ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রাপ্তন

১ম পর্ব

লেখক: ইসরাত ইতি

সেপ্টেম্বরের ১৩ তারিখ। আওয়ামী স্বৈরাচার পতনের ঠিক মাসখানেক কেটে গিয়েছে। বাতাস থেকে ততদিনে নিস্পৃহ রক্তক্ষয়ী বিপ্লবের দামামা-আতঙ্ক! মধ্য ঢাকার ধোয়াটে বাতাসে বিস্ময়কয় উল্লাস আর অনিবার্য প্রত্যাবর্তনের প্রতিধ্বনি দাপিয়ে বেড়াচ্ছে সকাল থেকে সন্ধ্যা। জনজীবন থমকে ছিল যা, নতুন আগমনী দিনের বার্তা নিয়ে চলতে শুরু করেছে ধীরে ধীরে।

বাইরের আবহাওয়া আজ বিশেষ ভালো নেই। সকাল থেকে ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি পরছে, ঠান্ডা ঠান্ডা চারপাশ। হাফসা নুন হলুদ গোলাতে মাঝারি সাইজের ইলিশের পিস চুবিয়ে প্যানের তেলে ছেড়ে দিয়ে সতর্ক ভঙ্গিতে তাকিয়ে আছে। মাহদীর জন্য ইলিশ মাছটা খুব যত্ন করে ভাঁজতে হয়। টাটকা ভাজা, মুচমুচে তবে খুব বেশি দাগ লাগানো যাবে না। মাছ ভেজে কালাভুনা রেঁধে ফেলতে হবে, ভুনা খিচুড়ির সাথে মাহদী এই সমস্ত আইটেম পছন্দ করে। হাফসারও ধৈর্য্য অঢেল।

রান্নাঘর থেকে হাঁড়িপাতিল স্থানান্তরিত হবার ধুন্ধুমার শব্দে তন্ময়ের বুক ঢিপঢিপ করছে। ও ভাবছে মায়ের মেজাজ পরেনি তখন এক চড় মেরে। আবার যদি এসে পিঠে দুই ঘা লাগিয়ে দেয় তবে তন্ময়কে বাঁচানোর কেউ থাকবে না। আব্বু অফিসে, আসবে লাঞ্চে। আব্বু আসার আগেই হয়তো তন্ময় একবার ভর্তা হবে। সেই উৎকণ্ঠার চাপে ও দ্রুত দ্রুত নিজের ব্যাগ গুছিয়ে নিচ্ছে।

তন্ময়ের স্কুল না খুললেও তার টিউশন মিস আজ ডেকেছে। তন্ময়ের মুখ ভার তাই, ভারমুখেই পুরনো রুটিং ঘেঁটে প্রয়োজনীয় সব বই গুছিয়ে ব্যাগে ভরছে। খাটের নিচ খুঁজে ছেঁড়া সিলেবাসটা তুলে ময়লা ঝারছে।

বসার ঘরের টিভিটা অকারণে চালু করে রাখা। চ্যানেল টুইন্টি ফোর দেয়া তাতে। অথচ বাড়িতে সারাক্ষণ খবর দেখার মানুষটা নেই,সে অফিসে। ওটা নিশ্চয়ই ছোটোনের কাজ, রিমোট পেলেই টিপে টিপে সর্বনাশ করে ফেলে দেড় বছরের ছেলেটা। হাফসা রান্নাঘর থেকে বিরক্ত গলায় ডাকলো তন্ময়কে,“তন্ময় টিভিটা অফ করে দাও আর তিথি আপুকে গিয়ে স্যরি বলো এক্ষুনি নয়তো আরো এক ঘা পরবে তোমার পিঠে। ছোটোনের ডায়পার হেভি হয়েছে কিনা সেটাও চেক করো।”

কলটা বেজে উঠল ফোনের। দুই হাত কিচেন এপ্রোনে মুছে নিয়ে হাফসা কল রিসিভ করলো মায়ের। তন্ময়ের নানী কুশল জানতে চাইলে বিরক্ত হয়ে বলল,“একটাবার এসে ক'দিন থাকতে তো পারো না। তিনটা বাচ্চা সামলাতে গিয়ে আমার সব হাওয়া বেড়িয়ে গেছে। এখন আর কেমন আছি জানতে চেয়ো না।”

তন্ময়ের নানী হোসনা হাসলো একগাল, বললো,“বেশি জ্বালায় কে?”

_কে আবার! ছেলে দু'টো। তিথি মা আমার ভারি ভালো। এতোটাই ভদ্র যে ভাইয়ের হাতে মার খেয়ে রুমে ঢুকে কাঁদছে মুখ বুজে, তবুও পাল্টা আঘাত করেনি ভাইকে।

_সেকি! তন্ময় এসব করে? আচ্ছা মাহদী ওকে কিছু বলে না?

এইবার ছোট করে শ্বাস ফেললো হাফসা, একটু ঘাবড়েছে মুখটা। আস্তে করে বললো,“হয়তো আমার মুখের দিকে তাকিয়ে কিছু বলেনা। তন্ময় আসলেই বড্ড বিরক্ত করে ওকে। তবে ও-ই তো লাই দেয়। আমি ভীষণ শাসন করি! আমাকে করতে দেয়না।”

হোসনা জানতে চাইলো,“এমনিতে ভাইবোনে মিল আছে?”

_হ্যা হ্যা তা আছে। তন্ময় তিথিকে ভীষণ পছন্দও করে। আপুর জন্য স্কুল থেকে ফেরার পথে আইসক্রিম,আচার,এটা সেটা আনে। খেতে বসলে সব ভাগাভাগি করে খায়। মাঝে মাঝে মাথার তারটা একটু ছিঁড়ে যায় আর কি! আচ্ছা, ঐ দেখো ছোটোজন আবার কোথায় গেলো দেখতে হবে। আচ্ছা মা রাখি,বিকেলে ফ্রি হয়ে কল করবো।

_হ্যা রাখো। আর শোনো!

_হুম মা?

_একটু মানিয়ে গুছিয়ে থাকো কেমন? মাহদী ছেলেটা ভীষণ ভালো। একটু ওর মনের মতো মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করো। ও যেভাবে তন্ময়কে নিজের ছেলের মতো ভালোবাসা দিচ্ছে এটা এই যুগে কেউ করে না। তুমিও তিথিকে নিজের মেয়ের মতো দেখো, দেখবে ভালো থাকবে। মাহদী যেমন চায় নিজেকে তেমন বানাও। ও ইসলামিক মাইন্ডেড। এটা জেনেই কিন্তু ওর সাথে নিজের জীবন জুড়েছো মা। স্বামী ভালোর জন্য কিছু বললে তার সাথে তর্ক করতে নেই। তুমি দু'টো পুরুষ দেখেছো জীবনে। সবাই তো এক হবে না। অনিকেত এককরম ছিল,মাহদী এককরম। এটা বুঝতে হবে।

_মা বুঝি বলেই তো আমি মাহিমকে জন্ম দেওয়ার সিদ্ধান্তটা নিয়েছি। মাহদীর সন্তান পেটে ধরার মতো গুরুতর সিদ্ধান্ত আমার খেয়াল খুশির ছিল না। আমার আজীবন ওর সাথে কাটানোর ইচ্ছেতেই হয়েছে। তুমি চিন্তা করো না। আমি বারবার মানুষ হারাতে চাইনা।

কল কেটে একটা শুকনো ঢোক গিলে হাফসা জানালার বাইরেটা একবার দেখে। বৃষ্টির বেগ বাড়ছে ক্রমে ক্রমে। ব্যস্ত হাত দুটো থামাবার যো নেই ওর,হাফসা চুলায় মাহদীর পছন্দের কালা ভুনা চড়িয়ে দিয়ে ভাবছে ওর মানিয়ে নেওয়ার কথা।

মা যে কেনো অকারণে দুশ্চিন্তা করে তা হাফসা বোঝে না। হ্যা অনিকেতকে হাফসা পাগলের মতো ভালোবাসাতো, কিন্তু মাহদী তো এখন ওর স্বামী। ওর স্বামীর সাথে আর যাই হোক “মানিয়ে নেওয়ার মতো” শক্ত গোলমেলে ব্যাপার ওর রয়নি। ও মাহদীকে মন থেকে ভালোবেসেছে।

২০১৪ সালে ছোট্ট তন্ময়কে রেখে অনিকেতের হঠাৎ নিখোঁজ হওয়া, একটার পর একটা টানাপোড়েনে যখন জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল, তখন মাহদী হাসান নামের এক কৃষি কর্মকর্তার সাথে হাফসার দেখা হয়। এটা ২০২১ সালের ঘটনা। অনিকেত হারিয়ে যাওয়ার সাত বছর পরে। মাহদী ছিল বিপত্নীক, তিথি ওর আগের ঘরের মেয়ে। তন্ময়ের থেকে এক বছরের বড়। দু'জনে একই স্কুলে পড়তো।

অনিকেত নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার পরে জীবনটা ভীষণ সংগ্রামে কেটেছে হাফসার। সুন্দরী মধ্যবয়সী নারী সে। বয়স আঠাশ ঊনত্রিশ। ওর সংগ্রামী চালচলন দেখে ঘটনাচক্রে ভালো লেগে যায় মাহদীর। নিজেই আগ বাড়িয়ে পারিবারিকভাবে প্রস্তাব দেয়। হাফসা মোটেই রাজি ছিল না শুরুতে। কিন্তু ধীরে ধীরে বাস্তবতার প্ররোচনায় ও আর না করেনি, বিয়েটা করে নিয়েছে যখন দেখেছে ওর বাবা হারা ছেলেটার জন্য মাহদী হাসান নামের ভদ্রলোক এক চমৎকার অভিভাবক হতেও পারে। অন্তত লোকটার উপস্থিতি সবসময় সেটাই জানান দিতো হাফসাকে।

আজ হাফসা,মাহদী হাসানের বৌ। নিজেও হয়ে উঠেছে তিথির আম্মু। মাহদীর সাথে মিলিত হয়ে জন্ম দিয়েছে আরেকটি প্রান। যার বছর দেড়েক বয়স হলো এখন। গা দুলিয়ে অল্পস্বল্প হাঁটে। পাঁচ জনের নির্ঝঞ্ঝাট সংসারটা বেশ শান্তিময়। এ যাবত পর্যন্ত মাহদীর সাথে ওর কখনো মত বিচ্যুতি ঘটেনি কোনো ব্যাপারে, তর্ক তো দূর! তবে সেদিন মাহদী ওর বেপর্দায় চলাফেরা নিয়ে একটু কড়া শাসন করেছে। হাফসা হিজাব পরলেও বাইরে বোরখা পরতো না। এখন থেকে হাত মোজা আর পা মোজাও পরতে হবে। মাহদী স্বপরিবারে হজ্বে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে ইদানিং। তাই এই আদেশ। এটা নিয়ে ওদের মাঝে ঝামেলা বিশেষ হয়নি। আসলে যত দিন যাচ্ছে,ও বুঝতে পারছে মাহদী ওকে নিজের জীবনের সাথে কি পোক্ত করে জুড়ছে, হাফসা যেন মাহদীর অবিচ্ছেদ্য কেউ। মাহদীর স্বামী সুলভ আচরণ,শাসন সবসময় সেই বার্তা দেয়। হাফসাও হাসিহাসি সব মেনে নেয়। জীবনে আর কি আছে তার এই মানুষগুলো ছাড়া এখন?

বৃষ্টি পরলেও ছয়তলায় ভ্যাপসা গরম দিচ্ছে এখন। হাফসা জানালা গুলো খুলে দেয় ভাবনারাজ্য থেকে মাটিতে পা রেখে। রান্নাটা সবে শেষ হলো। এখনো কাজের শেষ নেই। তিথিকে শ্যাম্পু করিয়ে গোসল করিয়ে দিতে হবে। এগারো বছর বয়স হলেও মেয়েটা একটা বাচ্চাই। বাবার আদরের ছিলো যে। হাফসাও তাই আদর দেয়।

এরপর মাহিমকে সেরেলাক খাওয়াতে হবে। তন্ময়ের জামাকাপড় ধুতে হবে। টেবিলে খাবার সাজাতে হবে। মাহদী চলে আসবে এক্ষুনি। দু হাতের গতি দুর্বার,তেমনি দু পায়ের। এজন্যই ইদানিং হাফসা ডায়েট ফলো না করেই স্লিম।

ঠিক এমন সময় বসার ঘর থেকে চিল্লিয়ে উঠলো তন্ময়। কলিং বেলটাও বাজলো ঠিক একই সময়। বুকটা ধ্বক করে উঠলো হাফসার। মাহিম ব্যাথা পেলো কিনা সেই দুশ্চিন্তায় ছুটে গিয়ে যখন বসার ঘরে দাঁড়াল,দেখলো তন্ময়ের মুখটা অস্বাভাবিক লাল, ঘেমে নেয়ে একাকার ছেলেটা। ছুটে গিয়ে আগে সদর দরজা খুললো। অস্থির শ্বাস ফেলে কিছু বলতে চাইছে হাফসাকে, পারছে না। শুধু হাত বাড়িয়ে টিভি দেখালো।

মাহদী বৃষ্টি মাথায় নিয়ে এসেছিল। সেও ভারি বিস্মিত, ব্যগ্র কদমে ঘরে ঢুকে তাকালো টিভির দিকে। হাফসা ন্যানো সেকেন্ড আগেই কথা হারিয়েছে। মধ্যবয়সী ফ্যাকাশে চোখ দু'টো টিভির পর্দায় আটকা। আর শরীর মাটিতে মিশবে বলে প্রস্তুতি নিচ্ছে।

ওদিকে নিউজপ্রেজেন্টার গড়গড় করে পড়েই যাচ্ছে,“আজ একই সাথে আয়নাঘর থেকে সাতজন মুক্ত হলো। এর মাঝে সাংবাদিক অনিকেত দেওয়ান রয়েছেন যিনি দুই হাজার চৌদ্দ সালে আওয়ামী সরকারের বিরুদ্ধে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করার মাসখানেক পরে নিখোঁজ হয়েছিলেন বলে তথ্য রয়েছে।”

নিউজ প্রেজেন্টারের কন্ঠ যান্ত্রিক। খবরটা শেষ হতেই স্ক্রিনে একটি ভিডিও ফুটেজ দেখা গেলো। দুই গাল ভর্তি দাড়ি নিয়ে জীর্ণশীর্ণ কজন পুরুষ লোক ক্যামেরার সামনে। চারদিকে ঘেরা রিপোর্টার ও আর্মির লোক। হাফসা তাকিয়ে আছে। অতগুলো লোকের মাঝে পাগল পাগল বেশে অনিকেত দেওয়ান মানুষটাকে চিনতে মোটেও ভুল হলো না তার। যদিও সময়টা প্রায় দশ বছরের। হাফসার একটুও চিনতে ভুল হলো না অনিকেতকে। সেই সুঠাম অনিকেত, জাহাঙ্গীর নগর ইউনিভার্সিটির জার্নালিজম বিভাগের অনিকেত দেওয়ান। দুঃসাহসী আর দুরন্ত মানুষটাকে। যার প্রেমে বাংলা বিভাগের হাফসা এককালে পাগল হয়েছিল, বিয়ে করেছিল, যার বাচ্চা নিয়েছিল নিজের গর্ভে, যার নিখোঁজ হবার পরে নিজের নাওয়া খাওয়া ভুলে আত্মহত্যা করে নিচ্ছিল হাফসা। হাফসা মোটেও ভুল করেনি তাকে চিনতে।

মাহদীর স্থির চোখ দুটোতে কোনো প্রতিক্রিয়া নেই, ও শুধু হাফসার দিকে ঘাড় বাঁকিয়ে তাকালো একপলক। ততক্ষণে তন্ময় ঘর কাঁপিয়ে চিল্লিয়ে উঠলো,“আম্মু বাবা। আম্মু ওটা আমার বাবা। আমি চিনি। দেখো ওটা আমার বাবা।”

হাফসা নির্লিপ্ত। মাহদী কিছুই বলছে না। শুধু কিছু একটা আন্দাজ করতে পেরে দ্রুত বাড়াল হাত। ততক্ষণে হাফসা মূর্ছা গিয়ে তার বুকেই পরেছে। রক্ত সরে কাগজের মতো সাদা হয়েছে মধ্যবয়সী রূপসী মুখটা।

_____

বাড়িটা হাফসার মায়ের। অনিকেত জীবনে বহুবার এ বাড়িতে এলেও আজকে গেটে পা রাখতেই ভীষণ অস্বস্তি হচ্ছে তার। শক্তি পাচ্ছে না সে। কিংবা সে নিজেই জোর দিচ্ছে না পায়ে। অনিকেত মাথা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে আশপাশটা দেখতে দেখতে হঠাৎ বিড়বিড় করে বললো,“এইখানে একটা জারুল গাছ ছিল, খুব মোটা একটা গাছ।”

মাহদী নিস্পন্দ চোখে এতক্ষণ জীর্ণ শীর্ণ লম্বা পুরুষ লোকটাকে পর্যবেক্ষণ করছিল। সাংবাদিক হিসেবে আগে চিনতো যদিও, নিজের স্ত্রীর প্রাক্তন এখন। কথাটা ভাবতেই মাহদীর অদ্ভুত লাগছে! সে জবাব দিলো,“ওটা বছর দেড়েক আগে আম্মা কাটিয়েছেন।”

“আম্মা!”

সম্বোধনটা শুনে অনিকেত একটু চমকাল। পরপর চোখ নামিয়ে নিজের আবেগ সংবরণ করে বললো,“তন্ময়কে ডেকে দিবেন?”

তন্ময়কে ডাকতে হলো না। সে দু চোখে অবাক বিস্ময় নিয়ে বাবার অপেক্ষাতেই ছিল নানীর ঘরের খোলা বারান্দায় দাঁড়িয়ে। মা যদিও শিখিয়ে দিয়েছে,তবে তন্ময় না শেখালেও ছুটে গিয়ে বাবাকে ধরতোই। তন্ময় ছোটো হলেও এতটুকু বুঝ তার আছে।

অনিকেত নিজের ছেলেকে বুকের মাঝখানে ঢুকিয়ে নিলো,বের করলো, চুমু খেলো। পাগলের মতো কাঁদল।

এই অভূতপূর্ব মিলন পর্বের স্বাক্ষী কেবল ওরা চারজন। আর বিশেষ কাউকে এ বাড়িতে ডাকা হয়নি আজ। বিষয়টা সম্পূর্ণ পারিবারিক তাই। অনিকেত ছেলেকে কোলে চেপে দাঁড়িয়ে থাকে। মাহদী নরম গলায় বলে,“ভেতরে আসুন। আমরা বসে কথা বলি!”

_হাফসা?

নামটা উচ্চারণ করেও অনিকেত থতমত খেলো যখন দেখলো ওর সামনে দাঁড়ানো মাহদী নামের মানুষটাও ভারি অপ্রস্তুত। অনিকেত নিজেকে শুধরে আবার বললো,“তন্ময়ের মা?”

_আছে সে ভেতরে। আপনি বসুন। তন্ময়,বাবা তুমি তোমার নানীর কাছে যাও।

অনিকেত বিব্রত ভঙ্গিতে বলল,“ইয়ে মানে, সন্ধ্যা হয়ে আসছে। আজ যমুনা টিভিতে একটা ইন্টারভিউয়ের আমন্ত্রণ আছে আমার। যদি ওর মাকে ডেকে দিতেন তো কিছু জরুরি কথা বলেই চলে যেতাম, যদি কিছু মনে না করেন তো।”

বলতে বলতে গলা ধরে এলো অনিকেতের। ও বুঝতে দিলো না সেটা, তুমুল প্রচেষ্টা চলছে নিজের কন্ঠ স্বাভাবিক রাখার।

বসার ঘরের মাঝবরাবর শিফনের পর্দা দেয়া। মাহদী ওকে পর্দার একপাশে একটি সোফাতে বসতে দিয়ে আমতা আমতা করে বলল,“আসলে হাফসা ইদানিং পুরুষ লোককে দেখা দেয়না তো…..আপনি বসুন, আনছি ওকে।”

অনিকেত মাথা নুইয়ে বসে আছে। ধীরে ধীরে ওর সম্মুখে এসে দাঁড়ায় একজোড়া ছোটো খাটো পা, মোজায় আবৃত। পর্দাটা মেঝে অবধি ছিলো না বিধায় খুব সহজেই নজরে পরেছে অনিকেতের। ওটা দেখা মাত্রই হঠাৎ করে ওর দৃশ্যপটে ভেসে উঠলো একজোড়া শ্বেতপদ্ম পা। কত রাতে,কত চূড়ান্ত আদরের সময়টিতে অনিকেত ওই পা জোড়ায় চুমু খেতে গিয়ে হাফসার ধমক খেয়েছে। কিন্তু অনিকেত শুনতো না। হাফসার পা দু'টো ছিল তার ভীষণ পছন্দের।

আজ সেই পা জোড়া কালো মোজায় আবৃত এবং অনিকেত পরপুরুষ। পরপুরুষ হয়ে এসব নিষিদ্ধ বিষয় কল্পনায় এনে ও নিজে নিজেকে চাটি মারে মনে মনে।

ওপাশে পরস্ত্রী চেয়ারে বসলো, পরস্ত্রী হয়তো নিশ্চুপে কাঁদছে। অনিকেত বুঝলো। কিন্তু ওর এখন কোনো ভাবলেশ নেই। যান্ত্রিক গলায় পরস্ত্রীকে বললো,“তন্ময়ের অভিভাবকত্ব আমি নিতে চাইছি। ওকে আমি আমার কাছে নেবো। তুমি খুশি খুশি এই অনুমতি দিলে আমি কৃতজ্ঞ থাকব।”

হাফসা কথা বলতে পারছে না। মুখটা নিকাবে আবৃত। নিশ্চুপে গড়িয়ে পরা নোনাজলে ভিজে গিয়েছে নিকাব। অনিকেত আবার বললো,“ওর দেখভাল করার জন্য আমি জনাব মাহদী হাসান এবং তোমার প্রতি অসম্ভব কৃতজ্ঞ। আমি তোমাদের কিছু উপহার দিতে চাই দু'জনকে।”

এ পর্যায়ে হাফসা হঠাৎ ছটফটিয়ে উঠলো, পাশে মাহদী বসে আছে। হাফসা অনিকেতকে উদ্দেশ্য করে বললো,“তুমি এসে থেকে কোনো মেডিক্যাল চেকআপ করিয়েছো? তুমি দুপুরে খেয়েছো?”

অনিকেত নির্বিকার। হাফসা ততটাই অস্থির। আবার যখন ওর পাশে বসা মাহদীর শুকনো মুখটা দেখলো, দমে গেলো,নিভে গিয়ে চোখ মুছলো।

এ পর্যায়ে অনিকেত হঠাৎ বললো,“এই আট বছরে তুমি কি বুড়িয়ে গিয়েছো হাফসা?”

হাফসা আর নিজেকে আটকাতে পারলো না। খেই হারিয়ে,দিক হারিয়ে টান মেরে সামনে থেকে পর্দা সরিয়ে টেনে খুললো নিজের নিকাব। অনিকেত তাকিয়ে আছে নিস্প্রভ। হাফসার চোখ আবার বাঁধভাঙা, হাফসার কন্ঠ ভেজা, বললো,“তুমি কি আমাকে ঘৃণা করবে অনিকেত?”

অনিকেত ঠান্ডা গলায় বলল,“কেন?”

_আমি অনেকটা এগিয়ে গিয়েছি তাই!

বুকে হাত চেপে কাঁদছে হাফসা। অনিকেত শুকনো হেসে বলল,“সমস্যা নেই,আমিও চলতে শুরু করব। তোমার আর জনাব মাহদীর ছেলেটা ভীষণ মিষ্টি দেখতে। ওর জন্যও একটা উপহার পাঠাবো, নিয়ো।”

_অনিকেত আমি তোমাকে বিয়ে করাবো। অনেক ভালো মেয়ে এনে দেবো, তোমাকে ভালো রাখবে।

এ পর্যায়ে বাচ্চাদের মতো হাত পা ছুড়ে কাঁদতে শুরু করে দেয় হাফসা। মাহদী অবস্থা বেগতিক দেখে দু'হাতে ওকে আগলে ধরে শান্ত করতে চায়। অনিকেত দ্রুত চোখ নামায়। পরপর হাফসার কথায় কোনো জবাব না দিয়ে তাড়াহুড়ো করে উঠে মাহদীকে বলে,“আসছি জনাব। আবার দেখা হবে। আসসালামুয়ালাইকুম।”

অনিকেত বেড়িয়ে যেতেই মাহদী হাফসাকে বুকে টেনে মাথায় হাত বুলায়,“একটু শান্ত হও। একটু শান্ত হও হাফসা তুমি অবুঝ নও।”

বিকেল গড়িয়ে তখন সন্ধ্যাতে। ব্যস্ত রাস্তায় পথচারীরা চলছে,থামছে একটা লোককে দেখে। লোকটা হাঁটু ভেঙ্গে রাস্তায় বসে কাঁদছে। ভীষণ ভয়ংকর সেই কান্নার আওয়াজ। মনে হচ্ছে তার জান বেরিয়ে যাবে। উদ্বিগ্ন আগন্তুকেরা ছুটে এসে বলছে তাকে,“এ ভাই,আপনি এমন করছেন কেন? ভাই কি হয়েছে? কে আপনি?”

অনিকেত হাপাচ্ছে। লাল চোখ দু'টো তুলে চেয়ে থাকে সবার মুখের দিকে বোকার মতন। যেন ও নিজের পরিচয় ভুলেছে। তাই নাম বলছে না। শুধু বুকে হাত চেপে বলছে,“আমি প্রাক্তন।”

~সমাপ্ত~

#প্রাক্তন

#কলমে : ইসরাত আরা ইতি।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১ম পর্ব শেষ করেছেন।

উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন