ফন্ট সাইজ:
থিম:
রাজনীতির রক্তচুক্তি

১৮তম পর্ব

লেখক: নীলপ্রজাপতি

দরজাটা ধীরে খুলে গেল। প্রিয়ান্তির বুকটা কেঁপে

উঠলো। সে অনিচ্ছা সত্ত্বেও মুখ তুলে তাকালো।

সারফরাজ ভেতরে ঢুকল। ইতিমধ্যেই শেরওয়ানি বদলে

সে সাদা রঙের আরামদায়ক শার্ট আর ধূসর আর

ট্রাউজার পড়েছে।

অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক ভারী ভাবটা নেই।

দরজা বন্ধ করে সে ধীরে প্রিয়ান্তির দিকে এগিয়ে এলো।

প্রিয়ান্তি বিছানার একপাশে শক্ত হয়ে বসে আছে।

সারফরাজ কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে খুব স্বাভাবিক গলায় বলল,

“এভাবে বসে আছো কেন? চেঞ্জ করে নাও।”

প্রিয়ান্তি মাথা তুলল। তার চোখে স্পষ্ট অস্বস্তি।

কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

“চেঞ্জ করে কী পরবো আমি?”

সারফরাজ ভ্রু কুঁচকে তাকালো।

“কেন? তোমার লাগেজ কেউ দিয়ে যায়নি?”

প্রিয়ান্তি ধীরে মাথা নাড়িয়ে না বোঝালো।

সারফরাজ কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল। তারপর বিরক্ত মুখে নিঃশ্বাস ফেলে বললো,

“কি জ্বালা! এখন কোথায় খুঁজবো তোমার লাগেজ।”

প্রিয়ান্তির নিজেরও অস্বস্তি লাগছে।

সারফরাজ কিছুক্ষণ ভাবল। তারপর আলমারির দিকে

এগিয়ে গেল। আলমারি খুলে ভেতর থেকে কিছু খুঁজল।

কয়েক সেকেন্ড পর একটা সাদা শার্ট আর একটা লুজ

ট্রাউজার বের করল।

ফিরে এসে বিছানার পাশে রেখে বলল,

“এটা পরে নাও আপাতত।”

প্রিয়ান্তি তাকালো। তার চোখে স্পষ্ট অনীহা। সে জামাগুলোর দিকে তাকিয়েই রইল। তবে হাত বাড়ালো না।

সারফরাজ সেটা বুঝে ঠোঁট চেপে হাসল।

“কী?”

প্রিয়ান্তি চুপ। তবু মুখের ভাব বলে দিচ্ছে ওগুলো সে পরতে চাইছে না।

সারফরাজ এবার দুহাত পকেটে ঢুকিয়ে দাঁড়িয়ে বলল,

“দামি জামাকাপড় সবগুলো, ভয় নেই‌ সবই আমার।”

প্রিয়ান্তি চোখ সরু করে তাকালো। তার গাল হালকা লাল। অস্বস্তি আর বিরক্তি মিশে গেছে।

সারফরাজ সেটা দেখে মৃদু হাসল।

“এইসব নতুন। কেউ পরেনি।”

তারপর মাথা কাত করে বলল,

“নাকি ভারী লেহেঙ্গা আর গয়না পরে সারারাত বসে থাকবে?”

প্রিয়ান্তি ঠোঁট কামড়ে ধরল। কয়েক সেকেন্ড পর ধীরে জামাগুলো হাতে নিল।

সারফরাজ এবার একটু সরে দাঁড়িয়ে ওয়াসরুমের দিকে ইশারা করল।

“ওখানে যাও।”

প্রিয়ান্তি ধীরে ধীরে ওয়াসরুমের দিকে চলে গেল।

প্রায় আধঘণ্টা পর ওয়াশরুমের দরজা খুলে প্রিয়ান্তি

আস্তে বাইরে বেরিয়ে এলো। ঘরের ভেতর নরম আলো।

টিভি চলছে।

একটা খবরের চ্যানেলে রাতের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ দেখাচ্ছে।

আর বিছানার ওপর সারফরাজ লম্বা হয়ে শুয়ে আছে।

দু পায়ের মাঝে কোলবালিশ জড়িয়ে ধরা।

এক হাতে রিমোট ধরা। মুখে একদম গম্ভীর ভাব নিয়ে খবর দেখছে।

পরিবেশ টা দেখলে কারোর মনে হবে এটা বাসর রাত না, সংসদ অধিবেশন চলছে।

প্রিয়ান্তি বেরোতেই তার চোখ স্ক্রিন থেকে সরে এসে প্রিয়ান্তির দিকে থামল।

এক সেকেন্ড, দুই সেকেন্ড।

তারপর সে পুরোপুরি চুপ হয়ে গেল।

কারণ সাদা শার্টটা প্রিয়ান্তির গায়ে প্রায় হাঁটু পর্যন্ত নেমে এসেছে। হাতাগুলো অনেক বড়, তাই গুটিয়ে রেখেছে। ট্রাউজার টাও কয়েক ভাঁজ তুলে পরেছে।

মুখের সব মেকাপ ধুয়ে গেছে। চুলগুলো খোলা।

গয়না বেশিরভাগ খুলে রেখেছে।

এখন ওকে দেখতে ছোট আর সরল লাগছে। একদম বাচ্চার মতো।

সারফরাজের ঠোঁট কেঁপে উঠল। স্পষ্টই হাসি পাচ্ছে।

সে ঠোঁট চেপে রাখল কিন্তু চোখের কোণে মজা ফুটে উঠল।

প্রিয়ান্তি সেটা সঙ্গে সঙ্গে বুঝে ফেলল। ভ্রু কুঁচকে বলল,

“হাসছেন কেন?”

সারফরাজ এবার আর নিজেকে সামলাতে পারল না।

সে সত্যি হেসে ফেলল।

“সিরিয়াসলি, আমি একটা বাচ্চাকে বিয়ে করেছি নাকি?”

প্রিয়ান্তির চোখ গোল হয়ে গেল। সে সঙ্গে সঙ্গে কয়েক

পা এগিয়ে এলো। গাল লাল হয়ে উঠেছে।

“একদম হাসবেন না।”

জেদি গলায় বলল।

“একদম না।”

সারফরাজ আবার হেসে ফেলল। ইচ্ছা করে জোরে শব্দ করেই।

তারপর বিছানার ধারে বসে থাকা অবস্থাতেই হঠাৎ হাত

বাড়িয়ে প্রিয়ান্তির কব্জি ধরে টান দিল।

সবকিছু এত দ্রুত হলো যে প্রিয়ান্তি বুঝে ওঠার আগেই

সে ভারসাম্য হারিয়ে সরাসরি সারফরাজের কাছে এসে

পড়ল। এক হাত দিয়ে সারফরাজ তাকে সামলে নিল।

প্রিয়ান্তির দুহাত অনিচ্ছা সত্ত্বেও গিয়ে ঠেকল তার

কাঁধে। দুজনের দূরত্ব মুহূর্তেই খুব কমে এলো।

প্রিয়ান্তির নিঃশ্বাস থেমে গেল। চোখ বড় বড় হয়ে গেছে।

সারফরাজ নিচু হয়ে তার মুখের দিকে তাকালো।

চোখে সেই চাপা হাসি এখনো। খুব আস্তে বলল,

“কী? এত রাগ কেন?”

প্রিয়ান্তি কোনো উওর না দিয়ে দ্রুত সরে গেল। সে

বিছানার একপাশে গিয়ে বসল। মুখ ঘুরিয়ে রাখলো

যাতে চোখাচোখি না হয়।

সারফরাজ বিছানায় হেলান দিয়ে বসল। তার গলায় মৃদু রসিকতা। বলল,

“আচ্ছা খান বাড়ির সবাই বলছিল আমাদের মেয়েটা খুব ভীতু, খুব শান্ত। ওকে একটু দেখে রাখবেন। কষ্ট দেবেন না।”

প্রিয়ান্তি চুপ। তবু বোঝা যাচ্ছে সে শুনছে।

সারফরাজ এবার ঠোঁটের কোণে হাসি টেনে বলল,

“আর যেদিন দেখতে গিয়েছিলাম, সেদিনও বেশ চুপচাপ ছিলে। কিন্তু এখন তো দেখছি জেদি, রাগী আর তর্কও কম করো না।”

প্রিয়ান্তি সঙ্গে সঙ্গে মুখ ঘুরিয়ে বলল,

“ঘুম পাচ্ছে আমার।”

সারফরাজ বিছানায় হেলান দিয়ে বসে রইল। তারপর ধীরে বলল,

“আজ তো বাসর রাত।”

কথাটা শুনতেই প্রিয়ান্তির বুক ধড়ফড় করে উঠল।

আঙুলগুলো চাদর আরও শক্ত করে চেপে ধরল।

সারফরাজ সেটা স্পষ্টই দেখল। তার ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটল।

“আমি কিন্তু স্বামী হিসেবে খুব খারাপ।”

প্রিয়ান্তি এবার সত্যিই ভয় পেল। তার চোখ বড় হয়ে গেল। সে কিছু বলল না, শুধু স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল।

সারফরাজ কয়েক সেকেন্ড তার সেই ভয় পাওয়া মুখ দেখল। তারপর খুব শান্ত গলায় বলল,

“রিলেক্স। অতটাও খারাপ নই যে প্রথম রাতেই বউয়ের সাথে কিছু করবো।”

প্রিয়ান্তি দ্রুত বলল,

“আমি ভয় পাইনি।”

কথাটা যতই বলুক, গলাটা কাঁপল।

সারফরাজ সঙ্গে সঙ্গে চাদরের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল। বলল,

“এই জন্যই চাদরটা এত শক্ত করে ধরে আছো?”

প্রিয়ান্তি সঙ্গে সঙ্গে হাত ছেড়ে দিল। কিছু বলল না।

তারপর সারফরাজ হাত বাড়িয়ে পাশে থাকা আলোটা বন্ধ করে দিল। ঘরটা আধো অন্ধকারে ডুবে গেল।

সে ধীরে শুয়ে পড়ল। এক হাত মাথার নিচে রাখা।

নিচু গলায় বলল,

“ঘুমাও।”

প্রিয়ান্তি নড়ল না। সারফরাজ চোখ বন্ধ করেই বলল,

“আমি সত্যিই খুব খারাপ। আশা করি আমার বিষয়ে কিছু না কিছু শুনেছো।”

প্রিয়ান্তি ধীরে ধীরে শুয়ে পড়ল। তবে তার চোখ খোলা।

অন্ধকারে ছাদের দিকে তাকিয়ে আছে।

সারফরাজ আবার বলল,

“বেশি ভেবো না।”

তার গলা এবার আগের চেয়ে শান্ত, অদ্ভুত স্থির।

“প্রতিটা রাতের পর যে সকাল আসে সেটা তোমার জন্য নতুন কিছু নিয়ে আসবে।”

তারপর মাথা সামান্য ঘুরিয়ে খুব আস্তে বলল,

“শুভরাত্রি, বউ।”

************

সকালটা খান মহলে অদ্ভুত ব্যস্ততায় শুরু হলো।

বাড়ির স্টাফরা এদিক-ওদিক চলাফেরা করছে।

ডাইনিংয়ে সকালের নাস্তার আয়োজন।

দূরে কারও ফোনে রাজনৈতিক আলোচনা।

আর এইসবের মাঝেই আদ্রিতা আজ খুব সকালেই উঠে তৈরি হয়ে নিয়েছে।

আজ তার কলেজে একটু তাড়াতাড়ি যেতে হবে।

দেবজিত আসবে জরুরি কথা আছে।

অন্যদিকে আবরাজ খানও উঠে গেছে। আজ তারও বেরোনোর প্ল্যান আছে। আদ্রিতা ব্যাগ কাঁধে নিচ্ছিল, তখনই পেছন থেকে আবরাজের গলা,

“এত তাড়াতাড়ি যাচ্ছো কোথায়?”

আদ্রিতা ঘুরেও তাকালো না। সরাসরি বলল,

“কাজ আছে।”

আবরাজ কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে বলল,

“তাড়াতাড়ি ফেরা হয় যেন।”

আদ্রিতা এবার থামল। ঘুরে তাকালো। ভ্রু কুঁচকে বলল,

“সেটা আমার ব্যাপার।”

আবরাজ ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে এলো।

তার চোখ স্থির। সকালের শান্ত আলোতেও সেই দৃষ্টি কেমন ধারালো। একদম সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলল,

“বড্ড বাড় বেড়েছো তুমি, জানো?”

আদ্রিতা কিছু বলল না। শুধু তাকিয়ে রইল।

আবরাজ এবার নিচু স্বরে বলল,

“আমি এখন এই শহরের মেয়র। আর তুমি যদি কিছু উল্টো পাল্টা ব্যবহার করো আমার সম্মান কোথায় যাবে, ভেবে দেখেছো?”

আদ্রিতার ঠোঁটের কোণে ঠান্ডা হাসি ফুটল। সে এক পা এগিয়ে এলো। দুজনের দূরত্ব কমে গেল। তারপর একদম শান্ত গলায় বলল,

“আপনার সম্মান কি হবে সেটা আমার ভাবার দরকার নেই।”

কথাটা বলেই সে পাশ কাটিয়ে হাঁটতে গেল। কিন্তু আবরাজ তার কব্জি ধরে থামিয়ে দিল। তার একদম নীচু গলা বলল,

“লিটিল স্পার্ক সকাল সকাল আগুন জ্বালিও না।”

**********

আইয়ুপ সুলতান মসজিদ (Eyüp Sultan Mosque) হলো ইস্তাম্বুলের এর এক শান্ত, ঐতিহাসিক আর গভীর আধ্যাত্মিক আবহে ঘেরা স্থান। গোল্ডেন হর্নের ধারে অবস্থিত এই মসজিদে ঢুকলেই চারপাশের কোলাহল যেন থেমে যায়। এই জায়গাটা ইতিহাস আর রহস্যের নিঃশব্দ সাক্ষী।

সাদা পাথরে গড়া বিশাল স্থাপনাটি দূর থেকেই চোখে পড়ে। উঁচু মিনার, প্রশস্ত উঠান, আর কেন্দ্রীয় গম্বুজ যেন আকাশ ছুঁতে চায়।

মসজিদের ভেতরের অংশে বড় ঝাড়বাতি, কারুকাজ করা খিলান, দেয়ালজুড়ে আরবি ক্যালিগ্রাফি পুরো জায়গাটাকে এক রাজকীয় অথচ শান্ত সৌন্দর্য দেয়।

এই মসজিদের পাশে রয়েছে আবু আইয়ুব আল-আনসারির সমাধি, যার জন্য জায়গাটি মুসলিমদের কাছে বিশেষ পবিত্র।

শহরের ক্ষমতাবান মানুষ থেকে সাধারণ মানুষ সবাই এখানে আসে। এই জায়গাটা ইস্তাম্বুলের ব্যস্ততার বাইরে অন্য এক জগৎ।

কিছুক্ষণ পর একে একে কালো গাড়ির সারি এগিয়ে এলো। প্রথমে দুটো সিকিউরিটি এস ইউ ভি।

তারপর তিনটি মূল কালো গাড়ি। সবকটায় কাচ কালো। পেছনে আরও কয়েকটি গাড়ি। সশস্ত্র নিরাপত্তাকর্মীরা পুরো রুট ঘিরে রেখেছে।

প্রথম গাড়িতে রয়েছে আবরাজ খান, প্রয়াণ খান ও মিনহাজ আলি।

দ্বিতীয় গাড়িতে রয়েছে সারফরাজ আহমেদ ও জায়েদ মালিক।

তৃতীয় গাড়িতে আরো দুই জন মন্ত্রী।

গাড়ি থামতেই চারপাশে থাকা সাধারণ মানুষ একপাশে সরে দাঁড়াল। কারও চোখে বিস্ময়, কারও

মুখে চাপা আলোচনা।

একে একে তারা নেমে এলো গাড়ি থেকে।

আবরাজ সবার আগে। আজ তার পরনে সাদা পাঞ্জাবি, গাঢ় রঙের জিন্স। চোখে কালো সানগ্লাস।

তার পেছনে প্রয়াণ। পরনে গাঢ় ধূসর পাঞ্জাবি, সাদা পাজামা। মুখে স্বাভাবিক গাম্ভীর্য।

মিনহাজ কালো পাঞ্জাবি পরে নেমে পাশে দাঁড়াল।

তার চোখ চারপাশ স্ক্যান করছে।

দ্বিতীয় গাড়ি থেকে নামল সারফরাজ।

সাদা পাঞ্জাবি কালো ওয়েস্ট কোর্ট, চোখে রোদচশমা।

তার পাশে জায়েদ। হালকা বাদামি পাঞ্জাবি ও জিন্স।

নামতেই ফোন পকেটে ঢুকিয়ে চারপাশে তাকালো।

তৃতীয় গাড়ি থেকেও দুই মন্ত্রী নেমে তাদের সঙ্গে যোগ দিল।

সবাই কিছুক্ষণ একসাথে দাঁড়িয়ে রইল। বাতাসে মসজিদের সামনে কাপড়ের ভাঁজ হালকা দুলছে।

দূরে মিনারের পাশে পাখির ঝাঁক উড়ে যাচ্ছে।

আবরাজ একবার মাথা তুলে মসজিদের গম্বুজের দিকে তাকালো।

তারপর চশমা খুলে এক নিরাপত্তাকর্মীর হাতে দিল।

শান্ত গলায় বলল,

“চলো।”

কথাটা বলতেই সবাই ধীরে ধীরে তার সঙ্গে ভেতরের দিকে এগিয়ে গেল।

সাদা পাথরের সিঁড়ি বেয়ে তারা মসজিদের প্রধান ফটকে পৌঁছাল।

চারপাশে মানুষ পথ ছেড়ে দিল। কেউ নিচু গলায় সালাম জানাল, কেউ দূর থেকে তাকিয়ে রইল।

তারপর তারা একসাথে আয়ুইপ সুলতান মসজিদের ভেতরে প্রবেশ করল। ভেতরে ঢুকতেই যেন এক অদ্ভুত অনুভূতি ঘিরে ধরে। বাইরের কোলাহল, রাজনীতি, গাড়ির শব্দ, নিরাপত্তার কড়া পরিবেশ সব যেন ফটকের বাইরেই থেমে যায়।

এখানে সময়ের গতি অন্যরকম। মসজিদের ভেতরের এই শান্ত পরিবেশ, বাইরের কোনো কোলাহলই যেন ভাঙতে পারে না।

অনেক মানুষই আছে ভেতরে। তবু কেউ উচ্চস্বরে কথা বলে না। কেউ কাউকে বিরক্ত করে না। সবাই নিজের মতো দোয়া করছে।‌ মনে হচ্ছে প্রত্যেকে নিজের একান্ত গোপন কথা আল্লাহর সামনে রেখে দিচ্ছে।

ক্ষমতা, পদ, জয়, পরাজয় সবকিছুই যেন এই বিশাল নীরবতার সামনে খুব ছোট।

মসজিদের গভীর নীরবতার মাঝেই ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এলেন একজন প্রধান প্রবীণ ইমাম।

তার পদচারণাও যেন শব্দহীন। সাদা জুব্বা, মাথায় পাগড়ি, মুখজুড়ে ধবধবে সাদা দাড়ি।

চোখে এমন এক প্রশান্তি, যেন বহু বছর ধরে এই পবিত্র স্থানের নীরবতা তার ভেতরেই বাসা বেঁধেছে।

তিনি কাছে এসে থামলেন। একবার ধীরে দৃষ্টি বুলালেন সবার ওপর।

আবরাজ সামনে দাঁড়িয়ে। তার পাশে প্রয়াণ ও মিনহাজ। কিছুটা ডানদিকে সারফরাজ, তার পাশে জায়েদ। আর পেছনে দুই নতুন মন্ত্রী।

প্রবীণ ইমাম ধীরে ডান হাত বুকে রাখলেন। মাথা সামান্য নত করে সালাম জানালেন।

তার কণ্ঠে এমন স্থিরতা ছিল, যেন পুরো বিশাল গম্বুজের নিচে শব্দটা নরম ঢেউ হয়ে ছড়িয়ে গেল।

সবাই একসঙ্গে সালামের জবাব দিল।

ইমাম কিছুক্ষণ নীরব রইলেন। তারপর শান্ত, গভীর কণ্ঠে বললেন,

“এই পবিত্র স্থানে যারা আসে, তারা শুধু নিজের জন্য আসে না। তারা আসে মানুষের দায়, রাষ্ট্রের দায়িত্ব আর অদৃশ্য বোঝা বুকে নিয়ে।”

তিনি ধীরে আবরাজের দিকে তাকালেন, আবার সারফরাজের দিকেও দৃষ্টি গেল।

“আজ আপনারা যে অবস্থানে আছেন, সেখানে ক্ষমতা যেমন আছে তেমনি পরীক্ষা আরও বড়। একটি শহরের দায়িত্ব, মানুষের বিশ্বাস, আর দেশের ভবিষ্যৎ এগুলো আল্লাহর দেওয়া আমানত।”

মসজিদের আলো জ্বলজ্বল করছে।

তিনি আবার বললেন,

“মেয়র হোক, সংসদ সদস্য হোক, মন্ত্রী হোক এই দরজার ভেতরে সবাই আগে মানুষ, তারপর পদ।”

কথাটা শুনে চারপাশ যেন আরও নীরব হয়ে গেল।

তারপর তিনি ডান হাত সামনের দিকে বাড়িয়ে দিলেন।

মৃদু স্বরে বললেন,

“চলুন। বিশেষ দোয়ার স্থানে নিয়ে যাই আপনাদের।”

তার কণ্ঠে কোনো জোর ছিল না। তবু অদ্ভুতভাবে সবাই নিজে থেকেই তার পিছু নিল।

সেই মুহূর্তে মনে হচ্ছিল,

ইস্তাম্বুলের সবচেয়ে ক্ষমতাবান কয়েকজন মানুষও

এই পবিত্র নীরবতার সামনে শুধুই সাধারণ মানুষ।

দোয়া শেষ করে তারা ধীরে ধীরে ভেতর থেকে বাইরে

উঠোনের দিকে বেরিয়ে এলো।

মসজিদের সেই শান্ত পরিবেশ পেছনে রেখে বেরিয়ে

আসতেই দেখা গেল আবার মানুষ জমেছে।

কেউ অপেক্ষা করছিল ভেতরে ঢোকার জন্য, কেউ দূর থেকে দেখছিল।

তারা পথ ছেড়ে সরে দাঁড়াল।

কারণ এখানে কেউ নিজের উপস্থিতিকে অন্যের ইবাদতের ওপর রাখে না।

আয়ুইপ সুলতান মসজিদের এই দরজার ভেতরে সবাই সমান। ক্ষমতাবান, সাধারণ, ধনী, গরিব আল্লাহর সামনে শুধু মানুষ।

আবরাজ খান নিজেই ইশারায় সিকিউরিটিকে একটু পেছাতে বলল।

যাতে অন্যরা স্বাভাবিকভাবে প্রবেশ করতে পারে।

ঠিক তখনই আবার ধীরে সামনে এলেন সেই প্রবীণ

ইমাম। তার চোখে আগের মতোই প্রশান্তি। তিনি একে

একে সবার দিকে তাকালেন। প্রথমে সারফরাজ

আহমেদের সামনে এসে থামলেন।

কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইলেন। তারপর শান্ত গলায় বললেন,

“শুনেছি সম্প্রতি আপনার বিবাহ হয়েছে।”

সারফরাজ মাথা সামান্য নত করল।

ইমাম মৃদু হাসলেন।

“আল্লাহ আপনার দাম্পত্যে রহমত দান করুন। আপনার ঘরকে শান্তি দিন, হৃদয়ে সহনশীলতা দিন, আর সম্পর্ককে সম্মান দিয়ে রক্ষা করার শক্তি দিন।”

সারফরাজ নীরবে শুনল। তার কঠিন মুখেও কয়েক

মুহূর্তের জন্য এক অদ্ভুত স্থিরতা নেমে এলো।

তারপর ইমামের দৃষ্টি গেল আবরাজ খানের দিকে।

তিনি বললেন,

“আপনারও নতুন সংসার শুরু হয়েছে, আর নতুন দায়িত্বও।”

কিছুটা এগিয়ে কাছে এসে তার কাঁধে হাত রাখলেন।

“আল্লাহ যেন আপনাকে ঘর ও শহর দুটো দায়িত্বই ন্যায়ের সঙ্গে সামলানোর তাওফিক দেন। ক্ষমতা যেন হৃদয় কঠিন না করে।”

আবরাজ মাথা নিচু করল। কোনো কথা বলল না।

এরপর তিনি প্রয়াণ খানের দিকে তাকালেন। তার চোখে যেন একটু আলাদা কোমলতা ফুটল।

“আপনার ঘরে সন্তান আছে, পরিবার আছে।”

তিনি ধীরে বললেন,

“আল্লাহ আপনার স্ত্রী ও সন্তানদের সুস্থ রাখুন।

আপনার ঘরকে বরকতে পূর্ণ করুন, আর আপনাকে তাদের জন্য নিরাপদ ছায়া বানিয়ে রাখুন।”

প্রয়াণ নিঃশব্দে মাথা নত করল।

তারপর প্রবীণ ইমাম একবার পুরো দলটার দিকে তাকালেন। তার মুখে হালকা হাসি।

তারা মসজিদের প্রধান ফটক পেরিয়ে বাইরে আসতেই বোঝা গেল খবর ইতিমধ্যেই ছড়িয়ে পড়েছে।

বাইরে সাংবাদিকদের ভিড়। ক্যামেরা, মাইক, লাইভ সম্প্রচার মুহূর্তেই জায়গাটা আলো আর প্রশ্নে ভরে উঠল।

নিরাপত্তাকর্মীরা দ্রুত বেষ্টনী তৈরি করল। ফলে কেউ সামনে এগোতে পারল না।

প্রত্যেকেই দ্রুত গাড়িতে উঠে পড়লো। সবকিছু খুব বেশি সময় নেয়নি। কয়েক মিনিটের মধ্যেই কনভয় বেরিয়ে গেল। কিন্তু ভিডিও আর ছবি ততক্ষণে ছড়িয়ে পড়েছে।

ইস্তাম্বুলের কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে শিরোনাম ভেসে উঠল,,,,,,,,,,

•“আবরাজ খান মেয়র পদ গ্ৰহনের পরেই উপস্থিত আয়ুইপ সুলতান মসজিদের সফরে!”

•”নতুন মেয়র ও মন্ত্রীদের একসঙ্গে পবিত্র দোয়া, আলোচনায় রাজনৈতিক বার্তা!”

•সরফরাজ আহমেদের শীর্ষ নেতৃত্বের উপস্থিতি ঘিরে জনমত!”

একটি সংবাদমাধ্যম বিষয়টা আরও বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করলো।

স্টুডিওতে বড় স্ক্রিনে আয়ুইপ সুলতান মসজিদের ফুটেজ চলছে। পাশাপাশি ভেসে উঠছে আবরাজ খান ও সারফরাজ আহমেদের ছবি।

সংবাদ পাঠক বললেন,

“ইস্তাম্বুলের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্যে নতুন এক সমীকরণ তৈরি হচ্ছে।

সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, তুরস্কের এমপি সারফরাজ আহমেদ গত পরশু বিবাহ সম্পন্ন করেছেন ইস্তাম্বুলের নবনির্বাচিত মেয়র আবরাজ খানের বোনের সঙ্গে।

এই পারিবারিক সম্পর্কের খবর প্রকাশ্যে আসার পর আজ প্রথমবার তাদের একসঙ্গে দেখা গেল আয়ুইপ সুলতান মসজিদে।

নতুন প্রশাসনের দায়িত্ব গ্রহণের কয়েক দিনের মধ্যেই এমন প্রতীকী সফর রাজনৈতিক মহলে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে।

স্ক্রিনে তখন সারফরাজের গাড়ি থেকে নামার দৃশ্য চলছে। তারপর আবরাজের সঙ্গে একই ফ্রেমে মসজিদের সিঁড়ি বেয়ে ওঠা।

সংবাদ পাঠক আবার বলল,

“বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে সারফরাজ আহমেদের উপস্থিতি। কারণ সাম্প্রতিক বিবাহের মাধ্যমে দেশের প্রভাবশালী দুই রাজনৈতিক পরিবারের সম্পর্ক এখন আনুষ্ঠানিকভাবে আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে।”

বিশ্লেষকদের একাংশ বলছেন,,,,,,,,

‘এই সম্পর্ক ভবিষ্যতের রাজনৈতিক সমীকরণেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।

অন্যদিকে আজকের এই সফরকে কেউ ধর্মীয় সৌজন্য হিসেবে দেখছেন।’

আবার কেউ মনে করছেন,,,,,,,,

‘পরিকল্পিত একটা পাবলিক ইমেজ ধরে রাখার জন্য।’

স্টুডিওর আরেক বিশ্লেষক যোগ করলেন,

“যে পরিবারগুলো দীর্ঘদিন আলাদা প্রভাব বলয়ে ছিল, তাদের রাজনৈতিক ও পারিবারিক সংযোগ একসঙ্গে তৈরি হওয়া এটা নিছক সামাজিক ঘটনা নয়। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব থাকতে পারে। ইস্তাম্বুল হয়তো এক নতুন সময়ের দিকে যাচ্ছে।”

স্ক্রিনের নিচে শেষ লাইন ভেসে উঠল,,,,,,,,,,,

‘ব্যক্তিগত সম্পর্ক নাকি নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ? আবরাজ–সারফরাজ একসঙ্গে আইয়ুপ সফরে -- নজরে পুরো ইস্তাম্বুল।'

•••••••••••••

মেডিকেল কলেজের কমন রুমটায় ছাত্রছাত্রীদের দ্বারা পরিপূর্ণ। সেখানে একটু কোণের দিকে একটা টেবিলে বসে আছে আদ্রিতা ও দেবজিত।

টেবিলের ওপর ছড়িয়ে আছে কিছু ফাইল, কয়েকটা

রিপোর্ট, কিছু প্রিন্ট করা কাগজ।

দেবজিৎ ধীরে কাগজগুলো আদ্রিতার দিকে এগিয়ে দিল।

“ম্যাডাম, এগুলো গত দুদিনের রিপোর্ট।”

আদ্রিতা চুপচাপ কাগজগুলো হাতে নিল। এক এক করে পড়তে লাগল।

দেবজিৎ নিচু গলায় বলল,

“আবরাজ খান মেয়র হওয়ার পর থেকেই বিতর্ক থামছে না।”

সে আরেকটা রিপোর্ট বের করে দেখালো।

“শুধু অভিযোগ না, কিছু প্রমাণও মিলছে।”

আদ্রিতার চোখ উঠে গেল তার দিকে। দেবজিৎ গলা আরও নিচু করে বলল,

“কিছু জায়গায় ইলেকশন কমিশন ইচ্ছাকৃতভাবে ভোট কাউন্টিং ভুল করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।”

কথাটা শুনে আদ্রিতার আঙুল ফাইলের ওপর থেমে গেল। সে ধীরে বলল,

“প্রমাণ?”

দেবজিৎ সামনে একটা নথি রাখল।

“এইটা অফিসিয়াল রেজাল্ট আর এইটা প্রাথমিক অভ্যন্তরীণ ভোট গণনার হিসাব।”

দুই কাগজের সংখ্যার পার্থক্য স্পষ্ট।

“দুটোর মধ্যে মিল নেই।”

ঘরটা আরও ভারী লাগতে শুরু করল।

আদ্রিতা কাগজগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল।

তার চোখের ভেতর ধীরে ধীরে জমে উঠল অন্যরকম এক স্থিরতা।

দেবজিৎ বলল,

“পুরোটা এখনো হাতে আসেনি। কিন্তু আরো গভীর ভাবে ইনভেস্টিগেশন করলে পুরো চিত্র বের হবে।”

আদ্রিতা ধীরে ফাইল বন্ধ করল। তার গলা একদম শান্ত।

“আর কেউ জানে এই বিষয়ে?”

দেবজিৎ মাথা নেড়ে বলল,

“না। আপাতত শুধু আমি আর এখন আপনি।”

কয়েক সেকেন্ড কোনো কথা হলো না।

আদ্রিতা জানালার দিকে তাকালো।

দূরের আকাশে রোদ কিন্তু তার চোখে সেই আলো পৌঁছাল না।

মনে পড়ল সকালের কথা,,,,,,

আবরাজের মুখ, তার সতর্ক গলা,

“এই বাড়াবাড়ি বন্ধ করো।”

আদ্রিতার ঠোঁটের কোণে ধীরে এক ঠান্ডা হাসি ফুটে উঠল। মনে মনে বলল,

“আদ্রিতা চৌধুরী সহজে কিছু ভুলে যায় না আবরাজ খান। আপনাকে এতো সহজে আমি ক্ষমা করবো না।”

#চলবে

#রাজনীতির_রক্তচুক্তি

#পর্ব_১৮

#লেখনীতে_নীল‌প্রজাপতি

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৮তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন