#শত_ ডানার_ প্রজাপতি
#urme prema (sajiana monir )
পার্ট : ৩০
চাঁদের চাঁদনী বড় কাচের দেয়াল ভেদ করে পুরো ঘর আলোকিত করছে । আমি বিছানায় গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছি । চোখে ঘুমের ছিটেফোঁটাও নেই । চোখ জোড়া খিচে বন্ধ করে রেখেছি । সোজাসুজি ভাবে বললে ঘুমের ভাণ করে আছি । অগ্নি আমার পাশেই বসে । মূলত অগ্নি পাশে আছে বলেই এমনটা করা । আমি চোখ বন্ধ রেখেই বলতে পারছি অগ্নি আমার দিকে গভীর চোখে তাকিয়ে আছে ।
নাকে সিগারেটের তীক্ষ্ণ গন্ধ আসছে । আমি পিটপিট চোখে তাকিয়ে দেখি অগ্নি পাশের চেয়ারে বসে আছে । পা জোড়া সেন্টার টেবিলের উপর উঠানো । হাতের সিগারেটটা জলজল করে জ্বলছে । চোখ দুটো ভয়ংকর লাল হয়ে আছে । আর দৃষ্টিটাও আমার দিকে । সবটা বুঝতে আমার খুব একটা কষ্ট হলো না । কারন চাঁদের উজ্জ্বল আলো আমাদের দুজনকেই ঘিরে আছে । অগ্নির মাতাল চাহনিটাও আমার চোখ এড়ায় না ।এই চোখে কি আছে ? রাগ? নেশা ? প্রেম? না তীক্ষ্ণত্ব কোনো চাওয়া ?
আমি সেদিকে আর তাকালাম না আমার চোখ জোড়া খিচে বন্ধ করে নেই । গাঁয়ের কম্বলটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরি । বেশ কিছুক্ষণ কেটে যায় । আচমকা টের পাই অগ্নি আমার দিকে এগিয়ে আসছে । ভয়ে আমি বালিশের কোনা খামচে ধরি । কপালটাও সামান্য কুঁচকে যায়। আচ্ছা অগ্নি আমার দিকে এগিয়ে আসছে কেন? আমাকে মারবে কি ?
যদি অগ্নি সজ্ঞানে অগ্নি কখনো এমনটা করবে না । কিন্তু এখনতো নেশারঝোঁকে আছে । যদি এমন কিছু করে দেয় এমনি তেই আমার উপর যা রেগে আছে ।
মনে ভয় খচখচ করছে । মনে মনে নিজের মনকে বুঝ দিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করছি ।
হ্ঠাৎ ই অগ্নির বরফ শীতল হাত আমার গালে স্পর্শ পাই । আমার দু গালে অগ্নির দু হাতের বৃদ্ধাঙ্গুল দিয়ে আঁকিঝুঁকি করছে । প্রত্যেকটা স্পর্শ খুব আদুরে । হঠাৎই অগ্নি কপালে খুব আলতো চুমু খেলেন । আমি কেঁপে উঠি । আমার পুরো শরীর কাটা দিয়ে উঠেছে । এই কনকনে শীতের মাঝেও গাল গরম হয়ে গেছে । কান থেকে গরম ধোঁয়া বের হচ্ছে।হার্ট খুব স্পীডে চলাচল করছে । উনার স্পর্শ গুলো এমন কেন? তড়িদগতি সম্পন্ন !
অগ্নি আমার ঘাড়ে চুলের মাঝেই নিজের মুখ ডুবায় । আমি তখনো চোখ মুখ খিচে বন্ধ করে আছি । উনার শরীর থেকে তীব্র মদের গন্ধ আসছে ।মদের গন্ধ আমার খুব অসহ্য লাগে । আমি কোনো রকম নিজেকে কন্ট্রোল করে রাখছি ।অগ্নি আমার ঘাড়ে বেশ কয়েকবার নিজের শীতল খশখশ করা ঠোঁটের স্পর্শ দেয় । আমি আমার কাঁপাকাঁপা হাত পা নিয়ে কোনো রকম চোখ বন্ধ করে আছি । অগ্নি আমার কানের লতিতে নিজের ঠোঁট ছুঁয়িয়ে আলতো স্বরে বলে ,
- "আমি জানি তুমি এখনো জেগে সুন্দরী ! নিজেকে এভাবে কষ্ট না দিয়ে চোখ খুলো । "
আমি উনার কথায় সাথে সাথে চোখ খুলে আড়চোখে অগ্নির দিকে তাকাই । অগ্নি তখনো আমার ঘাড়ে মুখ ডুবিয়ে আছে । আমি সিলিং এর দিকে তাকিয়ে আমতা আমতা করে বলি ,
- "আমার কাছে কেন এসেছেন । "
অগ্নির মাতাল স্বর ,
- "অনেকক্ষণ তো চেষ্টা করলাম তোমার থেকে নিজেকে দূরে রাখার। কিন্তু পারলাম কই ? তুমিই তো কাছে টেনে আনলে ! "
- "আমি কি করে কাছে টেনে আনলাম ? আমি কি আপনাকে ডেকেছি ? না আপনার হাত টেনে এনেছি ? "
উনি হাল্কা শব্দ করে হেসে উত্তরে বললেন,
- "ডাকার জন্য কি এই দুটো উপায় ই ? আর অন্য কোনো উপায় নেই ? "
আমি হ্যবলার মত অগ্নির কথায় থম মেরে আছি । অগ্নি আমার ঘাড় থেকে মুখ তুলে আমার দিকে ঝুঁকে ভারী গলায় উত্তর দেয় ,
- "ডাকার জন্য আরো কত উপায় আছে ! এই যে তুমি এলোমেলো চুলে বাঁকিয়ে আমার সামনে এমন আবেদনময়ী ভঙিতে শুয়ে আছো । মুখের উপর চাঁদের নুর পড়ছে । তোমার চাঁদেরকণা মুখটায় এক মোহনীয় মায়ায় ভরে আছে ।
তা কি আমাকে আকৃষ্ট করার জন্য যথেষ্ট নয় ? আমার বুকে আগুন জ্বালানো ,কন্ট্রোলেস করার জন্য যথেষ্ট নয় কি ? "
আমি অগ্নির থেকে চোখ সড়িয়ে নেই । অন্যদিকে তাকিয়ে বলি,
- "আপনি এখন সজ্ঞানে নেই । নেশার ঘোরে আছেন । "
অগ্নি আমার মুখ টেনে নিজের দিকে ঘুরিয়ে অস্থির কন্ঠে বললেন ,
- "একদম ঠিক বলেছো । আমি সত্যি নিজের মধ্যে নেই । আমি নেশায় পড়েছি! কিন্তু তা মদের না তোমার নেশায় পড়েছি । বুকে ঝড় উঠেছে । ভয়ংকর ঝড় । এই ঝড় শুধু তুমিই থামাতে পারো ! "
আমি অগ্নির দিকে ভীতু দৃষ্টি তে তাকাই । কি বলতে চাইছে অগ্নি ?
অগ্নি হয়তো আমার দ্বিধাদ্বন্দ্ব বুঝতে পেরেছে । এক টুকরো হেসে বললেন,
- "ভয় নেই সুন্দরী আমি এমন কিছু চাইবো না যা আমাদের দূরত্বের কারন হবে !
কিন্তু যা চাইবো তা আমাকে দিতেই হবে । তুমি দিতে বাধ্য !
আমার আজ রাতের জন্য তোমাকে চাই । "
অগ্নির কথায় আমি বড়বড় চোখ করে তাকাই । অগ্নি বললেন ,
- "এই না না তুমি যা ভাবছো তা নয় । আমি আজ সারারাত তোমাকে নিজের বুকের মাঝে আগলে রাখতে চাই মন জুড়িয়ে তোমাকে দেখতে চাই । কাল বাড়ি যাবে জানিনা আবার তুমি কবে ফিরবে । কবে আবার এতোটা কাছ থেকে তোমাকে দেখবো !
তাই আজ সারারাত তোমাকে দেখে পাড় করতে চাই ।"
আমি অগ্নির চোখে এই মুহূর্তে পাগলামো দেখছি । এই অগ্নি অন্য এক অগ্নি । এক অগোছালো অস্থির অগ্নি । যার চোখে তীব্র চাওয়া আকাঙ্ক্ষা !
আমি অগ্নির চোখের মায়া এড়াতে পারিনা । অগ্নিকে কিছুটা জায়গা খালি করে দিয়ে পাশেই শুয়ে পড়ি । অগ্নিও দেরী না করে লাফ দিয়ে বিছানায় উঠে । আমাকে টেনে বুকে নিয়ে নেয় । অগ্নির মুখে এই মুহূর্তে বিশ্বজয়ের হাসি !
____________________________
সকালে ঘুম ভাঙতেই অগ্নি কে পাশে দেখতে পাই না । নিচেও নেই ।
আপু আজ বাড়িতে যাচ্ছে ।প্রেগন্যান্সিতে মন একদম বাচ্চাদের মত হয়ে যায় । মায়ের কাছে থাকতে ভালো লাগে ।তাই আপু কিছুদিনের জন্য বাড়িতে যাচ্ছে । আমিও ঝোপ বুঝে কোপ মারি। আপুর সাথে বাড়িতে যাওয়ার কথা বলি । মা ও নিষেধ করেন না । আর অগ্নিও সকাল থেকে লাপাত্তা । আমি সকালের নাস্তা শেষে রুমে এসে প্যাকিং করছি । এমন সময়ই অগ্নির আগমন ঘটে ।কয়েক সেকেন্ড আমার দিকে আর প্যাকিং করা ব্যাগের দিকে রাগী দৃষ্টি তে তাকিয়ে থাকে । পাশে থাকা ফুলদানি টা মাটিতে আছাড় মেরে ওয়াশরুমে চলে যায় । আমি অগ্নির কান্ডে হা করব তাকিয়ে আছি । এমন হুটহাট রেগে যাওয়ার কারণ আমার মাথায় খেলছেনা।আমি তো কাল রাতেই বলেছিলাম আমি আজ বাড়িতে যাবো । তাহলে এমন রিয়েক্টের কারণ কি ? আর রেগে গেলে কি ঘরের জিনিস ভাঙা আবশ্যক ? এই লোকের এই একটা জিনিস আমার প্রচন্ড বিরক্ত হই । রেগে গেলে হয়তো নিজের ক্ষতি করবে ,না হয় ঘরের জিনিস ভাংচুর করবে !
আমি উনার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘ এক নিশ্বাস ছাড়ি । আমি যখন রেডি হচ্ছিলাম অগ্নি পুরোটা সময় আমার দিকে তাকিয়ে ছিলেন । কোনো সাড়াশব্দ ছাড়া । চোখ দুটো রক্তলাল ছিলো ।আমার সাথে টু শব্দ পর্যন্ত করে না । ভাইয়া অগ্নিকে আমাদের মামা বাড়ীতে পৌছিয়ে দেওয়ার কথা বললে । অগ্নি রেগে উত্তর দেয় । উনি আমাদের দিয়ে আসতে পারবে না । উনার সময় নেই । বলেই রাগে ফুসতে ফুসতে উপরে চলে যায় । উনার ব্যবহারে আপু আর ভাইয়া বেশ অবাক হয় । ভাইয়া আমাদের বাড়িতে পৌছিয়ে দেয় ।
বাড়ি তে সবার সাথে দেখা করি ।
মামা মামি আমাদের দেখে খুব খুশি হয়ে যায় ।সবাই একসাথে দুপুরে লাঞ্চ করি ।
লাঞ্চ শেষ করে দুপুরের পর বিছানায় গাঁ এলিয়ে দেই। এতো দিন পর নিজের নিজের ঘর নিজের বিছানায় শুয়ে বেশ শান্তি লাগছে । কেমন যেন মুক্ত মুক্ত লাগছে । কিছুক্ষনের মাঝেই ঘুমের দেশে তলিয়ে যাই । মাগরিবের আযানে ঘুম ভাঙে । নামায পড়ে কফির মগটা হাতে নিতেই ফোনটা বেজে উঠে ।ফোনের সাথে সাথে মনের ঘন্টিটা ও বেজে উঠে । অগ্নি ফোন করেছে কি ? উৎসাহ নিয়ে তাড়াতাড়ি ফোনটা হাতে নেই । ফোনের দিকে তাকিয়ে দেখি শেফার নাম ভাসছে । মনটা ছোট হয়ে যায় । শেফার সাথে কথা বলে জানতে পারি । রবিনকে ভার্সিটি থেকে টিসি দেওয়া হয়েছে । আর অগ্নিকে এক সাপ্তাহের জন্য সাসপেন্ড । খোলা চোখে অগ্নি যদিও কোনো দোষ করে নি । কিন্তু মারামারি আর ভার্সিটির রুলস ব্রেক করার কারনে এমনটা করেছেন । যদি অগ্নিকে কিছু না বলা হয় তাহলে অন্যান্য স্টুডেন্ট তা খারাপ নজরে নিবে । আর তাছাড়া অগ্নি ভার্সিটির রাজনীতিতে জড়িত যদি এমনটা না করে তবে সবাই ভাববে ক্ষমতার জোরে এসব করেছেন ।পরবর্তীতে ভার্সিটি তে বাজে পরিবেশ সৃষ্টি করবেন । অগ্নি নিজের থেকেই মাথা পেতে পানিশমেন্ট নিয়েছেন ।
সেদিন অগ্নি আর ফোন দেয় না । সারারাত কেটে যায় কোনো খোঁজ নেয় না ।
_________________________________
আজ দুদিন হয়ে গেছে । অগ্নির কোনো খোঁজ নেয় নি । এই দুদিনে রাগ অভিমান আরো মাথায় চড়ে বসেছে । এই তার ভালোবাসা ? এই ?
দুদিনে না ফোন করেছে ,না কোনো খোঁজ নিয়েছে !
অসভ্য লোক একটা । কাছে থাকলেই যত ভালোবাসা কেয়ার হ্যান ত্যান !
এই দুদিনে মা কম হলেও শতবার ফোন করেছে । আর শেফা তো সারাদিনই ফোনের উপর ফোন করছে । কি করছি ? খেয়েছি নাকি? এটা ওটা জিগ্যেস করছে । যেন আমার প্রেমিক বা স্বামী । শেফার এমন হুটহাট টাকা খরচ করে ফোন দেওয়া আর সারাদিন কথা বলা । আমাকে বেশ ভাবাচ্ছে ! মেয়েটার কি হলো ? মেয়েটার জেন্ডার- টেন্ডার চেঞ্জ করেছে কি ?
ইয়াক ! যাতা ভেবে যাচ্ছি । আই হেইট মাই মাইন্ড ।
কাল আইসক্রিম খেয়ে গলা বসে গিয়েছিলো । মামা মামী আপু কত খেয়াল রেখেছে । শেফা আর মা তো কিছুক্ষণ পর পর ফোন দিয়ে খবর নিয়েছে ।
সবাই আমার কতো খেয়াল রাখে । আর এক উনি যার আমার থাকা না থাকায় কোনো কিছু আসে যায়না । মনে একরাশ অভিমান বুকে জমাট বাঁধে !
সকাল দশটার দিকে শেফা ফোন দেয় ।বিকালে বের হতে চাইছে । বাড়ি থেকে বিয়ে ঠিক করেছে । আজ বিকালে ছেলের সাথে দেখা করবে । আমি প্রথমে না করে দেই । কিন্তু পরে শেফার রিকোয়েস্টে আর না করতে পারি না । যাওয়ার জন্য রাজি হই । বাড়িতে বন্ধী থাকতে থাকতে হাপিয়ে গিয়েছি । বাহিরে বের হলে মন কিছুটা হাল্কা হবে ।
আর অগ্নির ভূত ও ঘাড় থেকে নামবে !
চলবে.....❤️
প্লিজ সবাই সবার মতামত জানাবেন । ভুল ত্রুটি ক্ষমার চোখে দেখবেন 😊😊😊।