ফন্ট সাইজ:
থিম:
রাজনীতির রক্তচুক্তি

৪৭তম পর্ব

লেখক: নীলপ্রজাপতি

#সম্পর্কের_নতুন_সূচনা #রাজনীতির_রক্তচুক্তি

আফসানা খান বিস্ময়ে ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন। আদ্রিতাও আবরাজের দিকে তাকিয়ে। তার চোখে স্পষ্ট বিস্ময়। কারণ সে ভেবেছিল আবরাজ হয়তো সাহায্য করবে। দায়িত্ব পালন করেবে। কিন্তু এত সহজে, এত স্বাভাবিকভাবে নিজের নামের পরিচয় দিয়ে দেবে, এটা সে কল্পনাও করেনি।

রাত প্রায় এগারোটা। আবরাজ ফ্রেশ হয়ে শুয়ে পড়েছে। পাশেই আদ্রিতা শুয়ে আছে। এবং তার পাশে ছোট্ট শিশুটি ঘুমিয়ে আছে। সে ছোট যে বড় বালিশের পাশেও তাকে আরও ছোট দেখাচ্ছে।

আবরাজ নীচু গলায় বলল,

“লিটল স্পার্ক, আজ তুমি আমার পুরো জীবনের হিসাবটাই ওলটপালট করে দিয়েছ।”

আদ্রিতা শিশুটার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে আস্তে বলল,

“আপনার খারাপ লাগছে, তাই না?”

আবরাজ সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ল।

“না।”

সে ধীরে ধীরে উঠে বসে পড়ল। তার চোখ শিশুটার ওপর গেলো। বলল,

“খারাপ লাগছে না। শুধু ভাবছি, তোমার মধ্যে ঠিক কতটা ক্ষমতা আছে।”

আদ্রিতা ভ্রু কুঁচকে বলল,

“মানে?”

আবরাজ হালকা হেসে মাথা নাড়ল। বলল,

“আজকের আগে আমি নিশ্চিত ছিলাম তোমার মধ্যে দয়া-মায়া বলে কিছু নেই। শুধু জেদ আছে। রাগ আছে। তর্ক আছে। “কিন্তু আজ বুঝলাম আমি ভুল ছিলাম।”

তার কন্ঠস্বর একদম শান্ত।

“মেয়েটা তোমার রক্তের সম্পর্কের না। তুমি তাকে চিনতেও না। আজ সকালে পর্যন্ত তার অস্তিত্বও জানতে না। তবু তুমি তার জন্য পুরো পৃথিবীর সঙ্গে লড়ে গেলে।”

আদ্রিতা চুপ করে রইল। আবরাজ আবার বলল,

“আমি হাসপাতালে তোমার মুখটা দেখছিলাম, যখন তুমি ওকে কোলে নিয়েছিলে, তখন মনে হচ্ছিল তুমি পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান জিনিসটা ধরে আছ।”

আদ্রিতার চোখ ধীরে শিশুটার দিকে চলে গেল। তার ঠোঁটে অজান্তেই একটা হাসি ফুটল। সে ফিসফিস করে বলল,

“ও তো মূল্যবানই। খুব মূল্যবান।”

আবরাজ মৃদু হেসে বলল,

“এক মাসের চুক্তি করতে গিয়ে দেখছি, আমি সরাসরি বাবা হয়ে গেলাম।”

আদ্রিতা অনিচ্ছা সত্ত্বেও হেসে ফেলল।

আবরাজ একটু ঝুঁকে এলো শিশুটার দিকে। আবরাজ খুব আস্তে শিশুটার ছোট্ট হাতের কাছে আঙুল রাখল।শিশুটি ঘুমের মধ্যেই নড়ে উঠল। তার ক্ষুদ্র আঙুলগুলো অজান্তেই আবরাজের তর্জনী আঁকড়ে ধরল। আবরাজ খুব নিচু স্বরে ফিসফিস করে বলল,

“আমার মেয়ে তুমি। শুধু আমার সন্তান। তুমি জানো, ছোট্ট বেবি, তোমার মা তোমার জন্য পুরো সমাজের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে গেছে।”

আদ্রিতা স্থির হয়ে তাকিয়ে আছে।

আবরাজ আবার শিশুটার দিকে তাকিয়ে বলল,

“আর তোমার বাবা তোমাকে কথা দিচ্ছে, তোমার জীবনে কোনো কষ্ট ইচ্ছে করে আসতে দেব না। কেউ তোমাকে অবাঞ্ছিত বলবে না। কেউ তোমাকে বোঝা বলবে না।”

তার কণ্ঠ আরও নরম হয়ে এলো।

“এই পৃথিবীতে তোমার আসাটা অনেক কষ্ট নিয়ে হয়েছে। কিন্তু তোমর ভবিষ্যত সম্পূর্ণ আলোয় ভরা হবে।”

কী অদ্ভুত এক দৃশ্য। আবরাজ খানের মতো মানুষ একটা কয়েক ঘণ্টার শিশুর সঙ্গে কথা বলছে। আবরাজ হালকা ভাবে তার গায়ে হাত দিয়ে বলল,

“তোমার পরিবারে তোমায় স্বাগতম, ছোট্ট রাজকুমারী।”

কিছুক্ষণ পর আদ্রিতা উঠে বসল। আবরাজ তাকালো তার দিকে। আবরাজ কিছু বলার‌ আগেই আদ্রিতা তাকে জড়িয়ে ধরে বলল,

“ধন্যবাদ আপনাকে, আবরাজ। আমার কথা রাখার জন্য।”

আবরাজ একদম স্থির হয়ে গেল।‌ মুহূর্তের জন্য সে যেন বুঝতেই পারল না কী হয়েছে। সকাল থেকে তার সঙ্গে অনেক অদ্ভুত ঘটনা ঘটছে। কিন্তু এটা একদমই অপ্রত্যাশিত ছিল। আদ্রিতার মাথাটা এসে ঠেকেছে তার বুকে। আর আবরাজ স্পষ্ট অনুভব করল, নিজের হার্টবিট অস্বাভাবিক দ্রুত হয়ে গেছে।

সে নিচের দিকে তাকাল। আদ্রিতা চোখ বন্ধ করে আছে। তার মুখে শান্তির ছাপ।

আদ্রিতা আস্তে বলল,

“আমি ভীষণ খুশি আজ, আবরাজ। ভীষণ। আমি আপনাকে কথা দিলাম, এর বিনিময়ে আপনি যা চাইবেন, আমি অবশ্যই দেওয়ার চেষ্টা করব।”

আবরাজ কয়েক সেকেন্ড কোনো উত্তর দিল না। তারপর ধীরে ধীরে এক হাত তুলে আদ্রিতার মাথার ওপর রাখল। চুলে আলতো হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,

“লিটল স্পার্ক, আজকের পরও তুমি মনে করো আমি কোনো বিনিময়ের জন্য এটা করেছি?”

আদ্রিতা চুপ করে রইল। তারপর ধীরে ধীরে আবরাজের কাছ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিল। কয়েক সেকেন্ড শিশুটার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর খুব সাবধানে তাকে কোলে তুলে নিল। ছোট্ট মেয়েটা তখনও নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে।

আদ্রিতা হালকা হাসল। তারপর শিশুটাকে আবরাজের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,

“নিন, একবার আপনি নিন ওকে।”

আবরাজ সঙ্গে সঙ্গে মাথা নেড়ে বলল ,

“না না না। আমি পারব না।”

আদ্রিতা ভ্রু তুলে বলল,

“কেন?”

আবরাজ শিশুটার দিকে এমনভাবে তাকাল যেন পৃথিবীর সবচেয়ে ভঙ্গুর জিনিস তার সামনে। বলল,

“ও অনেক ছোট, লিটল স্পার্ক। প্লিজ। তুমি ধরো।”

আদ্রিতা এবার সত্যিই হেসে ফেলল। বলল,

“ইস্তাম্বুল সামলাতে পারেন, আর একটা বাচ্চা সামলাতে পারবেন না?”

আবরাজ গম্ভীর মুখে বলল,

“ইস্তাম্বুল অন্তত আমার হাত থেকে পড়ে যাবে না।”

“কিন্তু ও...”

কথাটা শেষ করতে পারল না। তার আগেই আদ্রিতা অত্যন্ত সাবধানে শিশুটাকে তার হাতে তুলে দিল।

আর কোলে নেওয়ার সাথে সাথেই আবরাজের বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা অনুভূতি হলো। এমন অনুভূতি সে আগে কখনো পায়নি। তার বাহুর মধ্যে একটা ক্ষুদ্র জীবন। আবরাজ কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে খুব আস্তে বলল,

“এত ছোট মানুষও হয়।”

আবরাজ আবার শিশুটার দিকে তাকাল। তার মনে হলো, আজ সকাল পর্যন্ত এই শিশুটার অস্তিত্ব সম্পর্কে সে কিছুই জানত না। আর এখন সে মেয়েটার বাবা। সে খুব আস্তে শিশুটার কপালের কাছে মুখ নামিয়ে ফিসফিস করে বলল,

“তুমি জানো পুচকি, আজ সকালেও আমি ভাবিনি আমার একটা মেয়ে হবে।”

এর মধ্যে কেটে গেছে প্রায় পাঁচ-ছয় দিন। খান মহলের পরিবেশটাও যেন একটু একটু করে বদলে গেছে। প্রথম দিন যে শিশুটাকে নিয়ে এত প্রশ্ন, এত আপত্তি ছিল, এখন সেই ছোট্ট মেয়েটাকেই ঘিরে বাড়ির অর্ধেক আলোচনা।

আদ্রিতা ধীরে ধীরে শিখছে। কীভাবে শিশুকে কোলে নিতে হয়। কীভাবে দুধ খাওয়ানোর পর কাঁধে নিয়ে শান্ত করতে হয়। কীভাবে কান্নার কারণ বুঝতে হয়। তবে এখনও সে নতুন। অনেক কিছুই জানে না।

তাই রাহি সবচেয়ে বেশি সাহায্য করছে। নবজাতক শিশুকে সামলানোর অভিজ্ঞতা তার আছে। আদ্রিতা কলেজে থাকলে বেশিরভাগ সময় সে বাচ্চাটাকে সামলে‌ রাখে। রাজন্যা তো ছোট বোন পেয়ে খুশিতে আত্মহারা। প্রতিদিন কয়েকবার করে এসে দেখে যায় তার হিসাব নেই।

সবচেয়ে অদ্ভুত পরিবর্তনটা বোধহয় আবরাজের মধ্যেই এসেছে। এক সপ্তাহ আগেও যে মানুষটা দিনে ষোলো ঘণ্টা কাজ করত, এখন বাড়ি ফিরেই প্রথম প্রশ্ন করে,

“অদ্রিজা কোথায়? লিটল স্পার্ক! আমার মেয়ে কোথায়?”

সবচেয়ে অদ্ভুত পরিবর্তনটা বোধহয় আবরাজের মধ্যেই এসেছে। এক সপ্তাহ আগেও যে মানুষটা দিনে ষোলো ঘণ্টা কাজ করত, এখন বাড়ি ফিরেই প্রথম প্রশ্ন করে,

“অদ্রিজা কোথায়?”

অদ্রিজা নামটা আবরাজ নিজেই রেখেছে। কেন রেখেছে, সেটা কাউকে বলেনি। কেউ জিজ্ঞেস করলেও শুধু বলেছে,

“নামটা আমার ভালো লেগেছে।”

কিন্তু আদ্রিতা বুঝেছে। হয়তো অন্য কেউ খেয়াল করেনি। কিন্তু সে করেছে।

অদ্রিজা নামের মধ্যে কোথাও যেন আদ্রিতার নিজের নামের প্রতিধ্বনি লুকিয়ে আছে। আবরাজ কখনো স্বীকার করবে না। হয়তো কোনোদিনও না।

তবু আদ্রিতা জানে, এটা একদমই কাকতালীয় নয়।

এক মাসের সেই চুক্তির কথাও যেন এখন আর কেউ মনে রাখে না। কয়েক সপ্তাহ আগেও যে বিষয়টা নিয়ে তাদের মধ্যে অনেক আলোচনা ছিল। আজকাল সেটার হিসাবই যেন হারিয়ে গেছে।

কারণ জীবনে এমন কিছু ঘটনা আসে, যেগুলো সব হিসাব-নিকাশ এলোমেলো করে দেয়। অদ্রিজা যেন ঠিক তেমনই একটা মাধ্যম।

আদ্রিতা আবরাজকে দেখে যখন অদ্রিজাকে কোলে নিয়ে সে গল্প করে। কখনো তার ছোট্ট হাত ধরে ত

থাকে। কখনো আবার কপালে আলতো চুমু খায়।

তখন আদ্রিতার মনে পড়ে যায়, প্রথম দিনের সেই মানুষটাকে। যার সঙ্গে তার বিয়েটা হয়েছিল একটা চুক্তির কারণে। যে মানুষটা অনুভূতির চেয়ে দায়িত্বে বেশি বিশ্বাস করত। যে মানুষটার চোখে সবকিছু ছিল শক্ত, হিসেবি আর নিয়ন্ত্রিত।

আর আজ সেই মানুষটাই রাত জেগে থাকে যদি অদ্রিজা একটু বেশি কেঁদে ফেলে। কাজের মাঝখান থেকে ফোন করে খবর নেয়। বাড়ি ফিরেই মেয়েকে খোঁজে।

আদ্রিতা নিজের চোখে আবরাজের পরিবর্তন দেখেছে।প্রতিদিন একটু একটু করে বদলাতে দেখছে। ‌কেউ অভিনয় করে এতটা বদলাতে পারে না। কেউ শুধু কোনো চুক্তি জেতার জন্য এমন হয় না।

অদ্রিজা শুধু একটা শিশু হয়ে আসেনি। হয়তো সে এসেছে দুটো জেদি মানুষের মাঝখানের দূরত্বটা কমাতে। যে কথাগুলো তারা বলতে পারে না, যে অনুভূতিগুলো স্বীকার করতে চায় না সেগুলোর মাঝখানে নীরব একটা সেতু হয়ে।

আবরাজ খানের জন্য আদ্রিতার মনে কিছু একটা আছে। কিছু একটা, যা শুধুই রাগ না। শুধুই বিরক্তি না। এমন একটা সত্য অস্বীকার করা কঠিন। আর হয়তো সেই কারণেই, আবরাজের বদলে যাওয়া তাকে অদ্ভুতভাবে শান্তি দেয়।

__________________***************_______________

~ আহমেদ ম্যানশন ~

সময় ধীরে ধীরে প্রিয়ান্তি সৃজার জীবনটাকে রঙিন করে তুলেছে। সারফরাজ সন্ধ্যের মধ্যে ফিরে এসেছে।

ঘরে ঢুকে দেখল প্রিয়ান্তি আলমারির সামনে দাঁড়িয়ে জামাকাপড় গোছাচ্ছে।

হঠাৎ পেছন থেকে দুটো শক্ত হাত এসে প্রিয়ান্তিকে জড়িয়ে ধরল। প্রিয়ান্তি চমকে উঠলেও পরমুহূর্তেই বুঝে গেল কে।

সারফরাজ তার কাঁধে মুখ রেখে নিচু গলায় বলল,

“হুমম... আমার বাটারফ্লাই।”

তারপর চুলের ভেতর মুখ ডুবিয়ে গভীর নিঃশ্বাস নিল।

“মাই বাটারফ্লাই।”

প্রিয়ান্তির গাল লাল হয়ে উঠল। সে ধীরে বলল,

“সারফরাজ কী করছেন?”

সারফরাজ হেসে বলল

“কেন? ভালো লাগছে না বুঝি?”

প্রিয়ান্তি উত্তর দিল না। শুধু লজ্জায় চোখ নামিয়ে ফেলল।

সারফরাজ সেটা দেখে মুচকি হাসল। তারপর ধীরে ধীরে তাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিল। এক হাত দিয়ে কোমর জড়িয়ে ধরে বলল,

“আজ সারাদিন তোমাকে ঠিকমতো দেখতেই পাইনি। এখন আর ছাড়বো না। সারারাত বাটারফ্লাই কে আমি নিজের বুকের মধ্যে রাখবো।”

প্রিয়ান্তি সঙ্গে সঙ্গে আপত্তি জানিয়ে বলেন,

“না, আজ না প্লিজ।”

সারফরাজ ভ্রু তুলল।

প্রিয়ান্তি অসহায় মুখ করে বলল,

“সৃজা কাল রাতেও আম্মির কাছে ছিল। এমনিতেই মেয়েটা আমাকে ছাড়া থাকতে পারে না।”

সারফরাজ দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

অবশেষে রাত নেমে এলো ইস্তাম্বুলে।

সারফরাজের ঘরের লাইট অফ হয়ে গেছে। শুধু নাইট ল্যাম্পের হালকা নরম আলো পড়ছে।

সৃজাও ঘুমিয়ে গেছে একদম মায়ের পাশে। প্রিয়ান্তি মাঝে মাঝে তার চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। প্রিয়ান্তির পাশেই সারফরাজ শুয়ে আছে। প্রিয়ান্তি ভেবেছে সারফরাজ বোধহয় ঘুমিয়ে গেছে।

কিন্তু কিছুক্ষণ পর হঠাৎই সারফরাজ চোখ খুলে সৃজার দিকে তাকাল। মেয়েটা গভীর ঘুমে রয়েছে দেখে নিশ্চিন্ত হলো।

সে ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে প্রিয়ান্তিকে জড়িয়ে ধরল।

প্রিয়ান্তি চমকে উঠে ফিসফিস করে বলল,

“কী করছেন?”

সারফরাজ আরও একটু কাছে সরে এলো। তারপর নিচু গলায় বলল,

“বাটারফ্লাই, একটা কিস তো দেওয়াই যায়।”

প্রিয়ান্তির চোখ বড় হয়ে গেল।

“সারফরাজ!”

সে তাড়াতাড়ি সৃজার দিকে তাকাল। বলল,

“মেয়েটা পাশেই আছে।”

সারফরাজ গম্ভীর মুখে বলল,

“তাই তো এত আস্তে বলছি। একটা কিস দাও না হলে আমার ঘুম হবে না।”

প্রিয়ান্তি হাসি চেপে রাখার চেষ্টা করল।

সারফরাজ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

“এত কষ্ট নিয়ে একজন স্বামী বেঁচে থাকতে পারে? কেউ আমার কষ্ট বোঝে না। সারাদিন কাজ করি। তারপর বাড়ি ফিরে দেখিড় মেয়ে মায়ের কাছে। বউ মেয়ের কাছে। আর আমি?”

প্রিয়ান্তি এবার সত্যিই হেসে ফেলল। বলল,

“নাটক কম করুন। আপনিও তো আমাদের কাছেই আছেন।”

তারপর ধীরে ধীরে সারফরাজের দিকে ঘুরল। সারফরাজ তার চুল গুলো একপাশে সরিয়ে দিল। কোমর জড়িয়ে ধরে নিজের বুকের ওপর উঠিয়ে নিল। আর অপেক্ষা না করে নিজের ঠোঁটজোড়া দৃঢ় ভাবে প্রিয়ান্তির কাঁপা ঠোঁটে স্পর্শ করাল। প্রিয়ান্তির চোখ বন্ধ করে সেই স্পর্শ অনুভব করল। তার হাতদুটো সারফরাজের জামা চেপে ধরা আছে।

ধীরে ধীরে কিছুক্ষণ পর সারফরাজ তাকে ছেড়ে দিলো। প্রিয়ান্তি এখনো ঠিকঠাক শ্বাস নিতে পারছে না। সারফরাজ ধীরে ধীরে তার পিঠে হাত বুলিয়ে তাকে শান্ত করলো। বলল,

“শান্ত হও বাটারফ্লাই।"

ইস্তাম্বুলের রাত গভীর হলো। প্রিয়ান্তি ধীরে ধীরে ঘুমিয়ে গেল সারফরাজের বুকে। সারফরাজ ঘুমন্ত মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।

_________________***************________________

ইস্তাম্বুল থেকে বেশ দূরে, বুরসা অঞ্চলে গিয়েছিলেন অরিন্দম চৌধুরী। সেখানে একটি বড় শিল্প ও অবকাঠামো প্রকল্প নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক ছিল। মূলত আবরাজ খানেরই যাওয়ার কথা ছিল কিন্তু গত কয়েক সপ্তাহে পরিস্থিতি বদলে গেছে। অদ্রিজা থাকায় আবরাজ এখন আগের মতো দীর্ঘ সফরে যেতে চায় না।

তাই এই সফরের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল অরিন্দম চৌধুরীকে। তার সঙ্গে কয়েকজন নিরাপত্তাকর্মীও ছিল।

রাত প্রায় তিনটা। আহমেদ ম্যানশন নিস্তব্ধ। সবাই গভীর ঘুমে রয়েছে। হঠাৎ সারফরাজের ফোনটা কেঁপে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল একটা নাম - জায়েদ।

সারফরাজ ভ্রু কুঁচকাল। রাত তিনটায় জায়েদের ফোন দেখে অবাক হলো। কিছু একটা ভাবতেই মুহূর্তের মধ্যেই তার ঘুম উধাও হয়ে গেল।

পাশে ঘুমিয়ে থাকা প্রিয়ান্তির দিকে একবার তাকিয়ে খুব সাবধানে বিছানা থেকে নেমে এল।‌তারপর ফোন রিসিভ করে বলল,

“হ্যালো?”

ওপাশ থেকে কয়েক সেকেন্ড কোনো উত্তর এল না। শুধু ভারী নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে। সারফরাজের বুকের ভেতর কেমন যেন করে উঠল।

“জায়েদ? কী হয়েছে?”

অবশেষে জায়েদের গলা শোনা গেল। বলল,

“অরিন্দম চৌধুরীকে গু"লি করা হয়েছে।”

সারফরাজের হাত শক্ত হয়ে গেল। মুহূর্তের জন্য সে যেন ঠিক শুনতে পেয়েছে কি না, সেটাই বুঝতে পারল না।

“কী বলছিস তুই?”

জায়েদ গভীর নিঃশ্বাস ফেলল। বলল,

“প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, হামলাটা পরিকল্পিত ছিল। আর আমাদের সন্দেহ এর পেছনে কেমাল আরসালানের লোকজন আছে।”

সারফরাজের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। কেমাল আরসালান নামটা শুনলেই তার ভিতরের একটা জা'নো'য়া'র জেগে ওঠে। মাসের পর মাস ধরে তাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে সে। কিন্তু সে এখনও ধরা পড়েনি।

কিছুদিন আগের খবর অনুযায়ী, সে তুরস্কের উত্তরাঞ্চলের পাহাড়ি এলাকায়, রিজে প্রদেশের দুর্গম অঞ্চলের কোথাও আত্মগোপন করে আছে।

সারফরাজ কয়েক মুহূর্ত চুপচাপ বসে রইল। বুঝতে পারছে না ঠিক কীভাবে আবরাজ কে বলবে। সারফরাজ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বলল,

“কেমাল আরসালান সম্পর্কে আমার সব তথ্য চাই। ওর সঠিক ঠিকানাও বের কর। বাকি সব আমি দেখছি।”

_________________*************___________________

ইস্তাম্বুলের সকালটা আজ অদ্ভুত রকমের শান্ত। বসফরাসের বুক জুড়ে পাতলা কুয়াশার চাদর ভাসছে, যেন শহরটা নিজের হাজার বছরের গল্পগুলো আড়াল করে রেখেছে।

ঠান্ডা বাতাস জলের গন্ধ নিয়ে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। দূরে সীগালেরা নীল আকাশে বৃত্ত এঁকে উড়ছে। সূর্যের কোমল আলো একে একে ছুঁয়ে দিচ্ছে গম্বুজ আর মিনারগুলোকে।

পুরোনো পাথরের রাস্তা এখনও দিনের কোলাহল পায়নি। শহরটা যেন কয়েক মুহূর্তের জন্য থেমে আছে, নীরব, গম্ভীর, অথচ ভেতরে ভেতরে অসংখ্য অপ্রকাশিত ঝড় লুকিয়ে রেখে। ঠিক যেমন সমুদ্রের শান্ত জলের নিচে থাকে অদৃশ্য স্রোত।

সারফরাজ ফোনে ডায়াল করল আবরাজের নম্বর। কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল স্ক্রিনের দিকে। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফোনটা কানে তুলল। রিং হাতে লাগল।

অন্যদিকে, আবরাজ তখনও ঘুমিয়ে। সকালের ঘড়িতে সাড়ে আটটা পেরিয়ে গেছে। ভারী পর্দার ফাঁক গলে সূর্যের আলো বিছানার এক কোণে পড়েছে।

আবরাজ আধো ঘুমের মধ্যেই ফোনের বিরক্তিকর রিংটোন শুনে ভ্রু কুঁচকাল। তাকিয়ে দেখল আরু ঘুমাচ্ছে। কাল রাতে অনেক দেরিতে ঘুমিয়েছে মেয়েটা। আদ্রিতা নেই কোথাও। তারমানে সে কলেজে।

তবে আবার ফোন বেজে উঠতেই আবরাজ বিরক্ত হয়ে ফোনটা হাতে তুলে নিল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল,

Sarfaraz Calling...

