ফন্ট সাইজ:
থিম:
রাজনীতির রক্তচুক্তি

২১তম পর্ব

লেখক: নীলপ্রজাপতি

Grand National Assembly of Turkey-র বিশাল ভবনের ভেতরে দুপুরের আলো এসে পড়েছে কাচের জানালায়।

Ankara-র সংসদ ভবনের করিডোর আজ ব্যস্ত।

নতুন সরকার, নতুন জোট, নতুন ক্ষমতার হিসাব সব মিলিয়ে সবার মুখে চাপা ব্যস্ততা।

নিজের নির্দিষ্ট অফিস কক্ষে বসে আছে সারফরাজ আহমেদ।

টেবিলের ওপর ছড়ানো ফাইল, কিছু নথি, সই করার কাগজ।

তার কালো শার্টের হাতা কনুই পর্যন্ত গোটানো।

কপালে হালকা ভাঁজ। এক হাতে কলম, অন্য হাতে কাগজ উল্টে দেখছে।

দরজায় নক হতেই সে চোখ না তুলেই বলল,

“কাম ইন।”

দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল কয়েকজন মন্ত্রী।

তাদের মুখে স্পষ্ট হাসি। সবচেয়ে আগে এগিয়ে এলো

রফিক দেমির। তিনি বয়স্ক, অভিজ্ঞ মন্ত্রী।

হাসতে হাসতে বললেন,

“মিস্টার আহমেদ, সংসদের কাজের চাপে নতুন বিয়ের শুভেচ্ছা দেওয়াই হয়নি।”

পেছন থেকে তারিক ওজকান মজা করে বললেন,

“দেশের এমপি সাহেব চুপিসারে বিয়ে করে ফেললেন, আর আমাদের দাওয়াতই দিলেন না।”

ঘরে হালকা হাসি ছড়িয়ে পড়ল।

সারফরাজ ধীরে কলমটা নামিয়ে চেয়ারে হেলান দিল।

চোখ তুলে সবার দিকে তাকাল। তার ঠোঁটের কোণে সামান্য হাসি।

“দাওয়াত দিলে আপনারা রাজনীতি ছেড়ে খাওয়াদাওয়া নিয়েই ব্যস্ত হয়ে যেতেন।”

ঘরে আবার হাসির রোল উঠলো।

একজন ছোট বাক্স বাড়িয়ে দিল।

“ছোট উপহার। গ্রহণ করবেন।”

সারফরাজ একবার তাকিয়ে জায়েদ কে ইশারা করল।

জায়েদ এগিয়ে এসে বাক্সটা নিয়ে পাশে রাখল।

তারপর সে নিজেই টোন হালকা করে বলল,

“যাই হোক, ধন্যবাদ। শুভেচ্ছা নিয়েছি। এখন বাজেটের

দিকটা নিয়ে আলোচনা করা যাক?”

এক মুহূর্তেই ব্যক্তিগত কথা সরিয়ে পুরো ঘরকে আবার কাজে ফিরিয়ে আনল।

এটাই সারফরাজ। কথা যতই ব্যক্তিগত হোক শেষে আলোচনার কেন্দ্র সে নিজেই ঠিক করে।

সারফরাজ কাগজ থেকে চোখ না তুলেই বলল,

”মোট বাজেট কতো?”

টেবিলে বসা অর্থমন্ত্রী রফিক দেমির কাগজ দেখে বললেন,

“প্রায় একশো আটাশ বিলিয়ন। (প্রায় বারো হাজার আটশো কোটি টাকা।)।”

সারফরাজ ভ্রু কুঁচকাল। আবার জিজ্ঞেস করল,

“ইস্তানবুলের কাজের জন্য কত?”

মন্ত্রী উত্তর দিল,

“একত্রিশ বিলিয়ন। (প্রায় তিন হাজার একশো কোটি টাকা)।”

সারফরাজ এবার ফাইল বন্ধ করে চেয়ারে হেলান দিল।

শান্ত গলায় বলল,

“অনেক কম। ওটা চল্লিশ করো।”

একজন মন্ত্রী বলল,

“তাহলে অন্য দিক থেকে কমাতে হবে।”

সারফরাজ তাকালোই না।

“কমাও। মানুষ আগে চোখে পরিবর্তন দেখতে চায়। পরে হিসাব দেখে।”

সারফরাজ কে বাইরে থেকে দেখে মনে হবে সে কাগজ পত্রের হিসাব দেখছে। তবে তার মাথায় চলছে আলাদা হিসাব।

একশো আটাশ বিলিয়নের প্রস্তাব। তার থেকে ইস্তানবুলের জন্য চল্লিশ বিলিয়ন। তার ঠোঁটের কোণে খুব সামান্য হাসি ফুটল।

সে খুব ভালো করেই জানে এই শহর চালাতে, প্রথম বছরের কাজ সামলাতে, এত টাকা লাগবে না।

ছয়-সাত বিলিয়নেই অনেক কিছু হয়ে যাবে।

তার চোখ স্থির হয়ে রইল ফাইলের ওপর।

আর বাকি টাকাটা কাগজে থাকবে উন্নয়ন নামে।

তবে বাস্তবে নিজেদের মধ্যে ভাগ হয়ে যাবে।

একটা অংশ আবরাজের হাতে যাবে। অন্যটা যাবে

সারফরাজের নিজের হাতে। সেখান থেকেও ছোটো

ছোটো ভাগ হয়ে কিছু কিছু টাকা যাবে তাদের কাছের

লোকদের হাতে।

সারফরাজ খুব ধীরে চেয়ারে হেলান দিল। মনে মনে ভাবল,

“মানুষ শুধু নতুন রাস্তা দেখে। নতুন আলো দেখে। বড়

বড় ঘোষণা শোনে। কেউ দেখে না একটা শহরের

উন্নয়নের নামে কত টাকা হারিয়ে যায়।”

তার চোখে অদ্ভুত শীতলতা বিরাজ করছে।

রাজনীতি শুধু মঞ্চের শপথ না। শপথের আড়ালে থাকে চুক্তি। আর সেই চুক্তির নিচে থাকে রক্ত, টাকা, বিশ্বাসঘাতকতা।

সারফরাজ চোয়ারে হেলান দিলো। তার মাথায় আরো একটা দিক ফুটে উঠল। আবরাজ এখন মেয়র পদে রয়েছে। সাধারন মানুষ, মিডিয়া, সংবাদ মাধ্যম সবার দৃষ্টি এখন রয়েছে আবরাজের দিকে। এই সময় লোভ দেখালে খেলা শেষ হতে বেশি সময় লাগবে না।

সারফরাজ ধীরে বলল,

“প্রথম কয়েক বছর ইমেজ একদম পরিষ্কার রাখতে হবে।"

ঘরে থাকা সবাই তার দিকে তাকাল।

সে আঙুল দিয়ে ফাইল ছুঁয়ে বলল,

“মানুষের বিশ্বাস একবার ধরতে পারলে, তারা

নিজেরাই ক্ষমতা ধরে রাখে। তখন জোর করা লাগে না।”

একজন মন্ত্রী ভ্রু কুঁচকে বলল,

“তাহলে আগের হিসাব?”

সারফরাজের ঠোঁটে মৃদু হাসি টেনে বলল,

“আগের সরকার যত দুর্নীতি করেছে, সব বের করো। অন্তত সেটাই দেখাও যে কাজে লেগে পড়েছে নতুন সরকার কাজে লেগে পড়েছে।”

আরও যোগ করল,

“আবরাজ নিজে সামনে থাকবে। সে সঠিক বিচার করবে। শাস্তি দেবে। পুরোনো দুর্নীতি পরিষ্কার করবে।”

একটু থেমে বলল,

“মানুষ তখন NDP-কে সরকার না, মুক্তি ভাববে।”

সারফরাজ চোখ নামিয়ে বলল,

“মানুষ দেখবে এক নতুন ক্লিন রাজনীতি। প্রথমে তাদের ন্যায় দেখাও, তারপর বিশ্বাস নাও, তারপর ক্ষমতার শেকড় ভালোভাবে গাঁথা যাবে।”

রফিক দেমির চিন্তিত গলায় বলল,

“কেমাল আরসালান এত সহজে ছাড়বে না। কোর্টে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। দলও চাপ দিচ্ছে।”

ঘরে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা নেমে এলো।

সারফরাজ একটুও বিচলিত হলো না। গ্লাসে আঙুল ঘুরাতে ঘুরাতে ঠান্ডা গলায় বলল,

“যা করছে করতে দাও।”

কথাটা এতটাই নিশ্চিন্ত ভাবে বলল যেন বিষয়টা তুচ্ছ।

রফিক ভ্রু কুঁচকে বলল,

“যদি কেসটা বড় হয়?”

সারফরাজ এবার ধীরে মুখ তুলল। চোখে শীতলতা বিরাজমান। সে খুব আস্তে বলল,

“হোক। কোর্টে গেলে ও নিজেই নিজের কবর খুঁড়বে।”

যেদিন ও মামলা করবে, সেদিনই পুরোনো সব ফাইল বের হবে।”

একটু থেমে বলল,

“ওর মেয়াদকালে যে চুক্তি হয়েছে, যে ঘুষ গেছে, যে কালো টাকা ঘুরেছে সব কিছু।”

রফিক এবার বুঝে নিল। তার মুখে হালকা হাসি ফুটল।

সারফরাজ চেয়ারে হেলান দিয়ে বলল,

“মানুষ সত্য চায় না। মানুষ নাটক চায়।”

তার ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি।

“কেমাল যদি মঞ্চে উঠতে চায় আমরা পুরো শহরকে দর্শক বানাবো।”

সারফরাজ তাচ্ছিল্য কন্ঠে বলল,

“মানুষ সবসময় ক্ষমতার দাস।”

ঘরের সবাই চুপ করে শুনছে।

সে গ্লাসটা নামিয়ে খুব ধীরে বলল,

“দেখোনি? NDP ক্ষমতায় আসতেই কেমাল আরসালানের দলের ছোট ছোট নেতাগুলো কেমন

দৌড়ে এসে দল পাল্টে ফেলল।”

একজন মন্ত্রী হেসে ফেলল।

সারফরাজ মাথা নেড়ে বলল,

“আদর্শ, নীতি এসব বক্তৃতার শব্দ। বাস্তবে সবাই চায় যেখানে চেয়ার আছে তার পাশে থাকতে।”

তার চোখ ঠান্ডা।

“আজ কেমালের পাশে যারা আছে, কাল ওদের অর্ধেকই আমাদের মিটিং রুমে বসবে।”

চেয়ারে হেলান দিয়ে বলল,

“ক্ষমতা এমন একটা দরজা, সেটা যেদিকে খুলবে, মানুষ সেদিকেই হাঁটবে।”

---------

দু-দিন পর__________________

ইস্তাম্বুলের সংবাদ মাধ্যমে আজ একটাই খবর ছড়িয়ে পড়েছে।

প্রায় দু-তিন বছর চাপা পড়ে থাকা একটি ধ//র্ষ*ণ মামলার ফাইল আবার খুলছে নতুন প্রশাসন।

খবরের শিরোনাম ------

“প্রাক্তন প্রশাসনের সময় ধামাচাপা পড়া নারী নি'র্যা"তন মামলা পুনরায় তদন্তের নির্দেশ দিলেন মেয়র আবরাজ খান।”

খবরটা আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ল। টিভি, অনলাইন পোর্টাল, সোশ্যাল মিডিয়া সর্বত্র এক আলোচনা চলছে।

প্রায় দুই-তিন বছর আগের ঘটনা।

ইস্তাম্বুলের এক সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া মেয়ে।

বয়স খুব একটা বেশি নয়। নিজের পড়াশোনা আর

পরিবার নিয়েই তার জীবন ছিল।

এক সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার পথে তাকে অপহরণ করা

হয়। পরের দিন সকালে শহরের এক নির্জন জায়গায়

তাকে অচেতন অবস্থায় পাওয়া যায়।

হাসপাতালে নেওয়ার পর জানা যায়, তার ওপর নৃ"শং'"স নির্যাতন হয়েছিল।

ঘটনাটা প্রথমে সংবাদমাধ্যমে ওঠেছিলো। শহরজুড়ে

ক্ষোভও তৈরি হয়েছিল। মেয়েটির পরিবার মামলা

করেছিল।

অভিযোগ ওঠে এর পেছনে ছিল তৎকালীন ক্ষমতাসীন শিবিরের এক প্রভাবশালী নেতার ছেলে ও তার বন্ধুরা।

কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই সবকিছু বদলে যায়।

পরিবারকে রাতের অন্ধকারে হুমকি দেওয়া হয়।

মামলা তুলতে চাপ দেওয়া হয়।

অবশেষে মোটা অঙ্কের ঘুষ, প্রশাসনিক প্রভাব আর ভয়

দেখিয়ে পুরো ফাইল ধামাচাপা দেওয়া হয়।

সংবাদমাধ্যমের খবরও ধীরে ধীরে থেমে যায়।

তারপর আর কেউ কথা বলেনি এই বিষয়ে নিয়ে।

ফাইলটা সরকারি আর্কাইভে চাপা পড়ে ছিল,

যতদিন না নতুন সরকার সেটা আবার খুলে আনে।

খবরটা ছড়িয়ে পড়ার পর ইস্তাম্বুলের পরিবেশ যেন অন্যরকম হয়ে উঠল।

রাস্তাঘাট, চায়ের দোকান, অফিস, বিশ্ববিদ্যালয় সর্বত্র একটাই আলোচনা ঘুরছে।

মানুষ পুরোনো সেই ঘটনার কথা আবার বলতে শুরু করল।

বিশেষ করে নারীদের মধ্যে বিষয়টা বড় আলোড়ন তুলল। সোশ্যাল মিডিয়ায় পুরোনো পোস্ট আবার উঠে এলো।

অনেকে লিখল,,,,,,,

“আমরা ভেবেছিলাম মেয়েটার বিচার বোধহয় আর হবে না।”

আবরাজ খানের জনপ্রিয়তা যেন এক লাফে আরও বেড়ে গেল।

কারণ জনতার চোখে সে এখন শুধু নতুন মেয়র না, সে এমন একজন মানুষ, যে পুরোনো ক্ষমতাকেও ভয় পায় না।

সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এলো মেয়েটির পরিবার।

তারা বহুদিন পর প্রথমবার সংবাদমাধ্যমে মুখ খুলল।

মেয়েটির বাবা কাঁপা গলায় বললেন,

“অনেকদিন আগেই আমাদের সব শেষ হয়ে গেছে। আজ শহরের মেয়র আমাদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন, সত্যি এর থেকে বড়ো কিছু আর কি হতে পারে? আমার একটাই অনুরোধ আমার মেয়েটা যেন সঠিক বিচার পায়।”

এই কয়েকটা বাক্য শহরের মানুষকে আরও নাড়িয়ে

দিল। অনেকেই মনে মনে অপেক্ষা করছিল এই

বিচারটার জন্য। কেউ মুখে বলেনি, কিন্তু ক্ষতটা চাপা

ছিল। আর আজ সেই চাপা ক্ষত খুঁড়ে বের করে সামনে

এনেছে নতুন প্রশাসন।

মিরাজ টাওয়ারের নিজের কেবিনে বসে আবরাজ খান টিভিতে মানুষের প্রতিক্রিয়া দেখছে। তার মুখ স্থির।

চোখে কোনো ভাব নেই।

সে আগে থেকেই জানে এই সিদ্ধান্তে শহর তার পাশে

দাঁড়াবে। এটা শুধু বিচার না, এটা জনমতকে নিজের

দিকে টেনে আনার সময়।

তবে এই সিদ্ধান্তের পেছনে আরেকটা মাথা আছে।

সেটা হলো সারফরাজ আহমেদ। সে সরাসরি হয়তো

এই বিষয়টা নিয়ে সামনে আসে নি কিন্তু খেলার ছক

সে-ই সাজিয়েছে।

আবরাজ যদি দাবার বোর্ডের রাজা হয়,

তাহলে সারফরাজ সেই বোর্ডের খেলোয়াড়।

সে কোন গুটি কখন চাল দেবে, সেটা আগে থেকেই ঠিক করে রাখে।

সেদিনও সংসদের নিজের অফিসে বসে সারফরাজ খবরটা দেখছিল। তার ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটে উঠল।

পাশে দাঁড়িয়ে থাকা জায়েদ জিজ্ঞেস করল,

“মানুষ খুব দ্রুত আবরাজের পক্ষে চলে আসছে।”

সারফরাজ ঠান্ডা গলায় বলল,

“মানুষ বিচার দেখে না, বিচার শুরু হতে দেখে।”

একটু থেমে সে যোগ করল,

“তাদের বিশ্বাস দরকার। আর বিশ্বাস কেনার সবচেয়ে সস্তা উপায়, কাউকে শাস্তি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি।”

রাজনীতি বড় অদ্ভুত এক জগত। বাইরে থেকে যতটা সুশৃঙ্খল, ভেতরে ততটাই জটিল।

এখানে হাসির আড়ালেও চুক্তি থাকে, করমর্দনের আড়ালেও শত্রুতা।

সাধারণ মানুষ যা দেখে, সেটা খুব সামান্য।

একটা নতুন রাস্তা, একটা পুরোনো মামলা খোলা, কারও শাস্তি পাওয়া, কারও পতন। সবকিছু দেখে মনে হয় সরকার নিজের কাজ করছে, মানুষের জন্য বদল আনছে। কিন্তু ক্ষমতার দরজা বন্ধ হলেই সেই চিএ বদলে যায়।

মানুষ ভাবে সরকার তাদের ভালো করছে।

কিন্তু সেই ভালো করার মধ্যেও থাকে রাজনীতিবিদ দের ব্যক্তিগত স্বার্থ।

আবরাজ খান আর সারফরাজ আহমেদ এদের শরীরে র"ক্তের সঙ্গে রাজনীতিও বয়ে চলে।

ক্ষমতা এদের কাছে শুধু দায়িত্ব নয়, তাদের অস্তিত্বের অংশ।

আবরাজ সামনে দাঁড়িয়ে মানুষের মুখোমুখি হয়। তার

কণ্ঠে শপথ থাকে, তার হাতে সিদ্ধান্ত। মানুষ তাকে

দেখে তার ওপর বিশ্বাস রাখে।

আর সারফরাজ সামনে না থেকেও সবকিছুর কেন্দ্রে।

কোন সিদ্ধান্ত কখন নিতে হবে, কোন ঘটনা কখন

সামনে আনতে হবে, কোন বিচারকে জনমতের হাতিয়ার

বানাতে হবে... তার হিসাব আগেই কষা থাকে।

সে জানে, ক্ষমতা শুধু জেতার নয় ধরে রাখার খেলাও।

কেমাল আরসালানও আলাদা নয়। বহু বছর যে চেয়ারে বসে মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করেছে, সেই চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ানো সহজ নয়।

কারণ ক্ষমতা একবার রক্তে ঢুকে গেলে,

মানুষ সেটা পদ বলে দেখে না, সেটা নিজের অংশ বলে

মনে করে। তাই হারার পরও সে জায়গা ছাড়তে পারে

না।

আবরাজ, সারফরাজ, কেমাল তিনজনের পথ আলাদা। কিন্তু রাজনীতির জায়গায় তারা এক।

তাদের শিরায় শিরায় রাজনীতি বয়ে চলে।

রাজনীতি ভীষণ নোংরা। কারণ এখানে হাসির পেছনে ফাঁদ থাকে, সহযোগিতার পেছনে স্বার্থ থাকে আর ন্যায়ের পেছনেও অনেক সময় ক্ষমতার গন্ধ লুকিয়ে থাকে।

*************

~ আহমেদ ম্যানশন ~

শুক্রবার সকাল ৭টা।

ছুটি না থাকলেও সারফরাজ আজ বাড়িতে থাকবে।

কারন আজ বাইরে কোনো মিটিং নেই।

তবু গত দুদিন নানা কাজের চাপে প্রিয়ান্তিকে তার বাড়ি নিয়ে যাওয়া হয়নি।

সারফরাজের ঘরের জানালা দিয়ে সকালের আলো

ঢুকছে। টেবিলের সামনে বসে ল্যাপটপে কাজ করছে

সারফরাজ। পরনে পার্পল টি-শার্ট, সাদা ট্রাউজার।

চোখে হালকা বাদামি ফ্রেমের সরু, গোল চশমা। যেটা তাকে স্বাভাবিকের চেয়েও বেশি গম্ভীর আর আকর্ষণীয় লাগাচ্ছে।

প্রিয়ান্তি ট্রেতে চা এনে টেবিলের পাশে চুপচাপ রাখলো।

আজও তার মুখে সেই নীরব অভিমান।

সারফরাজ স্ক্রিন থেকে চোখ না সরিয়েই বলল,

“কাজের চাপ ছিল তাই নিয়ে যেতে পারিনি।”

প্রিয়ান্তি সঙ্গে সঙ্গে বলল,

“এইজন্যই তো বলেছিলাম, আমি একাই যাই।”

কথাটা শুনে সারফরাজের হাত থেমে গেলো।‌ ধীরে মুখ তুলে তাকাল তার দিকে। চোখের ভেতর একটু অন্যরকম ভাব। সে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়েই রইল।

তারপর খুব শান্ত গলায় বলল,

“প্রিয়ান্তি… সবসময় ‘একাই যাই’, ‘একাই করব’ এই কথাগুলো এত বলো কেন?”

প্রিয়ান্তি চুপচাপ তাকালো।

সারফরাজ চশমা খুলে টেবিলে রাখল। চেয়ারে হেলান দিয়ে আবার বলল,

“এখন তুমি একা নও।”

কথাটা শুনে প্রিয়ান্তি চুপ। তার আঙুল ট্রের পাশে শক্ত হয়ে রইল।

সারফরাজ এবার মৃদু গলায় যোগ করল,

“যেখানে যেতে হবে, আমি নিয়ে যাব। যা দরকার, বলবে। প্রতিটা কথায় নিজেকে আলাদা করে রাখার দরকার নেই।”

প্রিয়ান্তি ঠোঁট শক্ত করেই বলল,

“আমি বাচ্চা নই। আর আপনি কোনো পারফেক্ট হাজব্যান্ড নন।”

সারফরাজ ভ্রু তুলে তাকাল। শান্ত গলায় বলল,

“কেন? কোনো কমতি তো নেই আমার।”

প্রিয়ান্তি এবার সরাসরি তাকালো। চোখে সেই চেনা জেদ।

“কমতি না থাকলে নিশ্চয়ই আপনার এত সুন্দরী প্রথম বউয়ের সঙ্গে ডিভোর্স হতো না।”

কথাটা শেষ হতেই ঘরের বাতাস বদলে গেল।

সারফরাজের মুখের রেখা শক্ত হয়ে উঠল।

চোয়াল স্পষ্ট টানটান। কয়েক সেকেন্ড সে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল। তারপর খুব ঠান্ডা, নিচু গলায় বলল,

“এলিনার বিষয়ে কোনো কথা বলার অধিকার তোমার নেই।”

প্রিয়ান্তি থামল না। বরং হালকা হেসে ফেলল।

“এতই যখন প্রথম বউয়ের প্রতি দরদ, তাহলে আমায় বিয়ে করলেন কেন?”

এইবার সারফরাজ ধীরে ল্যাপটপ বন্ধ শান্ত গলায় বলল,

“তুমি একটা জিনিস ভুলে যাচ্ছো, প্রিয়ান্তি।”

প্রিয়ান্তি চুপ। সারফরাজ বলল,

“সব প্রশ্ন করার বয়স হয় না। কিছু প্রশ্ন করার সীমা থাকে।”

প্রিয়ান্তির বুক ধক করে উঠল কিন্তু তার জেদও কমল না। সে ফিসফিস করে বলল,

“সত্যি কথা শুনতে খারাপ লাগছে?”

সারফরাজ কয়েক সেকেন্ড চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর একদম ধীরে বলল,

“তুমি আমার স্ত্রী। তাই বলছি নিজের সীমা বোঝো।”

কথাটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে প্রিয়ান্তির চোখে জল এসে গেল। তবে চোখের জল হাতের পিঠ দিয়ে মুছে নিয়ে গলা শক্ত করে বলল,

“একটা কথা আমি আপনাকে স্পষ্টভাবে বলে দিলাম আপনার প্রথম স্ত্রী যেন এই বাড়িতে না আসে।”

সারফরাজ ভ্রু কুঁচকাল। চোখে স্পষ্ট বিস্ময়।

“মানে?”

প্রিয়ান্তি ঠোঁট কামড়ে বলল,

“মানে আপনার বিশ্বসুন্দরী স্ত্রী আজ এসেছিল সৃজাকে দেখতে। এইভাবে সে প্রতিদিন আসবে?”

সারফরাজ কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে রইল। তারপর খুব স্বাভাবিক গলায় বলল,

“ডিভোর্সের পরও অনেকবার এসেছে মেয়ের জন্য। আর আসবেও। ওর সম্পূর্ণ অধিকার আছে আসার।”

প্রিয়ান্তির চোখে সঙ্গে সঙ্গে জল চলে এলো।‌ সে এক

সেকেন্ডও আর দাঁড়াল না। মুখ ফিরিয়ে দ্রুত

আলমারির দিকে গেল। নিচ থেকে নিজের স্যুটকেস

টেনে বের করল। জোরে সেটার চেন খুলে বিছানার

ওপর রাখল। একটার পর একটা নিজের কাপড় গুছাতে

শুরু করল। হাত কাঁপছে, কিন্তু থামছে না।

সারফরাজ প্রথমে কয়েক সেকেন্ড শুধু তাকিয়ে রইল।

সব দেখে তার মুখের রেখা ধীরে শক্ত হয়ে উঠল।

সে এগিয়ে এসে বলল,

“কী করছো এগুলো?”

প্রিয়ান্তি একবারও তার দিকে তাকাল না।

কাপড় গুছাতেই গুছাতে বলল,

“বাড়ি যাব। আর ফিরব না। তাই গুছিয়ে নিচ্ছি।”

সারফরাজের ভ্রু কুঁচকে গেল। ঠান্ডা গলায় বলল,

“বাচ্চামি কেন করছো তুমি?”

প্রিয়ান্তি সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে দাঁড়াল। চোখ লাল, গাল ভেজা।

“কী বাচ্চামি করেছি আমি? বলুন।”

সারফরাজ স্থির গলায় বলল,

“এলিনা আমার প্রাক্তন স্ত্রী হলেও সে আমার সন্তানের মা। তাই এই বাড়ি আসার অধিকার তার সারাজীবন আছে।”

কথাটা খুব সাধারণভাবে বলা হলেও, তার স্বরে এমন এক দৃঢ়তা ছিল, যেটা বুঝিয়ে দিল এই বিষয়ে তর্ক সে বরদাস্ত করবে না।

প্রিয়ান্তি ঠোঁটে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটল।

“ওহ… আমি ভুলেই গিয়েছিলাম।”

সে ধীরে স্যুটকেসের চেইন টানতে টানতে বলল,

“আমি তো আপনার জীবনে শুধু রাজনৈতিক চুক্তি, তাই না? খান পরিবার আর আহমেদ পরিবারের সম্পর্ক আরও গাঢ় করার মাধ্যম।”

কথাটা শেষ হতেই সারফরাজের চোখ বদলে গেল।

চোখে রাগ এবার স্পষ্ট। চোয়াল শক্ত হয়ে উঠেছে।

তবু নিজেকে সামলাল। খুব ধীরে, চাপা গলায় বলল,

“এলিনা আসাতে তোমার সমস্যা কোথায় হয়েছে?”

প্রিয়ান্তি তার দিকে তাকালো।‌ চোখের ভেতর কষ্ট আর অপমান মিশে আছে।

“সমস্যা?”

সে হেসে ফেলল। কিন্তু সেই হাসিতে ব্যথা স্পষ্ট।

“আপনার প্রথম স্ত্রী, আপনার মেয়ের মা এই বাড়িতে যখন খুশি আসবে। আর আপনার মা তাকে এখনো নিজের মতোই গ্রহণ করে। আপনি তার নাম উঠতেই বদলে যাবেন আর আমি?”

সে বুকের দিকে আঙুল তুলে বলল,

“আমি এই ঘরে দাঁড়িয়ে শুনব, আপনার প্রাক্তন‌ স্ত্রীর অধিকার আছে?”

সারফরাজ এবার গলা একটু উঁচু করল।

“কারণ আছে। সে এই পরিবারের অংশ। সেটা বদলাবে না।”

প্রিয়ান্তির চোখ থেকে আবার জল গড়িয়ে পড়ল।

সে হেসে মাথা নেড়ে বলল,

“বুঝেছি। আমি জায়গা না, আমি একটা সিদ্ধান্ত। একটা প্রয়োজন।”

এবার সারফরাজের ধৈর্যের বাঁধ ভাঙল। সে এক ঝটকায় স্যুটকেস বন্ধ করে বিছানায় ছুড়ে ফেলল।

প্রিয়ান্তি চমকে উঠল। সারফরাজ সামনে এসে দাঁড়াল।

চোখ ঠান্ডা, কিন্তু ভেতরে রাগ দপদপ করছে।

“তোমাকে আমি বিয়ে করেছি। তোমার বাচ্চামি, বেয়াদবি সব মেনে নিচ্ছি। কিন্তু তারমানে এই না যে তুমি আমার অতীত নিয়ে সীমা ছাড়িয়ে কথা বলবে।”

প্রিয়ান্তি তবু জেদ নিয়ে তাকিয়ে রইল।

বলল,

“এইজন্যই আপনার মতো বয়সে বড় কাউকে বিয়ে করতে চাইনি। যার আগে বউ ছিল, বাচ্চা আছে।”

একটু থেমে যোগ করল,

“আমি এমন কাউকে চেয়েছিলাম, যার জীবনে আমি

প্রথম হব। কিন্তু সবাই মিলে আমার জীবনটা নিজের

মতো ঠিক করে দিল।”

সারফরাজের ধৈর্য শেষের দিকে। ধীরে, স্পষ্ট স্বরে বলল,

“এই বিয়ে কোনো রূপকথা না, প্রিয়ান্তি। তুমি জানতে এটা দুই পরিবারের সিদ্ধান্ত।”

প্রিয়ান্তি তাচ্ছিল্য করে হেসে বলল,

“হ্যাঁ, রাজনৈতিক সম্পর্ক।

সারফরাজ এবার সামনে এগিয়ে এলো। চোখ সরু করে বলল,

“তাহলে সমস্যা কোথায়? তুমি জানতে। আমিও জানতাম। তবু এখন এসব নাটক কেন?”

প্রিয়ান্তির বুক কেঁপে উঠল। কথাটা সরাসরি অপমানের মতো লাগল। জেদি গলায় বলল,

“কারণ চুক্তি করলেও অপমান সহ্য করতে পারি না।”

সারফরাজ ভ্রু কুঁচকে বলল,

“এলিনা আসাতে তোমার অপমান কোথায়?”

প্রিয়ান্তি এবার তাকাল সোজাসুজি। বলল,

“আপনার প্রাক্তন স্ত্রী, এই বাড়িতে ইচ্ছে মতো আসবে।

আপনি বলবেন তার অধিকার আছে। আপনাদের পরিবারের সবাই তাকে স্বাভাবিকভাবে নেবে। আর

আমি সেটা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখব? না আমি সেটা পারব না।”

সারফরাজ এবার গলা শক্ত করে বলল,

“পারতে হবে। কারণ এটা বাস্তব। আমার মেয়ের মা এই বাড়িতে আসবে। এটা নিয়ে আর একটা কথাও শুনব না।”

কথাটা এত ঠান্ডাভাবে বলল যে প্রিয়ান্তির মুখ সাদা হয়ে গেল।

সারফরাজ বুঝলো‌ সে বেশি কঠোর হয়ে গেছে।

কিন্তু কথা ফিরিয়ে নিলো না।

প্রিয়ান্তির চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ছে। সে মাথা নেড়ে বলল,

“বুঝেছি। আমি মানুষ না শুধু একটা দরকার।”

সে স্যুটকেস তুলে নিল। সারফরাজ তার হাত চেপে ধরল। চোখে বিরক্তি, গলায় নিয়ন্ত্রণ করা রাগ।

“এক কদমও বাইরে যাবে না। রাগ হয়েছে, ঘরে বসে রাগ করো। কিন্তু এই বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত কখনোই তোমার‌ একার নয়।”

*******************

প্রয়াণ বিছানায় আধশোয়া হয়ে আছে। এক হাত মাথার নিচে দেওয়া।

আর রাজন্যা তার পেটের ওপর বসে দিব্যি খেলছে।

কখনো বাবার শার্টের বোতাম নিয়ে টানছে, কখনো ছোট্ট আঙুল দিয়ে তার গাল টিপছিল।

মেয়েটার মুখে একটার পর একটা প্রশ্ন। একদম থামার কোনো নাম নেই।

তারপর গোল গোল চোখে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,

“পাপা… তুমিও আমার মতো দুট্টু ছিলে?”

প্রয়াণ হেসে বলল,

“অনেক দুষ্টু ছিলাম।”

রাজন্যা অবাক হয়ে গেল। মুখটা হাঁ হয়ে গেল।

“সতিই?”

প্রয়াণ মাথা নেড়ে বলল,

“হুম।”

রাজন্যা আবার জিজ্ঞেস করল,

“দাদ্দা তোমায় বততো?”

প্রয়াণ হেসে বলল,

“বকতো… কখনো মারতও।”

রাজন্না দুই হাত দিয়ে মুখ চেপে হেসে উঠল।

ওর হাসিটা পুরো ঘর ভরিয়ে দিল।

তারপর বাবার বুকের ওপর ঝুঁকে ছোট্ট গলায় বলল,

“তুমি কাঁদতা?”

প্রয়াণ মজা করে মুখ কুঁচকে বলল,

“অনেক কাঁদতাম।”

রাজন্না এবার একদম খুশি হয়ে বাবার গালে চাপড় দিল।

“তুমি বেবি ছিলা!”

প্রয়াণ হেসে মেয়েটাকে জড়িয়ে ধরল। একটা বড় চুমু খেল গালে।

রাজন্না খিলখিল করে হাসতেই প্রয়াণ পেটের কাছে কাতুকুতু দিল।

“এই দুষ্টু মেয়ে, পাপাকে নিয়ে এত হাসি?”

রাজন্না কুঁকড়ে গিয়ে হাত-পা ছুঁড়তে লাগল।

“নাআআ… নাআ… কাতুকু নাআ!”

তবু হাসি থামছে না। ছোট্ট শরীরটা বাবার বুকের ওপর লুটোপুটি খাচ্ছে।

প্রয়াণও অনেকদিন পর এভাবে হেসে উঠল।

মেয়েকে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে আবার কাতুকুতু দিল।

রাজন্না হাপাতে হাপাতে বলল,

“পাপা খারাপ… পাপা দুট্টু।”

#চলবে

(কালকের পর্বে থাকবে বিশাল বড়ো সারপ্রাইজ 🙂🙃। গল্প পড়ে মন্তব্য করেবেন এট্টু 🤌। রাজনীতি সম্পর্কে গভীর ধারণা নেই। ভুল-ত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।)

#রাজনীতির_রক্তচুক্তি

#পর্ব_২১

#লেখনীতে_নীলপ্রজাপতি

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২১তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন