#অন্তরমোহ [ ৫]
#সুহাসিনি_মিমি
“মেরে দিই? দিই মেরে? খুব তো আমার মুখের ওপর জবান ফুটছিল। এখন কথা বলো! আমার কথার অবাধ্য হয়ে পালিয়ে যাওয়া? এই গ্রামের বাইরে পা রাখার স্পর্ধা দেখিয়েছ যেহেতু, ফলস্বরূপ কিছু তো শাস্তি ভোগ করতেই হবে। কী হলো, দেব ট্রিগার চেপে?”
আনভীরের চোখ দুটো রাগে লাল। হিংস্র একদম। এক হাত দিয়ে আরোহীর মুখটা শক্ত করে চেপে আছে। মুখের ভেতর নিজের সেই কালো কুচকুচে রিভলবারের নলটা ঢুকিয়ে রেখেছে সে। আরোহীর দম বন্ধ হয়ে আসছে। লোহার শীতল, নোনতা স্বাদটা ওর জিভে লাগতেই শরীর অবশ হয়ে এলো। কিছুই বলতে পারছে না। শুধু চোখ দিয়ে অবিরল ধারায় পানি ঝরছে। আনভীর সেই ভয়ার্ত চোখের দিকে তাকিয়ে পৈশাচিক হাসল। তারপর সত্যি সত্যি আঙুলটা ট্রিগারের ওপর রেখে যেই না চাপ দিতে যাবে অমনি ভঙ্গুর গলায় কোনোরকম বলল আরোহী,
“না! আমাকে মারবেন না প্লিজ! আমি যাব না। কোথাও যাব না আর। মারবেন না, মারবেন না! আহ!”
চরম এক আর্তনাদ করে ধড়ফড়িয়ে বিছানার ওপর লাফিয়ে বসল আরোহী। বুকটা কামারের হাপরের মতো ওঠানামা করছে। সারা শরীর ঘামে একদম জুবুথুবু। দুই হাত দিয়ে নিজের মুখ আর গলা হাতড়ে দেখল। না, কোথাও কোনো পিস্তল নেই। চারপাশটায় চোখ বুলাতেই বুঝল স্বপ্ন ছিল। কি ভয়ানক স্বপ্ন। ভাবা যায়!নিজের অবাধ্য মনকে শান্ত করতে সে জোরে জোরে কয়েকটা শ্বাস টানল। টেবিলের ওপর রাখা কাচের গ্লাস থেকে ঢকঢক করে কিছুটা পানি খেলো।
অতঃপর ধুপ করেই বালিশে মাথা লাগিয়ে শুয়ে পড়ল। বড়োসড়ো একটা শাস নিলো। কেবলই ফজরের আজান পড়ছে। বাড়ি থেকে বেশ কাছাকাছিই মসজিদ। আজানের ধ্বনি স্পষ্টতই শোনা যাচ্ছে। মনটাকে শান্ত করল। মনে মনে বিড়বিড় করল,
"কিছু হবেনা। তোর ভাইতো তোকে কথা দিয়েছে এই জাহান্নাম থেকে বাইরে বের করে নিয়ে যাবে। এতো ঘাবরাস না আরোহী। রিলেক্স। একদম চিল থাক। লোকটা তোর কিছুই করতে পারবে না। জাস্ট ভালোয় ভালোয় এখান থেকে একবার বের হতে পারলেই সব ঠিক। সব!"
.
নিচ থেকে হট্টগোলের শব্দে ঘুম ভাঙল আরোহীর। গতকালের মুষলধারে বৃষ্টির পর আজ সকালের আকাশটা একদম ফকফকা পরিষ্কার। কাচের মতো স্বচ্ছ রোদ এসে পড়েছে আরোহীর ঘরের জানালায়।
ঘড়ির দিকে তাকাল। দেখল, বেলা ন'টা পেরিয়ে গেছে। এত মানুষের গলার আওয়াজ পেয়ে না চাইতেও উঠে বসল। তখনি রুমে প্রবেশ করলেন ওর মেজো মামী। তাঁরা দিয়ে বললেন ওকে,
"উঠছো! জলদি গোসল কইরা কিছু খাইয়া রেডি হইয়া নেও। তোমারে নিতে আইসে!"
"নিতে আসছে? কে এসেছে? কোথায় যাবো আমি?"
"সিকদার ভিলা'য়!"
আরোহী চকিত চাইল। মামীকে পাশ কাটিয়ে উঠে এলো বাইরে।বসার ঘরে আসতেই দেখল, সোফায় বসে আছেন সেই ভদ্রমহিলা। যে ঐদিন তাকে এসে গয়না পরিয়ে দিয়েছিলেন, তিনি।উনারা যেতেই সেসব গা থেকে খুলে ছুড়ে মেরেছিলো সে। স্বর্ণ, অলংকার এসব একদমই পছন্দ হয়না ওর।
আরোহী সিউর হলো এটাই ওই লোকটার মা। লোকটার নাম টাও আরোহী জানেনা। জানার ইচ্ছেটুকুও নেই। আঞ্জুমান এসেছেন আরোহীকে সঙ্গে করে নিয়ে যাওয়ার জন্য। এই এলাকার প্রভাবশালী পরিবার তাঁরা। মস্ত নামডাক তাদের। তাইতো চেয়ারম্যান বাড়ির ছেলের বিয়ের কথাটা খবরের কাগজের আগেই ছড়িয়ে পড়েছে লোকসম্মুখে। দূর-দূরান্ত থেকে নামি-দামি আত্মীয়স্বজনরা আসতে শুরু করেছে চেয়ারম্যান বাড়িতে। নতুন বউ দেখার জন্য। আর সেই কারণেই সুফিয়া বেগম আজ সকালে সশরীরে হাজির হয়েছেন শেখ বাড়িতে। নিজের পুত্রবধূকে সাময়িকভাবে সিকদার বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার জন্য।
তবে ড্রয়িংরুমের পরিবেশটা বড্ড থমথমে।মিনহাজকে কিছুতেই রাজি করাতে পারছেন না ভদ্রমহিলা।মিনহাজ একপাশে শক্ত মুখে বসে আছে।তার চোয়াল শক্ত।আঞ্জুমান আরোহীর মা আর মামা-মামির উদ্দেশ্যে হাত নেড়ে বলছেন,
“বুঝলেন ভাবি, বাড়িতে মেহমানে লোকারণ্য অবস্থা। সবাই আনভীরের বউ দেখতে আসছে। চেয়ারম্যান সাবও চাইলেন আরোহী একটু ও বাড়ি যাক। জাস্ট কিছুক্ষনের'ই সময়। মেহমানরা গেলেই আমি নিজ দায়িত্বে মেয়ে দিবে যাবো!"
মিনহাজ সঙ্গে সঙ্গে কড়া গলায় দ্বিমত পোষণ করল,
"তা কী করে হয়? বিয়েটা কোনো স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে হয়নি। আর আপনাদের ছেলেও আরোহীকে মর্যাদা দিয়ে ঘরে তোলেনি। এখন হঠাৎ লোক দেখানোর জন্য ও একা ওই বাড়িতে যাবে না।"
মিনহাজের এমন সাফ সাফ জবাবে আঞ্জুমান কিছুটা আমতা আমতা করলেন। আরোহীর মামা আর মামী তখন মিনহাজকে টেনে একটু আড়ালে নিয়ে বোঝাতে লাগলেন। মামী ফিসফাঁস করে বললেন,
“মিনহাজ বাবা, অমন করো না। ওনারা এলাকার মাথা। তাছাড়া আরোহীর তো ওখানেই বিয়ে হইসে।আজ হউক কাল হউক ও বাড়িতেই যেতে হবে। মানুষ তো নানা কথা কইব। এখন না পাঠাইলে ওনাদের মান-সম্মান যেমন ক্ষুণ্ণ হইব। আর সিকদাররা নিজেদের মান সম্মান বজায় রাখতে সব করতে পারে।পরিস্থিতি ঘেটে যাবে তাইলে। আমাদেরও মুখ দেখানোর জায়গা থাকব না।”
আরোহী উপরে দাঁড়িয়ে সবটাই দেখল। আশ্চর্য! উনারা আবার রিকোয়েস্টও করতে জানেন? ছেলে রাত বিরাতে এসে মাস্তানি করে যা তা করে যায়। আর মা দিনের বেলা এসে নম্রতা দেখান। আরোহীর হাসি পেল। এরা একেকটা পারেও বটে। ড্রামাবাজ।
আরোহীর মা-ও ছেলের হাত ধরে অশ্রুসজল চোখে বললেন,
“মিনহাজ, বাবা আমার। একটু শান্ত হ।ঠান্ডা মাথায় ভাব। আঞ্জুমান ভাবি খারাপ মানুষ না। ওনার ওপর ভরসা রাখ।”
আঞ্জুমান এবার নিজেই এগিয়ে এলেন মিনহাজের দিকে। অত্যন্ত নরম কণ্ঠে বললেন,
“মিনহাজ বাবা। তুমি আমার ছেলের ওপর রাগ করে আছো। আমি জানি। আনভীর অন্যায় করছে। কিন্তু মা হিসেবে আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি। আরোহীকে আমি নিজের দায়িত্বে নিয়ে যাচ্ছি। ওর গায়ে একটা আঁচড়ও লাগতে দিবো না। মেহমান বিদায় হইলেই আমি নিজে গাড়ি করে ওকে আবার তোমাদের এখানে দিয়ে যাবো আমার ওপর এই ভরসাটুকু রাখো বাবা।”
চারপাশ থেকে মা, মামা-মামির অনুনয়ের পর অবশেষে না চাইতেও রাজি হলো মিনহাজ। ভদ্রমহিলার কথাটা মনে ধরেছে হয়তো তার। এক বুক দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে কিছুটা নমনীয় হলো। অবশেষে সে রাজি হলো আরোহীকে পাঠাতে।
ওদিকে দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে সবটা শুনছিল আরোহী। ও বাড়িতে যাওয়ার কথা শুনেই ওর বুকের ভেতরটা দুরুদুরু করে কাঁপতে লাগল। ও বাড়িতে তো সেই জল্লাদ লোকটা আছে! যার কোমরে রিভলবার থাকে! একা একা ওই নরকে সে কীভাবে যাবে?
মিনহাজ আরোহীকে দেখতে পেয়ে কাছে এগিয়ে এলো। আরোহী ভয়ে ও আশঙ্কায় ভাইয়ের হাত দুটো খপ করে ধরে কেঁদে ফেলার মতো করে বলল,
“ভাইয়া, আমি যাব না। প্লিজ আমাকে পাঠিয়ো না। আমার খুব ভয় করছে ভাইয়া। আমি একা থাকতে পারব না ওখানে।”
মিনহাজ আরোহীর মাথায় স্নেহের হাত বুলাল। বলল,
"এদিকে আয়!"
আরোহী গেল। বোনকে অনেক্ষন যাবৎ কি কি যেন বুঝালো মিনহাজ। আরোহীও চুপচাপ একনিষ্ঠ ভাবেই সবটা শুনল। কথা শেষ হতেই মিনহাজ মাথা নাড়িয়ে জিজ্ঞেস করল,
"এবার বুঝেছিস তো? ভাইয়ের ওপর ভরসা রাখ।বাকিটা আমি সামলে নিবো। কেমন?"
অগত্যা তাই মানল আরোহী। মনের সমস্ত অনিচ্ছা চেপে বাধ্য মেয়ের মতো মাথা ওপর-নিচ করল। মিনহাজ অয়নকে ডেকে বলল,
“অয়ন ও যাবে ওর সঙ্গে।"
অয়ন তো হাতে চাঁদ পেল! সে লাফিয়ে উঠে বলল,
“হ হ ভাইয়া! আমি যামু। আপুর একলা লাগব না আমি গেলে। আমি সাথে থাকলে আরোহী আপু একদম বিন্দাস থাকব!”
অয়নের যাওয়ার কথা শুনে কিছুটা স্বস্তি পেল আরোহী।
.
গাড়ির মধ্যে প্রথমে বেশ অস্বস্তি নিয়েই এসে বসল আরোহী। আরোহীকে গাড়িতে তুলে নিয়ে নিজের পাশেই বসালেন আঞ্জুমান। পুরোটা পথ মেয়ের মতো আগলে রাখলেন। মাথায় হাত বুলিয়ে, নানা কথার ছলে আরোহীর মনের ভেতরের জড়তা, ভয় দূর করার আপ্রাণ চেষ্টা করলেন। পাশে বসা চঞ্চল অয়নের অবশ্য সেসবে খেয়াল নেই। জানালার বাইরে চোখ রেখে নিজের মনেই হুল্লোড় করে যাচ্ছিল পুরোটা পথ।
চল্লিশ মিনিট পর গাড়িটা এসে থামল একটা জায়গায়। জানালা দিয়ে সামনে চোখ পড়তেই আরোহীর চোখজোড়া বিস্ময়ে কিছুটা চড়কগাছ হয়ে উঠল। রীতিমতো এক রাজকীয় রাজপ্রাসাদ! বিশাল জায়গা জুড়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে প্রাসাদটি। একপাশে কারুকার্যখচিত কিছু লেখা ফুটে উঠল, সিকদার ভিলা!
এই বিশাল অট্টালিকার দিকে তাকিয়ে আরোহী ক্ষণিকের জন্য থমকে গেল। ভেতরে ভেতরে একটা অজানা অস্বস্তি আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠল তার।গাড়ি থেকে আগে নামলেন আঞ্জুমান।নেমে অত্যন্ত যত্নে আরোহীর হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিলেন। তারপর মৃদু হেসে কোমল স্বরে বললেন,
"ওড়নাটা একটু টেনে মাথায় ঘোমটা দিবে মা?আমাদের এই বাড়ির একটা নিয়ম আছে। বাড়ির বউদের মাথা খোলা থাকে না। পরপুরুষের নজরে যেন চুল না পড়ে। যতই হউক তুমি তো এখন এই বাড়ির'ই বউ!"
শাশুড়ির এমন স্নেহমাখানো আদেশ খানা অমান্য করতে পারল না আরোহী। বাধ্য মেয়ের মতো জামার ওড়নাটা টেনে মাথার ওপর সুন্দর করে গুছিয়ে দিল।
চেয়ারম্যান বাড়ির উঠোনে আর বারান্দায় তখন দূর-দূরান্ত থেকে আসা আত্মীয়-স্বজনে গিজগিজ করছে। নতুন বউ গাড়ি থেকে নেমেছে দেখেই বাড়ির তরুণীরা আর কাজিনদের দল হইহুল্লোড় করে ছুটে এলো।
“ভাবি এসেছে! আনভীর ভাইয়ার বউ এসেছে!”
বলে বলে চারদিকে শোরগোল পড়ল।হঠাৎ এত এত মানুষের কৌতুহলী চোখ, মানুষের হইচই দেখে ভ্যাবাচ্যাকা খেল আরোহী। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অয়নের হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল।যেন এই অচেনা সাগরে অয়নই তার একমাত্র চেনা দ্বীপ। আরোহীর এমন জড়সড় ভাব দেখে আঞ্জুমান ওর কাঁধে হাত রেখে আশ্বস্ত করলেন,
“একদম ঘাবড়াবে না মা। এটা তোমারই বাড়ি। তোমার নিজের ঘর। চলো আমার সাথে।”
আঞ্জুমান আরোহীকে আগলে নিয়ে ভেতরের ড্রয়িংরুম পার হয়ে সোজা দোতলায় উঠলেন।সুসজ্জিত একটা ঘরের দিকে নিয়ে গেলেন। ঘরটি বেশ পরিপাটি। দামী কাঠের আসবাবে সাজানো। আরোহীর পিছন পিছন এলো বাড়ির সব তরুণীরাও। আরোহীকে খাটের ওপর বসিয়ে ভদ্রমহিলা গিয়ে আলমারি খুললেন। একটা বটল গ্রিন রঙের জামদানি শাড়ি বের করলেন। সেই সঙ্গে কিছু ছোট বড় বাক্স বের করলেন। আরোহীকে ঘিরে বসা বাড়ির তিন-চারজন মেয়েদের উদ্দেশ্য করে বললেন,
"এই শাড়িটা আর গহনা গুলো তোদের ভাবীকে পড়িয়ে নিচে নিয়ে আয়। আমি নিচে গেলাম কেমন?"
বলে ভদ্রমহিলা চলে গেলেন। আঞ্জুমান যেতেই বাড়ির মেয়েগুলো হড়বড় করে ঘিরে ধরল আরোহীকে। একেকজন একেক মন্তব্য করতে ব্যস্ত। দুজন ইতিমধ্যে আরোহী কে আগে দেখলেও বাকিজন তো দেখেনি।একজন আরোহীর চিবুক ধরে বলল,
“ওমা! ভাইয়া তো দেখি আস্ত একখানা পরি ধরে নিয়ে এসেছে! কী মিষ্টি গায়ের রঙ!”
আরেকজন পাশ থেকে ফোড়ন কাটল,
“ঠিক বলেছিস। সাজ ছাড়াই যদি এমন পুতুল লাগে তবে সাজালে তো নিচে নামানোই যাবে না। আমাদের ভাইয়ার চোখ আছে বটে!”
আরোহীর এদের কথা কানে গেলো কিনা সন্দেহ। ওর-তো গহনা আর শাড়ি দেখে মনে মনে প্রাণ যায় যায় অবস্থা! মনে করার চেষ্টা করল বিয়ের দিন ছাড়া লাস্ট কবে শাড়ি পড়েছিল। দীর্ঘ অতীত ঘেঁটেও মনে করতে পারল না। তারমধ্যে আবার এতো এতো গহনা!
শুরু হলো সাজানোর পর্ব। আরোহী তার জীবনে এই নিয়ে দ্বিতীয়বার শাড়ি পরছে।শাড়িটা পরিপাটি করেই পড়িয়েছে আনভীরের কাজিনরা। শাড়ি পরানো শেষে দুই হাতে স্বর্ণর বালা পরালো। কানে বড় বড় দুটো ঝুমকাও পড়ালো। সবশেষে মাথায় নববধূর মতো লম্বা একটা ঘুমটা টেনে দিলো।
সবুজ রঙের বিপরীতে দুধে-আলতা গায়ের চামড়া যেন আরও বেশি দ্যুতি ছড়াচ্ছে। কানের ভারী সোনার ঝুমকো দুটো গাল ছুঁয়ে দুলছে। লম্বা ঘোমটার আড়াল থেকে বেরিয়ে থাকা মায়াবী, ভয়ার্ত মুখটা নজরকারতে সক্ষম। বাড়ির সব মেয়েরা একযোগে বলে উঠল,
“মাশাআল্লাহ! মাশাআল্লাহ। একদম রাজরানী লাগছে ভাবিকে!”
আরোহীর বুকের ধুকপুকানি কমছে না কিছুতেই। সে মনে মনে শুধু একটাই প্রার্থনা করছিল—নিচে নামার পর যেন অন্তত ওই পাষাণ, লাগামহীন মানুষটার মুখোমুখি হতে না হয়!
.
সিকদার ভিলার বিশাল ড্রয়ইং রুমটায় ঠিক যেন রাজদরবার বসেছে আজ। মাঝখানের বড়সড় দামি সোফাটায় আরোহীকে বসানো হয়েছে। তাকে ঘিরে গোল হয়ে বসে আছেন পরিবারের কাছের মানুষজন—আনভীরের খালামণি, ফুফু, চাচিরা সহ দূর-দূরান্ত থেকে আসা গণ্যমান্য আত্মীয়রা।
সবুজ শাড়ির, সোনার অলঙ্কারের দ্যুতিতে আরোহীকে আজ সত্যি সত্যিই এক জীবন্ত পুতুলের মতো লাগছে। লম্বা ঘোমটার আড়াল থেকে ওর ফর্সা, নিষ্পাপ মুখখানি দেখে আগত নারীদের মধ্যে প্রশংসার গুঞ্জন রটে গেল মুখে মুখে। আনভীরের বড় খালামণি ওর চিবুকটা আলতো করে ছুঁয়ে বললেন,
"মাশাআল্লাহ! আঞ্জুমান, তোর ছেলের কপাল বটে রে। একদম যেন দুধে-আলতা পুতুল একটা!”
যেহেতু অফিশিয়ালি কোনো অনুষ্ঠান করা হয়নি নিয়মমাফিক বড় কোনো অলঙ্কার না দিলেও নতুন বউকে দেখে খুশি হয়ে প্রত্যেকেই মুখ দেখার সালামি দিতে লাগলেন। আরোহী বড্ড লজ্জা আর অস্বস্তিতে পড়ে হাত গুটিয়ে রাখল। নিতে না চাইলেও জোড় করে মেয়েটার হাতে গুঁজে দিচ্ছেন প্রত্যেকে।
তাদের সবার মাঝখানে এসে বসেছেন মনোয়ারা খাতুন। তিনি নাতবউকে দেখে সন্তুষ্ট। যাক!নাতি তার একটা কাজের কাজ করেছে। তবে দেখতে সুন্দর হলেও তার মতে শরীরটা বড্ড দুর্বল প্রকৃতির মেয়েটার। ভালো করে কয়দিন খেলেই মোটাতাজা হয়ে যাবে। না হলেও তিনি করে নিবেন।
ওদিকে বেলা তখন প্রায় বারোটার ঘরে। দোতলার এক কোণের অন্ধকার ঘরটায় এতক্ষণ নিস্পন্দ হয়ে শুয়ে ছিল আনভীর। গতকালের ওই পাগলাটে বৃষ্টিতে ভেজার খেসারত দিতে হচ্ছে এখন। ছোটবেলা থেকেই আনভীরের শরীরটায় বৃষ্টির পানি সয়না। বছর তিনেক থাকতে একবার বৃষ্টি তে ভিজেছিলো সে। সেদিন রাতে গা কাঁপিয়ে জ্বর বেঁধেছিলো। সেই জ্বর মৃত্যুর দাঁড় প্রান্ত থেকে ঘুরিয়ে এনেছে তাকে। আহা সেকি মর্মান্তিক সময় কেটেছিল তখন সিকদার বাড়ি জুড়ে! এরপর আবার আনভীর যখন স্কুলে পড়তো সেবারও একবার ভিজেছিলো।ফলস্বরূপ একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়েছিল সেবারেও। ডাক্তার কড়া গলায় বলেছে আনভীরকে বৃষ্টি পানি না ছোঁয়াতে। তারপর থেকে আর কখনো বৃষ্টিতে ভিজেনি আনভীর।
আজও তার ব্যতিক্রম হলো না। রাত থেকেই আনভীরের গায়ে প্রচণ্ড জ্বর। গা পুড়ে যাওয়ার মতো অবস্থা। চোখ দুটো রক্তজবার মতো লাল টকটকে হয়ে আছে। সারা শরীর ম্যাজম্যাজ করছে ব্যথায়। নিচে আত্মীয়-স্বজনদের অবিরত হইচই আর চিল্লাচিল্লির শব্দে ওর কাঁচা ঘুমটা ভেঙে গেল। কপালে হাত দিয়ে তপ্ত উত্তাপ টের পেয়ে একটা বিরক্তিসূচক শব্দ করল।
পরনে একটা কালো ট্রাউজার আর ধূসর রঙের টি-শার্ট। চুলগুলো এলোমেলো হয়ে পরে আছে কপালের উপর। সেই অবস্থাতেই ধীর পায়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে করিডোরের রেলিংয়ের কাছে এসে দাঁড়াল। ওপর থেকে নিচের ড্রয়িংরুমটা স্পষ্ট দেখা যায়।নিচে এত মানুষের জটলা দেখে আনভীর কপাল কুঁচকে ঝাপসা, লালচে চোখ দুটো মেলে তাকাল নিচে। আর পরমুহূর্তেই তীব্র অনূভূতির কম্পন বয়ে গেল তার শরীরজুড়ে।
ড্রয়িংরুমের ঠিক মাঝখানে সবার কেন্দ্রবিন্দুতে বসে আছে এক সবুজরঙা অপ্সরী। বটল গ্রিন রঙা শাড়ির আড়ালে রমণীর ওই দুধে-আলতা গায়ের রঙটা আগুনের মতো জ্বলজ্বল করছে। মাথায় সিকদার বাড়ির বউদের মতো ঘোমটা টানা। এতগুলো চেনা-অচেনা মানুষের ভিড়ে উক্ত রমণীকে দেখতেই হৃদস্পন্দন পাগলা ঘোড়ার মতো ছুটল তার। মনে হলো—কেউ বুঝি মায়াবী একটা পুতুল বউ এনে বসিয়ে রেখেছে মাঝখানে।
আনভীর শুষ্ক গলায় ঢোক গিলল। হুট করেই ওর ভেতরের তৃষ্ণাটা দ্বিগুণ বেড়ে গেল যেন। উত্তপ্ত গলাটা বুঝি শুকিয়ে কাঠ হয়ে এলো তার। বুকের ভেতর জ্বরের উত্তাপের চেয়েও এক তীব্র ব্যাকুলতার আগুন ছড়িয়ে পড়ল শরীরজুড়ে। সেই টালমাটাল উত্তাপ সামলাতে ঘনঘন নিশ্বাস ফেলতে লাগল।সেদিক থেকে চোখ সরাতে পারছেই না। নিজের ভেতরের এই অবাধ্য ঘোর সামলাতে জোরে একটা শ্বাস টানল এবারে। তারপর ওখান থেকেই চড়া গলায় নিচের দিকে তাকিয়ে ওর বোনকে উদ্দেশ্য করে ডাকল,
“তিশা! তিশা শুনছিস?”
ভাইয়ের গলার আওয়াজ পেয়ে তড়িঘড়ি উপরে চাইল তিশা।উত্তর দিলো-
“কী ভাইয়া?"
আনভীর আরোহীর দিকে চেয়েই শুষ্ক কণ্ঠে বলল,
“মাথা ব্যথা করছে ভীষণ। এক কাপ কড়া করে ব্ল্যাক কফি বানিয়ে আমার রুমে নিয়ে আয় জলদি।”
কথাটা বলেই আনভীর প্রস্থান করল। হনহন করে পা বাড়াল নিজ কক্ষের উদ্দেশ্য।
চলবে....