ির একমাত্র ছেলে তুই। একবার তাদের সাথে কথা বলে দেখ।"

রায়ান ও মায়ের কথায় সম্মতি দিয়ে বলল-

"সেটাই তো আন্টি কে আগে বলে দেখ কি বলে।"

সোরায়া ঘাবড়ে মাথা তুলে মাহিরের দিকে তাকালে মিরা সোরায়ার চোখে অস্বস্তি দেখলো। মিরা সোরায়ার উদ্দেশ্যেই তাকে একটু সাহস দিতে নিজে উদ্যোগ নিয়ে বলল-

"তোমরা এতো অগ্রীম ভাবছো কেন বলো তো? চাচা চাচি কে আমি মেনেজ করে নেব। মাহির ভাই একজন এ্যালিজিবল ব্যাচেলর। চাচা চাচি কখনো আপত্তি করবে না।"

সোরায়া মিরার কথায় একটু স্বস্তি পেল। মাহির মিরার কথার প্রেক্ষিতে বলল-

"আমি যাকেই পছন্দ করবো আমার বাবা মা তাতেই আমার সঙ্গ দেবে। আর তা না হলেও তাদেরকে রাজি করানোর দায়িত্ব আমার তোমরা এতো ভেব না। আমি বাড়িতে জানাবো সব শীঘ্রই।"

মাহির টেবিলের নিচে সোরায়ার হাতটা শক্ত করে ধরে কথাটা বলল। কথার টপিক পাল্টে রায়হান চৌধুরী সবার উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করলেন-

"তা তোমরা কোন দলের হয়ে ভোট দিতে চাইছো?"

রায়ান মিরার উরুর উপরে রাখা হাতে হাত রেখে মিরার কানের কাছে ঝুঁকে বলল-

"আমার বউয়ের দলে..!"

মিরা না চাইতেও এক গাল হেঁসে হাত নিজের হাত রায়ানের হাতের উপর থেকে সরিয়ে নিলো। মিরা হাত সরিয়ে নিতেই রায়ানের হাত মিরার উরুর উপর গিয়ে পড়লো। রায়ান মিরাকে জ্বালাতে দুষ্টু হেঁসে নিজের হাতের বাঁধন মিরার উরুতে শক্ত করতেই মিরার চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেল। সে তৎক্ষণাৎ রায়ানের হাতের উপর আঘাত করে সরিয়ে দিল। রায়ান ঠোঁট কামড়ে হেঁসে নিজের মুখ আড়াল করলো। মিরা লজ্জায় মাথা নিচু করে বসে রইল।

খাওয়া দাওয়া শেষে রায়ান মিরাকে আর রুদ্র রিমিকে নিয়ে বের হয় ভোট দেওয়াতে নিয়ে যাওয়ার জন্য। ভোট দিয়ে দুজনেই অদ্ভুত রকমের খুশি। রায়ান রুদ্রর প্রতিক্রিয়া তাদের বউদের দেখে ছিল দেখার মতো- একটা ভোট দিয়ে এতো আনন্দ হতে পারে তাদের জানা ছিল না। যদিও দিন শেষে তাদের মাথায় একটাই প্রবাদ বাক্য-"Happy wife, happy life.."

_________

১৩ই ফেব্রুয়ারি~

ঠিক আর ১০মিনিট পাড় হলেই ভালোবাসা দিবস। সকালে রায়ান সেই যে অফিসের কাজে বের হয়েছিল আর তার পাত্তা পাওয়া যায় নি। কিছুক্ষণ আগেই রুদ্র রিমিকে নিয়ে একটা ডিনার ডেটে গেলো। প্লেন টা রুদ্ররই ছিল। রুদ্র রিমিকে রেডি হতে বলার পর রিমি ঝটপট রেডি হয়ে রুদ্রর সাথে বেরিয়ে গেছে। মাঝ রাতের পর মাহিরের সোরায়ার সাথে দেখা করার অনুমতি নেই বলে মাহির বাড়ির নিচে এসে সোরায়াকে রেপিং পেপারে মুড়া এক ঝুড়ি উপহার দিয়ে গেছে। আর এখন সোরায়া বন্ধ ঘরে এসব এক এক করে খুলে খুলে দেখছে।

মিরা কখনো এই দিন গুলো নিয়ে কোনো চিন্তা করেনি এমনকি এসব নিয়ে আলোচনা হলেও বন্ধু দের এড়িয়ে যেত। তখন এড়িয়ে যাওয়াটা ঠিক ঠেকলেও আজ কেন যেন মেয়েটা তার চারপাশের প্রেম নিবেদনে জোড় জড়িত। মিরা একা ঘরে কিছুক্ষণ আনমনে বসে রইল।

ঘড়ির কাঁটায় এখন ১২.১৫ বাজছে। মিরা সময় দেখে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফোনটা খুলে মেসেজ অপশনে ঢুকলো- এই আশায়, হয়তো রায়ান একটা মেসেজ করে তাকে ভালোবাসা দিবসের শুভেচ্ছা জানিয়েছে। কিন্তু এমন কিছুই ঘটেনি। মিরার চোখ দুটো হঠাৎ ছলছল করে উঠলো। বিছানায় ফোনটা ছুঁড়ে ফেলে চোখের জল মুছতে মুছতে নিজে নিজে বলল-

"আমাকে আপনি একটুও ভালোবাসেন না। একটুও না। আই হেট ইউ।"

মিরা কম্ফোর্টারটা মুড়ি দিয়ে বিছানায় চুপ করে শুয়ে পড়লো। চোখের পানি নিজের মতো বয়ে চলেছে।

১২.৩০ মিনিট~

ড্রয়িং রুমে ঢুকতে ঢুকতে রায়ান নিজের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করল-

"Oh god..I am late..আজকে আর রক্ষা থাকবে না আমার।"

সিঁড়ি দিয়ে মিরাকে চেঁচিয়ে ডাকতে ডাকতে উঠালো-

"হৃদপাখি?...মিরা...! বেইবি..!"

মিরা রায়ানের গলা শুনে সাথে সাথে নিজের চোখের পানি মুছে নিল। রায়ান ঘরে ঢুকেই মিরাকে এভাবে শুয়ে থাকতে দেখে দ্রুত বিছানায় এসে মিরার কাঁধে হাত রেখে ঝাঁকিয়ে চিন্তিত কন্ঠে জিজ্ঞেস করল-

"পাখি...কি হয়েছে? Are you sick?"

মিরা চুপ করে রইল। চোখ বন্ধ তার। রায়ান নিজের জায়গা নিয়ে মিরার পাশে শুয়ে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে জিজ্ঞেস করল-

"কথা বলবে না?"

মিরা নীরবতা ভেঙে কান্না ভরা গলায় বলল-

"অনেক রাত হয়েছে, আপনার খাবার নিচে টেবিলে রাখা আছে। খেয়ে এসে শুয়ে পড়ুন।"

রায়ান মিরার গলা শুনে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার যে মস্ত বড় ভুল হয়ে গেছে দেরি করে তা সে হারে হারে বুঝতে পারছে। রায়ান মিরার কোমর জড়িয়ে ধরে একহাতে মিরার মাথায় রেখে তাকে কে শান্ত গলা বোঝাতে চাইলো-

"বেইবি, একবার আমার কথাটা শুনো..!"

মিরা রায়ানের হাত তার কোমর থেকে সরিয়ে দিয়ে নিজের মাথাও সরিয়ে নিল। গায়ে কম্ফোর্টারটা ভালো করে জড়িয়ে নিয়ে বলল-

"আমি ঘুমাবো।"

রায়ান বুঝলো সোজা কথায় কাজ হবে এমন পরিস্থিতি আর নেই। রায়ান বিছানা থেকে উঠে সোজা মিরার পাশে গেল। হঠাৎ করেই মিরা এক ঝাঁকিতে নিজের চোখ খুলল। নিচের দিকে তাকিয়ে দেখলো সে এখন শূন্যে ভাসছে। মিরা পড়ে যাওয়ার ভয়ে রায়ানের গলা জড়িয়ে ধরে কাঁদো কাঁদো মুখেই প্রশ্ন করলো-

"কি হচ্ছে টা কি? কেন আমাকে শুধু শুধু বিরক্ত করছেন? আমি কি কিছু বলেছি আপনাকে?"

রায়ান মিরার কথার প্রতি উত্তরে কথার রেশ ধরে রেখেই বলল-

"হাজার বার বিরক্ত করবো। আমার বউ তুমি। আমার জ্বালাতন সহ্য করতে হবে তোমার।"

মিরা নিস্তব্ধ হয়ে গেল। রায়ান মিরাকে আয়নার সামনে নিয়ে গিয়ে দাড়া করিয়ে দিয়ে বলল-

"২ মিনিটে রেডি হয়ে নিচে এসো আমি বাইক বের করছি। Hurry up..!"

রায়ান নিচে চলে যেতে নিলে মিরা জেদ দেখিয়ে বলল-

"পারবো না। আমি কোথাও যাবো না। আর ২ মিনিটে রেডি হওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না।"

রায়ান ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল-

"আমার বউ যথেষ্ট সুন্দরী, ২ মিনিট ও তার জন্য অতিরিক্ত। এখন আমার কথা না শুনার ভুল করলে মনে রেখো- ছোট্ট একটা ভুল, সাড়া রাতের কান্না। Choose wisely..!

রায়ান কথাটা বলেই বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। মিরা মনে মনে রায়ানকে হাজারটা গালিগালাজ করে কোনো মতো তৈরি হয়ে নামলো। রায়ান বাইক বের করে মিরার হেলমেট নিয়ে বাইকে বসে আছে। মিরা মেজাজ নিয়ে হেঁটে বাইকের সামনে এসে দাঁড়ালো চোখ তার অন্যদিকে। রায়ান মিরাকে পা থেকে মাথা অব্দি একবার দেখে মিরার কোমর জড়িয়ে নিজের কাছে টেনে মিরার গালে পড়ে থাকা চুল গুলো আলতো হাতে সরিয়ে কানের পিছনে গুঁজে দিয়ে তার ফর্সা গালে ছোট্ট চুমু খেয়ে বলল-

"চুল গুলো বেঁধে নেও পাখি। আমাকে ডিস্টার্ব করছে ওরা।"

মিরা বিরক্ত হয়ে রায়ানের দিকে তাকিয়ে তার বুকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে নিজের চুল খোঁপা করে নিল। রায়ান মুচকি হেঁসে মিরাকে হেলমেট টা পড়িয়ে দিয়ে বলল-

"Hoop on..baby..!"

মিরা নিজের হেলমেটের ভিসর গ্লাসটি উঠিয়ে গম্ভীর গলায় বলল-

"আমি রাইড করবো।"

-"মিরা...সব সময় জেদ ভালো লাগে না। আমার একটা কথা শুনো না তুমি।"

-" আপনার কথা আমি অনেক শুনি আপনি আমার একটা কথা শুনেছেন কখনো? আমিও শুনবো না আর। হয় আমাকে রাইড করতে দিন নয়তো আমি চললাম।"

মিরা পিছন ফিরে বাড়ির ভেতরে যেতে নিলেই রায়ান মিরার হাত ধরে ফেলল। মিরা একটা শয়তানি হাসি দিয়ে থমকে দাঁড়ালো। রায়ান মিরাকে থামিয়ে বলল-

"ঠিক আছে।"

মিরা উৎফুল্ল হয়ে জিজ্ঞেস করলো-"সত্যি?"

রায়ান সাথে একটা শর্ত জুড়ে দিল-

"হুম সত্যি। কিন্তু একটা শর্ত আছে।"

-"কি শর্ত..!"

-"রাইড করার সময় বাইকের স্পিড যত থাকবে তুমি আমাকে ঠিক ততগুলো চুমু খাবে।"

মিরা ভড়কে উঠে বলল-

"মানে? আমি মোটেও এমন কিছু করবো না। আমি না চাইলেও বাইকের স্পিড অনেক বেশি উঠে যাবে। আমার অভ্যাস নেই স্লো রাইডিং এর।"

রায়ান শয়তানি হাসি হেঁসে বলল-

"আমি তো সেটা জানি মিস রায়া। এবার তোমার ইচ্ছে বাইক চালাতে চাও না নাকি,চাও না।"

মিরা আপ্লুত নজরে রায়ানের বাইকটা কে দেখলো। রায়ান যেদিন থেকে এই বাইকটা কিনেছে সেদিন থেকেই এই বাইকটা চালানোর স্বপ্ন দেখছে সে। বরের চুমুর প্রতি আসক্তির কাছে তার বাইকের প্রতি আসক্তি মোটেও হারবে না। মিরা স্পষ্ট করে রায়ান কে বলল-

"ঠিক আছে আমি রাজি। যত স্পিড তুলবো ততগুলোই চুমু দিব। কিন্তু আমাকে আপনি প্রমিস করুন- চুমু দেওয়ার পর আর বেশি কিছু চাইবেন না।"

রায়ান খুশি মনে তখন মিরার কথায় রাজি হয়ে গেল-

"ওকে ডান, চাইবো না।"

মনে মনে নিজেকে বলল-

"বউয়ের কাছে চাওয়ার কি আছে? পরে আমার যা ইচ্ছা করবে আমি নিজেই করতে পারবো। চাইবো না।"

রায়ান বাইক থেকে নেমে মিরাকে বসতে দিল। আর নিজে পিছনে বসলো। যে মিরা একটু আগে কাঁদছিল এখন বাইক পেয়ে রীতিমতো খিলখিলিয়ে হাসছে। রায়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে মিরাকে জিজ্ঞেস করল-

"আমাকে একটা সত্যি কথা বলো তো- তুমি আমাকে ভালোবাসো না আমার বাইক কে।"

মিরা নিজের ঝুমকা ঝুলানো চাবিটা ঘুরিয়ে বাইক স্টার্ট দিয়ে বলল-

"Of course, it's you hubby.. আমি আপনাকে ভালোবাসি। আর সাথে আপনার সব কিছুই ভালোবাসি। আপনার বাইকও।"

রায়ান মিরার নাটকীয় উত্তর শুনে বানোয়াট হেঁসে বলল-

"হ্যাঁ, তা তো দেখতেই পাচ্ছি।"

মিরা ঠোঁট কামড়ে হেঁসে রায়ানকে বেশ ভাব নিয়ে বলল-

"Hold on to me tight..আমি কোনো পর নারী না।"

রায়ান মিরার কোমর একহাতে জড়িয়ে ধরে বলল-

"যেইনা কোমর... এটা টাইট করে ধরলে যে, কি হবে! কে জানে। সেদিন যদি জানতাম রায়া তুমি, আমাদের বাসর টা সেদিনই হতো।"

মিরা রায়ানের পেটে কনুই মেরে বলল-

"মুখে লাগাম দিন। ওইসব দিনের হিসেব এখনো বাকি আছে। কিচ্ছু ভুলি নি আমি। শুধু সময় হয়ে উঠছে না।"

রায়ান কথা ঘুরিয়ে বলল-

"আচ্ছা নিও হিসেব পরে এখন চলো। অনেক কাজ আছে।"

_________

৩০ মিনিট রাইড করার পর মিরা বাইকটা একটা আলোকিত বাড়ির সামনে দাঁড়া করায়। দুজন বাইক থেকে নেমে নিজেদের হেলমেট টা খুলল। মিরা কিছু বুঝতে না পেরে রায়ান কে প্রশ্ন করলো-

"এটা কার বাড়ি? আগে তো কখনো আসি নি। কোনো আত্মীয়ের বাড়ি নাকি?"

রায়ান মিরা দিকে এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলো-

"বাড়িটা সুন্দর না?"

মিরা বাড়ি টার দিকে তাকিয়ে বলল-"হুম। অনেক সুন্দর।"

-"তোমার পছন্দ হয়েছে?"

-"মানে?"

-"কিছু না। চল দেখি বাড়িটা কার।"

মিরা রায়ানের হাত ধরে রায়ান কে থামিয়ে বলল-

"আপনার কি মাথা খারাপ? কার না কার বাড়ি। আমরা দেখে কি করবো। এতো রাতে কেউ দেখলে চোর ভাববে আমাদের।"

রায়ান উল্টো মিরার হাত ধরে জোর করে মিরাকে বাড়ির নেইম প্লেটের সামনে নিয়ে গিয়ে বলল-

"আরে ধুর, চোর ভাববে কেন? শুধু কার বাড়ি সেটাই তো জানতে চাইছি আমরা।"

-"আমি মোটেও জানতে চাইছি না। আমি জেনে কি করবো?"

রায়ান মিরাকে জোর করে বলল-

"উফফফ্ এতো কথা বলো কেন? সব মজা শেষ করে দিচ্ছ। দেখই না কার বাড়ি।"

মিরা রায়ানের সাথে আর তর্কে পেরে উঠলো না। সোজা দাড়িয়ে নেইম প্লেটের নিচে ঝুলতে থাকা দড়িটা টানলো। সেই সঙ্গে নেইম প্লেটের উপর থেকে লাল চকচকে কাপড়টা ও সরে গেল। নেইম প্লেটটার উজ্জ্বল আলো মিরার চোখে লাগলো। মিরা ছোট ছোট চোখ করে তাকিয়ে দেখলো খুব পরিচিত একটা নাম জলজল করছে। চারপাশে আলোর সামঞ্জস্যতা হয়ে এলে মিরা অস্পষ্ট কণ্ঠে নামটা বিড় বিড় করে পড়লো-

"Heartbird mention...owner- Mr and Mrs chowdhury??"

মিরা ভাঙা গলায় আওড়ালো- "মা..মানে...!"

রায়ান মিরার কাঁধের কাছে ঝুঁকে এসে মিরার সামনে একটা চাবি ঝাঁকিয়ে বলল-

"ওয়েল কাম টু আওয়ার হোম, মাই ডিয়ার হার্টবার্ড।"

চলবে...

পরের পার্ট কালকে আসবে। একটু ধৈর্য ধরো কেমন। আর একটু রেসপন্স করো। তোমাদের কমেন্টের আশায় থাকবো। Love you pakhis ❤️ 🥰

#আত্মার_অঙ্গীকারে_অভিমোহ #Soul_bound_obsession

#Oratrika_Rahman_অরাত্রিকা_রহমান

#Part_66 (2nd) (18+)

(কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ)

(প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য উন্মুক্ত)

মিরা কিংকর্তব্যবিমু হয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে রইল। গলা দিয়ে কোনো কথা বেরোচ্ছে না মেয়েটার। মিরার কোনো হেলদোল নেই বলে রায়ান পিছন থেকে সামনে এসে চিন্তিত কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো-

"ওই..রিয়েক্ট করো না কেন?"

মিরা রায়ানের দিকে অবুঝ চাহুনিতে তাকালো। তার মাথায় ঢুকছে না রায়ান ঠিক কেমন রিয়েকশন আশা করছে তার থেকে। মিরা নজর ঘুরিয়ে আলোকিত সাদা রংয়ের ডুপ্লেক্স বাড়িটার দিকে তাকিয়ে দেখলো, ঠিক পরেই আবার নেইম প্লেটের দিকে তাকিয়ে উজ্জ্বল নামটা পড়লো। রায়ান অধৈর্য হয়ে মিরার হাতটা নিজের হাতে নিয়ে মিরার হাতের তালুতে বাড়ির চাবিটা দিয়ে বলল-

"আরে ধুর, এক নাম কতবার পড়বা? তোমার কি সন্দেহ হচ্ছে যে আমি অন্য কারো বাড়ি আমাদের বলে চালিয়ে দিচ্ছি?"

মিরা সাথে সাথে মাথা টর্নেডোর গতিতে নাসূচক নেড়ে বলল-

"আরে না না, তা না। আমাদের বাড়ি বলতে...! কবে হলো এটা সেটাই বুঝতে পারছি না।"

রায়ান দম ফেলে নিজের মাথা চুলকে বলল-

"আজই হলো। পুরো ছয় মাস লেগেছে জানো?"

মিরা চোখ বড় বড় করে জিজ্ঞেস করল-

"ছয় মাসসস..!"

রায়ান কথা পাল্টে মিরাকে তাড়া দিয়ে উৎসাহিত গলায় বলল-

"পরে সব বলবো। এখন আমাদের দুজনের ছোট্ট সংসারের উদ্বোধন করো। আমার আর তর সইছে না।"

মিরা রায়ানের চোখে মুখে উদ্বিগ্নতা দেখতে পাচ্ছে। মুচকি হেঁসে মিরা নিজের হাতের চাবিটার দিকে তাকিয়ে বাড়ির মূল দরজার সামনে এগিয়ে দরজায় ঝুলানো বড় তালাটা খুলল। মিরা তালা খুলতে খুলতে মিরাকে বলল-

"এখনও কিছু কাজ বাকি আছে বুঝেছ? এই মেইন গেটটা অটোমেশনে থাকবে- গাড়ির চাবিতে যেমন বাটন ক্লিক করলেই গাড়ি আনলক হয় এই গেটেও তেমন লকও হবে। এখন ওই লাক্সারি টা তোমাকে দিতে পারলাম না। সরি পাখি, তোমাকে হাত দিয়ে তালা খুলতে হলো।"

মিরা তালাটা খুলে মন দিয়ে রায়ানের কথা শুনলো- তার মনটা চাইলো হাতের তালাটা রায়ানের মাথায় মারতে। মিরা মুখে হাসি রেখেই বলল-

"আপনি এতো বেশি বুঝেন কেন? আমি কি একবারও বলেছি আমার তালা খুলতে কষ্ট হচ্ছে? নাকি হাত দিয়ে তালা খুললে হাত খয়ে যাবে আমার?"

রায়ান মিরার কথা কথা শুনে মুখ বাঁকিয়ে বলল-

"ওই ছেমড়ি..তুই বউ বউয়ের মতো থাকবি। আমি ফ্লার্ট করবো তুই মুচকি মুচকি হাসবি, মুখ লুকিয়ে লজ্জা পাবি। এতো প্রেক্টিকাল হইতে হবে কেন তোর?"

মিরা রায়ানের কথায় বিন্দু মাত্র পাত্তা দিল না, রায়ান কথায় তার ভয় লাগবে সেইদিন বহু আগে চলে গেছে। অনেক দিন পর রায়ানের মুখে তুই শুনেও তার হাসি পেল কিন্তু হাসলো না করুণা করে- বেচারা একটু তো নিজের বিরক্তি প্রকাশ করলো! মিরা দরজা টা এক দিক থেকে ঠেলে দিয়ে খুললো। যেই বাড়ির ভিতরে পা বাড়াতে যাবে ওমনি রায়ান মিরার হাত ধরে টেনে সোজা নিজের কোলে তুলে নিয়ে বলল-

"বউকে কোলে করে গৃহ প্রবেশ করার লাক্সারি টা আমি নিজেই নিজেকে দিচ্ছি। So.. be a good wife and cooperate with me.."

মিরা কিছু বলল না, চুপ করে রায়ানের গলা জড়িয়ে রইল। রায়ান মিরাকে তাদের নতুন বাড়ির ভেতরে নিয়ে গেল। বাড়ির বাইরের দেয়ালে হালকা টেক্সচার করা সাদা পেইন্ট। চারপাশে সাজানো সবুজ লন, ছাঁটা ঘাস আর সারি সারি সাদা গোলাপ—সব মিলিয়ে এক পরিপাটি অভিজাত পরিবেশ।

প্রবেশদ্বারটা উঁচু, বড় কাঁচের ডাবল ডোর। দরজার দু’পাশে লম্বা পিলার, আর উপরে ঝুলছে আধুনিক ডিজাইনের ঝাড়বাতি।

কিছুক্ষণ সময় নিয়ে মিরা চার পাশ টা দেখলো। তার পরই সদর দরজা খুলে প্রবেশ করলো।

ভেতরে ঢুকতেই মিরা দেখলো ডাবল-হাইট সিলিং—উপর থেকে নেমে আসা বিশাল ক্রিস্টাল চ্যান্ডেলিয়ার পুরো লিভিং স্পেসটাকে আলোকিত করে রেখেছে। মেঝেতে সাদা মার্বেল, তার উপর হালকা ধূসর নকশা—সবকিছুই পরিষ্কার, ঝকঝকে আর রাজকীয়। ড্রয়িংরুমে সাদা আর বেইজ রঙের সোফা সেট, কাঁচের সেন্টার টেবিল, আর দেয়ালে মিনিমালিস্ট আর্ট। একপাশে বড় কাঁচের জানালা, যেখান দিয়ে সকালবেলার সূর্যের আলো সরাসরি ঘরে ঢুকে পড়ে। রাতে নরম এলইডি লাইটিং আর কর্নার ল্যাম্প ঘরটাকে দেয় উষ্ণ, প্রশান্ত এক আবহ। বাড়িটার কোণা কোণা একদম নিখুঁত ভাবে সাজানোর চেষ্টা করা হয়েছে তা দেখেই বোঝা যায়।

সিঁড়িটা বাড়ির অন্যতম আকর্ষণ—সাদা মার্বেল স্টেপস, পাশে কাঁচের রেলিং আর স্টিলের হ্যান্ডেল। সিঁড়ির ধাপে ধাপে ছোট রিসেসড লাইট বসানো, যা রাতে আলোর সরু রেখা তৈরি করেছে।

মিরা আপ্লুত হয়ে চারপাশ দেখছে। রায়ান মিরাকে কোলে থেকে নামিয়ে দিয়ে বলল-

"So Mrs. Chowdhury...নিজের হাসবেন্ডের পছন্দের একটু তো প্রশংসা করুন। সে যে মুখিয়ে আছে।"

মিরার মুখে সত্যিই কোনো ভাষা নেই। মিরা প্রসস্থ হেঁসে বলল-"আমার বরের পছন্দ ভালো বলেই সে আমার বর।"

রায়ান ঠোঁট কামড়ে হেঁসে মিরার সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলল-

"একটু প্রশংসা করলে, আর এতেও নিজের ভাগ নিতে হবে তোমার?"

-"অবশ্যই..! আমি আপনার অর্ধাঙ্গিনী না?"

-"জি, বউ জান আমার। অর্ধেক না, সব নিয়ে নিন।"

মিরা পায়ের পাতায় ভর দিয়ে রায়ানের গলা জড়িয়ে ধরে রায়ানের গালে ছোট্ট করে এটা চুমু দিল। রায়ান মিরার কোমর জড়িয়ে ধরে দুষ্টু হেঁসে বলল-

"সোফাটা আজ সকালেই এসেছে একটু বসে দেখবে কেমন?"

মিরা ভালো করেই বুঝলো রায়ানের কথার ধারা। সে দূরে সরে গিয়ে স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল-

"No thanks..আমি বাড়িটা ঘুরে দেখব এখন।"

রায়ান মিরার হাত ধরে বলল-

"মাত্র ৫ মিনিটের ব্যাপার পাখি। একটা চুমু খেয়েই ছেঁড়ে দেব।"

মিরা রায়ানের থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে দূরে সরে যেতে যেতে বলল-

"একটা চুমুর জন্য ৫ মিনিট..! আপনার মতলবের ঠিক আছে নাকি?"

-"মতলব আমার ঠিকই থাকে, তোমাকে দেখলেই খারাপ হয়ে যায়।"

মিরা দৌড়ে সিঁড়ির দিকে গিয়ে উপরে উঠতে উঠতে খিলখিলিয়ে হেসে বলল-

"আহারে বেচারা..catch me if you can..and take whatever you want.."

রায়ান ও মিরা পিছন পিছন দোতলার দিকে ছুটে বলল-

"আজকে যদি ধরি...ছাড়া পাওয়ার জন্য কান্না করিয়ে ছাড়বো। This time, Your legs are gonna pay for running away baby..."

মিরা দৌড়ে সিঁড়ির একদম শেষ মাথার রুমটায় ভেতর গিয়ে দরজাটা ভেতর থেকে লক করে দিল। রায়ান ও সেই ঘরের দিকে ছুটে গেল। মিরা ঘরের ভেতর ঢুকতেই দেখলো ঘরের একটা দেয়ালে তার আর রায়ানের ছবি দিয়ে ভরা। তাদের একসাথে প্রথম বাইক রাইডের ছবি, রেসের ছবি, বিয়ের ছবি, আর তার নিজের কিছু আলাদা ছবি ছিল যেগুলো সম্পর্কে মিরা কিছুই জানতো না। ছবি গুলো দেখেও বোঝা যাচ্ছে ওগুলো না জানিয়ে তোলা। একটা ছবিতেও মিরা ক্যামেরা তে তাকায়নি শুধু রায়ান ছবি গুলো তুলেছে। ঘরের চারপাশটা দেখার সময়ই ঘরের দরজা খোলার আওয়াজ এলো। মিরা চট করে পিছনে ফিরতেই রায়ান কে ঘরের মধ্যে দেখলো। মিরা অবাক হলো- সে তো দরজা লক করেছিল-

"আপনি ভিতরে ঢুকলেন কি করে? আমি তো লক করেছিলাম।"

রায়ান মিরাকে দেখিয়ে ঘরের চাবি ঝাঁকিয়ে মিরার দিকে এগিয়ে গেল। মিরা মুখ ফুলিয়ে বলল-

"This is cheating..আপনার কাছে চাবি ছিল বলেন নি কেন?"

রায়ান মিরার সামনে এসে মিরার মাথায় হালকাভাবে টোকা দিয়ে বলল-

"সব রুম ফেলে দৌড়ে এই রুমেই কেন এলে? নিজের বেডরুমের চাবি তো আমার কাছে থাকবেই। চিটিং কিভাবে হলো আমি কি বলেছিলাম এই রুমে ঢুকতে?"

মিরা মাথায় হাত দিয়ে ঘসতে ঘসতে বলল-

"আমি কি করে জানবো এটাই আমাদের বেডরুম।"

রায়ান মিরার কাঁধে হাত রেখে মিরাকে ঘুরিয়ে দাঁড়া করিয়ে পিছন থেকে মিরার গলা জড়িয়ে ধরে মিরার মাথায় নিজের থুতনি ঠেকিয়ে জিজ্ঞেস করল-

"তোমার ভালো লেগেছে পাখি?"

মিরা নিজের গলায় জড়ানো রায়ানের হাতটা ধরে বলল-

"খুব ভালো লেগেছে..! কিন্তু, প্রথম দিনের বাইক রাইডের সময় ফুলসহ ছবি, রেসের ছবি, বিয়ের ছবি গুলো কোথায় পেলেন আপনি? আমি তো জানি ও না এই সময় গুলোর কেউ ছবিও তুলেছে।"

রায়ান ভাব নিয়ে হাতের ইশারায় বলল-

"It's magic... don't you like it..?"

মিরা মিষ্টি হেঁসে বলল- "I love it..."

রায়ান মিরার হাত ধরে বাড়ির দ্বিতীয় ঘরের সামনে নিয়ে গেল। দরজার সামনে মিরাকে দাঁড়া করিয়ে দিয়ে বলল-

"এটা তোমার ঘর...!"

মিরা অবাক হয়ে রায়ানের দিকে তাকিয়ে বলল-

"আমার ঘর মানে? আমরা আলাদা থাকবো?"

রায়ান ভ্রু কুঁচকে মিরার দিকে তাকিয়ে বলল-

"এতো বুদ্ধি নিয়ে রাতে ঘুমাও কি করে? How stupid..! বিয়ের পর এক রাতও কি তোমাকে ছাড়া ঘুমিয়েছি? না তোমাকে ঘুমাতে দিয়েছি? এই প্রশ্ন তোমার মনে আসলো কিভাবে?"

-"তবে যে বললেন আমার ঘর..!"

রায়ান দরজার উপরে আঙ্গুল দেখিয়ে ইশারা করে বলল-

"Read that.."

মিরা রায়ানের আঙুল অনুসরণ করে দরজার উপরে তাকিয়ে দেখলো- দরজার উপর জলজল করছে একটা লাইন-

"Dream room for my dream girl..!"

মিরার চোখে আশ্চর্যতা। রায়ান মিরাকে নির্দেশ করে বলল-

"দরজায় তোমার ফিঙ্গার প্রিন্ট দেওয়া আছে। আনলক করো ফিঙ্গার প্রিন্ট দিয়ে।"

মিরা রায়ানের দিকে হতবাক হয়ে এক নজর তাকিয়ে রায়ানের কথা মতো কাজ করলো। দরজাটা মিরার ফিঙ্গার প্রিন্টে আন লক হওয়ার পর মিরা দরজাটা ধীরে খুলে ভেতরে প্রবেশ করলো।

স্বচ্ছ কাঁচে ঘেরা আলোকিত ঘরটায় পা রাখতেই মনে হলো যেন আলো আর রঙের কোনো স্বপ্নরাজ্যে ঢুকে পড়েছে মিরা। চারদিকে নরম সাদা আলো—সিলিংয়ের রিসেসড লাইট আর কাঁচের দেয়ালে প্রতিফলিত ঝলক মিলিয়ে পুরো ঘরটাকে করে তুলেছে দ্যুতিময়, প্রাণবন্ত।

ঘরের একপাশ জুড়ে তৈরি করা হয়েছে সুপরিকল্পিত একটি ওয়াকিং ক্লজেট। বাঁদিকে সারি সারি হ্যাঙ্গারে ঝোলানো জামা কাপড় —রঙ, আর নকশা অনুযায়ী সাজানো। তার পাশেই আলাদা সেকশনে শাড়ি—মসলিন, সিল্ক, জামদানি—প্রতিটা ভাঁজ করা বা ঝোলানো এমন যত্নে, যেন প্রতিটি নিজেই এক একটি শিল্পকর্ম। আরেক কোণে গাউনগুলো— নরম আলোয় তাদের কাপড় যেন মৃদু ঝিলিক দিয়ে ওঠে।

ডানদিকে জুতার সেকশন—নিচ থেকে ওপরে পর্যন্ত তাক সাজানো। একদিকে স্লিপার, আরেকদিকে সুজ, আর আলাদা র‍্যাকে হিলস। প্রতিটি জোড়া একেবারে সোজা করে রাখা- রঙ অনুযায়ী, স্টাইল অনুযায়ী—সবকিছু এতটাই পরিপাটি যে চোখ জুড়িয়ে যাচ্ছে তাকিয়ে থেকেই।

আরেকটি দেয়াল জুড়ে কসমেটিক্সের রাজ্য। কাঁচের তাকের ওপর সাজানো পারফিউম, লিপস্টিক, আইশ্যাডো প্যালেট—সবকিছু ব্র্যান্ড ও শেড অনুযায়ী গোছানো। মাঝখানে একটি বড় ভ্যানিটি মিরর, চারপাশে গোল গোল বাল্বের আলো। আয়নার সামনে বসলে মনে হয় যেন নিজেই নিজের সৌন্দর্যে বিমোহিত।

কিন্তু সবচেয়ে চোখধাঁধানো বিষয়টা হলো ডান পাশের দেওয়ালটা-চুড়ির দেয়াল। পুরো এক দেয়ালজুড়ে শুধু চুড়ি—কাঁচের, ধাতুর, পাথর বসানো, সোনালি, রূপালি। এমন কোনো রং যেন নেই, যা এখানে অনুপস্থিত। গাঢ় থেকে হালকা—লাল থেকে গোলাপি, নীল থেকে আকাশি, সবুজ থেকে পেস্তা—রঙের শাখা অনুযায়ী একেবারে গ্রেডিয়েন্ট করে সাজানো। দূর থেকে দেখলে মনে হয় রঙধনু নেমে এসে দেয়ালে আশ্রয় নিয়েছে।

পুরো ঘরটাই এতটা পরিপাটি, এতটা আলোকিত আর এতটা স্বপ্নময় যে মনে হচ্ছে সব কিছু মিরার কাছে।

সে শুধু হা হয়ে দেখেই গেল। মিরার চোখ ঝলসে যাচ্ছে এই চাকচিক্য তে। মিরার মনে এখন অনেক কৌতুহল অনেক প্রশ্ন। কি এসব? মানে কি এসবের? মিরা পিছনে রায়ানের দিকে ফিরতেই দেখলো রায়ান হাঁটু গেড়ে হাতে এক থোকা ফুল নিয়ে বসে আছে ফ্লোরে। রায়ান মিরার দিকে তাকিয়ে শান্ত কন্ঠে বলল-

"Happy anniversary My Mrs...and also.. happy Valentine's day..."

মিরা অবাক হলো রায়ানের কথায়। মিরা রায়ানের দিকে তাকিয়ে আমতা আমতা করে আওড়ালো-

"A.. anniversary..?"

রায়ান হকচকিয়ে সোজা হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে মিরাকে বোঝাতে চাইলো-

"Baby trust me..আমি ঠিক সময়ে উইস করতে পারি নি কারণ আমার এই সবকিছু মেনেজ করতে দেরি হয়ে গেছিল। আমি জানি তবুও একটা মেসেজ করা উচিত ছিল আমার কিন্তু আমি সময় করে উঠতে পারি নি। প্লিজ আম...!"

মিরা রায়ান কে থামিয়ে দিয়ে বলল-

"রায়ান, আমি মোটেও রেগে নেই আপনি উইস করেন নি বলে। এতো কিছুর পর তো একদমই না। আমি জিজ্ঞেস করছি- কিসের anniversary আজ?"

রায়ান প্রশ্ন সূচক দৃষ্টিতে মিরার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল-

"কিসের মানে? আমাদের...। দশ বছর আগে এই দিনেই আমাদের বিয়ে হয়েছিল। তুমি জানতে না?"

মিরা হতভম্ব হয়ে নিজের মুখে হাত দিলো-

"আজকে? Are you sure? Valentine's day তে বিয়ে হয়েছিল আমাদের?"

রায়ান তুচ্ছার্থে হেঁসে বলল-"Do you have any doubt!"

মিরা এই তথ্য জানতে পেরে সাথে সাথে নিজের মাথা ধরে নিল। আনমনে নিজে নিজে হাসছে। রায়ান মিরার প্রতিক্রিয়া দেখে জিজ্ঞেস করলো-

"আরে কি অদ্ভুত! হাসছো কোন?"

মিরা রায়ানের দিকে তাকিয়ে সন্তুষ্ট মনে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রায়ান কে জাপটে ধরল। কথায় আছে না- অতি শোকে পাথর! মিরার ক্ষেত্রে তার উল্টো হচ্ছে - অতি সুখে পাগল! মিরা রায়ান কে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল-

"আপনি আস্ত একটা পাগল। একবার বললেও তো পারতেন আমাকে আজকের দিনটা কত ইম্পরট্যান্ট! নিজে ভালো স্বামী হতে চাইছেন তাই না আর আমাকে খারাপ বউ বানাতে চাইছেন।"

রায়ান মিরার কথা শব্দ করে হেঁসে উঠে বলল-

"আমি ভালো স্বামী হতে চাইছি কারণ আমি অনেকটা সময় নষ্ট করে ফেলেছি। কিন্তু তোমাকে খারাপ বউ বানানোর কোনো ইচ্ছা আমার ছিল না। আমার বউ টা কত লক্ষ্মী!"

রায়ান মিরার মুখটা তুলে মিরার কপালে একটা ছোট্ট চুমু খেয়ে জিজ্ঞেস করলো-

"এত কষ্ট করে ঘরটা সাজিয়েছি, কিছু বলবে না?"

মিরা ঘরটা দেখলো না বরং কাঁদো কাঁদো চোখে রায়ানের দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে রায়ানের শার্টের কলার মুঠো করে ধরে রায়ান কে নিজের কাছে টেনে নিজের পায়ের পাতায় ভর দিয়ে উঁচু হয়ে দাঁড়িয়ে রায়ানের ঠোঁটের মাঝে নিজের ঠোঁট রাখলো। মিরা এমন কিছু করবে রায়ান কখনো ভাবেনি। রায়ান মিরাকে নিজের কাছেও টানতে পারছে না তার হাতের ফুল গুলোর জন্য। মিরা রায়ানের গলা জড়িয়ে ছোট ছোট চুমু খেয়ে যাচ্ছে রায়ানের ঠোঁটে। রায়ান না পারতে হাতের ফুল গুলো ফ্লোরে ফেলে দিয়ে মিরার ঘাড়ে নিজের একহাত আর অন্য হাতে মিরার কোমর জড়িয়ে নিজের সাথে মিশিয়ে নিয়ে দুই ঠোঁট জোড়ার সংঘর্ষের মাঝে বলে উঠলো-

"That's not how it's done baby.. let me show you.."

রায়ান মিরার শরীরে নিজের দাপট বিস্তার করলো। দুই ঠোঁট জোড়ার অদম্য এক খেলায় বরাবরের মতোই মেয়ে দেহ শিহরণে হেঁড়ে যাচ্ছে কিন্তু তবুও সরছে না। রায়ানের ঠোঁট মিরার দুই ঠোঁটের দাবিতে পাগল প্রায়। মিরার শ্বাস প্রশ্বাসেও বেশ কষ্ট হচ্ছে। এতো দিন সংসার করার পরও সে এখনো রায়ানের গতির সাথে কুলিয়ে উঠতে পারে না। মিরার শরীর কেমন অবশ হয়ে আসছে। রায়ান এক প্রকার জোড় করে তাকে দাঁড়া করিয়ে রেখেছে তার সাথে। রায়ান মিরার একগুচ্ছ চুল হাতের মুঠো করে ধরে নিজের কাছে টানলো। কোমরের দিকে পুরুষালী হাতের স্পর্শ দৃঢ় হতেই মিরা ব্যাথা তুর আওয়াজে কাতরে উঠলো-"উমমমমম্..!"

রায়ান মিরাকে কয়েক সেকেন্ডের জন্য বিরতি দিয়ে বলল-

"Inhale... Breath..!"

মিরা পুনরায় জীবন ফিরে পাওয়ার মতো নিঃশ্বাস ত্যাগ করছে। কয়েক মিনিটে লাল হয়ে ফুলে উঠা ঠোঁট জোড়া অনবরত কাঁপছে মেয়েটার। রায়ান মিরার ঠোঁটের উপর আঙ্গুল রেখে সেখানে আবারও হালকা করে চুমু দিয়ে মিরাকে কোলে তুলে তাদের বেডরুমে নিয়ে গেল। মিরা চোখ বন্ধ করে শুধু হাপাচ্ছে। রায়ান মিরাকে বিছানায় বসিয়ে দিয়ে তার মুখটা নিজের দুহাতের মাঝে নিয়ে বলল-

"এখনো যদি এতো হাপাও কিভাবে হবে পাখি? একটু অভ্যাস করো।"

মিরা মিটিমিটি চোখ খুলে রায়ানের দিকে অশ্রু সিক্ত চোখে তাকালো। রায়ান মিরার চোখের পানি মুছে দিয়ে বলল-

"দশ বছর আগে, এই রাতে যেই ভুল টা করেছিলাম তা আমি আজ রাতে মোটেও করবো না। তোমাকে দূরে রাখার দশটা বছর আমার জীবনের সবচেয়ে বড় আফসোস। আজ থেকে কোনো আফসোস থাকবে না আমার। তুমি আমার হবে আবার নতুন করে, সম্পূর্ণ আমার- আজ, এখন, এই রাতেই।"

রায়ানের কথা গুলো মিরার বুকের ভেতর তীরের মতো লাগলো। একটা সুপ্ত ভয় মেয়েটার দেহ মন সব কিছু ঝাঁকিয়ে তুলছে।

রায়ানের কথা গুলো মিরার ভেতরটা অদ্ভুতভাবে চুপ করে দিল। বুকের মধ্যে হালকা চাপা ব্যথা, সঙ্গে একটা অস্বস্তি—কী হতে যাচ্ছে, সেটা সে আন্দাজ করতে পারছে, কিন্তু পুরোটা বুঝে উঠতে পারছে না। ঘরটা নিঃশব্দ। বাইরে থেকে ভেসে আসা হালকা শব্দও যেন থেমে গেছে। রায়ান ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো। শুধু একটু থেমে থাকা শ্বাস। সে হাত বাড়িয়ে নিজের জামার বোতাম খুলতে শুরু করল। যেন ভেবে-চিন্তে নেওয়া একটা সিদ্ধান্তে উপনিত হয়েছে। মিরা তাকিয়ে আছে, কিন্তু চোখে বিস্ময়ের চেয়ে বেশি আছে অস্বস্তি আর প্রশ্ন। রায়ান একবার তার দিকে তাকাল—চোখে অনুমতির খোঁজে। তার শার্টটা চেয়ারের উপর রেখে সে স্বাভাবিক গলায় বলল- “চাইলে আমি থামব।”

ঘরের বাতাস ভারী, কিন্তু দৃশ্যটা অতিরঞ্জিত নয়। শুধু দু’জন মানুষের মাঝের দূরত্বটা একটু কমে এসেছে—আর সেই কমে আসার ভেতরেই লুকিয়ে আছে অস্বস্তি, টান আর অজানা এক মুহূর্তের। কিন্তু মিরা নিজের আপত্তি জানিয়ে তেমন কিছুই বলল না। রায়ান মিরার গা থেকে ধীরে ধীরে পোশাকের আবরণ সরিয়ে দিল। মিরা লজ্জায় মরে যাচ্ছে। রায়ান যতবারই মিরার কাছে আসে ঠিক ততবারই মিরাকে একই ভাবে লজ্জায় দেখে তার মনে প্রশ্ন জাগে- এতো কিছুর পরও সে তার বউয়ের লজ্জা ভাঙতে পারলো না। একটা সুপ্ত আফসোসের দরুন রায়ানের মুখ থেকে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। মিরা নিজের হাত দুটো আড়াআড়ি ভাবে তার শরীরের উপর ধরে রেখেছে দেখে রায়ান নিজের নিচের ঠোঁট টা বিরক্তিতে কামড়ে ধরে হঠাৎ মিরার হাত দুটো ধরে টেনে নিজের সামনে নিল। মিরা ছলছল চোখে শুধু তাকিয়ে দেখছে। রায়ান নিজের পয়েন্টের বেল্ট খুলে ওই বেল্ট দিয়ে মিরার হাত দুটো শক্ত করে বেঁধে দিল। মিরা নিজের হাত সেই বাঁধন থেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ। মিরার চোখ থেকে পানি অবশেষে গড়িয়ে পড়লো ভয়ে। ভয়ার্ত গলায় মেয়েটা রায়ান কে বলল-

"হা..হাত কেন বাঁধলেন আপনি? খুলে দিন প্লিজ। আমার কেমন যেন ভয় ভ..ভয় করছে।"

রায়ান মিরার গাল বেয়ে পড়তে থাকা অশ্রু কণা মুছে মিরাকে আশ্বস্ত করল-

"সুসসস.. কিচ্ছু হবে না। Trust me.."

মিরা বারবার মাথা ডানে বামে নেড়ে বলল-

"না, আপনি হাত খুলে দিন প্লিজ। আমার এমনি খুব কষ্ট হয়। প্লিজ খুলে দিন।"

রায়ান মিরাকে সাহস দিয়ে বলল-

"এমন বলে না পাখি। You are my good girl right?"

মিরা একবার হ্যাঁ সূচক নাড়ে আবার না সূচক মাথা নাড়ে। রায়ান আবার বলল-

"Your are my strong girl..তুমি পারবে। ভয় পেও না।"

মিরা রায়ানের কথায় ঠিক মতো কাঁদতেও পারছে না। বারবার হাতটা বেল্টের বাঁধন থেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করছে। রায়ান মিরাকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে অশান্ত হয়ে বলল-

"এমন ছটফট করতে থাকলে ভীষণ লাগবে। আর হাত স্থির রাখ নাহলে হাতেও লেগে যাবে।"

মিরা ভাঙা আওয়াজে রায়ানের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন সূচক কন্ঠে বলল-

"You'll be gentle, right?"

রায়ান মিরার গলায় মুখ ডুবিয়ে বলল-

"Maybe...,

আবার একই সাথে বলল- "Maybe not..."

মিরা এবার সত্যিই ভয়ে কেঁদে ফেললো। রায়ান মিরাকে অতিরিক্ত ভয় পেতে দেখে বলল-

"Fine, I'll be gentle..."

মিরা একটু নিজেকে যেই সামলে নিলো ওমনি রায়ান সুযোগ বুঝে মিরার দেহে নিজের উপস্থিতি বিরাজমান করে বলল-

"But only at the beginning..!"

মিরা অসহ্যকর ব্যাথায় চিৎকার করে উঠলো। বড় ঘরের চার দেয়ালে সেই আওয়াজ প্রতিধ্বনিত হলো। চোখের অশ্রু কণারা নিজেদের বাঁধ ভাঙালো। এরপর বিপরীত দেহের দুই মানবের মাঝে আলিঙ্গনটা গভীর হয়। শরীরের দূরত্ব কমে আসে, কিন্তু ভেতরে একটা স্থিরতা। চূড়ান্ত মিলনটুকু ঘটলো খুব স্বাভাবিকভাবেই—কোনো বাড়তি শব্দ। শুধু দু’জন মানুষের পারস্পরিক সম্মতি, ধীর স্পর্শ, আর একে অপরকে পুরোপুরি গ্রহণ করার সিদ্ধান্তে।

___________

রাত পার হয়ে ভোর হওয়ার পথে। রায়ান এই কয়েক মিনিট হলো এক মহাযুদ্ধে বিজয়ী হয়ে এখন ক্লান্ত হয়ে মিরার গলায় মুখ গুজে শুয়ে আছে। মিরার হাতটা এখন বাঁধা - উপর থেকেও বোঝা যাচ্ছে বেশ লাল হয়ে গেছে জায়গাটা। মিরা অস্থির হয়ে হাপাচ্ছে আর রায়ানের সেই দিকে খেয়াল নেই। মিরা তার বাঁধা হাত রায়ানের গলায় রেখে তার পিঠে জোরে আঘাত করে বলল-

"I hate you.. hate you so much..!"

আরো বিড়বিড় করলো-

"এইটা আপনার জেন্টল হওয়ার নমুনা? কিচ্ছু হবে না.. এই টাই তো বলেছিলেন.. মিথ্যুক, জালিয়াত কোথাকার। আর জীবনেও আপনাকে বিশ্বাস করবো না। সরুন আমাদের উপর থেকে। হাত খুলুন আমার। আমি আপনার সাথে আর কথাই বলবো না। I hate you so much now.."

রায়ান মিরার দেওয়া আঘাতের প্রতি উত্তরে মিরার গলায় কামড়ে ধরলো। মিরা নিজের ঠোঁট কামড়ে চিৎকার করতেই রায়ান কামড়ানো জায়গায় একটা ছোট্ট চুমু খেয়ে মিরার গালেও আদর করে একটা চুমু দিয়ে বলল-

"Hate me after another round..I am starving.."

মিরা রায়ানের কথায় সাথে সাথে বলে উঠলো-

"I love you..I Love you..I love you very much..I don't hate you anymore..হাতটা খুলে দিন।"

রায়ানের মিরার চোখ মুখ দেখে বেশ মায়া হলো। সত্যিই মেয়েটার শরীরে কিচ্ছু নেই তবুও তাকে সহ্য করে। রায়ান মিরার হাত খুলে দিয়ে মিরার হাতে লাল হয়ে যাওয়া জায়গায় অনেক গুলো ছোট ছোট চুমু দিয়ে মিরার মুখেও একই ভাবে চুমু দিয়ে বলল-

"I am so sorry baby.."

মিরা আর কিছুই বলল না। শরীর এমনি ব্যাথা করছে আর রায়ানের এসব আদুরে কাজ গুলো তার রাগ গলিয়ে দেবে যা সে চায় না। মিরা মুখ অন্য দিকে করে চুপ করে চোখ দুটো বন্ধ শুয়ে রইল। রায়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে মিরা কে ভয় দেখিয়ে বলল-

"বেল্ট কিন্তু এখনো আমার হাতেই আছে।"

মিরা সাথে সাথে রায়ানের দিকে ঘুরে রায়ান কে জড়িয়ে ধরলো। রায়ান ঠোঁট কামড়ে হেঁসে মিরার মাথায় হাত বুলিয়ে তাকে নিজের বুকে আগলে নিয়ে বলল-

"My pretty wife.. আমি মাঝে মাঝে খুব অবাক হই জানো?"

মিরা রায়ানের বুকের থেকে মুখ উঠিয়ে জিজ্ঞেস করলো-

"কি নিয়ে?"

রায়ান শয়তানি হাসি হেঁসে বলল-

"You take me so well..how do you?"

মিরা লজ্জায় রায়ানের বুকে আঘাত করে বলল- "ছিঃ..!"

রায়ান শব্দ করে হেঁসে উঠে মিরাকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে রইল আর সাবধান করে দিল-

"সকালে উঠে যদি দেখি তুমি একা শাওয়ার নিয়েছ খবর আছে।"

মিরা আদতেও শুনতে পেয়েছে কিনা সন্দেহ। ক্লান্ত হয়ে সে সাথে সাথে ঘুমিয়ে গেছে। যদিও রায়ান আর তাকে জাগানোর প্রয়োজন বোধ করলো না। এখন মিরার যে অবস্থা, সকালে আরও খারাপ হয়ে যাবে এটা রায়ান নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই ঠাওড় করতে পারছে। একা শাওয়ার নেওয়ার সক্ষমতা মেয়েটার আছে কিনা সেটা অনেকাংশে প্রশ্ন করার মতো বিষয়।

____________

ভোর ৬টা~

সোরায়া নিশ্চিন্তে নিজের ঘরে ঘুমাচ্ছে। ঘুমের মাঝেই মিটিমিটি হাসছে-কে জানে কোনো স্বপ্নই দেখছে কিনা! বেচারির সুখের মুহূর্তের কাল হয়ে ফোনটা বেজে উঠলো।

ফোনটা ধরার যেমন ইচ্ছা নেই তেমন ফোনের শব্দ ও সোরায়ার ভালো লাগছে না। ফোনটা অনবরত বাজছে বলে সোরায়া অনেকটা সময় নিয়ে হাতরে ফোনটা খুঁজে রিসিভ করে কানে ধরল। নিজে কিছু না বলে চুপ করে রইল। অপর পাশ থেকে পরিচিত একটা পুরুষ কণ্ঠ ভেসে এলে।

-"আমার জান বাচ্চা, অনেক ঘুমিয়েছ। এখন তাড়াতাড়ি উঠে নিচে আসো। সকালের অপেক্ষায় আমি সারারাত জেগেছি আর অপেক্ষা করা সম্ভব না।"

সোরায়া কথাটা শুনে ধপ করে বিছানায় উঠে বসলো। কানের থেকে ফোনটা পড়ে গেল বিছানায়। সোরায়া দ্রুত ফোনটা খুঁজে আবার কানে ধরে ধরফড়িয়ে বলল-

"হ্যালো, হ্যালো...! শুনছেন?"

মাহির অপর পাশ থেকে আবার বলল-

"তোমার সাথে আজকের সূর্যোদয় দেখবো। তাড়াতাড়ি নামো। আমার চাঁদ কে দেখে পরে আকাশের সূর্য দেখবো চাঁদকে নিয়ে। Come fast.."

সোরায়া মাহির কথা শুনাতে পর আর এক সেকেন্ড অপেক্ষা করলো না। দ্রুত ফ্রেশ হয়ে নিচে নামলো। মাহির সোরায়াকে দেখে প্রথমেই উইস করল-

"Happy Valentine's day my moon.."

সোরায়া নিজের থেকে খুশিতে মাহির কে জড়িয়ে ধরে বলল-

"Thank you my sky.. Happy Valentines day.."

মাহির মিষ্টি হেসে সোরায়া কে বুকে জড়িয়ে নিল। পরে তাড়াহুড়ো করে সোরায়া কে হেলমেট পড়িয়ে দিয়ে বলল-

"তাড়াতাড়ি চলো। লেট হলে সব শেষ।"

সোরায়া তাড়াতাড়ি বাইকে উঠে বসলো। মাহির সোরায়াকে বাইক স্টার্ট দিয়ে বলল-

"শক্ত করে ধর, আমার হবু বউ বাইক থেকে পড়লে তোমার খবর আছে।"

সোরায়া মাহির কে শক্ত করে জাপ্টে ধরে ভাব নিয়ে বলল-

"গার্লফ্রেন্ড নিয়ে ঘুরতে এসে বউ নিয়ে এতো চিন্তা করা ভালো না। আমার ও হবু বর কাছে। আমার কিছু হলে আমার বর আপনাকে দেখে নেবে।"

মাহির সোরায়ার দিকে বাইকের মিরর সেট কে বাইক স্টার্ট দিলো।

~

সূর্যোদয় হলো তারা একসাথে সূর্যোদয় দেখলো নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে। সময়টা কিভাবে কাটলো আসলে বোঝা গেল না। সকাল ৮টার কাছাকাছি বাজছে এখন। মাহির সোরায়াকে নিয়ে রমনা পার্কে এসেছে। কিচ্ছু একটু একসাথে হেঁটে তার পর ব্রেকফাস্ট করে বাড়ি ফিরবে। সকাল সকাল উঠেছে বলে সোরায়ার খুব খিদে পেয়েছে। সোরায়া নির্দ্বিধায় মাহির কে বলল-

"আমার না খুব খিদে পেয়েছে। রাতে শুধু আপনার দেওয়া চকলেট গুলো খেয়েছিলাম।"

মাহির একটু রেগে বলল-

"মানে কি? রাতে শুধু চকলেট খেয়ে কে ঘুমায়? এই জন্য চকলেট দিয়েছিলাম নাকি?"

সোরায়ার মাহিরের রাগ দেখানো পছন্দ হলো না। সে মুখ ফুলিয়ে অন্য দিকে তাকিয়ে বলল-

"ঠিক আছে বাড়ি চলুন। খিদে পায় নি আমার।"

মাহির হতবাক। সে তো শুধু সোরায়ার রাতের চকলেট খাওয়া নিয়ে একটু কথা বলল। মাহির সোরায়ার কাঁধে হাত রেখে নিজের দিকে ঘুরিয়ে তার গালে হাত রেখে বলল-

"কিছু বললেই যদি আপনার এই রূপ দেখতে হয় তাহলে তো ভয়ে ভয়ে থাকতে হবে আমাকে কিছু বলার আগে।"

-"এই রূপ মানে? কি রূপ?"

-"এই যে, ফুলকো লুচির মতো মুখ করে রেখেছ। এই রূপের কথা বলছি। অনেক ইয়াম্মি লাগছে দেখে।"

সোরায়া মাহিরের হাত ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে উল্টো দিকে ঘুরে গেলে মাহির সোরায়ার কানের কাছে ঝুঁকে গিয়ে বলল-

"একটু দাঁড়াও দেখি কিছু খাওয়ার জন্য পাই কিনা। কোথাও যাবে না কিন্তু।"

মাহির চলে গেল তখনি পিছন থেকে একজন ভদ্রমহিলা এসে সোরায়ার কাঁধে হাত রাখলো। সোরায়া মাহির ভেবে পিছনে ফিরে অন্য একজন কে দেখে একটু ভয় পেল। ভদ্রমহিলা সোরায়ার সাথে হেঁসে কথা বললেন-

"মা, তোমার নাম কি?"

সোরায়া এমন হঠাৎ প্রশ্নে একটু ইতস্তত বোধ করে আমতা আমতা করে উত্তর দিল-

"আমি সোরায়া। আপনি কে?"

-"আমি এখানকারই বাসিন্দা। সকালে হাঁটতে এসেছি একটু। ডায়াবেটিস তো তাই। এতো সকালে কোনো দিন কোনো বাচ্চা মেয়েকে দেখি নি তো তাই কথা বলতে ইচ্ছে করলো। তুমি কোথায় থাকো মা?"

সোরায়া ভদ্রমহিলার কথায় ও কারণে যে সন্তুষ্ট তা নয়। তবে বিনয়ী হয়ে সে জবাব দিল-

"আমি এখানকার বাসিন্দা নই আন্টি। একটু ঘুরতে এসেছি আর কি। বাসা বেশ দূরে।"

সোরায়া ঠিকানা বলতে চাইলো না বলে আর ভদ্রমহিলা জোর করলেন না। তিনি সোরায়াকে সোজা জিজ্ঞেস করলেন-

"মা, এত সকালে এখানে কার সাথে এসেছ মা? ওই ছেলেটা কি হয় তোমার?"

সোরায়া এতক্ষণে বুঝলো ভদ্রমাহিলা আসলে কেন তার সাথে কথা বলতে এসেছে। সোরায়ার তাকে এলাকার গুজব ছাড়ানো আন্টি মনে হলো। মাহির তার বয়ফ্রেন্ড এটা বললে বিষয়টা অনেক খারাপ দেখাবে আর তার লজ্জাও লাগছিল তাই অনেকক্ষণ ভেবে বলল-

"আমার হাসবেন্ড হয় আন্টি।"

ভদ্রমহিলার চোখে মুখে একটু অবাক হাওয়া ভাব। মাহির পিছন থেকে সোরায়া কে কারো সাথে কথা বলতে দেখে একটু অবাক হয়ে সামনে এগিয়ে এলো। সোরায়া মাহির কে ফিরে আসতে দেখে স্বস্তির শ্বাস নিয়ে মাহির কাছে দৌড়ে গিয়ে মাহিরের হাত জড়িয়ে ধরে বলল-

"এই যে আন্টি। আমার হাসবেন্ড।"

মাহির অবাক হয়ে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার দিকে তাকিয়ে দেখে বড় বড় চোখ করে আশ্চর্য হয়ে আওড়ালো-

"আম্মু...তুমি..!"

সোরায়া মাহির দিকে হা হয়ে তাকিয়ে রইল। সীমা খান মাহিরের দিকে তাকিয়ে বুকে আড়াআড়ি করে হাত বেঁধে হেঁসে বললেন-

"আমার একমাত্র ছেলের বিয়ে হয়ে গেছে?! বাহ্! তা বাবা, নিজের মা বাবা কে দাওয়াত না দেওয়ার কারণ কি?"

চলবে,

পাখিরা। পড়ে ফেলো। কমেন্টে সবাইকে দেখতে চাই। 🫣 বেস্ট পার্ট কমেন্ট করো। সাথে পছন্দের ডায়লগ ও লিখে যেতে পারো। Love you pakhis ❤️ 🥰

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৬৬তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন