#লাল_শাড়িতে_প্রেয়সী ❤️🔥
#অন্তিম_পর্ব (প্রথমাংশ)
#লেখনিতে_Fatima_Fariyal
নিজের দুই হাত দিয়ে আগুনের সেই ভয়ংকর আগ্নেয়গিরিটাকে নিভিয়ে ফেলতে চাইছে আহাদ। যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না, এই আগুনটা বাস্তব। এই ধ্বংসটা সত্যি। এই তো… এই তো একটু আগেও রাস্তায় বসেই বাবা হওয়ার আনন্দে সে ভবিষ্যৎ আঁকছিল। হাসছিল। চোখে ছিল অদ্ভুত এক নরম আলো। সে বাচ্চাদের নাম ঠিক করেছিল। তাদের ছোট ছোট আঙুল ধরে হাঁটার স্বপ্ন দেখেছিল। তাদের মুখের আধো বুলিতে “বাবা” ডাক শোনার স্বপ্ন দেখছিল। সবকিছু খুব স্পষ্ট ছিল তার চোখে। আর এখন? সবকিছু জ্বলছে। সব স্বপ্ন পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে পৈশাচিক আগুনের উল্লাসে। আগুনের লেলিহান শিখা যেন আকাশ ছুঁতে চাইছে। মৃত্যু যেন উল্লাসে নাচছে।
“ভাই, সরে আসেন! আগুনের তাপ খুব বেশি!”
“আহাদ, পাগলামো করিস না! সরে আয়!”
আদনান প্রাণপণে চেষ্টা করছে তাকে টেনে সরিয়ে আনতে।
তার নিজের চোখ ঝলসে যাচ্ছে আগুনের তাপে। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু আহাদ? সে ছটফট করে উঠল, যেন শেকল ভাঙা কোনো জন্তু। সে নিজের বুক চাপড়ে চিৎকার করছে,
“আমার রিদি… আদনান… আমার বাচ্চা… আমার বাচ্চারা!”
কণ্ঠ ভেঙে যাচ্ছে। শব্দগুলো ঠিকভাবে বেরোচ্ছে না।
“ওদের বাঁচা আদনান! আমার অস্তিত্ব… আমার অংশ জ্বলে যাচ্ছে! ওরা কষ্ট পাচ্ছে… ওরা কষ্ট পাচ্ছে আদনান, ওরা পুড়ে যাচ্ছে! আমাকে ছাড়! ছাড় আমাকে! না হলে ওরা ছাই হয়ে যাবে! রিদি… রি…দি.. আমার বাচ্চারা পুড়ে যাচ্ছে… ওরা পুড়ে যাচ্ছে…”
চারপাশে ধোঁয়া, আগুন আর মানুষের আর্তচিৎকার।
আকাশ ভারী হয়ে আছে কালো ধোঁয়ায়। আহিয়া এসব দেখে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে আছে। নিঃশ্বাস নিচ্ছে, কিন্তু বুঝতে পারছে না সে বেঁচে আছে কিনা। নীলা কাতর চোখে তাকিয়ে আছে আহাদের সেই পাগলামির দিকে। তার বুকের ভেতর কেমন যেন মোচড় দিচ্ছে। আহাদ আবার ছটফট করে উঠল,
“আহহ! আদনান… ওদের কোনোভাবে বাঁচা না… ওরা কষ্ট পাচ্ছে! রিদিইই… রিদি… জানু… প্লিজ… আমাকে এভাবে ছেড়ে যাস না… আমি কিছু হতে দেব না তোর, প্লিজ একবার সারা দে। একবার মন্ত্রীমশাই বলে ডাক, জানু... প্লিজ একবার.. ”
তার কণ্ঠে করুন আর্তনাদ। এটা এক বাবা হারানোর চিৎকার। এক স্বামী সবকিছু হারানোর আর্তনাদ। শাহীন আর আদনান শত চেষ্টা করেও আর ধরে রাখতে পারল না। এক ঝটকায় তাদের ছিটকে ফেলে দিয়ে আহাদ আবার পাগলের মতো দৌড় দিল আগুনের দিকে। ঠিক তখনই আদিলের গাড়ি এসে থামল। সে দৌড়ে গিয়ে ঝাঁপটে ধরল আহাদকে।
“ভাই! ভাই কী করছো? পাগল হয়ে গেছো? আগুন ভয়ংকর! ব্লাস্ট হতে পারে, সরে আসো।”
“আদিল, ছাড় আমাকে! ছাড়! রিদি আছে ওই গাড়িতে.. ওই গাড়িতে আমার রিদি আছে। আল্লাহ আমার রিদি!”
সে হাটুমুড়ে বসে পড়ল। মাথা দু’হাত দিয়ে চেপে ধরে চিৎকার শুরু করতে লাগল। এমন চিৎকার, যা শুনে যে কারোই বুক ফেটে যাওয়াট উপক্রম হতে পারে। আদিল তাকে ধরে রাখতে চেয়েও পারল না। সে গিয়ে গাড়ির গ্লাসে একের পর এক ঘুষি মারতে লাগল। এর মধ্যেই কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই এক বিকট বিস্ফোরণ। চারদিক কেঁপে উঠল। আগুনের ভেতর থেকে একটা দানব যেন গর্জে উঠল। আহাদ ছিটকে গিয়ে পড়ল দূরে। এবার আর কোনো ছটফটানি নেই। কোনো চিৎকার নেই। একদম নিস্তেজ। নিথর।
“ভাইয়া… ভাইয়া… ভাই…য়া…!”
আহিয়া চিৎকার করে উঠল। সব কিছু কেমন তার সামনে ঝাপসা হয়ে আসছে। তার চোখের সামনে যা ঘটেছে তা তার চোখ সহ্য পারল না। অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল। নীলা তাকে ধরে রাখল, কিন্তু তার নিজেরই হাত পা কাঁপছে। আদিল আর আদনান ছুটে গেল আহাদের কাছে। আদনান তার মাথাটা নিজের উরুর ওপর তুলে নিল। তার কণ্ঠ কাঁপছে,
“আহাদ! আহাদ ওঠ! তোর কিছু হয়নি! রিদির কথা ভাব! তোর বাচ্চাদের কথা ভাব! তাকা… তাকা আমার দিকে… আহাদ!”
শাহীন নীলাকে বলল,
“নীলা... তুমি নিজেকে শক্ত রাখ। আহিয়াকে সামলাও। আমি আসছি।”
নীলা শুধুু মাথা নাড়ল। কন্ঠনালী থেকে কোনো শব্দ বের হলো না। এদিকে নাদিম, শাওন, আমজাদ মীর, আসাফাক মীর এসে পৌঁছেছে ঘটনা স্থলে। সুমন, তানভীর আর তারেক রায়ানও খবর পেয়ে সাথে সাথে ছুটে এসেছেন। তারেক রায়ান আজই গ্রাম থেকে রিদিতাকে দেখার উদ্দেশ্যে এসেছিলেন। রিদিতা বাবাকে বলেছিল, তালের পিঠা খেতে ইচ্ছে করছে। তিনি মেয়ের সেই ইচ্ছা পূরন করতেই মূলত এসেছেন। এখন চোখের সামনে এসব দেখে পুরোপুরিভাবে ভেঙ্গে পড়েছেন। সুমন আর তানভীর তাকে ধরে রেখেছে। ফায়ার সার্ভিসের টিম আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছে। ডিবি পুলিশ চারপাশে ঘেরাও করে রেখেছে। তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে।
আমজাদ মীর ছেলেকে নিয়ে ব্যাস্ত। তার হৃদস্পন্দন ক্ষীণ হয়ে এসেছে। আদনান মরিয়া হয়ে চেষ্টা করছে আহাদের হার্টবিট ঠিক রাখতে।
“আহাদ চোখ খোল, আহাদ! আহাদ চোখ খোল! আদিল, শাহীন.. আহাদকে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে, ওর হার্টবিট ড্রপ করছে!”
সবাই মিলে তাকে অ্যাম্বুলেন্সে তুলল। অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন, মানুষের ভিড়, ডিবি পুলিশের ঘেরাও সব মিলিয়ে এক রমরমে হাহাকার। আদিল এসে আহিয়াকেও গাড়িতে তুলে দিল। কিন্তু নীলা স্থির হয়ে বসে আছে। নিশ্চল তাকিয়ে আছে অ্যাম্বুলেন্সের লাল জ্বলজ্বলে আলোর দিকে। ভেতরে ভেতরে তার হৃদস্পন্দন আর্তনাদ করছে,
“আমি তো এটা চায়নি.. আমি তো কখনো এটা চায়নি। আমি তো ওদের সুখি দেখতে চেয়েছি, ওদের সুখের সংসার দেখতে চেয়েছি। সব মেনে নিয়েছি, কোনো বদ দোয়া তো করিনি.. তাহ... তাহলে তুমি এমনটা কেন করলে খোদা? কেন এমন ভয়ংকর পরিনতি করলে? কেন সব জালিয়ে পুড়িয়ে ছাড়খাড় করলে? কেন?”
সে অনবরত বিড়বিড় করতে লাগল,
“না, না… এটা সত্যি না… এটা স্বপ্ন… এটা স্বপ্ন..”
শাহীন এসে তার পাশে বসল। আজ আর দ্বীধা কাজ করছে না। সে নীলাকে বুকের সঙ্গে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। কন্ঠে এক টুকরো আশ্বাস,
“নীলা, নীলা রিল্যাক্স… সব ঠিক হয়ে যাবে… কিছু হয়নি সব ঠিক হয়ে যাবে। রিল্যাক্স!”
নীলা ভঙ্গুর কন্ঠে ফিসফিস করে উঠল,
“এটা মিথ্যা। এটা সত্যি না… বলুন.. এটা সত্যি না তাই না?”
শাহীন আর কিছু বলতে পারল না। শুধু শক্ত করে ধরে রাখল। কিছুক্ষণ পর সে টের পেল নীলা নিস্তেজ। সে বুঝল নীলা অজ্ঞান হয়ে গেছে। শাহীন তাকে তুলে গাড়িতে তুলল। গন্তব্য হাসপাতাল। পেছনে পড়ে রইল পোড়া গাড়ির ধ্বংসস্তূপ। নাদিম, শাওন, আসফাক মীর আর সুমন ঘটনা স্থলে ডিবি পুলিশদের সাথেই আছে। আগুন এখন নিয়ন্ত্রণে। কিন্তু ভেতরে রিদিতার অবশিষ্ট কিছু আছে কি না, তা নিশ্চিত করে বলা দুষ্কর!
★
চারদিকে ঘন অন্ধকার ভেদ করে ধীরে ধীরে ফুটে উঠছে সূর্যের সুপ্ত আলো। রাতের দীর্ঘ, ক্লান্ত নিঃশ্বাস যেন ভোরের আলোয় একটু একটু করে হালকা হচ্ছে।কেবিনের পর্দার ফাঁক গলে সূর্যের এক চিলতে রশ্মি এসে আহাদের চোখে পড়তেই সে অস্বস্তিতে চোখ-মুখ কুঁচকে নিল। মাথার ভেতর যেন কেউ হাতুড়ি মারছে। শরীরটা ভারী, অবশ। খানিকক্ষণ পর চোখ খুলে সে নিজেকে আবিষ্কার করল হাসপাতালের একটি কেবিনে। সাদা দেয়াল। ওষুধের গন্ধ। মেশিনের একঘেয়ে শব্দ। প্রায় সাত ঘণ্টা পর চেতনা ফিরে পেয়েছে আহাদ। কিন্তু চেতনা ফিরতেই, গতরাতের সেই ভয়ংকর, নির্মম দৃশ্যগুলো চোখের সামনে ঝাঁপিয়ে পড়ল। পৈশাচিক আগুন। চিৎকার। আর্তনাদ। মুহূর্তেই আহাদ পাগলের মতো ধড়ফড়িয়ে উঠে পড়ল। চারপাশে হাতের কাছে যা পেয়েছে সব ভাংচুর শুরু করেছে। দরজার কাছে থাকা গার্ডরা হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ডাক্তার, নার্সরা দৌড়ে এসেছে। দরজার কাছেই সীমাবদ্ধ। কেউই সাহস পাচ্ছে না কাছে যেতে।
বাইরে তখন ডিবি পুলিশের সঙ্গে কথা বলা আমজাদ মীর আর আদনান ছুটে এল। পেছন থেকে শাহীনও ঢুকল।
আহাদকে থামাতে আদনান আর শাহীন দু’জনেই পেছন থেকে জাপটে ধরল। আহাদ ছটফট করতে লাগল।
আদনান গলা নামিয়ে, কিন্তু শক্ত করে বলল,
“আহাদ, কী করছিস? এটা হাসপাতাল। শান্ত হ। তোর শরীর ভালো নেই। এই অবস্থায় এমন করিস না।”
কিন্তু আহাদ বজ্রকণ্ঠে গর্জে উঠল,
“আদনান, ছাড় আমাকে! ছাড়! না হলে আমি তোকে মেরে চালের ড্রামে ঢুকায়া রাখবো! ছাড় বলছি!”
চোখ রক্তবর্ণ। কণ্ঠে উন্মত্ততা।
“আমাকে রিদির কাছে যেতে দে! ছাড়!”
আদনান ছাড়ল না। বরং আরও শক্ত করে ধরে রাখল।
শাহীন হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
“ভাই প্লিজ… আপনার শরীর ভালো না। এমন করবেন না।”
শেষমেশ আদনান তাকে জোর করে সোফায় বসাল।
নিজের নিঃশ্বাস ঠিক করতে করতে বলল,
“ঠিক আছে। ঠিক আছে। নিয়ে যাব। কিন্তু তার আগে শান্ত হ। এমন পাগলামো করিস না।”
একটু থেমে নরম স্বরে যোগ করল,
“আমরা রিদিতাকে আনার ব্যবস্থা করছি। ওকে?”
এই কথায় আহাদের কণ্ঠ ভেঙে গেল। সে ধীরে ধীরে আদনানের দিকে ফিরল। কম্পিত হাতে বাতাসে কিছু একটা আঁকার চেষ্টা করল, যেন শব্দ খুঁজছে।
“আমার… রিদি… পুড়ে গেছে আদনান…”
চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে। “আমার অংশ… আমার অস্তিত্ব পুড়ে গেছে। আমি… আমি ওদের বাঁচাতে পারিনি।”
শ্বাস কাঁপছে।
“আমি ব্যর্থ… আমি নিজের সন্তানদের রক্ষা করতে পারিনি। আমার প্রেয়সীকে… আমি বাঁচাতে পারিনি…”
আদনান শক্ত করে তার ভাইয়ের কাঁপতে থাকা দেহটাকে নিজের বুকের সাথে চেপে ধরল। বোধহয় এই প্রথম সে সত্যিই অনুভব করল, তার একটা ছোট ভাই আছে। যাকে আজ প্রথমবার সে আগলে ধরছে। তার চোখ ঝাপসা হয়ে এল। আহাদের পিঠে ধীরে ধীরে হাত বুলাতে বুলাতে আদনান বলল,
“কিচ্ছু হয়নি… কিচ্ছু হয়নি।” কণ্ঠ চাপা, কিন্তু দৃঢ়, “আমার কথা শোন। মন দিয়ে শোন।”
একটু থেমে, স্পষ্ট করে বলল, “ওই গাড়িতে রিদিতা ছিল না। গাড়ি ব্লাস্ট হওয়ার আগেই রিদিতা গাড়ি থেকে নেমে গেছিল। ও ওই গাড়িতে ছিল না।”
আহাদ আচমকা ঝটকা মেরে নিজেকে ছাড়িয়ে নিল।
চোখে অবিশ্বাস। সে বিড়বিড় করে উঠল,
“মিথ্যা…”
গলা আবার চড়ল,
“সব মিথ্যা! আমাকে ভুংবাং বোঝাস না আদনান।”
“আমার চোখের সামনে সব হয়েছে। আমি ওকে গাড়িতে রেখে গেছিলাম।”
কণ্ঠ ফেটে যাচ্ছে,
“আমার চোখের সামনে সব শেষ হয়ে গেছে… আর আমি কিছু করতে পারলাম না…কিচ্ছু নাআআ!””
চিৎকার করে উঠল সে। আবার ভাঙচুর শুরু করল।
ঠিক তখনই কেবিনের ভেতরে প্রবেশ করলেন আমজাদ মীর। তার সঙ্গে ডিবি পুলিশের প্রধান কর্মকর্তা আনিসুজ্জামান। আমজাদ মীর কঠোর গলায় বললেন,
“কী করছো এসব? শান্ত হও। এই ভাঙচুর বন্ধ করো।”
আহাদ তার বাবার দিকে তাকাল। চোখে শিশুর মতো অসহায়ত্ব।
“বাবা…”
কণ্ঠ বের হতে চাইছে না। গলা আটকে আসছে।
“বাবা… আমার রিদি… আমার বাচ্চারা…”
সে কথা শেষ করতে পারছে না।
“ওদের বাঁচাতে পারলাম না আমি… ওরা পুড়ে… ছা…ই…”
আমজাদ মীর জোর করে তাকে আবার সোফায় বসালেন।
তার কাঁধ ধরে ঝাঁকিয়ে বললেন,
“হুসস! শান্ত হও। রিদিতার কিছু হয়নি। তোমার অনাগত সন্তানদেরও কিছু হয়নি।”
একটু থেমে, গম্ভীর স্বরে বললেন,
“রিদিতা ওই গাড়িতে ছিল না। রিদিতাকে মাতাব্বরের লোক তুলে নিয়ে গেছে।”
এক মুহূর্তে সব শব্দ থেমে গেল। আহাদ বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে গেল। চোখ পলক ফেলছে না। মস্তিষ্ক যেন কথাগুলো বুঝে উঠতে পারছে না। আমজাদ মীর এবার তার পাশে বসে শান্ত কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বললেন,
“তুমি যদি এমন উন্মাদনা করতে থাকো, তাহলে রিদিতাকে সামলাবে কে? তোমার বাচ্চাদের দায়িত্ব কে নেবে?”
আহাদ ফিসফিস করে বিড়বিড় করল,
“মা… মানে…”
শ্বাস আটকে যাচ্ছে। কণ্ঠ কাঁপছে।
“র-রিদি… আমার রিদি ঠিক আছে? ও ঠিক আছে বাবা? তাহলে আমার রিদি এখন কোথায়? কোথায়?”
পুলিশ প্রধান আনিসুজ্জামান ভারাক্রান্ত এক নিশ্বাস ছাড়লেন। তার চোখেমুখে পেশাগত কঠোরতার আড়ালে চাপা উদ্বেগ স্পষ্ট। কিছুক্ষণ নীরব থেকে তিনি ধীরস্বরে বলতে শুরু করলেন,
“দেখুন, মি. আহাদ… গাড়ির আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনার পর আমরা ঘটনাস্থলে বিস্তৃত তদন্ত চালাই। ফরেনসিক রিপোর্ট এবং প্রত্যক্ষ প্রমাণ অনুযায়ী নিশ্চিত হওয়া গেছে ওই গাড়িতে কেউই ছিল না।”
আহাদের দৃষ্টি স্থির। চোখ পলক ফেলছে না আনিসুজ্জামান কথা চালিয়ে গেলেন,
“আমাদের নির্ভরযোগ্য সোর্স থেকে জানা গেছে, শামিম পোদ্দার আর খলিল মাতাব্বরের লোকজন একসাথে পরিকল্পনা করে আপনার স্ত্রীকে অপহরণ করেছে।”
এই কথাটা যেন বাতাস কেটে আহাদের বুকে আঘাত করল। আনিসুজ্জামান গম্ভীর স্বরে বললেন,
“আপনি তো ভালো করেই জানেন, আপনার সাথে খলিল মাতাব্বরের শত্রুতা আজকের নয়। ও অনেকদিন ধরেই সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। আপনার কাছ থেকে প্রতিশোধ নেওয়ার তাড়নায় ছিল। আর সেই শত্রুতায় শামিম পোদ্দারও হাত মিলিয়েছে।”
তিনি এক মুহূর্ত থেমে চোখ তুলে তাকালেন,
“তারা আপনাদের গতিবিধি অনেকদিন ধরেই নজরে রেখেছিল। আজ রাতে আপনাদের সাথে কোনো নিরাপত্তা রক্ষী ছিল না। তার উপর এত রাতে শহরের বাইরে বের হওয়া... এই সুযোগটাই তারা পুরোপুরি কাজে লাগিয়েছে।”
কথা শেষ হওয়ার আগেই আহাদের চোখে হিং'স্র আগুন জ্বলে উঠল। কপালের শিরা-উপশিরা ধপধপ করে ফুলে উঠেছে। নীলচে শিরার ভেতর দিয়ে র'ক্তে'র প্রবাহ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। সে চোয়াল শক্ত করে, দাঁত চেপে জিজ্ঞেস করল,
“এখন কোথায়?”
কণ্ঠ নিচু, কিন্তু ভয়ংকর।
“কোথায় নিয়ে গেছে আমার স্ত্রীকে?”
আনিসুজ্জামান চোখ নামিয়ে নিচু স্বরে বললেন,
“যতদূর আমরা জানতে পেরেছি… কামারপট্টির একটি পরিত্যক্ত কারখানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ওটা শামিম পোদ্দারের আস্থানা। তবে...”
এক মুহূর্তের নীরবতা। আহাদ চোখ তুলে তাকাল,
“তবে?”
শব্দটা বজ্রপাতের মতো কেবিন কাঁপিয়ে দিল।আনিসুজ্জামান গম্ভীর হয়ে গেলেন। ধীরে ধীরে বললেন,
“তবে… মিসেস মীর এই মুহূর্তে কেমন আছেন, কিংবা আদৌ জীবিত আছেন কি না; এই বিষয়ে আমরা এখনো নিশ্চিত কিছু বলতে পারছি না।”
এই কথাটা যেন আহাদের সমস্ত সংযম ছিন্নভিন্ন করে দিল।
সে গর্জে উঠল,
“তাহলে আইন হাতে নিয়েছেন কেন?”
কণ্ঠ ক্রমশ উঁচু হচ্ছে।
“একজন সাধারণ মানুষের কথা বাদই দিলাম। একজন মন্ত্রীর স্ত্রীর নিরাপত্তাও যদি দিতে না পারেন, তাহলে আপনারা কিসের ডিবি?”
চোখে উন্মত্ততা। কণ্ঠে তীব্র ঘৃ'ণা।
“কোন বা'লে'র ডিবি প্রধান আপনি?”
আহাদ তেড়ে এগোতেই আদনান মুহূর্তে মাঝখানে এসে বাধা হয়ে দাঁড়াল। দুই হাতে তাকে শক্ত করে ধরে ফেলল। আহাদ র'ক্তচক্ষু করে তাকাল তার দিকে। হঠাৎ সোফায় এক সজোরে লাথি মারল। আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। হনহন করে বেরিয়ে গেল। পেছন থেকে আমজাদ মীর কঠোর স্বরে প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন,
“কোথায় যাচ্ছো এই শরীর নিয়ে?”
আহাদ থামল না। হাঁটতে হাঁটতেই ঠান্ডা, অমানবিক স্বরে জবাব দিল,
“রিদিকে আনতে।”
এক মুহূর্ত থেমে যোগ করল, “আর মাতাব্বরের হিসাব চুকাতে।”
তার পেছনে ছুটল শাহীন আর আদনান। আমজাদ মীর কয়েক সেকেন্ড স্থির দাঁড়িয়ে রইলেন। ছেলের চোখের সেই আগুন তিনি চিনে ফেলেছেন। তিনি বুঝে গেছেন, এখন আর দেরি করা যাবে না। এক মুহূর্তের মধ্যেই তিনি আনিসুজ্জামানের দিকে তাকালেন। কোনো কথা না বলেই ইশারায় জানালেন, এখন কাজ শুরু করার সময়। তারপর দু’জন একসাথে দ্রুত কেবিন ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন।
★
কামারপট্টির পুরো এলাকাটি আগেই আইন প্রশাসনের ডিবি পুলিশের বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী দিয়ে ঘিরে ফেলা হয়েছে। চারদিক থেকে সিল করে দেওয়া হয়েছে রাস্তা, অলিগলি, পরিত্যক্ত গুদাম আর কারখানাগুলো। যেন কোনোভাবেই খলিল মাতাব্বর, শামিম পোদ্দার কিংবা তাদের সঙ্গপাঙ্গ পালিয়ে যেতে না পারে। রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে শুধু শোনা যাচ্ছে পুলিশের বুটের শব্দ, ওয়াকিটকির ফিসফাস আর দূরে অ্যাম্বুলেন্সের প্রস্তুত অবস্থার সাইরেন। পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে পুলিশ প্রধান আনিসুজ্জামান হাতে মাইক তুলে নিলেন। কণ্ঠে ছিল কর্তৃত্ব আর শেষ সতর্কতার দৃঢ়তা,
“আমি শেষবারের মতো আইন প্রশাসনের পক্ষ থেকে সতর্ক করছি। আপনারা ভালোয় ভালোয় আত্মসমর্পণ করুন। আপনাদের আর পালানোর কোনো রাস্তা নেই। কোনো সুযোগ নেই। যদি পালানোর চেষ্টা করেন, তাহলে বাধ্য হয়ে ইনকাউন্টার করা হবে। তাই সময় থাকতে থাকতে বেরিয়ে এসে আত্মসমর্পণ করুন।”
কিন্তু ভিতর থেকে কোনো সাড়া এলো না। কারখানার ভেতর যেন নিস্তব্ধতা আরও ঘনীভূত হয়ে উঠল। এই নীরবতা আহাদের ধৈর্য ভেঙে দিল। প্রেয়সীকে হারানোর ভয়, অনাগত সন্তানদের অনিশ্চয়তা; সব মিলিয়ে তার বুকের ভেতর যেন দম বন্ধ হয়ে আসছে। সে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
“আপনারা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কী দেখছেন? ওরা এখনো বের হচ্ছে না কেন?”
কণ্ঠে তীব্র উৎকণ্ঠা।
“ভিতরে কী অবস্থা? আমার স্ত্রীর কী অবস্থা কিছু জানেন? কোনো খবর আছে?”
সে এক ধাপ সামনে এগিয়ে গেল।
“আপনারা যদি না পারেন, বলুন। আমি নিজেই ভিতরে যাচ্ছি!”
একজন ডিবি কর্মকর্তা দ্রুত সামনে এসে বলল,
“সরি স্যার। কিন্তু আপনি ভিতরে গেলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে যাবে। একটু ধৈর্য ধরুন। ইঁদুর জীবন বাঁচাতে গর্ত থেকে ঠিকই বেরোবে।”
“ভা… ভাই! ওদিকে তাকান!”
শাহীন ভয়ার্ত কণ্ঠে চিৎকার করে উঠল। সবাই একযোগে তাকাল সামনের দিকে। খলিল মাতাব্বর ধীরে ধীরে বেরিয়ে এসেছে কারখানার ভেতর থেকে। তার এক হাতে পি'স্ত'ল, আরেক হাতে রিদিতার চুলের মুঠি। ব'ন্দু'কের নল ঠেকানো রিদিতার মাথায়। মুহূর্তেই বাতাস ভারী হয়ে উঠল। পালানোর আর কোনো উপায় না থাকায় রিদিতাকেই ঢাল বানিয়েছে তারা। আহাদের বুকের ভেতর ধুকপুকানি অসহনীয় হয়ে উঠল। বুকের মাঝখানে যেন কেউ ধারালো ছু'রি চালাচ্ছে। রিদিতার ঠোঁটের কোণে জমাট বাঁধা শুকনো র'ক্ত। চোখে আ'তঙ্ক জমে আছে। এক হাত দিয়ে উদর চেপে রেখেছে। গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে গরম অশ্রু।
“মন্ত্রীমশাই!”
আহাদের কণ্ঠ ভেঙে উঠল,
“রিদি… জানু…!”
সে দিশেহারা হয়ে এক পা এগোতেই খলিল মাতাব্বর আরও শক্ত করে ব'ন্দু'ক চেপে ধরল রিদিতার মাথায়। রিদিতা চোখ বন্ধ করে গুগিয়ে উঠল। আহাদের পা থেমে গেল। সে অসহায়, করুণ কণ্ঠে মিনতি করল,
“ওকে ছেড়ে দে মাতাব্বর… ওকে কিছু করিস না।”
গলা ভীষন কাঁপছে।
“তোর শত্রুতা তো আমার সাথে। প্লিজ… ওকে ছেড়ে দে।”
সে প্রায় কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“তুই যা চাস, সব দেবো। টাকা, ক্ষমতা, সব! শুধু রিদিকে ছেড়ে দে… আমার বাচ্চাদের কোনো ক্ষতি করিস না… প্লিজ!”
খলিল মাতাব্বর তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে উঠল। ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
“আমি চাই প্রতিশোধ!”
তার কণ্ঠে বিষ।
“তুই আমার জীবন তছনছ করছিস আহাদ রাজা। আমার ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছিস। আজ চাওয়া-পাওয়ার দিন শেষ। এখন শুধু প্রতিশোধ!”
সে রিদিতার চুল আরও শক্ত করে ধরল,
“এই মেয়েটার জন্য তুই আমার বাড়িতে এসে আমাকে অপমান করেছিস। আমি কিছুই ভুলিনি। আজ আমাকে যদি ভালোয় ভালোয় যেতে দিস, তাহলে ওকে ছেড়ে দেবো। নইলে ওকে শেষ করেই আমি সারেন্ডার করবো।”
চারদিক থেকে নিরাপত্তা বাহিনী বন্দুক তাক করে আছে।
আনিসুজ্জামান কঠোর কণ্ঠে গর্জে উঠলেন,
“পি'স্ত'ল নামা মাতাব্বর। তোর আর পালানোর রাস্তা নেই। শেষবারের মতো সতর্ক করছি।”
কিন্তু আহাদ আর অপেক্ষা করতে পারল না। সে প্রায় কাতর হয়ে বলল,
“নো… নো… ফাইন! তুই যা চাস তাই হবে। সবাই ব'ন্দু'ক নামান।”
এক পা এগিয়ে গেল। কণ্ঠ ভেঙে আসছে,
“রিদিকে ছেড়ে দে। ওর কষ্ট হচ্ছে। আমার বাচ্চাদের কিছু করিস না। দোহাই লাগে ওকে ছেড়ে দে।”
আহাদের কথায় নিরাপত্তা বাহিনী ধীরে ধীরে ব'ন্দু'ক নামাল। খলিল মাতাব্বর রিদিতাকে ঢাল বানিয়ে পিছু হটতে লাগল। গাড়ির কাছে পৌঁছে হঠাৎ রিদিতাকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল। সে দৌড়ে গাড়িতে উঠতে যেতেই; পরপর কয়েকটা গু'লি'র শব্দ। মুহূর্তেই খলিল মাতাব্বর নিথর হয়ে লুটিয়ে পড়ল রাস্তায়। এদিকে রিদিতা তার ধাক্কায় পড়ে গিয়ে প্রচণ্ড আঘাত পেয়েছে। র'ক্ত'ক্ষর'ণ শুরু হয়েছে। সে রাস্তায় গুটিশুটি হয়ে অসহ্য যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে।
“আহহ… আমার বেবি.. আ.. মা.. র বা চ্চা।”
আহাদ ছুটে এসে তার পাশে বসে পড়ল। কাঁপা হাতে রিদিতার মাথা নিজের উরুর ওপর তুলে নিল। পাগলের মতো কপাল, গাল, ঠোঁটে একের পর এক চুমু দিতে লাগল। রিদিতা হাউমাউ করে কেঁদে উঠল,
“আমার বেবি… আমার বাচ্চারা… মন্ত্রীমশাই… ওরা ঠিক নেই… প্লিজ কিছু করুন… আমি আর পারছি না…”
তার নিশ্বাস ক্ষীণ। আহাদ দুই হাতে তার গাল ধরে বলল,
“কিছু হবে না। আমি আছি তো হুম। কিছু হবে না।”
“আমি আর পার..ছি না। অনেক কষ্ট হচ্ছে। পারছি না..হ!”
আহাদ দিশেহারা হয়ে চিৎকার করে উঠল,
“আদনান! কিছু কর, কুইক!”
আদনান যদিও গাইনলজিস্ট না। তবুও দ্রুত এসে নার্ভ চেক করল। চোখ সাদা, তা দেখে আদনানের মুখ গম্ভীর হয়ে গেল।
“ইতিমধ্যে প্রচণ্ড রক্তক্ষরণ হয়েছে। অবস্থা খুব খারাপ।”
একটু থেমে বলল,
“আমার মনে ইমিডিয়েটলি সিজার করতে হবে।”
আমজাদ মীর আতঙ্কে বললেন,
“কী বলছো? ওর তো ডেলিভারি ডেট এখনো অনেক দেরি। প্রায় পাঁচ-ছয় সপ্তাহ পর। এখনো তো অনেক সময় বাকি!”
আদনান নিচু গলায় বলল,
“আই নো ছোট আব্বু! কিন্তু এই মূহুর্তে ঢিলে হলে বড় দুর্ঘটনা হতে পারে। ওর অবস্থা বেশি একটা ভালো না।”
আর এক মুহূর্ত দেরি না করে আহাদ রিদিতাকে কোলে তুলে অ্যাম্বুলেন্সে তুলল। গন্তব্য হাসপাতাল। এদিকে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে বিশাল গো'লাগু'লি হয় শামিম পোদ্দার ও তার দল বলের সাথে। কিন্তু শেষ পরিনতি হয় মাতাব্বরের মতোই, মৃত্যু।
চলবে....
(কঠোরভাবে কপি করা নিষিদ্ধ 🚫, চাইলে লিংক শেয়ার করতে পারেন।)
হ্যাপি রিডিং 🫶🏻
#লাল_শাড়িতে_প্রেয়সী ❤️🔥
#অন্তিম_পর্ব (বর্ধিতাংশ)
#লেখনিতে_Fatima_Fariyal
হাসপাতালের করিডোর জুড়ে পিনপতন নীরবতা। Emergency C-section লেখা লাল বাতিটা এখনো জ্বলছে। সামনেই সবাই শ্বাস রুদ্ধ করে বসে আছে। ভিতরে রিদিতাকে নিয়ে গেছে এক ঘণ্টারও বেশি সময় হয়ে গেছে। প্রতিটা সেকেন্ড যেন ঘণ্টার সমান ভারী। ঘড়ির প্রতিটা কাঁটা এক এক করে সবাই গুনছে। কিন্তু এখনো কোনো সুখবর আসেনি। আহাদ অস্থিরতায় একবার অপারেশন থিয়েটারের দরজায় গিয়ে কপাল ঠেকাচ্ছে, তো আবার নিচে বসে পড়ছে; আবার কখনো দুই হাতে চুল টেনে ধরে শূন্যে তাকিয়ে থাকছে। এই অপেক্ষা তাকে ভিতর থেকে ছিঁড়ে ফেলছে। আফরোজা শেখ ছেলের দিকে তাকিয়ে আছেন অসহায়ের মতো। বুকের ভেতর অসহায়ত্ব আর ভয় একসাথে পাক খাচ্ছে। মনে মনে ভাবছেন, আল্লাহ না করুক যদি কোনো দুঃসংবাদ আসে… তাহলে এই ছেলেটাকে তিনি কীভাবে সামলাবেন?
তারেক রায়ান নিথর হয়ে বসে আছেন। চোখে এক ধরনের শূন্যতা। যেন সব অনুভূতি নিঃশেষ হয়ে গেছে। এমন একটা দিন তাকে দেখতে হবে তিনি কখনো কল্পনাও করেননি।
ঈশানী পাশে বসে বাবার দুই হাত শক্ত করে ধরে রেখেছে। যেন বাবাকে ভরসা দিতে চায়; অথচ সে নিজেই ভিতরে ভিতরে ভেঙে পড়েছে। চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রুর কনা সে কোনোমতে আটকে রেখেছে। আমজাদ মীর অস্থিরভাবে করিডোর জুড়ে পায়চারি করছেন। চোখ বারবার ওটির দরজার দিকে চলে যাচ্ছে। ঠিক তখনই ভিতর থেকে আদনান বেরিয়ে এল। তাকে দেখেই সবাই মৌমাছির মতো ঘিরে ধরল। আহাদ কাতর চোখে শুধু তাকিয়ে আছে, কথা বলার শক্তিটুকুও যেন নেই। আমজাদ মীর ভারী কণ্ঠে প্রশ্ন ছুড়লেন,
“আদনান, কিছু বলছো না কেন? কী হয়েছে? অপারেশন কত দূর?”
আদনান একবার আড়চোখে তাকাল আহাদের দিকে। গলা দিয়ে শব্দ বের হতে চাচ্ছে না। তবু ভাঙা কণ্ঠে বলল,
“এখনো চলছে। ড. জোবাইদার সাথে কথা হয়েছে। উনি বলেছেন, এখন শুধু আল্লাহ ভরসা। এর বেশি কিছু বলতে পারছেন না।”
আফরোজা শেখ দাঁড়িয়ে পড়লেন। কণ্ঠে তীব্র উদ্বেগ,
“কী বলছো তুমি? প্রায় এক ঘণ্টা হয়ে গেছে রিদিতাকে নিয়েছে! আর এখনো কিছু বলতে পারছে না?”
আদনান গভীর নিশ্বাস নিয়ে বলল,
“ছোট আম্মু, রিদিতার টুইন প্রেগন্যান্সি। তার ওপর প্রচণ্ড র'ক্ত'ক্ষ'রণ হয়েছে। সব মিলিয়ে কেসটা খুব জটিল। আমি তো বিষয়টা বুঝি। ওরা অকারণে সময় নিচ্ছে না।”
এই কথা শুনে আফরোজা শেখ হতোদ্যম হয়ে আবার বসে পড়লেন। তারেক রায়ানের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। চোখ ছলছল করে উঠল। ঈশানীর চোখ থেকেও অশ্রু ঝরে পড়তে চাইছে। সুমন তারেক রায়ানের পিঠে আলতো করে হাত বুলিয়ে বলল,
“বাবা… রিদির কিছু হবে না। আপনি চিন্তা করবেন না। আল্লাহ ভরসা, সব ঠিক হয়ে যাবে।”
তারেক রায়ান ফুপিয়ে উঠলেন। মেয়ের এই করুণ পরিণতি দেখা একজন পিতার জন্য কতটা অসহনীয়; তা একজন পিতাই বোঝেন। কিন্তু আজ তার সামনে আরেকজন মানুষও ঠিক তার মতো করেই তার মেয়ের জন্য ছটফট করছে। তিনি নিজেকে সামলে নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। আহাদ তখন অপারেশন থিয়েটারের দরজায় মাথা ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তারেক রায়ান ধীরে এগিয়ে গিয়ে আলতো করে তার কাঁধে হাত রাখলেন। আহাদ ঘুরে তাকাল। চোখে অসীম ভাঙন,
“রিদি ঠিক হয়ে যাবে তো, আব্বু? বলুন না… আপনার মেয়ে ঠিক হয়ে যাবে তো?”
তারেক রায়ান কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। আহাদ রাজা তাকে “আব্বু” বলে সম্মধোন করছে। এই ডাকটা তার জন্য অপ্রত্যাশিত, অথচ গভীরভাবে ভেতরটা নাড়া দিল। আহাদ ভাঙা গলায় আবার বলল,
“আপনি ওকে বলুন না… এভাবে আমাকে নিঃস্ব করে যেন না যায়। আপনি তো ওর বাবা। আপনার কথা ও শুনবে। আপনি একবার বলুন না।”
তারেক রায়ান ব্যথাতুর এক ঢোক গিলে নিলেন। তারপর অদ্ভুত কোমল স্বরে বললেন,
“আমার বলা না বলায় কিছু হবে না বাবা। এখানে সব কিছু আল্লাহর ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল। তার বান্দাকে হেফাজত করার মালিক একমাত্র তিনিই। আপনি তার কাছে চান।”
আহাদ অসহায় স্বরে বলল,
“আমি চাইলে কি তিনি শুনবেন? আমার মতো পাপী বান্দার দোয়া কি তিনি কবুল করবেন?”
তারেক রায়ান হালকা হাসলেন,
“তিনি পরম দয়ালু। মন থেকে চাইলে তিনি কাউকে ফিরিয়ে দেন না।”
এই কথাগুলো আহাদের ভিতরে কোথাও গেঁথে গেল।
কিছুক্ষণ পর সে তারেক রায়ানের সাথে হাসপাতালের কেন্দ্রীয় মসজিদের দিকে এগিয়ে গেল। শীতল পানিতে অযু করে দুজনেই একসাথে এশার নামাজ আদায় করল।
নামাজ শেষে তারেক রায়ান দীর্ঘ মোনাজাতে ডুবে গেলেন। কাঁপা কণ্ঠে মেয়ের জন্য দোয়া করলেন, সব যেন আগের মতো স্বাভাবিক হয়ে ফিরে আসে। আহাদও তার পাশে বসে তাকে অুনুকরন করে মোনাজাতে হাত তুলল। বুকের অদৃশ্য বোঝা যেন কিছুটা হলেও হালকা হয়েছে। এক অদ্ভুত প্রশান্তি তার অন্তর ছুঁয়ে গেল। মোনাজাত শেষে আহাদ ক্লান্ত শরীরে গুটিশুটি হয়ে শুয়ে পড়ল মসজিদের খসেখসে কার্পেটে। তারেক রায়ান তার মাথাটা টেনে নিজের উরুর ওপর রাখলেন। আলতো করে মাথায় হাত বুলাতে লাগলেন, যেমন করে একজন বাবা তার সন্তানকে শান্ত করে। আহাদ একদম শিশুর মতো চুপচাপ সেই স্পর্শ অনুভব করতে লাগল। ঠিক যেমনভাবে রিদিতা তার চুলে আঙুল চালাত, এই স্পর্শটাও ঠিক তেমন। তার শুকনো মুখে একচিলতে হাসির আভা ফুটে উঠল। যার সাথে সে আজ অব্ধি চোখে চোখ রেখে ঠিকভাবে কথাই বলেনি, আজ তারই কোলে মাথা রেখে নিশ্চিন্তে চোখ বন্ধ করে আছে।
নীরবে কেটে গেল কিছু সময়। হঠাৎ আহাদের ফোন বেজে উঠল। সে চমকে উঠে বসল। শাহীন। রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠ ভেসে এল,
“ভাই! ভাবিকে অবজারভেশন রুমে নিয়ে গেছে। ডাক্তার বলেছে, আল্লাহর রহমতে সবাই ঠিক আছে। মা আর বাচ্চা সবাই সুস্থ। এখন আপনাকে খুঁজছে।”
আহাদ চোখ বন্ধ করে গভীর স্বস্তির নিশ্বাস নিল। তারেক রায়ানের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আমি আসছি শাহীন… এখনই আসছি।”
মসজিদ হাসপাতাল চত্বরেই ছিল। তাই পৌঁছাতে সময় লাগল না। একজন নার্স এগিয়ে এসে বলল,
“পেশেন্ট রিদিতার হাজবেন্ড কে আছেন? আপনাকে ভিতরে ডাকছে।”
আহাদ তার মায়ের দিকে তাকাল।।আফরোজা শেখ চোখের ইশারায় সাহস দিলেন। আকাশি এপ্রোন, টুপি আর মাস্ক পরে আহাদ কাচের দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকল বুকভরা ভয়, আশা আর অজানা এক অনুভূতি নিয়ে। সামনের বেডে রিদিতা শুয়ে আছে আধা অচেতন অবস্থায়। সাদা চাদরে ঢাকা তার শরীরটা এখন খুবই নিস্তেজ দেখাচ্ছে। মুখে ক্লান্তির ছাপ, চোখ দুটো অল্প অল্প খুলছে। আহাদ ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে তার মাথার কাছে হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল। এতক্ষণ যে বুকের ভেতর ঝড় বইছিল, প্রেয়সীকে চোখের সামনে দেখে সেই ঝড়টা আরও তীব্র হয়ে উঠল। রিদিতা তাকে দেখামাত্রই আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। ঢুকরে কেঁদে উঠল। আহাদ কাঁপা হাতে তার চোখের কোন মুছিয়ে দিল। বৃদ্ধাঙ্গুল দিয়ে আলতো করে গাল ছুঁয়ে দিল, কপালে, গালে, দুই চোখের পাতায় একের পর এক নরম চুমু খেল। তারপর কপালে কপাল ঠেকিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। সেই নীরবতার মধ্যেই রিদিতা টের পেল, আহাদও কাঁদছে। ধীর, ভাঙা কণ্ঠে সে বলল,
“আপনি কাঁদছেন? আমি তো ভেবেছিলাম… আপনি খুশি হয়েছেন।”
আহাদ মাথা তুলে নাক টানল। কণ্ঠটা নামিয়ে বলল,
“আমার প্রাণভোমরা নিয়ে টানাটানি করে বলছো খুশি হতে?”
রিদিতা দুর্বল হাসি হেসে জিজ্ঞেস করল,
“ভয় পেয়েছিলেন?”
আহাদ এক মুহূর্তও দেরি না করে বলল, “ভীষণ।”
“আমাকে ভালোবাসেন?”
রিদিতার চোখ দুটো ভিজে উঠল। আহাদ মৃদু গলায় বলল,
“উহুম।”
এই উত্তর শুনে রিদিতা অভিমানে ঠোঁট দুটো ফুলিয়ে নিল। ক্লান্ত মুখেও সেই ছোট্ট অভিমানটা স্পষ্ট। আহাদ সেটা দেখে হালকা হাসল। সামান্য ঝুঁকে তার কপালের ছোট চুলের গোছা সরিয়ে দিতে দিতে বলল,
“ভালোই যদি না-ই বাসি, তাহলে ব্যাঙের বাচ্চা দুটো কোথা থেকে আসল, রিদি রানি?”
“খবরদার!” রিদিতা ক্ষীণ শক্তি দিয়ে বলল, “আমার বাচ্চাদের ব্যাঙের বাচ্চা বলবেন না।”
আহাদ চোখ বড় করে বলল,
“যাক বাবা! আপনি নিজেই তো একটা ব্যাঙ। আপনার বাচ্চাদের ব্যাঙের বাচ্চা বলবো না তো কী বলবো?”
রিদিতা ক্ষুব্ধ স্বরে বলল, “ব্যাঙ আপনি! আপনার চোদ্দ গুষ্টি!”
আহাদ ঠোঁট চেপে হাসি চাপা দিয়ে বলল,
“সেই চোদ্দ গুষ্টির মধ্যেই তো আপনার বাচ্চা দুটোও পড়ে।”
রিদিতা রাগী চোখে তাকিয়ে রইল। আহাদ তার নাকে আলতো করে একটা ঠোকা দিয়ে বলল,
“ঠিক আছে, আর বলব না। হয়েছে?”
রিদিতা ধীরে মাথা নাড়ল। ফের জিজ্ঞেস করল,
“বেবিদের দেখেছেন?”
আহাদ মাথা নাড়ল, “উহুম।”
“কেন?”
কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে, তবুও সে নিজের কথা শেষ করল,
“আমি তো বলেছিলাম, আমি ম'রি কিংবা বাঁচি, সবার আগে আপনি ওদের মুখ দেখবেন। তাহলে কেন দেখলেন না?”
আহাদ চোখ নামিয়ে শান্ত গলায় বলল,
“কারণ তার আগে তোমাকে দেখা জরুরি ছিল। এখন নিশ্চিন্তে ওদেরও মন ভরে দেখতে পারব।”
সে পাশের একজন নার্সকে ইশারা করল। নার্স এসে একজন একজন করে দুটো বেবিকেই আহাদের কোলে তুলে দিল। আহাদ গভীর দৃষ্টিতে নিজের দুইটা অস্তিত্বের দিকে তাকিয়ে রইল। ছোট্ট ছোট্ট মুখ, মুঠো করা আঙুল, কাঁপা নিঃশ্বাস; সবকিছু যেন অবিশ্বাস্য লাগছে। একে একে দুজনের কপালে চুমু খেল। ছোট আঙুলগুলো ছুঁয়ে দেখল। তারপর কৌতূহল নিয়ে চাদর সরিয়ে দেখতে লাগল। রিদিতা ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
“কী করছেন? এভাবে কী দেখছেন?”
“ছেলে না মেয়ে চেক করছি।”
“আপনি এটাও জানেন না?”
রিদিতা অবাক হয়ে বলল,
“আগেই তো বলা ছিল। একটা ছেলে, একটা মেয়ে!”
“জানি তো! তবুও নিজের চোখে দেখে নিশ্চিত হলাম আর কী!”
“আপনি আসলেই পাগল।”
আহাদ নরম গলায় বলল, “হুম, পাগলই তো। আর সেই পাগলামির কারিগর আপনি নিজেই।”
রিদিতা হালকা হাসল। আহাদ আবার ঝুঁকে তার কপালে নরম চুমু খেল। এবার রিদিতা বেবিদের হাত, আঙুলে একের পর এক চুমু দিতে লাগল। আহাদ অপলক চোখে সেই দৃশ্যটা দেখছিল একজন মা, তার সদ্য জন্ম নেওয়া সন্তান, আর সেই অদ্ভুত শান্তি। ঠিক তখনই একজন নার্স এসে বলল,
“স্যার, আপনার সময় শেষ। এখন আপনাকে বাইরে যেতে হবে। আগামীকাল পেসেন্টকে কেবিনে শিফট করা হবে। এর পরের বার তখনই দেখা হবে।”
আহাদ শেষবার রিদিতার দিকে তাকাল। সদ্যোজাত দুটো শিশুকে কোলে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল। বুকের ভেতরটা কেমন যেন ভারী হয়ে উঠল তার; ভয়, দায়িত্ব আর সীমাহীন ভালোবাসা একসাথে চেপে বসেছে। বাইরে অপেক্ষারত মানুষগুলোর ভিড় উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ল। আহাদ বেবিদের তারেক রায়ানের কোলে তুলে দিল। তারেক রায়ান একে একে দুজনকে কোলে নিয়ে কানের কাছে মধুর স্বরে আজান শোনালেন। এমন সময় আফরোজা শেখ বাচ্চাদের দিকে তাকিয়েই আবেগ চেপে রাখতে না পেরে বলে উঠলেন,
“মাশাআল্লাহ! একদম পুতুলের মতো হয়েছে।”
সাথে সাথেই আমজাদ মীর গর্বভরা কণ্ঠে হেসে উঠলেন। বুকটা যেন আরও চওড়া হয়ে গেল তার।
“দেখতে হবে না, কার নাতি-নাতনী। মীর পরিবারের র'ক্ত বলে কথা।”
সবাই এক জোট হয়ে হেসে উঠল। এমন সময় আহিয়া এসে হাজির। সে বাড়িতেই ছিল। শরীর ভালো না, তাই আদনান বারবার তাকে আসতে বারণ করেছিল। কিন্তু ফুপি হওয়ার আনন্দ তার সমস্ত শারীরিক দুর্বলতাকে হার মানিয়েছে। আবেগ আর ভালোবাসার টানে শেষ পর্যন্ত আদিল সঙ্গে নিয়ে এসেছে। বাচ্চাদের কাছে গিয়ে সে ছোট ছোট আঙুল দুটো ধরে আদর করল। চোখেমুখে কী যে আনন্দ! কণ্ঠটা আপনাতেই শিশুসুলভ হয়ে উঠল।
“আউ! গুলুগুলু বেবিরা… দেখ কে এতেতে! তোমাদের ফুপ্পু এতেতে… এতা তোমাদের ফুপ্পু… ফুপ্পু!”
তার কণ্ঠের উচ্ছ্বাসে মেয়েবাবুটার ঠোঁট কুঁচকে উঠল।আহিয়া একদম ভয় পেয়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে তাকে আলতো করে ঝুলাতে লাগল।
“ও লে লে… না না, না.. কাঁদেনা… কাঁদেনা। এতা ফুপ্পু… তো, তোমাদের ফুপ্পু!”
আদনান দূরে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে রইল। বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠল। এত আনন্দের মাঝেও তার ভেতরে এক নিঃশব্দ পোড়া ব্যথা।আহিয়ার চোখের সেই উজ্জ্বলতা, কণ্ঠের সেই মাতৃত্বমাখা মায়া; সবকিছু মিলিয়ে তার নিজের অপূর্ণতাটাকে যেন আরও প্রকট করে তুলছে। কিন্তু কীভাবে বোঝাবে সে? কী বলবে আহিয়াকে? যে নিজেও ভেতরে ভেতরে পুড়ে যাচ্ছে। কিন্তু কিছুই করার নেই। আল্লাহর সাথে পাল্লা দেওয়া যায় না। হয়তো তিনি চাননি তার সন্তান এই পৃথিবীতে আসুক… এই ভাবনাটুকুতেই তার বুকটা আরও ভারী হয়ে উঠল। আর ভাবতে পারল না সে। একটা গভীর, দীর্ঘশ্বাস ফেলে আদনান এগিয়ে এসে আহিয়ার পাশে দাঁড়াল। আলতো করে আঙুলের ডগা দিয়ে দুটো বেবির নাকে ছুঁয়ে দিল। স্পর্শটুকু ছিল নিঃশব্দ, কিন্তু ভরা ভালোবাসায়। এত বছর পর মীর পরিবারে আবার একসাথে পুত্র ও কন্যার আগমন ঘটেছে। চারপাশ জুড়ে শুধু হাসি, দোয়া আর আনন্দের উল্লাস।
★
ছয় মাস পর…
সকাল থেকেই মীর হাউজে এক অন্যরকম উচ্ছ্বাসের ঢেউ আছড়ে পড়েছে। কারণটা খুব স্পষ্ট, আজই জার্মানি থেকে ফিরেছে সালমান মীর আর শারমিন। যেদিন আকিকা দিয়ে বাচ্চাদের নাম রাখা হয়েছিল, সেদিনই তাদের আসার কথা ছিল। কিন্তু কাজ, সময় আর ব্যস্ততার টানাপোড়েনে তখন আসা হয়ে ওঠেনি। আর আজ সেই অপূর্ণতা পূরণ হয়েছে বলেই সকাল থেকে বাড়িটা যেন উৎসবের রঙে রঙিন। হাসি, গল্প সব মিলিয়ে এক রমরমে পরিবেশ। কিন্তু এই সব কিছুর মধ্যেও আহাদ অনুপস্থিত। সে এখনো ঘুমিয়ে আছে। সারা রাত জুড়েই বাচ্চারা তাকে এক মুহূর্তও শান্তিতে ঘুমোতে দেয়নি। সারা রাত জাগিয়ে রাখে বাচ্চা দুটো। ভোরের দিকে যখন ওরা দুজন একটু চোখ বন্ধ করে, তখনই আহাদও একটু সুযোগ পায় চোখ বুজবার। কিন্তু আজ নিচতলার সেই হইহুল্লোড় তার ঘুমের বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে। বিরক্ত হয়ে সে বালিশটা মুখের ওপর চেপে ধরল। কিন্তু কোনো লাভ হলো না। শেষমেশ গভীর এক বিরক্তির নিঃশ্বাস ফেলে চোখ-মুখ গুছিয়ে উঠে বসল। চোখ এখনো আধ-বোজা, মাথা ঝিমুনিতে ভরা। ঠিক তখনই কানে ভেসে এল একটা পাতলা, আধভাঙা স্বর,
“পা… পাপ্পা… পা পা প্পা… পা পাপ্পা!”
আহাদ বিস্মিত হয়ে হেসে ফেলল। পাশে ঘুরতেই দেখল তার রাজকন্যা ছোট্ট ছোট্ট আঙুলগুলো পুরো মুখের ভেতর পুরে রেখেছে। চোখ দুটো চকচক করছে, মুখে একরাশ আগ্রহ। আহাদ কনুইতে ভর দিয়ে সামান্য ঝুঁকে পড়ল মেয়ের সামনে। তাকে দেখামাত্রই অরিতা উচ্ছ্বাসে হাত-পা ছুড়তে লাগল। কচি গোলাপি ঠোঁট নাড়িয়ে এক নাগাড়ে বলতে লাগল,
“পা পা পা… প্পা… পা… পা…!”
মুখ থেকে থুতু গড়িয়ে পড়ছে। আহাদ বৃদ্ধাঙ্গুল দিয়ে আলতো করে মেয়ের মুখ মুছিয়ে দিল। আদুরে গলায় বলল,
“এই তো পাপা… কী হয়েছে পাপা? কী হয়েছে? খিদে পেয়েছে? খুব খিদে পেয়েছে? মাম্মাম খেতে দেয় না? একদম কেয়ার করে না? একটুও না? হ্যাঁ… একদমই কেয়ার করে না… জানি তো! সব জানি! পাপারও কেয়ার করে না। হুম তো একদম কেয়ার করে না।”
তার কথার মানে ছোট্ট অরিতার অবুঝ মন কিছুই বুঝল না। তবুও মেয়েটা যেন তার বাবার সঙ্গে পাল্লা দিয়েই অভিযোগ জানাতে লাগল। আরো জোরে “বু বু” করে শব্দ করতে লাগল। আহাদ চোখ ঘুরিয়ে পাশের দিকে তাকাল। আব্রাহাম, মানে ছেলেটা নির্বিঘ্নে গভীর ঘুমে। নিঃশ্বাসের ছন্দে বুক ওঠানামা করছে। আহাদ মেয়ের কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“হুসস… আস্তে কথা বল মা। তোমার ভাই ঘুমাচ্ছে তো! শুনে ফেললে মাম্মামকে বলে দেবে। তখন পাপাকে আবার কান ধরতে হবে। আস্তে আস্তে বল, পাপা শুনছি তো!”
অরিতা যেন কথাটা বুঝল। একদম চুপ করে গেল। আঙুল মুখে পুরে ফ্যালফ্যাল করে বাবার দিকে তাকিয়ে রইল।
আহাদ মেয়ের মুখ থেকে আঙুল সরাতেই সে আবার ঢুকিয়ে দিল। এই ছোট্ট জেদেই আহাদ বুঝে গেল মেয়ের খিদে পেয়েছে। সে আদুরে স্বরে বলল,
“খুব বেশি খিদে পেয়েছে মা? ঠিক আছে, পাপা এখনই মাম্মামকে ডেকে আনছি। কেমন?”
এই বলে সে মেয়েকে কোলে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে দোতলার করিডোরে এসে; নিচতলার হলঘরের দিকে তাকাল। নিচে সবাই বসে হাসছে, গল্প করছে, আনন্দে মেতে আছে। কিন্তু রিদিতাকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। আহাদ বুঝে গেল, সে নিশ্চয়ই রান্নাঘরে। রিদিতা এখন হালিমা বেগম আর বানির সাথে প্রায়ই রান্নাঘরে থাকে। ছোটখাটো কাজে সাহায্য করার চেষ্টা করে। আজও তার বিপরীত হয়নি। হালিমা বেগম বারবার নিষেধ করলেও সে শোনেনি। আহাদ মেয়েকে এক হাতে সামলে গলা চওড়া করে ডাকল,
“রিদি… রিদি, উপরে আসো।”
রিদিতা তখন পরোটা বানানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। ময়দা হাতে লেগে আছে। ডাক শুনে সে একটু থমকে গেল। এখন কী করবে বুঝে উঠতে পারছে না। এর মধ্যেই আবার আহাদের রুক্ষ কণ্ঠ ভেসে এল,
“রিদি, উপরে আসো। আমি দ্বিতীয়বার বলবো না।”
রিদিতার মুখে একটা অসহায় হাসি ফুটে উঠল। আহিয়া দ্রুত এসে বলল,
“ভাইয়া তোকে ডাকছে। অরিতার খিদে পেয়েছে মনে হয়। তুই যা, আমি দেখছি।”
রিদিতা আর কিছু না বলে হাত ধুয়ে দ্রুত উপরে চলে গেল।
আহিয়া কিছুক্ষণ রান্নাঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে রইল।
কোথা থেকে শুরু করবে বুঝতে পারল না। এসব কাজ সে কোনোদিনই ঠিকভাবে করেনি। রান্নাঘর মানেই তার জন্য আতঙ্ক। এক হাতে কপালের চুলগুলো পেছনে সরিয়ে ক্লিপ দিয়ে আটকে নিল। তারপর সাহস সঞ্চয় করে হাত বাড়াল ময়দার দিকে। এক জগ ভর্তি পানি তুলে ময়দার পাত্রের মধ্যে ঢেলে দুই হাত দিয়ে গুলতে লাগল। ময়দা কাদা কাদা হয়ে যাচ্ছে কিন্তু সে বুঝল না। ঠিক তখনই রান্নাঘরে ঢুকলেন হালিমা বেগম। চোখে পড়তেই যেন বজ্রাঘাত হলো তার মাথায়। তিনি কপালে চাপড় দিয়ে হায়হুতাশ করে উঠলেন,
“হায় আল্লাহ! আহিয়া তুই এটা কী করলি? তোকে কে বলছে রান্নাঘরে আসতে? বানি আপা, তুমি দেখনি? ও এটা কী করল!”
আহিয়া হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল। সে তো কিছু ভুল করেছে বলে তার মনে হচ্ছে না। সে অবাক কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
“কেন? পরোটা বানাবা না? আমি তো আটা গুলে দিচ্ছি।”
হালিমা বেগম যেন মাথায় হাত দিয়ে বসলেন।
“মা, মাফ চাই। তোর কিছু করতে হবে না। তুই আদনানের চা নিয়ে যা। রান্নাঘরে এলেই একটা না একটা ঝামেলা করিস। ঠিকমতো তো চাও বানাতে পারিস না!”
তিনি কথা থামালেন না। বরং পুরোনো কথা তুলে ক্ষোভের সাথে বললেন,
“সেদিন কী করলি? চায়ের রং আনার জন্য মরিচ ঢেলে দিয়েছিস। পাগলেও তো বোঝে চা পাতি দিয়ে চা বানায়। আর তুই কিনা! তুই যা মা! তোর এই পরোটা মরোটা বানাতে হবে না। তুই আদনানের চা নিয়ে দিয়ে আয়।”
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রিতু হেসে ফেলল। আহিয়া সঙ্গে সঙ্গে চোখ রাঙাল। একটু ধমকে উঠল,
“চুপ থাক! একদম হাসবি না। সব তোর জন্য হইছে। তুই বললি না কেন এত পানি দেওয়া যাবে না?”
রিতুর হাসি এক মুহূর্তে মিলিয়ে গেল। নিজে দোষ করে এখন তার ঘাড়ে চাপাচ্ছে। এই বুদ্ধিটা আহিয়ার ভালোই জানা। হালিমা বেগম আর কথা বাড়ালেন না। হাতের ইশারায় তাড়া দিলেন। আহিয়া আর কিছু না বলে হাত ধুয়ে চায়ের কাপ নিয়ে ধীর পায়ে উপরে উঠতে লাগল। আজ আদনান ছুটি নিয়েছে। এতক্ষণ সে নিচেই ছিল সবার সঙ্গে। এখন উপরে এসেছে নিজের ঘরে। দরজার সামনে এসে আহিয়া থমকে দাঁড়াল। হঠাৎ করেই বুকের ভেতর একটা দোটানা জমে উঠল। সে তো রাগ করে নিজের ঘরে চলে গেছে। আজ দুই দিন হলো, এই রুমের আশেপাশেও আসেনি। এখন কী করবে? ভিতরে যাবে? নাকি চা রেখে আবার ফিরে যাবে? মনের ভেতর নিজেকেই নিজে বোঝাতে লাগল। এমন সময় ভেতর থেকে পুরুষালি একটা কণ্ঠ ভেসে এল,
“না না, নিচে বড় আব্বু, বড় আম্মু আছে। এখন নিচে গেলেই সবাই সন্দেহ করবে। আমি তো আর থাকতে যাচ্ছি না উনার সাথে। আমি শুধু চা দিয়েই চলে যাবো। ব্যাস!”
আহিয়া চমকে উঠল। চোখ বড় বড় হয়ে গেল। সে তো এসব মনে মনে ভেবেছে! উনি কী করে জানলেন? ভেতরে দাঁড়িয়ে আদনান ঠোঁট চেপে নিজের হাসি সংযত করল। দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটার প্রতিটা দোটানা সে ঠিকই ধরে ফেলেছে। আহিয়া কান পেতে ভেতরের শব্দ শোনার চেষ্টা করছিল। ঠিক তখনই দরজাটা হঠাৎ সামনে থেকে খুলে গেল। আদনান দাঁড়িয়ে আছে
বুকের ওপর হাত জড়ো করে, ভ্রু একটু উঁচু করে। আহিয়া যেন চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়েছে, এমন কাচুমাচু হয়ে গেল। জিভ জড়িয়ে বলল,
“ওও… চা… চি… আম্মু আপনার চা পাঠিয়েছে। নয়তো আমি আসতামই না।”
“চাচি আম্মা বলছে?” আদনানের কণ্ঠে হালকা কৌতুক।
“হুম।”
আদনান ঠোঁট কামড়ে হালকা হাসল। তারপর ভেতরে গিয়ে সোফায় বসে পায়ের ওপর পা তুলে দু’আঙুল দিয়ে ইশারা করল। আহিয়া ছোট ছোট পা ফেলে তার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। আদনান কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে রইল, একদম নীরবে। তারপর টেবিলের দিকে ইশারা করে বলল,
“রাখ টেবিলে।”
আহিয়া কাপটা টেবিলে রেখেই তড়িঘড়ি করে বলল,
“আমি আসছি।”
দরজার দিকে দ্রুত পা বাড়াল।।ঠিক তখনই পেছন থেকে ভেসে এল,
“আহি!”
পা থেমে গেল আহিয়ার। দরজার কাছেই দাঁড়িয়ে রইল সে।
ভিতরের অস্থিরতাটা আচমকা যেন দ্বিগুণ হয়ে উঠল। বুকের ভেতরটা কেমন ছটফট করছে। এই অনুভূতিটা তার খুব চেনা। আদনানের এই স্বর… এই ডাক… এর সঙ্গে সে বহুদিনের পরিচিত। কতবার এই কণ্ঠ তাকে নিজের কাছে টেনেছে তার হিসেব নেই। তবুও এই দুই দিন সে নিজেকে ভীষণভাবে সংযত রেখেছে। কারণটা খুব সাধারণ, আবার খুব গভীরও। সেদিন আদনানকে দেখেছিল একটা মেয়ের সঙ্গে। সহকর্মী হবে হয়তো! কিন্তু তার সাথে এত কথা কিসের? ব্যাস! সেখান থেকেই অভিমানের বীজটা আহিয়ার মাথার ভেতরে গজিয়ে উঠেছে। আদনান আর কতবার বোঝাবে? তার জীবনে আহিয়া ছাড়া আর কেউ নেই। এই কথাটা তো সে হাজারবারই বলেছে।
আহিয়া ধীরে ফিরে তাকাল। কণ্ঠটা ইচ্ছে করেই স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করল,
“কিছু বলবেন, আদনান ভাই?”
আদনানের মুখটা মুহূর্তে বিবর্ণ হয়ে গেল। চোখে জমে উঠল চাপা রাগ, চাপা অসহায়তা। তবুও সে নিজেকে সামলে নিল। ঠোঁটের কোণে জোর করে একটা হাসি টেনে এনে বলল,
“একটা জিনিস দিতে ভুলে গেছিস।”
আহিয়া ভ্রু কুঁচকে তাকাল, “কী?”
“এদিকে আয়। বলছি।”
এই ডাকটা সন্দেহ জাগাল তার মনে। তবুও কৌতূহলটা তাকে এগোতে বাধ্য করল। সে মাত্র দুই কদম এগিয়েছে, এর মধ্যেই আদনান হঠাৎ টেনে নিজের কোলে বসিয়ে নিল। কানের কাছে ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল,
“আদর। আদর দিতে ভুলে গেছিস।”
একটু থেমে আবার বলল,
“ইদানীং তোর আদরের অভাবে ভুগছি আমি, আহি। ভিতরটা মরুভূমির তৃষ্ণার্ত যাযাবরের মতো শুকিয়ে গেছে। কেন এমন করে জালাতন করিস আমাকে?”
আহিয়া নিজের ভেতরের দুর্বলতাটা লুকাতে চেষ্টা করে নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে চাইল,
“ছাড়ুন আমাকে। আমি আপনার সাথে থাকবো না। আমি এই ঘরে থাকবো না।”
আদনান একদম শান্ত স্বরে বলল,
“ঠিক আছে। সমস্যা নেই। আজ থেকে আমরা তোর ঘরেই থাকবো, কেমন?”
“না। মোটেও না।”
আহিয়ার কণ্ঠে জেদ, “আমার ঘরে আপনার জায়গা নেই।”
আদনান তাকিয়ে রইল। প্রশ্ন করল,
“আমার অন্যায় কী?”
“ভুলে গেছেন?”
“হ্যাঁ। বল কী অন্যায় করেছি আমি?”
“ওই যে… ওই মেয়েটা।”
আদনান আহিয়ার গ্রীবায় মুখ গুঁজে দিল। নরম গলায় জিজ্ঞেস করল,
“কোন মেয়েটা?”
“এখন না জানার ভান করছেন?”
আহিয়া আবার উঠতে চাইল, “ছাড়ুন আমাকে।”
আদনান তাকে শক্ত করে নিজের বুকে আটকে রাখল। কণ্ঠটা ভারী হয়ে গেল,
“পারবো না। পারবো না আমি তোকে ছাড়তে। তুই যা করার করে নে। প্রয়োজনে আমাকে মেরে ফেল। তবুও আমি ছাড়বো না।”
আহিয়া চাপা স্বরে বলল,
“সবাই নিচে আছে! ছাড়ুন না।”
আদনান নির্ভীক স্বরে বলল,
“তো কী হয়েছে? এখন সবাই জানে তুই আমার বউ।”
আহিয়ার কণ্ঠে জমে থাকা কষ্ট বেরিয়ে এল,
“আমি আপনার কেউ না। আপনি আমাকে ভালোবাসেন না।”
“কে বলল বাসি না?”
“আমি তো জানতাম না। বাসেন নাকি?”
আদনান চোখে চোখ রেখে বলল, “প্র্যাক্টিক্যালি দেখাই?”
আহিয়া চমকে উঠল, “এই না না… এ… এখন না।”
“তাহলে কখন?”
হালকা মুচকি হেসে বলল, “রাতে? রাতে তুই আসবি। না আমি যাবো তোর ঘরে?”
এইবার আহিয়া নিজেকে ছাড়িয়ে উঠে বসল। চোখের কোণ দিয়ে তাকাল, আবার দ্রুত দৃষ্টি সরিয়ে নিল। তবে কিছু বলল না। এই নীরবতাটুকুই আদনানের জন্য যথেষ্ট ছিল। সে হালকা হাসল,
“ঠিক আছে। আমিই যাবো।”
তারপর হঠাৎ স্বরে দৃঢ়তা এনে বলল,
“একটা কাজ করিস। তোর যাবতীয় জিনিসপত্র প্যাক করে রাখিস। আমি সাত দিনের ছুটি নিয়েছি। আমরা কাল সকালের ফ্লাইটে সুইজারল্যান্ড যাবো।”
আহিয়া বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল,
“সুইজারল্যান্ড?”
“হুম।”
“আপনি কী করে জানলেন সুইজারল্যান্ড আমার ড্রিম কান্ট্রি?”
আদনান হালকা হেসে তার কানের পাশের চুলের গোছা গুঁজে দিয়ে বলল, “তোর পছন্দ-অপছন্দ ছোটবেলা থেকেই জানি আমি। আর এটা জানবো না?”
কণ্ঠটা আরো নরম হলো,
“আমি যতদিন বেঁচে আছি তোর স্বপ্নগুলো পূরণ করবো, আহি। শুধু তুই আমার হয়ে থাক আজীবন। আমার তাতেই চলবে।”
আহিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর হঠাৎই আদনানের বুকে মাথা গুঁজে দিল। অভিমানী স্বরে বলল,
“আমি তো আপনারই। আপনার হয়েই থাকবো। শুধু তার বিনিময়ে আমাকে প্রতিদিন চকলেট এনে দিলেই হবে।”
আদনান তৃপ্তিকর হেসে ফেলল। দিন যত যাচ্ছে, এই মেয়েটার প্রতি তার আসক্তি ততই বাড়ছে। আর এই মেয়েটা মাঝে মাঝে এমন অভিমান করে বসে; যে তার বুকের ভেতরটা শুকিয়ে যায়। একটাই ভয় তার মনে বারবার ঘুরে ফিরে আসে, যদি আহিয়া সত্যিই একদিন তাকে ছেড়ে চলে যায়… তাহলে তো তার জীবননাশ ঘটবে খুব দ্রুত!
চলবে....
(কঠোরভাবে কপি করা নিষিদ্ধ 🚫, চাইলে লিংক শেয়ার করতে পারেন।)
📌
হ্যাপি রিডিং 🫶🏻
#লাল_শাড়িতে_প্রেয়সী ❤️🔥
#অন্তিম_পর্ব (পরিশিষ্টংশ)
#লেখনিতে_Fatima_Fariyal
বাবা হওয়ার ভারটা কাঁধে পড়ার পর থেকেই আহাদের জীবনযাত্রা বদলে গেছে। আগের সেই নির্বিকার সময়সূচি আর নেই। এখন প্রতিটা দিন কাজ শেষ করার একটাই তাড়া, যত দ্রুত সম্ভব বাড়ি ফেরা। কারণ বাড়িতে তার জন্য অপেক্ষা করে থাকে দুটো ছোট্ট প্রাণ। চাতক পাখির মতো চেয়ে থাকে দরজার দিকে। বাবা ফিরবে এই আশায়।
ওদের ওমন ভরাট, বিস্মিত চোখদুটো আহাদের সমস্ত ক্লান্তি শুষে নেয়। অফিসের চাপ, রাজনীতির কূটচাল, মানুষের মুখোশ, সবকিছু মুহূর্তে অর্থহীন হয়ে যায়। এই আনন্দটুকু থেকে সে কোনো দিনই বঞ্চিত হতে চায় না। কিন্তু আজ… আজ বড়সড় একটা মিটিং ছিল। সময় কোথা দিয়ে চলে গেল টেরই পেল না। মন্ত্রণালয় থেকে বেরোতে বেরোতে সন্ধ্যা গড়িয়ে গেছে। তাছাড়া আজকের দিনটা তার জন্য এমনিতেই বিশেষ। আজকে ডিসেম্বরের ছাব্বিশ। রিদিতার জন্মদিন। মনে পড়ে আহাদের বুকটা একটু চেপে ধরল। অবশ্য রিদিতার হয়তো নিজেরই খেয়াল নেই। দুটো বাচ্চা সামলাতে সামলাতে দিন–তারিখ, উৎসব, সব গুলিয়ে যায় মেয়েটার। তবুও… সে তো প্রেয়সীর বিশেষ দিনটা ভুলতে পাটে না। গাড়ির কাছে আসতেই আহাদের চোখে পড়ল, নাদিম আর শাওন দাঁড়িয়ে আছে। ওদের ওপরই আজকের একটা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দিয়েছিল সে। গাড়ির ঠান্ডা বোনেটে ভারী, ক্লান্ত শরীরটা ঠেকিয়ে আহাদ প্রশ্ন ছুড়ল,
“আমি যা যা বলেছিলাম, সব এনেছিস তো?”
নাদিম সঙ্গে সঙ্গে ডিকি খুলে দেখাল,
“সব আনছি ভাই। কিন্তু… একটা ঝামেলা হয়ে গেছে।”
আহাদের ভ্রু কুঁচকে গেল, “কী ঝামেলা?”
“কেকটা…” নাদিম ঢোক গিলল, কেকটা বচকায়া গেছে।”
“হোয়াট?”
আহাদের কণ্ঠ মুহূর্তে চড়া হয়ে উঠল।
নাদিম তড়িঘড়ি যোগ করল, “সব ঠিকই ছিল ভাই। এখানে আসার পরই ঝামেলাটা হইছে। আর এটা শাওনের জন্যই হইছে।”
শাওন সঙ্গে সঙ্গে তেঁতে উঠল,
“একদম ফাও কথা বলবি না নাদিম! আমার জন্য হইছে? নাকি তোর জন্য?”
“গাড়ির ডিকি কে খুলছে?”
“আমি কী জানি!”
নাদিম ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল, “এখন তো জানবাই না। দুধে ধোয়া তুলশি পাতা !”
“নাদিম্মাআআআ!”
শাওন দাঁত কিড়মিড় করতে লাগল। পরের মুহূর্তেই আহাদের বজ্রকণ্ঠ আছড়ে পড়ল,
“থাপ্পড়ায়া একেকটার চেহারার নকশা পাল্টায়া দিবো। একটা কাজও ঠিকঠাক করতে পারিস না, গর্দভ!”
দুজনেই মুহূর্তে চুপসে গেল। ঠিক তখনই শাহীন বেরিয়ে এলো। ভেতরে কিছু ফাইল আর ডাটা নিয়ে ব্যস্ত ছিল এতক্ষণ। এসেই আহাদকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“চলেন ভাই। আমি ডাটা ট্রান্সফার করে দিয়েছি। বাকিটা সৌম্য বাবু দেখে নেবে বলেছে।”
আহাদ মাথা নাড়ল, “ঠিক আছে। তুই এবার যা।”
শাহীন একটু থমকে প্রশ্ন করল,
“আপনি বাড়ি যাবেন না?”
“হ্যাঁ যাবো।”
আহাদ একটু চুপ থেকে, সংক্ষেপে বলল,
“এখন থেকে তোর আর আমার সাথে বাড়ি পর্যন্ত যাওয়ার দরকার নেই। কাজ শেষ করে সোজা বাসায় যাবি। নীলার এই মুহূর্তে তোকে বেশি দরকার।”
শাহীন একদণ্ড চুপ করে রইল। তারপর একটু গাল ভারী করে বলল, “সমস্যা নেই ভাই। আপনাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়েই যেতে পারবো।”
এই কথাটুকুতেই আহাদের চোখ লাল হয়ে উঠল।
“সমস্যা আছে কি নাই আমি জানতে চেয়েছি? আমি যখন বলেছি চলে যাবি, তখন ম্যানম্যান করছিস কেন?”
শাহীন মাথা নিচু করে ফেলল, “সরি ভাই…”
আহাদ আর কিছু বলল না। নীরবে শাহীনের গম্ভীর মুখটার দিকে তাকিয়ে রইল। শাহীনের চোখে ক্লান্তি, ভেতরে জমে থাকা অসহায়ত্ব, সবই যেন স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। সেই চেনা, দৃঢ় আহাদ আজ একটু ধীর হয়ে গেল। একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল সে। তারপর খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে শাহীনের কাঁধে হাত রাখল। কণ্ঠস্বর মুহূর্তেই বদলে গেল। কঠিন আহাদ যেন হঠাৎ করেই অভিভাবকের রূপ নিল।
“দেখ শাহীন, জীবন কখনো কারোর জন্য থেমে থাকে না। থামে না, বুঝলি? তুই এখন যেটা করছিস, সেটা শুধু তোর নিজের ক্ষতিই করছে না। তোর জীবনের সঙ্গে আরও তিনটা মানুষ জড়িয়ে আছে। তোর মা, নীলা… আর তোর অনাগত সন্তান।”
শাহীন চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। আহাদ একটু থামল, যেন কথাগুলো ঠিক জায়গায় বসাতে চাইছে। আবার বলল,
“একবার ভাব, খালাম্মা কতটা খুশি তোর বাবা হওয়ার খবরে। সারাজীবন কত কষ্ট করে মানুষ করেছে তোকে। আর নীলার কথা ভাব। মেয়েটা ছোটবেলা থেকে তেমন কিছুই পায়নি। তবুও কোনো অভিযোগ না করে সবকিছু মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে।”
আহাদ এবার একটু শক্ত করে শাহীনের কাঁধে হাত রাখল।
“যে তোকে ছেড়ে গেছে, তার জন্য যাকে পেয়েছিস; তাকে অবহেলা করিস না। সবাই সব কিছু পায় না শাহীন। যা পেয়েছিস, সেটার মূল্য দিতে শিখ।”
শাহীন যেন পাথর হয়ে গেল। কী বলবে সে? কী করবে? নিজেকেই তো সে এখনো বুঝে উঠতে পারেনি। মানিয়ে নিতে চাইলেও কোথাও যেন একটা বাধা কাজ করে। তবুও সত্যিটা অস্বীকার করার উপায় নেই, নীলা চেষ্টা করছে। সম্পর্কটা বাঁচানোর চেষ্টা করছে। আহাদ পিঠে আলতো করে চাপড় দিয়ে ভরসা দিল। শাহীন আবেগ সামল দিতে না পেরে আহাদকে জড়িয়ে ধরল। একদম অনাকাঙ্ক্ষিত। আহাদ কিছু বোঝার আগেই দুই পাশ থেকে নাদিম আর শাওনও ঝাঁপিয়ে পড়ল। মুহূর্তের মধ্যে তিনজনের চাপে আহাদ প্রায় পিষ্ট!
আহাদের সাধারণত গায়ে গা লাগানো একদমই পছন্দ না। কিন্তু আজ কেন জানি খারাপ লাগছে না। বরং অদ্ভুত একটা ভালো লাগা কাজ করছে। এই তিনজন, তার এই ত্রয়ী; ওকে ভীষণ ভালোবাসে, শ্রদ্ধা করে। সেটা আজ আবার নতুন করে অনুভব করল সে। কয়েক সেকেন্ড পর আবেগী মুহূর্তটা কেটে যেতেই আহাদ আবার নিজের চেনা রূপে ফিরে এল। নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করল। বিরক্ত গলায় বলল,
“আহ! কী করছিস? মেয়ে মানুষের মতো গায়ে পড়েছিস কেন? ছাড়! ছাড় আমাকে। দূরে যা!”
কিন্তু ত্রয়ী ছাড়ার পাত্র নয়। বরং আরও শক্ত করে চেপে ধরল। আজ সুযোগ পেয়েছে, এমন সুযোগ তো বারবার আসে না। গর্জে উঠল আহাদ,
“থাপ্পড়ায়া একেকটার চেহারা পাল্টায়া দিবো। ছাড়তে বলেছি না!”
এবার তিনজনই ছেড়ে দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল। আহাদ আদেশের সুরে বলল, “শাহীন, যা, বাসায় যা। তোর তিন দিনের ছুটি। এই তিনটা দিন নীলা আর তোর অনাগত সন্তানের জন্য। ভুলে যাস না।”
শাহীন কিছু বলল না। শুধু ইশারায় নীরব বিদায় জানিয়ে চলে গেল। শাহীন চলে গেলেও নাদিম আর শাওন বিস্ময়ে মুখ হাঁ করে দাঁড়িয়ে আছে। আহাদ সেটা দেখে বিরক্ত হয়ে বলল,
“সমস্যা কী? এমন বোয়াল মাছের মতো হা করে আছিস কেন?”
নাদিম অবাক গলায় বলল,
“শাহীন তো নীলার ধারে কাছেও যায় না। যতদূর আমি জানি! তাহলে হুট করে বাবা কীভাবে হচ্চে ও?”
শাওন হে হে করে হেসে উঠল।
“সবই আল্লাহর লীলা খেলা, বুঝলি?”
নাদিম সন্দেহের চোখে তাকাল।
“মানে? কী বলতে চাইছিস!”
আহাদ তখন আনমনে ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে। দেরি হয়ে যাচ্ছে। শাওন রহস্যময় ভঙ্গিতে বলল, “সেদিন আমি ওর অরেঞ্জ জুসের সঙ্গে একটু মশলা মিশাইছিলাম। মনে হয় সেটারই কর্মফল।”
নাদিম চোখ চকচক করে উঠল।
“আমারেও একটু মশলা দে ভাই! আর কত একা একা নিঃসঙ্গ জীবন কাটামু!”
শাওন ব্যঙ্গ করে বলল,
“জীবনে তো একটা প্রেমিকাও জুটাইতে পারছ নাই। মশলা কার উপর প্রয়োগ করবি?”
“তোর উপর, আয়, পাটক্ষেতে যাই।”
শাওনের কাঁধে হাত রাখতেই শাওন ঝটকা দিয়ে হাত সরিয়ে দিল।
“আস্তাগফিরুল্লাহ! নাউজুবিল্লাহ! আমার এত খারাপ দিনও আসে নাই যে তোর লগে পাটক্ষেতে যামু!”
আহাদ ফোড়ন কেটে বলল,
“আশেপাশে পাটক্ষেত নাই। তবে একটু খুঁজলে কচুক্ষেত পাইতে পারস।”
নাদিম কি আর সুযোগ ছাড়ে? সে আবার শাওনের কাঁধে হাত রেখে বলল, “চল, কচুক্ষেতে যাই।”
শাওন ঝট করে সরে গেল।
“আল্লাহ মাফ করুক। প্রয়োজনে আফ্রিকার জঙ্গলে যামু, তবুও তোর সাথে যামু না!”
“চল না যাই,”
নাদিম আবার জ্বালাতে লাগল। এইবার শাওন দৌড়ে পালাল। নাদিমও পেছনে পেছনে ছুটল।
“আমারে তো নিয়া যা! একা একা গেলে হবে না তো শাওন বেবি!”
আহাদ দৃশ্যটা দেখে শব্দ করে হেসে উঠল। অতঃপর গাড়িতে উঠে বসল। দেরি হয়ে গেছে। যাওয়ার পথে আবার কেক নিতে হবে। আজকের দিনটা যে একটু আলাদা।
★
শাহীন যখন বাড়ির ভেতরে ঢুকল, তখন ঘড়ির কাঁটা নয়টা পেরিয়ে বেশ খানিকটা এগিয়েছে। তার কাছে বাড়ির অতিরিক্ত চাবি থাকে। রাত-বিরেতে ফেরার অভ্যাস তার নতুন। মা আর নীলাকে বিরক্ত করতে চায় না সে। মায়ের শরীর এমনিতেই ভালো থাকে না আর এখন নীলার শরীরটাও ভালো যাচ্ছে না। শারীরিক দুর্বলতার সঙ্গে মানসিক চাপও যোগ হয়েছে। বাড়িতে ফিরেই শাহীন সাধারণত চুপচাপ গিয়ে নিজের মতো করে শুয়ে পড়ে। নীলা অনেকবার বলেছে, রাত যত দেরিই হোক; যেন অন্তত তাকে ডাকে। কিন্তু শাহীনের ভেতরে অদ্ভুত এক অস্বস্তি কাজ করে। যাকে সে নিজের স্ত্রীর পূর্ণ মর্যাদা দিতে পারে না, তার কাছ থেকে স্বামীর অধিকার চাওয়া তার কাছে বোকামি মনে হয়। যদিও সত্যিটা হলো, সে চায়ও না। সম্পর্কটার দায় এড়িয়ে যাওয়াই তার সহজ পথ। ধীরে দরজা খুলে ভেতরে পা রাখতেই শাহীন থমকে গেল। ডাইনিং টেবিলের উপর মাথা রেখে নীলা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। চারপাশ নিস্তব্ধ। এমন দৃশ্য নতুন নয়, প্রায়ই নীলার অপেক্ষা এভাবেই শেষ হয়। অপেক্ষা করতে করতে ক্লান্ত শরীর নিজেই হার মানে। শাহীন ধীরে এগিয়ে এসে খুব নিচু স্বরে ডাকল,
“নীলা… নীলা।”
নীলা হকচকিয়ে উঠে বসল। ঘুম জড়ানো চোখ কচলাতে কচলাতে তাকাল শাহীনের দিকে। যেন কয়েক সেকেন্ড সময় লাগল বুঝতে সে কোথায়, কী হচ্ছে।
“আপনি এসেছেন?” নরম গলায় বলল সে।
“আজকে এত তাড়াতাড়ি?”
শাহীন প্রশ্নটার উত্তর দিল না। সে বরাবরের মতো পাশ কাটিয়ে গেল। চারপাশে একঝলক চোখ বুলিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করল,
“মা কই? ঘুমিয়ে পড়েছে?”
নীলা মাথা নেড়ে বলল।
“হ্যাঁ, মায়ের তো নয়টার ওষুধ। খাওয়াইয়ে ওষুধ দিয়ে এসেছি।”
“ওহ।”
এইটুকুই। শাহীন সিঁড়ির দিকে পা বাড়াল। ঠিক তখনই নীলা পেছন থেকে ডাকল,
“আপনি খাবেন না?”
শাহীনের কণ্ঠে ক্লান্তি। “না, ইচ্ছে করছে না।”
নীলা আর কিছু বলল না। নীরবে টেবিলে রাখা খাবারগুলো ঢাকতে শুরু করল। সেই নীরবতার মধ্যে একটা চাপা অভ্যস্ত কষ্ট লুকিয়ে থাকে, যা কখনোই প্রকাশ পায় না। শাহীন সিঁড়ির এক ধাপে পা রেখেই হঠাৎ থেমে গেল। কেন জানি মনে হলো, কিছু একটা বলা দরকার। সে ফিরে তাকাল।
“তুমি খেয়েছো?”
নীলা সামান্য চমকে উঠল। এমন প্রশ্ন শাহীনের কাছ থেকে সে কখনোই আশা করে না। মুখে হালকা একটা হাসি আনার চেষ্টা করল; যদিও চোখে সেটা পৌঁছাল না।
“না, খাইনি।”
“কেন খাওনি?”
নীলা একটু থামল। তারপর সোজাসাপটা উত্তর দিল,
“একা একা খেতে ইচ্ছে করছিল না।”
শাহীন অজান্তেই একটা ঢোক গিলল। আসলেই তো। মেয়েটার সঙ্গে একবেলা বসে খাওয়াটুকুও তার হয় না। যেন সবসময় অপেক্ষার তালিকায় পড়ে থাকে। শাহীন কী মনে করে আর উপরে গেল না। চুপচাপ হাত ধুয়ে ডাইনিং টেবিলে এসে বসল। নীলার চোখে এটা সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত। সে দ্রুত খাবারগুলো খুব যত্ন করে শাহীনের সামনে সাজিয়ে দিল। কোনো উচ্ছ্বাস নেই, শুধু দায়িত্ব আর অভ্যাস। শাহীন ইশারা করতেই নীলাও তার পাশে এসে বসল। রাতের নীরবতার ভেতর শুধু থালা-চামচের টুংটাং শব্দ। দুইজন মানুষ, একই টেবিলে তবুও মাঝখানে একটা অদৃশ্য দেয়াল। নীরবতার মধ্য দিয়েই শেষ হলো সেই রাতের নৈশভোজ।
ঘরে এসে নীলা ধীরে ধীরে বিছানা গুছিয়ে নিল। দিনের শেষে শরীরটা ক্লান্ত হলেও মনটা আজ অন্যরকম অস্থির। বাইরে থেকে শাহীনের শাওয়ারের শব্দ শোনা যাচ্ছে। কিছুক্ষণ পর সে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে এলো। নীলা বালিশটা তুলে শাহীনের দিকে বাড়িয়ে দিল। কারণটা খুবই স্বাভাবিক, আবার খুবই নিষ্ঠুর। শাহীন বরাবরই সোফায় ঘুমায়, আর নীলা বিছানায়। এই ঘরের ভেতরেও তাদের জন্য আলাদা আলাদা জায়গা নির্ধারিত। শুধু একদিনই তাদের বিছানা আলাদা ছিল না। সেদিন শাহীন নেশায় ছিল। নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিল আর নীলাও সেদিন তাকে থামায়নি। একজন বৈধ স্বামী-স্ত্রীর পবিত্র বন্ধনের মতোই সেদিন তাদের মাঝখানে কোনো দূরত্ব ছিল না। সম্পর্কটা অস্বীকার করার সুযোগও ছিল না। আর আজ, আজই নীলা জানতে পেরেছে সে মা হতে চলেছে। ঠিক কত সপ্তাহ, সে নিশ্চিত না। ছয়, সাত পিরিয়ডের হিসাব মিলিয়ে এইটুকু আন্দাজই করতে পেরেছে। কিন্তু এই অনাগত প্রাণটার অস্তিত্ব সে তার ভেতরে খুব স্পষ্টভাবে অনুভব করছে। শাহীন বালিশটা নিতে গিয়ে হঠাৎ থমকে গেল। আহাদের কথাগুলো আচমকা তার মাথার ভেতর আছড়ে পড়ল। সে বালিশটা আবার আগের জায়গায় রেখে দিতে দিতে শান্ত স্বরে বলল,
“আমি যদি বেড শেয়ার করি, তোমার কোনো আপত্তি আছে?”
একটু থেমে যোগ করল,
“আসলে… সোফায় শুতে শুতে আমার ঘাড় ব্যথা করছে।”
নীলা প্রথমে বুঝতেই পারল না, কী বলবে। এমন প্রস্তাব তার জন্য একেবারেই অপ্রত্যাশিত। বুকের ভেতরটা হালকা কেঁপে উঠল। কয়েক সেকেন্ড পর সে শুধু মাথা নেড়ে জানাল, তার কোনো আপত্তি নেই। শাহীন আর কিছু বলল না। কোনো ব্যাখ্যা নয়, কোনো কৃতজ্ঞতাও নয়। চুপচাপ বিছানায় শুয়ে পড়ল। নীলা তখনও বসে আছে। হয়তো অস্বস্তিতে, হয়তো দ্বিধায়। সে জানে না, এই মুহূর্তটাকে স্বস্তি বলবে, না নতুন কোনো ভুল বোঝাবুঝির শুরু। শাহীন সেটা টের পেল। তাই প্রসঙ্গ পাল্টে স্বাভাবিক স্বরে বলল,
“সকালে তোমাকে নিয়ে হাসপাতালে যাবো। রেডি থেকো।”
নীলা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কণ্ঠে হালকা বিষণ্ণতা, কিন্তু কোনো অভিযোগ নেই।
“আপনাকে জোর করে কোনো দায়িত্ব পালন করতে হবে না, শাহীন। আমি কখনো এসব নিয়ে অভিযোগ করব না।”
একটু থেমে আবার বলল,
“আমি জানি… আপনি আনিকাকে ভালোবাসেন। আর আমি সেই জায়গাটা দখলও করতে চাই না।”
এই কথাটা বলতে গিয়ে নীলার বুকটা একটু ভারী হয়ে এল। তবুও সে নিজেকে সামলে নিল। সে চোখ নামিয়ে বলল।
“শুধু একটা আবদার আছে আমার। দুজন মানুষ থেকে আমাকে কখনো আলাদা কইরেন না।”
তারপর নিজের উদরের ওপর আলতো করে হাত রেখে খুব শান্ত স্বরে যোগ করল,
“আপনার মা… আর যে আসতে চলেছে, এই দুজনকে নিয়ে একটু সুখী থাকতে চাই। এ ছাড়া আপনার প্রতি আমার আর কোনো অভিযোগ নেই।”
শাহীন সম্পূর্ণ চুপ করে রইল। কিছু বলার ভাষা তার নেই।
সত্যিই তো, এই মেয়েটা কখনো অভিযোগ করেনি। কখনো প্রশ্ন করেনি, কেন সে এখনো অন্য একজনের স্মৃতিতে আটকে আছে। আর সে নিজে? সে কি পেরেছে আনিকাকে ভুলতে? না, পারেনি। সে কি পেরেছে আনিকাকে ভুলে নীলার সঙ্গে নতুন করে সবকিছু স্বাভাবিকভাবে শুরু করতে? না, সেটাও পারেনি। তাদের মাঝখানে যে উঁচু অদৃশ্য প্রাচীর দাঁড়িয়ে আছে, সে কি পেরেছে সেই প্রাচীর ভাঙতে? না। আজও পারেনি। ঘরের ভেতর নীরবতা নেমে এল। এই নীরবতায় ভালোবাসা নেই, কিন্তু দায়িত্ব আছে। দূরত্ব আছে, তবুও একসঙ্গে থাকার বাধ্যবাধকতাও আছে।
★
মীর হাউজের পেছনের আঙিনা দিয়ে নিঃশব্দে ভিতরে প্রবেশ করল আহাদ। সঙ্গ দিয়েছে আদিল আর তানভীর। আদিল আগেই একবার ভিতরে ঢুকে চারপাশটা ভালো করে দেখে এসেছে, রিদিতা তখন বাচ্চাদের নিয়ে নিচতলাতেই আছে। বাড়ির সবাই দুই ছানাকে ঘিরে ব্যস্ত। এই ব্যস্ততাটাকেই কাজে লাগাল আহাদ। সোজা নিজের ঘরের সামনে এসে দাঁড়াল। দ্রুত মই লাগিয়ে বেলকনি পেরিয়ে ভেতরে ঢুকল সে। সময় খুব বেশি নেই। যতটা সম্ভব কম সময়ের মধ্যে ঘরটাকে একটু সাজালো। নিখুঁত না, লুকিয়ে-চুপিয়ে যতটুকু করা যায় ততটুকুই আর কি। সব শেষ আবার আগের পথেই নিচে নামল তিনজন। এবার মূল দরজা দিয়েই ঢুকবে, স্বাভাবিকভাবে। এতে কারোর মনে সন্দেহের বীজও গজাবে না।
হলঘরের মেঝেতে আলাদা করে নরম কার্পেট বিছানো। মূলত সেখানেই বাচ্চাদের খেলনা ছড়িয়ে রাখা হয়, যেন ওরা নিচে বসে খেলতে পারে। এখন তো ওরা একটু একটু বসতে শিখেছে, হামাগুড়িও দেয়। তাই আর কোলে বেঁধে রাখার দরকার পড়ে না। আদনান সোফায় বসে অরিতাকে উরুর ওপর বসিয়েছে। খেলছে ‘ঘোড়া-ঘোড়া’।
“ঠক ঠক ঠক, অরিতা ঘোড়ায় উঠেছে… ঘোড়াআআ!”
অরিতে খরল্লা দিয়ে হেসে উঠল। সে আদনানের সাথে এই খেলাটা বেশ উপভোগ করে। আদনান আবার ঝাঁকালো,
“হুস ঘোড়া চল, চল… আহ! এতা কী হলো? ঘোড়া আমার কথা শুনছে না কেন? এই ঘোড়া চল, রাজকন্যাকে নিয়ে চল প্রাসাদে..”
বলতে বলতে পা নাচাতে লাগল সে। অরিতা খিকখিক করে গলা ভেঙে হেসে উঠল। হাসতে হাসতে মুখ গলিয়ে লালা ঝরছে। আদনান নিজের বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে লালাটা মুছে আবার আগের মতো পা নাচাতে লাগল। আহিয়া পাশেই বসে। দৃশ্যটা দেখে হালকা হাসছে। আদনানের মেয়ে বাবুদের প্রতি আগ্রহ আহিয়াকে দিয়েই শুরু হয়েছে। সেটা এখন আহিয়া বুঝল, অরিতার প্রতি আদনানের দুর্বলতা দেখে। রিদিতা বাচ্চাদের খাবার রেডি করতে করতে আড়চোখে বারবার ওদের দিকে তাকাচ্ছে। আমজাদ মীর কোলে আব্রাহামকে নিয়ে আদর করছেন। আফরোজা শেখ পাশে বসে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ফাইল দেখছেন, তবুও মাঝেমাঝে নাতি-নাতনীর দিকে তাকাতে ভুলছেন না। হালিমা বেগম আর বানি রাতের খাবারের টেবিল গুছাচ্ছে। রিতু সহযোগিতা করছে। আদিবা পাশে বসে ড্রইং করছে, আহিয়া মাঝে মাঝে তাকে সাহায্য করছে। আসফাক মীর সিরিয়াস আর কোকোর সাথে খেলছে। শারমিন সবার সঙ্গে এই মুহূর্তগুলো উপভোগ করছেন। জার্মানিতে থাকার কারণে এসব আনন্দ থেকে তিনি অনেকটাই বঞ্চিত থাকেন। তাই যখনই আসেন, একেবারে উসুল করে নেন। রিদিতা এক গ্লাস পানি আমজাদ মীরের দিকে বাড়িয়ে দিল,
“বাবা, আপনার খাবার আগের ওষুধটা খেয়ে নিন। আব্রকে আমার কাছে দিন।”
বলেই ছেলের দিকে হাত বাড়াল।
“আসো বাবা, মাম্মার কাছে আসো।”
কিন্তু ছেলেটা মুখ ঘুরিয়ে দাদার বুকের সঙ্গে আরও শক্ত করে লেপ্টে রইল। সে বুঝে গেছে মা এখন খাবার খাওয়াবে। এতটুকু ছেলে, অথচ বুদ্ধিতে একেবারে সেরা। বুকের দুধ ছাড়া অন্য কিছু খাওয়ানোর সময় দুটো বাচ্চাই নাক সিটকায়। এখন ছয় মাস শেষ, তাই একটু একটু করে বাড়তি খাবার দিতে চায় রিদিতা। কিন্তু তারা খেতেই চায় না। কয়েকবার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলো সে। ছেলেটা বারবার মাথা ঘুরিয়ে নিচ্ছে। আফরোজা শেখ হালকা হেসে বললেন,
“তুমি আমার কাছে দিয়ে যাও। আমি খাইয়ে দিচ্ছি।”
আমজাদ মীরও সায় দিলেন,
“ঠিক আছে, তোমার আম্মা খাইয়ে দিবে। তুমি যাও মা।”
“রিদি, তোর ফোন! ঈশানী আপু কল দিছে।”
আহিয়ার ডাকে রিদিতা বাচ্চাদের দিকে একবার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ছুড়ে দিয়ে ফোন রিসিভ করল। কথা বলতে বলতে একটু সরে এল।
“মাহি কেমন আছে বুবু? ওর জ্বর কমছে?”
ওপাশ থেকে ঈশানীর কণ্ঠ ভেসে এল,
“না রে, আরও বেড়ে গেছে। তোর ভাইয়া বলল সকালে হাসপাতালে নিয়ে যাবে। হুট করে জ্বর আসছে, আর কমছেই না। আব্র আর অরিতা কী করে? কেমন আছে?”
“কী আর করবে? বাপের মতো খালি ত্যাড়ামি করে। এই বয়সেই ত্যাড়ামি শিখছে। মুখে খাবারই দেওয়া যায় না।”
ঈশানী হেসে উঠল। তার বোনটা বাচ্চা দুটো নিয়ে ভালোই হিমশিম খায়।
“একদম তোর মতো হয়েছে। তুইও খাবার খাওয়ার সময় চৌদ্দবার মাথা ঘুরাইতি।”
রিদিতা কিছু বলল না। শুধু কপাল গুছিয়ে ছেলে-মেয়ের দিকে তাকাল। হঠাৎ ঈশানী বলল, “ওহ! আজ তো তোর জন্মদিন ছিল। আমি তো উইশ করতেই ভুলে গেছি।”
রিদিতার নিজেরও তো মনে ছিল না।
“সমস্যা নাই। আমি তো নিজেও ভুলে গেছি।”
“কেন? আহাদ রাজা তোকে উইশ করে নাই?”
মনের ভেতরটা ভারী হয়ে গেল রিদিতার। আহাদ রাজা তো সত্যিই উইশ করেনি। সে ভুলে গেলে কী হবে, আহাদ রাজা কীভাবে ভুলতে পারল? তবুও বোনকে বুঝতে দিল না।
“আজকে ওর বড় মিটিং ছিল। তাই একটু ব্যস্ত। হয়তো সময় পায় নাই।”
ঈশানী বুঝে গেল নিশ্চয়ই আহাদ রাজা কোনো প্ল্যান করছে। নয়তো রিদিতার জন্মদিন ভুলে যাওয়ার মতো বোকামি সে করবে না।
“থাক, মন খারাপ করিস না। সময় করে একটু আসিস। মাহি তো আব্র আর অরিতাকে দেখলে অর্ধেক সুস্থ হয়ে যাবে।”
“আচ্ছা। আহাদ রাজা যদি অনুমতি দেয়, কালই যাব। উনার তো আবার আদি যুগের হিটলার বাপ-দাদাদের মতো বাপের বাড়ি যাওয়া নিয়ে সমস্যা।”
ঠিক তখনই মূল দরজা দিয়ে ভিতরে ঢুকল আহাদ।
রিদিতা বোনের থেকে বিদায় নিয়ে ফোন রেখে দিল। আহাদ তার দিকে তাকিয়ে এক চোখ টিপে ইশারা করল। কিন্তু সে মুখ গম্ভীর করে হালিমা বেগমের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। আহাদ বুঝে গেল, প্রেয়সী ঘোর অভিমান করেছে। সে করুক। মানিয়ে নিতে তার সময় লাগবে না। কিন্তু তাই বলে এমন অবহেলা?
ঠিক তখনই,
“পা… প্পা! পা পা… পা প্পা!”
ছেলের আধো বুলি ডাকেই ঘোর কাটল আহাদের। তাকে দেখামাত্রই আব্র আর অরিতা হাত-পা ছড়িয়ে উচ্ছ্বাসে লাফাতে লাগল। আহাদ এক গাল হেসে এগিয়ে গিয়ে দুজনকেই কোলে তুলে নিল। পরপর তাদের গালে হামি দিতে লাগল। দুজনেই বাবার বুকের সঙ্গে একেবারে লেপ্টে গেছে। সারাদিন পর এই আশ্রয়টা যে কতটা দরকার ছিল!
বাচ্চাদের কোলে নিয়েই সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে উঠতে ডেকে উঠল আহাদ,
“রিদি, উপরে আসো।”
আজ দ্বিতীয়বার ডাকতে হয়নি তাকে। আহাদের সাথে পা মিলিয়ে উপরে উঠে এল। দরজার সামনে এসে আহাদ থামল। চোখের কোণে তাকাল প্রেয়সীর দিকে। রিদিতার গাল ফুলে আছে এখনো, ঠোঁট দুটো শক্ত করে চেপে রাখা। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, অভিমান এখনো কাটেনি। আহাদ ইচ্ছে করেই হালকা মেজাজে প্রশ্ন করল,
“কী হয়েছে? পটকা মাছের মতো হাউপ করে আছো কেন?”
এই একটুখানি কথাতেই রিদিতার ভিতরে জমে থাকা আবেগের বাঁধ ভেঙে গেল। কণ্ঠে জমে থাকা ক্ষোভ বেরিয়ে এল একসাথে।
“আপনি খুব খারাপ! আমি আপনার সাথে থাকবো না। আব্বুকে বলবো, আমাকে এসে যেন নিয়ে যায়!”
মুহূর্তেই আহাদের মেজাজ তুঙ্গে উঠে গেল। চোখ লালচে হয়ে উঠল, কণ্ঠে নেমে এল পরিচিত কর্কশতা।
“থাপ্পড়ায়া চেহারার নকশা পাল্টায়া দিবো, বজ্জাত বেডি! সাহস কী করে হলো এই কথা বলার? কিছু বলছি না বলে দিনদিন সাহস বেড়ে যাচ্ছে, না?”
রিদিতা আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না। ফুঁসতে ফুঁসতে দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকে গেল। তখনই আহাদ টের পেল, বাচ্চা দুটো তার দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে। বাবার গলার স্বর, মুখের কঠোরতা পুরোপুরি বুঝতে চেষ্টা করছে হয়তো। মুহূর্তেই নিজেকে সামলে নিল সে। মুখে কৃত্রিম একটা হাসি টেনে আনল। এত চেষ্টা করেও সন্তানদের সামনে রাগটা লুকিয়ে রাখতে, কিন্তু এই আল্লাহর বান্দিটা আর হতে দেয় কই!
রিদিতা ভিতরে পা রাখতেই থমকে গেল। পুরো ঘর জুড়ে মৃদু আলোয় টিমটিম করে জ্বলছে অসংখ্য হলদেটে ক্যান্ডেল। চারপাশে উষ্ণ, নরম এক আবহ। মেঝেতে লাল গোলাপের পাপড়ি ছড়িয়ে তৈরি করা পথ, সোজা শয্যা পর্যন্ত গিয়ে শেষ হয়েছে। লাল বেলুনে ভরে আছে পুরো ঘর। এক মুহূর্তেই তার সমস্ত রাগ, অভিমান; সব মিলিয়ে গেল রাতের কুয়াশার মতো। ধীরে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল আহাদের দিকে। চোখে বিস্ময়, কণ্ঠে অবিশ্বাস।
“আপনার মনে ছিল… আজ আমার বার্থডে?”
আহাদ ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি খেলিয়ে বলল,
“ভুলে যাওয়ার মতো কোনো কারণ তো দেখছি না।”
“এসব কখন করলেন?”
রিদিতার গলা কাঁপছে। আহাদ বাচ্চাদের বেবি কটে শুইয়ে রাখতে রাখতে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলল,
“বলাটা খুব জরুরি?”
“উহুম।”
রিদিতা মাথা নাড়ল। আহাদ ধীরে ধীরে এগিয়ে এল। খুব কাছে। এতটাই কাছে যে তার চিবুক রিদিতার ললাট ছুঁই ছুঁই করছে। আচমকাই কণ্ঠের সুর বদলে গেল।
“রিদি!”
“হুম…”
“একটা আবদার রাখবে?”
“কি?”
“আজকে আমার জন্য একটু লাল শাড়ি পরবে? অনেকদিন শাড়িতে দেখি না তোমায়। পরবে?”
রিদিতা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। সত্যিই তো, অনেকদিন শাড়ি পরা হয় না। মা হওয়ার পর থেকে সময় কোথায়? এমনিতেই শাড়ি সামলানো তার জন্য কঠিন। এখন তো দুটো ছানা, ওদের নিয়ে শাড়ি পরা প্রায় অসম্ভব। আহাদ নরম স্বরে আবার বলল।
“কি হলো? পরবে?”
ভাবনার সুতো কেটে গেল রিদিতার। ধীরে মাথা নেড়ে সম্মতি দিল।
“হুম… পরবো।”
আহাদের চোখ মুহূর্তেই উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে দ্রুত আলমারির কাছে গিয়ে অতি যত্নে তুলে রাখা সেই লাল ঝলমলে শাড়িটা বের করে প্রেয়সীর হাতে তুলে দিল।
শাড়িটা চিনতে রিদিতার সময় লাগল না। এই শাড়ি পরেই তো সে প্রথম ছবি পাঠিয়েছিল আহাদ রাজাকে। যে ছবিটা এখনো তার ফোনের স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করে ভেসে ওঠে।
রিদিতা শাড়িটা নিয়ে ড্রেসিংরুমে ঢুকে গেল। আহাদ এবার ঘুরে বাচ্চাদের কাছে গিয়ে বসল।
“পাপা! পা… পা!”
আনন্দে গলা ভেঙে ডাকল সে,
“আমার রাজকন্যা কোথায়? আমার আব্র বাবা কোথায়? তারা কী মাম্মাম আর পাপার রোমান্স দেখছে? ছি! লজ্জা! চোখ বন্ধ করো।”
ছোট পাখির মতো দুজনেই ডানা ঝাপটানোর ভঙ্গিতে হাত-পা ছুড়তে লাগল। আহাদ কোলে নিতেই দুজন বাবার বুকের সঙ্গে মাথা ঠেকিয়ে উষ্ণতা খুঁজল। সে ধীরে ধীরে ঘরজুড়ে পায়চারি করতে লাগল। বাবার বুকের ছন্দে, নিরাপদ উষ্ণতায়, কিছুক্ষণের মধ্যেই দুজন ঘুমিয়ে পড়ল। আহাদ একজন একজন করে পরম যত্নে বেবি কটে শুইয়ে দিল। কমফোর্ট টেনে দিল ঠিকঠাক করে। তারপর দুজনেরই গালে, কপালে পরপর কয়েকটা টুপটাপ চুমু খেল। ঠিক তখনই পেছন থেকে ভেসে এল পরিচিত, মিষ্টি, সেই কণ্ঠ,
“মন্ত্রীমশাই!”
আহাদ ঘুরে তাকাল। রিদিতা দরজার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। লাল শাড়ির আঁচলটা এলোমেলো হয়ে জড়িয়ে গেছে। কপালের কাছে কয়েক গোছা চুল বেরিয়ে এসেছে, চোখে-মুখে একধরনের লাজুক অস্থিরতা। সে ঠোঁটজোড়া ফুলিয়ে অভিমানের সুরে বলল,
“শাড়ির কুচিগুলো একটু ঠিক করে দিবেন! আমি পারছি না।”
এই দৃশ্যটা দেখেই আহাদ দমকা হেসে উঠল। দু’দুটো সন্তানের মা হয়ে গেছে, অথচ এখনো শাড়ির কুচি সামলাতে পারে না। এই অবোধত্বটাই তাকে বারবার নতুন করে প্রেমে ফেলায়। সে এগিয়ে এসে রিদিতার সামনে হাটুমুড়ে বসল। যেন কোনো পবিত্র কাজ করতে বসেছে। মনোযোগ দিয়ে একে একে কুচিগুলো ঠিক করল। প্রতিটা ভাঁজে যত্ন, প্রতিটা টানে সাবধানতা। তারপর আঁচলটা আলতো করে কাঁধে তুলে দিল। পকেট থেকে বের করল লাল গোলাপের গাজরা। খুব যত্নে রিদিতার চুলের ভাঁজে গুঁজে দিল সেটা। এখন একদম পারফেক্ট। রিদিতার রুপ মুহূর্তেই বদলে গেল। একজন পরিণিতা প্রেয়সী। লাল শাড়িতে, নরম আলোয়; লাজে রাঙা মুখে একদম মোহময়। আহাদ তাকিয়ে রইল। চোখ সরাতে পারছে না। কিন্তু রিদিতা লজ্জার ভারে চিবুক নামিয়ে রেখেছে। চোখ তুলে তাকানোর সাহস পাচ্ছে না। আহাদ আলতো করে তার চিবুক তুলল। কণ্ঠ নামিয়ে আনল গাঢ় খাদে,
“এই আল্লাহর বান্দি এই! তাকাও আমার দিকে।”
রিদিতা তাকাল। চোখে চোখ মিলল। গাঢ় বাদামি, ঘন পাপড়িতে ঢাকা সেই চোখ, যে চোখে তাকালে বুকের ভিতর কেমন যেন দুলুনি লাগে। সেই চোখ, যেটা রিদিতাকে প্রথম দিন থেকেই অদ্ভুতভাবে টেনেছে। সে বেশিক্ষণ সেই ধারাল দৃষ্টির ভার নিতে পারল না। চোখ নামিয়ে নিল আবার। আহাদ প্রশ্ন করল,
“সমস্যা কী তোমার?”
রিদিতার কণ্ঠে নিষ্পাপত্ব, “কী করেছি আমি?”
“কথায় কথায় আমাকে ছেড়ে যাওয়ার হুমকি দাও কেন?
জানের ভয় নাই?”
“ভুল হয়ে গেছে। আর বলবো না।”
আহাদ নিষ্পলক তাকিয়ে রইল প্রেয়সীর মুখের দিকে। ঠোঁটের কোণে চাপা হাসি। তারপর হঠাৎ বলল, “কান ধরো।”
রিদিতা চমকে উঠল, “এ্যাহ!”
“এ্যাহ না। হ্যাঁ। ভুল যখন করেছেন এর শাস্তি তো পেতেই হবে রিদি রানি। কান ধরে বিশবার উঠবস করো।”
চোখ বড় বড় করে তাকায় সে, “এখন?”
“হু। এখনই।”
রিদিতা ঠোঁটজোড়া ফুলিয়ে বলল,
“আজকের দিনেও আপনি আমাকে কান ধরাবেন?”
আহাদ চারপাশে একবার চোখ বুলাল। বেবি কটের দিকে তাকাল। ঘুমন্ত দুই ছানা। তারপর গম্ভীর ভান করে বলল,
“ঠিক আছে। আজকে মাফ করে দিলাম। কাল সকালে বিশ বিশ, চল্লিশবার কান ধরে উঠবস করবে।”
“আপনি এত খারাপ কেন?”
কণ্ঠে আদুরে অভিযোগ। আহাদ হেসে ফেলল। সেই আহ্লাদী কণ্ঠে সে কখনো রাগ করতে পারে না। এক হেঁচকা টানে প্রেয়সীকে নিজের বুকস্থলে টেনে নিল। গলা নেশায় ভিজে গেল।
“বেশি খারাপ?”
“না, না। ভালো।”
“বেশি ভালো?”
“হুম।”
আহাদ সম্মহীন হাসল।
“আমার এত ভালো পোষায় না, জানু। আমি খারাপ হতে চাই। অনেক বেশি খারাপ হতে চাই।”
কণ্ঠ আরো নিচে নামাল,
“আজকে কি একটু খারাপ হতে দিবে?”
রিদিতার গাল লজ্জায় লালচে হয়ে উঠল। সে কিছু বলল না। শুধু নিজের মন্ত্রীমশাইয়ের বুকে মুখ লুকিয়ে নিল। এই আশ্রয়টা রিদিতার ভীষণ পছন্দের, ভীষণ শান্তির। এমন শান্তির জায়গা কয়জনের মেলে? যেমন সব থেকে বড় উদাহরণই আনিকা! সে প্রতিনিয়ত নিস্বঙ্গতায় ভুগছে। ভেতর থেকে নিশ্বেষ হয়ে যাচ্ছে দিন দিন। সবারই একটা সঙ্গী হলো, শুধু বিয়ে পাগল আনিকারই আর বিয়ে করা হলো না। সাজানো একটা সংসারের স্বপ্ন পূরন হলো না। তিনটা সন্তান জন্ম দেয়ার স্বাদ অপূর্ণই রয়ে গেল। ভারী নিশ্বাষ ফেলে রিদিতা আবারো নাক ঘঁষল আহাদের বুকে এই নিরব সম্মতিটাই আহাদের জন্য যথেষ্ট। কয়েকবার নিঃশ্বাস ফেলল সে। নেশা বাড়ছে। বেশামাল আহাদ রাজা আরো বেশামাল হয়ে উঠছে। পরিস্থিতি সামলাতে রিদিতা হঠাৎ প্রশ্ন করল,
“ভালোবাসেন আমাকে?”
আহাদ তখন নিজের কাজে ব্যস্ত। তবুও চেনা ভঙ্গিতে উত্তর দিল, “উহুম।”
রিদিতা বেড়ালের মতো গুটিশুটি হয়ে বুকের সাথে লেপ্টে রইল। চুপচাপ আদর খেয়ে যাচ্ছে। আহাদ ভাবল, হয়তো আবার অভিমান করেছে। সে প্রেয়সীর মাথা নিজের বুক থেকে তুলে নিজের দিকে তাক করাল। দু’হাত আলতো করে প্রেয়সীর গালে রেখে, চোখে চোখ রেখে অদ্ভুত এক নেশাময় স্বরে বলল,
“তুমি প্রেয়সী, তুমি শ্রেয়সী,
বলো কোন রূপে তোমায় ভালোবাসি।
যে রূপেই থাকো, সে রূপেই মরি,
প্রেয়সী, তুমি যে বড়ই সর্বনাশী।”
----- সমাপ্ত -----
(কঠোরভাবে কপি করা নিষিদ্ধ 🚫, চাইলে লিংক শেয়ার করতে পারেন।)
বিদ্রঃ কোনো কিছু সমাপ্ত মানেই শেষ নয়। বরং নতুন কিছুর শুরু। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পাশে থাকার জন্য, ভালোবাসা দেওয়ার জন্য, আমি হৃদয়ের গভীর থেকে কৃতজ্ঞ। 🥹🫶🏻
শুরু ~ ২৮/০৮/২৫ - ০৩/০২/২৬ ~ শেষ।❤️🔥