ফন্ট সাইজ:
থিম:
তৈলচিত্র

২য় পর্ব

লেখক: নূরজাহান আক্তার আলো

ঘড়িতে তখন রাত বারোটা!

মুনতাসীর কেবল ভুঁইয়া বাড়িতে এসে পৌঁছেছে। আর আসার পথে ওই মুরব্বি গ্রামের অদ্ভুত ঘটনা শোনাতে শোনাতে তার কান ঝালাপালা করে দিয়েছে। একটা মানুষ এত কথা বলতে পারে? এতটা বাচাল হয়? নাকি বয়সের দোষ? তার উপরে সে সাইকেলে ঠিকঠাক বসতে পারছিল না। বারবার উনার হাঁটু তার নিতম্বে বারি খাচ্ছিল। এভাবে কি বসা যায়? চিপা প্যান্টের কারণে বসতে কষ্ট হচ্ছিল। শেষ কবে এভাবে ঝুলে ঝুলে সাইকেলে চড়েছে মনে পড়েনা। আর মুরব্বি তার মতো জোয়ান তাগড়া যুবককে নিয়ে সাইকেল টানতেও পারছিলেন না। অবশ্য বলেছিল সেই চালাক কিন্তু তাও দেয়নি। নিজেই বাহাদুরি করে চালাচ্ছিলেন। কিছুদূর গিয়ে অবশ্য হাঁপাতে হাঁপাতে জিজ্ঞাসাও করেছিলেন তার ওজন কত!

ততক্ষণে অপমানে তার মুখখানা থমথমে হয়ে গিয়েছিল। রাগে-ক্ষোভে কথাও বলতে পারছিল না। তখনই সাইকেল গর্তে পড়তে পড়তে বাঁচল। কিন্তু গর্ত বাঁচাতে একেবারে ধ্যাড়ধ্যাড়ানি গোবরের ওপর দিয়ে সাইকেল চালিয়ে চলে গেলেন। ফলে গোবর ছিটকে তার প্যান্টে এসে মাখামাখি হলো। আর কিছু বলার ভাষার নেই তার। কি বা বলবে? কাকে বলবে? কোন দুঃখে মরতে মরতে এখানে এসেছিল? একটা মানুষের ভাগ্য ঠিক কতটা খারাপ হলে এই পরিস্থিতি পড়ে! সে চোয়াল শক্ত করে চুপ করে বসে রইল। ঠিক তখনই পুঁ..পুঁ..পুঁই করে একটি শব্দ কানে ধাক্কা দিলো।

এরপরই মুরব্বি বললেন,

_'কিছু মনে কইরো না বাজান, প্যাটে মেলা গ্যাস হইছে! দুবেলা গ্যাসের ট্যাবলেট খাইতে হয়।'

মুনতাসীর নিশ্চল। শুধু মুখ তুলে অসহায় দৃষ্টিতে আকাশপানে তাকাল। কোন পাপের শাস্তি পাচ্ছে সে? তার নসিবে এসবও লেখা ছিল? এরপর তারা এসে পৌঁছাল ভুঁইয়া বাড়ির গেটের সামনে। সাইকেল থেকে নেমে মুনতাসীর ধাপ ফেলতে পারছেনা। ব্যাক সাইডটা অবশ অবশ লাগছে।

এদিকে কারেন্ট নেই। পুরো গ্রাম অন্ধকার৷ ঘরে ঘরে যাও ছিল সেসবই নিভে গেছে। সন্ধ্যা হলে হয়তো মানুষের আনাগোনা থাকত। রাত বিধায় কাউকে দেখা যাচ্ছে না। সে সামনের ভুঁইয়া বাড়ির দিকে তাকাল। সারা বাড়ি অন্ধকারে ডুবে আছে। কি রঙের বাড়ি, কেমন ডিজাইন বোঝারও উপায় নেই। অনেক ডাকাডাকির পর দারোয়ান সাড়া দিলেন। ও বেচারা ঘুমাচ্ছিল। তারপর রাগে গজগজ করতে করতে অনুমতি নিয়ে তারপর তালা খুলে দিলো। তখন আযান ভুঁইয়া সেখানে উপস্থিত হলেন। অনেক রাত হয়ে গেছে তাই মুরব্বিও দাঁড়ালেন না। অল্প কথায় বিদায় নিলেন। তবে যেতে যেতে জানালেন কাল এসে দেখা করে যাবেন। এতদূর থেকে ছেলেটা জার্নি করে এসেছে। তাই আযান ভুঁইয়া উনাকে ভেতরে নিয়ে গেলেন। আরাফাত ভুঁইয়া বের হতে হতে তাদের আসতে দেখে হাসলেন। স্নেহের সাথে তাকে বুকে জড়িয়ে নিলেন। কাঁধ চাপড়ে কুশল বিনিময় করলেন।

এতক্ষণে চেনা মানুষ দেখে মুনতাসীরের মুখেও হাসি ফুটল। স্বস্তির শ্বাস ছাড়ল। মনে মনে লক্ষ-কোটি শুকরিয়া জানাল। এমন জঘন্য অভিজ্ঞতা

এর আগে হয়নি। উনাদের কথাবার্তা শুনে লাঠি হাতে বয়োজ্যেষ্ঠ নূর বানু এগিয়ে এলেন। সংসারে এখনো উনার কথায় শেষকথা। কথার ঝাঁঝ মাথা ঘুরানোর মতোই। বিধবা নারী অথচ দাপট নিয়ে চলেন। আর উনার দাপটে তিনপুত্রবধু ঠকঠক করে কাঁপে। মুনতাসীর উনাকে দেখে বিনয়ের সঙ্গে সালাম দিয়ে কুশল বিনিময় করল। উনি বোধহয় তাকে পছন্দ করছে না। কেমন গম্ভীর সুরে কথা বললেন। কেমন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তার আপাদমস্তক দেখলেন। সত্যি বলতে, এতরাতে অচেনা ছেলেকে বাড়িতে ঢুকানো পছন্দ হয়নি উনার। নেহাৎ ছেলের পরিচিত তাই আর কথা বাড়ালেন না। নয়তো মাঝরাতে লঙ্কাকান্ড বাঁধিয়ে দিতেন। বাড়ির ভেতরটা সুনশান। বেশিরভাগ সদস্যই ঘুমে কাদা। কারেন্ট নেই মোমের আলোয় এতক্ষণ কথাবার্তা হচ্ছিল। তখন দুই গিন্নি এসে দাঁড়াতেই সে তাদের সালাম দিলো। উনারা সালামের জবাব নিয়ে বসতে বলে উনারা

রান্নাঘরের দিকে ছুটে গেলেন। তড়িঘড়ি খাবারও সাজিয়ে ফেললেন।

খেতে ডাকলে মুনতাসীর জানাল তার ফ্রেশ হওয়া দরকার। সারা গায়ে ঘামে চিটচিট করছে। প্যান্টের পায়ের দিকে গোবর লেগে আছে। ফ্রেশ না হলে থাকা অসম্ভব। একথা শুনে আরাফাত ভুঁইয়া তাকে কলপাড়ে নিয়ে গেলেন। নিজেই টিউবওয়েল টিপে দিলেন। টিউবওয়েলের ঠান্ডা পানিতে শাওয়ার নিয়ে কি যে ভালো লাগল। ইচ্ছে মতো পানি ঢালল।

কিন্তু গোসলের পর আসল বিপত্তি বাধল তখন, যখন মনে পড়ল সে তো ট্রলি হারিয়ে ফেলেছে।

একটা জামা-কাপড়ও তার সঙ্গে নাই। এখন কি পরবে? একথা জানাতে আরাফাত ভুঁইয়া আবারও ছুটলেন ছেলের ঘরে। ছেলের ট্রাউজার আর টিশার্ট এনে দিলেন মুনতাসীরকে। ভেজা পোশাক ছেড়ে শুকনো

জামা-কাপড় পরল সে। এরপর বিশাল বড় টেবিলে খেতে বসতেই তার চোখ চড়কগাছ। খাবার সাজানোর ধরণ দেখে ক্ষুধা দ্বিগুণ বেড়ে গেল। সে পেটপুরে খেতে লাগল। তখন আরাফাত ভুঁইয়া বললেন,

_'তা একা রুমে থাকতে পারবে? নাকি সঙ্গে কাউকে দেব?'

_'একাই থাকতে পারব। কারো পাশে ঘুম আসেনা আমার।'

_'গ্রাম কিন্তু। তাছাড়া কারেন্ট নেই কখন আসে ঠিক নাই।'

_'সমস্যা নাই।'

_'ঠিক আছে।'

আযান ভুঁইয়ার ইশারায় ততক্ষণে কাকলি নামের একটি মেয়ে দোতলার একটি রুমে বিছানার চাদর বিছিয়ে দিয়েছে। রুমটা ঝাড়ু দিয়ে, গুছিয়ে থাকার উপযোগী করে ফেলেছে। এমনিতে রোজ ঝাড়-মোছের কারণে তেমন কিছু করতে হলো না। আরাফাত ভুঁইয়া হাতপাখা, পানির বোতল, কয়েল, দুটো মোমবাতি আর দিয়াশলাই দিয়ে তাকে রুমে নিয়ে এলেন।

রুমের সঙ্গে ওয়াশরুম আছে কিন্তু পানি নেই। লাইনে কি যেনো সমস্যা হয়েছে পানি আসেনা। কাল মিস্ত্রি এসে ঠিক করে দিবে। কাকলিকে ডেকে এক বালতি পানি ওয়াশরুমে রাখতে বললেন। কাকলি তা রেখে গেলে তাকে রেস্ট করতে বলে উনিও চলে যাচ্ছিলেন। মুনতাসীর উনাকে পিছু ডেকে বলল,

_'আঙ্কেল পাওয়ার ব্যাংক থাকলে দিয়ে যান।'

_'আচ্ছা দিচ্ছি। আর কিছুকিছু লাগবে?'

_'না।'

_'হুম।'

এরপর উনি পাওয়ার ব্যাংক পাঠিয়ে দিলে ফোন চার্জে দিয়ে বিছানায় চিৎপটাং হয়ে শুয়ে পড়ল। কতক্ষণ পর বিছানা পেল! কোমরটা চিনচিন করছে। ক্লান্তিতে চোখজোড়াও বন্ধ হয়ে আসছে। বেশি সময় নিলো না, তার চোখে ঘুম নেমে এলো। কিছুক্ষণ পরেই ভ্যাপসা গরম আর মশার কামড়ে উঠে বসতে বাধ্য হলো। এ কি জ্বালা! গায়ের টি-শার্ট ছুঁড়ে উপুড় হয়ে শুয়ে চোখ বন্ধ করতেই মশার দলরা এসে কামড়ে ধরল। পিঠখানা জ্বালিয়ে দিলো! এভাবে ঘুমানো যায়? সে উঠে বসে দেখে কয়েল শেষ। বিরক্ত হয়ে হাতপাখা ঘুরাতে ঘুরাতে হাতই ব্যথা হওয়ার জোগাড়। তাও কারেন্ট আসার নাম নেই। জানালা খোলা অথচ বাতাস আসছে না। গা

ঘেমে একাকার অবস্থা। এখনো কারেন্ট আসছে না৷ আজ কি আসবে না ?

ঘড়ির কাঁটা চলতে থাকল। সময় কাটল। রাত বাড়ল। তার ফোন খুলেছে কিন্তু নেটওয়ার্ক নেই। এদিক-ওদিক হেঁটেও নেটওয়ার্ক পেল না। উদোম গায়ে কিছুক্ষণ শুয়ে -বসে রইল। কিন্তু সত্যি সত্যি কারেন্ট আর এলো না। চব্বিশ ঘণ্টা এসিতে থাকত সে। যার কারণ গরমে অবস্থা খারাপ। আর এমনিতেই প্রচুর ঘামে সে। একপর্যায়ে ঘাম বসে তার গলা ভেঙে গেল।

ঘুম না হওয়ায় চোখ দুটো প্রচণ্ড জ্বলছে। মাথার ব্যথায় অবস্থা খারাপ।

অতঃপর আর না পেরে ওভাবেই বিছানায় পড়ে রইল। মোম শেষ হয়ে অন্ধকার রুম। এভাবে কয়েক ঘন্টা কেটে ভোরের দিকে জানালা দিয়ে

শীতল হাওয়া এলো। একটু শান্তি লাগল। চোখ দুটো একটু লেগে এলো।

ভোরের আজানের সময় কারেন্ট এলো। কিন্তু মুনতাসীর টেরও পেল না কারণ তার রুমে লাইট বা ফ্যানের সুইচ অন করা নেই। আজানের পর,

ভোরের আলো ফুটেছে। মোরগ ডাকছে। গ্রামের মানুষেরা তাড়াতাড়ি ঘুমায় আবার সকালে তাড়াতাড়ি ওঠে। আজ আবার সোমবার। আর গাঁও-গ্রামে সোমবার মানেই হাটবার। এজন্য ভোর ভোরই উঠে পড়েছে অনেকে। বাড়ির উঠান থেকে কামলাদের চেঁচামেচি শোনা যাচ্ছে। তারা পান্তা খেয়ে দলবেঁধে যাচ্ছে মাঠের দিকে। বোরো ধানের মৌসুম এখন।

ভুঁইয়াদের অনেক জমিতে ধান বুনেছে সেসব কাটার জন্য তারা যাচ্ছে।

এরা সারাবছর এ বাড়িতেই কাজ করেন। যখন যে আবাদ উঠে সেসব নিয়ে কাজ করেন। এত চিৎকার চেঁচামেচিতে মুনতাসীরের ঘুমটা ভেঙে গেল। ঘুমঘুম চোখে জানালার দিকে তাকাল। সকাল হয়েছে আর এত হাঁকডাকে শুয়ে থাকা সম্ভব হলো না। কারা চেঁচাচ্ছে, তাকে দুই ঘুষি দিতে নিচে নামল। কিন্তু কাউকে পেল না। লুঙ্গি উঁচিয়ে একদল তখন মাঠের দিকে হাঁটা ধরেছে। সে চোখ ডলতে ডলতে উঠানে এসে দাঁড়াল। ঘড়িতে তখন সাড়ে সাতটা। আজ সকাল থেকে সূর্যের উত্তাপ অন্যদিনের চেয়ে অনেকটাই বেশি। বাতাসে খাঁ খাঁ ভাব। মাঠ-ঘাটের মাটি ফেটে চৌচির। আজও প্রচুর গরম পড়বে। সে ভাবল কলপাড়ে থেকে হাত-মুখ ধোবে। তাই কলপাড়ের দিকে হাঁটা ধরল। পরনে গতকালকের হাতাকাটা কালো গেঞ্জি আর কালো ফোর কোয়ার্টার প্যান্ট। যেটা হাঁটু বরাবর। সে যেতে যেতে খেয়াল করল বাড়ির গিন্নিরা পাশের রান্নাঘরে ব্যস্ত। দশটার দিকে কামলারা ধান কেটে আঁটি বেঁধে এনে এই উঠানেই পালা করে রাখবে। তাই শেফালি নামের কাজের মহিলা উঠানে গতকালকে কাটা ধানের আঁটি শুকাতে দিচ্ছিলেন। নিজের কাজ করতে করতে হঠাৎ উনার চোখ গেলো মাঝ উঠানের দিকে। ভূত দেখার মতে চমকে উঠলেন। চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইলেন। কেমন করে দেখলেন। উনাকে এভাবে তাকাতে দেখে মুনতাসীর খুব বিরক্ত হলো। সে কি অন্য গ্রহের এলিয়েন? তাকে এভাবে দেখার কি হলো? এমনিতে মেজাজ চড়ে আছে। তাই সে ভ্রু কুঁচকে বলল,

_'হোয়াট হ্যাপেন্ড?'

শেফালি খালা তড়িঘড়ি আঁচলে মুখ ঢেকে নিলেন। এসব কেমন পোশাক? এগুলো কেউ পরে? এত বড় দামড়া অথচ জামা-কাপড় বাচ্চা ছেলের মতো। আর কি যেন বলল? হুঁশ প্যান? তাকিয়েছে বলে গালি দিলো? কত বড় সাহস! কে না কে এসে তাকে গালি দিলো। উনি তড়িঘড়ি কুলা হাতে নিয়ে রান্নাঘরে ছুটলেন৷ এর একটা হেস্তনেস্ত করেই ছাড়বে। তাই উনি কাকলিকে দেখে তার পাশে দাঁড়ালেন কাকলি তখন পরোটা বেলছিল। উনি তার পাশে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন,

_' উডানে ওইডা কেডা রে কাকলি? ক্যান আইছে? জানিস আমার দিকে কেবা কইরা যেন তাকাইল। তারপর কইল, আমি নাকি 'হুঁশ প্যান'। তোর বাপে 'হুঁশ প্যান' গোলাপের পুঁত।'

উনার কথার আগামাথা কিছুই বুঝল না কাকলি। তাই উঠানের দিকে উঁকি মেরে তাকাল। মুনতাসীরকে দেখে মুখ টিপে হেসে বলল,

_'কাইল রাইতে শরের থিকা আইছে। আমাগো হিমাদ্রি ভাইজানের বন্ধু।'

_'কি কস! আমাগো হিমাদ্রি ভাইজানের বন্ধু? এইডা? আমাগো ভাইজানও দেহি নষ্ট হইয়া গ্যাছে। নইলে এমন সুলেমান ল্যাংটারে বন্ধু বানায়। ছিঃ!'

_____

__‘অ্যাই আরিজ ভাই, আব্বার থেইকা কিছু ট্যাহা লইয়া দ্যান না? বাইত যামু। প্যাটের বিষে এক পাও ফ্যালাইতে পারতেছি না।’

হঠাৎ পেছন থেকে মেয়েলি কণ্ঠস্বর শুনে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল আরিজ। তার থেকে দুই হাত দূরে কুঁজো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ধারা। পরনে কলেজ ড্রেস। কাঁধে কলেজ ব্যাগ। শ্যামবর্ণ মুখে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে, কড়া রোদে মুখটা কেমন ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে। ধারা আরিজের দিকে চাইলেও তার চোখদুটো আতঙ্কে আড়তের দিকে চলে যাচ্ছে। আড়তের ভেতরে ক্যাশবক্সের সামনে তার বাবা আযান ভুঁইয়া বসে আছেন। কয়েকজন মাতব্বরকে নিয়ে গল্পগুজবে মশগুল তিনি। উনি যদি ভুলক্রমেও তাকে দেখে তাহলে এখানেই জুতোপেটা করবে। মেয়ে মানবে না, মানুষজনও দেখবে না। তার মনের অবস্থা বুঝে আরিজ কথা বাড়াল না। সে ধারার থেকে সামনে এগিয়ে আড়ালে দাঁড়াল। যাতে আযান ভুঁইয়া দেখতে না পান। তারপর বোতলের পানি নিয়ে নিজের মুখে-চোখে দিলো। হাটের ধুলো আর ভ্যাপসা গরমে চোখ-মুখ কেমন চটচট করছে। সকাল থেকে একটানা ধানের বস্তা টানার কারণে কোমরটা চিনচিন করছে। মেরুদণ্ডে টান লেগেছে। সে গলায় ঝুলানো গামছা দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে ধারার

দিকে তাকাল। এই সময় কলেজ ছুটি হয় না। নিশ্চয়ই পালিয়ে এসেছে! সে বোতলটা একপাশে রেখে বলল,

_‘তোর বাপে এতই ভালা মানুষ? আমি কইলেই ট্যাহা দিয়া দিব? উল্টা হাটের মধ্যে আমারেই দশটা কথা শুনাইয়া দিব। যেই হারামি তোর বাপ।'

ধারা জবাব দিল না। কথাটা বিন্দু মাত্র মিথ্যে না তা ভালো করেই জানে। কিন্তু সত্যি সত্যিই হাঁটতে পারছে না সে তাই ছুটে এসেছে। তাহলে বাড়ি যাবে কিভাবে? নিজেকে ভীষণ অসহায় লাগল৷ চোখ ফেটে জল গড়িয়ে পড়ল। তারপর দ্রুত চোখ মুছে ধরা গলায় বলল,

_‘তাইলে আপনেই ধার দ্যান। আমি বাইতে গিয়া আম্মার থেইকা লইয়া আপনারে দিয়া দিমু।'

কথাটা শুনে আরিজের ভ্রুজোড়া কুঁচকে গেল। ইচ্ছে করল মেয়েটার কান বরাবর কষে থাপ্পড় লাগাতে। কিন্তু এখন হাটভর্তি মানুষ তাই চুপ করে গেল। যুবতী একটা মেয়ে হাটের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকাও পছন্দ হলো না তার। তাই চাপা গলায় বলল,

_‘ভং কম কর। তোর ভং এর ঠেলায় গা জ্বইলা যাইতাছে। কিন্তু কথা হইল গিয়া, কলেজ তো অহনও ছুটি হয় নাই। পলাইয়া আইছোস ক্যান?’

ধারা মাথা নিচু করে নিলো। অপরাধীর ন্যায় মাটির দিকে তাকিয়ে রইল। মেয়েলি সমস্যার কথা কীভাবে বলবে সে? এদিকে পেটের ব্যথায় সোজা হয়ে দাঁড়ানো দায়। লজ্জায় চুপ করে রইল। আরিজ নির্বোধ নয়, ধারার আড়ষ্টতা দেখে কিছু একটা আন্দাজ করে নিলো। তাই কথা না বাড়িয়ে পকেট থেকে পঞ্চাশ টাকার নোট বাড়িয়ে দিয়ে বলল,

_‘হাঁটে বদমাইশ পোলাপান ঘুরাফিরা করতাছে। যা, তড়িৎ বাড়িত যা। অন্য ভ্যানে উঠবি না। মোড়ের মাথায় মজিদের ভ্যান খাড়াইয়া আছে, ওইডাত গিয়া উঠ।’

_‘হুম।’

ধারা টাকাটা মুঠোয় পুরে এক সেকেন্ডও দাঁড়াল না। পেটের একপাশ চেপে হাঁটা শুরু করল। মোড়ের মাথায় পৌঁছাতেই দেখতে পেল মজিদের ভ্যান দাঁড়িয়ে আছে। তাকে আসতে দেখে মজিদ মিয়া একটু হাসলেন। গ্রামের চেনা মেয়ে তাই স্নেহের সুরে বললেন,

_‘আম্মা, বাইত যাইবেন? কলেজ শ্যাষ?’

_‘হুম চাচা। বেশি দেরি হইব ছাড়তে? মেলা মাথা বেদনা করতাছে।’

_‘আর দু'জন আইলেই গাড়ি টান দিমু আম্মা। আপনে কষ্ট কইরা একটু বয়া থাহেন।’

_‘আচ্ছা।’

মিনিটখানেকের মধ্যেই বাজার নিয়ে দু'জন ভ্যানে এসে বসলেন। ভুঁইয়া বাড়ির মেয়েকে দেখে একটু দূরত্ব রেখেই বসলেন। মজিদ মিয়া এবার গাড়ি টান দিলেন। গ্রামের রাস্তাগুলো ভাঙাচোরা। ভ্যানের চাকা কোনো গর্তে পড়লেই মনে হচ্ছে কলিজা ছিঁড়ে বেরিয়ে আসবে। সে চোখ-মুখ শক্ত করে দাঁতে দাঁত চেপে বসে রইল। দূর থেকে আরিজ তীক্ষ্ণ চোখে খেয়াল রাখছিল মেয়েটা চেনা ভ্যানটায় উঠল কি না। যখন দেখল উঠেছে তখন সে আড়তের দিকে পা বাড়াল। সকাল থেকে তার পেটে এক ফোটা দানাপানিও পড়েনি। খাওয়ার সুযোগই হয়নি। আজ বড় হাট। ব্যস্ততা বেশি। বোরোর

মৌসুমে ভালোই ধান আমদানি হয়। আজকে পাট আর ধানের আমদানি নজরে পড়ার মতোই ছিল। এজন্য আড়তদাতারাও যার যার মতো লুফে নিয়েছে। আরিজ আড়তে ঢুকে আযান ভুঁইয়াকে বলল,

_‘চাচা, আপনে বয়া থাহেন, আমি বাজারডা সাইরা লই। বাড়ি যাওনের সময় আম্মার হাতে দিয়া দিয়েন।’

_‘জলদি আসিস,’

_‘ক্যান, এইটুক বইতেই পু/টকি জ্বলতাছে আপনার? আমি যে সকাল থেইকা বসবার সময়টুক পাই নাই, হেই হিসাব আছে? নাকি নিজের পাছা পাছা আর অন্যেরডা যাতা।'

আরিজের মুখে কোনো লাগাম নেই। ছেলেটা আগে যা ভয় করত এখন

তার মধ্যে ভয়ের ছিঁটেফোঁটা নাই। তাই উনি চোখ রাঙিয়ে তাকালেন। গালি দিয়ে বললেন,

_‘জানোয়ারের বাচ্চা! কথা কম ক কইলাম। বাড়িত মেহমান আইব, তড়িৎ যাওন লাগব আমার।’

_‘কেডা আইব?'

_‘ঘটক আইব। বাড়িভর্তি শুয়োরের পাল পয়দা কইরা রাখছি না? ট্যাহা খরচা কইরা আপদ বিদায় করন লাগব না?’

_‘পোলা-মাইয়া দুনোটাই আল্লাহর মাল। আপনে মাইয়াগো লগে এমন করেন ক্যা? মরবেন না? নাকি মরণের ভয়ডাও নাই?’

_‘বেশি ফটর ফটর করবি না আরিজ! যা বুঝোস না তা লইয়া কথা কবি না। আমি মরলে মাইয়ারা আমার খাটলি ছুঁইতে পারব? আমার কবর জিয়ারত করতে পারব? খালি খালি অগো পেছনে ট্যাহা ধ্বংস! আইজ নিজের একখান পোলা থাকলে তোর মতো কামলার চোপা সহ্য করন লাগত আমার? একটু কিছু কইলেই তো আড়ত ছাইড়া যাওয়ার হুমকি দেস!’

_‘কই, সহ্য আর করেন কই? একটা ন্যায্য কথা কইলে তো পেছন দিয়া বাঁশ ভইরা দেন! মাস্টার্স পাশ করা কামলা পাইয়া কাম কইরা জানডা

কয়লা কইরা ফালাইতাছেন। অথচ আমার দিন কিন্তু এমন আছিল না। আমি এই গেরামে পড়ালেহায় ফাস্ট বয় আছিলাম। আব্বা না মরলে আইজ আমিও রাজার হালেই থাকতাম। নেহাৎ পরিস্থিতির কাছে বান্ধা পইরা গেছি। আর এই সুযোগে আপনেও আমার হাতের কলম কইরা আপনের আড়তের হিসাব ধরাইয়া দিলেন। খারাপ দিন তাই এহনো পইড়া থাকি। তয় বেশিদিন থাকব না চাচা, মিলাইয়া নিয়েন। আমারও সু'দিন আইব!

আমি আবারও কলম ধরমু! আমার সার্টিফিকেট একদিন কথা কইব।'

_'ক্যান যাইবি, আমি তোরে দেখি না? কিচ্ছু দেই না?'

_'দেন তো। দেন নাই কই নাই তো। রোজ পাঁচশ ট্যাহা হাতে ধরাইয়া দেন। এহনকার বাজারে পাঁচশ ট্যাহায় কিছু হয়? নিজেরা ঝুড়িভর্তি বাজার করছেন। আর আমি এ ট্যাকায় মাছ কিনুম নাকি মুরগি? ত্যাল কিনমু নাকি সবজি? বোনডা আমার মুরগির মাংস পাইলে একগাল ভাত বেশি খায়। এসব বুঝি ঠিকই কিন্তু কুলাইতে তো আর পারিনা।'

_‘খ/বিশ কোনহানকার! এত দেই তাও মুখে শুকরিয়া নাই। যা, আমার চোখের সামনে থেইকা দূর হ কইলাম! নইলে ইটা দেখতাছোস, এইডা দিয়া তোর মাথা ফাটাইয়া দিমু!’

_‘আপনে ইটা মারলে আমিও ঢিল মাইরা আপনের চোখ কানা কইরা দিমু! এমনিতে ল্যাংরা, চলতে ফিরতে পারেন না, এবার এক্কেরে কানা! কথা হইল গিয়া ঝগড়া থোন, আজইকার ট্যাকা দেন। আইজকা বাজারে মেলা বেচাকেনা হইছে, কম দিলে নিমু না কইলাম।’

আযান ভুঁইয়া এবার রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে এক হাজার টাকার নোট ছুঁড়ে দিলেন। আরিজ তড়িৎ লুফে নিল। চকচকে নোটটায় চুমু খেয়ে একগাল হাসল। তারপর বাজারের ব্যাগ নিয়ে সবজি বাজারের দিকে হাঁটা ধরল।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২য় পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন