#শত_ ডানার_ প্রজাপতি
#urme prema (sajiana monir )
পার্ট : ২১
চরম বিরক্তি নিয়ে শেফার দিকে তাকিয়ে আছি । শেফা আমার সামনে মুখ ছোট করে দাড়িয়ে আছে ।চিন্তিত গলায় বললাম,
- "তুই এমন কি করে করতে পারিস ? আমাকে না জিগ্যেস করে তুই কালচারাল প্রোগ্রামের জন্য আমার নাম দিয়ে দিলি ? হাউ ক্যান ইউ ডু দ্যাট ? "
শেফা আমতা আমতা করে বলল,
- "স্কুল কলেজে সবসময় কালচারাল প্রোগ্রমে পার্টিসিপেট করতি । তুই ঢাকায় ছিলিনা তাই আমিই নাম দিয়েছি । তাতে কি এমন হয়েছে বলতো ! "
- "শেফা স্কুল কলেজের ব্যাপার আলাদা । তখনকার আর এখনকার পরিস্থির মাঝে আসমান জমিন তফাত । তাছাড়া আমার গান গাওয়া থেকে মন উঠে গেছে । তুই তো সবটা জানিস ! "
- "স্যরি ইয়ার ! বাট একটা ব্যাপার নিয়ে আর কত দিন নিজেকে এভাবে লুকিয়ে রাখবি ? দোষ ঐ লোকের ছিলো তোর না । আর কতদিন নিজেকে এভাবে সবকিছু থেকে দূরে রাখবি ? "
- "যাই হোক আমি পারবো না । যতবার গান গাইতে যাই ঐ লোকের প্রত্যেকটা কথা আমার কানে বাজে উনার মিথ্যা স্বপ্ন চোখে ভাসে বারবার মনে করিয়ে দেয় আমি কত বড় বোকা ছিলাম ।আমি পারবো না গাইতে । এখনি আমার নাম তালিকা থেকে কাটবো । "
শেফাকে আর কিছুবলার সুযোগ না দিয়ে নাম কাটাতে চলে যাই । সেখানে যেতেই আমার চোখ কপালে উঠে যায় । নিহা রিহার্সাল রুমে । আর সবাই অডিশন তার কাছেই দিচ্ছে । নিশ্চিত কোনো ঝামেলা করবে । আমার ভাবতে দেরী কিন্তু শয়তানের ডাক পড়তে দেরী না । নিহা আমাকে ডাকছে । ইচ্ছা না থাকার পরও যেতে হলো । এই মুহূর্তে কোনো সিন ক্রিয়েট করতে চাইছিনা । আমি চুপাচাপ দাড়িয়ে আছি । নিহা তার হাতের পেপারস গুলো চেক করে ভেঙাত গলায় বলল,
- "ওহ বেহেনজি ? তুমি গান গাইবে ? গান পারো নাকি এখানে ছেলে দেখতে এসেছো ? "
আমার ভয়ংকর রকম রাগ হচ্ছে । কিন্তু নিজেকে ঠান্ডা করার চেষ্টা করে খুব স্বাভাবিক গলায় বললাম ,
- "আমি আমার নাম কাটাতে এসেছি । তালিকা থেকে আমার নামটা কেটে দিন প্লিজ । "
নিহা আমার উপর থেকে নিচ পর্যন্ত চোখ বুলিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বললেন,
- "কেন ভয় পাচ্ছো বুঝি ? অবশ্য তোমারদের মত ছোট লোকদের কাছে তো একটা ট্যালেন্টই আছে নিজের শরীর প্রদর্শন করে ছেলে ফাসানো । যেমন করে অগ্নি কে ফাসিয়েছো । কি ভেবেছিলে মানুষ অন্ধ ? তাদের চোখে কিছু পরে না ? অগ্নির সাথে গাড়ি দিয়ে চলাচল করা ,এক সাথে ফাংশন এটেন্ড করা এসব কেউ দেখে না ? যাই বলো বেহেনজি মানতে হবে ছেলে ফাসানোর ভালো ট্যালেন্ট আছে । না হয় অগ্নির মত ছেলেকে কি করে পটাতে পারতে? "
এতো সময় নিজেকে স্বাভাবিক রাখলেও এখন আর পারলাম না । মুখে কৃত্রিম হাসি এনে বললাম ,
- "কেন আপনার কি আফসোস হচ্ছে ? আপনি পটাতে পারেননি বলে ।আপনার উপর মাঝে মাঝে খুব দয়া হয় এতো কিছু করেও আপনি অগ্নির মন জয় করতে পারেননি । আপনার দিকে তাকায় না পর্যন্ত । ছিঃ কি লজ্জা ! "
- "ইউ ইডিয়েট ! "
বলেই আমার উপর হাত তুলতে চাইলো । আমি হাত দিয়ে বাঁধা দিয়ে তার হাত মোচড় দিয়ে ধরে বলি ,
- "আপনার হাতটা একটু বেশি নড়ে । নিজের হাত ঠিক ভাবে রাখতে শিখেন । না হয় হাত ভেঙে দিতে আমি ভাববো না । "
বলেই নিহার হাত ছেড়ে দিলাম । নিহা টেবিলের উপরে পরে । এমন সময়ই অগ্নি রিহার্সাল রুমে প্রবেশ করে । নিহার এই অবস্থা দেখে সবার দিকে তাকিয়ে ধমকের স্বরে বললেন ,
- "এখানে কি হচ্ছে ? "
সবাই চুপ । অগ্নি আমার চিৎকার করে ধমক দিয়ে বললেন ,
- "আমি জিগ্যেস করেছি এখানে কি হয়েছে ? "
নিহা ন্যাকা কান্না করতে করতে বলল ,
- "দেখ অগ্নি এই মেয়ে কি অসভ্য । সিনিয়রদের সাথে বেয়াদবি করছে । আমাকে শুধু ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছে । 'আউচ' হাত খুব ব্যথা করছে । "
আমি নিহার কথা শুনে অবাকের চূড়ান্ত পর্যায় । আমি কিছু বলতে যাবো তার আগেই নিহা বলল ,
- "আমি শুধু অডিশনের জন্য লাইনে দাঁড়াতে বলেছিলাম । তাই রেগে এসব করলো । সে নাকি রুলস মানবে না । আবার বলে ,আমি কে জানো ? আমি অগ্নির খুব কাছের ! আমার জন্য কোনো রুলস নেই । "
অগ্নি আমার দিকে তাকিয়ে বাঁকা হেসে শান্ত স্বরে বললেন,
- "আজ কাল সিনিয়রদের সম্মান করা বোধহয় ভুলে গেছেন ? কখনো অপমান করছেন ,কখনো মারছেন !
ভার্সিটি তে এসে এসব শিক্ষা পাচ্ছেন ? "
আমি কিছু বললাম না । আমি জানি উনি সকালের কথা গুলোকে ইঙ্গিত করছে । উনাকে অপমান করায় এখনো রেগে আছে ।
উনি আমার দিকে খুব সুক্ষ্ম দৃষ্টি তে তাকিয়ে । আমি চুপ । আমি জানি আমি কিছু বললেও উনি এই মুহূর্তে শুনবে না । অগ্নি আমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন ,
- "তুমি কালচারাল প্রোগ্রামে পার্টিসিপেট করবে না । "
- "আমি পার্টিসিপেট করবো "
- "আমি না বলেছি তো তুমি করবে না "
আমি উনার কথায় উনার দিকে ছোট ছোট সন্দিহান চোখে তাকাই । উনি এতো কিছু রেখে আমার পার্টিসিপেট করার পিছনে কেন লেগেছে ? কি চায় উনি ? তা জানার জন্য আগুনে একটু ঘি ঢেলে দেই । বললাম,
- "কেন আমি করবো না অবশ্যই করবো । আপনার কোনো সমস্যা ? "
উনি রেগে বললেন ,
- "হ্যা আমার সমস্যা আছে ।স্টেজে এতো গুলো মানুষ হা করে তাকিয়ে থাকবে সবার সামনে ড্যাং ড্যাং করে গান গাইবে তা হবে না ।তুমি গান গাইবে না মানে না । "
- "আমি গান গাইবো একশো বার গাইবো । এতো ক্ষন ভেবেছিলাম গাইবো না কিন্তু এখন যেহেতু আপনার সমস্যা হচ্ছে তো আমি গান গাইবো ই গাইবো । "
উনি রেগে বাঁকা হেসে বললেন ,
- "আমি অডিশন নিচ্ছি আমি সিলেক্ট না করলে তুমি কি করে পার্টিসিপেট করবে ! "
আমি কৃত্রিম হেসে বললাম,
- "তাই বুঝি? আমি আদ্রিতা ম্যামের কাছে কমপ্লেইন করবো যে আপনি ইচ্ছে করে আমাকে সিলেক্ট করেননি । "
উনি আর কোনো কথা বললেন না । রেগে নাক ফুলিয়ে চলে যায় । আর আমার অডিশন ও নেন না ।আমি জানতাম উনাকে মায়ের কথা বললে উনি আর কথা বাড়াবেন না। আমার ট্রিক কাজে লেগেছে । আমি এখন থেকে তাই করবো যা উনার অপছন্দ । ছেলেরা দেখবে বলে উনি আমাকে গান গাইতে না করছে তাই না ? আমি এখন তাই করবো । উনার কথায় আমি কেন চলবো ? কিসের এতো অধিকারবোধ ? যেই সম্পর্কই উনি মানে না সেই সম্পর্ক নিয়ে উনার এতো কেন মাথা ব্যথা ?
রিহার্সালের ঘটনার পর তিন চারদিন চলে যায় । আমার আর অগ্নি মাঝে এর পর আর কোনো কথা হয় না। একি বাড়িতে একি ছাদের নিচে দুজন অপরিচীতদের মত থাকি । না কোনো কথা না কোনো নৈকট্য । দুজনের মাঝে শুধুই পিনপতন নীরবতা কাজ করে ।আমি বরাবরের মতই অগ্নিকে ইগনোর করি । দুজনের খুব কম চোখাচোখি হয় ।
উনি ঘুম থেকে উঠার আগেই ভার্সিটি তে চলে যাই । আর ফিরার সময় রিহার্সাল শেষ করে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে আসি । রিহার্সালের সময় ও লুকিয়ে চলে আসি । কোনো ভাবেই এই লোকের মুখোমুখি আমি হতে চাই না ।
___________________________
আজ রিহার্সাল শেষ হতে অনেক দেরী হয়ে গেছে । শেফাও অপেক্ষা করতে না পেরে চলে গেছে । আমি ভার্সিটির গেটে আসতেই দেখি উৎস ভাইয়া দাড়িয়ে আছে । আমাকে দেখেই আমার দিকে এগিয়ে আসে । এক গাল হাসি নিয়ে । আমিও সৌজন্য মূলক হাসি দিলাম । উৎস ভাইয়া আমার সামনে এসে বললেন,
- "কেমন আছো হুর পরী ? "
আমি মুচকি হেসে বললাম ,
- "আবার নতুন নাম ! "
উনি নিচের দিকে তাকিয়ে আলতো স্বরে বললেন ,
- "এখন তুমি মানুষটাই এমন যে তোমার প্রতি রুপ নতুন নতুন নামের সন্ধান দেয় । "
আমি মুচকি হাসলাম । উৎস ভাইয়া আবার বললেন ,
- "বললে না ,কেমন আছো? "
- "জি ভাইয়া ভালো আছি । আপনি কেমন আছেন? "
- "হুম ভালো। তোমার সাথে কিছু কথা ছিলো । যদি তোমার সমস্যা না হয় তাহলে কোথাও বসি ! "
আমি কিছুক্ষণ চুপ থেকে হ্যা বোধক মাথা নাড়ালাম ।উনার চেহারা দেখে মনে হচ্ছে ইম্পরট্যান্ট কিছু । উনার সাথে ভার্সিটির পাশে রেড রোজ ক্যাফে তে বসি ।উনি কফি অর্ডার করলেন । দুজনের মাঝে নীরবতা কাজ করছে । নীরবতা ভেঙে উৎস ভাইয়া বললেন,
- "হুর আমার জীবনে তোমার কতটা ইম্পরট্যান্টস তুমি হয়তো জানোনা । আমার জীবনের প্রথম প্রেম ছিলে তুমি আর হয়তো শেষও । "
উৎস ভাইয়ার কথায় আমি কিছুটা নোড়ে বসি । সংকোচিত স্বরে বললাম ,
- "কিন্তু ভাইয়া এখন এসব কথা.....মানে আরকি ...
আমাকে থামিয়ে উৎস ভাইয়া বললেন ,
- "আমি এখন এসব কেন বলছি তাই ভাবছো তো ? এসবের দরকার আছে হুর । আমি এখন যা বলবো তার জন্য এসব কথার প্রয়োজন আছে হুর । তোমার সবটা জানার অধিকার আছে । আমি তোমার এই অবস্থা মেনে নিতে পারছিনা "
উৎস ভাইয়ার কথায় আমার মনে ভয় চেপে ধরে । উৎস ভাইয়া কি আমার আর অগ্নির ব্যাপারে সবটা জেনে গেছেন? যদি মামাকে জানিয়ে দেয় ? না না আমাকে যে করেই হোক সবটা সামলিয়ে নিতে হবে । উৎস ভাইয়াকে বুঝাতে হবে ।
চলবে...❤️
প্লিজ সবাই সবার মতামত জানাবেন । ভুল ত্রুটি ক্ষমার চোখে দেখবেন 😊😊😊 ।