আবরাজ ভ্রু কুঁচকাল। এত সকালে সারফরাজ সাধারণত ফোন করে না। নিশ্চয়ই কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সে কল রিসিভ করল। ঘুমজড়ানো কণ্ঠে বলল,

“কী হয়েছে?”

তার কণ্ঠে স্পষ্ট বিরক্তি।

“সকাল সকাল ফোন করেছ কেন?”

বিছানায় হেলান দিয়ে বসে পড়ল আবরাজ। আর ওপাশে সারফরাজ কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।

আবরাজ ভ্রু কুঁচকে ফোনটা কানের সঙ্গে চেপে ধরল।

“সকাল সকাল ঘুম ভাঙিয়ে দিয়ে চুপ করে আছ কেন?”

ওপাশে সারফরাজ খুব নিচু গলায় বলল,

“অরিন্দম চৌধুরী আর নেই।”

আবরাজের মুখের বিরক্তি মুহূর্তের মধ্যে মিলিয়ে গেল।

সে স্থির হয়ে বসে রইল।

“মানে?”

সারফরাজ চোখ বন্ধ করল। এই কথাটাই সে বলতে চাইছিল না।

“গতরাতে বুরসায় ওনার কনভয়ের ওপর হামলা হয়েছে। আমরা খবর পেয়েছি কয়েক ঘণ্টা আগে।”

আবরাজের আঙুল ধীরে ধীরে শক্ত হয়ে উঠল।

“সারফরাজ, তুমি কী বলতে চাইছ?”

ওপাশ থেকে ভারী গলায় উত্তর এল।

“তিনি আর বেঁচে নেই, আবরাজ।”

আবরাজের দৃষ্টি ধীরে ধীরে বিছানার দিকে চলে গেল।ছোট্ট আরু নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে। কয়েক মুহূর্ত আগেও তো পৃথিবীটা স্বাভাবিক ছিল। আর এখন সবকিছু যেন বদলে গেছে। অবশেষে সে বলল,

“না। কোথাও ভুল হচ্ছে।”

সারফরাজ কিছু বলল না। কারণ সে জানে এই পর্যায়টা স্বাভাবিক। এমন কিছু মানুষ প্রথমে বিশ্বাস করতে চায় না।

আবরাজ আবার বলল,

“গতকাল সন্ধ্যাতেও আমার সঙ্গে কথা হয়েছে। ফাইল নিয়ে তর্ক করল। আর এখন সে...”

কথাটা শেষ করতে পারল না আবরাজ। ফোনটা কেটে দিল সে। তার মনে ভেসে উঠলো আদ্রিতার হাসি মুখটা।

মেয়েটা যতোই মুখে বলুক বাবা কে ঘৃণা করে। যতোই অস্বীকার করুক বাবাকে, তাও রক্তের সম্পর্কের অদ্ভুত এক সত্য আছে। এই খবরটা তার পৃথিবীটা নাড়িয়ে দেবে। হয়তো সে প্রথমে বিশ্বাসই করবে না। হয়তো রেগে যাবে। হয়তো চুপ করে যাবে। কিন্তু যাই হোক, এই আঘাত তাকে বহন করতে হবে।

আবরাজ নিচু গলায় নিজেকেই বলল,

“লিটল স্পার্ক, তোমায় কি ভাবে বলবো যে তোমার বাবা আর এই পৃথিবীতে নেই!"

কিছুক্ষণ পর আরুকে রাহির কাছে দিয়ে প্রয়াণ, আবরাজ আর মিনহাজ বেরিয়ে গেল বুরসার উদ্দেশ্য।

বসফরাস ব্রিজ পেরিয়ে গাড়ি যখন হাইওয়েতে উঠল, তখন প্রয়াণ অবশেষে নিচু গলায় বলল,

“ভাই, ভাবি জানে?”

আবরাজ চোখ বন্ধ করে বলল,

“না।"

প্রয়াণ আর কিছু বলল না। কারণ দুজনেই জানে সবচেয়ে কঠিন কাজটা এখনও বাকি। অরিন্দম চৌধুরীর মৃ/ত্যু সংবাদ শোনা কঠিন। কিন্তু সেই খবরটা আদ্রিতাকে জানানো, তার থেকেও কঠিন।

#চলবে

(খারাপ লাগছে আপনাদের আদ্রিতার জন্য? 🥺)

#পর্ব_৪৭

#লেখনীতে_নীলপ্রজাপতি

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৪৭তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন