ফন্ট সাইজ:
থিম:
রাজনীতির রক্তচুক্তি

২৯তম পর্ব

লেখক: নীলপ্রজাপতি

#সম্পর্কের_নতুন_সূচনা #রাজনীতির_রক্তচুক্তি

"আপনার মতো মানুষের সাথে দাঁড়িয়ে গল্প করার শখ আমার নেই।"

আদ্রিতার কথাটা শুনে আবরাজ কয়েক সেকেন্ড চুপ রইল। তারপর অদ্ভুতভাবে হেসে ফেলল।

"বেশ। কমপক্ষে এখন আর আমাকে দেখে চুপ হয়ে যাও না এটাই অনেক।"

আদ্রিতা ভুরু কুঁচকাল।

"মানে?"

আবরাজ ধীরে বলল,

"গত এক মাস তুমি আমার সাথে প্রয়োজন ছাড়া একটা কথাও বলতে না। আজ অন্তত ঝগড়া করছ। বেশ উন্নতি হয়েছে।"

আদ্রিতা কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর বলল,

"আপনার পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা দেখে আমি অভিভূত।"

আবরাজ বলল,

"ধন্যবাদ। তবে তোমার মুগ্ধ হওয়ার অভিনয়টা খুব একটা বিশ্বাসযোগ্য হলো না, লিটিল স্পার্ক।"

অবশেষে আবরাজ হাতটা ছেড়ে দিল। তারপর এক পা পিছিয়ে গিয়ে একদৃষ্টিতে আদ্রিতার দিকে তাকিয়ে রইল। মুখে সেই বিরক্তিকর, আত্মতুষ্ট হাসি।

"একটু সামনে তাকিয়ে হাঁটো, লিটিল স্পার্ক।"

আদ্রিতা ভুরু কুঁচকাল।

আবরাজ গম্ভীর হওয়ার ভান করে বলল,

"নাহলে আবার কে জানে কার বুকে গিয়ে ধাক্কা দেবে।"

সে নাটকীয়ভাবে নিজের বুকের দিকে তাকাল।

তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

"আর তারপর বেচারার হৃদস্পন্দনটাই না বেড়ে যায়।"

কথাটা আদ্রিতা এমনভাবে তাকাল যেন এই মুহূর্তে আশেপাশে কোনো ভারী ফুলদানি থাকলে সেটা সরাসরি আবরাজের মাথায় ছুড়ে মারত।

"আপনার বয়স কি উল্টো দিকে যাচ্ছে?"

আবরাজ ভুরু তুলল।

"মানে?"

"মানে আজকে আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে আপনি কলেজের ফার্স্ট ইয়ারে পড়া ছেলে।"

আবরাজ হেসে ফেলল।

"ওহ। তাহলে এখনও আকর্ষণীয় আছি।"

আদ্রিতার মাথার রগ টনটন করে উঠল।

"আপনি সত্যিই অসহ্য।"

"ধন্যবাদ।"

"আমি প্রশংসা করিনি।"

"তবুও ধন্যবাদ।"

আদ্রিতা কয়েক সেকেন্ড স্থির চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর বিরক্ত মুখে বলল,

"আপনার সাথে কথা বলা মানে দেয়ালের সাথে তর্ক করা।"

আবরাজ মাথা নেড়ে সম্মতি দিল। সে একটু ঝুঁকে এসে বলল,

"হুম। তবে পার্থক্য হলো, দেয়াল উত্তর দেয় না।"

আদ্রিতা সত্যিই আর দাঁড়াল না। ঘুরে দ্রুত হাঁটতে শুরু করল। পেছন থেকে আবরাজের কণ্ঠ ভেসে এলো,

"আর হ্যাঁ, সামনে তাকিয়ে হাঁটবে। প্রতিবার কিন্তু আমি ধরতে আসব না, লিটিল স্পার্ক।"

আদ্রিতা হাঁটতে হাঁটতেই দাঁত চেপে বলল,

"আল্লাহ, এই মানুষটাকে সহ্য করার জন্য আমায় আলাদা ধৈর্য দেওয়া উচিত ছিল।"

পেছনে দাঁড়িয়ে আবরাজ খান হেসে ফেলল। আর অনেকদিন পর, আদ্রিতার চোখে সেই পুরোনো বিরক্তি-মেশানো আগুনটা দেখে অদ্ভুতভাবে তার দিনটা একটু ভালো হয়ে গেলো।

রাত নেমেছে ইস্তাবুলের বুকে। দিনভর নির্বাচনের উত্তাপ, মানুষের কোলাহল আর রাজনৈতিক ব্যস্ততার পর শহরটা যেন ধীরে ধীরে অন্য এক রূপ ধারণ করেছে।

বসফরাসের কালো জলের ওপর হাজারো আলোর প্রতিফলন কাঁপছে। দূরে সেতুগুলো আলোর মালা পরে দাঁড়িয়ে আছে।

শহরটা পুরোপুরি ঘুমায় না। ইস্তাম্বুলের রাতেরও নিজস্ব জীবন আছে। কোথাও দেরি রাত পর্যন্ত খোলা ক্যাফে।

কোথাও রাজনীতি নিয়ে উত্তপ্ত আলোচনা চলছে।

কোথাও আবার মানুষ নতুন মেয়র, নতুন জেলা প্রশাসন আর আগামী দিনের হিসাব কষছে।

খান মহলের বিশাল কাঁচের জানালার ওপাশে পুরো শহরটা যেন তারাভরা আকাশের মতো ঝলমল করছে। ওই আলো-ঝলমলে শহরের দিকে তাকিয়েই নিজের স্টাডি রুমে দাঁড়িয়ে আছে আবরাজ খান। কানে ফোন দেওয়া। ফোনের ওপাশে সারফরাজ আহমেদ।

আবরাজ নিচু স্বরে বলল,

"কাল সকাল আটটার মধ্যে বের হব।"

ওপাশ থেকে সারফরাজের শান্ত কণ্ঠ ভেসে এলো,

"ফাতিহতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আগেই দেখে রেখেছি।"

আবরাজ জানালার বাইরে তাকাল। দূরে আলোয় ভাসছে শহর।

"নিরাপত্তা নিয়ে আমি চিন্তা করছি না। আমি মানুষের প্রতিক্রিয়া দেখতে চাই।"

সারফরাজ কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বলল,

"আরিন্দম চৌধুরীর জয়ের পর ওদিকের পরিবেশ পুরোপুরি আমাদের পক্ষে থাকবে না।"

আবরাজের ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটল।

"রাজনীতিতে সবাই তোমার পক্ষে থাকলে বুঝবে তুমি কিছুই পরিবর্তন করছো না। বিরোধিতা থাকা ভালো।

ওটা মানুষকে সতর্ক রাখে।"

বাইরে রাত আরও গভীর হচ্ছে। দূরে কোনো মসজিদের মিনার থেকে ভেসে এলো রাতের নরম সুর।

আর স্টাডি রুমের ম্লান আলোয় দাঁড়িয়ে আবরাজ খান আগামী দিনের হিসাব কষতে লাগল।

************

ঘরের ভেতর সোফার এক কোণে বসে আছে প্রিয়ান্তি।

মুখ ভীষণ গোমড়া করে।

বিয়ের আগে তার ধারণা ছিল, তার বর হবে ভীষণ হ্যান্ডসাম। স্মার্ট। রোমান্টিক। মাঝে মাঝে ফুল নিয়ে হাজির হবে।

কারণ ছাড়াই বলবে,

"আজ তোমাকে খুব সুন্দর লাগছে।"

রাতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে গল্প করবে। হাত ধরে হাঁটবে।

সিনেমার নায়কদের মতো দুই-চারটা মিষ্টি কথাও বলবে।

কিন্তু বাস্তবে তার কপালে জুটেছে, একজন কাঠখোট্টা রাজনীতিবিদ।

সকালে রাজনীতি। দুপুরে রাজনীতি। বিকেলে মিটিং।

রাতে ফোনকল। আর মাঝখানে সময় পেলে তাকে খেপানো।

প্রিয়ান্তি দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

"আল্লাহ... এটা কি সংসার?"

ঠিক তখনই দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল সারফরাজ।

কোট খুলতে খুলতে বলল,

"এভাবে বসে আছো কেন?"

প্রিয়ান্তি তাকালই না।

"কীভাবে?"

"মনে হচ্ছে কেউ তোমার প্রিয় বিড়াল চুরি করে নিয়ে গেছে।"

প্রিয়ান্তি এবার তাকিয়ে বলল,

"আমার বিড়ালই নেই।"

"তাই নাকি?"

"হুম।"

"তাহলে সমস্যা কী?"

প্রিয়ান্তি কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর বিড়বিড় করে বলল,

"আমার ভাগ্যটাই সমস্যা।"

সারফরাজ ভুরু তুলল।

"আচ্ছা?"

"হ্যাঁ।"

"কেন?"

প্রিয়ান্তি নাটকীয়ভাবে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

"আমি ভেবেছিলাম আমার বর খুব রোমান্টিক হবে।"

"কিন্তু আপনি তো..."

সে মাথা থেকে পা পর্যন্ত সারফরাজকে দেখে বলল,

"একটা হাঁটতে-চলতে থাকা রাজনৈতিক দল।"

সারফরাজ হেসে ফেলল। বলল,

"এটা নতুন অপমান।"

"অপমান না।"

"তাহলে?"

"বাস্তবতা।"

সারফরাজ টাই আলগা করতে করতে বলল,

"আমি কী করলাম আবার?"

প্রিয়ান্তি সঙ্গে সঙ্গে শুরু করল,

"আপনি মিষ্টি কথা বলেন না। রোমান্টিক না। রাগ ভাঙাতে জানান না। ফুল দেন না। গান শোনান না। ঘুরতে নিয়ে যান না। হুটহাট সারপ্রাইজ দেন না। উল্টে সারাদিন ফোনে দেশের সমস্যা সমাধান করেন।"

সারফরাজ চুপচাপ শুনল। তারপর খুব গম্ভীর মুখে বলল,

"তাহলে অবস্থা গুরুতর।"

প্রিয়ান্তি মাথা নেড়ে বলল,

"খুব গুরুতর।"

"হুম।"

"সমাধান?"

প্রিয়ান্তি ভেবেছিল লোকটা হয়তো কিছু একটা বলবে।

কিন্তু সারফরাজ একদম গম্ভীর মুখে বলল,

"আগামী সংসদ অধিবেশনে বিষয়টা উত্থাপন করতে হবে।"

প্রিয়ান্তি কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে রইল। তারপর বালিশটা তুলে ছুঁড়ে মারল সারফরাজের দিকে।

"আপনাকে দিয়ে কিছু হবে না!"

সারফরাজ সহজেই বালিশটা ধরে ফেলল। মুখে চাপা হাসি। আর মনে মনে ভাবল, এই মেয়েটা আসার পর থেকে তার জীবনটা সত্যিই আগের মতো নেই। অনেক বেশি শব্দ হয়েছে। অনেক বেশি ঝামেলা হয়েছে।কিন্তু অদ্ভুতভাবে তার জীবনে অনেক বেশি প্রাণও এসেছে।

বিয়ের পর প্রিয়ান্তির মুখের পটর পটর করা আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, খান মহলে থাকাকালীনও মেয়েটা এতটা খোলামেলা ছিল না। ওই বাড়িটা ছিল তার নিজের বাড়ি। নিজের পরিবার। নিজের মানুষ।

তবুও সে অনেক কথা চেপে রাখত।

কারণ ছোটবেলা থেকে তার জীবনে একটা জিনিসই বেশি হয়েছে। অন্যের সিদ্ধান্ত।

কী পড়বে। কোথায় যাবে। কী করবে। সবকিছু কেউ না কেউ ঠিক করে দিয়েছে। ফলে নিজের মতামত প্রকাশ করার অভ্যাসটাই খুব একটা তৈরি হয়নি।

কিন্তু এখন ধীরে ধীরে যেন বদলাচ্ছে সে।

আর সবচেয়ে অবাক করার বিষয়,

এই পরিবর্তনের বড় কারণ সম্ভবত সারফরাজ আহমেদ। কারণ লোকটা তাকে থামায় না। বকে না।

চুপ করিয়ে দেয় না। বরং উল্টে তার অবান্তর কথাগুলোও শোনে। আর তাকে খেপায়।

তাই হয়তো প্রিয়ান্তিও অজান্তে অনেক বেশি প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে।

ঠিক যেমন এখন সোফার ওপর পা গুটিয়ে বসে সে হঠাৎ বলল,

"মিস্টার এমপি?"

সারফরাজ ফাইল থেকে চোখ না তুলেই বলল,

"হুম?"

"আপনার সাথে ওই ডাইনিটার ডিভোর্স কেন হয়েছিল?"

ঘরের বাতাস এক মুহূর্তে থমকে গেল। সারফরাজের হাতের পাতা থেমে গেল। ফাইলের পৃষ্ঠা আর উল্টানো হলো না। প্রিয়ান্তি প্রথমে বুঝতেই পারল না কী হয়েছে।

সে স্বাভাবিক গলায় আবার বলল,

"মানে আমি জাস্ট জানতে চাচ্ছি, এত বড়োওওওও লাভ ম্যারেজ ছিল না? তাহলে.....

"প্রিয়ান্তি।"

প্রিয়ান্তি কথা শেষ করার আগেই সারফরাজ মাথা তুলে শান্ত কন্ঠে বলল।

প্রিয়ান্তি থেমে গেল। সারফরাজ কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে বলল,

"সব প্রশ্নের উত্তর জানা জরুরি না।"

প্রিয়ান্তি ভুরু কুঁচকাল।

"মানে?"

সারফরাজ বলল,

"মানে কিছু গল্প শেষ হয়ে যায়। সেই গুলোকে শেষ হয়েই থাকতে দেওয়া ভালো।"

প্রিয়ান্তি এবার একটু চুপ হয়ে গেল। তার চুপ থাকায়

ঘরটা কিছুক্ষণ নীরব রইল।

তারপর সারফরাজ নিজেই বিষয়টা হালকা করার জন্য বলল,

"আর একটা কথা।"

"কি?"

"ডাইনি বলাটা বন্ধ করো।"

প্রিয়ান্তি সঙ্গে সঙ্গে বলল,

"কেন?”

সারফরাজ উওর দিল,

"কারণ এটা ভদ্রতা না।"

"ও আচ্ছা।"

"হুম।"

প্রিয়ান্তি বলল,

"তাহলে আমি কী বলব?"

সারফরাজ সন্দেহভরা চোখে তাকাল। প্রিয়ান্তি কয়েক সেকেন্ড ভেবে বলল,

"প্রাক্তন ডাইনি?"

এক সেকেন্ডে,‌ দুই সেকেন্ড, তিন সেকেন্ডে।

তারপর সারফরাজ কপালে হাত দিয়ে চোখ বন্ধ করল।

আর প্রিয়ান্তি বিজয়ীর হাসি হাসল।

কারণ সে নিশ্চিত, এই পৃথিবীতে যদি কেউ একজন সংসদ সদস্যকে নিয়মিত হার্ট অ্যাটাকের কাছাকাছি নিয়ে যেতে পারে, তাহলে সেই মানুষটা সে-ই।

প্রিয়ান্তি বেশিক্ষণ চুপ থাকতে পারলো না। সে সোজা হয়ে বসে বলল,

"আচ্ছা, আপনি তো লাভ ম্যারেজ করেছিলেন। তারমানে আপনি ওই ডাইনি... সরি, প্রাক্তন ডাইনিটাকে ফুল দিতেন?"

সারফরাজ শান্ত গলায় বলল,

"না।"

প্রিয়ান্তি থমকে গেল।

"হোয়াই?"

সারফরাজ উওরে বলল,

"কারণ ও ফুল পছন্দ করত না।"

প্রিয়ান্তির চোখ গোল হয়ে গেল।

"কি!! এই পৃথিবীতে এমনও মেয়ে আছে যে ফুল পছন্দ করে না? আমাকে যদি কেউ জন্মদিনে একশোটা ফুল দেয়, তাহলে আমি তাকে জীবনের সেরা মানুষ ঘোষণা করব।”

সারফরাজ বলল,

“তোমরা মেয়েরা অদ্ভুত।”

প্রিয়ান্তি বলল,

“অদ্ভুত আপনি! আপনি জানেন ফুল হলো ভালোবাসার আরেকটা প্রতীক। ওগুলোর মিষ্টি সুবাস থাকে। সৌন্দর্য থাকে। অনুভূতি থাকে। ফুল মানেই স্পেশাল।"

সে কথাগুলো এতটাই স্বাভাবিকভাবে বলল যেন পৃথিবীর সবচেয়ে সহজ সত্যিটাই বলছে। যেন সবাই এটা জানে। যেন ফুল মানেই ভালোবাসা, এ নিয়ে কারও দ্বিমত থাকার কথা না।

সারফরাজ কিছুক্ষণ চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর অদ্ভুতভাবে নিজের অতীতটা মনে করার চেষ্টা করল। সে কি কখনও কাউকে ফুল দিয়েছে?

বারবার ভেবে দেখার পরও একটাই উওর আসলো, না‌, কখনোই দেয়নি।

কারণ এলিনা কখনও ফুল চায়নি। কখনও এমন অনুভূতির কথা বলেনি। দামী গয়না, ব্র্যান্ডেড জিনিস।

বিদেশ ভ্রমণ, বিলাসবহুল জীবন এসব নিয়ে কথা হতো তাদের।

কিন্তু ফুল?

না। কখনও না। তাই হয়তো ফুল দেওয়ার প্রয়োজনও তার জীবনে কখনও আসেনি।

অথচ প্রিয়ান্তি এমনভাবে বলছে যেন ফুল ছাড়া ভালোবাসার প্রকাশই অসম্পূর্ণ।

আবার কিছু একটা মনে পড়তেই সে বলল,

“আচ্ছা, আপনার বয়স কত?”

সারফরাজ বলল,

“বত্রিশ।"

প্রিয়ান্তি বলল,

“অনেক কম বয়সে বিয়ে করেছিলেন।"

সারফরাজ মাথা নেড়ে বলল,

“হুম। পঁচিশ বছর বয়সে বিয়ে করেছিলাম। তারপর সৃজা হলো। আর ডিভোর্স হলো যখন সৃজার বয়স তিন বছর।"

প্রিয়ান্তি চুপচাপ শুনল। তারপর বলল,

"অর্থাৎ প্রায় দুই বছর হয়ে গেছে আপনাদের ডিভোর্সের?"

সারফরাজ সংক্ষিপ্তভাবে মাথা নাড়ল। প্রিয়ান্তি সোফায় একটু এগিয়ে বসল। চোখ দুটো কৌতূহলে চকচক করছে।

"আচ্ছা।"

সারফরাজের কপালে ভাঁজ পড়ল। এই "আচ্ছা" শব্দটা তার অভিজ্ঞতা অনুযায়ী সাধারণত বিপদের পূর্বাভাস।

প্রিয়ান্তি একদম স্বাভাবিক গলায় জিজ্ঞেস করল,

"এই দুই বছরে আপনার জীবনে অন্য কেউ আসেনি?"

সারফরাজ স্থির চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর ধীরে বলল,

"না।"

প্রিয়ান্তি অবাক হয়ে গেল। বলল,

"একজনও না?"

সারফরাজ বলল,

"না।"

প্রিয়ান্তি বলল,

"কোনো ক্রাশ?"

"না।"

"কোনো পছন্দ?"

"না।"

"কোনো গোপন প্রেম?"

"না।"

"কোনো....।"

শেষ করার আগেই সারফরাজ বলল,

"প্রিয়ান্তি, তুমি কি পুলিশি জেরা করছ?"

প্রিয়ান্তি সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ল।

"না। আমি অবাক হচ্ছি।"

সারফরাজ তাকালো।

প্রিয়ান্তি একদম সৎভাবে বলল,

"আপনি দেখতে খারাপ না। টাকা আছে। ক্ষমতা আছে। আপনি এমপি। উপরন্তু লম্বাও। তাহলে কেউ পছন্দ করেনি আপনাকে?"

সারফরাজ কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।

তারপর শুকনো গলায় বলল,

"তুমি প্রশংসা করছ নাকি অপমান করছ, আমি নিশ্চিত না।"

প্রিয়ান্তি গম্ভীর মুখে বলল,

"আমিও না।"

কথাটা শেষ হতেই সারফরাজ আর দেরি করল না। সে এগিয়ে এসে বলল,

“ঘুমাবে চলো।”

প্রিয়ান্তি বলল,

“ঘুম পায়নি আমার।”

সারফরাজ বলল,

“ঘুম না পেলেও ঘুমাতে হবে। ওঠো।"

সারফরাজ তাকে ওঠানোর জন্য হাত বাড়িয়ে দিলো। প্রিয়ান্তি একেবারে বাচ্চাদের মতো সোফার হাতল জড়িয়ে ধরে বসে রইল।

পরের মুহূর্তেই সারফরাজ এমন একটা কাজ করল যা প্রিয়ান্তি একদমই আশা করেনি।‌ সারফরাজ দুহাতে তাকে তুলে নিল। প্রিয়ান্তি হতবাক।

"আরে! মিস্টার এমপি! এইটা কি করছেন?"

সে সঙ্গে সঙ্গে হাত-পা ছুঁড়তে শুরু করল।

"আমাকে নামান!"

সারফরাজ উওরে বলল,

"নামাব না।"

সারফরাজ একদম শান্ত মুখে তাকে নিয়ে বিছানার দিকে হাঁটতে লাগল।

প্রিয়ান্তি গজগজ করছে। বকবক করছে। প্রতিবাদ করছে। কিন্তু তাতে সারফরাজের কোনো পরিবর্তন নেই।

সারফরাজ ঘরের লাইটটা নিভিয়ে দিলো। কিছুক্ষণ চুপচাপ শুয়ে থাকার পর প্রিয়ান্তি ধীরে বলল,

"মিস্টার এমপি।"

কোনো উত্তর নেই।

সে আবার ডাকল,

"মিস্টার এমপি?"

তবুও নীরবতা। প্রিয়ান্তি ভেবেই নিল লোকটা বোধহয় ঘুমিয়ে পড়েছে।

ঠিক তখনই পাশ থেকে শান্ত একটা কণ্ঠ ভেসে এলো।

"এত রাতে এমপিকে ডাকলে কিন্তু এমপি অন্য কিছু ভেবে নিতে পারে।"

প্রিয়ান্তি কিছু বলার আগেই সারফরাজের হাত তার কোমর জড়িয়ে ধরল। টেনে নিলো নিজের বুকে।প্রিয়ান্তি স্থির হয়ে গেল। ভেতরের হৃদস্পন্দনের শব্দটা যেন নিজের কানে শুনতে পাচ্ছে। সারফরাজের গরম নিঃশ্বাস পড়ছে প্রিয়ান্তির মুখে।

সারফারাজ নীচু কন্ঠে বলল,

“ঘুমিয়ে যাও, মাই বাটারফ্লাই।”

**********

খান মহল। গভীর রাত। পুরো প্রাসাদটাই প্রায় নিস্তব্ধ।

দূরে কোথাও কোনো বডিগার্ডদের পায়ের শব্দ ভেসে আসছে।

দ্বিতীয় তলার বিশাল ঘরটার ভেতর আধো অন্ধকার।

বিছানার এক পাশে শুয়ে আছে আদ্রিতা। অন্য পাশে আবরাজ খান। মাঝখানে যথেষ্ট দূরত্ব রয়েছে।

হঠাৎ আবরাজ নিচু গলায় ডাকল,

"লিটিল স্পার্ক‌‌।"

আদ্রিতা চোখ বন্ধ রেখেই বলল,

"কি?"

আবরাজ ভুরু তুলল।

"তুমি জেগে আছো?"

"না।"

আবরাজ বলল,

"তাহলে উত্তর দিলে কে?"

আদ্রিতা বলল,

"আমার আত্মা।"

আবরাজের ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটল।

"আচ্ছা। তাহলে তোমার আত্মাকে একটা প্রশ্ন করি?"

আদ্রিতা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

"রাত দুইটায় আপনার প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মতো মানসিক শক্তি আমার নেই।”

আবরাজ বাঁকা হেসে বলল,

"এখন তো বললে আত্মা জেগে আছে।"

আদ্রিতা শান্ত গলায় বলল,

"সেটাও ঘুমাতে যাবে।"

আবরাজ এককথায় বলল,

"নিষ্ঠুর।"

আদ্রিতাও জবাবটা ফিরিয়ে দিলো,

"আপনার কাছ থেকেই শিখেছি।"

তারপর অন্ধকারের মধ্যে আবরাজ ধীরে বলল,

"তুমি আসলে ভীষণ স্বার্থপর, লিটিল স্পার্ক। নিজের ছাড়া আর কাউকে নিয়ে ভাবো না।"

আদ্রিতা এবার সরাসরি তার দিকে ফিরল। অন্ধকারে মুখ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু কণ্ঠস্বর ঠান্ডা। বলল,

"না ভাবাটাই স্বাভাবিক। আমার ভাইয়ের খুনির কথা আমি কেন ভাবব?"

মাস পেরিয়ে গেছে তবুও কথাটা এখনও ছুরির মতো ধারালো। আবরাজ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল,

"দেখলে? আবার নিজের জায়গায় ফিরে এলে।"

আদ্রিতা তীক্ষ্ণ গলায় বলল,

"সত্যি কথাটা শুনতে খারাপ লাগছে?"

আবরাজ বলল,

“না, তুমি শুধু নিজের দিকটাই দেখো।”

আদ্রিতা শান্ত কন্ঠে বলল,

“আপনি ভীষণ অদ্ভুত এক মানুষ। যে নিজেকে নিরপরাধ প্রমাণ করতে চান না। আবার দোষী বললেও আপত্তি করেন না।"

আবরাজ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

“একটা কথা বলো, যদি সময়কে পেছনে নেওয়া যেত আর সেই দিনটায় ফিরে যেতে পারতে, তাহলে তোমার ভাইকে কি বলতে?"

প্রশ্নটা শুনে আদ্রিতা থমকে গেল। তারপর খুব নিচু গলায় বলল,

"বাড়ি ফিরে যেতে বলতাম। সব ছেড়ে দিতে বলতাম।"

প্রতিশোধ না নিতে বলতাম।"

প্রথমবার তার কণ্ঠে রাগের বদলে ক্লান্তি শোনা গেল।

*************

কেমাল আরসালান ভীষণ ঝামেলা করছে জেলা ভিত্তিক ভোট নিয়ে। তার কথা অনুযায়ী যে সব এলাকায় NDP বেশি পরিমানে জিতেছে সেগুলো তার হওয়ার কথা ছিল। এই নিয়ে ইস্তাম্বুলের পরিবেশে বেশ বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।

নিজের ঘরে বসে রয়েছে কেমাল আরসালান। তার মেজাজ এমনিতেই খারাপ। তার ওপর ফোনে নতুন একটা ভয়েস নোট এসে পৌঁছেছে।

প্রেরক আবরাজ খান।

কেমালের কপালে ভাঁজ পড়ল। সে ভয়েস নোট চালু করল। শুনে তার শরীর কেঁপে উঠলো। সে যদি আবরাজ কে সামনে পেতো তাহলে বোধহয় গলা টি*পে মে*রে ফেলতো। এই ভয়েস নোটটা হলো সেই যে মেয়েটির সাথে রে/প হয়েছিল সেই ব্যাপারে কেমাল আরসালান আর ওই নেতাটার কথোপকথন।

এরপর আরো একটি ভয়েস নোট। যেটায় আবরাজের ঠান্ডা কন্ঠস্বর ভেসে এলো,

”বেশি বাড়াবাড়ি করবেন না, মিস্টার আরসালান। তাহলে এই ভয়েস নোটটা প্রকাশ পেতে খুব বেশি সময় লাগবে না। আর একটা কথা মনে রাখবেন, রাজনীতিতে ক্ষমতা চিরস্থায়ী না। তবে এই মুহূর্তে ক্ষমতার চাবিটা আমার হাতেই আছে।”

ভয়েস নোটটা শেষ হতেই ঘরটা নিস্তব্ধ হয়ে গেলো। কেমাল কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে বসে রইল। তারপর ধীরে ফোনটা টেবিলে রাখল।

“অভিশাপ।”

সে জানে আবরাজ সরাসরি আঘাত করে না। সে আগে চারপাশের সব দরজা বন্ধ করে দেয়। তারপর প্রতিপক্ষকে বুঝতে দেয়, আর পালানোর রাস্তা নেই।

কেমাল দাঁত চেপে বলল,

"তুমি ভাবছ খেলা শেষ? না, আবরাজ খান। খেলা এবার শুরু।"

তার চোখ ধীরে ধীরে সরু হয়ে এল। হয়তো নির্বাচনে সে হারেছে। হয়তো এই রাউন্ডে আবরাজ এগিয়ে আছে।কিন্তু রাজনীতি কখনও এক দিনের যুদ্ধ না। এটা খুব দীর্ঘ খেলা।

আর সেই মুহূর্তেই তার মাথায় নতুন একটা পরিকল্পনার বীজ জন্ম নিল। তার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটল।

"যদি আবরাজকে হারাতে হয়, তাহলে সরাসরি আবরাজকে আঘাত করা যাবে না। বরং তার সবচেয়ে শক্তিশালী মানুষদের দুর্বল করতে হবে আগে।"

সেই তালিকায় প্রথমেই নাম আসে সারফরাজ আহমেদ। কেমালের ঠোঁটের কোণে এক অস্বস্তিকর হাসি ফুটে উঠল। ফিসফিস করে বলল,

"আবার এমন চাল চালব, যাতে সারফরাজ শুধু রাজনৈতিকভাবে না, নিজের জীবনেও আবার শূন্য হয়ে যায়।"

কথাটা বলেই তার চোখের সামনে ভেসে উঠল দুই বছর আগের একটা দৃশ্য। ভেতরে থেকে সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত এক সারফরাজ। এলিনার সাথে ডিভোর্সের পরের সেই সময়টায় সারফরাজ নিজের কাজের মধ্যে ডুবে ছিল।সংসদ, সভা, মিটিং, ফাইল, আইন সবকিছুর আড়ালে সে নিজের ব্যক্তিগত জীবনের ধ্বংসস্তূপ লুকিয়ে রেখেছিল।

কেমাল সেই দৃশ্য দেখেছিল। আর আজও ভুলে যায়নি।

ধীরে ধীরে তার চোখ সরু হয়ে এল।

"একবার সারফরাজের জীবন থেকে একটা অধ্যায় শেষ করেছিলাম আমি। এবারেও করবো।"

তার মনে ভেসে উঠল আরেকটা মুখ। প্রিয়ান্তি খান।

কিছুদিন আগেও যার অস্তিত্ব রাজনৈতিক হিসাবের মধ্যে ছিল না। কিন্তু এখন সারফরাজের জীবনে মেয়েটার গুরুত্ব বাড়ছে। আর একজন কৌশলী রাজনীতিবিদের চোখে এমন পরিবর্তন এড়িয়ে যায় না।

কেমাল নিচু স্বরে বলল,

"মানুষের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ক্ষমতা না। তা হলো আবেগ। যাকে হারানোর ভয় থাকে, সেই মানুষটাই দুর্বলতা হয়ে যায়।"

কেমাল বাঁকা হেসে বলল,

“এমন চাল চলবো,যাতে একডিলে দুই পাখি মারা যায়। অর্থাৎ সারফরাজ আর আবরাজ দুজনের জীবনেই কালো অধ্যায় নেমে আসবে।”

#চলবে

(আপনারা একটু রেসপন্স করবেন একটু সুন্দর মন্তব্য করবেন। নেক্সট পার্ট কালকেই দেবো তাই নেক্সট কমেন্ট করবেন না 🌚 গঠনমূলক মন্তব্য করুন। আমার ভুল ঠিক ধরিয়ে দিন। গল্প বোরিং লাগছে নাকি ইন্টারেস্টিং লাগছে সেটাও বলুন।)

#পর্ব_২৯

#লেখনীতে_নীলপ্রজাপতি

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২৯তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন