#শত_ ডানার_ প্রজাপতি
#urme prema (sajiana monir )
পার্ট : ১৩
ঘড়িতে ছয়টা বাজতে চলছে । অগ্নি এখনো গভীর ঘুমে । আমি ফ্রেশ হয়ে উনার পাশে বসে ফোন চালাচ্ছি । হ্ঠাৎ ই উনি উপুড় হয়ে আমার কমোড় জড়িয়ে ধরে । উনার এমন আচমকা স্পর্শে আমি কেঁপে উঠি । অগ্নির দিকে তাকিয়ে দেখি উনি এখনো ঘুমে । জেগে থাকলে নিশ্চিত নিজের থেকে আমার এতোটা কাছে আসতো না !
জীবন যেহেতু এমন একটা সুযোগ দিয়েছে তবে আমি কেন হাত ছাড়া করবো ? আমি হাল্কা নিচু হয়ে উনার মাথায় বেশ কয়েকবার নিজের ঠোঁট ছোঁয়াই । আলতো আদুরে হাত তার চুলে বোলাতে লাগি ।
ঘড়ির কাটা আট টায় আসতেই আমি উনাকে ডাকতে শুরু করি । বেশ বেলা হয়েছে । সবাই হয়তো উঠে পড়েছে । উনি আমার ডাকে চোখমুখ খিচে নেয় ।
অগ্নি ঘুমের মাঝে বেশ আদুরে গলায় ডাকলেন,
- "পরীজান । আর একটু ঘুমাতে দেও প্লিজজজ ! "
আমি উনার কথা শুনে থম মেরে থাকি । উনার এই ডাক কলিজা কামড়ে ধরেছে । এই নাম এই ডাক উনি কি করে জানলেন ? এই নামে তো আমাকে সে ডাকতো । কিন্তু তা উনি কি করে জানেন ? তবে অগ্নিই কি উনি ? না না তা কি করে হয় । যদি তাই হতো তাহলে কেন নিজের পরিচয় লুকাতো ? আর তা ছাড়া উনি সুপ্তিকে ভালোবাসতেন ।কিন্তু অগ্নি এই নাম কি করে জানলেন । আমার ডাইরি থেকে ? নাকি এটা জাস্ট একটা কো- ইন্সিডেন্ট ?
তাড়াতাড়ি করে নিজেকে উনার থেকে ছাড়িয়ে দূরে সরে যাই । আমার অতীত আমাকে খুব বেশি পুড়ায়। এই নামটা পুরানো জখম তাজা করে দিয়েছে । চোখ থেকে গলগল করে পানি ঝড়ছে । তাড়াতাড়ি ওয়াশরুমে ডুকে পড়ি চোখে মুখে পানির ছিটে দেই । আমি অতীত মনে করতে চাই না । আমাকে ভুলতেই হবে আমার সেই অতীত ।অগ্রসর হতে হবে সামনের দিকে !
________________________
সকালের নাস্তা সেরে রুমের বারান্দায় বসে আছি এমন সময়ই রুমে কারো উপস্থিতির আবাশ পেয়ে রুমের দিকে যাই । রুমে ডুকতেই দেখি নানুজান একগাল হাসি নিয়ে দাড়িয়ে । হাতে একটা কাঠের বক্স । নানুজান আমার হাত টেনে বিছানায় বসিয়ে বললেন ,
- "রাতে ভালো ঘুম হয়েছে? কোনো সমস্যা হয়নি তো ? "
আমি মাথা নত করে ধীর গলায় উত্তর দেই ,
- "জি নানুজান কোনো সমস্যা হয়নি । ভালো ঘুম হয়েছে । "
নানুজান আমার গালে হাত রেখে বললেন ,
- "দিদিভাই তুই কি এখানে আনইজি ফিল করছিস? আনইজি ফিল করতে এটা তোর ও বাড়ি ।আর আমরা সবাই তোর আপনজন । নিজের মত ইজিলি চলাচল কর । "
আমি উত্তরে মৃদু হাসলাম । নানুজান আবার বললেন,
- "এসব কথা ছাড় । শুন তোর জন্য কিছু এনেছি । "
আমি কৌতূহল দৃষ্টি তে নানুজানের দিকে তাকাই । নানুজান কাঠের বক্স থেকে একজোড়া বালা আমার হাতে পড়িয়ে দেয় । ডায়মন্ড নোসপিন বের করে আমাকে পড়িয়ে দিতে দিতে মুচকি হেসে বললেন,
- "এগুলো আমাকে তোর নানাজান দিয়েছিল । স্বামীর মৃত্যুর পর তার নিশানি গাঁয়ে রাখতে নেই । তাই উনি মারা যাবার পর সব খুলে সযত্নে রেখে দিয়েছিলাম । বড় নাতবউ কে উপহার দিবো বলে। জানি একটু ওল্ড মডেল কিন্তু আমার মনের খুব কাছের এই গহনা গুলো । তোকে খুব মানাবে ।তোর পছন্দ হয়েছে ? "
নানুর কথা শুনে স্থব্দ হয়ে যাই এতো ভালোবাসা আমার মত পোড়াকপালির ভাগ্যে ছিলো? চোখে জল চিকচিক করছে । নানুজানকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলি ,
- "নানুজান খুব খুব খুব পছন্দ হয়েছে । কিন্তু এসবের কি প্রয়োজন ছিলো । আপনার ভালোবাসা আর দোয়াই আমার জন্য সবচেয়ে বড় উপহার । "
নানুজান আমার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বললেন ,
- "কে বলেছে দরকার নেই ? এসব কিছুর উপর তোর অধিকার ।এসব কখনো নিজের থেকে আলাদা করবি না এগুলো বিবাহিত মেয়েদের চিহ্ন ।
আমি নানুজানের কথায় বাধ্য মেয়েদের মত মাথা নাড়িয়ে বলি ,
- "জি নানুজান আমি খুব যত্নে এসব কিছু সামলিয়ে রাখবো । কখনো নিজের থেকে আলাদা করবো না । "
নানুজান আমার কপালে চুমু দিয়ে আদুরে কন্ঠে বললেন,
- "আমার হুর বুড়িটা "
_______________________
দুপুরে লাঞ্চ করে সবাই বের হয়েছি । আজ নানুজানের বাগানবাড়ী তে সবাই থাকবো ।ছোটখাটো গেট টুগেদারের আয়োজন করা হয়েছে । ছোটরা সবাই যাচ্ছি । অগ্নির সব কাজিনরা তাদের ফ্রেন্ড সার্কেলকে ইনভাইট করেছে । অগ্নির কাজিনদের ফ্রেন্ড সার্কেল অগ্নি আর আবির ভাইয়ার পরিচীত হলেও আমার আর হিয়া আপুর জন্য সবাই একদমই অচেনা ।
দুতলা এক বাগানবাড়ির সামনে গাড়ি থামে । সবাই ভিতরের দিকে অগ্রসর হই ।সাদাবাড়ি সাইডেই বিরাট বড় পুকুর পাড়ে একটা সুন্দর নৌকা থামানো । আমরা ভিতরে যেতেই দেখি অগ্নির কাজিনের ফ্রেন্ডরা আগের থেকেই পৌছিয়ে গেছে । আমাকে আর হিয়ার আপুকে সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দেয় । আমরা সবার সাথে কুশল বিনিময় করি । বড় মামার বড় ছেলের বন্ধু ইশানের সাথে পরিচয় হবার সময় অগ্নি বেশ রাগী দৃষ্টি তে আমার দিকে তাকাচ্ছিলেন । কিন্তু কেন তা আমার জানা নেই । আর জানার চেষ্টাও করিনা । দোতলায় সব মেয়েরা আড্ডা নিচ্ছে আর নিচ তলায় ছেলেরা । আমি সাইডে দাড়িয়ে আছি । হ্ঠাই কেউ আমাকে পিছন থেকে ডাকে । আমি ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে দেখি ইশান ভাইয়া দাড়িয়ে আছে । মুখে একগাল হাসি । উনি আমার দিকে চিকেন শাসলিকের ডিশটা এগিয়ে দিয়ে বললেন ,
- "তুমি দেখি কিছুই খাচ্ছো না । এই নাও এটা ট্রায় করো । "
আমি উনার এমন কাজে বেশ অবাক হয় । এই তো একটু আগেই পরিচয় হয়েছি । এই অল্প সময়ে এত আন্তরিকতা কিসের ? নিশ্চিত ব্যাটার কোনো মতলব আছে । কিন্তু কি ? সে যাই হোক আমার কি আমি তো দূরেই থাকবো । আমার মনে এতো সংকোচের যুদ্ধ চলছে কিন্তু তা চেয়ারায় প্রকাশ করলাম না । আমি সৌজন্য মূলক হাসি দিয়ে বললাম,
- "না ভাইয়া আমি খাবো না । "
- "আরে লজ্জা পাচ্ছো কেন ? লজ্জা পাবার কিছুনেই আমরা আমরাই তো । "
উনার কথা শুনে মনে হচ্ছে আমি উনার কত জনমের চেনা । কত আগের সম্পর্ক উনার সাথে । উফফ একদম উটকো ঝামেলা । আমি ভ্রু কুঁচকে উনার দিকে তাকাতেই উনি বললেন,
- "তুমি কি কথা কম বলো নাকি আমার সাথেই বলতে চাইছো না ? বায় দ্যা ওয়ে তুমি এবার কোন ক্লাসে ? "
আমি আমতা আমতা করে বলি ,
- "জি ভাইয়া আমি এবার অনার্স ফাস্ট ইয়ারে । "
উনি আমার দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে বললেন ,
- "কি বলো তুমি অনার্সে পড়ো ? দেখতে তা মনে হয় না । দেখলে মনে হয় নাইন টেনে পড়ো! "
- "ভাইয়া আপনার মনে হচ্ছেনা আপনি একটু বেশি আমাকে ফুলিয়ে দিচ্ছেন? "
- "আরে না । সত্যি তুমি একদম বাচ্চাদের মত দেখতে । বায় দ্যা ওয়ে তুমি অনেক বেশি সুন্দরী । "
আমি এই লোকের কান্ড দেখে শুধু অবাক হচ্ছি । এই লোক কোথা থেকে কোথায় চলে যাচ্ছে । আর প্রতিটা কথা এতো জোরে শব্দ করে কেন বলছে ? মাথার তার গুলো কি সব ছিড়া নাকি ?
আমি কিছু বলতে যাবো তার আগেই কেউ ঝড়গতি তে এসে তুফানের গতিতে আমাকে টানতে টানতে নিয়ে যায় । আমি বেকুব হয়ে যাই । কোনো কিছু ভাবার মত সময়ও পাই নি । আমাকে নিয়ে অন্ধকার এক রুমের সামনে দাড় করায়। হাত গুলো তখনো শক্ত করে চেপে ধরে আছে । আমার প্রচন্ড ব্যথা করছে । আমি যতই ছাড়ানোর চেষ্টা করছি ততই শক্ত করে চেপে ধরছে । আমি কিছু বলবো তার আগেই সামনের লোকটা গর্জন করে উঠে । ধমক দিয়ে বললেন,
- "তুমি ইশানের সাথে কেন কথা বলছিলে ? ওর সাথে এত কিসের তোমার হাসা হাসি ডলাডলি ? খুব মজা লাগছিলো ওর সাথে কথা বলতে ? "
কন্ঠ শুনে এটা স্পষ্ট যে এটা অগ্নি । আমি কি করে ভুলে যাই আমার জীবনে অগ্নি দোষ লেগে আছে । মানুষের লাগে শনি দোষ আমার লেগেছে অগ্নি দোষ । হায়! আমার বেচারা কপাল । ওই মুহূর্তে আমার ভয় থেকে বেশি রাগ হচ্ছে । প্রচুর রাগ । উনি কি করে আমাকে এসব বলছে ? উনি কি কানার ভাই অন্ধ হয়ে গেছে নাকি ? উনি চোখে কি চোখে দেখেনি যে ইশান আমার কাছে এসেছিলো । আমি রাগী গলায় বলি ,
- "আমি কথা বললে আপনার কি সমস্যা? আপনার লাগছে কেন? "
- "আমার সমস্যা আছে আমার লাগছে । "
- "কিন্তু তা কে লাগছে ? "
উনি মুখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে বললেন,
- "তার কারণ বলতে আমি বাধ্য নই "
উনার কথা শুনে আমার রাগ বেড়ে যায় । আমি বড় একটা নিশ্বাস নিয়ে বলি ,
- "অকে ফাইন ! আমিও আপনার কথা শুনতে বাধ্য নই । আমার ইশান ভাইয়ের সাথে কথা বলায় আপনার সমস্যা হয় তাই না।? আমি এখন থেকে উনার সাথে বেশি বেশি কথা বলবো একশোবার বলবো হাজার বার বলবো । "
কথাটা বলে আমি পাশ কেটে যেতে নেই এমন সময়ই উনি আমার হাত শক্ত করে চেপে ধরে দেয়ালের সাথে মিশিয়ে ফেলে । একটু জোরে টান দেওয়ায় মাথায় ব্যথা পাই । চোখ গুলো বন্ধ করে ফেলি ।উনি আমার গাল চেপে ধরে মুখ উঁচু করে দাঁতে দাঁত চেপে বললেন ,
- "একদম জানে মেরে ফেলবো ।আমি ইশানের সাথে কথা বলতে না করেছি মানে কথা বলবে না । ব্যসসস । আর একটাও টু শব্দ শুনতে চাই না । "
আমি চোখ খুলে উনার চোখের দিকে তাকাই । এই চোখে কি ছিলো রাগ ? ভয় ? নাকি অন্যকিছু .....
চলবে...❤️
প্লিজ সবাই সবার মতামত জানাবেন । ভুল ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন । 😊😊😊