#পর্ব_২৭
#হাওয়ায়_সুরগান
#Sharmin_Shaajh_Nur
বিশাল এড়িয়া জুড়ে হল রুম। পার্টি প্রয়োজনীয় সরঞ্জামে সুন্দর স্নিগ্ধ সাজানো। এক নজরকাড়া বন্দোবস্ত। সাদা কালো থিম। স্নিগ্ধ আলো, মোলায়েম সঙ্গিত, অমায়িক ভঙ্গিতে হালকা নাচ, রংবেরঙের পানীয় এবং পরিমানে হালকা খাবার। সেকশন আলাদা আলাদা। জনসংখ্যা হাতে গোনা নির্দিষ্ট সংখ্যক। সার্ভেন্ট রয়েছে নির্দিষ্ট ও বিশ্বস্ত। তবে গার্ডের কমতি নেই। পুরো হলে রুম জুড়ে ভিন্ন দল নজরে আসে। কোথাও নিজ নিজ পছন্দসই পানীয় পান, কোথাও ড্যান্স, কোথাও বিজনেস কোলাবরেশন এবং কোথাও অতিথীয় অব্যর্থনা।
দরজা ছেড়ে ভেতরে প্রবেশ করে একজোড়া দম্পতি। মায়া ও আরহান। আরহান এখনো মায়ার নরম কোমল হাত নিজের হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরে রেখেছে। ছাড়লেই সর্বনাশ যেন। তারা ভেতরে প্রবেশ করতেই মন্ত্রীর দৃষ্টিতে আটকে যায়। পার্টি তে মাথায় ক্যাপ মুখে মাস্ক পরিধান করে আসার ঘটনা বোধহয় চিরন্তর । চিনতে এবং বুঝতে অসুবিধা হয় না তার। বসা থেকে উঠে ধীর পায়ে এগিয়ে আসেন তিনি নির্দ্বিধায়। যেন তাদের অপেক্ষাতেই ছিলেন এতক্ষণ। মায়া ক্যাপের আড়াল থেকে চোখ ছোট ছোট দেখে চারপাশ।
বেশ গোছাল পরিপাটি আয়োজন। যেসব অতিথিয়া আছেন সবাই নিজ নিজ তালে মগ্ন।
__মাস্ক এখন নামিয়ে রাখতে পারো"।
হঠাৎ আসা আরহানের কন্ঠে অপ্রস্তুত হয় মায়া। মৃদু চমকে উঠে আরহানের দিকে তাকায়। আনমনেই প্রশ্নতর আওয়াজ দেয়,
__উম"?
আরহান অপেক্ষা করে না। নিজ উদ্যোগেই মায়ার মুখ থেকে মাস্কটি নামিয়ে থুতনিতে ঠেকিয়ে দেয়। নিজেও একই কার্য করে কয়েক পা এগোয় সামনে। মন্ত্রী আসেন। হাসিমুখে বলেন,
__কি জেন্টেলম্যান! তুমি স্যরি তোমরা অত্যন্ত দেরি করে ফেললে না' কি"?
আরহান স্মিথ হাসে-
__আশা করছি খুব বেশি হয় নি"?
লোকটি নিঃশব্দে জানান দেন আরহানের কথার উত্তর। তারপর মায়ার দিকে চেয়ে প্রশ্ন করেন,
__তোমার ওয়াইফ তো"?
__ইয়াহ। মাই ওয়াইফ। মায়া চৌধুরী"।
আরহানের পরিচয় করিয়ে দেওয়া দেখে মায়া বিনয়ের সঙ্গে হ্যালো বলে তাকে। ভেতরে গিয়ে বসে তারা। অন্যদিকে তাদের অজান্তেই তোলা ছবিগুলো পাঠিয়ে দেওয়া হলো কারোর ফোনে সঙ্গে ছোট্ট একটি বার্তা। অজ্ঞাত লোকটি দরজার বাহিরে। পরনে গার্ড দের পোষাক। হয়তো ছদ্মবেশে। ঘড়ির কাঁটা ঘুরতে থাকে তার নিজ গতিতে। সময় হয় রাতের বারোটা। মায়া তখন লালচে আলোয় ভাসা বার কাউন্টারের পাশে দাঁড়িয়ে। সামনেই একটি জুসের গ্লাস। হাতে আরহানের ফোন। মাথা নুইয়ে রেখে সমস্ত মনোযোগ তার ফোনেতেই।
আরহান কে দেখা যায় না আশপাশ। সে অনেকক্ষণ মন্ত্রীর সঙ্গে আলাদা ভাবে কথা বলতে গেছে। মায়ার অবশ্য এতে কিছু যায় আসে না। নিজ তালেই রয়েছে তবে সেই তাল ভাঙে একজন সার্ভেন্ট। সে বার কাউন্টারের ভেতরে থেকে অনেকক্ষণ মায়া কে খেয়াল করতে করতে এবারে প্রশ্নঃ করেই বসে-
__ম্যাম আপনি কি কোনোভাবে সাঈফ স্যারের কেউ হোন"?
মায়া মাথা উঁচু করে তাকায় এমন প্রশ্নে। ক্যাপ মাথায় থাকায় একটু বেশিই উঁচু করে। চোখ পিটপিট করে চেয়ে স্বাভাবিক ভাবেই জিজ্ঞেস করে-
__কেন মনে হলো"?
ছেলেটি একটু ইতস্তত করে বলে,
__আপনার এই পার্টি পরিবেশেও এমন বেশভুষার জন্য জানতে ইচ্ছে করল আর কি? আসলে সাঈফ স্যার কেও এখানের যেকোনো occasion এ এমন আজব ভাবে দেখা যায়। সবসময় ক্যাপ মাস্ক তার কাছে থাকেই থাকে। মনেহয় উনি ক্যাপ মাস্কের পিছনেই অর্ধেক টাকা খরচ করে"।
মায়া নিজের ভ্রু জোড়া কুঁচকে নিল। ছেলেটির বাকি সব কথা বাদ দিয়ে জব্দ করল একটি শব্দ। আজব! আজব ভাবে। ছেলেটি দেখে তার বয়সে ছোট মনে হলো। তাই তুমি সম্বোধন করে তিক্ষ্ণ গলায় বলল-
__তুমি ইনডাইরেক্ট আমাকে আজব বললে? আমি আজব ভাবে এসেছি"?
ছেলেটি তন্দা খেয়ে তাকাল। কি বলল আর কি হলো? সে সঙ্গে সঙ্গে মাথা ডানে বায়ে নাড়িয়ে জবাব দেয়-
__না না ম্যাম। আমি আসলে বলছি যে সাঈফ স্যার মানুষ টা বড্ড আজব। আমি এখানেই পার্মানেন্ট কাজ করি অথচ আজ অব্দি স্যারের মুখটাও দেখি নি। কখনো কখনো তো তার শরীরের একটা অংশও দেখা যায় না, মুখ তো দূরেই থাক। শুধু বেশভুষায় চিন্তে পারি। আজ আপনাকে প্রথম দেখলাম তাও স্যারের মতো করে তাই আর কি"।
মায়া এবারে জুসে কয়েক চুমুক দিল। ছেলেটির বোকা বোকা কথায় বেশ মজা পেল সে তবে প্রকাশ করল না।
__আজ দেখেছ তাকে"?
__না ম্যাম। আজ তো এখনো দেখতে পাই নি"।
মায়া মজা করে বলে,
__তাকে কি ক্যাপ মাস্কে চিনবে নাকি? আমার সঙ্গে যে এসেছে সেও কিন্তু ক্যাপ মাস্কে এসেছে"।
__কি হচ্ছে"?
পিছন থেকে আরহানের কন্ঠস্বর ভেসে আসতেই মায়া পিছন ঘুরে তাকায়। ছেলেটিও দেখে তবে ভয়ে আর কোনো কথা বলে না। যদি কিছু বলে। আরহান এগিয়ে এসে নিজের জন্য ওয়াইন দিতে বলে। ছেলেটি ব্যস্ত হয়ে যায়। আরহান মায়াকে প্রশ্ন করে,
__কি কথা বলছিলে"?
মায়া তা অপেক্ষা করে চোখমুখ কুঁচকে জিজ্ঞেস করল-
__আপনি এখন ড্রিংক করবেন"?
আরহান মাস্ক থুতনিতে ঠেকিয়ে রেখে মাথার ক্যাপটি আরো নামায়। মুখখানি তার অর্ধেকাংশই ঢেকে যায়। ঠোঁট জোড়া নাড়িয়ে উত্তর করে -
__বেশি না খুব সামান্যই করব"।
মায়া আরহানের দিকে ফোন বাড়িয়ে বলে-
__আপনি খুব সতর্কতার সঙ্গে চলাফেরা ও সিক্রেটলি কাজ করেন! উপদেষ্টা...
আরহান ফোনটি হাতে নেয়। কথা সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই নির্লিপ্ত ভাবে ফোন পকেটে পুরে বলে,
__কাজ করি। দায়িত্ব রক্ষার্থে যা করার করি তবে অপরাধ নয় অবশ্যই"।
মায়া থমথম খেয়ে যায়। মুখ চুপসে বলে,
__এটা আমি কখন জিজ্ঞেস করলাম? (কয়েক সেকেন্ড থেমে মূহূর্তে কন্ঠস্বর পাল্টে) এন্ড আমি অমন মেয়ে না যে হাসবেন্ডের অপজিটে যেয়ে স্বতি সাবিত্রী সেজে ন্যাকামি করে বলব, এটা করবেন না। ওটা করবেন না। হ্যান ত্যান"।
আরহান মুচকি হাসে। তবুও জবাবে বলে,
__জিজ্ঞেস তো করো নাই। আমি বললাম। ওয়াইফ তুমি আমার। আমার সবকিছু জেনে শুনে রাখবে এটাই স্বাভাবিক"।
আরহানের বলা ওয়াইন তৈরি হলে সে পর পর কতগুলো চুমুক দেয় তাতে। মায়া প্রশ্ন করে,
__বাড়ি ফিরব কখন আমরা"?
__উম। হুম"।
এরমধ্যেই পিছন থেকে আরহান কে ডাক দেয় কোনো এক ব্যক্তি। আরহান পিছন ঘুরে তার সঙ্গে কিছু দরকারি কথা বলতে থাকলে মায়া আবারো ছেলেটি কে ডাক দেয়-
__আমার পাশের লোকটি কে দেখছ"?
ছেলে মাথা নাড়িয়ে বলে-
__জ্বী ম্যাম। একটুখানি"।
__চিনতে পারো নাই তো.."?
__না। আমি চিনব কিভাবে"?
মায়া মৃদু হাসে
__সে আমার হাসবেন্ড। আরহান সাঈফ চৌধুরী"।
ছেলেটি মূহূর্তে হা হয়ে যায়। বলে কি! নিজের চোখ কান কে বিশ্বাস করতে না পেরে সে মায়ার দিকে চেয়ে আবার তার দিকে পিঠ দিয়ে রাখা আরহানের দিকে তাকায়। চোখ ঝাপটায় বারংবার। এই সেই লোক? ইশ! ইশ! সামনে এভাবে পেয়েও তার মুখটা ঠিকমতো দেখা হলো না।
মায়া যেন মজা পেয়েছে ব্যাপার টায়। সে আনমনেই নিজের জুসের গ্লাস টি না খেয়াল করেই হাতে নেয়। চুমুক বসায় তাতে তবে স্বাদ আসে অন্যরকম। কড়া কিছু একটা। প্রতিক্রিয়া পাল্টে যায় মুখের। কুঁচকানো চোখ খুলে ভালো ভাবে খেয়াল করতেই দেখতে পায় আরহানের ওয়াইন। এত কড়া। আহ। মায়ার মুখটাই বিকৃত হয়ে গেছে।
______
__চলেন ওয়াইফি। নাচ, গান, খাওয়া দাওয়া, ড্রিংক অনেক তো হলো এবার যাওয়া যাক"।
মায়ার তখন মাথা ঝিমঝিম করছে। সে চটপট আরহানের হাত আঁকড়ে ধরে।
__আপনার হয়ে গেছে সমস্ত কাজ"?
__হ্যাঁ চলেন"।
চলেন বললেও আরহান মায়ার হাব ভাব পরখ করতে থাকে। ওকে আগাগোড়ায় দেখে বলে,
__তুমিও ড্রিংক করছো নাকি? আশ্চর্য ড্রিংক করলাম আমি আর নেশা ধরতেছে তোমার"।
__না তো। আমার নেশা ধরে না। মাথা ঝিমঝিম করছে একটু। চলুন"।
*°•
দেখতে দেখতে রাতের সময় দেড়টার কাছে পৌঁছেছে। গাড়ি চলছে নির্জনে নিজ গতিতে। রাস্তা প্রায় ফাঁকা। মায়া বিরক্ত মুখে বসে আছে গাড়িতে। আরহান ড্রাইভ করছে করতেই আড় চোখে ওকে দেখতে। মেয়েটার হাবভাব মোটেও ভালো লাগছে না। আবার অসুস্থ হয়ে যায় কি না! এমন হলে তো সমস্যা হবে এখন। তার যে প্ল্যান এখন তাতেই...
__কি সমস্যা তোমার মায়া"?
মায়া আরহানের দিকে দৃষ্টি দেয়। বাচ্চাদের মতো ঠোঁট ভেঙে উত্তর দেয়,
__আমার খুদা পেয়েছে"।
__কি"!?
আরহান অবাক না হয়ে পারে না। তার এখন খুদা লাগছে! সিরিয়াসলি? আরহান হঠাৎ ই ব্রেক কষে দেয়। মায়া আরো বিরক্ত হয়ে চায়। কপালে ভাঁজ ফেলে বলে,
__কি হলো এটা? এভাবে মারবেন নাকি রাস্তায়"।
আরহান অন্যমনস্ক হয়ে উত্তর দেয়,
__আমি মারব না আমাদের মারবে। সামনে তাকাও"।
মায়া বিরক্ত মুখে সামনের দিকে তাকাতেই তার চোখ বিস্ফারিত হয়ে যায়। রাস্তার ঠিক মাঝে দাঁড়িয়ে আছে একটি কালো গাড়ি। কিছু লোক গাড়ি থেকে বের হয়ে তাদের গাড়ির দিকেই এগিয়ে আসছে…
চলবে...
[এরপর মজা আছে কিছু একটু ধামাকা টাইপ 🥹]