ঘড়িতে রাত একটা।
অদ্ভুত এক নিস্তব্ধতায় ছেয়ে আছে চারিপাশ। কোথাও কোনো কোলাহল নেই৷ জনমানুষের আনাগোনা নেই। নেই ভারী কোনো শব্দ। শুধু মাথার ওপর বিশাল আকাশের বুকে একাকি চাঁদ দুহাত ভরে আলো বিলাচ্ছে। তার রুপ দেখে মনে হচ্ছে চাঁদটা আজ রূপলাবণ্য মেলে জোছনাকুমারী সেজেছে। যার কাজ মনখুলে, প্রাণ ভরে, শুধু জোছনা বিলানো। আর এ সৌন্দর্যটুকু জানালার পাশে দাঁড়িয়ে দেখছে হিমাদ্রি। তার হাতে কফির মগ। রুমের লাইট অফ। কানে ব্লুটুথ কানেক্ট করা। কথা বলছে নিচুস্বরে।
পেশাগত কারণে তার রাতের ঘুমটাও নিয়মমাফিক। অভ্যাসবশত নতুন কোনো জায়গায় সহজে ঘুম আসে না। তাছাড়া জরুরি কল করার ছিল বিধায় এতক্ষণ জেগেছিল। হঠাৎ কথা বলতে বলতেই তার নজর বিঁধল উসমান সাহেবের দোতলা বিশিষ্ট বাড়ির দিকে। কেউ সাবধানতার সাথে
দোতলার বেলকনি বেয়ে নিচে নামছে। ভালো করে দেখে বুঝল মেয়েলী কোনো দেহাবয়। পরনে ঢিলেঢালা ঘরোয়া পোশাক। মুখ ঢাকা। এভাবে নামছে কেন? চোর টোর নাকি? তবে হাইট দেখে মনে হচ্ছে চেনা কেউ।
দেখেছে কোথাও। ততক্ষণে মেয়েটি নিচে নেমে পড়েছে। ধীরে ধীরে গেট পেরিয়ে বাইরে বেরিয়ে এসেছে। বাড়ির পেছনের পথ ধরে হাঁটতেও শুরু করেছে। হিমাদ্রি দ্রুত ব্লুটুথ ডিসকানেক্ট করে তার পিছু নেওয়ার প্রস্তুতি নিলো। কে সে? কোথায় যাচ্ছে? কেন যাচ্ছে? তার জানা দরকার। আজ
জোছনা রাত। সবকিছু স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। দেখা যাচ্ছে বলেই সে সতর্ক হলো। মেয়েটির থেকে যথেষ্ট দূরত্ব রেখে আড়ালে থেকেই নজরে রাখল।
মেয়েটি ধীর পায়ে হাঁটতে হাঁটতে বিশাল চরণভূমি পার হলো। পিছু ফিরে বাড়ির দিকে তাকিয়ে আবার চলতে শুরু করল। চলতে চলতে আচমকা দৌড়াতে শুরু করল। এবার হিমাদ্রি বিপাকে পড়ে গেল কারণ দৌড়ালে নজর রাখবে কিভাবে? তার পেছনে সেও যদি ছুটতে শুরু করে তাহলে ধরা পড়ে যাবে। খেলা তো কেবল শুরু এখনই ধরা পড়লে হবে?মেয়েটি ততক্ষণে গভীর জঙ্গলে প্রবেশ করেছে। গাছের পাতার ফাঁক গলিয়েই সরু পথে জোছনা এসে পড়েছে। সেই আলোতেই চলতে কষ্ট হচ্ছে না। চলতে চলতে হিমাদ্রি হঠাৎ মেয়েটিকে হারিয়ে ফেলল। হন্ন করে খোঁজে দেখল কিন্তু তাও পেল না। কিছুদূর গিয়ে আবারও তাকে দেখতে পেল ।সে গাছের আড়ালে নিঃশব্দে চলতে শুরু করল। হঠাৎ পা সড়কে পড়ার শব্দে মেয়েটি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। দ্রুত মোটা গাছের পেছনে লুকিয়ে পড়ল। বোঝার চেষ্টা করল বন্যপ্রাণী নাকি অন্যকেউ? কিন্তু কারো শব্দ না পেয়ে একটু মাথা বের করে আশপাশে তাকাল। সৌভাগ্যবশত তখন কাছে কোথও থেকে একদল শিয়াল ডেকে উঠল। তবুও মেয়েটি নড়ল না। কিছুক্ষণ আড়ালে থেকেই তারপর আরেকবার আশপাশ দেখে বের হলো। তারপর পুনরায় হাঁটতে শুরু করল। পথ চিনে চলার গতিতে মনে হচ্ছে এপথে তার যাওয়া-আসা হয়। যতই চেনা হোক মনে একটু ভয়ঢর থাকা উচিত। অবশ্য তার সম্পর্কে এখন অবধি যতটুকু শুনেছে তাতে না থাকাই স্বাভাবিক। মেয়েটি জঙ্গল পেরিয়ে এবার ছোট্ট একটি পর্বতের চূড়ায় উঠতে শুরু করল। এখান থেকে চাঁদটা একটু বেশিই সুন্দর দেখা যাচ্ছে। মেয়েটি দুই পা ঝুলিয়ে বসে পড়েছে। তাকে বসতে দেখে হিমাদ্রি
পাইন গাছের সঙ্গে হেলান দিয়ে দাঁড়াল। মেয়েটির দৃষ্টি স্থির যৌবনবতী চাঁদের দিকে। এবার আর চিনতে ভুল হলো না। এটাই উসমান সাহেবের একমাত্র মেয়ে মাহিনূর সিদ্দিকী। যাকে গতকালও অবলা একজন নারী ভেবেছিল। অথচ আজ মধ্যেরাতে তারই চোখের সামনে পর্বতের চূড়ায় উঠে বসে আছে। যেখানে সবারই জানা এখানকার পর্বত, গহীন জঙ্গল কতটা ভয়ংকর। কত হিংস্র প্রাণী রয়েছে এখানে। তাকে দেখে মনে হচ্ছে না উঠার কোনো তাড়া আছে। যেন জেনেবুঝে সময় নিয়ে চন্দ্র বিলাশে এসেছে। তার মতিগতি বুঝে হিমাদ্রিও মুচকি হাসল। এসব চরিত্রগুলো তার বেশ পছন্দ। এদের সঙ্গে লড়ে মজা আছে। এরা সহজে হাল ছাড়ে না। হার মানেও না৷ খেলাতে যদি বিপক্ষদল সহজে হার মানে তাহলে খেলাতে মজা আসেনা। এবারের কাজ একেবারে অন্যরকম হতে যাচ্ছে সেটা এক্ষনই টের পাচ্ছে। তাই সে বিড়বিড় করে বলল,
__''বাবার সম্মুখে অবলা মায়া। রাতের আঁধার রহস্যময়ী কায়া।
ইন্টারেস্টিং, ভেরি ইন্টারেস্টিং!"
মাহিনূর তখন আশেপাশে তাকাতেই তড়িৎ আড়ালে সরে গেল হিমাদ্রি।
নিজেও বসল গাছের আড়ালে। নজর রাখল সামনে রহস্যময়ী মেয়েটির দিকে। সময় কাটল। রাত বাড়াল। বন্যপ্রাণীর ডাক শোনা গেল। রাতের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে জোছনার আলো যেন আরো গাঢ় হতে লাগল। এভাবে ঘণ্টাখানিক বসে মাহিনূর উঠে দাঁড়াল। যেভাবে এসেছিল ঠিক সেভাবেই
নিঃশব্দে বাড়িতে প্রবেশ করল। কেউ জানলও না, কেউ দেখলও না তার এমন দুঃসাহসিক কাজের কথা। মাহিনূর প্রবেশের মিনিট পাঁচেক পরেই হিমাদ্রি অতিথিখানায় প্রবেশ করল। দরজা আঁটকে ক্লান্ত শরীর এলিয়ে চোখজোড়া বুঝে নিলো। তখনও তার ঠোঁটে ফিচেল হাসি। মাথায় ঘুরছে অন্যকিছু। ঘড়ির কাঁটা তখন তিনের ঘরে স্থির। ঘুমে চোখের পাতা ভারি হয়ে আসছে। ক্লান্ত দেহখানা বিশ্রাম চাচ্ছে। এবার ঘুমনো দরকার! মাত্র দেড়ঘণ্টা ঘুমের বোধহয়। তখনই আজানের ধ্বনিতে ঘুমটা ভেঙে গেল। এখানে আশেপাশে মসজিদ অনেক বেশি। এজন্য প্রতিটি আজান কানে এসে লাগে। সে শুয়ে শুয়ে আজান শুনল। তারপর ধীরেসুস্থে উঠে ফ্রেশ হয়ে নিলো। ঠিক তখনই তার ধারণা সঠিক প্রমাণ করে উসমান সাহেব
তার নাম ধরে ডেকে উঠলেন। নামাজের জন্য তাড়া দিলেন। অতঃপর দুজন একসঙ্গে নামাজ আদায় করলেন। আশপাশ ঘুরে গল্পে গল্পে এসে দাঁড়ালেন খামারের সামনে। তখন সকালের আলো ফুটেছে। নতুন এক দিনের সূচনা ঘটেছে। উসমান সাহেব নিজেই ঘুরে ঘুরে খামার দেখাতে লাগলেন। কোন ঘোড়া কেমন, কোন ঘোড়াটা কোন কাজ করে, বর্তমান বাজারে কোন ঘোড়ার চাহিদা বেশি, নিজে থেকে জানালেন। হিমাদ্রিও মন দিয়ে শুনল সেসব কথা। কৌতূহলবশত টুকটাক প্রশ্নও করল। সেসব প্রশ্নের জবাব সুন্দর করে দিলেন উসমান সাহেব। ভদ্রলোক বেশ গুছিয়ে কথা বলে। এজন্য মিথ্যা কথা হলেও শুনতে কিন্তু বেশ লাগে। খামারটি কয়েক বিঘা জমির ওপর করা বিধায় বেশ বড়সড়। অনেক জাতের ঘোড়া রয়েছে। উন্নত জাতের ঘোড়াগুলো বিশেষভাবে রাখা। একেকটি ঘোড়ার রঙ, শরীরের গঠন নজরে পড়ার মতোই। কতটা যত্নে রাখা হয় তাদের সৌন্দর্য দেখেই বোঝা যাচ্ছে। উসমান সাহেব বড় মাপের ঘোড়া ব্যবসায়ী। তবে এতবড় ব্যবসা একা দেখা সম্ভব না তাই উনার শ্যালক ঘোড়া কেনা-বেচাতে সাহায্য করে।
তারা যখন খামার ঘুরে দেখছিল তখন সেখানে মাহিনূর উপস্থিত হলো। তাকে খামারে ঢুকতে দেখে খামারে কাজ করা ছেলেগুলো সালাম দিয়ে সরে দাঁড়াল। মাহিনূর সালামের জবাব দিয়ে আশেপাশে তাকাল। অদূরে দাঁড়িয়ে আছে তার বাবা আর গতদিনের সেই মেহমান। হিমাদ্রিকে দেখে বাবাকে আর ডাকল না। সোজা হেঁটে বামদিকে চলে গেল। কথা বলতে বলতে উসমান সাহেব মেয়েকে দেখলেন তবে কিছু বললেন না।এদিকে ডাকলেনও না। বরং হিমাদ্রিকে নিয়ে আরেকটু সামনের দিকে এগিয়ে গেলেন। ঘোড়ার জাত কিভাবে চিনবে বোঝাতে লাগলেন। ঘোড়া কিসব খায় দেখাতে লাগলেন। তখন খামারের একটা ছেলে ডাকলে হিমাদ্রিকে বসিয়ে উনি সেদিকে গেলেন।যেতে যেতে কি ভেবে যেন একবার পেছনে ঘুরে তাকালেন। হিমাদ্রি চেয়ারে বসে মাটির দিকে তাকিয়ে ছিল। আর তার এহেন কাজে খুশিও হলেন তিনি। ছেলেটার ভদ্রতা জ্ঞান প্রশংসার
যোগ্য। তার জায়গায় অন্যকেউ হলে ঘোড়ার গায়ে হাত বুলাতো নয়তো উনার অনুপস্থিতিতে মেয়েকে দেখার চেষ্টা করলেও করতে পারত। কিন্তু এই ছেলেটা একেবারে অন্যরকম। খুব কম কথা বলে। নিচু ও ধীরে কথা বলে। আর এজন্য ছেলেটাকে বেশ পছন্দ হয়েছে। যদি এমন থাকে তবে তাকে কাজ শেখাতে কোনো সমস্যা হবেনা। বরং নিজেই তার ব্যবসার সূচনা করে দিবে। এসব ভেবে উনি নিশ্চিন্তে স্থান ত্যাগ করলেন। হিমাদ্রি মাটির দিকে তাকিয়ে কেন জানি মৃদু হাসছিল। উনি যাওয়ার পাক্কা দুই মিনিট পর মাথা তুলল। তড়িৎ বাজপাখির মতো তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ছুড়ল তার ডানদিকে। এখানে বসে মাহিনূরকে দেখতে পাচ্ছে মে। এ নিয়ে তিনবার মেয়েটাকে দেখল। তিনবারই মুখ ঢাকা বিধায় চেহারা দেখতে পেল না। মাহিনূর দাঁড়িয়ে আছে ঘোড়ার আস্তাবলের সামনে। হাত বুলিয়ে দিচ্ছে ধবধবে সাদা একটি ঘোড়ার মাথায়। ঘোড়াটির নাম সম্ভবত হীরা। তবে প্রতিদিনের তুলনায় হীরা আজ একটু বেশিই গম্ভীর। মাহিনূর তার পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে কিছু বলছে বোধহয়। তবে হীরা নড়ছে না। বরং মুখ ধরতে গেলে মুখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিচ্ছে। বেশ কিছুক্ষণ একই কাজ করেও লাভ হলো না দেখে মাহিনূর হীরার গলাটা জড়িয়ে ধরল। কপাল ঠেকালো হীরার মাথায়। তবুও হীরার রাগ কমছে না দেখে মাহিনূর তখনও ফিসফিস করে বলে চলেছে,
_''সরি বলছি তো। ওই ঘোড়াটা কিছুদিন ধরে অসুস্থ ছিল তাই তাকে নিয়ে একটু বের হয়েছিলাম। দেখলাম কতটুকু সুস্থ হলো। ওকে নিয়ে আর বের হবো না। তাছাড়া ওরা কি আর আমার হীরার মতো? আমার হীরা বেস্ট! আমি আমার হীরাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি। এই সামান্য কারণে কেউ নাওয়া-খাওয়া ছাড়ে? আচ্ছা চল, আজকে তোকে নিয়ে বের হবো।''
একথা বলে মাহিনূর হীরাকে নিয়ে আস্তাবল থেকে বের হতে গেল। কিন্তু হীরা হাঁটছে না। যাবে না। অর্থাৎ সেদিন যাকে নিয়ে বের হয়েছিল তাকে নিয়ে যাও। তার রাগ দেখে মিটিমিটি হাসছে মাহিনূর। কিন্তু হাসলে হবে না এখন মান ভাঙানোর পর্ব চলছে। তাই বেশ মনমরা হয়ে বলল,
_ "আজ এমনিতেই মন ভালো নেই। কারা যেন আমাকে ফলো করছে। পর্বতের দিকে একা যেতে ভয়ও লাগছে। কেউ যদি হামলা করে? তুই ছাড়া আমাকে কে রক্ষা করবে ? তোর মতো কেউ কি আমাকে আগলে রাখবে? চল না রে হীরা, তুই না গেলে কিন্তু একাই চলে যাব।''
একথা বলে হীরার লাগাম ছেড়ে মাহিনূর হাঁটতে হাঁটতে খোলা আঙিনার সামনে এসে দাঁড়াল। তখনই তার পেছনে এসে দাঁড়াল হীরা। মাহিনূরকে আদেশ করতে হলো না তার আগেই দুই পা ভাঁজ করে হাঁটু গেঁড়ে বসল। যাতে তার মালকিনকে কষ্ট করে উঠতে না হয়। তার কাণ্ডে হেসে ফেলল মাহিনূর। হীরার কপালে নিঃশব্দে চুমু আঁকল। তারপর অনায়াসে হীরার পিঠে চড়ে বসল। বাবাকে আশেপাশে না দেখে লাগাম টেনে ধরে মুহূর্তেই হীরা বাতাসের বেগে ছুটতে শুরু করল। হিমাদ্রিও আড়ালে দাঁড়িয়ে চুপ করে দেখে গেল পুরো ঘটনা। তাকিয়ে রইল রহস্যময়ী মেয়েটির দিকে। যে ঘোড়ার পিঠে চড়ে একটু একটু করে তার দৃষ্টি সীমানার বাইরে চলে যাচ্ছে। যাক না, যাবে আর কতদূর! তার ধরতেই তো তার আগমন কি না।
______
_''ভাই, এই গেরামে নতুন নাকি? শহর থেকা আইছেন?''
হঠাৎ কারো কথা শুনে দাঁড়িয়ে গেল মুনতাসীর। মনে হলো তাকে কথাটা জিজ্ঞাসা করা হয়েছে। কিন্তু সে ঘুরে ডান-বাম, সামনে-পিছনে তাকিয়ে কাউকে দেখতে পেল না। তবে কথাখানা কে বলল? তখন পুনরায় কেউ বলল,
_''আমি এদিকে ভাই। ডাইনে তাকান। ''
মুনতাসীর ডানে তাকাতেই জঙ্গল নজরে পড়ল। এই জঙ্গলে মধ্যে কেউ আছে নাকি? সে একটু এগিয়ে দেখল একটা হ্যাংলা পাতলা ছেলে লুঙ্গি কাচা মেরে দাঁড়িয়ে আছে। বুঝতে বাকি রইল উনিই জিজ্ঞাসা করেছে।
তাই সেও ছোটো করে জবাব দিলো,
_''জ্বি।''
_''ওহ। তা কার বাড়িতে আইছেন?''
_''ভুঁইয়া বাড়িতে। তা আপনি জঙ্গলের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছেন কেন?''
_''আর কইয়েন ভাই। পড়ছি মুশিববতে। হাঁট থেকা মোরগ নিয়া বাড়িতে যাইতেছিলাম। হাত ফসকে মোরগ এদিকে লাফ মারছে। এহন জঙ্গলে ভিত্রে মোরগ খুজতাছি।''
_''ওহ। তা পেয়েছেন?''
_''পাইছি। তয় একা ধরতে পারতাছি না ভাই।''
_''হেল্প লাগবে?''
_''হেলেপ করলে তো ভালোই হয় ভাই।''
_''ওয়েট।''
একথা বলে সেও জঙ্গলের মধ্যে ঢুকল। কিন্তু আশেপাশে কোনো মোরগ দেখতে পেল না। খুঁজতে খুঁজতে ঝোপের মধ্যে লুকানো মোরগের দেখা পেল। দুজন দুদিক থেকে তেড়ে মোরগটাকে কোনোমতে ধরল। তারপর
মুনতাসীর ছেলেটার হাতে মোরগ বুঝিয়ে দিয়ে বাড়ির পথে হাঁটা ধরল। একটা ভালো কাজ করে মনটাও ফুরফুরে হয়ে গেল। গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে বাড়িতে প্রবেশ করল। সকাল থেকে বাড়িতে ছিল না সে। সকালের নাস্তা সেরেই আযান ভুঁইয়ার সঙ্গে আড়ত দেখতে গিয়েছিল।
সেখানে এতক্ষণ ছিল। তারপর সিরাজ বাইকে করে বাড়ির গলির কাছে নামিয়ে গেছে। জঙ্গলে ঢুকে শরীর চুলকাচ্ছে তাই আগে শাওয়ার নিলো। তারপর বোনের সঙ্গে কথা বলল। তারপর দুপুরে খেয়ে রুমে বসে রইল।
সময় কাটাতে মুভি দেখল। কতক্ষণ গেম খেলল। একমগ কফির জন্য মনটা বড্ড টানছিল তাই নিচে গিয়ে নিজেই কফি বানিয়ে আনল। সেই কফির মগ হাতে নিয়ে দোতালার খোলা বারান্দায় কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটিও করল। বাতাসে ভালোই লাগছে। সে রেলিং ঘেষে দাঁড়িয়ে কফির মগে চুমুক দিয়ে আশেপাশে তাকাল। গ্রামের নামটা যাতা হলেও গ্রাম সুন্দর।
সে চঞ্চল দৃষ্টিতে ছুঁড়তে ছুঁড়তে তার দৃষ্টি আটকাল সামনের এক বাড়ির উঠানে। অরাকে চিনতে একটুও কষ্ট হলো না। মেয়েটা খোলা কলপাড়ে গোসল করছে। হাতে-পায়ে সাবান মাখল। মুখে ফেসওয়াশ ঘষলো। কল টিপে পানি নিয়ে এরপর শরীরে ঢালতে লাগল। আর এই পুরো মুহূর্তটুকু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখল সে। কেন জানি দেখতে ভালো লাগল। এইদিকে
সদ্য গোসল করে কলপাড়ে দাঁড়িয়ে মাথা মুছছে অরা। এ সময় তার মা ছাড়া বাড়িতে কেউ থাকেনা। আজ অবশ্য একটু বেশি দেরি হয়ে গেছে।
ভেজা গায়ে, ভেজা চুল, মুছতে মুছতে হঠাৎ নজর গেল ভুঁইয়া বাড়ির দোতলার দিকে৷ মুনতাসীর রেলিং ঘেঁষে দাঁড়িয়ে তাদের বাড়ির দিকে তাকিয়ে আছে। তাকে হঠাৎ দেখে চমকে উঠল সে। তারমানে এতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল? তার গোসল করা দেখেছিল? অরা হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। এই হাবাগোবাটা এত শয়তান? এত শয়তানি তার পেটে পেটে?
কিন্তু এখন কি করবে? দৌড়ে পালাবে নাকি কিছু বলবে বোধগম্য হলো না তার। তড়িৎ ভেজা শরীরে লাল গামছাটা জড়িয়ে নিলো। তখন তাকে বাকহারা করতে মুনতাসীর ইশরায় বোঝাল,
__''জলকেলি খেলা সবে জমে উঠেছিল, থামালে কেন? দেখতে কিন্তু বেশ লাগছিল। দর্শক হিসেবে আমি সন্তুষ্ট!"
অরা হতভম্ব। চোখ বড় বড় তাকিয়ে রইল। একটা ছেলে এতটা অসভ্য হতে পারে? সে আর দাঁড়াল না দৌড়ে নিজের রুমের দিকে ছুটতে শুরু করল। তাকে লজ্জা পেতে দেখে হো হো করে হেসে ফেলল মুনতাসীর। ভীষণ মজাও পেল। তখন নিচে চেঁচামেচি শুনে সেদিকে তাকাল। অরার মা তখন থেকে কিছু খুঁজে বেড়াচ্ছে। বাড়ি বাড়ি জিজ্ঞাসা করে বেড়াচ্ছে কিছু দেখেছে কি না। ভুঁইয়া বাড়িতেও খুঁজতে এলেন। তখন কথা শুনে বোঝা গেল উনার বড় মোরগটা খুজে পাচ্ছেন না। দুপুরের দিকে নাকি এদিকে ইসমাইলকে দেখা গেছে। সে গাঞ্জাখোর। বাড়ি বাড়ি জিনিস চুরি করে গাঞ্জা খায়। উনার মোরগটাও ধরে নিয়ে গেল নাকি কে জানে। কত শখ করে পুষেছিলেন অথচ চোরের পেটেই গেল বোধহয়। মরিয়ম বেগম আক্ষেপ করতে করতে বাড়িতে দিকে চলে গেলে। আর উপর থেকে সব কথা শুনে মুনতাসীর ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে রইল। গলা খাঁকারি দিয়ে এদিক-ওদিক তাকাল। তারমানে ওই হ্যাংলা পাতলা ছেলেটা মোরগ চুরি করতে এসেছিল? আর সে চোরের হাতেই কি না মোরগ তুলে দিয়েছে!
(নোট:- গল্প পড়লে আজকের পর্বে রেসপন্স করবেন নয়তো এই গল্পটা এখানেই সমাপ্ত টানব। পাঠক না পড়লে কার জন্য লিখবো, বলেন?)