#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে
#পর্বসংখ্যা_৫২
#Esrat_Ety
ব্রেকফাস্ট টেবিলে সামিন শুধুমাত্র একটা রুটির অর্ধেক এবং কিছুটা সবজি খেয়ে উঠে পরে। আলো চুপচাপ পাশে বসে খাচ্ছিলো, সামিন কে দেখে বলে,"কফি টা খাবেন না?"
_ইচ্ছা করছে না। তুমি খাওয়া হয়ে গেলে ঘরে এসো, কথা আছে।
আলো সামিনের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। সামিন উঠে চলে যায়।
কি কথা আছে! সামিন কি তাকে ঐ কবীর আলমগীরের কাছে ক্ষমা চাইতে নিয়ে যাবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে! খাবার টা আলোর গলা দিয়ে নামে না আর। হাত ধুয়ে উঠে পরে, দ্রুত পায়ে সিঁড়ি ভেঙে উপরে চলে যায়।
ঘরে সামিন বিছানায় চুপচাপ বসে ছিলো। আলোকে দেখে বলে,"চলো।"
আলো অস্ফুট স্বরে বলে,"কোথায় যাবো?"
সামিন উঠে দাঁড়ায়,ওয়ালেট টা পাঞ্জাবির পকেটে ঢুকিয়ে নিয়ে মৃদু স্বরে বলে,"কবীর আলমগীরের বাসভবনে।"
আলো সামিনের দিকে তাকিয়ে থাকে। সামিন আলোর দিকে একপলক তাকিয়ে বলে,"তৈরি হও।"
_আপনি? আপনি শেষে....
কাঁপা কাঁপা গলায় বলে আলো চুপ হয়ে যায়।
সামিন বলে,"এতো কথা না বলে তৈরি হও। এরপরে থানায় যেতে হবে আমাদের।"
_কি করবেন? মাফ চাইয়ে থানায় গিয়ে আমার স্টেটমেন্ট উঠিয়ে নেবেন? আমি সেদিন রাতে কিছু দেখিনি, কিছু শুনিনি, সব মিথ্যা?
সামিন আলোর দিকে তাকিয়ে বলে, "রেডি হও।"
আলো দীর্ঘসময় ধরে সামিনের দিকে তাকিয়ে থেকে অভিমানী গলায় মৃদু স্বরে বলে,"চলুন। আমি তৈরি।"
গাড়িতে আলো নিশ্চুপ হয়ে বসে থাকে দৃষ্টি সামনের দিকে রেখে। সামিন আড়চোখে আলোর দিকে একপলক তাকায়। গাড়ি কবীর আলমগীরের বাসভবনের গেইট দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে।
লিভিং রুমে কবীর আলমগীর তার দলীয় সদস্যদের নিয়ে বসেছিলো। দাড়োয়ান এসে কানে কানে বলে,"স্যার! ইয়াসার মির্জা তার ওয়াইফ নিয়ে এসেছে।"
কবীর আলমগীরের মুখে হাসি ফোটে। দলের কর্মীদের দিকে তাকিয়ে গদগদ হয়ে বলে,"দেখেছো কত বাধ্য আমার পোষ্য সামিন? তোমরা শুধু শুধু ওকে নিয়ে টেনশন করো।"
তারপর দাড়োয়ানের দিকে তাকিয়ে বলে,"যাও । ওদের এখানে আসতে বলো।"
সামিন আলোর হাত ধরে হাঁটছে। আলো অভিমানী দৃষ্টিতে শুধু তার স্বামীকেই দেখছে। মানুষটাকে কি সে ভুল চিনলো তবে? এতোটাই ভুল?
সামিনকে দেখে কবীর আলমগীর একটা প্রশ্বস্ত হাসি দেয়। সামিন আলোর হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে । কবীর আলমগীর বলে ওঠে,"এসো সামিন। নাস্তা করেছো? তোমার আন্টি আজ মাটন ভুনা আর পরোটা করেছে তুমি আসবে বলে, খেয়ে দেয়ে তারপর নিজেদের মধ্যে সমঝোতা করবো। এসো, বৌমাকে নিয়ে এসো।"
_সমঝোতা মানে?
সামিন ঠান্ডা গলায় জানতে চায়। কবীর আলমগীর সামিনের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে,"এই কদিন যা পাগলামি করেছো তারজন্য মাফ চাইতে হবে। অনেকটা ইমেজ ন'ষ্ট হয়েছে আমার ।"
_কে মাফ চাইবে?
_তোমার বৌ।
সামিন বাঁকা হাসি হেসে বলে ওঠে,"মাফ? আমার বৌ কারো কাছে মাফ চাইবে না। "
আলো সামিনের দিকে মাথা তুলে তাকায়। কবীর আলমগীর শীতল চোখে তাকিয়ে আছে। সামিন বলতে থাকে,"না আমার বৌ কারো কাছে মাফ চাইবে না স্টেটমেন্ট উঠিয়ে নেবে। ও যা দেখেছে, শুনেছে সবটা সত্যি। ও সেভাবেই সাক্ষী দেবে।"
_সামিন তুমি কিন্তু.....
_বললাম না আমার বৌ কারো কাছে মাফ চাইবে না? কথা কি কানে যায়নি?
চেঁচিয়ে ওঠে সামিন। দলীয় কর্মীরা সবাই আ'ত'ঙ্কি'ত মুখ নিয়ে সামিন ইয়াসারের হিং'স্র মুখটার দিকে তাকিয়ে আছে।
জাবির তে'ড়ে আসে, দাঁত খিচিয়ে বলে,"তুই মামার সাথে এভাবে কথা বলছিস!"
_ওখানেই দাঁড়িয়ে যা, পুঁ'তে ফেলবো আমি।
ধমকে বলে ওঠে সামিন।
জাবির দাঁড়িয়ে পরে। সামিন কবীর আলমগীরের দিকে তাকিয়ে তেজী কন্ঠে বলে ওঠে,"আমার বৌ তার স্টেটমেন্ট ফিরিয়ে নিয়ে মাফ চাইবে না, কারন মেয়েটির সন্ধান পাওয়া গিয়েছে। আপনার গুণধর ভাগ্নের গাজীপুরের ফার্মহাউস থেকে উদ্ধার করা হয়েছে তাকে। মেয়েটা বর্তমানে পুলিশ হেফাজতে। আর দশমিনিটের মধ্যে পুলিশ আসছে আপনার ভাগ্নেকে এ্যা'রেস্ট করতে।"
কবীর আলমগীর জাবিরের দিকে তাকায়। জাবির মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। সামিন কবীরকে বলতে থাকে,"কি যেনো বলেছিলেন কাল রাতে? দল থেকে বের করে দেবেন, হ্যান করবেন ত্যান করবেন। আপনার নামে তো কেইস ফাইল হচ্ছে আংকেল। আগে নিজের গদি সামলান। "
কিছুক্ষণ চুপ থেকে সামিন বলে ওঠে,"নিয়ে যাচ্ছি আমি আমার বৌকে দিয়ে পুনরায় সাক্ষী দেওয়াতে। কারো বুকের পাটা থাকলে সে যেনো সামিনের বৌকে কিছু করে। "
কবীর আলমগীর উঠে দাঁড়িয়ে যায়। সামিন আলোর হাত ধরে যেভাবে টানতে টানতে নিয়ে এসেছিলো সেভাবেই টানতে টানতে নিয়ে চলে যায়।
পুরো রাস্তায় আলো সামিনের দিকে তাকিয়ে ছিলো। সামিন গম্ভীর মুখে ড্রাইভ করছিলো। থানায় গিয়ে লিখিত বক্তব্য দিয়ে বেরিয়ে সোজা বাড়িতে যায় তারা। ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে সামিন আলোর দিকে তাকায়, গম্ভীর কন্ঠে জানতে চায় সামিন,"কি ভেবেছিলে? বৌকে দিয়ে মাফ চাওয়াবে সামিন ইয়াসার?"
আলো চুপ করে থাকে। সামিন বলতে থাকে,"আমার ভেবে খারাপ লাগছে তুমি এটাই বিশ্বাস করেছিলে। কাল রাত থেকে ঠেশ মে'রে মে'রে কত কথা শুনিয়েছো আমায়।"
_সরি।
আলো অস্ফুট স্বরে বলে ওঠে। সামিন ধমক দিয়ে বলে,"কিসের সরি? দুম করে যা মুখে আসবে বলে দেবে, তারপর আবার সরি? দরকার নেই তোমার সরির।"
রাগে কাঁপতে কাঁপতে সামিন বারান্দায় চলে যেতে নিলে আলো সামিনের হাত টেনে ধরে। সামিন মুখ ঘুরিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বলে ওঠে,"কি?"
_কিছু বলতে চাচ্ছি আপনাকে মেয়র সাহেব।
সামিনের চোখের দিকে তাকিয়ে আলো অস্ফুট স্বরে বলে ওঠে। সামিন তাকিয়ে আছে,বলে,"বললাম তো সরি বলতে হবে না, আপনার সাত খুন বরাবরই মাফ।"
আলো কয়েক মূহুর্ত চুপ করে থেকে মাতা নাড়িয়ে বলে,"না অন্যকিছু বলবো।"
তারপর আলো যে কাজটা সচারচার করে না সেটাই করে ফেলে। শক্ত করে সামিন কে জরিয়ে ধরে। সামিনের বুকে মুখ গুজে মৃদু স্বরে বলে ওঠে,"আজ একটা কথা না বললেই নয় মেয়র সাহেব। কথাটা হচ্ছে,
শিরায় শিরায় রক্ত, আমি ইয়াসার ভাইয়ের ভক্ত।"
***
"স্যার আপনার জামাই এসেছে।"
আতাউর আলম কলম থামিয়ে দেয়। মাথা তুলে তার জুনিয়রের দিকে তাকায়। জুনিয়র বলতে থাকে,"আপনার জামাই মানে মেয়র এসেছে।"
_ঠিকাছে। ভেতরে আসতে বলো।
জুনিয়র চলে যায়। কিছুক্ষণ পরে সামিন ভেতরে ঢোকে। আশেপাশে তাকিয়ে সবকিছু দেখতে থাকে। আতাউর আলম বলে ওঠে,"বসো।"
সামিন একটা চেয়ার টেনে বসে পরে। আতাউর আলম বলে,"কি খাওয়াবো মেয়রকে? চা না কফি। দেখো জামাই হিসেবে আপ্যায়ন পেতে হলে তোমাকে আমার বাড়ি যেতে হবে।"
সামিন ম্লান হেসে বলে,"এক কাপ কফি।"
আতাউর আলম কফি আনতে বলে পিয়ন ছেলেটাকে। তারপর সামিনের দিকে তাকিয়ে বলে,"রিটায়ারমেন্টের পরে এতো ভালো একটা চাকুরী পেয়ে যাবো আশা করি নি।"
সামিন ঘরের আশেপাশে তাকিয়ে বলে,"কাজ টা কি আপনার?"
_কাজ সামান্য, ছেলেপুলেরা চারিদিক থেকে খবর এনে দেবে। আমি সাজিয়ে লিখবো।
কফি এসে যায়। সামিন কফিতে চুমুক দিতেই আতাউর আলম বলে ওঠে,"তেরো কোটির তদন্ত এখনও চলছে। এই দেশের এই বিচার ব্যবস্থা দেখলে ইচ্ছে করে উ'গান্ডা যাই। প্রমান সব হাতে অথচ পিবিআই কানা কানা করছে। কবীরের থেকে পয়সা খেয়েছে কিনা! যাই হোক, ওর পদত্যাগ টা আমাকে শান্তি দিয়েছে। এখন তোমার চাচার মতো কানাডা যাওয়া ছাড়া কোনো গতি নেই। তা ইলেকশন নিয়ে কিছু ভাবলে? মাসখানেক হয়ে গিয়েছে।"
_বুঝতে পারছি না। আমি কনফিউজড আসলে।
_আমার মতে তোমার এমপি ইলেকশন ল'ড়া উচিত। জনগন তোমাকে খুব করে চায়।
একটু থেমে আতাউর আলম বলতে থাকে,"তুমি রাজনীতির জন্য উপযুক্ত। আমি উপযুক্ত এইসব লেখালেখিতে। সবাইকে সবজায়গায় মানায় না। আমার নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত টা ভুল ছিলো।"
সামিন চুপ। আতাউর আলম বলে ওঠে,"যাই হোক, একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা বলতে চাই তোমায়। তুমি আমার মেয়েটিকে বেশি লাই দিও না। ভালোবাসো ঠিকাছে, তবে ওর মতো অপ্রতিরোধ্য জেদী মেয়েদের মাথায় ওঠানো ঠিক না। আমি লাই দিয়ে অনেকবার বিপদে পরেছি। তুমিও পরবে, ওর চালচলনে একটু লাগাম টানো।"
সামিন হেসে ফেলে, কিছুক্ষণ হেসে বলে ওঠে,"আপনি লাই দিয়ে বিপদে পরেছেন, ওকে বিপদ থেকে রক্ষা করতে পারেননি সেটা বাবা হিসেবে আপনার ব্যার্থতা, আমি ওকে কোনো বিপদে পরতেই দেবোনা সেটা স্বামী হিসেবে আমার আত্মবিশ্বাস।"
আতাউর আলম ম্লান হেসে বলে,"খোঁচা মারছো?"
_মোটেও না।
মাথা ঝাঁকিয়ে বলে সামিন। আতাউর আলম বলে,"যাই হোক, তোমার শাশুড়ি মা টেনশন করে সবসময়। তাই তোমাকে বলা।"
_দ্যা গ্রেট সাহসী সাংবাদিক আতাউর আলম ছেলে মেয়ের বেলায় খুবই ভীতু।
মজার ছলে সামিন বলে। আতাউর আলম কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলে ওঠে,"সাহসী সাংবাদিকদেরও কখনো কখনো ভীতু হতে হয়। এটা তুমি এখন বুঝবে না, যখন বাবা হবে তখন বুঝতে পারবে।
কথাটা শুনে সামিন লজ্জায় গদগদ হয়ে যায়। মনে মনে বলে,"আমি তো সেটা বোঝার জন্য হলেও বাবা হতে চাই শশুর বাবা, আপনার পাষণ্ডী মেয়েই তো আমার চাওয়ার কোনো দাম দিচ্ছে না। সবসময় স্বামীর থেকে এক লাইন বেশী বোঝে এই মেয়ে।"
****
খোলা চুলে হাত বুলিয়ে সামিন বলে ওঠে,"আছিয়া!"
কয়েক মূহুর্ত পরে আলো অস্ফুট বলে,"হু।"
সামিন বিরক্ত ভঙ্গিতে বলে,"তখন থেকে হু হা কি করছো?"
আলো কোনো জবাব দেয় না। তার হাতে একটা গিফট বক্স। সামিন উঠে বসে আলোর হাতের দিকে তাকিয়ে বলে,"এটা কি?"
_ফুয়াদ ভাইয়া দিয়েছে আমাকে।
গিফট বক্সটা খুলে আলো অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। একটা শোপিস। সাথে একটা চিঠি, চিঠিতে লেখা,
"ফুয়াদের তরফ থেকে এক উগ্রমেজাজী দম্পতিকে উপহার। ঝগড়া ঝাটি, মারামারি যাই করো না কেনো, দুজনে এটা কখনো ভেঙে ফেলো না। খবরদার!"
চিঠি পড়ে খিলখিল করে হাসছে আলো। আলোর দিকে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে আছে সামিন। আলো হাসি থামিয়ে বলে ওঠে,"এই ফুয়াদ ভাইয়াকে একটা রিটার্ন গিফট পাঠাতে হবে না মেয়র সাহেব?"
সামিন আলোর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে আলোকে কাছে টেনে নেয়। বুকের সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে নরম গলায় বলে,"সবাইকেই রিটার্ন গিফট পাঠাচ্ছো দেখছি, এই যে আমি এতো গিফট দিয়েছি। আমার রিটার্ন গিফট কবে পাবো শুনি।"
আলো লজ্জিত ভঙ্গিতে বলে,"সত্যিই। আপনার গিফটের পরিবর্তে কিছুই দেয়া হয়না। নেক্সট মান্থের স্যালারি পেয়েই দেবো। একটা একটা করে সবগুলোর রিটার্ন গিফট দেবো। এই আলো কখনো কারো ঋন রাখে না মেয়র সাহেব।"
"বাবা,সব কিছু ফেরত দেবে?"
নাটকীয় ভঙ্গিতে বলে সামিন।
_হুম।
মাথা নাড়ায় আলো।
_গিফটের বদলে রিটার্ন গিফট দেবে না হয় বুঝলাম। আর ভালোবাসার বদলে?
সামিন আলোর চোখে রেখে বলে। আলো অস্ফুট স্বরে বলে,"সেটাও তো ফেরত দেয়ার চেষ্টা করছি মেয়র সাহেব।"
_আর আদরের বদলে?
আলো মাথা নিচু করে ফেলে। সামিন তাকে কাছে টেনে নিয়ে বলে,"আদরের বদলে একটা বেবী দেয়া যায় না?"
আলো সামিনের মুখ চেপে ধরে বলে,"চুপ করুন। সবসময় এমন অ'সভ্য অ'সভ্য কথা শুনতে ইচ্ছে করে না আমার।"
সামিন আলোর দিকে তাকিয়ে থেকে তার মুখ থেকে হাতটা সরিয়ে দিয়ে বলে,"অ'স'ভ্য কথা কই বললাম? আচ্ছা ঠিকাছে , ভদ্রভাবে, মার্জিত ভাবে, সুশীল ভাবে বলছি।"
এতটুকু বলে সামিন থামে, তারপর গলা খাঁকারি দিয়ে বলে ওঠে,
" প্রিয়তমা বৌ, আমার চক্ষুশীতলকারিনী, আমার আছিয়া। আমি নিজের জীবনের পরিপূর্ণতা আনিবার লক্ষ্যে আপনার গর্ভস্থলে দশমাসের জন্য আমার একটি কন্যাসন্তান রাখিতে চাই। অনুগ্রহ পূর্বক যদি আমাকে অনুমতি দিতেন তাহলে আমি খুবই বাধিত থাকিতাম।"
আলো শাড়ির আঁচল দিয়ে নিজের মুখ ঢেকে বসে আছে। সামিন তাকে কাছে টেনে ঘোর লাগা কন্ঠে বলে,"হয়েছে? ভদ্রতা বজায় থেকেছে? এখন আমার কথা টা একটু ভেবে দেখেন। প্রমিজ করছি, দশমাস পরে আমি বা আমার মেয়ে, আপনাকে একটুও জালাবো না।"
আলো চুপ করে থাকে স্বামীর বুকে মাথা রেখে। কয়েক মূহুর্ত সময় নিয়ে বলে,"কিন্তু আমি একটু সময় চাচ্ছি।"
সামিন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। কাতর কন্ঠে বলে,"এতেও অপেক্ষা করাবে? আমি আর কত ধৈর্য্য ধরবো?"
আলো নিশ্চুপ। সামিন আলোর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে,"ব্যাপার না। অপেক্ষার ফল সুমিষ্ট হয়।"
দরজায় ধাক্কা পরে হঠাৎ। আলো সামিনের বুক থেকে মাথা তুলে সামিনের দিকে তাকায়। সামিন উঠে বসে। ইলহাম বাইরে থেকে জোরে জোরে ডাকতে থাকে। সামিন বিরক্ত ভঙ্গিতে বলে,"বয়স উনত্রিশ বছর হয়ে গিয়েছে এখনো ওর কান্ডজ্ঞান হলো না। কেমন বেয়াদব দেখো!"
আলো চোখ রাঙিয়ে বলে,"এভাবে বলছেন কেনো? কোনো সমস্যা হয়েছে হয়তো।"
কথাটি বলে আলো চুলে খোঁপা বেঁধে নিয়ে উঠে গিয়ে দরজা খুলে দেয়। দরজার বাইরে ইলহাম দাঁড়িয়ে আছে। তার পেছনে ইশিতা।
সামিন উঠে দাঁড়ায়, অবাক হয়ে বলে,"কি হয়েছে? ইশিতা কাঁদছে কেন?"
ইলহাম চেঁচিয়ে বলে,"তোমার আদরের বোন আবার সেই ছেলের সাথে রেস্তোরাঁয় দেখা করেছে। আর আমাদের সাথে কি বলেছিলো? বলেছিলো রিলেশন নেই। বেয়াদব মেয়ে একটা।"
ইশিতা চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। সামিন ইশিতার দিকে তাকায়। ইলহাম বলতে থাকে,"ওর ফোনটা কেনো নিয়ে নিলে না। যারা বোঝালেও বুঝতে চাইবে না তাদের সাথে এমনটাই করা উচিৎ।"
সামিন ইশিতার দিকে তাকিয়ে বলে,"ফোন দে।"
ইশিতা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে বলে,"ভাইয়া..."
সামিন ইশিতার হাত থেকে ফোনটা কে'ড়ে নিয়ে সজোরে মেঝেতে ছু'ড়ে মারে।
আলো চ'ম'কে ওঠে। রিতু এসে ইশিতার পাশে দাঁড়ায়। ইশমাম নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে আসে।
সামিন হুট করে যে কাজটা কখনো করেনি সেই কাজটাই করতে যায়। আলো গিয়ে সামিনের হাত ধরে ফেলে, চেঁচিয়ে উঠে বলে,"ছোটো বোনকে শাসন করবেন ঠিকাছে, আপনার অধিকার আছে, তাই বলে আমার আর রিতুর সামনে এভাবে ওর গায়ে হাত তুলতে চাইবেন? আমরা কে?"
ইশিতা কাঁদতে কাঁদতে নিজের ঘরে চলে যায়। সামিনের দিকে রাগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আলো। ইলহাম বলে ওঠে,"ওকে একবার আর দুই বার বুঝিয়েছি আমি আর ভাইয়া? কি জানি কি দেখেছে ঐ ছেলেটার মধ্যে, কি যোগ্যতা ঐ ছেলের? শুধু চেহারা সুন্দর।"
আলো ইলহামের দিকে তাকায়। সামিন বলে ওঠে,"ঐ ছেলেকে ডেকে আন। কতটা সাংঘাতিকভাবে এতো বড় একটা মেয়ের ব্রেইন ওয়াশ করেছে নিজের সিম্প্লিসিটি দেখিয়ে, খুবই প্রো লেভেলের লোক। ওর সাথে আমি বোঝাপড়া করতে চাই।"
ইশমাম এগিয়ে এসে বলে,"ভাইয়া ছেলেটার সাথে আমি পারসোনালি কথা বলেছি। আমার খারাপ মনে হয়নি।"
সামিন ক'ট'ম'ট দৃষ্টি দিয়ে ইশমামের দিকে তাকায়, রাগী গলায় বলে,"তুই মানুষ চিনিস? মানুষ চিনলে তো আজ কোনো মেয়ে তোকে ঠকিয়ে যেতো না। তুই চুপ কর।"
আলো মাথা নিচু করে ফেলে। ইশমাম কয়েক মুহূর্ত সামিনের দিকে তাকিয়ে থেকে চলে যায় নিজের ঘরে।
সামিন দ্রুতপায়ে নিজের ঘরে ঢোকে। আলো সামিনের পিছু পিছু যায়।
বিছানায় একপাশে চুপচাপ বসে পরে সামিন। কপালে চিন্তার ভাঁজ পরেছে তার। আলো এগিয়ে গিয়ে রাগী গলায় বলে,"এটা তখন কি করতে যাচ্ছিলেন আপনি হ্যা? আমরা ইশিতা আপুর ভাবী হলেও ইশিতা আপুর থেকে বয়সে ছোটো। রিতু তো অনেকটাই ছোটো। আমাদের সামনে ওর গায়ে হাত তুলতে যাচ্ছিলেন?"
সামিন চুপ করে থাকে । আলো পাশে বসে বলে,"সমস্যা কোথায়? ঐ ছেলের মধ্যে সমস্যা কি? শিক্ষিত, দেখতে শুনতে ভালো, এখন তো মোটামুটি ভালো চাকুরীও করছে। সবদিক থেকে ভালো। ছেলে গরীব পরিবার থেকে উঠে এসেছে এটাই আপনার চোখে বিঁধছে তাইতো? আচ্ছা আমি বুঝলাম না, আপনারা গরীব পরিবার থেকে মেয়ে বিয়ে করে আনতে পারলে ইশিতা আপু কেন পারবে না? সামাজিক অবস্থান শুধু ছেলেদেরই উঁচু থাকতে হবে? ডমিনেট করতে সুবিধা হয় যাতে?"
সামিন আলোর দিকে তাকিয়ে বলে,"আমি তোমায় ডমিনেট করেছি?"
আলো মাথা নাড়ায়। মুখ ফসকে এমন একটা কথা বলে ফেললো,এখন এই লোক ক্ষে'পে গেলে সে কি করবে।
সামিন উচ্চবাচ্য না করে নিচু গলায় বলতে থাকে,"আবেগী কথা বলবে না আলো, বোনটাকে চিরকাল আদরে রেখেছি, ওর এক একটা প্রসাধনী সামগ্রীর দাম জানো? সে কিভাবে মানিয়ে নেবে সবকিছু? এখন আবেগের বশে বুঝতে পারছে না।"
আলো তাকিয়ে আছে সামিনের দিকে,ক্ষনবাদে বলে ওঠে,"সে তো ছোট বাচ্চা মেয়ে নয়, মানিয়ে নিতে হবে ভেবেই তো পা বারিয়েছে। "
_এই আলো,প্লিজ চুপ করো। এটা বাংলা নাটক নয়, বাস্তববাদী হও। আবেগী কথা বলো না। অবশ্য তোমাকে বলে লাভ কি। তোমাদের এই বয়সটাই আবেগের।
বিরক্ত ভঙ্গিতে বলে সামিন।
****
"কিহ! ভাইয়া শান্তকে ডেকেছে? কেনো? কিসের জন্যে?"
বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে ছিলো ইশিতা,উঠে বসে আলোর দিকে তাকায়। তার ঘরে আলো,রিতু আর পরী।
ইশিতা পুনরায় চেঁচিয়ে বলে ওঠে,"কেনো ? কেনো ডেকেছে?"
_শান্ত হও ইশিতা আপু। বড় ভাইয়া সম্ভবত কথা বলার জন্যই ডেকেছে!
পরী নিচু স্বরে বলে। ইশিতা উঠে দাঁড়ায়, রিতুর দিকে তাকিয়ে বলে,"তোমরা জানো না কেনো ডেকেছে? তোমাদের দুজনের স্বামীরা বলেনি?"
রিতু মাথা নাড়ায়। আলো বলে,"সম্ভবত কথা বলতেই ডেকেছে। ভয় পেয়ো না। তোমার ভাইয়া উল্টোপাল্টা কিছু করবেন না।"
আলো স্বামীর সাফাই গাইতে শুরু করে। ইশিতা একবার আলো আর একবার রিতুর দিকে তাকিয়ে বলে,"তোমাদের স্বামীদের আমার বিশ্বাস নেই। নিশ্চয়ই মা'রবে বলে ডেকেছে।"
আলো তাকিয়ে আছে ইশিতার দিকে। পরপর বলে ওঠে,"কিছু করবে না। দেখো একসময় না একসময় তাদের মুখোমুখি হতেই হবে, তো সেটা আজই হোক।"
ইশিতা ধপপ করে বিছানার উপর বসে পরে। পরী আলোর দিকে তাকিয়ে বলে,"ভাইয়ার সাথে তুমি গিয়ে কথা বলো না ভাবী। তোমার সব কথাই তো ভাইয়া শোনে।"
আলো পরীর দিকে তাকিয়ে বলে,"বলেছি। আমি কথা বলেছি। আমিও চাই তারা সামনাসামনি হোক,তোমরা চিন্তা করো না, বাড়াবাড়ি কিছু হবে না। আমি হতে দেবো না।"
ধীরে ধীরে ঘরের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢোকে আলো। ঢুকে দরজা চাপিয়ে ঘুরে দাঁড়ায়। সামিন খালি গাঁয়ে আলমারিতে কিছু একটা খুঁজছিলো। আলো বলে,"কিছু খুঁজছেন?"
_আমার ব্ল্যাক শার্ট টা কোথায় রেখেছো, এখানে তো সব তোমার শাড়ি দেখতে পাচ্ছি ।
আলো এগিয়ে গিয়ে ব্ল্যাক শার্ট বের করে সামিনের হাতে দেয়। সামিন আলোর দিকে একপলক তাকিয়ে শার্ট টা হাতে নিয়ে বলে,"খেয়েছে তোমার ননদ?"
আলো মাথা নাড়ায়। সামিন শার্ট টা গায়ে চাপিয়ে বলতে থাকে,"না খেলে না খাক। ইশমাম আর ইশিতা, এই দু'টো এতো জেদী হয়েছে! ওদের বলে দিও ওদের থেকে আমার জেদ কোনো অংশে কম না।"
আলো এগিয়ে গিয়ে সামিনের ঘ'নিষ্ঠ হয়ে দাঁড়িয়ে তার শার্টের বোতাম লাগিয়ে দিতে দিতে আহ্লাদী গলায় বলে,"শুনুন না!"
সামিন আলোর কথার সুর শুনে আলোর দিকে কয়েকপলক তাকিয়ে একই সুরে বলে,"বলুন না।"
আলো সামিনের চোখে চোখ রাখে, তারপর নরম গলায় বলে,"আপনি শান্ত ভাইয়াকে মা'রবেন না তো ডেকে আনিয়ে?"
সামিন আলোর দিকে তাকিয়ে থাকে, কিছু সময় পরে বলে ওঠে,"কিছু প্রশ্ন করবো। উত্তর গুলো ঠিকঠাক ভাবে দিতে পারলে ভালো। নয়তো...."
আলো চ'ম'কে ওঠে। সামিন কথাটা খুবই কঠিন ভাবে বলেছে।
***
গেইটের ভেতরে পা রাখতেই শান্ত এদিক ওদিক তাকায়। শান্তিনীড়ের দারোয়ান রিয়াজ দূরে একটা চেয়ারে বসে তার দিকে কপাল কুঁ'চ'কে তাকিয়ে আছে। শান্ত দাঁড়িয়ে পরে, রিয়াজের দিকে তাকিয়ে বলে,"রিয়াজ ভাই একটু ভেতরে গিয়ে বলে দেবেন শান্ত এসেছে। ইয়াসার মির্জা আমাকে ডেকে পাঠিয়েছেন।"
_আপনে ভেতরে যান,বলাবলির কিছু নাই, সবাই আপনার জন্যে বসে আছে। অপেক্ষা করতেছে আপনার জন্য।
শান্ত ধীরপায়ে এগিয়ে যায় শান্তিনীড়ের সদর দরজার দিকে। সবাই তার জন্য অপেক্ষা করছে মানে! সবাই বলতে কারা!
দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে করিডোর পেরিয়ে লিভিং রুমের দিকে পা বাড়াতেই শান্ত চুপচাপ দাঁড়িয়ে পরে। সামিন তার দিকে শীতল দৃষ্টি দিয়ে তাকিয়ে আছে। বাড়ির মেয়ে বৌরা দোতলা থেকে উঁকি দিয়ে দেখছে, ইশিতা চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে তার আ'ত'ঙ্কি'ত মুখটা নিয়ে। আলো ইশিতা কে ফিসফিসিয়ে বলে,"টেনশন নিও না। উল্টোপাল্টা কিছু আমি হতে দেবো না। ইয়াসার মির্জার মুখোমুখি আমি হবো। অন্যের বোনকে তুলে এনে বিয়ে করতে পারে আর নিজের বোনের জন্য ভাইভা বোর্ড বসায়! দু মুখো সা'প কোথাকার। শান্ত ভাইয়াকে কিছু বললে আজ আমি ওনার সাথে বোঝাপড়া করবো!"
কন্ঠে তেজ নিয়ে বলে আলো।
সামিন শান্তর পা থেকে মাথা পর্যন্ত দেখে। শান্ত গলার টাইয়ের নট ঠিক করে নেয়। অফিসের ফরমাল পোশাকেই সে এসেছে। তাকে কয়েক পলক দেখে নিয়ে সামিন বলে ওঠে,"ঠিক চারটার সময় থাকার কথা ছিলো। তুমি তো দশমিনিট দেরী করে এলে।"
শান্ত কোনো জবাব না দিয়ে আশেপাশে দেখতে থাকে। সে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছে পুরো। লিভিং রুমে সামিন,ইলহাম,ইশমাম ছাড়াও রয়েছে জামিল,ফুয়াদ,রাহাত,আরাফ,রনি,সবুজ,তৌফ এবং দলের সব ছেলেরা। সবাই শান্তর দিকে শীতল চোখে তাকিয়ে আছে। সামিন শান্তর হতভম্ব দৃষ্টি দেখে বলে ওঠে,"ইশিতা শুধু আমাদের তিন ভাইয়ের বোন না, ওদেরও বোন। ওরাও তোমার সাথে কথা বলবে।"
শান্ত চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে কিছুক্ষণ দেখে একটা ঢোক গিলে নেয়, রূপকথার গল্পে সে সাত ভাই চম্পার কথা শুনেছে। কিন্তু তার পারুলের এতগুলো চম্পা ভাই সে বুঝতে পারেনি! এরা তাকে এখন কি করবে!
চলমান........