#শত_ ডানার_ প্রজাপতি
#urme prema (sajiana monir )
পার্ট : ৩৭
কিছুক্ষণ পূর্বেই মায়ের জ্ঞান ফিরেছে । মায়ের কেবিনে সবাই । মা অপরাধ ভঙ্গী তে সেটে হেলান দিয়ে আছে । অগ্নি মায়ের হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে শব্দহীন ভাবে চোখের জল ফেলছে । মা অগ্নির মাথায় হাত রেখে অগ্নিকে শান্ত করার চেষ্টা করছে।কিন্তু অগ্নি কোন ভাবেই থামছে না । বাচ্চাদের মত কান্না করে যাচ্ছে ।মাকে আকড়ে ধরেই এতোটা বছর বেঁচে এসেছে। আজ যখন জেনে মায়ের খুব তাড়াতাড়ি তার মা তাকে ছেড়ে চলে যাবে অগ্নির যেন পুরো দুনিয়ায় অন্ধকার নেমে এসেছে । বাচ্চা দের মত কান্না করে নিজের মাকে নিজের কাছে রাখার অপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে । অগ্নির এমন অবস্থা দেখে বার বার ভেঙে পড়ছি ।অগ্নি কে কি করে সামলাবো? কি সান্ত্বনা দিবো ?
অগ্নি মায়ের হাত ধরে কান্না করতে করতে বলে ,
- "মা তুমি কেন এতোবড় কথা লুকালে ? কেন তোমার অসুস্থতার কথা আমাদের জানাও নি ? "
মা মলিন হেসে বললো ,
- "আগে জানালে কি হতো? কোনো কিছু কি পরিবর্তন হতো ? শুধু শুধু তোমরা সবাই চিন্তা করতে ভেঙে পড়তে । "
- "মা তুমি এমন ভাবে বলছো যেন কিছুই হয়নি । আর এতোটা মাস তুমি একাই সব কষ্ট সহ্য করেছো নিজেই সব সামাল দিয়েছো সব চাপ টেনশন নিয়েছো। আমাদের একটা জানাও নি ।আর আমিও অপদার্থ ছেলের মত কিছুই বুঝিনি । নিজের মার কষ্ট গুলো একবার বুঝিনি । "
বলেই অগ্নি আবার কান্নায় ভেঙে পড়ে । খুব করে কাঁদছে অগ্নি । মা অগ্নির মাথায় হাত রেখে কান্না জড়ানো গলায় বললেন ,
- "কে বলেছে আমার ছেলে অপদার্থ ? আমার ছেলে লাখে এক । যার মত কেউ কখনো হতে পারবেনা । খুব দায়িত্ববান । এইযে আমার পুরো পরিবার আমার সামনে । সবাই হাসি খুশি একসাথে আছে এর চেয়ে বেশি আর কি হতে পারে? এখন আমার মৃত্যু হলেও কোনো আফসোস নেই । আমার সবচেয়ে বড় শান্তি কি দেয় জানো ? আমার জীবনের সব ঋন আমি শোধ করেছি । তোমার জন্য যোগ্য বউ এনেছি যে সারাজীবন তোমার খেয়াল রাখবে ,সামলাবে ,ভালোবাসবে সঠিক রাস্তা দেখাবে । অগ্নি তোমার জন্য হুরের চেয়ে বেটার লাইফ পার্টনার কেউ হতে পারতো না । আমি জানি তুমি রেগে ছিলে আমার উপর কিন্তু আমার এই ডিসিশন তোমার কথা চিন্তা করে নেওয়া । আমি তোমার জন্য ভরসার হাত খুঁজছিলাম আর একমাত্র হুরই তোমার যোগ্য । "
অগ্নি মায়ের পায়ে ধরে কান্না করতে করতে বলে ,
- "মা স্যরি ! আমাকে মাফ করে দেও । আমি তোমাকে অনেক কষ্ট দিয়েছি ভুল বুঝেছি । রুড বিহেভ করেছি । কিন্তু তুমিই সঠিক ছিলে মা । তোমার ডিসিশন ঠিক ছিলো । তুমি আমাকে আমার হারানো জিনিস ফিরিয়ে দিয়েছো আর আমি তোমাকেই ভুল বুঝছি । ক্ষমা করে দেও মা । আমাকে ক্ষমা করে দেও । "
- "বাবা রে মায়েরা কি সন্তানের উপর রেগে থাকে? আমি জানতাম তুমি একদিন আমাকে ঠিক বুঝবে । "
মা হাতে ইশারা আমাকে নিজের দিকে ডাকেন আমি কাঁপা কাঁপা পায়ে মায়ের দিকে যাই । মায়ের পাশে বসি । মা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,
- "মা তুই যথেষ্ট ধৈর্যশীল একটা মেয়ে । আজকালকের মেয়েদের থেকে একদম আলাদা । আমি জানি আমার কাছে সময় খুব কম । হয় তো এখনি ,,, তুই আমার ভরসা । আমার পাগল ছেলেটাকে একমাত্র তুই ই সামলাতে পারবি । একটু রাগী একটু পাগলামি করে । কিন্তু মন থেকে খুব ভালো । তোকে খুব ভালোবাসে মন প্রাণ উজাড় করে তোকে চায় । আমি জানি সারাজীবন তোকে আগলে রাখবে । আমার ছেলেটার কাছে তুই সব । আমার ছেলের ঢাল হয়ে সব সময় থাকবি । তুই ই অগ্নির শক্তি ।সব সময় আমার ছেলের পাশে থাকিস মা । "
আমি নিজের কান্না আটকাতে পাড়লাম না । শব্দ করে কেঁদে দেই । মা আমার চোখের পানি মুছে দিয়ে বললেন ,
- "একদম কাঁদবি না । তুই ভেঙে পড়লে সবাইকে কে সামলাবে । এখন তো তোর অনেক দায়িত্ব মা ।"
মা হিয়া আপুকে কাছে ডাকে। আপু মায়ের পাশে বসে । মা হিয়া আপুকে বললেন ,
- "আমি আবির আর অগ্নিকে কখনো দু চোখে দেখিনি । আমি আবিরকে জন্ম না দিলেও আবির আমার বড় ছেলে । তার তুমি আমার বড় বউমা । আমার আরেক মেয়ে । আমার নাতী- নাতনী দেখার সৌভাগ্য আমার বোধহয় হবে না । কিন্তু তাদের বলো তার প্রতি আমার অনেক ভালোবাসা । নিজের আর আমার ছেলের খেয়াল রাখবে আর সন্তানের কাছে একজন সৎ মা হবে । এটাই নারী আসল আদর্শ ।এই সংসার এখন তোমাদের দুবোনের । সব সময় জুড়ে রেখো । "
হিয়া আপু মুখ চেপে কান্না করতে লাগলেন । আবির ভাইয়া মায়ের হাত ধরে জোরে শব্দ করে কান্না করছে । মা মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন ,
- "বাবা তুই না বুঝদার ? তুই এমন অবুঝের মত আচরণ করলে হবে । তোকে যে এখন সব সামাল দিতে হবে । হিয়ার খুব খেয়াল রাখবি । হিয়া কখনো অসম্মান করবেনা । তাহলে আমার আত্না অনেক কষ্ট পাবে।"
আমি মায়ের দিকে শান্ত চোখে তাকিয়ে আছি ।টপটপ করে আমার চোখ থেকে পানি ঝোড়ছে । মায়ের দিকে অপলক দৃষ্টি তে তাকিয়ে আছি । আমার দেখা শ্রেষ্ঠ মানুষ । নিজের পরিবারের জন্য নিজেকে শেষ গেলো সারাজীবন । নিজের মৃত স্বামীর স্মৃতি নিয়ে এতোটা বছর পাড় করেছে কখনো ভেঙে পড়েনি সারাজীবন শক্ত হয়ে বটবৃক্ষের মত সবাইকে ছায়া দিয়ে গেছে । নিজে একাই সব বিপদ কাঁধে দিয়েছে । একজন সফল বিজনেস ওম্যান । একজন শ্রেষ্ঠ মা । যতবার দেখি গর্বে বুক ভরে যায় । আজ জীবনের শেষ মুহূর্তে এসেও সবাইকে সামলাচ্ছে । সবাইকে নিজেদের দায়িত্ব বুঝিয়ে দিচ্ছে । জীবনের প্রত্যেকটা হিসাব মিলাচ্ছে । এতো সাহস আর এতো ধৈর্য আমি কখনো কাউকে দেখিনি । আমার আইকন । যার থেকে জীবনের পথ চলা শিখা যায় ।
রাত দশটা বাজে । আমি আর অগ্নি হসপিটালে মায়ের সাথে । আবির ভাইয়া আর হিয়া আপুকে বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছি । আপু প্রেগন্যান্ট সারাদিন এখানে ছিলো । সামনে মাসেই আপুর ডেলিভারি । এখন এতো তোড়জোড় করা ঠিক না । প্রোপার রেষ্টের প্রয়োজন । অগ্নিকে এখন পর্যন্ত কিছু খাওয়াতে পারিনি । অগ্নি মায়ের হাতে মাথা ঠেকিয়ে নত হয়ে আছে ।
মা ঘুমাচ্ছে । আমি অপলক দৃষ্টি তে তাকিয়ে আছি মায়ের দিকে সাহসী মানুষটা একদম নেতিয়ে গেছে ।আমি অগ্নির কাঁধে হাত রাখতেই অগ্নি মাথা ঝাড়া দিয়ে উঠে । শান্ত স্বরে বলি,
- "একটু ফ্রেশ হয়ে কিছু খেয়ে নিন । সারাদিন কিছু মুখে নেন নি । "
- "আমার ভালো লাগছে না "
- "একটু কিছু মুখে দিন । না খেয়ে সারারাত জাগলে অসুস্থ হয়ে যাবেন । "
অগ্নি না করতে চাইলো । কিন্তু আমি একপ্রকার জোড় করে পাঠাই । অগ্নিব দরজার কাছে যেতেই ।
মা শব্দ করে জেগে উঠে ।কেমন যেন ছটফট করছে । অগ্নি আর আমি মাকে সামলাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ি । মায়ের চোখ মুখ কেমন যেন হয়ে যাচ্ছে । বড় বড় শ্বাস নিচ্ছে । চোখ উল্টিয়ে যাচ্ছে । আমি কান্না করতে করতে চিৎকার করে ডক্টর কে ডাকি । মা ততক্ষনে চোখ উল্টে শরীর ছেড়ে দিচ্ছে । নিজের শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করছে । কোনো সাড়াশব্দ করছে না। ডক্টর হাতের পালস চেক করে আমাদের দিকে তাকিয়ে মাথা নত করে বললেন ,
- "স্যরি সি ইজ নো মোর "
এই কথাটাই আমার পুরো দুনিয়া এলোমেলো করে দিলো । মাথা ঝিমঝিম করছে । শরীর ভর ছেড়ে দিচ্ছে । পাশের দেয়াল ধরে দাড়াতে যাই কিন্তু পারিনা । হুট করে ফ্লোরে লুটিয়ে পরি ।তার পর আর কিছু মনে নেই ।
চলবে ...❤️❤️❤️
প্লিজ সবাই সবার মতামত জানাবেন । ভুল ত্রুটি ক্ষমার চোখে দেখবেন 😊😊😊 ।