ফন্ট সাইজ:
থিম:
বধূ কোন আলো লাগলো চোখে

৫০তম পর্ব

লেখক: ইসরাত ইতি

#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে

#পর্বসংখ্যা_৫০

#Esrat_Ety

ঘরের বাইরে থেকে রেহেনা ডেকে যাচ্ছে। এর আগেও তিনবার তিনি ডেকে গিয়েছেন। চতুর্থ বারের মতো দরজায় ধাক্কা দিতেই দরজা খুলে যায়, রেহেনা অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। সামিন নিচু স্বরে সালাম দেয় তার শাশুড়িকে।

রেহেনা সালামের উত্তর দিয়ে কিছু বলতে যাবে তখনই সামিন বলে ওঠে,"আলো ফজরের নামাজ পরে ঘুমাচ্ছে।"

রেহেনা অবাক হয়েই তাকিয়ে থাকে। সামিন ওয়াশ রুমে ঢোকে।

রেহেনা ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে আলো বিছানায় ঘুমাচ্ছে। রেহেনা এগিয়ে গিয়ে চেঁচাতে থাকে,"এই মেয়ে! এই গাধা মেয়ে! ওঠ!"

আলো পিট পিট করে তাকায়। কপাল কুঁচকে ঘুম ঘুম কন্ঠে বিরক্তির সাথে বলে,"কি হচ্ছে আম্মু? আমি নামাজ পরেছি। চেচিও না।"

_জামাই কখন এসেছে?

_রাত সাড়ে বারোটায়।

_রাত সাড়ে বারোটায় এসেছে, তুই আমাকে ডাকবি না?

হতভম্ব হয়ে যায় রেহেনা।

_ডাকলে কি করতে? দই মিষ্টি খাইয়ে বরণ করতে?

_খেতে কি দিয়েছিলি?

ধমকের সুরে বলে রেহেনা।

_কি খেতে দেবো? উনি তো রাতে খেয়ে এসেছেন।

রেহেনা মেয়ের গা ছাড়া ভাব দেখে প্রচন্ড বিরক্ত হয়। চাঁপা স্বরে চেঁ'চি'য়ে বলে,"তোর বয়স এক দুই করে ছাব্বিশ বছর হয়েছে, তোর মাথায় কি এখনো বুদ্ধি হবে না? হালকা পাতলা নাস্তা দিসনি?"

আলো চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে বলে,"নাস্তা দেবো মানে? রাত বারোটা নাস্তা করার সময়?"

রেহেনা এবার দাঁত খিচিয়ে মেয়ের দিকে তে*ড়ে যায়। মাথায় গাট্টা মেরে বলে,"হোক রাত তিনটা। তুই আপ্যায়ন করবি না? নতুন জামাই!‌ "

আলো উঠে দাঁড়িয়ে বলে,"নতুন জামাই বলে আপ্যায়ন করতে হবে? আর পুরাতন জামাইদের কি করে আম্মু? দরজা থেকে ফিরিয়ে দেয়?"

রেহেনা এইবার রে*গে মেয়ের চুল ধরে। সামিন ওয়াশ রুম থেকে বের হয়ে রেহেনাকে দেখে অবাক হয়ে যায়। রেহেনা লজ্জা পেয়ে মেয়ের চুল থেকে হাত সরিয়ে নেয়। সামিন বলতে থাকে,"ভালো করে দু'টো লাগিয়ে দিন। আমি দিলে আবার নারীর প্রতি স*হিংসতা রটে যাবে। এই কাজটা আপনিই করুন মা।"

রেহেনা ম্লান হাসে, তারপর দ্রুতপায়ে হেঁটে রান্নাঘরে চলে যায়, জলদি জলদি করে এখন জামাইয়ের জন্য নাস্তা বানাতে হবে। তার এখন দম ফেলবার সময় নেই।

সামিন আলোর কাছে এসে বলে,"শেষমেশ একজনকে পেলাম, যে আলো রানীর চুলের মুঠি ধরার ক্ষমতা রাখে! বাহ বাহ! যখন যখন তোমাকে শা*স্তি দিতে ইচ্ছে করবে, তখন এ বাড়িতে নিয়ে আসবো ভাবছি।"

স্টাডি রুমে সামিনের মুখোমুখি বসে আতাউর আলম তার জীবনে অর্জিত সকল মেডেলের বিশদ বিবরণ দিচ্ছে। খুবই উৎসাহের সাথে নিজের জীবনের সাহসিকতার দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করছে। সামিন মাথা ঘুরিয়ে সবকিছু দেখে হাতে একটা আর্টি*কেল তুলে নেয়। আতাউর আলম বলে ওঠে,"ওটাও আমার লেখা।"

কাগজটায় চোখ বুলিয়ে সামিন বলে ওঠে,"আপনি বই বের করলেই পারতেন। আপনার লেখায় সাহিত্যিক একটা টাচ আছে। অবশ্য আমি এসব কম বুঝি। পলিটি*ক্যাল সাইন্স নিয়ে ঠেলে ঠুলে মাস্টার্স শেষ করেছি। পড়াশোনায় বরাবর অমনযোগী ছিলাম। এসব পলি*টিক্সই আমাকে টানতো বেশি। বাকিটা তো বাবাকে দেখেই আগ্রহ পেতাম।"

আতাউর আলম ম্লান হেসে বলে,"তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের ধ্বস কিন্তু আমার জন্য নেমেছিলো। জানো তুমি?"

_না, এটা ভুল কথা। বাবার পিঠ পিছে তার ভাইয়ের কু-কীর্তি আর ইলহামের জন্য বাবা তার পজিশন খুইয়েছে,আমি বরাবর এটাই মেনে এসেছি। আপনি সাংবাদিক, আপনার কাজই তো সত্যি তুলে ধরা।

আতাউর আলম বলে,"আসল কথায় আসি। সরকারি ফান্ড সিন্ডি*কেটের আর্টিকেল টা আমি লিখেছি, ছাপিয়েছি। এই ব্যাপারে কি তোমার কোনো আপত্তি আছে?

সামিন আতাউর আলমের চোখের দিকে তাকিয়ে বলে,"আপত্তি কেনো থাকবে? আপনি কি ভাবছেন সিন্ডি*কেটের সাথে আমি জড়িত? মেয়ে জামাই হিসেবে ছাড় দিতে চাচ্ছেন?

_ঠিক তা নয়।

আমতা আমতা করে বলে আতাউর আলম।

সামিন ঠান্ডা গলায় বলে,"পুলিশ তদন্ত করবে, উপর মহল থেকে লোক আসবে, সত্যিটা সামনে আসবে। তেরো কোটি টাকা জনগণের জন্য ছিলো, আমার দলের কর্মীদের জন্য নয়। আমিও চাই এর একটা সুরাহা হোক।"

***

"আসতে গেলে কেন? আমি কি বাচ্চা? পথ চিনে আসতে পারিনা?"

ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে আছে ইশমাম। সামিন চোখ থেকে সানগ্লাস খুলে ফেলে বলে,"আমি তোদের তেমনটাই মনে করি!"

ইশমাম চুপ করে বসে থাকে। সামিন বলে,"আমিও তখন খুব ছোটো, মাকে দেখতাম তোদের ডায়াপার চেঞ্জ করে দিতে। আমি দুদিন ভালো করে লক্ষ্য করলাম, তারপর নিজেই চেষ্টা করলাম। সেই থেকে তোর আর ইশুর ডায়াপার চেঞ্জ করেছি। আমার কাছে এখনও মনে হয় তোরা অমনই।"

সামিনের কথায় ম্লান হাসে ইশমাম। তারপর বলে ওঠে,"বাড়িতে কে কে আছে এখন ?"

_তোর বড় ভাবী, মেজো ভাবী, ইহান। ইলহাম চিটাগাং গিয়েছে, ইশিতা ইউনিভার্সিটিতে।

_গাড়ি ডানে ঘোরাও ভাইয়া।

সামিন অবাক হয়ে বলে,"কেনো?"

_আগে বাবার কবর জিয়ারত করতে যাবো।

দুই ভাই চুপচাপ। ইশমাম বলে ওঠে,"বাবা বলতেন,আমি যেন তার জা*নাজায় অন্তত থাকি। সেটাও তো হয়নি। আমি কিন্তু বাবার অপদার্থ ছেলেই প্রমানিত হলাম ভাইয়া। বাবা খুব একটা মিথ্যা বলতেন না।"

সামিন কোনো জবাব দেয়না। গাড়ি ঘুরিয়ে তারা গ্রামের বাড়ির দিকে যায়। সেখানে দুই ভাই গোটা সকালটা কাটিয়ে আসে, তাদের বাবার সাথে।

গাড়ি শান্তিনীড়ের গেইট দিয়ে ভেতরে ঢোকে। কলিং বেল টিপে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। আলো এসে দরজা খোলে, ইশমাম নিচু স্বরে আলোকে সালাম দিলে আলো সালামের উত্তর দেয়।

সামিন হাসতে হাসতে আলোকে বলে,"রান্না বান্না হয়েছে?"

আলো মাথা নাড়ায়।

_রান্নায় লবণ হয়েছে কিনা দেখেছো?

মাথা নাড়িয়ে আলো অস্ফুট স্বরে বলে,"দেখেছি।"

সামিন বলে,"ঠিকাছে,ও ফ্রেশ হলে ওকে খেতে দিও। প্লেনে কিছু খায়নি।"

আলো মাথা নাড়িয়ে ইশমামের দিকে তাকায়। ইশমাম চুপচাপ সোজা হেটে সিঁড়ির কাছে যায়।

আলো রান্নাঘর থেকে সবকিছু নিয়ে এসে টেবিলের ওপর সাজিয়ে রাখে। অনেক সময় নিয়ে সে এসব রান্না করেছে।

হুট করে সামিন তাকে পেছন থেকে জরিয়ে ধরে। আলো চ'ম'কে ওঠে, নিচু স্বরে বলে,"ইহান বাড়িতে ছোটাছুটি করছে।"

সামিন হেসে আলোকে ছেড়ে দিয়ে মুখোমুখি দাঁড় করায়। তারপর আলোর চোখে চোখ রেখে বলে,"আজ তোমাকে একটু একটু গিন্নিদের মতো লাগছে।"

_একটু একটু? পুরোপুরি নয় কেনো?

সামিন হেসে আলোর আঁচল টেনে মাথায় তুলে দিয়ে বলে,"কারন,এটা ছিলো না।"

***

"আমি আজ ও বাড়িতে একটু যেতে চাচ্ছি আবার। কিছু ঘন্টা থেকে চলে আসবো। জরুরি কিছু কাজ আছে।"

সামিন পাঞ্জাবির বোতাম লাগাতে লাগাতে আলোর দিকে তাকায়। আলো বলতে থাকে,"বিজনেস যেটা শুরু করেছিলাম সেটা আম্মুকে বুঝিয়ে দিয়ে আসবো। আরো দুজন লোক নেওয়া হয়েছে।"

_আমার শাশুড়ি হবে কোম্পানির নতুন ব্যাবস্থাপনা পরিচালক? বাহ , বেশ ভালো!

আলো হাসে। তারপর বলতে থাকে,"টিউশনি টা ছেড়ে দিয়ে খারাপ লাগছে খুব। দিদিমণি আজকেও ফোন দিয়েছিলেন।"

সামিন আলোর দিকে এগিয়ে আসে। জরিয়ে ধরে বলে,"খুব উপার্জন করতে ইচ্ছে করে?"

_হু।

আলো মৃদু স্বরে বলে। তারপর বলে ওঠে,"কতগুলো টাকা বেতন পেতাম জানেন? সাড়ে ছয় হাজার টাকা।

সামিন অবাক হওয়ার ভান ধরে বলে,"সাড়ে ছয় হাজার টাকা? বাবা! এতগুলো টাকা!"

আলো বুঝতে পেরে যায় সামিন তাকে খোঁচা মারছে, সে মুখ ভার করে বলে,"আপনার কাছে সাড়ে ছয় হাজার টাকা কিছু না কিন্তু আমার কাছে অনেক কিছু। সপ্তাহে পাঁচদিন সন্ধ্যা ছয়টা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত ছোটো ছোটো বাচ্চাদের পড়িয়ে মাস শেষে যখন টাকাগুলো পেতাম, তখন অন্যরকম একটা আনন্দ হতো মনে। ঐ সাড়ে ছয় হাজার টাকায় ভাই দুটোকে কত কি যে কিনে দিতাম! আব্বু তো ওদের এক একটা সাবজেক্টের টিউশন ফি দিতে দিতেই হিমশিম খেয়ে যেত, ওদের শখ পূরণ করতো কখন! "

সামিন আলোর দিকে তাকিয়ে আছে। কপালের কাছে এলোমেলো হয়ে থাকা চুলগুলো সরিয়ে দিতে দিতে বলে,"আমার কাছে একটা চাকরির অফার আছে। একটা এজেন্সি চালাতে হবে। সপ্তাহে তিনদিন, সন্ধ্যা ছয়টা থেকে-রাত আটটা বসলেই হবে। বেতন আট হাজার টাকা। করবে চাকুরী টা? নতুন এজেন্সি তাই মালিক এর থেকে বেশি বেতন দিতে পারবে না।"

আলো অবাক হয়ে তাকায় সামিনের দিকে। তারপর বলে,"এজেন্সি?কি এজেন্সি? কোথাকার এজেন্সি?"

সামিন মৃদু হেসে তার ল্যাপটপ নিয়ে বসে, আলোকে কাছে টেনে পাশে বসিয়ে বলতে থাকে,"একটা এজেন্সি খুলেছি নতুন। প্রতিবন্ধী ও বিধবা নারীদের উন্নয়নে কাজ করবে। এছাড়াও গরীব স্টুডেন্ট যারা তুখোড় মেধাবী কিন্তু যাদের মেডিকেল কোচিং, ভার্সিটি কোচিং করার সামর্থ্য নেই তাদেরকে সাহায্য করা হবে। প্রাথমিক ভাবে এই দুটো প্র*জেক্ট হাতে নিয়েছি। এর বাইরে সামর্থ্য কিংবা অর্থায়ন নেই।"

আলো অবাক হয়ে সামিনের দিকে তাকিয়ে থাকে। কয়েক মূহুর্ত সময় নিয়ে বলে,"এসব কখন করলেন?"

_এই দুদিন এসব নিয়েই ছোটাছুটি করেছি।

আলো তাকিয়ে থাকে। সামিন হেসে বলে,"আট হাজার টাকার বেশি কিন্তু দিতে পারবো না। যদি অফারটা পছন্দ হয় তবে আমাকে তোমার সিভি দিও।"

_এতোকিছু কিভাবে ম্যানেজ করবেন? পারিবারিক ব্যাবসার টাকা তো আপনার একার না। আপনার ভাই বোনদের ও । এমনিতেই বেশ কিছু এজেন্সিতে দিচ্ছেন টাকা, এতিমখানা চালাচ্ছেন। নিজেকে কি রাজা রাম মোহন রায় ভেবে বসে আছেন?

সামিন হেসে ফেলে। তারপর হাসি থামিয়ে বলে,"কে বলেছে আমি সব টাকা দেবো। আমিও দেবো, তবে সামান্য। বাকিটা তুমি ম্যানেজ করবে।"

_আমি কিভাবে?

_প্রত্যেক মাসে এজেন্সি থেকে ক্যাম্পেইন করা হবে বিভিন্ন যায়গায়। কলেজ, ইউনিভার্সিটি তে। সেখান থেকে লোকজন যা দেবে, সেটাই ব্যায় হবে ।

আলো সবটা বুঝতে পেরে চুপ করে থাকে। সামিন বলে,"করবে চাকুরী টা? আমি বিশ্বস্ত আর পরিশ্রমী একজন কর্মী চাচ্ছি।"

_কিন্তু এভাবে সরাসরি নিজের বৌকে চাকুরী দেওয়া কি ঠিক? অন্যান্য বেকারদের তো হক আছে।

_স্বজনপ্রীতি করলাম। মাঝেমাঝে মেয়র একটু দূর্নীতি করবে না? একেবারে সৎ থাকলে কেমন দেখায়?

আলো হেসে ফেলে, তারপর বলে, "নাম কি আপনার এজেন্সির? আমি কাল সিভি জমা দেবো।"

সামিন কয়েক পলক আলোর দিকে তাকিয়ে বলে,"এজেন্সির নাম ইয়াসার-আলো ফাউন্ডেশন।"

আলো সামিনের দিকে তাকিয়ে থাকে। সামিন তার স্ত্রীর হাতে চু*মু খেয়ে বলে,"শাহজাহানের মতো স্ত্রীর জন্য তাজমহল তো গড়তে পারবো না। আমি একটা চাকুরী দিলাম। তুমি খুশি আছিয়া?"

***

খাবার টেবিলে চার ভাইবোন মিলে হাসাহাসি করতে করতে খাচ্ছে। কতদিন পরে আবার তারা এক সাথে খেতে বসেছে।

আলো রান্নাঘর থেকে উঁকি দিয়ে দেখছে। তার ইচ্ছে করছে না ভাই বোনদের মাঝখানে তৃতীয় ব্যক্তি হয়ে ঢুকতে। ভাইবোনদের নিজেদের কত কথা থাকতে পারে। সে বরং সবার খাওয়া হয়ে গেলেই খাবে।

সামিন আশেপাশে তাকিয়ে আলোকে ডাকতে থাকে। আলো ধীরপায়ে এগিয়ে যায়। ইশিতা মাথা ঘুরিয়ে আলোর দিকে তাকিয়ে বলে,"তুমি রান্নাঘরে ঘাপটি মে'রে আছো কেনো ভাবী? এখানে আমরা কত গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করছি। তুমি শুনবে না?"

আলো কিছু বলতে যাবে তখন সামিন বলে,"বসো এখানে, রিতু খেয়েছে, আমরাও খাচ্ছি। তুমি অপেক্ষা করছো কিসের?"

আলো বাধ সাধতে যাবে তখন সামিন একটা চেয়ার টেনে বলে,"বসো।"

আলো বসে পরে। ইশমাম খাবার নাড়াচাড়া করতে থাকে। হঠাৎ সামিন সবার মুখের দিকে তাকিয়ে খেতে খেতে বলে ওঠে,"এখানে সবাই যখন আছি তাহলে আমি কথাটা বলি। তোদের সবাইকে তো সবসময় পাওয়া যায় না।"

আলো মাথা তুলে তাকায়। এই লোক এখন কি বলবে! ইশমামের বিয়ের কথা নাকি! তাহলে তো এখানে আবার ঠান্ডা যু*দ্ধ লেগে যাবে! আলো অনুমানের উপর ভিত্তি করে সামিন কে থামিয়ে দিয়ে বলে,"খাওয়া শেষ করে বলুন।"

সামিন আলোর কথা গায়ে না মেখে বলতে থাকে,"আমি আর ইলহাম একটা মেয়ে পছন্দ করে রেখেছি ইশমামের জন্য।"

ইশমাম খাওয়া থামিয়ে ভাইয়ের দিকে তাকায়। ইশিতা আনন্দিত গলায় বলে,"তাই নাকি! ঐ ফিহা বলে মেয়েটা তাই না? সি ইজ ঠু মাচ কিউট ভাইয়া। বেশ মানাবে ওদের।"

সামিন খুশি খুশি গলায় বলে,"হ্যা তোর বড় ভাবীও ওকে পছন্দ করেছে।"

ইশমাম আলোর দিকে তাকায়। আলো মাথা নিচু করে ফেলে। চোখ ঘুরিয়ে ইশমাম বড় ভাইয়ের দিকে তাকায়। সামিন ঠান্ডা গলায় বলে,"কি? এভাবে দেখছিস কি? গ্লাস ভেঙে হাত কা*টবি?"

একটা গ্লাস ইশমামের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে,"নে, এটা ভেঙে ফেল।"

ইশমাম ঠান্ডা গলায় বলে,"কেনো? আমাকে নিয়ে পরেছো কেনো? ভাইয়া, ইশিতা মেয়ে, ওর বিয়ের ব্যাপারে মাথা না ঘামিয়ে আমাকে নিয়ে পরেছো কেনো?

ইশিতা চেঁচিয়ে ওঠে,"তুই নিজে বাঁচতে আমার কথা ওঠাচ্ছিস কেনো ভাই? আমার সাথে তোর কোন জন্মের শ*ত্রুতা?"

_তো তুই এতো খুশি কেনো আমার বিয়ে নিয়ে? তোর এতো আনন্দ কিসের?

মুহুর্তেই ঝ*গড়া লেগে যায় দুজনের মধ্যে। আলো হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে। এরা এখনো এভাবে চুলো*চুলি করে! কি অদ্ভুত!

ঝগড়ার এক পর্যায়ে ইশমাম ইশিতাকে বলে ফেলে,"এখনো তো তুই বেকার বেকার ভাইদের ঘাড়ে খাচ্ছিস। না চাকরির চেষ্টা করছিস! না বিয়ের জন্য রাজি হচ্ছিস! তুই আমার লাইফ নিয়ে এতো মাথা ঘামাচ্ছিস কেন!"

সামিন ইশমামকে ধ*মক দিয়ে থামিয়ে দেয়। ইশিতা কিছুক্ষণ ইশমামের দিকে তাকিয়ে থেকে পানির গ্লাস উঠিয়ে ইশমামের মুখে ছুড়ে দেয় পানি। তারপর গটগট করে হেঁটে দোতলায় উঠে যায়। ইশমাম চুপচাপ খেতে থাকে ভেজা অবস্থাতেই। তারপর খাওয়া শেষ করে উঠে চলে যায়, ইশমামের পিছু পিছু উঠে চলে যায় ইলহাম। খাবার টেবিলে বসে থাকে আলো এবং সামিন।

আলো সামিনের দিকে তাকিয়ে বলে,"কি দরকার ছিলো?"

সামিন হাত ধুয়ে উঠে পরতে পরতে বলে,"আমি হাল ছাড়বো না।"

টেবিল পরিষ্কার করে আলো দোতলায় উঠে দেখে ইশমাম আর ইশিতা বসে বসে ক্রিকেট ম্যাচ দেখছে! আলো বেশ অবাক হয়। এই মাত্রই তো দুটোতে হাতা*হাতি, মারা*মারি করছিলো! এরই মধ্যে মিল হয়ে গেল!

এরা চার ভাইবোন খুবই অদ্ভুত!

একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আলো ঘরে চলে যায়। বিছানায় বসে বই টা মাত্র হাতে নিয়েছে একটা ড্রামায় চোখ বুলাবে বলে, তখনই সামিন বারান্দা থেকে এসে আলোর কোলে মাথা রেখে শুয়ে পরে। চোখ দু'টো বন্ধ করে রেখেছে সে। আলো নাক কুঁ'চকে বলে,"সিগারেট খেয়েছেন? বাহ! এই চমৎকার গুন সম্পর্কে আমি অবগত ছিলাম না!"

_রা'গ করলে? বছরে দুই টা খাই। এই আজ একটা খেয়েছি, আরেকটা ছয়মাস পরে খাবো।

আলো ঠান্ডা গলায় বলে,"না রাগ করবো কেনো? আমার তো এতো খুশি লাগছে, এতো খুশি লাগছে যে খুশিতে ইচ্ছে করছে আপনাকে ঘর থেকে বের করে দেই।"

সামিন মৃদু হেসে বলে,"মাথার চুল টেনে দাও।"

_মামার বাড়ির আবদার গুলো করতে বেশ পারেন মেয়র সাহেব।

_আবদার নয়, স্ত্রী হবার এগারো তম শর্ত। নাও, চুল টেনে দাও‌। বত্রিশ বছর হয়ে গিয়েছে আমার, আর দু'বছর পরেই টাকলা হতে শুরু করবো। তখন স্বামীর চুল টেনে দেওয়ার জন্য মেঝেতে শুয়ে গড়াগড়ি করে কাদলেও চুল পাবে না। এখন মন ভরে টেনে রাখো বৌ !

***

কমলা রঙের শাড়িটার দিকে তাকিয়ে থেকে আলো মুচকি হেসে শাড়িটা হাতে তুলে নেয়। লোকটা একটা আস্ত পাগল। আলমারি ভর্তি শাড়ির প্রায় অর্ধেক শাড়িই কমলা রঙের। কি পেয়েছে এই রঙটাতে সে! আর কোনো রঙে বুঝি আলোকে মানায় না!

আঁচল গাঁয়ে জরিয়ে নিয়ে মাথায় তোয়ালে পেঁচিয়ে ওয়াশ রুম থেকে বের হয়। সামিন বিছানায় আধশোয়া হয়ে ল্যাপটপে কিছু টাইপ করছিলো। আলো সামিনের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে মৃদু আওয়াজ করে গলা খাঁকারি দেয়। সামিনের কোনো হেলদোল নেই। সে একমনে ল্যাপটপে কিছু একটা দেখছে। আলো মাথা থেকে তোয়ালে খুলে ফেলে বলে,"শুনছেন। আমাকে কেমন লাগছে?"

সামিন আলোর দিকে না তাকিয়েই ল্যাপটপে টাইপ করতে করতে অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে বলে ,"হু, সুন্দর লাগছে।"

_আরে দেখে বলুন না!

_ব্যস্ত আলো। পরে দেখবো, যাও।

আলো মাথা ঘুরিয়ে সামিনের দিকে তাকায়। তারপর কন্ঠে এক রাশ অভিমান মিশিয়ে বলে ওঠে,"এমনটা তো আমি শুরুতেই আন্দাজ করেছিলাম। বাংলাদেশের ছেলেদের এটা একটা নীতি, শখের নারী প'টে গেলে তখন আর পাত্তা দিতে ইচ্ছে করে না।"

সামিন কিছুক্ষণ কিবোর্ডে টাইপ করে আলোর দিকে না তাকিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বলে,"আমি পাত্তা দেয়া শুরু করলেই তো বলে দেবে, ছাড়ুন ছাড়ুন তরকারি পু'ড়ে যাচ্ছে, ইহান আসছে, জাপানে টর্নেডো হচ্ছে, পৃথিবী উল্টে যাচ্ছে। এখন ড্রামা না করে যাও। আমি সত্যিই ব্যাস্ত আছিয়া!"

আলো শীতল চোখে সামিনের দিকে তাকিয়ে থাকে। সামিন আলোর দিকে না তাকিয়েই বলতে থাকে,"স্ত্রী হবার বারো তম শর্ত হচ্ছে, স্বামী ব্যস্ত থাকলে তার জন্য চমৎকার এক কাপ কফি বানিয়ে নিয়ে এসে তাকে দেওয়া। তার পাশে বসে তার কাঁধে মাথা রাখা, এবং অবশ্যই মুখে তালা লাগিয়ে রাখা যাতে স্বামীর কাজে কোনো অসুবিধা না হয়।"

আলো বিরস মুখে রান্নাঘরে ঢুকে কফির জন্য পানি গরম করতে থাকে। সিতারা অবাক হয়ে বলে,"কি হয়েছে ভাবী? মুখ শুকনো কেনো আপনার? কিছু হয়েছে?"

আলো কপাল কুঁচকে বলে,"বলো তো সিতারা পৃথিবীতে সবথেকে পল্টিবাজ প্রানী কোনটা? মানে দ্রুত রং বদলায় কারা?"

সিতারা বলে,"গিরগিটি ভাবী।"

আলো মাথা নাড়িয়ে বলে,"হয়নি।"

সিতারা কিছুক্ষণ চিন্তা করে বলে,"তবে কি বাংলাদেশের নেতা-খাতারা?"

_হয়নি,তাদের থেকেও পল্টিবাজ।

সিতারা বলে,"বুঝতে পারছি না ভাবী। আপনি বলেন।"

_সেই প্রানীর নাম হলো স্বামী। এরা প্রথম প্রথম একরকম থাকে, পরে রূপ বদলে ফেলে।

সিতারা মাথা ঝাঁকিয়ে আলোকে সমর্থন করে বলে,"ঠিক বলেছেন ভাবী,এরা মিনিটে মিনিটে পল্টি নেয়। ঘরভর্তি মানুষের সামনে বৌকে ধ'ম'ক দিয়ে বীরপুরুষ সাজে আর রাত বারোটার পরে এসে বৌয়ের হাত পা ধরে মাফ চায়। আমি ভুক্তভোগী ভাবী!

আলো শুকনো মুখে বলে,"হু, আমারো সেদিন আসতে চলেছে সম্ভবত!"

***

অফিস ঘর টা বেশ পছন্দ হয়েছে আলোর। সামিন সম্ভবত তার জন্যই এতোটা শৌখিন ভাবে সাজিয়েছে ঘরটাকে। নয়তো লোকটা তো পুরো অগোছালো একটা লোক।

সপ্তাহে তিনদিন তাকে এজেন্সির এই অফিসে বসতে হয়। রবি,মঙ্গল ও বৃহস্পতিবার, এই তিনদিন হচ্ছে তার অফিস টাইম। আলো প্রথমে বেশ অবাক হয়েছিলো। সন্ধ্যা ছয়টা থেকে আটটা কোনো অফিস টাইম নাকি! পরে জেনেছে সামিন তারজন্য এমন একটা নিয়ম করে রেখেছে। যাতে সে ইউনিভার্সিটি যেতে পারে এবং অফিসেও থাকতে পারে। বড় কথা হচ্ছে সামিন নিয়মিত আলোকে এজেন্সি থেকে নিয়ে যায়।

আপাতত চারজন ছাত্র ছাত্রীকে মেডিকেলের এডমিশন যু*দ্ধে অংশ নিতে কোচিং করার যাবতীয় খরচ দেওয়া হয়েছে, সবাই চাষাভুষা পরিবারের, ঠিকমতো খেতে পারে না। এবং এটা সম্পূর্ণ সামিন দিয়েছে। তাদের ফান্ডে এখনো দানের অর্থ জমা হতে শুরু করেনি।

ঘড়ির দিকে তাকিয়ে আলো উঠে দাঁড়ায়। প্রায় রাত আটটা বেজে গিয়েছে। সামিনের এখনো আসার নাম নেই। হয়তো কোনো কাজে আটকে গিয়েছে। সামিনের পার্টি অফিস থেকে এজেন্সির দূরত্ব পায়ে হেঁটে দশ মিনিট। আবাসিক এলাকা তাই জায়গাটা একটু নির্জন। অফিসের সহকারী মেয়েটিকে বিদায় দিয়ে আলো দাড়োয়ান চাচাকে বলে তালা লাগিয়ে দেয় অফিস ঘরটিতে। সিদ্ধান্ত নিয়েছে আজ সে গিয়ে সামিনকে চ'ম'কে দেবে পার্টি অফিসে। ছাতা হাতে নেমে পরে আলো, বাইরে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়ছে। লোকজন নেই কোন রাস্তায়। দূরে একটা মাইক্রো গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। আর মাঝে মাঝে দুয়েকটা ট্রাক চলে যাচ্ছে।

আলো এদিক ওদিক তাকিয়ে সামনে দুই পা বাড়াতেই হঠাৎ মৃদু গোঙানির আওয়াজ শুনতে পায়। মনে হচ্ছে কারো মুখ চেপে ধরা হয়েছে। হঠাৎ আলোর ভেতরটা কেমন কেঁ*পে ওঠে। ঘাড় ঘুরিয়ে আশেপাশে ভালো করে দেখতে থাকে সে। কোথাও কিছু নেই একটা মাইক্রো গাড়ি ছাড়া। হঠাৎ একটা যাত্রীবাহী অটোরিকশা চলে গেলো আলোর সামনে দিয়ে। আলো ব্যাপারটাকে পাত্তা না দিয়ে ঘুরে আবারও সামনে পা বাড়ায়। আবারও সেই গোঙানির আওয়াজ শুনতে পায় সে।

থেমে যায় আলো, মাথা ঘুরিয়ে তাকাতেই দেখে কোথা থেকে একজন লোক ছুটে এসে দূরে দাঁড়িয়ে থাকা মাইক্রো গাড়িতে উঠে পরে। ল্যাম্পোস্টের ঘোলাটে আলোতে একপলকের জন্য আলো লোকটার মুখটা দেখতে পেলো। কিছু একটা অনুমান করার আগেই গাড়িটা সাই সাই করে আলোর সামনে দিয়ে চলে যায়। তখনই কোনো মেয়েলি কন্ঠের কান্নার আওয়াজ শুনতে পায় সে।

আলো হতভম্ব হয়ে তাকায় সেদিকে। মাথা কাজ করছে না তার। ফোন বের করে গাড়িটার নাম্বার প্লেটের ছবি তুলে এদিকে ওদিক তাকিয়ে লোকজন ডাকতে থাকে আলো। খুব কাছেই কুরিয়ার সার্ভিসের একটা অফিস। সেখান থেকে দাড়োয়ান সহ বেশ কিছু কর্মচারী ছুটে আসে।

আলো কাউকে পুরো ব্যাপারটা বিশ্বাস করাতে সক্ষম হয় না। হাল ছেড়ে দিয়ে অটোতে উঠে সামিনের পার্টি অফিসে চলে যায়।

সামিন ইয়াসারের পার্টি অফিসে সালিশ বৈঠক বসেছে আজ। দু'টো ছাত্রদলের মধ্যে সংঘর্ষ নিয়ে সালিশ বিচারের বৈঠক।

আলো গেইট থেকে দ্রুতপায়ে বৈঠক খানা হয়ে সোজা সামিনের মুখোমুখি দাঁড়ায়। সামিন সালিশ রেখে উঠে দাঁড়িয়ে আলোকে নিয়ে নিজের ঘরটাতে আসে, ধ'ম'কে'র সুরে বলে,"সাহস ভালোই তোমার। বলেছি না আমি না যাওয়া পর্যন্ত বের হবে না একদম। এতো তা*ড়া ছিলো ফোন দিতে গাড়ি পাঠিয়ে দিতাম।"

_আমি ফোন দিয়েছি আপনি ফোন ধরছিলেন না।

সামিনের মনে পরে যায় সে সালিশের জন্য ফোনটা সাইলেন্ট করে রেখেছিলো। তারপর বলে ওঠে,"তো? ইশমামকে ফোন দিতে, ও এসে নিয়ে যেতো।"

আলো সামিনের কথার জবাব না দিয়ে বলে ওঠে,"বাদ দিন। আমার কথা এখন মন দিয়ে শুনুন। আমার সাথে একটু থানায় যাবেন চলুন।"

সামিন অবাক হয়ে বলে ,"থা*নায় কেনো?"

আলো সব ঘটনা খুলে বলে সামিনকে। সব শুনে সামিন পাত্তা দেয়না প্রথমে, মজার ছলে বলে,"হয়তো কোনো অদ্রিতা আলোকে কোনো সামিন ইয়াসার তুলে নিয়ে গেছে। "

আলো রাগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সামিনের দিকে। চেঁচিয়ে উঠে বলে,"আমি মজা করছি না, এই দেখুন গাড়ির নাম্বার প্লেট।"

সামিন আলোর ফোনে ছবিটার দিকে তাকিয়ে থেকে কিছুক্ষণ পরে বলে ওঠে,"এটা তো জাবিরের গাড়িটা,ও এই গাড়িটা ব্যাবহার করে।"

আলো চাঁপা স্বরে চেঁ'চি'য়ে ওঠে,"হ্যা হ্যা। আমার মনে পরেছে। ঐ লোকটার মুখ আমি দেখেছি। ঐ লোকটা জাবির ছিলো। জাবিরই ছিলো।"

সামিন আলোর দিকে তাকিয়ে আছে। আলো বলতে থাকে,"চলুন মেয়র সাহেব। আমার মনটা কেমন কু গাইছে। আমি স্পষ্ট শুনেছি সেই নারীকন্ঠের আর্তনাদ!"

চলমান......

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৫০তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন