#নয়নিকা -০৭
#তিশা
ক্যাটাগরি- রাজনৈতিক
জনরা- রোমান্টিক ,থ্রিলার
প্রেগন্যান্সি কিট হাতে নিয়ে বসে আছে নয়নিকা।স্পষ্ট দুটো লাল দাগ ভেসে আছে তাতে।সাধারণত অন্য কোন মেয়ে হলে এতক্ষণে খুশিতে আত্মহারা হওয়ার কথা কিন্তু নয়নিকা নির্লিপ্ত ,চোখমুখ অনুভূতিশূন্য। আসলে নয়নিকা নিজেও বুঝতে পারছে না তার অনুভূতি কি হওয়া উচিত।তার বিধ্বস্ত জীবনে আরেকজনকে এনে সেই নিষ্পাপ জীবনটাকে কষ্ট দেয়ার কি মানে।
*******
নিশাদ এবং অনিকেত দুবাইয়ের এক বিলাশবহুল হোটেলে মুখোমুখি বসে আছে।দুজনেরই মুখ থমথমে। নীরাবতা ভেঙ্গে অনিকেত প্রথম কথা বলল,
- এত সুক্ষ্ম প্লান তো এভাবে ফ্লপ হওয়ার কথা নই।
- আমিও সেটাই ভাবছি। কাস্টমস থেকে শুরু করে সমস্ত প্রোটোকল আমি গুছিয়ে নিয়েছিলাম তাহলে শেষ মুহূর্তে নির্বাণ কিভাবে পুরো জাহাজটাই আটকে দিলো?
- এই নির্বাণকে আর বেশিদিন বাঁচিয়ে রাখা যাবে না। খুব শীঘ্রই আমি বাংলাদেশে যাবো।নাহলে আমার একটার পর একটা বিজনেস এভাবে ধ্বংসের পথে আগাবে।
- যেটা করতে হবে খুব সাবধানে ভূলে গেলে চলবে না নির্বাণের কাছে এখন রাজনৈতিক ক্ষমতাও আছে।
দুজনে তারপর পরবর্তী পদক্ষেপের জন্য বিশদ আলোচনায় বসলো।
********
এয়ারপোর্টে বসে আছে নির্বাণ আর সীফাত।সীফাতের মুখে বিষাদের ছায়া।নির্বাণ ওকে ভালোভাবে দেখে বলল,
- এভাবে মুখ লটকিয়ে আছিস কেন?
- ভাই পিকনিকে আনবা বলে সত্যি সত্যি পিকনিকের মত একবেলা ঘুরিয়ে বাড়ি নিয়ে যাচ্ছো?আর দুটো দিন থাকলে কি এমন ক্ষতি হতো।
- বেশ তো তুই থাক আমি চলে যাচ্ছি তোর আর বাংলাদেশে যাওয়ার দরকার নেই।
সীফাত আর কিছু না বলে গাল ফুলিয়ে বসে থাকলো।
*******
নয়নিকা সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাচ্চাটা সে রাখবে।অনিকেতকে বলবে যদি অনিকেত বাচ্চাটা রাখতে রাজি হয় তবে ভালো নাহলে সে পালিয়ে যাবে। জীবনটা তো তার এমনিতেই সমুদ্রের পাড়ে বানানো বালির প্রাসাদের মত।কোন নিশ্চয়তা নেই এবার না হয় সন্তানের জন্য একটু ঝুঁকি নেবে।
বিকালে হাঁটতে বেরিয়েছে নয়নিকা। এলোমেলো চিন্তার মাঝে কখন যে রাস্তার মাঝে চলে এসেছে বুঝতে পারেনি হঠাৎ করে একটা গাড়ির আওয়াজ পেতেই ঘাবড়ে পিছনে তাকিয়ে দেখে দ্রুতগামী একটি ভ্যান তার দিকে এগিয়ে আসছে।মুহূর্তেই নয়নিকার মনে হলো তার মস্তিষ্ক নিশ্চল হয়ে গেছে পা দুইটা চলছে না।নয়নিকা যখন চোখ বন্ধ করে মারাত্মক ব্যথা পাওয়ার অপেক্ষায় ঠিক তখনই বলিষ্ঠ দুইটা হাত ওকে টেনে রাস্তার পাশের ফুটপাতে নিয়ে গেলো।
- এত অসাবধান হলে হয় এক্ষুনি তো চাপা পড়তেন।
নয়নিকা তাকিয়ে দেখলো ইশান নামের লোকটা তাকে ধরে ভীতু চোখে তাকিয়ে আছে।নয়নিকা একটা বোকা হাসি দিয়ে বলল,
- ধন্যবাদ। আমি আসলে খেয়াল করিনি।
- ধন্যবাদ দিতে হবে না তবে নেক্সট টাইম সাবধানে চলাফেরা করবেন।(নাহলে কেউ একজন আমাকেই গায়েব করে দেবে আপনার কিছু হলে)
শেষের কথাটুকু ইশান খুবই আস্তে বলল।নয়নিকা বুঝতে না পেরে একটু কনফিউজড হয়ে জিজ্ঞেস করল,
- কি বললেন?
- কিছু না। আপনাকে অসুস্থ লাগছে চলুন বাসা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসি।
- না না আমি একাই যেতে পারবো।
- আরে চলুন যার ভয় পাচ্ছেন সে তো অস্ট্রেলিয়ায় নেই এখন।
নয়নিকা একটু অবাক হয়েই জিজ্ঞেস করল,
- আপনি কিভাবে জানেন?
- বিখ্যাত লোকজনের খবর বাতাসে ঘুরে বেড়ায় বুঝলেন। চলুন আপনাকে পৌছে দিয়ে আসি।
নয়নিকা আর না করলো না। আসলেই তার শরীরটা খারাপ লাগছে।
*********
- ওদিকের কি অবস্থা সীফাত?
- ভাই নিশাদের টেক্সটাইল এলিমেন্টের সাথে অনিকেতের আর্মসও আটক করেছে নৌবাহিনী।
নির্বাণ একটা তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলল,
- বেচারা নিশাদের সাথে হাত মিলিয়েও লাভ হলো না।
- কিন্তু ভাই আমার তো তালুকদারকে নিয়ে চিন্তা হচ্ছে।শয়তানটা চুপ করে আছে মানে মনের মধ্যে বিশাল কিছু পাকাচ্ছে!
- আমিও তো তাই চাই।
নির্বাণের ফোন বেজে উঠায় আলোচনার ছন্দপতন হলো।ফোন রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে,
- ভাই উনি মনে হয় অসুস্থ আজ তো আর একটু হলে এক্সিডেন্ট করতো।
- মুখ বুঝে অতো মা/র খেলে তো মানুষ অসুস্থ হবেই তুই চোখে চোখে রাখ আশা করছি একমাসের মধ্যেই একটা ব্যবস্থা হবে।
- জ্বি ভাই।
ইশান ফোন রাখতেই নির্বাণ বলল,
- খুব শীঘ্রই জাল গোটাতে হবে সীফাত। তুই দ্রুত আশরাফ আর ওর বউকে খুঁজে বের কর।
*********
নয়নিকা ইদানিং নিজেকে সুখী সুখী অনুভব করে।গর্ভে বেড়ে ওঠা দেড় মাসের ছোট্ট জানটা তার মনের মধ্যে আলাদা প্রশান্তি এনে দেয়।অবসরে পেটে হাত দিয়ে অনাগত সন্তানের সাথে টুকরো টুকরো গল্প করে।নয়নিকা ভেবে নিয়েছে এই সন্তানের জন্য সে লড়বে।নিজের সর্বোচ্চ দিয়ে চেষ্টা করে যাবে।
**********
তালুকদার কয়েকদিন ধরে খুব বিক্ষিপ্ত মেজাজে আছে এজন্য নাহিদও খুব সাবধানে থাকছে। বলা যায় না বস কখন তার কপালেই গু/লি ঠুকে দেয়।এই নির্বাণ শাহরিয়ার জ্বা/লি/য়ে খেলো তো।ওই ব্যাটার জন্য তালুকদার অশান্তিতে আছে আর তালুকদার অশান্তিতে থাকা মানে নাহিদও অশান্তিতে থাকা।হঠাৎ তালুকদারের মুঠোফোনের শব্দে ভাবনার দেশ থেকে ফিরে এলো নাহিদ।
- স্যার মির্জা ভাই ফোন দিছে।
নামটা শুনেই তালুকদারের চেহারাটা চকচক করে উঠলো।
- কবে আসবা তুমি? যত তাড়াতাড়ি পারো চলে আসো।
ওপাশ থেকে কি বলল বুঝা গেলো না সঠিক তবে তালুকদারকে বলতে শোনা গেলো,
- ওই নির্বাণকে আমি খন্দকারের চেয়েও ভয়ানক মৃ/ত্যু দেব।
***********
নয়নিকা ক্যাফে থেকে বের হয়ে ভাবলো গ্রোসারি শপিং করা দরকার তাই সে পাশের এক সুপার সপে ঢুকলো।ফ্রুটস সেকশনে ইশিতার মুখোমুখি হলো নয়নিকা।নয়নিকাকে দেখে ইশিতা একটা ক্রুর হাসি দিয়ে বলল,
- আরে দ্যা গ্রেট অনিকেত মির্জার বউ যে! তা তোমার বাড়িতে সার্ভেন্ট নাই যে নিজেকেই বাজার করতে হচ্ছে?
নয়নিকা একটু হেসে বলল,
- বউ তো এজন্য সংসারের সব কাজ নিজের হাতেই করতে হয়।এসকর্ট হলে মে বি সার্ভেন্ট থাকতো।
ইশিতা রেগে কিছু বলতে যাবে এমন সময় ইশান উপস্থিত হয় সেখানে। ইশানকে দেখে ইশিতা দমে যায় একটু। ইশানের সামনে উল্টাপাল্টা কিছু বললে দেখা গেলো ইশান মানুষজনের সামনে তার হাঁড়ির খবর বের করে দিছে। নয়নিকাকে শাসানোর নজরে একবার দেখে নিয়ে গটগট করে চলে যায়।
- আপনি এই মহিলাকে চেনেন?
ইশানের প্রশ্ন শুনে নয়নিকা একটা তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলে,
- হ্যা সাক্ষাৎ হয়েছিল দুই তিনিবার।
- আপনার স্বামীকে কিন্তু ওই মহিলার সাথে বেশ কয়েকটা পার্টিতে বেশ অন্তরঙ্গ অবস্থায় দেখা গেছে।
নয়নিকা একটা দীর্ঘনিশ্বাস নিয়ে বলল ,
- হবে হয়তো।আসছি।
বলে নয়নিকা ক্যাশ কাউন্টারের দিকে চলে গেলো।
*********
সুপার সপ থেকে বেরিয়ে ইশিতা অনিকেতকে ফোন করে ,
- তোমার বউ আমাকে অপমান করেছে?
- তো আমি করব?
- তুমি কি করবে মানে সে আমাকে তোমার এসকর্ট বলেছে।
- ভুল কি বলেছে? শোনো নয়নিকার সাথে রাস্তাঘাটে দেখা হলে কোন কথা বলবে না যেচে ঝগড়া তো অবশ্যই করতে যাবে না?
- আমি ঝগড়া করি?
- অবশ্যই তুমি করো নয়নিকা রাস্তায় দাঁড়িয়ে ঝগড়া করার মতো মেয়ে নই। আমি সিউর তুমিই আগে ওকে পোক করেছো।
- বউয়ের প্রতি এত দরদ তাহলে এসকর্টের কাছে আসো কেন?
- কমদামি সস্তা মাল দেখলে সবারই টুকটাক লোভ হয়।
- তুমি আমাকে এভাবে বলতে পারো না অনিকেত।
- আমি আরো অনেক কিছুই বলতে পারি।শোনো নেক্সট টাইম রাস্তাঘাটে নয়নিকার সাথে ঝামেলা করবা না তোমার মান সম্মান না থাকতে পারে কিন্তু অনিকেত মির্জার বউয়ের একটা সম্মান আছে।
- তোমার বউ যে এখন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ইশানের সাথে গল্প করছে এটাতে সম্মানহানি হচ্ছে না।
- না হচ্ছে না দাঁড়িয়ে গল্প করছে তোমার মত খাটে শুয়ে তো পড়ছে না। আমাকে আর ফোন করবে না।
কথাটা বলেই অনিকেত ফোন কেটে দিলো। ইশিতা আগুন চোখে কাউন্টারে দাঁড়িয়ে থাকা নয়নিকার দিকে তাকিয়ে এর শোধ কিভাবে নেবে সেটাই ভাবছিলো এমন সময় কাধে কেউ টোকা দিলো।
- ভুলেও ওদিকে তোমার শকুন নজরে তাকাবে না।
ইশানের কথায় ইশিতা ভ্রু কুচকে বলল,
- তোমার এত জ্বলছে কেন?
- সেটা তোমাকে বলার প্রয়োজন বোধ করছি না।শুধু সাবধান করছি ওদিকে নজর দিও না পরে দেখবা চোখ দুটোই নাই হয়ে গেছে।
কথাটা বলে ইশান শিষ বাজাতে বাজাতে চলে গেলো। ইশিতা ক্রোধে রাস্তার পাশের পাথরে লাথি মেরে বলল,
- এই নয়নিকার মধ্যে কি আছে যে সবাই ওর আশেপাশে মাছির মত ভনভন করে।
..............চলমান...............
বিঃদ্রঃ অনুমতি ব্যতীত কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।