ফন্ট সাইজ:
থিম:
বধূ কোন আলো লাগলো চোখে

৩৮তম পর্ব

লেখক: ইসরাত ইতি

#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে

#পর্বসংখ্যা_৩৮

#Esrat_Ety

বেশ কিছুক্ষণ সামিন ওয়াশ রুমের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকে চুপচাপ। আলো তখনও কেঁদে যাচ্ছে। কোনো সান্ত্বনা খুঁজে পাচ্ছে না সে। কাঁদতে কাঁদতে ক্লান্ত হয়ে পরেছে। সামিন এদিকে ওদিকে অসহায়ের মতো একবার তাকিয়ে শরীরের সমস্ত শক্তি খরচ করে দরজায় বেশ কয়েকবার ধা/ক্কা দিতেই সিটকিনি ভে/ঙে দরজা খুলে যায়। একটা গভীর নিঃশ্বাস নিয়ে সামিন ওয়াশ রুমের ভেতর পা রাখে। আলো ওয়াশ রুমের একপাশে মেঝেতে পা ছড়িয়ে বসে দেয়ালে মাথা ঠেকিয়ে কাঁদছে। তার শরীর কাঁপছে। ভেজা চুল বেয়ে পানি পরছে। শাড়ির আঁচল মাটিতে লুটিয়ে পরে আছে। সামিন এগিয়ে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে। আলোর দিকে খানিকটা ঝুকে তার আঁচল উঠিয়ে তার‌ গায়ে জড়িয়ে দেয়। ক্রন্দনরত আলোর মুখের দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বলে,"চলো ওঠো।"

আলোর থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে সামিন কিছু সময় আলোর দিকে তাকিয়ে থাকে, তারপর পাঞ্জাবির হাতা গুটিয়ে নিয়ে আলোকে তুলে নেয়। বিছানায় এনে আলোকে বসিয়ে দিয়ে সামিন আলোর মুখোমুখি বসে। আলোর কান্না থেমেছে। কেমন নির্জীব হয়ে বসে আছে এখন। সামিন খানিকটা ঝুকে আলোর চোখের দিকে তাকিয়ে বলে,"সমস্যা কোথায়?"

আলো মুখটা সরিয়ে নেয়। সামিন কিছুক্ষণ আলোকে দেখে। কাঁদতে কাঁদতে নাকের ডগা লাল বানিয়ে ফেলেছে। সামিনের ইচ্ছে করছে হাত দিয়ে ঐ নাকের ডগা ছুঁয়ে দিতে। কিন্তু অযাচিত আহ্লাদী স্পর্শ দিয়ে এই মেয়েটার গালাগাল খেতে সে ইচ্ছুক নয় এখন। হাজার হলেও সে এই শহরের মেয়র। তার একটা গাম্ভীর্য নিয়ে চলা উচিত, কথায় কথায় পুঁচকে বৌয়ের গালাগাল খাওয়া তার শোভা পায় না।‌

সামিন একটা গভীর নিঃশ্বাস ফেলে বলে,"ওয়াশ রুম কাঁদার যায়গা? এতো সুন্দর পরিপাটি রুম আমার। কত সুন্দর একটা টানা বারান্দা। কোথায় রুমের এসি অন করে এই নরম বিছানায় শুয়ে শুয়ে কাঁদবে,তা না! এসব রেখে ওয়াশ রুমে ঢুকে কাঁদছো কেনো? সত্যিই তোমার মাথার স্ক্রু খুলে কোথাও পরে গিয়েছে। "

আলো দৃষ্টি বিছানার চাদরের ফুলকাটা নকশায় দিয়ে আছে। সামিন উঠে আলোর আলমারি থেকে একটা নতুন তোয়ালে বের করে আনে। আলোর হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলে,"মাথা মুছে নাও। ঠান্ডা লেগে যাবে।"

আলো চুপ। সামিন একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মৃদু স্বরে বলে,"তুমি আমাকে দিয়ে বড্ড খাটাও। এটা ঠিক না আলো।"

কথাটা বলে সামিন নিজের হাতে আলোর চুল মুছিয়ে দিতে থাকে। আলো পাথরের মতো বসে আছে। সামিন কি করছে সেদিকে তার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। চুল মুছিয়ে আলোর মাথায় তোয়ালেটা সুন্দর করে জরিয়ে দেয় সামিন।

সামিনের দরজার বাইরে এসে আতাউর আলম দাঁড়িয়ে পরে। মেয়ে জামাইয়ের ব্যক্তিগত রুমে সে আসতে ইচ্ছুক ছিলো না। ইশিতা আর রিতু জোর করে নিয়ে আসে তাকে। ঘরের ভেতরে সামিনের বৌয়ের সেবা করার দৃশ্য দেখে সবাই থতমত খেয়ে যায়। ইশিতা আর রিতু মুখ চাওয়াচাওয়ি করে দুজনে দুদিকে কে/টে পরে আতাউর আলমের পেছন থেকে। আতাউর আলম বোকার মতো কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থেকে ঘুরে সিঁড়ির দিকে যাওয়ার জন্য পা বাড়ায়। পেছন থেকে সামিন বলে ওঠে,"আসুন।"

আতাউর আলম দাঁড়িয়ে পরে। সামিন ঘরের বাইরে এসে বলে," আপনার মেয়ের আপনাকে প্রয়োজন।‌ তার কাছে থাকুন। আমি আপনাদের দুজনের খাবার উপরে পাঠিয়ে দিচ্ছি।"

সামিন চলে যায়। আতাউর আলম মাথা ঘুরিয়ে আলোকে দেখে তার কাছে যায়। আলো মাথা নিচু করে নিস্তেজ হয়ে বসেছিল। আতাউর আলম গিয়ে মেয়ের পাশে বসে। কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থেকে একটা হাত মেয়ের মাথায় রাখতেই আলো ঝাঁপিয়ে পরে তার বুকে, ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে আলো বাবার শার্ট খামচে ধরে। আতাউর আলম মেয়ের মাথায় পরম মমতায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকে। আলো কান্না মিশ্রিত কন্ঠে বলে ওঠে,"আমি কুৎসিত হয়ে গিয়েছি আব্বু। কুৎসিত হয়ে গিয়েছি।"

নিচ তলার লিভিং রুমে মেহমান রা চলে এসেছে । মেহমান বলতে ফুয়াদ, জামিল এবং সামিনের দলের ছেলেরা। সবাই খাওয়া দাওয়া করছে। আজান আয়াত বোনের শ্বশুরবাড়িতে এই দ্বিতীয় বারের মতো এসেছে।‌ সামিনের সাথে জড়তা এখনো পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি তারা। মাথা নিচু করে রোস্ট থেকে মাংস খুটে খেতে ব্যস্ত তারা। সামিন দুজনের মাথায় হাত বুলিয়ে তাদের পাশেই একটা চেয়ার টেনে বসে। তারপর বলে ওঠে ,"বোনের শ্বশুরবাড়ি, বেশি বেশি খাবে শা'লারা।"

আজান আয়াত খেতে খেতে সামিনের দিকে তাকায়। দুলাভাই মজা করলে কেমন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে হয় তারা জানে না।

সামিন বলে,"খাও।"

পাশ থেকে রনি বলে ওঠে,"হ্যা খাও। না খেলে আমি আছি তো। গলায় ছু/রি বসিয়ে দেবো।"

আয়াত বিষম খেয়ে কাশতে থাকে রনির কথায়। খাবার টেবিলে সবাই হেসে ফেলে। সামিন আয়াতের দিকে এক গ্লাস পানি এগিয়ে দেয়। পানি খেয়ে আয়াত ধাতস্থ হয়।

কিছুক্ষণ পরে সামিন পরিবেশ টা স্বাভাবিক করতে আজানকে বলে,"কলেজে উঠেছো। গার্লফ্রেন্ড হয়নি কোনো?"

আজান লজ্জা পেয়ে মাথা নাড়ায়। সামিন আয়াতের দিকে তাকিয়ে বলে,"আর তোমার?"

আয়াত ও ভীষণ লজ্জা পায়। নিচু স্বরে বলে,"না।"

সামিন বলে,"কাউকে মনে ধরলে বলবে। প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে পেছনে ঘুরঘুর করতে হবে না। তুলে এনে বিয়ে পড়িয়ে দেবো‌।"

আজান আয়াত চুপ করে থাকে। ফুয়াদ আজান আয়াতের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে,"হ্যা। ওই একটা কাজই তোমাদের দুলাভাই পারে। মেয়ে তুলে আনা।"

সামিন ফুয়াদের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলে। ফুয়াদ গম্ভীর কন্ঠে বলে,"বাচ্চাদের ভালো পরামর্শ দিতে হয়। দুলাভাই তুই ওদের। ভাগ্যিস আলো নেই এখানে,নয়তো তোর বারোটা বাজিয়ে দিতো এসব শুনলে।"

সামিন অপরাধী গলায় বলে,"এখন মজাও করতে পারবো না? কি অদ্ভুত!"

***

"আপনার ফোন বাজছে। ম্যানেজার ফোন দিচ্ছে।"

বিছানার দিকে তাকিয়ে রিতু বলে। ইলহাম ওয়াশ রুমে শেভ করছিলো,ওয়াশ রুমের দরজা খোলা, মাথা ঘুরিয়ে রিতুর দিকে তাকিয়ে বলে,"রিসিভ করে কথা বলো। বলো ব্যস্ত আছি।"

রিতু অবাক হয়ে বলে,"আমি?"

_হ্যা। রিসিভ করো।

রিতু আমতা আমতা করে ফোনটা হাতে নিয়ে রিসিভ করে কথা বলে রেখে দেয়। আগে হলে ইলহাম তার ফোনে হাত দেওয়ার অপরাধে খুব বকে দিতো। এখন কি না তাকে দিয়ে অফিসের কল উঠাচ্ছে।

রিতু আলমারি থেকে ইলহামের একটা পাঞ্জাবি বিছানার উপর রেখে বলে,"সাদা পাঞ্জাবি বের করেছি। পরবেন?"

ইলহাম ততক্ষণে ফ্রেশ হয়ে ওয়াশ রুম থেকে বেরিয়ে আসে। রিতুর শাড়ির আঁচলে মুখ মুছে নিয়ে বলে,"কেনো নয়।"

রিতু মুচকি হেসে চলে যেতে নেয়। ইলহাম শক্ত করে রিতুর হাত ধরে ফেলে,হ্যাচকা টান দিয়ে নিজের কাছে টেনে আনে। রিতু চ'ম'কে ওঠে। বিছানায় একপাশে বসে রিতুকে কোলের ওপর বসিয়ে তার ডান হাত টেনে নিজের কাঁধের ওপর রাখে। রিতু অস্ফুট স্বরে বলে,"কি করছেন।"

ইলহামের দিক থেকে কোন জবাব আসে না। সে তার স্ত্রীর ঘারে আদর মাখিয়ে দিতে ব্যস্ত। রিতু ছ'ট'ফ'ট করে নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে চায়। তার অস্বস্তি বুঝতে পেরে ইলহাম জরানো কন্ঠে বলে,"চুপ করে বসো। শুধু চু/মুই খাবো। ভ/য় পেয়ো না।"

রিতু চুপ করে থাকে। ইলহাম রিতুর ঘার থেকে মুখ উঠিয়ে রিতুর লাজুক মুখখানার দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে,"কেমন আছে আমাদের ছোটো সোনা? তোমাকে কষ্ট দেয় আমার মতো?"

রিতু মাথা নাড়ায়। ইলহাম রিতুর গালে একটা চু/মু খায়, তারপর বলে,

_এইবার আমাকে একটা মেয়ে দেবে তুমি। আমি মেয়ে চাই।"

রিতু অস্ফুট স্বরে বলে,"আর যদি না দিতে পারি?"

ইলহাম সাথে সাথে বলে ওঠে,"তাহলে পরের বার দেবে।‌"

রিতু লজ্জা পেয়ে যায়। ইলহাম বলে,"পরের বার না হলে তার পরের বার। তার পরের বার না হলে তার পরের বার। মোটকথা হাল ছাড়া যাবে না।"

রিতু চোখ তুলে তাকাচ্ছে না। ইলহাম মুগ্ধ চোখে এই নমনীয় মেয়েটির লাজুক মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। এতো মুগ্ধতা সে আগে কেনো খুঁজে পেলো না?

