চিঠি দিও
৩২
_________
"প্রেমিকা হত্যার দায়ে গ্রেফতার সদ্য নির্বাচিত নগর সভাপতি অতনু হাওলাদার"
মধ্যরাতে ধাপ জেল রোড থেকে প্রেমিকার ক্ষতবিক্ষত লাশসমেত অজ্ঞাত তিন অনুচরসহ তাকে আটক করা হয়।
পুরো একটা কলামজুড়ে ঘটনার বিস্তারিত লেখা থাকলেও এতটুকু পড়েই পত্রিকাটা সরিয়ে রাখলেন নিজাম চৌধুরী। রিমলেস চশমা খুলে ভাঁজ করা পত্রিকার ওপর রেখে চায়ের পেয়ালা টেনে নিলেন হাতের তালুতে। এরপর পিছিয়ে ইজি চেয়ারে মাথা এলিয়ে আরাম করে চুমুক বসালেন দুধ, চিনি বিহীন ফ্যাকাশে সবুজ রঙের ধূমায়িত চায়ের কাপে। বিস্বাদ তরল টুকু গলায় পৌঁছতেই নাকমুখ কুঁচকে গেল তার। তবুও সবটা গলাধঃকরণ করলেন নিরবচ্ছিন্ন দীর্ঘশ্বাসের সাথে। এসব শওকতের পাগলামি। রক্তে কোলেস্টেরল নাকি বেড়ে গেছে, ডায়াবেটিসও নিয়ন্ত্রণে নেই। তাই সব খাবারের ওপর নিষেধাজ্ঞা। আজীবন ঘনদুধ আর দু চামচ চিনির চায়ের পরিবর্তে কি-না খেতে হচ্ছে এই তিতকুটে গ্রীন টি! একটুখানি বিরক্তিভাব তো জাগছেই;পরক্ষনে এই ভেবে আনন্দ হচ্ছে ছেলেটা তাকে নিয়ে কতই না ভাবে। সারাজীবন এই কলিজার টুকরাগুলোকে ছাড়া কীভাবে একা একা থাকতে হলো। সব ঐ নাকউঁচু বোকা মহিলাটার জন্য। আরে স্ত্রী হয়েছিস স্ত্রীর মতো থাক। রাজনীতিতে মাথা ঘামাতে হবে কেন? নিজে তো কষ্টে ধুঁকে ধুঁকে মরলই, মাঝখান থেকে ছেলেমেয়ে দুটোকেও পিতৃ বিমুখ করে দিলো। পিতার দিকে ফেরাতে শেষ পর্যন্ত চালবাজির আশ্রয় নিতে হলো। যাকগে যা হয়েছে ভালোর জন্যই হয়েছে। ঘরের ছেলে ঘরে ফিরেছে। এবারে দায়িত্বগুলো ঠিকঠাক বুঝে নিতে পারলে একটু নির্ভার হতে পারেন নিজাম চৌধুরী।
গাড়ি বারান্দায় একযোগে অনেকগুলো মোটরসাইকেল আগমনের শব্দে চিন্তার সমাপ্তি টানতে হলো নিজামকে। ওদিকে অতনুটা আবার গুছিয়ে রাখা কাজকর্ম সব বিগড়ে দিয়েছে। ওকে লাইনে আনার আরেক ঝক্কি। ছেলেমানুষি করার সময় একবারও ভাবে না সবকিছুর জবাবদিহি ওপর মহলে করতে হয় নিজামকে। আসনে টিকে থাকার বিষয়টা ফসকা গেরোর মতো হয়ে যাচ্ছে দিনকে দিন। কখন যে ছুটে যায়! সময়টাও দ্রুত যাচ্ছে না। অফিশিয়াল অ্যানাউন্সমেন্ট করে ছেলেকে যে লাইনে নিয়ে আসবে সেই সুযোগও পাচ্ছে না। ওদিকে ম্যাডামের নিত্য নতুন সিদ্ধান্তে রীতিমতো পর্যুদস্ত হবার আশংকা। উফফ এত চাপ আর সত্যিই নিতে পারে না বয়োজেষ্ঠ্য কাঁধ।
-- স্যার আনিস সাহেব এসেছেন।
পি.এ ইসহাকের বিনীত কণ্ঠস্বরে নড়েচড়ে সোজা হয়ে বসলেন নিজাম চৌধুরী। চায়ে শেষ চুমুকটা দিয়ে হাতে ইশারা করে ডাকলেন,
"এসো আনিস"
বলা বাহুল্য কাচারির চৌকাঠেই দাঁড়িয়ে ছিল আনিস, মন্ত্রী সাহেবের ডাকের অপেক্ষা করছিল। মুখভর্তি তার পান। ডাক পড়লে শব্দ করে পানের পিক বাইরে ফেলে হাসি হাসি মুখ নিয়ে সে ভেতরে প্রবেশ করল।
বসেছে কি বসেনি ততক্ষণাৎ কাচারি ঘরের দামি টেলিফোনটা তারস্বরে বেঁজে নতুন সংবাদের সতর্কতা সংকেত জানিয়ে দিলো। ফোনটা রাখা হয়েছে দলের সমস্ত কল অ্যাটেন্ড করার জন্য। বাজলে সবসময় কোনো সতর্কবাণী পৌঁছে দিতেই বাজে। সকালের ঘটনার পর আজ বহুদিন বাদে বেঁজে ওঠায় সন্দেহের অবকাশ রইল না ম্যাডাম অবধি পৌঁছে গেছে নিজামের দায়িত্বজ্ঞানহীনতার খবর। ইসহাক ভীষণ চটপটে মানুষ। রিং পড়ামাত্র সে ফোন তুলে বসের টেবিলের সামনে রেখে দিয়ে গেল। নিঃশব্দে আনিসকে বসতে ইশারা করে দীর্ঘশ্বাসের সাথে রিসিভার তুলে কানে ঠেকালেন নিজাম চৌধুরী। অপরপ্রান্ত থেকে স্বল্প বাক্যে যা বলা হলো তা নিঃসন্দেহে চেহারার রঙ উড়িয়ে দেয়ার মতো। একইসাথে ফ্যাকাশে এবং গম্ভীরমুখে কথাগুলি শ্রবণ করতে করতে হাতের মুঠো শক্ত হতে দেখা গেল নিজাম চৌধুরীর। ভারী স্বরে সে কথোপকথনের প্রতুত্তর করল কয়েকটা। এরপর মিনিট পাঁচেক বাদে ফোন নামিয়ে রাখার সময় তার শরীরটা পুনরায় যেন ঢলে পড়ল চেয়ারের ব্যাকরেস্টে। দুশ্চিন্তার কারণ যদিও অতনুকে ঘিরে নয়, বরং নিজের পলিটিক্যাল ক্যারিয়ার নিয়ে৷ তথাপি এতদিনের বিশ্বস্ত কর্মীকে অকালে ছাঁটাই করতে হবে এমন ভাবনায়ও খানিক বিমর্ষ হয়ে পড়লেন নিজাম।
দু'হাতের দূরত্বে বসে নিমীলিত চোখে সবটাই পর্যবেক্ষণ করছিল আনিস। মুখে কিছু বলল না। সময় দিলো মন্ত্রী সাহেবকে। তার অপেক্ষা বৃথা নয়। একটু ধাতস্থ হলে গড়গড় করে সবটা উপস্থাপন করে দিলেন নিজাম চৌধুরী, সাথে তার ছেলে এবং অতনুর পলিটিক্যাল ক্যারিয়ার নিয়ে দুশ্চিন্তা প্রকাশেও কার্পণ্য করলেন না। মন্ত্রী সাহেবের কথার সারমর্ম এই,
"খুব বেশিদিন হয়নি ম্যাডাম ক্ষমতায় এসেছেন। এত দ্রুত এই পথ থেকে সরে দাঁড়ানোর পরিকল্পনা তাঁর নেই। দলে কোনো অসৎ সহকর্মীর প্রয়োজনবোধ করছেন না আপাতত। রংপুরের এই আসন পরিচালনা নিয়ে বহুদিন যাবৎ বহু অভিযোগ, অসন্তোষ প্রকাশ করছেন সাংসদরা। এভাবেই যদি অভিযোগের পাল্লা ভারী হতে থাকে তাহলে আসন্ন নির্বাচনে বাধ্য হয়েই অপসারণের পথ দেখতে হবে। ক্ষমতার লড়াইয়ে টিকে থাকতে হলে পুনরায় শক্তহাতে নিজের আসনটা ধরে রাখার পরামর্শ দিলেন স্বল্প বাক্যে। দৃঢ় গলায় একপ্রকার আল্টিমেটামই জারি করে দেয়া হলো যেন ওপর মহল থেকে"
গুঞ্জন উঠছে এ বছর নির্বাচনে রংপুর জেলার গুরুভার তুলে দেয়া হবে বিরোধী দলের একজন প্রার্থীর হাতে। কিছু অসন্তোষের জায়গা শিথিল না হলে দেশ গঠনের কাজটা ঠিক সহজ হয়ে উঠছে না। ভেতরের এসব কথা বহুদিন আগে থেকেই আনিসের কানে ভেসে ভেসে আসছে, যদিও সে নিজাম সাহেবকে কিছু বলেনি। এমনকি ইসহাককেও কড়াভাবে নিষেধ করে দেয়া ছিল। সিদ্ধান্ত তো আগেই বানিয়ে নেয়া হয়েছে, অভিযোগ-অনুযোগ বাহানা মাত্র। নিজাম সাহেবও বোধহয় কিছুটা জানেন, নইলে ছেলেকে পদ পাইয়ে দিতে অস্থির হয়ে উঠতেন না। আনিসের মনে হলো এই একটা সুযোগ, বিশৃঙ্খলার মধ্যে নিজের কার্যসিদ্ধি করে নেয়ার। অতনুকে হটিয়ে ঐ জায়গাটা রওনককে দিতে পারলে রওনক সম্পূর্ণ তার হাতের মুঠোয় এসে যাবে। এরপরেই রওনকের সাথে একমাত্র কন্যা অহনার বিয়ের বন্দোবস্ত করে ফেলবে আনিস। ক্ষমতার লোভ পায়ে ঠেলা সহজ কর্ম নয়। আনিসের পূর্ণ বিশ্বাস রওনকও পারবে না। এই লোভটাকেই কাজে লাগাতে হবে। দুর্ভেদ্য ফন্দিটা এঁটে গলা খাঁকারি দিয়ে সমবেদনা প্রকাশের ভঙ্গিমায় আনিস বলল,
-- এখন তাহলে কি করতে চাচ্ছেন বস?
পরিকল্পনা নিজামেরও যে বানানো ছিল না তা নয়। গতকাল রাতে একটা বিষয় নিয়ে অতনুর সাথে কিঞ্চিৎ মনোমালিন্যের পর রাগের মাথায় দল থেকে অপসারণের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, যদিও রাগ স্তিমিত হতে সিদ্ধান্ত পাল্টেও ফেলেছিলেন। তবে এখন পুনরায় হঠকারী সিদ্ধান্তে ফিরে যেতে হবে। তবে এবারের সিদ্ধান্ত হঠকারী নয়, ঠান্ডা মাথায় নেয়া।
দুঃখবোধটুকু দূর করে দৃঢ়তার সাথেই আনিসকে নিজের পরিকল্পনাটা জানিয়ে দিলেন নিজাম চৌধুরী। আপাতত অতনুকে গা ঢাকা দিয়ে রাখতে হবে। ওর পদটাও আড়ালে সতর্কতার সাথে যোগ্য কারোর হাতে হ্যান্ডওভার করতে হবে। কোনোভাবে অতনুর কানে গেলে ঝামেলা বাঁধিয়ে ফেলতে পারে সে। দূরে কোথাও পাঠাতে হবে ওকে। এরপর চলতি কেসটার প্রভাব থেমে গেলে তখন না-হয় কোনো ব্যবস্থা নেয়া যাবে। আপাতত ক্যারিয়ারের পথে বাঁধা হতে দেয়া যাবে না ওকে।
_________
ওড়নায় মুখ চেপে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে আসমা। ভাবিকে সান্ত্বনা দেয়ার ভাষা উপমার জানা নেই। ভেতরে ভেতরে সেও ভেঙে পড়েছে। কি করা উচিৎ আর কি অনুচিত বুঝতে পারছে না। তবে সে জানে তার প্রিয় সেজ ভাইয়ের দ্বারা এতবড় অপকর্ম হওয়া সম্ভব নয়। নিশ্চয়ই জেনে-বুঝে কেউ তাকে ফাঁসানোর চেষ্টা করছে। দেখেছে সে একটা ভালো পজিশনে গেছে, অমনি ষড়যন্ত্র শুরু। রাজনীতির ক্ষেত্রটা বিশেষ ভালো নয় ও জানে, তবে একেবারে খারাপও নয়। একজন মানুষ ভালো নাকি খারাপ হবে এটা নির্ভর করে পারিবারিক শিক্ষার ওপর;উপমা তাই বিশ্বাস করে। বড়মামা নিজ হাতে গড়েছেন সব ভাইবোনদের। মামার দেখানো পথ কখনও ভুল হতে পারে না।
জটিল থেকে জটিলতর পরিস্থিতি একা হাতে সামলানোর অসীম ক্ষমতা যে মানুষটার, সে-ই এবার সমস্যায় জর্জরিত। এমতাবস্থায় নিজেকে ছাদহীন নিঃস্ব মনে হচ্ছে উপমার। খবরটা জানার পর থেকে দলের ছেলেপেলেদের আনাগোনা বেড়ে গেছে আঙিনায়। ক্ষণিক পূর্বেও কিসের মানববন্ধন হবে বলে গুঞ্জন শুনলো উপমা। ভাবিকে তার জিম্মায় রেখে বড় মামা গেলেন থানায় খোঁজ খবর নিতে, সাথে বোধহয় ঢাকায়ও খবর পাঠাবেন। ছোটো মামা, বাকি দু'ভাই এখনও কিছু জানে না। অভ্রকেও বলা হয়নি। ওরা জানতে পারলে আরও কি কি হবে ভাবতেই ভয় ভয় করছে উপমার। ছোটো মামাটা ভীষণ ভীষণ নরম মনের। ওদিকে তার ছেলে হয়ে চিরকাল সেজ ভাই হার্টলেস, জিদ্দি-একরোখা স্বভাবের। উল্টোপাল্টা কাজ করে বাড়ির সবাইকে টেনশনে রাখা যার একসময়ের প্রিয় কাজ ছিল। পরে লেখাপড়া করতে গিয়ে কীভাবে যেন রাজনীতিতে জড়ানোর পর হুট করে অন্যরকম হয়ে গেল। মামারা বিরোধ করেছিল অবশ্য রাজনীতি করা নিয়ে। সাদাসিধে নিপাট ভদ্রলোকের ছেলে রাজনীতিক হবে বিষয়টা অদ্ভুত ঠেকছিল সবার চোখে। কিন্তু ঐ যে সেজ ভাইয়ের জেদ! নিজেকে একটা শক্ত পজিশনে দাঁড় করিয়েই সবার কিম্ভুত নজরের জবাব দিয়েছিল সে। আজ এতদিন বাদে তার দৃঢ় পদক্ষেপ কেউ টলিয়ে দেবার দুঃসাহস দেখাবে এমন চিন্তা কখনও মাথায়ই আসেনি।
নাহ্ ছোট্ট মস্তিষ্কে এত জটিল ভাবনা আর নিতে পারে না উপমা। ভাবির কাঁধে হাত রেখে অসহায় গলায় বলে,
-- প্লিজ ভাবি একটু শান্ত হও। মামা তো গেছেন তাই না? সব ঠিক হয়ে যাবে। বিশ্বাস রাখো ভাবি, আমার সেজ ভাই এমন মানুষই নয়।
উপমার সান্ত্বনা বাক্যের বিনিময়ে আসমা জলভরা চোখে একবার দৃষ্টি মেলালেও কিছু বলল না। উপমার মনে হলো এই অসহ্য অসহায় পরিস্থিতিটাতে একমাত্র ভরসার কাঁধ হতে পারে রওনক। সে মানুষটাও বা কোথায়? গতকাল রাতে একটা ফোন পেয়ে অমন দিগ্বিদিক হারা হয়ে বেরিয়ে গেল, এরপর তারও তো কোনো খোঁজ নেই। মানুষটা ঠিক আছে তো? হুট করে ভাইয়ের দুশ্চিন্তা সরে প্রিয়তমের প্রতি উৎকণ্ঠা আচ্ছন্ন করে ফেলল উপমাকে। ব্যাকুল হৃদয়ে ভাবির কাঁধে ভরসায় আলতো চাপ দিয়ে অন্যমনস্ক কণ্ঠে সে বলল,
-- একটা জরুরি কল করতে হবে ভাবি। এই পরিস্থিতি থেকে বেরোনোর উপায় পেয়ে গেছি আমি। প্লিজ একটু শান্ত হয়ে বোসো কেমন?
এরপর কলের পুতুলের মতো প্রতুত্তর না শুনে একা একাই নীচতলায় বসার ঘরের দিকে অগ্রসর হলো উপমা। অস্বস্তি আর অস্থিরতায় হাড় হিম করা শীতের সকালেও তার হাত পা ঘামে ভরে উঠছে।
ওদিকে উপমা বেরিয়ে গেছে নিশ্চিত হয়ে ওড়না সরিয়ে বিরক্তির একটা শ্বাস ফেলল।আসমা। অবিরত ঝরতে থাকে অশ্রুকণাগুলোর গতিপথ পাল্টে চোখের সীমানা বরাবর করে দিয়ে ভেজা গাল মুছে নিলো। যেন অশ্রুপাতেও তার দৃপ্ত নিয়ন্ত্রণ। মুখে বিরক্তসূচক চ-কারান্ত শব্দ করে হেলায় পড়ে থাকা পত্রিকা হাতে তুলে নিয়ে ভালোমতো অতনুর খবরটা পড়তে আরম্ভ করল। কতগুলি প্রেমিকা গজিয়ে উঠেছে বদমাশটার কে জানে! কোনটাকেই বা খু* করল সেটাও বুঝতে পারছে না। আচ্ছা ধাপের দিকে ওর কোন প্রেমিকার বাড়ি? আসমার যতদূর সম্ভব মনে হয় উর্বশী নামক ভিনদেশী মেয়েটা ওদিকটায় থাকে। এমনই তো খবর পেয়েছিল। তবে কি ঐ মেয়েটাকে?
ভাবতেই শরীরের রক্তকণিকা চঞ্চল হয়ে উঠল আসমার। সহসা উঠে দাঁড়িয়ে দাঁতে ঠোঁট চেপে কি যেন ভাবল সে। ভাবনার অতলে উর্বশীর প্রতি কিঞ্চিৎ করুণা হলো তার। আহারে! অসম্ভব রূপবতী ছিল মেয়েটা; ছিল বোকাও। নইলে রাঘববোয়ালরা যার চরণে লুটিয়ে পড়ার জন্য সবসময় তৈরিই থাকত, সে কি না এমন ছুঁচকো কারোর জালে ফেঁসে জীবন শেষ করে ফেলল!
"বন্ধু থানার সামনে ছেলেপেলের দলটা মিডিয়া কভারেজে এসে গেছে। আনিস ভাই দ্রুত রেডি হইতে বলছেন। মন্ত্রী সাবের সাথে যাইতে হবে ঐখানে।"
মিজানের তাড়ার বিপরীতে বিশেষ অস্থির হতে দেখা গেল না রওনককে। বরাবরের মতোই সে শান্ত-অবিচল। মিজান অবাক হয়ে লক্ষ করল পায়ের ওপর পা তুলে সাহেব হয়ে বসে তার বন্ধু সিগারেটের ফিল্টারে ঘনঘন টান দিচ্ছে। একসময় সিগারেট আঙুলে গুঁজেই কি ভেবে টেলিফোনটা কাছে টেনে নিলো। সুপরিচিত নম্বরটা ডায়াল করবে বলে নম্বরবুথে আঙুল রাখার মুহুর্তে ঠিক যেন তার পরিশ্রম কমাবে বলে একা একাই বেঁজে উঠল টেলিফোনটা। তৎক্ষনাৎ হাত গুটিয়ে নিয়ে শব্দ করে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে রিসিভার তুলে কানে ঠেকাল রওনক। অচীরে অপরপ্রান্ত থেকে কান্নার বুদবুদ মেশানো গলায় ভেসে আসতে শোনা গেল,
-- কোথায় ছিলেন আপনি? আমার যে আপনাকে ভীষণ প্রয়োজন রওনক।
সকাতর কণ্ঠের বিপরীতে সহসা কিছু বলবার মতো খুঁজে পেল না রওনক। আধখাওয়া সিগারেট মিজানের হাতে দিয়ে চোখের ইশারায় বেরিয়ে যেতে বলে তবেই মুখ খুলল,
-- আমি তো আছি। তোমার পাশে সবসময় ছায়ার মতো। ভয় পাবে না। পরিস্থিতি যত খারাপই হোক নিয়ন্ত্রণে আনার ব্যবস্থা করব আমরা।
-- আপনি জানেন, আপনি জানেন? ওরা লিখেছে..
কান্নার দমকে কথা সম্পূর্ণই করতে পারল না উপমা। প্রজ্বলিত মোমের রশ্মি দমকা হাওয়ায় যেমন দপ করে নিভে যায় তেমনই তার কথা বলবার শক্তিটা টুক করে নেমে ক্ষণিকের জন্য নির্বাক বানিয়ে দিলো তাকে।
এপ্রান্তে সবটা উপলব্ধি করে চোখ বুঁজে বুকের চাপটা সয়ে নিলো রওনক৷ একটা কাজের শত রকমের প্রতিক্রিয়া আসতে পারে ও জানে। নিজেকে তো সেভাবেই প্রস্তুত করে রেখেছিল, তবু এই নিষ্পাপ ক্রন্দন অন্তরের শক্ত মাটিতে যে কম্পন সৃষ্টি করছে, তা ভীষণ ভীষণ অস্বস্তিদায়ক রওনকের জন্য। কিন্তু কার্যসিদ্ধি হয়ে যাওয়ার পর নতুন ভাবনার অবকাশ যে আর থাকে না।
কি একটা ধারণা করে রওনক হুটহাট প্রশ্ন করে বসল,
-- তোমার কি মনে হয় অতনু ভাই সত্যি এমনকিছু করেছে?
-- নাহ্ কখনোই না। মানুষ খু"নের মতো গর্হিত অপরাধ আমার ভাই করতে পারে না। রাজনীতিতে গিয়ে তার মস্তিষ্ক তো পঁচে যায়নি রওনক তাই না? আপনিও তো রাজনীতির ক্ষেত্রটাতে পা রাখলেন। এর ভয়াল কালো থাবাটা কি আপনাকে গ্রাস করে নিয়েছে? উঁহু নেয়নি। আমি জানি আমার ভাইকেও নিতে পারেনি, পারবে না। সব জিনিসেরই ভালোমন্দ দু'টো দিক আছে। অন্যকারো পরিবার উজাড় করার আগে ভাবতে হয় নিজেরও তো একটা পরিবার আছে। সেই পরিবারের কোনো সদস্যের ওপর আঘাত এলে কেমন অনুভূতি হবে বলুন তো?
নির্বাক সত্তা আচমকা তেজ দীপ্ত কিরণে জ্বলে উঠে যে প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিলো রওনকের দিকে সেটাই যথেষ্ট ছিল ওর শিরদাঁড়া বেয়ে শীতল রক্তের স্রোত বয়ে দেবার জন্য।
উষ্মা প্রকাশ করে কিছু বলতে চাইলেও রওনকের ভেতর থেকেই একটা বাঁধা উঠে এলো। উপমার এই বিশ্বাস বহু আগেই ভেঙেচুরে চুরমার করে দিয়েছে অতনু, রওনক দু'জনেই। সত্যগুলো যখন সামনে আসবে, চেনা মানুষগুলোর অপরিচিত রূপ ঠিক কতখানি আঘাত হানবে মেয়েটার নিষ্কলুষ হৃদয়ে চিন্তা করতে গেলেও কোনো তল খুঁজে পায় না রওনক। সামনে আরও খারাপ কিছুর সম্মুখীন হতে হবে ভেবেই ওর অন্দরে দীর্ঘশ্বাসের কুণ্ডলী যেন বৃহৎ আকার ধারণ করে ফেলল।
চলবে,
Sinin Tasnim Sara
★উক্ত গল্পে ব্যবহৃত সব রাজনৈতিক ক্রিয়াকর্ম কাল্পনিক। বাস্তবের সাথে এর কোনো সংযোগ নেই।