#নয়নিকা -০৯
#তিশা
ক্যাটাগরি- রাজনৈতিক
জনরা- রোমান্টিক ,থ্রিলার
নয়নিকাকে হাসপাতাল থেকে গতকাল ডিসচার্জ দেয়া হয়েছে।তিনদিন সে হাসপাতালে ছিল এই তিনদিনে একবার শুধু নার্সকে জিজ্ঞেস করেছিলো বাচ্চাটা আছে কি? উত্তরটা শোনার পরে আর একটা কথাও বলেনি। এই তিনদিন অনিকেত হাসপাতালেই ছিল কয়েকবার নয়নিকার সাথে কথাও বলার চেষ্টা করেছে কিন্তু নয়নিকার দিক থেকে কোনরকম সাড়াশব্দ না পেয়ে চুপ করে গেছে।
গতকাল নয়নিকাকে বাসায় নিয়ে আসার পরে অনিকেত একবার বের হয়েছিলো নয়নিকা ভেবেছিলো অনিকেত আর ফিরবে না কিন্তু অনিকেত রাতে ফিরে এলো। নয়নিকার সাথে এখনো পর্যন্ত কোন রূঢ় আচরণ সে করেনি।
************
- ভাই আশরাফ আর তার বউ ভারতে আছে এখন।
নির্বাণ একটা বাঁকা হাসি দিলো। মনে মনে ভাবলো সবগুলোকে এবার একসাথে জালে আটকাবে সে। অনেক তো হলো কানামাছি খেলা।
- জানিস তো এবার কি করতে হবে?
- জ্বি ভাই।
কথাটা বলে সীফাত চলে গেলো। এমন সময় নির্বাণের কাছে ইশানের ফোন আসলো রিসিভ করতেই ইশান বলল,
- ভাই নয়নিকা গত এক সপ্তাহ বাইরে বের হয়নি।
- জানি আমি সে ডিপ্রেশনে ভুগছে।
- এভাবে আর কতদিন ভাই?
- আর কয়েকটাদিন সময় ফুরিয়ে এসেছে।
***********
হাসপাতাল থেকে ফেরার তিনদিন পর থেকেই অনিকেত তার আগের জীবনে ফিরে গেছে। আর নয়নিকা সে এখন শান্ত ঠিক যেন আটলান্টিকের বুকে একখন্ড আইসবার্গ। নয়নিকা সারাদিন জানালার পাশের চেয়ারে বসে থাকে বাইরে যায় না কারো সাথে কথা বলে না। কেউ দরজায় নক করলেও দরজা খোলে না।সারাদিন হয় জানালার কাছে বসে থাকে নতুবা বিছানায় শুয়ে থাকে। অনিকেত কথা বললেও সে বলে না। বেশ কিছুক্ষণ কলিংবেলের শব্দেও যখন নয়নিকা দরজা খুলে নি তখন অনিকেত নিজের কাছে থাকা চাবি দিয়ে দরজা খুলে ভেতরে ঢোকে হাতে তার খাবারের প্যাকেট। নয়নিকা রান্না করবে না সে জানতো। নয়নিকাকে শুয়ে থাকতে দেখে অনিকেত ওর কাছে যেয়ে ওকে টেনে কোলে বসিয়ে বলল,
- মন খারাপ করো না আর তুমি সুস্থ হলে আমরা আবার বেবী নিবো।
অনিকেতের কথায় নয়নিকা তার মুখের দিকে তাকালো তারপর ভাবলো লোকটার মধ্যে নিজের সন্তানের প্রতিও কোন অনুভূতি নেই কোন অনুশোচনা নেই।ভাবনার মাঝে অনিকেত বলল,
- পরশু একটা পার্টি আছে পার্টিটা হবে শীপেএকদম সমুদ্রের মাঝে ওখানে গেলো তোমার ভালো লাগবে। এখনো বসো খাবার নিয়ে এসেছি খাবে।
অনিকেত নয়নিকাকে উঠিয়ে সোফায় বসিয়ে বলল,
- তুমি বসো আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি।
অনিকেত ওয়াসরুমে যেতেই নয়নিকা নিজের মনে আওড়ালো 'সমুদ্রের মাঝে'।
**********
- ভাই পরশু মাঝ সমুদ্রে একটা পার্টি আছে অনিকেত খুব সম্ভবত নয়নিকাকে নিয়ে যাবে সেখানে।
ইশানের কথায় নির্বাণের ললাটের চিন্তার ছাপ দেখা গেলো। তারপর কিছু একটা ভেবে বলল,
- তুই সেদিন ছায়ার মত লেগে থাকবি নয়নিকার সাথে। এক মুহূর্তের জন্যও ওকে চোখের আড়াল করবি না শুধু সেটাই নয় স্পেশাল গার্ড রাখবি চারপাশে এবং জাহাজের ক্যাপ্টেন থেকে শুরু করে সেফ পর্যন্ত সবাই যেন আমার লোক হয় সেই ব্যবস্থা করবি।
- ওকে ভাই।
নির্বাণ যেন কিছুতেই শান্ত থাকতে পারছে না ওর বারবার মনে হচ্ছে ওইদিন কিছু একটা হবে আর সেটা যে সুখকর নই সেটাও ভালো বুঝতে পারছে।
***********
আজ নয়নিকা খুব সুন্দর করে সেজেছে। ডার্ক সার্কেল আর বিষাদের বলিরেখাগুলো প্রসাধনীর আস্তরণে ঢেকে নিয়েছে।অনিকেত নয়নিকাকে এভাবে দেখে বেশ খুশিই হলো যাক বউটা তার ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে। বেশ অনেকদিন পরে অনিকেত আর নয়নিকাকে দেখে সবাই বেশ উৎসুক।চারপাশে বেশ রঙিন সাজসজ্জা আলোয় ঝলমল করছে সব কিছু।চারদিকের হাসোজ্জল মুখগুলো দেখে নয়নিকার মনে হচ্ছে এরা সবাই মুখোশের আড়ালে থাকা এক একটা হায়েনা।প্রত্যেকের হাসির পিছনের ভয়ংকর চরিত্রটা মনে হচ্ছে তার সামনে ভেসে বেড়াচ্ছে।নয়নিকার মনে হলো এই চকচকে আলো এই চারিদিকের নকল হাসির মানুষগুলো তাকে অক্টোপাসের মত চারদিক থেকে পেচিয়ে ধরছে।এসমস্ত ভাবনার মাঝেই ইশিতা এলো তার সামনে ,
- শুনলাম তুমি হাসপাতালে ছিলে এখন কেমন আছো?
- ভালো আছি।
নয়নিকার হাস্যোজ্জ্বল উত্তরে ইশিতা একটু ভড়কালো যেন তারপরও হাসি হাসি মুখে ফের জিজ্ঞেস করল,
- এই যে তুমি জানো তোমার স্বামীর অন্য মেয়ের সাথে সম্পর্ক আছে এটা জানার পরেও সেই স্বামীর সাথে এক বিছানায় ঘুমাতে একসাথে সংসার করতে তোমার খারাপ লাগে না।
ইশিতার কথায় নয়নিকা একটা শুকনো হাসি দিলো তারপর ইশিতার হাতটা নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে হাসি হাসি মুখে বলল,
- আমি জানি তুমি এই কথাগুলো কেন বলছো তুমি চাও তোমার কথা শুনে আমি যেন রেগে অনিকেতকে ছেড়ে দেয় তাই তো? শোনো তুমি যদি অনিকেতকে কনভেন্স করতে পারো আমাকে ছেড়ে দিয়ে তোমাকে বিয়ে করার জন্য বিশ্বাস করো আমি কোনরকম বাধা দেবো না।
তারপর নয়নিকা তার হাতের মুঠোয় থাকা ইশিতার হাত ময়লা ঝাড়ার মত ছুড়ে দিয়ে বলল,
- যাও অনিকেতকে নিজের করে নাও আমার পক্ষ থেকে শুভ কামনা তোমার জন্য।
ইশিতা অবাক হয়ে চাইলো কিছুক্ষণ নয়নিকার দিকে তারপর কিছু না বলেই উঠে চলে গেলো। নয়নিকা তার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে মনে মনে হাসলো আর ভাবলো কত মেয়েই তার জায়গাটা নিতে চাই। মানুষের গল্পগুলো যদি আয়নায় দেখানো যেতো তাহলে সে তার জীবনের গল্পটা ওই মেয়েগুলোকে দেখিয়ে বলত,
'মে আবাদ হো কে ভি বরবাদ হু'।
*************
সাফায়েত তালুকদার খুব বিক্ষিপ্ত মেজাজে বসে আছে। কিছুতেই হিসাব মেলাতে পারছে না।একই দিনে নির্বাণের গাড়িতে বোমা আবার তার ক্যামিকেল ফ্যাক্টরিতে আগুন। কে এই অচেনা শত্রু যে নির্বাণ এবং তাকে দুজনকেই আ/ক্র/ম/ণ করছে? নাকি সে আ/ক্র/ম/ণ করেছে ভেবে নির্বাণই তার ফ্যাক্টরিতে আগুন লাগিয়েছে? এই সমস্ত চিন্তায় তার মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে।একে নির্বাচনের পরাজয় তার উপরে ফ্যাক্টরির আগুনে তার কয়েকশত কোটি টাকার লস সব মিলিয়ে অশান্তির চরম পর্যায়ে আছে সে।
***********
নয়নিকা জাহাজের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে।তার সামনে অনন্ত অসীম মহাসাগর আর হৃদয়ে মহাবিশ্বের শূণ্যতা।তার জীবনের প্রাপ্তির খাতা সব সময় শূণ্যই ছিল একটা সময় আশা আকাঙ্ক্ষা সবকিছুর দরজা সে বন্ধই করে দিয়েছিলো। প্রথমবার স্বপ্ন দেখেছিলো যখন অনিকেতের সাথে বিয়ে হয়েছিল কিন্তু সেই স্বপ্ন তার জীবনের সবচেয়ে বড় দুঃস্বপ্ন হয়ে ধরা দিয়েছিলো। তারপর তো জীবনের উপর থেকে সব রকম ভরসায় সে ছেড়ে দিয়েছিলো। নিজেকে বানিয়েছিলো যন্ত্র মানব। তারপর দুদিনের অতিথি হয়ে সন্তান এলো গর্ভে নয়নিকা ভেবেছিলো ভবিতব্য মেনে নিয়ে সন্তানকে আকড়ে ধরে একটু বাঁচবে সেটাও প্রকৃতির সহ্য হলো না। তাকে নিঃস্ব করে দিয়ে চলে গেলো।আকাশের দিকে তাকিয়ে নয়নিকা প্রথমবারের মত স্রষ্টার কাছে নীরব অভিযোগ জানালো।তার জীবনের খাতাতে যদি সুখ নামক সৌভাগ্য টা নাই লিখে থাকে তাহলে কেন বারবার তাকে সুখের আশা দেখানো হয়! নয়নিকা তার সমুদ্রের মত গভীর আখি মেলে সামনের শূণ্যতায় দৃষ্টি মেলে অনুভব করলো তার সন্তান তাকে ডাকছে। তার সন্তান মা মা বলে আহাজারি করছে।নয়নিকা একটা উচ্ছল হাসি দিয়ে ফিসফিস করে আওড়ালো ,
- 'আমি আসছি সোনা'
তারপর চারপাশে চেয়ে দেখলো জাহাজের এই পাশটা পুরো ফাকা সুনশান নীরবতা বিরাজ করছে। দ্বিতীয়বার আর ভাবলো না সে রেলিং এর উপরে উঠে নিজেকে বিলীন করে দিলো প্রশান্ত মহাসাগরের ওই অতল গহ্বরে।
........চলমান.........
বিঃদ্রঃ অনুমতি ব্যতীত কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।