***

সামিন হাত ধুয়ে উঠে পরে। আজান বলে,"ভাইয়া। আপুর জিনিসপত্র যা চেয়েছিলেন,সব এনেছি।"

সামিন বলে,"কোথায়?"

আজান আঙ্গুল তুলে দেখিয়ে দেয়। সিঁড়ির কাছে একটা ট্রলি ব্যাগ রাখা।

ফুয়াদ সামিনের দিকে তাকিয়ে বলে,"এগুলো কি?"

সামিন মৃদু হেসে বলে,"শশুর বাড়ি থেকে যৌ/তুক নিয়েছি।"

কথাটা বলে সামিন ব্যাগটা উঠিয়ে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে ওঠে। তার ঘরের দরজার কাছে এসে সে একটা দৃশ্য দেখে দাঁড়িয়ে পরে। আলো তার বাবার কোলে মাথা রেখে চুপচাপ শুয়ে আছে। আতাউর আলম তার মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে গল্প করছে। যেন বাবা তার ছোটো অবুঝ মেয়েকে রূপকথার গল্প শুনিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিচ্ছে।

সামিন দৃশ্য টা দেখে এতোটাই মুগ্ধ হয়েছে যে মুখ থেকে অস্ফুট স্বরে বেরিয়ে আসে,"বাহ! কি সুন্দর! আমাকেও যেন আল্লাহ কন্যাসন্তান দেয়।"

ভেতরে ঢুকে বাবা মেয়ের এতো সুন্দর মুহূর্ত সে নষ্ট করতে চায় না। তাই ট্রলি ব্যাগটা সে দরজার কাছে রেখেই চলে যায়।

***

হাঁটুতে মাথা ঠেকিয়ে বসে আছে আলো। বাবা যতক্ষন ছিলো,মনটা ভীষণ শান্ত ছিলো। আতাউর আলম, আজান, আয়াত রাত নয়টার দিকে বাড়িতে চলে গিয়েছে। আবারো ভীষণ খারাপ হয়ে গিয়েছে মন টা। খুব কান্না পাচ্ছে।

সামিন দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকে কিছু মুহূর্ত, ঘড়িতে সময় রাত এগারোটা প্রায়। সারাদিনের ধকল শেষে সেও বেশ ক্লান্ত । একটু ঘুম দরকার।

মনে মনে আল্লাহর কাছে দোয়া করতে থাকে সে,"আল্লাহ ওই পাগল মেয়েটা যদি আজ আমার মেজাজ খারাপ করে দেয় তবুও যেন আমার রা/গ না ওঠে আজ। প্লিজ আল্লাহ,একটু সুবুদ্ধি দিও ঐ আছিয়াকে আর আমাকে দিও ধৈর্য্য।"

একটা গভীর নিঃশ্বাস ফেলে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢোকে সে। কয়েক পলক আলোকে দেখে নিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে দরজার সিটকিনি তুলে দেয়। আলো মাথা তুলে তাকায় না।

সামিন ওয়াশ রুমে ঢুকে ফ্রেশ হয়ে গায়ের পাঞ্জাবিটা পালটে একটা টি শার্ট পরে নেয়। তারপর বেরিয়ে এসে পুনরায় আলোর দিকে তাকায় । একই ভাবে হাঁটুতে মাথা ঠেকিয়ে গুটিয়ে বসে আছে। সামিন ভাবে, ঘুমিয়ে পরলো না তো! পরতেই পারে, এই মেয়ের সবকিছু অগোছালো।

আলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সামিন শব্দ করে ঘরের জানালার গ্লাস টেনে বন্ধ করে দেয়, বারান্দার দরজা ধপ করে লাগিয়ে দেয়। আলো ধীরে ধীরে মাথা তুলে সামিনের দিকে তাকায়। সামিন নাটকীয় ভঙ্গিতে বলে,"সরি।"

আলো কিছু বলে না। মাথা ঘুরিয়ে বিছানায় চোখ রাখে। ইশিতা আর পরী রাত নয়টার দিকে এসে বিছানার উপর কিছু ফুল আর ফুলের পাপড়ি ছড়িয়ে দিয়ে গিয়েছে। বিরক্তিতে আলো কপাল কুঁ'চ'কে রেখেছে। ইশিতা আপু কিভাবে এতো অবুঝের মতো কান্ড করতে পারে!

সামিন আলোর দৃষ্টি অনুসরণ করে বিছানার দিকে তাকায়। কয়েক মূহুর্ত তাকিয়ে থেকে মৃদু স্বরে বলে,"পরিস্কার করে দিচ্ছি।"

বাড়ির কাউকে না ডেকে সামিন ফুলগুলো সরিয়ে নেয় বিছানা থেকে, তারপর ঝুড়িতে ফেলে দিতে দিতে বিড়বিড় করে বলে,"আমিও আমার বৌয়ের কাছে অবহেলিত আর তোরাও, চিমটি।"

ঘুরে আবারও আলোর দিকে তাকায়। তারপর গিয়ে আলমারি খুলে একটা বক্স বের করে সেটার ভেতর থেকে আরেকটা ছোট বক্স বের করে এনে আলোর মুখোমুখি বসে। আলো সামিনের দিকে তাকিয়ে আছে। সামিন হাতের ছোটো বক্সটা খুলতে খুলতে আলোর চোখের দিকে তাকায়। বক্সে সামিনের মায়ের সেই বালা দুটো।

আলো বালা দুটোর দিকে তাকিয়ে থাকে, এগুলো সে খুলে সামিনের হাতে দিয়ে গিয়েছিলো সেদিন। সামিন আলোর ডান হাত ধরে একটা বালা পরিয়ে দিয়ে অপর হাতেও আরেকটা বালা পরিয়ে দিয়ে বলে,"আমার চোখে দেখা সবথেকে বিশুদ্ধ একজন নারীর স্মৃতিচিহ্ন আমার চোখে দেখা আরেকজন বিশুদ্ধ নারীর হাতে পরিয়ে দিলাম।"

এ পর্যন্ত বলে একটু থেমে আবারও বলতে শুরু করে,"এই দু'টো কখনো খুলবে না হাত থেকে, অনুরোধ তোমার প্রতি।"

আলো কিছুক্ষণ হাতের দিকে তাকিয়ে থেকে সামিনের হাত থেকে নিজের হাত সরিয়ে নেয়। সামিন এক পলক আলোকে দেখে মজা করে বলে ওঠে,"কি ব্যাপার! অস্বাভাবিক চুপচাপ কেনো? রেঞ্জ দেখছি স্ক্রু বেশ ভালো করে টা/ইট দিয়ে গিয়েছে।"

আলো অবাক হয়ে বলে,"মানে? কিসের রেঞ্জ?"

_রেঞ্জ। তোমার বাবা, আমার শশুর। তাকে এনেছিলাম তোমার স্ক্রু টা/ইট দিতে। সে তার কাজ ঠিকমত করেছে দেখছি।

আলো অন্যদিকে তাকিয়ে থাকে সামিনের কথায় পাত্তা না দিয়ে। সামিন বলতে থাকে,"মন খারাপ করে থাকবে দেখে বাবাকে, ভাইদের এনে দিলাম, একটা ধন্যবাদ তো পেতেই পারি।"

"ধন্যবাদ "

আলো কপাল কুঁ'চ'কে কাটকাট বলে।

সামিন একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে,"এভাবে দিলে? একটা চ/ড় মেরে দিতে এর বদলে নাহয়!"

আলো গম্ভীর কন্ঠে বলে ওঠে,"মন পেতে এসব করছেন?"

সামিন ম্লান হাসে, তারপর বলে,"না, মন চুরি করতে এসব করছি। চুরি করতে না পারলে ডাকাতি করবো।"

_হ্যা, ওই একটা জিনিসই আপনি ভালো পারেন। লুটতরাজ।

কাট কাট বলে ওঠে আলো।

ব্যস,এই কথাটাই সামিনের মেজাজ খারাপ করে দিতে যথেষ্ট। কিন্তু সামিন হাত মুঠি করে চোখ বন্ধ করে ফেলে,বড় বড় নিশ্বাস নিয়ে বিড়বিড় করে নিজেকে নিজে বলতে থাকে,"ক/ন্ট্রোল সামিন ইয়াসার মির্জা ক/ন্ট্রোল! প্লিজ রা/গ উঠাস না।"

আলো অবাক হয়ে সামিনকে দেখে বলে,"বিড়বিড় করে কি বলছেন! কাকে গালাগাল দিচ্ছেন?"

_গালাগাল? ওসব তো তুমি ভালো জানো।

আলো চুপ হয়ে যায়। সামিন আলোকে দেখতে থাকে। কমলা রঙের শাড়িটা কত সুন্দর লাগছে মেয়েটির গায়ে। শাড়িটার সৌন্দর্য মেয়েটিকে সুন্দর করে তুলেছে নাকি মেয়েটির সৌন্দর্য শাড়িটার গাঁয়ে ছেয়ে গিয়েছে বুঝতে পারছে না সামিন। আলো কপাল কুঁ'চ'কে সামিনের দিকে তাকাতেই সামিন চোখ সরিয়ে নেয়। আলো দৃঢ় ভাবে বলে,"সুযোগ চেয়েছেন, সুযোগ দিয়েছি। আগে নিজেকে প্রমাণ করে দেখান। মনে রাখবেন, স্ত্রীর মন পাওয়ার আগে তার শরীর কা/মনা করা পুরুষদের আমি ঘৃ/ণা করি।"

সামিন কি বলবে বুঝতে পারছে না। সে যে তার স্ত্রীর শুধুমাত্র শরীর কা/মনা করে না, তার যে তার স্ত্রীর মনটাও পেতে হবে এই কথাটা এখনো ঐ অবুঝ মেয়েটা বুঝলো না। এতো যু/দ্ধ তবে কেন করলো সামিন? শরীর তো বহু আগেই পেতে পারতো। কিভাবে মুখের ওপর কাট কাট বলে দিলো ঐ অভদ্রমহিলা। সামিন কি তাকে ছুঁ/য়ে ফেলতো নাকি আজ? খুবই অ'ভ'দ্র এই মহিলা। মুখে কোনো লাগাম নেই!

আলো বলতে থাকে,"বুঝতে পেরেছেন?"

সামিন কিছু না বলে মাথা নাড়ায়। তারপর নিচু স্বরে বলে,"জ্বী।"

_তাহলে নিজেও সময় নিন এবং আমাকেও সময় দিন।

আলো কথা গুলো বলে শেষ করার আগেই সামিন বলে ওঠে,"সিম্পল কথা, সিম্পল ভাবে বলো,ধ/মকে কেনো বলছো।"

আলো চুপ করে থাকে। সামিন এদিক ওদিক তাকিয়ে আমতা আমতা করে বলে,"বলছিলাম, আমি কি ডিভানে শোবো মানে..."

আলো রা/গী চোখে তাকিয়ে আছে। সামিন একটা ঢোক গিলে ফেলে, তারপর কাঁচুমাচু মুখ করে বলে,"দুমাস ডিভানে শুয়ে শুয়ে মেরুদন্ড বাঁকা হয়ে গিয়েছে আমার!"

আলো সামিনের দিকে কিছুক্ষণ কপাল কুঁ'চ'কে তাকিয়ে থাকে। তারপর গম্ভীর কন্ঠে বলে ওঠে, বিছানার মাঝামাঝি দু'টো কোলবালিশ দিয়ে বিছানা ভাগ করে নিন।

"অনেক উদার তুমি আছিয়া"

বিড়বিড় করে বলে সামিন বাধ্য ছেলের মতো আলমারি থেকে বিশাল সাইজের দুটো কোলবালিশ বের করে এনে বিছানার মাঝখান টাতে রাখে। তারপর আলোকে বলে,"তুমি কোন পাশটা নিতে চাও।"

আলো বিছানার দিকে তাকিয়ে থাকে দীর্ঘক্ষণ। যেন সে বুঝে উঠতে পারছে না তার কোন পাশটা নেওয়া উচিত। সামিন বলে,"তাড়াতাড়ি বলো, আমার ঘুম পাচ্ছে। "

আলো ডানপাশটা দেখিয়ে বলে,"আমি এই পাশে থাকবো।"

"ওকে"

উত্তর দিয়ে সামিন অপর পাশে গিয়ে টান টান হয়ে শুয়ে পরে। আলো কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে আলমারি থেকে একটা নরমাল সুতি শাড়ি বের করে ওয়াশ রুমে ঢোকে। শাড়িটা পাল্টানোর সময় তার কানে হাসির শব্দ পৌঁছায়, ঘরের ভেতর সামিন হাসছে। অদ্ভুত! এতো বিশ্রীভাবে রা/ক্ষসের মতো ঘর কাঁপিয়ে হাসছে কেন!

শরীরে শাড়ির আঁচল জরিয়ে সে বেরিয়ে আসে। সামিন গা দুলিয়ে হাসছে। মনে হচ্ছে বিছানাটাও কাঁপছে।

আলো কৌতুহলী হয়ে তাকে দেখছে। সামিনের হাতে কিছু একটা আছে। সেটার দিকে তাকিয়ে বারবার পাগলের মতো হাসছে। আলো তাকিয়ে আছে সামিনের দিকে। স্বভাবে বদ হলেও লোকটার হাসি সুন্দর, হাসলে মনে হয় যেন কত মাসুম একটা লোক, কত সহজ সরল একটা লোক!

সামিন আলোকে দেখতে পেয়ে আরো জোরে জোরে হাসতে থাকে। আলোর মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। ধ/মকের সুরে বলে,"রা/ক্ষসের মতো হাসছেন কেনো?"

সামিন বহু কষ্টে হাসি থামিয়ে তার হাতের ছবির অ্যালবাম টা আলোর দিকে তুলে ধরে।

ওটা আলোর ছোটোবেলার ছবির অ্যালবাম। আলো তার ছোটো বেলার ছবি দেখে লজ্জায় কুঁ/কড়ে যায়। একটা ছবিতে তার নাক বেয়ে সর্দি পারছিলো। আরেকটা ছবিতে আলোর বেল মাথা। আতাউর আলম মজা করে ছবি দুটো তুলে রেখেছিলো।

সামিন আবারো হাসতে থাকে। আলোর লজ্জা রা/গে পরিনত হয়। রেগেমেগে বলে,"কোথায় পেয়েছেন এগুলো?"

_আনিয়েছি তোমার ভাইদের দিয়ে। তোমার সব প্রয়োজনীয়,প্রিয়, গোপনীয় জিনিস। সবকিছু এখন আমার হেফাজতে।

অ্যালবামের আরেকটা পাতা উলটে আবারো হাসতে শুরু করে সামিন । এই ছবিতে আলো মুরগির ঠ্যাং চিবুচ্ছিলো। ভ/য়ংকর পর্যায়ের কুশ্রী একটা ছবি।

সামিন বুকে হাত দিয়ে হাসতে থাকে। হাসতে হাসতে বুকে ব্যাথা হয়ে গেলো।

আলো তে/ড়ে যায়,"দিন ওটা। দিন বলছি।"

সামিন অ্যালবামটা পিছনে সরিয়ে হাসতে হাসতে বলে,"দেবো না।"

_ইয়াসার মির্জা ওটা আমার পার্সোনাল জিনিস।

ধমকের সুরে বলে ওঠে আলো।

_এটা আমার পার্সোনাল বৌয়ের পার্সোনাল জিনিস।

ঠান্ডা গলায় বলে সামিন।

আলো থা/বা মে/রে নিতে যায় অ্যালবাম টা। সামিন দিতে নারাজ। একপ্রকার হাতা/হাতি লেগে যায় দুজনের মধ্যে। একসময় আলো কিছুটা সফল হয় অ্যালবামটা নিজের দিকে টেনে নিতে কিন্তু তৎক্ষণাৎ সামিন হ্যাচকা টা/ন মা/রতেই অ্যালবাম সহ আলো পরে যায় সামিনের গায়ে। হুট করে আলো পরে যাওয়ায় সামিন টাল সামলাতে না পেরে নিজেও পরে যায়। ঘটনার আকস্মিকতায় সামিনের চোখ দুটো রসগোল্লা সাইজের মতো বড় বড় হয়ে যায়। আলোর মাথা তার বুকে ঠেকে গিয়েছে। চুলের খোঁপা খুলে সামিনের মুখের ওপর ছড়িয়ে আছে।

ধীরে ধীরে হাত দিয়ে আলোর চুল গুলো সরিয়ে দেয়। আলো স্তব্ধ হয়ে গিয়েছে। কানে সামিনের হৃদস্পন্দন স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে। তড়িঘড়ি করে উঠে বসে ছবির অ্যালবাম আকরে ধরে মাথা নিচু করে বসে থাকে আলো। সামিন ধীরে ধীরে উঠে বসে আলোর নিচু করে রাখা মুখটার দিকে একপলক তাকিয়ে উঠে দাঁড়ায়। আলোকে আর অস্বস্তিতে ফেলতে চায় না তাই সেখানে দাঁড়িয়ে না থেকে হন হন করে বারান্দার দরজা খুলে সেখানে চলে যায়।

বিছানার ওপর আলো কিছুক্ষণ থ/ম মেরে বসে ছিলো। ধীরে ধীরে সেও উঠে দাঁড়ায়। অ্যালবামটা আলমারিতে তুলে রেখে চুপচাপ বিছানায় গিয়ে গুটিসুটি মেরে শুয়ে থাকে গায়ে চাদর টেনে।

দীর্ঘক্ষণ বারান্দার রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে সে। একটু আগের ঘটনা মনে করে এখন মুচকি মুচকি হাসছে। সৃষ্টিকর্তা তার প্রতি বরাবরই সদয়। বৌ না চাইতেও বুকে এসে পরে। আহা কি কপাল তার!

একা একা কিছুক্ষণ হেসে নিয়ে আবারো চেহারায় গাম্ভীর্য ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করে সামিন, তারপর ঘরের ভেতরে গিয়ে বারান্দার দরজা লাগিয়ে দেয়। ঘুরে বিছানার দিকে তাকিয়ে দেখে আলো ওদিকে ফিরে শুয়ে আছে। সম্ভবত ঘুমিয়ে গিয়েছে। সামিনও ধীরে ধীরে নিজের যায়গায় শুয়ে পরে। কিছুক্ষণ এপাশ ওপাশ করে আবারও উঠে বসে। আশ্চর্য জনক ভাবে এই ঘরে ঢোকার আগে চোখে গোটা রাজ্যের ঘুম ছিলো। এখন সেই ঘুম নেই। বুকে কেমন অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে। এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না তার আছিয়া তার বিছানায় ঘুমিয়ে আছে। মাঝখানে দুটো কোলবালিশ একটার উপর আরেকটা সাজিয়ে রাখা। এই দুটো মাঝখান থেকে সরতে কতটা সময় নেবে কে জানে! তবে সামিন ইয়াসার মির্জা তার ধৈর্যের চূড়ান্ত পরিক্ষা দিতে প্রস্তুত। তার জীবনে আপাতত একটাই স্বস্তির ব্যাপার, আছিয়া তাকে তার মন জিতে নেওয়ার নমিনেশন দিয়ে দিয়েছে। এখন তাকে জিততেই হবে মন জয় করার নির্বাচন! কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ছাড়াই নির্বাচন, তবুও জেতাটা সহজ নয়। এমন ভাবে সে জিততে চায় আছিয়াকে যে আছিয়া যেন নিজে এসে তাকে জয়ী ঘোষণা করে জয়ের মালা পরিয়ে দেয় তাকে।

সামিন কথাগুলো ভাবতে ভাবতে মৃদু হাসে। আবারও তার কিছুক্ষণ আগের ঘটনা মনে পরে যায়। কতটা নাস্তানাবুদ হয়েছে ওই মেয়েটা। চেহারা টা দেখার মতো ছিলো! মাথা ঘুরিয়ে আলোর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বিড়বিড় করে বলে ওঠে,"আজকের জন্য অতটুকু যথেষ্ট আছিয়া। আমি কৃতজ্ঞ তোমার প্রতি!"

চলমান.......

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩৮তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন