ফন্ট সাইজ:
থিম:
চিঠি দিও

৪৬তম পর্ব

লেখক: সিনিন তাসনিম সারা

১৮+ সতর্কতা

চিঠি দিও

৪৬

_________

দীর্ঘ সাড়ে সাত মাসের অবরুদ্ধ জীবন কাটানোর পর শেষ পর্যন্ত খোলা হাওয়ায় প্রশান্তির শ্বাস নিতে পারছে অতনু। জামিনটা গতকালই হয়ে গিয়েছে ওর; নিঃর্ঝঞ্ঝাট। এখন তো মনে হচ্ছে ইচ্ছে করেই এতদিন জামিন ঝুলিয়ে রেখে প্রতিশোধ নিচ্ছিল নিজাম চৌধুরী। উঁহ, একেবারে বিষধর সাপ যেন লোকটা। লেজে পা রাখলেই হয়েছে। সুযোগ বুঝে ফিরতি ছোবল দিয়েই ছাড়বে।

অতনুও কি কম যায়? ওঁকে উপর্যুক্ত শিক্ষা দেবে বলে কবে থেকে প্রস্তুত। এক্সিকিউট করতে একটু দেরি হয়ে যাচ্ছিল ঠিক, কিন্তু এবার আর সেই বোকামিগুলো ও করবে না।

অতনু জানে শেষকালে এসে একমাত্র পুত্রের ওপর নিজামের বেশ টান হয়েছে। চোখে হারাতে শুরু করেছে ছেলেকে। তাই তো ছেলের ফিউচার আরেকটু সিকিওর করবে বলে স্বীয় ক্ষমতার চেয়ারটা হাসতে হাসতে ছেড়ে দিতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। ওর প্রতিজ্ঞা পূরণ বার করে দেবে অতনু। প্রাণের অংশ হয়েছে না ছেলে? ওই প্রাণটাকেই আগে কেড়ে নেবে নিজামের থেকে। বাপ হয়ে চোখের সামনে ছেলেকে যখন অসীমের পদযাত্রী হতে দেখবে, ছেলের লাশ যখন কাঁধে বয়ে ভূতলে রেখে আসতে হবে তখন বুড়োটা বুঝবে অতনু হাওলাদারের সাথে প্রতিশোধ-প্রতিশোধ খেলার পরিণাম কি।

আহ্ রক্তের ঘ্রাণ! কি মাদকতাপূর্ণ। শিকারীর কাছে সবচেয়ে আকাঙ্ক্ষার বস্তু। কতদিন হয়ে গেল এই রক্ত তৃষ্ণায় কাতর অতনু। আর যে তর সইছে না। বর্ণহীন হাতদুটোকে রাঙাতে ওর সমস্ত সত্ত্বা অধীর।

-- সেকি এখনও বিছানা ছাড়লে না? ওদিকে কত আয়োজন বাকি পড়ে রয়েছে। বড় ভাইজান একা হাতে সামলাতেই পারছেন না। এই যে শুনছ?

কাছে থেকে দয়িতার রিনরিনে প্রেমপূর্ণ কন্ঠস্বর শুনে ভাবনা সকলে চট করে ইতি টেনে দিলো অতনু। নিমেষে ওর পশু সত্ত্বা বিলীন হয়ে, পুরুষ সত্ত্বা জাগ্রত হয়ে উঠল সগর্বে।

বিছানার কাছাকাছি আসতেই আধশোয়া হয়ে দু'হাতে সাঁড়াশীর মতো টেনে আসমাকে জড়িয়ে নিলো বুকের মাঝে কামনায়। বলা বাহুল্য অকস্মাৎ আক্রমণে আসমা হতবিহ্বল। ঐ যে সেদিনের সর্বনাশা রাতটা যে এসেছিল পৃথিবীর বুকে, সে রাতেও চলন্ত জিপে এমনি করে একজোড়া লৌহইস্পাত হাত টেনে নিয়েছিল ওকে পথের ধার থেকে। স্পর্শটা স্পষ্ট মনে আছে ওর।

"অথচ ইদের ছুটিতে চাচার বাড়িতে বেড়াতে আসার আগেও ও ধারণা করেনি চোখের পলকে জীবন পাল্টে দেয়া কোনো ঘটনা ঘটতে চলেছে এই সর্বনাশা শহরটাতে এসে।

বরাবর আসমা পরিবারে সব্বার আদরের। তার ভদ্রোচিত আচরণ, মুগ্ধ করবার মতন ব্যক্তিত্ব, পাশাপাশি যতখানি ধারালো তার সৌন্দর্য ততখানি তীক্ষ্ণ তার মেধা। রূপে-গুণে যেন সম্পূর্ণা সে। সেই ছোট্টবেলা থেকে বাবা-মায়ের বড্ড শখ মেয়েকে ডাক্তার বানাবেন। শখটা মূলত নিজেদের অপূর্ণ স্বপ্ন থেকেই এসেছিল তাঁদের মধ্যে। কেউ দারিদ্রতার করাল গ্রাস, কেউবা পারিবারিক গোঁড়ামির কাছে হেরে গিয়ে বেশিদূর লেখাপড়ার সুযোগ পায়নি। তবুও সমাজে চলার মতো যতখানি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল সেই শিক্ষাটা তাঁদের স্বপ্ন দেখাতে শিখিয়েছিল। পিতা-মাতা বরাবর নিজের অপূর্ণ স্বপ্নগুলো সন্তানের মাধ্যমে পূরণ হতে দেখতে চান। আসমার বাবা-মাও ব্যতিক্রম ছিলেন না।

ছোট্টবেলা থেকেই আসমা বাবা-মায়ের বাধ্য মেয়ে। বোঝার বয়সে একবার যখন তার কানে তুলে দেয়া হয়েছিল বড় হয়ে ডাক্তার হতে হবে, সেই বয়স থেকে সত্যিকার অর্থে তার ধ্যানজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল যেকোনো উপায়ে মেডিকেল পরীক্ষায় তাকে উত্তীর্ণ হতেই হবে। এবং হয়েছিলও সে। রীতিমতো সেকেন্ড হায়েস্ট পেয়ে বাবা-মা এবং ডিস্ট্রিক্টকে পুরো দেশবাসীর কাছে সমাদৃত করেছিল।

সুযোগ পেয়েছিল সে ঢাকা মেডিকেল কলেজে লেখাপড়া করার। এমনিতেই পরিবারে বড় সন্তান বলে ওর কদর বেশি, মেডিকেলে চান্স পাওয়ার পর সেটা বাড়ল বৈ কমল না। সবাই উন্মুখ হয়ে রইল ওর সাথে দেখা করতে, কথা বলতে। আত্মীয় স্বজনরা যেমন হয়!

কিন্তু আসমার স্বপ্নালু চোখজোড়া তখন নতুন ক্লাস, আইটেম, ভাইভা করে ফুরসত পাচ্ছে না। সেই যে ভর্তি হয়ে ঢাকা গেল, পড়াশোনার চাপে দ্বিতীয় বর্ষ অবধি তার ঠিকমতো বাড়ি ফেরাও হলো না। লোকে ছড়াতে শুরু করল ঢাকার হাওয়া লেগে মেয়ে পাল্টে গেছে। বাড়িতেও ফিরতে চায় না। আসমা বিস্মিত হলো। মেয়েদের চলার পথে এত বাঁধা!

বিরূপ মন্তব্য শোনার ওর অভ্যেস নেই ছোটোবেলা থেকে। এত স্বাভাবিক একটা বিষয় নিয়ে প্রথমবার যখন এসব ফেস করতে হলো, বিষয়টাকে স্বাভাবিকভাবে নিতে পারল না আসমা। রীতিমতো মন্তব্য এড়াতেই সেবার ইদে জেদ করে সে বেড়াতে এলো চাচার বাড়ি এই রংপুরে। বেচারি, জানতোও না রংপুর ওকে কোন উপায়ে আপ্যায়ন করতে ডালা হাতে অপেক্ষায় ছিল।

ইচ্ছে ছিল ইদটা এখান থেকে একেবারে করেই যাবে আসমা। কিন্তু ঘরের মেয়ে ঘরে না থাকলে বাড়িটা কেমন শূন্য শূন্য লাগে। এই শূন্যতাটা মেনে নিতে পারছিলেন না বলে আসমার বাবা ওকে চিঠি পাঠালেন, দ্রুত যেন মেয়ে বাড়ি ফেরে৷ আসমার মন বাবার প্রতি বরাবরই কোমল। তাই প্ল্যান যাই থাকুক বাবার আদেশ অমান্য করার শক্তি ওর কোনোমতেই হলো না। চিঠি পাওয়ামাত্র সে প্রস্তুত হয়ে গেল ফেরার জন্য।

এবং সেদিনটাতেই তার বিদায় সম্ভাষণ হলো এমন অদ্ভুতভাবে;যা পৃথিবীর কোনো মেয়ে নিজের অদৃষ্টের কাছে দুঃস্বপ্নেও কামনা করবে না।

সেবার ইদে নির্বাচনের ধুম। প্রচার-প্রচারণা আর মিছিলে রাজপথ সরগরম। নির্বাচনটা হলো ঠিক ইদের আগের দিন৷ নিজাম চৌধুরী তখন দ্বিতীয় দফা এমপি হয়েছেন। খবরটা পেল আসমা চাচার বাড়িতে বসে। রাজনীতিতে কখনোই ওর তেমন আগ্রহ জাগেনি। তাই শুধু কানে তুলেই ক্ষ্যান্ত। নিজাম চৌধুরীকে ও একপলক চোখের দেখাটাও দেখেনি। সিঙ্গেল পোস্টারেও না।

আসমার মনে আছে বিকেলের দিকে চাচা তাদের পাড়াতেই পরিচিত এক রিকশা বলে দিলেন। বৃদ্ধ লোকটা আসমাকে ভারী স্নেহ করে নিয়ে যাবেন বলে প্রস্তুত হয়েছিলেন। তাঁর শুধু একটাই দোষ ছিল তিনি রাতের দিকে চোখে দেখতেন কম। চাচা আসমাকে বলে দিয়েছিলেন রিকশাওয়ালা সবই চেনেন তবু গাড়িঘোড়া দেখলে কিংবা টার্ন নেয়ার সময় আসমা যেন একটু বলে বলে দেয়।

বাড়ির গলি থেকে বেরলো যখন ওরা, প্রকৃতিতে তখন সূর্য মিলিয়ে গেছে প্রায়। পুরো শহরের বিজয় উল্লাসে যদিও আঁধার নামেনি ঠিকমতো। কৃত্রিম চোখ ধাঁধিয়ে দেয়া আলোয়

শুধু আঁধার ঢাকবার বৃথা চেষ্টা চলছিল। টার্মিনাল তখনও বেশ দূর। চারিধারে উচ্ছ্বসিত মানুষের মুখ আর শহরের বর্ণিল আলোকসজ্জা উপভোগ করতে করতে আসমাদের রিকশা এগচ্ছে। এমন সময়ে হুট করে দুটো বখাটে গোছের ছেলে ওর রিকশার পিছু নিলো। বাজে কথা বলে টিজ করছিল ওকে। ইতোপূর্বে একা চলাফেরা করতে গিয়ে এসব হাজারবার ফেইস করেছে। কখনো সখনো প্রতিবাদ করেছে। কাজ হলে হয়েছে, না হলে ঝামেলা বাড়ায়নি, হাল ছেড়ে দিয়েছে। অপরিচিত শহর বলে সেদিনও ঝামেলা মুক্ত থাকতে চাইছিল আসমা। রিকশাচালক কাকা অবশ্য ধমক-টমক দিয়েছিল ওদের। তাঁরই ধমক খেয়ে কি-না কিছুটা পথ ডিসটার্ব করে আবার ফিরে গিয়েছিল ওরা। আসমা ভেবেছিল এই শেষ। এবার দ্রুত টার্মিনালে পৌঁছে বাসে উঠলেই বেঁচে যাচ্ছে।

বেচারি! ও তো আর জানতো না ফিরে যাওয়ার মিথ্যে অভিনয় করে বদমাশগুলো এবার সদলবলে ওকে তুলে নিয়ে যাওয়ার পায়তারা করছিল।

অতনুর যে জিপটা? ওটাতে করেই ওকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তখন ও টার্মিনাল থেকে অল্প কিছুটা দূরত্বে। রিকশাওয়ালা কাকা অনেক চেষ্টা করেছিলেন ওকে বাঁচাতে। অতনুরা তাঁকেও জীবিত ছাড়েনি। আসমার মনে আছে ঐ গলিটায় বেশ কিছু লোক বসেছিল দোকানে, কয়েকজন রাস্তায় দাঁড়িয়েও তামাশা দেখছিল। দিনেদুপুরে একটা মেয়েকে তুলে নিয়ে গেল ওদের চোখের সামনে দিয়ে, এমনকি একটা খুনও হলো, কিন্তু কেউ এগোনোর প্রয়োজন বোধ করল না। তা দেখেই কি না, আসমার ভেতরেও তেজ কিছুটা অস্তমিত হলো। প্রটেস্ট করারও সুযোগ পেল না সে। পাবে কি করে; জিপে তুলেই কতগুলো নরপশু ওর হাত-পা বেঁধে দিলো, একজন বোধহয় মুখ। বাঁচার আকুতি নিয়ে অশ্রুভেজা চোখে তাকিয়েছিল সে শেষ ভরসায়, অপরিচিত লোকগুলোর দিকে। বিপরীতে তাদের দৃষ্টি নিষ্প্রাণ, পাথরসম। এরপর আতঙ্কে আসমা জ্ঞান হারিয়ে ফেলল।

চেতনাশক্তি যখন ফিরল তখন বাইরে প্রলয়ঙ্করী ঝড়। আরাধ্যর অভিশাপে পৃথিবী যেন তার ধ্বংসের শেষ সীমানায় পৌঁছে গেছে। আকাশ-বাতাসের গর্জনে তাই মনে হচ্ছিল। তখন আর নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করেনি সে। করেই বা কি হবে। যা হারানোর তা ততক্ষণে ওর চেতনাহীন শরীর হারিয়েই ফেলেছে। সমাজে সম্মানের আসনগুলোতে আসীন মুখোশধারী শয়তানগুলো ওকে নিয়ে ধ্বংসাত্মক উল্লাসে মেতে উঠেছে। কোনো শরিরী যন্ত্রণা অনুভব করতে পারছিল না আসমা। অনুভব করার পরিস্থিতিতেই ছিল না। ওর সজাগ স্নায়ু শুধু এতটুকু উপলব্ধি করাচ্ছিল মায়ের আদরের সাদা গোলাপটা ভারী নির্দয়ভাবে কতগুলো দৈত্যের পায়ের নীচে পিষে মৃতপ্রায়।

অসুরগুলোর নগ্ন উল্লাস যখন থামল তখন কি ভোরের আলো ফুটেছে? ঠিক জানা নেই আসমার। বিবসন কদর্যতা মেখে বরফ শীতল মেঝেতে ও নিস্পন্দ শুয়ে আছে। ঘুলঘুলির ফাঁক গলিয়ে বৃষ্টি পরবর্তী শীতল হাওয়া আসছিল অনবরত, গেঁথে যাচ্ছিল ওর শরীরে সূঁচের মতো। স্নায়ুতন্ত্র মাত্র মস্তিষ্কে ব্যথার সংকেত পাঠাতে শুরু করেছে। পানির তৃষ্ণায় গলা শুকিয়ে চৌচির। ঘুটঘুটে আঁধার ঘরটায় ও ছাড়া কেউ নেই ভেবেছিল। তবুও কিসের আশায় ওর অন্তঃকরণ বিড়বিড় করে স্বগতোক্তি করল,

"প...পানি"

-- কি বলিস? হুমমহ?

নেশা জড়ানো একটা পুরুষ কণ্ঠ নিজের ঠিক ডানদিকে আবিষ্কার করার পর পুনর্বার আতঙ্কে কেঁপে উঠল আসমার দুর্বল শরীর। আচমকা চিৎকারে সে বলতে লাগল,

-- ছ..ছোঁবে না আমাকে। একটুও ছোঁবে না। ধরবে না। পুরুষ মানুষের স্পর্শ আমি ঘৃণা করি, বড্ড ঘৃণা করি। ছোঁবে না বলে দিচ্ছি।

-- ভয় প..পাস না৷ আমি, আমি..

কথা বলতে বলতে বোধহয় সে উঠে বসার চেষ্টা করছিল, কিন্তু অন্ধকার এবং নেশার ঘোরে ধুপ করে পড়ে গেল। এরপর বহুক্ষণ আসমা তার উপস্থিতি অনুভব করল না। ভেবেছিল আঁধারেই বেরিয়ে গেছে বুঝি। কিন্তু সে আসলে বেরোয়নি। একটু ধাতস্থ হওয়ার সময় নিচ্ছিল। নেশা কাটা সহজ ব্যাপার নয়। সময় নিয়ে উঠে বসলেও লোকটা কেমন পেন্ডুলামের মতো দুলছিল। কাঁপা কাঁপা হাতে সে আঁধার সরাতে দেশলাই জ্বালালো। ফস্ একটা শব্দে আতঙ্কিত আসমা যখন চোখ মেলেছে ঠিক তখনই তার দৃষ্টিসীমায় এলো ঝাপসা হয়ে আসা রক্তাভ দু চোখজোড়া। অতনু, অতনু হাওলাদারের সাথে এই তার প্রথম সাক্ষাৎ।

ওই সর্ব বিধ্বংসী চোখজোড়া দেখে আতঙ্কিত আসমা ভেবেছিল আরেকটা নরপশুর হামলা হতে চলেছে ওর দুর্বল শরীরটায়। তীব্র হতাশায় ভরে উঠেছিল দু চোখের কার্নিশ। তবে সৃষ্টিকর্তা বুঝি ওর অশ্রুকণাগুলো আর সইতে পারছিলেন না। সেজন্যই তো পশুটার হৃদয়ে তিনি একটুখানি মায়া দিলেন। চকিতে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বিবসনা শরীর নিজের শার্ট দিয়ে ঢেকে টলতে টলতে সে বাইরে বেরিয়ে গেল বিনা বাক্য ব্যয়ে। যন্ত্রণা নাকি সৃষ্টিকর্তার করুণায় কৃতজ্ঞতা প্রকাশে আসমা আকাশ-পাতাল এক করে কাঁদল। ততক্ষণ অবধি কাঁদল যতক্ষণ না ওর দুর্বল চোখের অশ্রুটুকু ফুরিয়ে যায়৷ ভালো মেয়ে ছিল আসমা, বড্ড ভালো মেয়ে। কিন্তু ভালো মেয়ে হয়ে ও শুধু ব্যথা পেয়েছে, যন্ত্রণা পেয়েছে। কখনো ওর নারীত্ব ওর থেকে কেড়ে নেয়া হয়েছে, কখনো ওর মা হওয়ার ক্ষমতা। কখনোবা পরিবার। স্বার্থপর পৃথিবী ওর ঝুলি ভরে দিয়েছে কেবল নিষ্ঠুরতায়। তাই সেও এখন পাল্টে গেছে, পাল্টে নিয়েছে নিজেকে। বছর কয়েক আগের আসমা এখন আর জীবিত নেই।

"আঁধারে যার ধ্বংসের শুরু, আঁধারেই তার সমাধি।"

বুকের নরম ত্বকে তীক্ষ্ণ দাঁতের স্পর্শে অতীত ভুলে বর্তমানে ফিরল আসমা। ভাবনার অতলে হারিয়ে ঊর্ধ্বাঙ্গ কখন বিবসন হয়ে পড়েছে সে বুঝতেও পারেনি। একটা শুয়ো পোকার অনবরত নোংরা স্পর্শে রীতিমতো গা গোলাতে শুরু করেছে। দগ্ধ চোখজোড়া জলে পরিপূর্ণ। মনে হচ্ছে শরীরের সমস্ত শক্তি কেউ ছিনিয়ে নিয়েছে তার থেকে। তবু দুর্বল হাত দুখানি তুলে জোর করে শুয়ো পোকাটাকে সে সরাতে চেষ্টা করল বুকের ওপর থেকে৷ বিড়বিড় করে বলল,

-- পাগল হয়ে গেছ তুমি? দিনের বেলা এসব! বাড়িভর্তি লোক।

-- ২২৩ দিন ২১ ঘণ্টা তোমার সান্নিধ্য থেকে দূরে। মাথাটা ঠিক থাকে কি করে বলো?

প্রিয়তমার পুরো মুখ জুড়ে উষ্ণ স্পর্শ এঁকে দিতে দিতে মোহগ্রস্তের মতো উত্তর দিলো অতনু। ওদিকে আসমার শরীরের অস্বস্তি ধীরে ধীরে বাড়ছে। অতনুকে থামাতে রীতিমতো তৎপর হয়ে উঠছে ও। কিন্তু হাজার চেষ্টায়ও যখন অতনুকে থামানো ওর পক্ষে সম্ভব হলো না তখন কয়েক মুহুর্তের একটু ব্রেক দিলো নিজেকে। ঠান্ডা মাথায় ভেবে ঠিক করল যে করেই হোক শরিরী বিষয়টা ওকে এড়াতেই হবে। তাই তো বড় করে শ্বাস নিয়ে সাহসী হাতে হঠাৎ ওর দু গালে হাত রেখে কোমলভাবে নিজের থেকে ঠেলে দিলো ওকে। এবং স্পর্শের কাছে হেরে বিস্মিত অতনু যখন মাত্র স্ত্রীর চোখে চোখ রাখল তখুনি চট করে মাথা তুলে ওকে বাধ্য করল দেহ ভুলে নিজের কোমল ঠোঁটের মাদকতায় হারাতে।

"আমি, জেনে শুনে বিষ করেছি পান,

প্রাণের আশা ছেড়ে সঁপেছি প্রাণ"

_________________

"যতই দেখি তারে ততই দহি,

আপন মনোজ্বালা নীরবে সহি,

তবু পারি নে দূরে যেতে, মরিতে আসি,

লই গো বুক পেতে অনল-বাণ।"

আজ উপমার হলুদ সন্ধ্যা৷ চিঠি পাঠানোর পর দিন যত ঘনিয়ে আসছিল ততই ওর বুকের বাঁ দিকে হৃদিটার স্পন্দন দ্রুত হচ্ছিল। উপমা আজও আশা ধরে রেখেছে রওনক ফিরবে। শেষ মুহুর্তে ওর হাত ধরে টেনে নিয়ে যাবে লোকালয়ের বাইরে, কোনো অচিনপুরিতে। যেখানে তাদের আলাদা করার মতো কেউ নেই। নেই কোনো বিচ্ছেদেরও গল্প। যে পৃথিবী জোড়া সবসময় ভরে থাকে শুধুমাত্র ভালোবাসায়।

আচ্ছা চিঠিটা কি রওনক পড়েনি? একটুখানিও মায়া হয়নি ওর উপমার জন্য। তাহলে এতদিনের ভালোবাসা। ওগুলো মিথ্যে ছিল, সস্তা কোনো অভিনয় ছিল?

অভিমান ফুলে ওঠে উপমার ভেতরে। হলুদের সাজ নিয়ে জানালার গরাদে হাত রেখে নিঃশব্দে সে বিষাদ বিসর্জ্জন দেয়। উষ্ণ নোনা ধারায় ধুয়ে যায় ওর প্রসাধন, লেপ্টে যায় চোখের কাজলও। তবু মোহময়ীর মোহনীয় রূপ-মাধুর্য একবিন্দু ম্লান হয় না।

অনুরাগে ভেঙে পড়া মিষ্টি বধূটি তো জানে না তার প্রেমিক পুরুষ চিঠি পাওয়ার অবস্থানে এতদিন ছিল না। যদি থাকতো তাহলে আজ নিঃসঙ্গতায় তাকে অশ্রু বিসর্জন দিতে হতো? উঁহু, সে তো বরং পরম নির্ভরতায় দয়িতের বাহুডোরে আবদ্ধ হয়ে চিরকালের মতো সমস্ত বিরহ যাতনাকে উড়িয়ে দিতে পারত সান্ধ্য ফানুশের মতো।

চলবে,

Sara

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৪৬তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন