#ওরা_তেঁতুল_পাতায়_দুজন
“আমার একটা বাজে স্বভাব আছে। আমি কারো থেকে কষ্ট পেলে যে ভাবেই হোক, যত দেরিই হোক,প্রতিশোধ নিই। নয়তো ঘুমাতে পারিনা রাতে, শরীরে অশান্তি লাগে। আব্বু আম্মুর সাথেও তাই করেছি। এই যেমন দুম করে বিয়ে করে তাদের একা করে দিয়ে চলে এসেছি, বলে এসেছি বছরে দুই ইদ ছাড়া কখনো ও বাড়ীতে পা মাড়াবো না। সে কোনো বড় সর অপরাধ তারা করেনি যদিও। তবে মেডিকেলে এডমিশন হয়নি বলে চ্যালা কাঠ তুলে ক্যালানি বোধহয় একটা এতো বড় মেয়ে ডিজার্ভ করেনা। মেডিকেলের রেজাল্টের দিন পাশের বাসার মিনা কাকি এসে চেগিয়ে চেগিয়ে শুনিয়ে গেলেন তার বোনঝি বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেলে চান্স পেয়েছে। ওসব শুনে আম্মু এলো চ্যালা কাঠ নিয়ে মারতে। এই গেলো এক কাহিনী, সে তো বছর পাঁচেক আগের কথা। তারপর কোনো খানে চান্স না পেয়ে ন্যাশনালে ভর্তি হওয়াটা ছিলো আমার জীবনের কাল বোধহয়। আর তারপর থেকে দিন দিন, প্রতিদিন তাদের ভৎসর্না শুনতে শুনতে ফোর্থ ইয়ার অবধি এলাম। টিউশনি পড়িয়ে কিছুটা লাঘব করলাম তাদের খরচা। কিন্তু তাদের সার্বক্ষণিক কিচকিচ “শেষ তোর ক্যারিয়ার শেষ। তোকে দিয়ে আর কিছু আশা করি না!” অব্যাহত থাকলো।
এসব শুনতে শুনতে আমি দিনকে দিন হয়ে উঠলাম মানসিক রোগী।
আব্বু আম্মু আবার ছিলো আমার ক্যারিয়ারের ভুখা। উঁহু, এটা আমার ইনকাম খাওয়ার জন্য নয়। তাদের আমার ক্যারিয়ার নিয়ে এই পাগলা উৎকণ্ঠা ছিল অন্য একটি কারণে।
তাদের ঐ কিচকিচ যুক্তিযুক্ত না হলেও তাদের আমার ক্যারিয়ার নিয়ে আফসোসের ব্যাপারটা ছিল সমীচিন। ভাই নেই আমার, চার বোনের মধ্যে সবচেয়ে ছোট আমি। বড় আপুদের বিয়ে দিয়েছি সম্ভ্রান্ত পরিবার দেখে। পড়াশোনার পাঠ চুকিয়ে দিয়ে আমাদের মধ্যবিত্ত আব্বু মেয়েদের বিদায় করে ভেবেছিলেন নিশ্চিন্তে থাকবেন। তা আর হয়নি। এই সমাজব্যবস্থায় একজন মধ্যবিত্ত বাবাকে কুত্তার মতো দৌড়াতে হয়েছে,দৌড়াতে হচ্ছে বিবাহিত মেয়েদের সংসার জোড়াতালি দিতে। আপুরা কেউ উচ্চমাধ্যমিকের পরে আর পড়াশোনা করেনি বিধায় কখনো মেরুদন্ড জাগলোইনা তাদের, সংসারে নিজেদের অধিকার নিয়ে কথা বলা তো ছিলো দূরহ ব্যাপার। ওভাবেই যাচ্ছে দিন তাদের, দুই বেলা শ্বশুর বাড়ির লোকের খিচ খেয়ে।
এসব দেখে, এরপর থেকে আব্বু আম্মু আমাকে নিয়ে পরলো। আমাকে নাকি অমুক তমুক বানিয়ে তবেই বিয়ে দেবেন। নিজের পায়ে দাড় না করিয়ে মেয়ে বিয়ে দেয়ার শখ নেই তাদের আর। কিন্তু এবার বাঁধ সাধলাম স্বয়ং আমিই,পদে পদে হতে থাকলাম অসফল। আমার কি দোষ? চেষ্টা তো কম করিনি, দিনে চার ঘন্টা ঘুমিয়েছি কেবল। কোথাও চান্স মেলেনি। দূর্ভাগ্য পিছু না ছাড়লে আমার কি করার?
তাই বলে তো তারা কথায় কথায় আমাকে ঠুশতে পারেন না! ন্যাশনালে ভর্তি হয়ে দুলদুলুনি দোল খাচ্ছি এই বছর পাঁচেক ধরে। তাই বলে ভাতের খোটা দেবে? সব পারিবারিক ঝগড়ার অন্তিম অংশ শেষ হয় আমাকে ভাতের খোটা দেয়ার মাধ্যমে। এটা তো ঠিক না।
তাই রাগে দুঃখে মামার আনা প্রস্তাবটাতে হ্যা করে দিয়েছিলাম সেদিন। গত বছর পাঁচেকে কম সম্বন্ধ আসেনি আমার জন্য। রাম,শাম,যদু,মধু সব এসেছিল। তবে কেবল এই সম্বন্ধটা আমার মোটামুটি পছন্দ হয়েছিল। ছেলে লম্বা, মোটামুটি সুন্দর। আমি ফর্সা হলেও দেখতে আবার একটু খাঁটো তো, আমার আবার লম্বা ছেলে পছন্দ ছিল। আর ওদিকে আবার তাদের খাঁটো মেয়েতে আপত্তি নেই। আমার বরমশাই আমার থেকে ছয় বছরের বড়। পুরোই খাপে খাপ। আগুপিছু না ভেবেই আব্বু আম্মুর কিল-চড়কে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে মামার কাছে গিয়ে বলেছি,“তোমার আনা ঐ তালগাছের মতো লম্বা পাত্রকে আমার পছন্দ হয়েছে মামা। আমাকে বিয়ে দিয়ে দাও। পড়াশোনা, ক্যারিয়ার ,ছাইপাশ,বড্ড ভারি পরছে আমার ওপর।”
পড়াশোনা আসলেই বড্ড ভারি পরেছিল আমার ওপর। আমি হাঁপিয়ে উঠেছিলাম রীতিমতো। রাতের পর রাত ভেবেছি। আমার বয়স চব্বিশে পরলো, আমার বিয়ের বয়স হয়েছে, রাতে শুতে গেলে একাকী বোধ করছি এটা তো সত্যি। আব্বু আম্মু ছাড়াও আমি আরো একজন কাছের ব্যক্তির প্রয়োজন বোধ করছি এটা তো অস্বীকার করা যায়না।
তবে কিসের জন্য এতো অপেক্ষা করছিলাম আমি? পড়াশোনা শেষ করে একটা চাকরি পেয়ে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জন্য? ঠিক কিসের জন্য একটা চাকরি প্রয়োজন আমার? আমি প্রশ্ন করেছি নিজেকে রাতের পর রাত।
এটা জরুরী সব মেয়েদের নিজের পায়ে দাড়াতেই হবে? না,মোটেই নয়। একটি বৈবাহিক সম্পর্কে আমি যদি পার্টনারের থেকে উপযুক্ত সম্মান পাবার আশায় চাকরি করি তাহলে স্ত্রী হিসেবে আমার ভ্যালু কোথায়? আমি কি এই বঙ্গদেশের ছাপোষা গৃহিণীদের দাম কমিয়ে দিলাম না খানিকটা তবে?
আমি তো আমার অ্যাম্বিশন সেট করে নিয়েছি। আমি নিজের পায়ে না, স্বামীর পায়ে দাঁড়াব, না না, একদম কোলে উঠে বসে থাকবো। নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে পা ব্যথা আর করবো না। এটা মোটেই জরুরি নয় যে একটা মেয়ে চাকরি করলেই তার দাম থাকবে শুধু সংসারে। সে হালুম হবে তখন, এছাড়া মিউমিউ করতে হবে।
কেন? যে গিন্নি,সে বুঝি মূল্যহীন? যারা গিন্নি হয়েই জীবন কাটানো চুজ করে নেয় তারা কি দূর্বল? মোটেই নয়!
আমি তো গিন্নি হবো, আমার মনের এ এক জেদ। ঐ পজিশনে থেকেই কেড়ে নেবো আমার সবটুকু অধিকার,পাওনা, সম্মান, আল্লাহ যা যা আমার জন্য বরাদ্দ রেখেছেন সব। পইপই করে হিসেব তুলবো সবকিছুর। আপুরা যা যা কখনো পেরে ওঠেনি নিজেদের সংসারে, আমি ওটাই পেরে দেখাবো, তাও আবার স্বামীর কামাই খেয়ে পায়ের ওপর পা তুলে। নয়তো আমার নাম শর্মিলা নয়। এবং যে যে এই পথে আমাকে নাড়াতে আসবে প্রত্যেককে তাদের উপযুক্ত শাস্তি দেয়া হবে, শর্মিলা কখনো শাস্তি দিতে ভুল করে না মানুষকে।
ওহহ,আজ রাতে ডায়েরীতে আমার বরের ইন্ট্রো দিতে ভুলে গিয়েছি। আমার নাতি নাতনিরা যখন আমার ডায়েরী পড়বে তখন তাদের দাদু/নানুর তথ্য না পেয়ে একটু হতাশ হবে। তাই তাদের জন্য দু’লাইন লিখে গেলাম।
“ভবিষ্যতের নাতি নাতনিরা, তোমাদের দাদু/নানুকে আমার পছন্দ হয়েছে। বিশেষ করে তার স্যালারি টা। আর সে খুব সুন্দর করে হাসে। বিদায়ের সময় গাড়িতে উঠে একটু লোক দেখাতে কেঁদে ছিলাম। সে টিস্যু পেপার এগিয়ে দিয়েছিলো দরদ দেখিয়ে। এই ব্যাপারটাও আমার পছন্দ হয়েছে। আপাতত এটুকুই। আজ রাতটা কাটাতে দাও, তারপর বাকিটা লিখবো। বাসর রাতেই আসলে পুরুষের মুখোশ উন্মোচিত হয়। বুদ্ধিমতীরা একরাতেই ধরে ফেলে তাদের সংসার জীবন কেমন কাটবে। তো বাকিটা কাল লিখবো।”
১২.০৬.১৮
শর্মিলা বিনতে সরোয়ার।
নিজ বাসর ঘর থেকে,
বরিশাল সদর।
ডায়েরীর পাতায় কলম থামিয়ে হাই তুললো শর্মিলা। দুই হাত ভর্তি সোনার চুড়ি গুলো রিনিঝিনি আওয়াজ তুলে সুরের মূর্ছনায় আচ্ছ্বাদিত করছে নিস্তব্ধ কক্ষটা। এ বাড়িতে আজ গোটা সন্ধ্যা সানাই বেজেছে। মোতাহার মিয়ার শুভ বিবাহ সানাইয়ের সুর। ঘন্টাখানেক হলো থেমেছে। শর্মিলা দ্বিতীয় দফায় হাই তুলে উঠে দাঁড়ায়। বর এতো দেরি করে আসছে কেন বাসর ঘরে? বিয়েতে আপত্তি ছিল নাকি? অথচ একসপ্তাহ ফোনে কথা বলে তো তেমন কিছু মনে হয়নি। বরং মনে হয়েছে শর্মিলার প্রতি বেশ আগ্রহ আছে মাহমুদ হাসানের।
শর্মিলার ভাবনা চিন্তা একটু এমন অদ্ভুত। ওর সবকিছুতে “নেগেটিভ” চিন্তাটা চট করে চলে আসে। এটার জন্য ও সবসময় ভারি বিরক্ত নিজের ওপর।
ওর এই হতাশাবাদীতার ভুঁড়ি ভুঁড়ি উদাহরণ আছে ওর জীবনে।
তবে আজ ওর বাসর রাতে, ওর এই ভাবনার লতাপাতা বেশি বাড়তে না দিয়ে ঘরের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলো মাহমুদ। মুখ জুড়ে নির্মল হাঁসি ছেয়ে আছে। নিচে বন্ধুদের বিদায় দিতে দিতেই এতো দেরি, ঘরে ঢুকেই সহজ গলায় বললো,“ওরা যাচ্ছিল না শর্মিলা। স্যরি, তাই লেইট।”
শর্মিলা হাসি হাসি মুখটা দেখে শ্বাস ফেলল, এক গোপন ভার নেমে গেল মন থেকে। যাক, তবে মতেই হয়েছে এ বিয়ে। নয়তো উল্টো পাল্টা হলে শর্মিলার অন্তত ধৈর্য্য হতো না তেলিয়ে তেলিয়ে স্বামীর মন জয় করে সাবিত্রী হয়ে সংসার করার, লাত্থি মেরে পাড়া কেটে চলে যেত সংসারের।
মাহমুদ বেশ ফুরফুরে মেজাজে এসে শর্মিলার মুখোমুখি বসলো। ওর কড়া ম্যান পারফিউমের সুবাসে নাসারন্ধ্র ভরে গেলো শর্মিলার। ফের অল্প হাসতে শর্মিলাও হাসলো।
“টায়ার্ডনেস কেটেছে দেড় ঘণ্টা ঘুমিয়ে? বাপরে! এত সুখী কনে আমি জীবনে দেখিনি। যে একদম বিয়ের গাড়িতেই ঘুমিয়ে পরে। আমার পাড়ার কাকিরা সবাই হাসছিল, বলছিল দুধের বাচ্চা বিয়ে করেছি নাকি আমি।”
শর্মিলা অস্ফুটে জবাব দিলো,
_আপনি জীবনে বুঝি আরো বিয়ে করেছিলেন যে দেখবেন? একটাই তো করলেন,দেখলেন।
শর্মিলার কথায় মাহমুদ জোরে হাসলো,“হাহা, তোমার সেন্স অব হিউমার যদিও তেমন স্ট্রং নয়,তবে কথাটা ফানি লাগলো।”
শর্মিলা লাজুক হাসে। চোখ তুলে মাহমুদকে দেখে। বিয়ে করতে শেরওয়ানি পরে গেলেও এখন একটা পাঞ্জাবি গাঁয়ে। কালো পাঞ্জাবিতে পুরুষকে ভীষণ মানায়। তার বরকে অপূর্ব সুন্দর লাগছে। এই কথাটা চট করে ডায়েরীতে লিখে ফেলতে মন চাচ্ছে তার নাতি নাতনিদের জন্য, তবে ডায়েরী লুকানো অবস্থায় আছে, শর্মিলা ওটা কাউকে দেখায়না।
এ বাড়ির লোকগুলো বোধহয় সব ঘুমিয়ে পরেছে। শর্মিলা কি করবে বুঝতে না পেরে হাত বাড়িয়ে দুধের গ্লাসটা তুলে মাহমুদকে দিয়ে বললো,“পায়ে হাত দিয়ে সালাম করা নাকি উচিত না। আপনি দুধটা খান। আমি আসলে জানিনা কি করবো। এটাই দিতে হয় বোধ হয়।”
মাহমুদ মেয়েটির কথায় হালকা হেসে উঠে, হাত বাড়িয়ে দুধের গ্লাসটা নিয়ে অর্ধেকটা আরেকটা গ্লাসে ঢেলে শর্মিলাকে দিলো। শর্মিলার এই ব্যাপারটাও ভালো লাগলো।
মাহমুদ মুখ হাত ধুয়ে এসে পাঞ্জাবি পাল্টে টিশার্টে শরীর গলিয়ে আবার এসে ওর সম্মুখে বসে শান্ত ভঙ্গিতে। ড্রয়ার খুলে মোহরানার টাকা গুনে শর্মিলার হাতে পরিশোধ করে দিতে দিতে বললো,“আমাকে তোমার পছন্দ হয়েছে শর্মিলা?”
_জি।
শর্মিলার অকপটে জবাব। কোনো জড়তা নেই। মাহমুদ হেসে বলে,“তোমাকেও আমার ভীষণ পছন্দ হয়েছে। ইনফ্যাক্ট অনেক পছন্দ হয়েছে।”
শর্মিলা চোখ নামিয়ে হাসে। মাহমুদ এগিয়ে শর্মিলার কপালে গাঢ় চুম্বন এঁকে দিলো। শর্মিলা লজ্জা পেয়ে কপালে হাত চেপে রাখলো। মাহমুদ ওর থুতনিতে হাত রেখে মুখটা উঁচু করে বললো,“তুমি গাড়িতে যখন তোমার বান্ধবীর কাছে নিচুগলায় জানতে চেয়েছিলে কাঁদতে কাঁদতে তোমার কাজল লেপ্টে গেছে কিনা, তখন তোমাকে অপুর্ব সুন্দর লাগছিল। আমার জন্য যদি কখনো কাজল পরো তাহলে আঙুলের ডগা দিয়ে একটু লেপ্টে নেবে সবসময়। আমার দারুণ লাগবে।”
শর্মিলার বড্ড প্রেমময় লাগলো এই কথাগুলি। ও আপ্লুত ভঙ্গিমায় ঠোঁট চওড়া করে হাসলো। কথাগুলো বলে মাহমুদ হাত রাখলো শর্মিলার দুই কাঁধে, কিছু বুঝে ওঠার আগেই শর্মিলা টের পেলো বালিশে মাথা তার। ওর চোখ দু'টো কোটর থেকে বেড়িয়ে এলো আচমকা।
একি রে! এই মাত্র তো প্রেমিক পুরুষের মত পকর পকর করে কি সুন্দর কথা বলছিল। হঠাৎ করে এমন হলো কেন?
শর্মিলা নড়েচড়ে উঠলো অস্বস্তিতে, ঘাবড়ে যাওয়া কন্ঠে বললো,“মাহমুদ শুনুন আমার সময় চাই একটু!”
মাহমুদ ঝুঁকলো, শরীরের ভার অবশ্য ধরে রেখেছে নিজে,শর্মিলাকে কষ্ট দিচ্ছে না। হালকা গলায় বললো,“এ্যাই কিসের সময়? আমরা স্বামী-স্ত্রী শর্মিলা। বোকা মেয়ে!”
ঘাড়ে চুমু খেলো মাহমুদ, কাঁপল শর্মিলা। ওর একটু রাগ হলো,বলতে চাইলো,“তবুও। একটু সময় কি আমাদের দুজনেরই নেয়া উচিত নয়?”
মাহমুদ শর্মিলার কথাগুলো বাচ্চামি হিসেবে নিয়ে হাসলো, চুমু খেতে খেতে বলল,“ধূর বোকা। এভাবে পারা যায়?”
_মাহমুদ আজ না প্লিজ।
মাহমুদ এবার মস্করার সুর টেনে বলে,“আরে একটা কথা শুনেছো প্রথম রাতেই নাকি বিড়াল মারতে হয়?”
হাসছে মাহমুদ গা দুলিয়ে । শর্মিলা অস্ফুটে বলে,“যতটা মস্করার মনে হচ্ছে ব্যাপারটা মস্করার নয়!”
মাহমুদ এবার ওর দুই বাহুতে আদরের সহিত চাপ প্রয়োগ করে ফিসফিস করলো কানে,
_আজই শর্মিলা। আমাদের বাসর রাত যে। এটা পণ্ড করো না প্লিজ।
মৃদু ধস্তাধস্তি হচ্ছে। শর্মিলা লোকটার এই আচরণকে আদর ভাববে নাকি জবরদস্তি ভাববে বুঝতে পারছে না। তবে ওর বিরক্ত লাগছে। সবাই তবে সত্যি বলে। পুরুষ মানুষ ভীষণ ছ্যাঁচড়া, একদম বিবেকহীন। ও অস্থির গলায় ফিসফিসায়,“মাহমুদ না।”
_প্লিজ।
_না!
_প্লিজ বললাম তো!
শর্মিলা কপাল কুঁচকে শুয়ে থাকে। মাহমুদ ওকে নিবিড় আলিঙ্গনে জড়িয়ে বলে,“তুমি ভীষণ সুন্দর শর্মিলা। আমার প্রত্যাশার থেকেও সুন্দর আমার বৌ। এই রেগেছো নাকি তুমি? আরে আমি তোমার স্বামী।”
শর্মিলা জবাব না দিয়ে বিরক্ত হয়ে চোখ বোজে। তার রাগ উঠেছে তুমুল।
এই যে এতো ভালো চমৎকার লোকটা তাকে এত ফালতু একটা কাজ করে রাগিয়ে দিলো আজ রাতে, এর প্রতিশোধ সে ঠিক কিভাবে নেবে সে সেটাই ভাবছে। শর্মিলা মাহমুদের এই আচরণে একটু কষ্ট পেয়েছে, রেগেছে, তাই মাহমুদকেও ছাড়বে না সে। প্রতিশোধ নেবেই নেবে।
⚫
সকালের আলো ফোঁটার আগেই শর্মিলার চোখ খুললো। বাইরে হৈচৈয়ের আমেজ ঐ অত ভোরেই। খুব সম্ভবত গোরু জবাই হচ্ছে মাঠে। রাতে শর্মিলা শুনেছিল আজ গোরু জবাই হবে, আগামীকাল বৌভাত ওর।
চোখ মুদে নড়েচড়ে উঠতেই শর্মিলা টের পেলো ও মাহমুদের নগ্ন বুকের সাথে লেপ্টে আছে। ওর ঘাড়ে উষ্ণ শ্বাস আছড়ে পরছে মাহমুদের। শর্মিলা পরিস্থিতি টের পেতেই লজ্জা পেলো। চাদর টেনে ঢেকে নিলো নিজের গলা অবধি,পেটের কাছ থেকে শক্ত হাতটা সরিয়ে দিয়ে উঠে বসতে চাইল। মাহমুদ ঘুম ভে’ঙে উঠে বসলো সাথে সাথে। ঘুম কাটেনি তার,হাই তুলে উদগ্রীব হয়ে প্রশ্ন করল,“খিদে পেয়েছে আবার? এনে দেবো কিছু?”
রাতের ঘটনায় গোস্বা কমেনি শর্মিলার। ওর বড্ড অভিমান হয়েছে পুরুষটির ওপর। ও ভুলবে না এটা, ও অনুরোধ করার পরেও স্বামী নামক মানুষটা ওর কথা শোনেনি। কি হতো একটু সময় দিলে? পালিয়ে যেতো শর্মিলা?
রাতে একবার পেট মুচড়ে উঠেছিল শর্মিলার। তখন রাত আনুমানিক আড়াইটা। মাহমুদ গিয়ে চুপিচুপি বাড়ির ফ্রিজ খুলে পুডিং নিয়ে এসেছিল। শর্মিলা রাগ করে ছিল বিধায় খায়নি তা।
ও উঠে দাঁড়াতে চাইলো, দূর্বল শরীরটা ওকে সমর্থন করলো না, হেলে পরলো মাহমুদের বুকে। মাহমুদ আগলে নিলো, নরম গলায় বললো,“ওয়াশরুমে যাবে? হেল্প করবো?”
_ঢং মা’রাচ্ছে এখন!
বিড়বিড় করলো শর্মিলা বিরক্ত ভঙ্গিতে। মাহমুদ শুনলো না স্পষ্ট, মুখ বেজার করে জানতে চাইলো,“কি বললে সোনা?”
_কিছুনা। পারবো আমি যেতে, ছাড়েন।
হাত ছাড়িয়ে শর্মিলা ওয়াশ রুমে গেলো। বেড়িয়ে এসে দেখলো মাহমুদ বিছানা ঝাড়ছে, চাদরে দলিত মথিত হওয়া গোলাপ আর জারভেরা গুলো ঝেড়ে ঝুড়ি ভরছে। শর্মিলা গিয়ে বিছানার একপাশে বসে, মাহমুদ ওর কাছে এসে বলে,“গয়না গুলো কি গাঁয়ে পরে নেবে? এনে দেবো?”
ঘরের চারপাশটায় চোখ বুলায় শর্মিলা। বলে,“ওসব পরে পরবো। আচ্ছা আপনার ঘরের চাবির গোছা নেই?”
_চাবির গোছা?
_হু, আপনার সব প্রয়োজনীয় জিনিস,সব মূল্যবান জিনিস যে লকারে রাখেন তার চাবি,ইভেন এই ঘরের দরজার চাবিও। গোছা নেই?
_চাবির গোছা দিয়ে কি করবে?
_আমার আঁচলে রাখবো। দিন তো ওটা থাকলে দিন।
মাহমুদ একটু অবাক চোখে শর্মিলাকে দেখে উঠলো। ঘরের চাবির গোছা এনে শর্মিলার সামনে ধরতেই খপ করে শর্মিলা নিলো ওটা, আঁচলেও বাঁধল সাথে সাথে। মুখ জুড়ে পরিতৃপ্তির হাঁসি তার। সে তার সংসার জীবনের শুভ উদ্বোধন করে ফেলেছে। আপুদের মতো ভুল তো সে জীবনেও করবে না। পদে পদে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়ে সংসার জয় করতে হবে। পুরুষ যেমন প্রথম রাতেই বিড়াল মারা নীতিতে বিশ্বাসী, শর্মিলাও প্রথম সকালে সংসারের চাবি কাড়া নীতিতে বলীয়ান। সমানে সমান।
মাহমুদ সকালের আলোতে মেয়েটাকে দেখলো মন ভরে। মেকআপ তুলেছে মুখ থেকে অথচ কি স্নিগ্ধ! সকাল বেলা আরো একদফা শর্মিলাকে বুকে টেনে মাহমুদ শুয়ে থাকে। শর্মিলা রাগ রেখেও ঐ বুকে চুপ করে থাকে, পুরুষটাকে রাতে ঐ ফালতু কাজটা করার জন্য কি শাস্তি দেয়া যায় তাই ভাবছে সে। গোটা রাত ভেবেও একটা পন্থা বের করতে পারেনি।
⚫
মাহমুদ একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করে, ছয় সংখ্যার একটা ভালো বেতন পায়, পরিবারের মেজো ছেলে। মোট চার ভাইবোন তারা। এক বোন তিন ভাই। এই বাড়িতে প্রবেশের সাথে সাথেই শর্মিলা টের পেয়ে গেছিলো এই বাড়িতে তার সংসার জীবন অতটা মসৃণ হবে না বোধহয়, কারণ ছিলো তার ঐ ননদ আর বেজারমুখো শাশুড়ি। যার আবার পাঁচ ছয়টা বোন আছে। তিনটা ননদ আছে। ওর বড় জা তৃষ্ণা দেখতে ভীষণ হাবাগোবা মানুষ, শর্মিলার সামনেই কাল থেকে তিনদফা শাশুড়ি,ননদ আর খালা-ফুপু শাশুড়িদের কাছে ধ'ম'ক খেয়েছে কাজের ভুলে। ওসব দেখেই শর্মিলা বুঝতে পারলো ওর ভবিষ্যতে সংসার জীবনের লড়াইটা বেশ হাড্ডাহাড্ডির হতে চলেছে, আপুদের মতো।
ওর বিশ্বাস পোক্ত হলো যখন ওর একমাত্র ননদ খুব সকালে এসে বললো,“ভাবী তোমার গয়নাগুলো মা চেয়েছে। মা তুলে রাখবে সাবধানে। তোমার যখন প্রয়োজন পরবে তখন মায়ের থেকে নিয়ে নিয়ো।”
সকাল বেলা গোসল সেরে মাথায় গামছা পেঁচিয়ে হাই তুলতে তুলতে একগাল হাসলো শর্মিলা। বাড়ির বৌয়ের থেকে বাসরের পরেরদিন গয়না কেড়ে নেওয়া,বাংলা সিনেমার রওশন জামিলের অভিনীত এই দৃশ্যটি অতি পরিচিত শর্মিলার। এমনকি আপুদের সাথেও এটা হয়েছে। তবে শর্মিলা তো শর্মিলা। শর্মিলা শাবানা,সুচন্দা,ববিতা,রোজি আফসার নয়।
সাংসারিক কুটকাচালির এসব পাঠ সে বহু আগে মনে মনে পড়ে ফেলেছে।
মাথা থেকে গামছাটা খুলে নিয়ে ভেজা চুল ঝাড়তে ঝাড়তে নরম গলায় বললো,“গয়না! ও গয়না তো তোমার ভাইয়া নিয়ে নিয়েছে রাখি। তার লকারে রেখেছে। চিন্তা করোনা,হারাবে না, মাকেও চিন্তা করতে বারণ করো। আমার প্রয়োজন পরলে আমি তোমার ভাইয়ার থেকেই নিয়ে নেবো।”
রাখি নামের মেয়েটির শুকিয়ে আমসি হওয়া মুখটা দেখে বিশ্বজয়ের হাসি হাসতে থাকলো শর্মিলা। এই শুরু, এরপর গয়না নিয়ে যে বা যারা কথা শুনাতে আসবে, প্রত্যেকের জন্য উত্তর রেডি করা আছে শর্মিলার।
ওই গয়নাগুলো শর্মিলা বাবা মায়ের থেকে পেয়েছে, আর শুনেছে ওর স্বামীর নিজের টাকার। চাকরির চার বছরের টাকা দিয়ে একটু একটু করে গড়েছে নাকি লোকটা বৌয়ের জন্য। ঐ গয়না নিয়ে চুলুবুলু চলবে না কোনো। শর্মিলা ছেঁড়ে দেওয়ার পাত্রী নয় তবে।
শর্মিলার কথা রাখি গিয়ে মায়ের কানে ঢালতেই মাহমুদের মা আকাশ থেকে পড়ল,মুখে হাত চেপে বললো,“একি কথা! এই মেয়ে তো ডেঞ্জারাস!”
_হু। তোমরা আমার কথা নিলে না তখন। বিয়ের আগে কত বলেছি এই মেয়েকে আমার বড় ভাবীর মতো মক্কেল মনে হয়না। এই মেয়ে চটপটে। আগে আগে দেখো হোতাহে কেয়া।
ভাইয়ার সাথে নাকি চাকরির জায়গায়ও চলে যাবে মা। তোমার ছেলে তো তোমার হাতছাড়া হলো বলে।
বিয়ে বাড়ির ব্যস্ততা তুমুল। সারাদিনের বিয়ের ঝক্কি সামলে ক্লান্ত শর্মিলা। মাহমুদের সাথে সারাদিনে দুইবার দেখা হয়েছে। একবার এসে একটা ওষুধ ধরিয়ে দিয়ে গিয়েছে হাতে। মুখ জুড়ে সে কি হাসি! বৌ পাওয়ার আনন্দ আর ধরছিল না বলে!
আর তারপর দেখা হয়েছিল দুপুরে লাঞ্চের টেবিলে। বৌভাতের অনুষ্ঠানের ঝামেলা সামনে। বাড়ির কর্তা গুলো বড্ড ব্যস্ত। মাহমুদ বড় ভাইয়ের পেছন পেছন দৌড়ে দৌড়ে নিজের রিসিপশনের ঝামেলা বুঝে নিচ্ছে।
গোটা দিন শর্মিলার খারাপ কাটেনি। তার শাশুড়ি বেজারমুখো হলেও উপরে বেশ দায়িত্বশীল আছেন। শর্মিলা ভাবে,গয়না নাই বা দিলো, কখনো কখনো গিয়ে এই শাশুড়ির মাথায় বিলি কেটে দিবে বিকেলে। বরের মা'কে নিজের মা অবশ্যই ভাববে সে। শুধু শর্মিলা কষ্ট পেলে একটু করে শোধ নেবে।
এসব ভাবতে ভাবতে শর্মিলার মাথায় আবার মাহমুদের কথা এলো। ও এখনও বুঝে উঠতে পারছেনা কাল রাতের জন্য লোকটাকে কি শাস্তি দেয়া যায়! শর্মিলার গাঁয়ের শাড়িটা একদম নরম তুলতুলে,এটা নাকি মাহমুদ নিজে কিনেছিলো শর্মিলার জন্য । এই ব্যাপারটা সকালে জায়ের মুখে শুনে শর্মিলা খুশি হয়েছিল ঢের। এজন্য সে ঠিক করেছে শাস্তির মাত্রাটা সে একটু কমাবে! কিন্তু ঠিক কি শাস্তি দিবে ও?
শর্মিলার বড় জায়ের নাম তৃষ্ণা, পেশায় গৃহিণী। বেচারী সারাদিন ঘুরতে ঘুরতে এমন অভ্যাস হয়েছে যে লাটিমের মতোই ঘুরছে শুধু। সন্ধ্যা নাগাদ শর্মিলার কক্ষে এসে জানতে চাইলো কিছু লাগবে কিনা।
শর্মিলা কেবল মাগরিবের নামাজ পরে উঠেছিল। হাত টেনে বসিয়ে দিল বড় জা’কে। বললো,“আমি এসে থেকে দেখছি আপনি লাটিমের মতো ঘুরছেন, একটু জিরিয়ে নিননা।”
_কি যে বলো, বাড়িতে এতো বড় অনুষ্ঠান। আমি জিরোবো?
_তো? সব দায়িত্ব তো আপনার ওপর না। আপনার মতো সবাই এই বাড়ির সদস্য। ভাগে ভাগে করুননা সব। নতুন বৌ হিসাবে আমাকে যে ট্রিটমেন্ট দিতে চান তা গিয়ে আমার ননদকে বলুননা দিতে, আপনি একটু বসেন।
হা করে তাকিয়ে আছে তৃষ্ণা শর্মিলার মুখের দিকে। কি স্পষ্ট কথা বলে এই মেয়ে! বাপরে!
তৃষ্ণা আবার একটু বেশিই সরল, আশেপাশে তাকিয়ে একদফা ঢোক গিলে বললো,“নতুন তো তুমি। কিন্তু আমি তো পুরাতন। আর বাড়ির বৌ যত পুরাতন হয় তত বেশি হালকা হয়। নিজের ওজন বোঝাতে কাজে ব্যস্ত রাখি নিজ ইচ্ছায়। নয়তো সবাই ভাবে বাড়িতে কাজ করি না। তোমার ভাসুরের কান ভাঙায়। এ নিয়ে যে কত ঝামেলা পোহাই! তুমি তো নতুন, পুরনো হও। তখন বুঝবে।”
শর্মিলা হাসে,বলে,“কিভাবে কান ভাঙায়? আপনার স্বামী কি চোখে দেখে না?”
_সে তো আর সবসময় বাড়িতে থাকেনা। তারা যা বলে তাই বিশ্বাস করে। আমি আবার অত বানিয়ে বানিয়ে মিথ্যা বলতে পারিনা মানুষের মতো। আমি একটু কথা বলতে গেলেই পেঁচিয়ে পরি।
শর্মিলা সবটা শুনে মৃদু হাসলো,
_আচ্ছা ঠিক আছে আমি আপনাকে আজ একটা বুদ্ধি শিখিয়ে দিচ্ছি। এতে করে আপনাকে বেশি কথা বলতে হবে না,অথচ সব বলা হয়ে যাবে।
_কি বুদ্ধি?
তৃষ্ণার চোখজোড়া বড় বড় হলো,
শর্মিলা বললো,
_এরপর থেকে ভাইয়া বাড়িতে এলে তারা যে কয়বার বলবে আপনি কাজ করেন না, সেসব গুনে রেখে আপনি দ্বিগুণ সময় ভাইয়ার কাছে গিয়ে বলবেন আজ সারাদিন কি কি করেছেন কেমন?
তৃষ্ণা ভারি অবাক হয়। এই মেয়েটা একটু চটপটে তা একে দেখতে যাওয়ার দিনই টের পেয়েছিল তৃষ্ণা। ওর শ্বশুর বাড়ির লোক তো বেকেই বসেছিল বিয়েতে, অনার্সে পড়ুয়া মেয়েকে বৌ করবেন না,তাদের আরো কচি মেয়ে চাই। নেহাত দেবরের পছন্দ ছিল প্রচুর, বিধায় মানতে হলো।
শর্মিলা একটু ঝুঁকে বলে,“একটা ডেমো দেখাই?”
তৃষ্ণা মাথা নাড়ায়। শর্মিলা ফিসফিসিয়ে বলে,“ভাইয়াকে দেখলাম বাইরে ঘুরঘুর করছে। আপনি গিয়ে দুইহাতে রান্নার তেল মেখে বার কয়েক ভাইয়ার সামনে গিয়ে বলেন,“শুনছেন আমার হাত আটকা। একটু পানি খাইয়ে দিননা। বাড়ির সবাই দেখছি হাসি আড্ডায় ব্যস্ত। তাদের আর বিরক্ত না করি। আপনিই পানি খাইয়ে দিন।”
এমন করে তিন-চার বার হাতে এটা সেটা মেখে ভাইয়ার কাছে পানি খেতে যাবেন আর এই একই ডায়লোগ কপচাবেন।”
তৃষ্ণা চোখ বড় বড় করে বললো,“এতে কি হবে?”
_এতে করে দুই কাজ হবে। এক, ভাইয়া দেখবে আপনি কত কাজ করছেন, দুই ভাইয়া জেনে যাবে তার বাড়ির লোক হাসি আড্ডায় ব্যস্ত থাকে।
ভয়ংকর বুদ্ধি। তৃষ্ণা ঘামছে, এটা ভেবে,তাদের নতুন বৌ ভয়ংকর বুদ্ধি ধারী মেয়ে। ওর ঘাবড়ে যাওয়া মুখ দেখে শর্মিলা হোহো করে হাসে,“বুদ্ধিটা দারুণ না? এমন ছোটো ছোটো বুদ্ধি নিয়ে আমি আপনার পাশে থাকবো,যদি আপনি আমার পাশে থাকেন। যান গিয়ে এখন পানি খান, আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে আপনার আসলেই তৃষ্ণা পেয়েছে।”
তৃষ্ণা মাথা নেড়ে চলে যেতেই শর্মিলা আঁচলের চাবিটা নাড়াতে নাড়াতে হাসলো, নিজের বুদ্ধি দেখে নিজেই মুগ্ধ ও। সংসারে পা রাখতে না রাখতেই মাথা খুলছে। কি দারুণ ব্যাপার। একদিন বরের ওপর অ্যাপ্লাই করে দেখবে ব্যাপারটা, যদি ওর ননদ এমন অমন করতে আসে তবেই। নয়তো শর্মিলা আবার আগ বাড়িয়ে কারো সাথে লাগতে যায়না। শর্মিলা কেবল কষ্ট পেলেই তবেই শাস্তি দেয়, প্রতিশোধ নেয়।
সন্ধ্যায় বাড়িটা ফাঁকা হলো,মেহমানরা বিদায় নিলো। মাহমুদ আর তার ভাইয়েরা বাড়িতে ফিরেছে কেটরিং অফিস থেকে,বাইরের সব ঝামেলা সামলে। দুই হাত ভর্তি বাজার তাদের।
বাড়ির পুরুষেরা বাড়িতে ফেরার পথে এটাসেটা অনেক খাবার নিয়ে আসে। এতো বড় একান্নবর্তী সংসার, সবাই হুমড়ে পরে ওসবের ওপর।
শর্মিলা নতুন বৌ, তাকে ডাকলেও খেতে যেতে পারেনা লজ্জায়। দোতলায় করিডোরে পায়চারি করছিল শুধু। সময় গড়াতেই হঠাৎ হাতে টান খেলো, খুব শক্ত করে মাহমুদ ধরেছে ওর কব্জি। টানতে টানতে কক্ষে নিয়ে দরজা ভেজিয়ে দিতেই শর্মিলা কপাল কুঁচকে নেয়।
কি ব্যাপার? আবার এই ভর সন্ধ্যায় বিড়াল মারার মতলব নাকি এই লোকের? শর্মিলা এবার ঠিক করলো সে হাতে কলমে শাস্তি দেবে তবে, একটা কামড় অথবা খামচি দেবেই দেবে এর গালে যদি এই ভর সন্ধ্যায় এশার নামাজের আগে এই অধৈর্য লোক জ্বালাতন করতে আসে শর্মিলাকে।
মাহমুদ জ্বালাতন করতে আসেনি। পেছন থেকে ডানহাতটা সামনে এনে একটা প্যাকেট শর্মিলার হাতে তুলে দিয়ে বলে, রীতিমত ফিসফিসিয়ে,“এই বাড়িটা না আজীবন এমন বড় ছিল শর্মিলা। বাড়িতে কোনো খাবার এলে ঠিক সময়ে উপস্থিত না হলে ভাগে পেতাম না। তুমিও পাবে না। এইটা এইখানে বসে খাও। কাউকে দেখিয়ো না। বার্গার আছে। স্টেক আর কোল্ডড্রিংকসও। শোনো এসব খেয়ে আবার কাউকে বোলোনা তোমার পেট ভরা, রাতে গিয়ে দুমুঠো খেয়ে চলে আসবে টেবিল থেকে । একটু বুদ্ধি করে চলো কেমন?”
শর্মিলা কিছুক্ষণ চেয়ে রইল মাহমুদের মুখটার দিকে। ও টের পেলো লোকটার ওপর গতকাল রাতের সব রাগ ধীরে ধীরে জ্বল হয়ে নামছে তার। প্রতিশোধ নেয়ার আর ইচ্ছে নেই, বরং লোকটাকে একটু আদর করে দিতে মনে চাইছে। আজ রাতে সেও একটু করে দেবে নাকি?
বেশ মজার তো সংসার টা। ঐ শাশুড়ি ননদ বোধহয় অত ভারি হবে না শর্মিলার ওপর, হলেও বাইরেটা সে সামলে নেবে । আর ভেতরটা, এইলোক যদি এমন বার্গার এনে সামলে দেয় তবে তো জমে যাবে পুরো! শর্মিলার ঠোঁটে হাসি ফোটে।
মাহমুদ ভাবুক শর্মিলাকে নাড়া দিয়ে বললো,“অ্যাই,কি হলো?”
শর্মিলা চোখ নামিয়ে হাসলো,বার্গার বের করে দুইভাগ করে একভাগ মাহমুদের দিকে বাড়িয়ে ধরে বললো,“জি সবসময় বুদ্ধি করে চলবো।”
“সমাপ্ত”