১৮+ সতর্কতা
চিঠি দিও
৫১
_________________
নিজাম চৌধুরীকে নিয়ে দৌড়ঝাঁপ শেষে অতনু যখন বাড়ি ফিরল তখন ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। শীতের তীব্রতা এই সময়টায় অনেক বেশি থাকে প্রকৃতিতে। নরম সুতি কাপড়ের পাঞ্জাবি পাজামা কিছুই নয় হাড়কাঁপানো শীতের কাছে। এই ওয়েদারে মানুষ জমে বরফ হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু অতনুকে দেখে মনে হচ্ছে তীব্র শীত তার ভেতরে কোনো পরিবর্তন নিয়ে আসতে পারেনি। সদ্য ঘটে যাওয়া ঘটনাটা তাকে রীতিমতো স্তব্ধ করে দিয়েছে। রওনকের মতো চুনোপুঁটির কাছে হেরে পদে পদে এভাবে পর্যদুস্ত হতে হবে অতনুর বিশ্বাসই হচ্ছে না৷ অবশ্য এসবকিছুতে ইন্ধন যোগাচ্ছে ওর আপন জনেরা। লোকে এমনি এমনি বলেনি ঘরের শত্রু বিভীষণ। অসীম ক্ষমতাধর মেঘনাদকে ছলে-বলে-কৌশলে পরাস্ত করার পেছনে সবচেয়ে বড় হাত যেমন তার চাচা বিভীষণেরই ছিল। ঠিক মেঘনাদের গল্পের মতো অতনু নামক খলনায়কের জীবনে ওর চাইতে চতুর খলনায়কের আবির্ভাব ঘটেছে। যা ওর আপনজনই। শব্দটা অবশ্য খলনায়ক হবে না, হবে নায়িকা। শ্লেষাত্মক হেসে জিপে ব্রেক কষল অতনু। বিস্তৃত শ্বাস ফেলে গেট খুলে পুনরায় গাড়ি স্টার্ট দিয়ে কম স্পিডে ভেতরে প্রবেশ করল। এরপর গ্যারাজে গাড়ি পার্ক, গেট বন্ধ কোনোকিছুতে অনুচরদের কোনোরূপ সাহায্য নিলো না। এই যে আজকের পর থেকে তার দিকে বাড়িয়ে দেয়া সমস্ত সাহায্যের হাত একে একে গুটিয়ে যাবে আপনা থেকে, ছোটো ছোটো কাজের অভ্যেস তাই এখন থেকে করে রাখা ভাল।
নিজাম চৌধুরীর শারিরীক অবস্থা বিশেষ ভাল নয়। হাসপাতালে খানিক আগে টর্নেডো বয়ে গেছে। যার আঁচ এখন পর্যন্ত অতনুকে অজানা আতঙ্কে আচ্ছন্ন করে রেখেছে৷ ঘন্টা কয়েক আগে অত তাড়াহুড়ো করে যে নিয়ে যাওয়া হলো মন্ত্রী মহোদয়কে হাসপাতালে! প্রাথমিক চিকিৎসায় অবনতি ছাড়া উন্নতির দিকে যায়নি তার শারিরীক অবস্থা। শেষে হম্বিতম্বি করে ইমার্জেন্সিতে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে তাকে নিয়ে যাওয়া হলো ঢাকার পিজি হাসপাতালে৷ অতনু যেতে চেয়েছিল সাথে,কিন্তু শওকতের বারণ তাকে আটকে দিয়েছে। শওকত ভদ্র ছেলে, কোনোরূপ ঝামেলায় সে যায়নি। শুধু অ্যাম্বুলেন্সে ওঠার মুহুর্তে শীতল দৃষ্টিতে অতনুর পাথুরে চোখে চোখ রেখেছিল। "বাবার কিছু হলে অতনুকে যে ও সহজে ছেড়ে দেবে না" এমন হুমকি ওর চাহনিজুড়ে খেলা করতে দেখেছে অতনু। অবশ্য ভীত নয় সে এসব নিয়ে, বরং তার মস্তিষ্কে উদ্ভব হয়েছে অদ্ভুত রকমের এক চিন্তার। বাই এনি চান্স নিজাম চৌধুরী যদি এই মৃত্যুশয্যা থেকে আর ফিরে আসতে না পারে তাহলে সুবিধে সবচেয়ে বেশি তো অতনুর। পিতার শোকে মুহ্যমান শওকত রাজনীতি নিয়ে চিন্তা করার পরিস্থিতিতে থাকবে না, ওকে দেখলেও মনে হয় না এসব ক্ষেত্রে বিন্দুমাত্র আগ্রহ অবশিষ্ট আছে ওর মধ্যে। তীব্র এই অনাগ্রহটাকে কাজে লাগিয়ে, কিছুটা সিম্প্যাথী সিম্প্যাথী খেলা খেলে অতনু যদি একবার নিজামের ছেড়ে দেয়া ক্ষমতার গুটি হাতের মুঠোয় নিয়ে নিতে পারে তাহলেই তো বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ওর রাজত্ব কায়েম হয়ে যাবে। রাতারাতি ও পাবে অসীম ক্ষমতার চাবিকাঠি এবং প্রতিদ্বন্দ্বীবিহীন রাজতন্ত্র। এসব ভাবনার মধ্যে আনিস শেখের নামটা চোখের তারায় জ্বলজ্বল করছে। বিশাল মৌর্য সাম্রাজ্যের শাসনকালে সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের রাজ্য পরিচালনায় অন্যতম সহায়ক ছিলেন চাণক্য। রাজনীতি, অর্থনীতি কিংবা রাজ্য পরিচালনায় তার চৌকস মস্তিষ্কের জুড়ি মেলা ভার। তাদের ডানের দলটায় আনিস শেখের ভূমিকাও কিছুটা চাণক্যের মতো বলে মনে হয় অতনুর। যেখানে নিজাম চৌধুরী হলো নন্দ সাম্রাজ্যের মহাপদ্ম নন্দ;আর অতনু? তার চরিত্রায়ন ঠিক চন্দ্রগুপ্তের আদলে তৈরি। চাণক্য একদিন চন্দ্রকে যেমন সাহায্য করেছিল সাম্রাজ্যের আধিপত্য ছিনিয়ে নিতে, তেমন অতনুকেও আনিস সাহায্য করেছিল এই দলে অনুপ্রবেশে;আজ কি সে তবে ক্ষমতা ছিনিয়ে নিতে সাহায্য করবে না?
গ্যারাজ পেরিয়ে সদর দরজার কাছাকাছি পৌঁছাতে পৌঁছাতে অতনুর দৃষ্টি চলে গেল ডান দিকে বাগানের জন্য খালি পড়ে থাকা জায়গাগুলোতে নিভে আসা কাঠকয়লার ওপর মূর্তিমান খাবারের হাঁড়িগুলোর দিকে। কত আয়োজন করেছিল গত কালকের দিনটিকে ঘিরে! রাত পেরতেই আনন্দ উৎসব বিষাদরূপে গত হলো। অন্তরীক্ষগামী রাগের আঁচ পুনরায় ফিরে এলে তীব্র রোষে শূন্য হাঁড়িগুলোতে জোর লাথি কষিয়ে হনহনিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল অতনু। ভেবেছিল বিষাদের ছোঁয়ায় নিঝুম পাওয়া যাবে বুঝি বাড়িটাকে৷ কিন্তু তার ধারণা তো সম্পূর্ণ ভুল। বরং তাকে বিস্ময়ের চরম শিখরে পৌঁছে দিয়ে তার মা রাগে গজগজ করতে করতে আসমার হাত ধরে টানতে টানতে এদিকটায়, সদর দরজার দিকে নিয়ে আসছে। মায়ের উদ্দেশ্য কি? ভ্রু কুঁচকে মাত্র কয়েক সেকেন্ড সময় নিল অতনু বিষয়টা আত্মস্থ করার। রাগে অন্ধ মা যখন ঠিক তার কাছাকাছি এসে পৌঁছেছে তখন ভাবনা ভুলে এগিয়ে গিয়ে ঝটকা মেরে মায়ের থেকে আসমাকে টেনে নিজের কাছে টেনে নিল অতনু৷ এবং থমথমে বাড়ির পরিবেশে বজ্র নিনাদ গর্জে উঠে চারদেয়ালে প্রতিধ্বনিত হলো,
-- আমার অনুপস্থিতিতে আমারই স্ত্রীর সাথে এমন ঘৃণ্য আচরণের অর্থ কি?
বলা বাহুল্য সবটা গুছিয়ে আনার মুহুর্তে ছেলের উপস্থিতি অপ্রত্যাশিত ছিল শিল্পীর কাছে৷ সেই কতদিন যাবৎ ছুতো খুঁজছিল সে অপয়া-অলক্ষ্মী মেয়েটাকে বাড়ি থেকে তাড়ানোর৷ অবশেষে শক্তিশালী একটা কারণও পাওয়া গিয়েছিল কিন্তু শেষ মুহুর্তে পরিকল্পনা এভাবে ভেস্তে যাবে কে জানত! হতাশা এবং ছেলের রাগ রীতিমতো তোপের মুখে ফেলে দিল শিল্পীকে৷ বোবা পুতুলের মতো কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে সে বুঝে-উঠতে পারল না কি বলবে, অথবা কি বলা উচিৎ তার!
ওদিকে উত্তরের আশায় অতনু পুনরায় গর্জে উঠল,
-- কি ব্যাপার, কথা নেই কেন কারো মুখে?
ভাগ্নির কর্মকাণ্ডে বিহ্বল রঞ্জু সাহেব অপত্য স্নেহের ওপর আসা আঘাতে ইতোমধ্যে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছেন। ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর থেকে তাকে ঘর ছেড়ে বেরতে দেখা যায়নি। এদিকে বাকিরা যারা উপস্থিত আছে তারাও শতবার চেষ্টা করেছে শিল্পীর এমন আক্রমণাত্মক, আপত্তিকর কাজে বাঁধা প্রদান করতে। কিন্তু সে যেন রাগে অন্ধের পাশাপাশি বধিরও হয়ে গেছে। প্রতিশোধপরায়নতা তার অপরাধে তাকে সাহস যুগিয়েছে। তাই তো পরিণতির কথা চিন্তা না করেই এতবড় কান্ড ঘটাতে সে তৎপর হয়ে উঠেছে।
অতনুর রাগ সম্বন্ধে বাকিদের মতো আসমাও অবগত। আর যাইহোক অতনুর তার প্রতি অবসেশনকে আসমা এই মুহুর্তে অগ্রাহ্য করতে পারবে না। এছাড়া ইতোমধ্যে অনেকখানি সিনেমা হয়ে গেছে বাড়িতে, এর রেশ আরও কিছুটা বাড়ুক আসমা চায় না৷ শরীরেও কুলচ্ছে না, আবার মন-মানসিকতাও চাইছে না এটা বাড়ুক। তাই পরিস্থিতি বিচারে অতনুর হাতে একটু চাপ দিয়ে ধীর কন্ঠে আসমা বলল,
-- বাদ দাও প্লিজ। হাসপাতাল থেকে এলে, ফ্রেশ হতে হবে না? চলো, ঘরে চলো।
উদ্বেগ মিশ্রিত স্ত্রীর কোমল স্বর অতনুর মধ্যে বিশেষ পরিবর্তন আনতে পারল বলে মনে হলো না। বরং হাতের চাপ একটুখানি বাড়িয়ে দৃঢ় স্বরে সে পুনরায় শুধল,
-- কত সময় প্রয়োজন হবে আমার উত্তর পেতে?
স্বাভাবিকভাবে অতনুর এবারের প্রশ্নেও তার মা নিশ্চুপ;তথাপি পরিস্থিতি বিগড়ে যাচ্ছে বুঝতে পেরে উদ্যোগী হয়ে আবিদ এবার এগিয়ে এলো কিছুটা। হাত তুলে বলল,
-- আহ অতনু, ঝামেলা বাড়াসনে তো। ঝামেলা করতে করতে রাত পেরিয়ে সকাল হলো। আর কত? বাবা-জেঠা কারোরই শরীর ভাল নেই।
-- আম্মা যখন আমার বউকে হিড়হিড় করে টানতে টানতে বাড়ির বাইরে বের করে দিচ্ছিল তখন এসব ভাবিসনি তুই?
কন্ঠের তেঁজ বাড়ছে বৈ কমছে না অতনুর৷ আবিদও এবারে রেগে গেল কিছুটা। ওরা তো চেষ্টা করছিলই মা'কে আটকাতে৷ মা যদি বধিরের মতো আচরণ করে তাহলে তারা কি করতে পারবে এখানে? আবিদ কিছু বলবে এর পূর্বে আসমাই বলে উঠল,
-- দয়া করে এসব বন্ধ করবে? আই বেগ অফ ইউ। আর পারছি না আমি বিশ্বাস করো৷
স্ত্রীর অসহায় কণ্ঠস্বরে অতনু ফিরে তাকাল। মিনিটখানেক নিষ্পলক তাকিয়ে থাকার পর সকলের উদ্দেশ্যে বলে উঠল,
-- এই মুহুর্তে বিষয়টা নিয়ে বাড়াবাড়ি করছি না বলে ভেব না তোমাদের অপরাধ এক বিন্দুও কম৷ আজ যা হয়েছে, পরবর্তীতে আর কখনো এ বাড়িতে যেন না হয়। সতর্ক করে দিচ্ছি, খবরদার আমার অনুপস্থিতিতে আমারই স্ত্রীর সাথে ফারদার এমন ঘৃণ্য আচরণ করার চেষ্টা করেছ তোমরা!
কথা অসম্পূর্ণ রেখে আসমার হাত ধরে টানতে টানতে ঘরে নিয়ে গেল অতনু। সশব্দে দরজা আটকে বিছানার ওপর বসিয়ে অল্প ঝুঁকে বলল,
-- পাঞ্জাবির বোতামগুলো খুলে দাও।
আসমা একটু অবাক হলো ওর আচরণে কিন্তু মুখে কিছু বলল না। বাধ্য মেয়ের মতো একটা একটা করে বোতাম খুলতে লাগল। হয়ে গেলে পাঞ্জাবি ছাড়তে ছাড়তে অতনু বলল,
-- ফ্রেশ হতে যাচ্ছি। আমার কাপড়গুলো বের করে রাখো কেমন?
এবারেও একপেশে মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল আসমা। যদিও তার খানিক বিরক্ত লাগছে। খানিকক্ষণ আগে যা ড্রামা হলো নীচে! আসমা ভাবতেও পারেনি সন্দেহের তীরটা এভাবে তার দিকে ঘুরে যাবে। জান্নাতির ড্রেসিং করিয়ে দেয়ার পর বাতি নিভিয়ে চুপচাপ ঘরে বসে ছিল আসমা। ও জানতো উপমার পালিয়ে যাওয়ার মুহুর্তটাতে যেহেতু ও উপস্থিত ছিল সেখানে, তাই ওর ওপর প্রশ্নবোধক চিহ্ন একটা উঠবেই। কীভাবে সকলের সন্দেহ এড়িয়ে প্রশ্নের ভার মাথা থেকে নামাবে এ-ই মূলত ভাবছিল আসমা। ঠিক সেই সময়টায় একটা বিদঘুটে চিৎকার এবং হাতের ওপর হেঁচকা টানে বাস্তবতার মাটিতে পা রাখতে হলো তাকে। বিস্ময়াভিভূত ওর দৃষ্টি কিছু বুঝে ওঠার আগেই হিড়হিড় করে টানতে টানতে ওকে নিয়ে ড্রয়িংরুমে ছুঁড়ে ফেলল শিল্পী। এবং শাশুড়ির এমন আচরণের অর্থ খুঁজে বের করবে তার পূর্বেই একাধিক অপরাধের বোঝা কাঁধে চাপিয়ে ওকে দোষী সাবস্ত করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল শিল্পী। এবং বিভিন্ন যুক্তিতর্কের মাধ্যমে সকলকে বোঝাতে তৎপর হয়ে উঠল, উপমার পালিয়ে যাওয়ার পেছনে একমাত্র আসমারই হাত আছে। অপরাধে কিছুটা হলেও সম্পৃক্ততা থাকলে মানুষকে তার থেকে মুক্তি পেতে ঝক্কি পোহাতে হয় বৈকি! আসমাও বুঝে গিয়েছিল চতুর শাশুড়ির চোখের সামনে দিয়ে মিথ্যেকে সত্যি বানাতে ঝামেলা পোহাতে হবে তাকে। তবু সে চেষ্টা করেছিল জোর গলায়। জান্নাতি সাহায্য করেছিল তাকে নিজের মতামত প্রতিষ্ঠা করতে। কিন্তু শিল্পীও তো আটঘাট বেঁধেই নেমেছিল। তাকে ট্যাকল দেয়া আসমার একার পক্ষে সম্ভব হয়ে উঠছিল না৷ শেষে দেখা গেল আসমা বাঁজা,অলক্ষ্মী-কুলক্ষ্মী অপবাদ দিয়ে তাকে বাড়ি থেকেই তাড়িয়ে দিচ্ছিল শিল্পী। সেসময়টায় কি যে ভর করেছিল তার ওপর! স্বামী,ছেলে কেউই আটকাতে পারছিল না। ভাগ্যিস চৌকাঠটা পেরোনোর আগে সেখানে এসে উপস্থিত হলো অতনু। এই রক্ষে। নইলে আজই বোধহয় শেষদিন হতো ওর এ বাড়িতে৷ প্রতিশোধটা আর পূর্ণ হতো কবে? মাত্র তো একজনকে সাজা দিতে পারল ও। অপরাধীর সংখ্যা এখনও কতখানি!
ফ্রেশ হয়ে এসে অতনু দেখল আসমা বিছানায় শুয়ে পড়েছে। ঘুমিয়ে গেল নাকি? ভ্রু কুঁচকে আয়নায় ওর শায়িত প্রতিচ্ছবি দেখে তোয়ালেতে মাথা মুছে নিলো। এরপর গরম কাপড় গায়ে চড়িয়ে আলো নিভিয়ে সোজা এসে ওর বুকে মুখ গুঁজে শুয়ে পড়ল৷ বলা বাহুল্য আসমা জেগেই ছিল। আচমকা উষ্ণ শরীরে শীতল স্পর্শ চমকে দিল ওকে। পূর্ব ভয়ের রেশ কিছুটা থেকে যাওয়ায় চমকে চোখ খুলে নড়ে উঠল। অতনু বুঝতে পারল ও ঘুমোয়নি। কিছু বলল না, নড়ল না অবধি।
খানিক বাদে শুধু বিড়বিড় একটা আওয়াজ শুনল আসমা,
"তৈরি থেকো, আগামীকাল থেকে একটা নতুন জীবন শুরু হতে চলেছে"
বুঝতে পারল না কিসের ইঙ্গিত করছে অতনু৷ বিশেষ আগ্রহও ওর হলো না। যেমন নিশ্চুপ ছিল, তেমনি করে চোখ মুদে ঘুমোনোর চেষ্টা করল। ঘড়ির কাঁটা থেমে থাকে না। ছোটো কাঁটাটা যত ডানদিকে সরে যাচ্ছিল ততই বাইরের আকাশ কুয়াশার চাদর সরিয়ে পরিষ্কার হয়ে উঠছিল। এদিকে সারাদিনের ধকলে দুটো প্রাণীর চোখজুড়ে গভীর ক্লান্তির ঘুম। স্বপ্ন কিংবা দুঃস্বপ্ন অতনু খুব কমই দেখে। মানুষের মস্তিষ্ক চিন্তামুক্ত থাকলে স্বপ্ন নামক বিভ্রমের আবির্ভাব ঘটে না। সেই যে একটা বাচ্চাকে নিয়ে অতনু ভয়ানক একটা স্বপ্ন দেখেছিল তারপর আজ। আজ অদ্ভুতভাবে ওর স্বপ্নে এক মায়াবতীর আবির্ভাব হলো যাকে ও চেনে না, কখনও দেখেনি৷ কিন্তু মায়াবতীর চোখজুড়ে অতল মায়ার সাগর। যে চোখে চোখ রাখলে অতনুর মনে হচ্ছে খুশি খুশি এই সাগরে ডুবে যেতে ও প্রস্তুত। অনিমেষ তার দিকে চেয়ে থাকায়ও কোনো ক্লান্তি নেই। বরং কিছুটা তাকিয়ে থাকলে ইচ্ছে করে অল্পখানি ছুঁয়ে দিতে। সে কি দূর আকাশে ভেসে বেড়ানো অপার্থিব ঐ সাদা মেঘগুলোর মতো? কে জানে! অতনু বরাবর নিজের মনের কথা শোনে। ভাল-মন্দ বাছ-বিচারে তার যায় আসে না। তাই মনটা যখন চাইল মোহিনী অমরাবতীকে একটু ছুঁয়ে দেখা দরকার, বিলম্ব করল না সে। ধীরপায়ে এগিয়ে গিয়ে তার আঙুলে আঙুল ছুঁয়ে ঘোরগ্রস্তের মতো বলল,
"আমার মরণ বুঝি এই কোমল হাতের ছোঁয়ায়ই"
সে কি কোনোভাবে চেনে অতনুকে? নইলে এত সহজবোধ্য হাসবে কেন! একরাশ প্রশ্ন জমিয়ে, অতনুকে বিস্মিত করে অল্প ঝুঁকে কানের কাছে মুখ নিয়ে সাবলীলভাবে প্রতুত্তর করল,
"আই ওন্ট লেট ইউ ডাউন। আই প্রমিস"
________________
কয়েক পশলা ভালোবাসা-বাসির পর উপমার কোলে মাথা দিয়ে ঘুমিয়ে গেল রওনক। সেই আট কি ন'বছর বয়স থেকে ঘুম পিছু ছেড়ে দিয়েছিল ওর। হারিয়ে যাওয়া ঘুম আজ সব একসাথে জটলা পাকিয়ে ফিরে এলো দু চোখের পাতায়। আসলে ভেতরে দহন থাকলে মানুষ ঘুমিয়েও শান্তি পায় না। অবর্ণনীয় কষ্ট, অপমান, যাতনা সব ঘিরে রেখেছিল রওনককে এতটাকাল। কোমল হাতের নিবিড় স্পর্শে কষ্ট ধুয়েমুছে না গেলেও প্রলেপ পড়ছে খানিকটা। তারই প্রতিক্রিয়া বহুদিন বাদের নিশ্চিন্ত ঘুম। প্রিয়তমের ঘুমন্ত মুখটার একাকংশ দৃষ্টিগোচর হচ্ছে উপমার। একদিকে মুখ রেখে উপুড় হয়ে শুয়ে আছে সে। পোশাকবিহীন নির্মেদ পিঠে কিছুক্ষণ পূর্বের ভালোবাসাবাসির চিহ্ন প্রকট। লম্বা লম্বা আঁচড়গুলো দেখে সহসা যেমন বিব্রতবোধ করল উপমা তেমনই একটা চিন্তার ঢেউ ওর মস্তিষ্কে আলোড়ন তুলল। খুব সাবধানে শব্দ না-হয় এমনভাবে বেডসাইড ডেস্কের ড্রয়ার খুলে অ্যান্টিসেপটিক খোঁজার চেষ্টা করল। পেল না। চাপা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে তাই আলতো হাতে ছুঁয়ে ছুঁয়ে দিতে লাগল ক্ষত গুলোকে।
মৃদু যন্ত্রণায় বার কয়েক নড়চড়ে উঠে পুনরায় স্ত্রীকে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে রাখল রওনক। উপমা হেসে ফেলল। পিঠের ওপর থেকে হাত সরিয়ে রওনকের ঘনচুলে আঙুল ডুবিয়ে নীচু হয়ে কপালে আলতো করে চুমু খেয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,
"পাগল ছেলে, আমি আপনাকে এত্তগুলো ভালবাসি"
উপমা ভেবেছিল কোনো উত্তর বোধহয় আসবে না মানুষটার থেকে। ঘুমিয়েই সে কাঁদা। কিন্তু তাকে ভুল প্রমাণিত করে ঘুম জড়ানো অস্পষ্ট স্বরে তার পাগল প্রেমিক পুরুষ জবাব দিল,
"আমিও"
বিস্ময়ের চাইতে আনন্দ বেশি হলো উপমার। দয়িতকে পাল্টা জড়িয়ে ধরে খিলখিল করে হেসে উঠল সে৷ আজ তারচেয়ে সুখী এই পৃথিবীতে আর কেউ নেই;কেউ না।
দরজায় তীব্র কড়াঘাতের শব্দে রওনকের ঘুমটা ছুটে গেল আগে। চোখ মেলতেই তীব্র আলোর ছটা দৃষ্টিতে বিঁধে গেল তার। পিটপিট করে বার কয়েক পলক ফেলে স্বাভাবিক হয়ে সে উঠে বসল। আলস্যে ঘরময় চোখ বুলিয়ে বোঝার চেষ্টা করল কোথায় আছে এখন! অলস দৃষ্টিজোড়া সময় নিয়ে ঘুরতে ঘুরতে নিজের ঠিক ডান পাশে শায়িত একটি মিষ্টিমুখে আটকে গিয়ে অচীরে ঘুমের রেশ কাটিয়ে দিল। অনভ্যস্ত হাতে তার শার্ট গায়ে চড়িয়ে বোতাম খোলা শার্টটা বুকের কাছে চেপে ধরে ঘুম মগ্ন ঘুম পরীকে দেখে অন্তর জুড়িয়ে গেল রওনকের। ঈষৎ ঝুঁকে প্রিয় চিবুকটায় ঠোঁট বুলিয়ে মসৃণ চুলগুলো ঘেঁটে দিল৷ আপনা থেকে ওর ঠোঁট জুড়িয়ে আসছে অনাবিল হাসিতে। এই হাসি সুখের হাসি। রওনকের জীবনে সুখের গল্প হাতে গোনা কয়েকটা। হয়তো খুব কম;তবে কম হলেও গল্প গুলো ঠিক খরার পরের প্রথম বারিধারার মতো প্রশান্তিদায়ক। রওনক জানে না এই সুখের গল্পটা তার জীবনে ঠিক কতদিন স্থায়ী হবে, তবে সে আপ্রাণ চেষ্টা করবে একফালি সুখটুকুকে আজীবন নিজের সাথে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে রাখতে।
"কিরে ব্যাটা এখনও উঠিসনি? বেলা গড়িয়ে দুপুর হলো এদিকে"
বাইরে থেকে মিজানের ডাকে সম্বিত ফিরল রওনকের। গাঢ় হেসে উপমার গায়ের ওপর ব্ল্যাঙ্কেট চাপিয়ে দিয়ে হাতমুখে পানি দিয়ে খালি গায়েই বেরিয়ে গেল সে। দরজা খুলেছে কি খোলেনি হুড়মুড় করে ওপাশ থেকে খাবারের প্যাকেট হাতে মিজান ঢুকে পড়ল ফ্ল্যাটে। ঢুকেই রওনকের বেশভূষা দেখে ওর চোখ রসগোল্লা সাইজের হয়ে গেল। মিজানের বেহায়া আচরণে রওনক ভারী বিরক্ত। খাবারের প্যাকেট কেড়ে নিয়ে সোফার ওপর বসতে বসতে বলল,
-- বেহায়ার মতো তাকায় রইছিস ক্যান?
-- মাম্মা তুমি তো এক রাতেই..
-- এই চুপ। মুখ সামলায় কথা বল। ভেতরের ঘরে তোর ভাবী আছে না? শুনতে পেলে কি ভাববে।
-- ওহ হ্যাঁ তাইতো। আহম৷ কিন্তু বন্ধু তুই এক কাজ কর কাপড়চোপড় গায়ে দিয়ে আয়। নইলে তো আমি আমার আগ্রহটাকে দমায় রাখতে পারব না।
-- সেটা তোর ব্যাপার। আমি তো এভাবেই থাকব, এখন যেভাবে আছি। তুই তোর ব্যাপার বুঝে নে।
-- উফফ শালা আমিও কিন্তু একদিন বিয়া করব। তারপর দেখিস।
-- আচ্ছা দেখবনে। এখন বল ওদিকের কি অবস্থা? কোনো হাঙ্গামা করেনি তো অতনু!
-- না তা করেনি। কিন্তু অবস্থা আসলে সুবিধের না। নিজাম চৌধুরী এক ধাক্কায় মৃত্যু শয্যায় পৌঁছে গেছেন। অ্যাটাক যে তোর ওপর কোনদিক দিয়ে আসবে এখনও বুঝতে পারছি না। তোকে আরও কিছু দিন লুকিয়ে থাকতে হবে রওনক।
দুশ্চিন্তাগ্রস্ত গলায় কথাগুলো যখন বলছে মিজান তখন ক্ষুধার পেটে একমনে আলু বোখারার চাটনি বিরিয়ানিতে মিশিয়ে মুখে পুরছে রওনক। দেখে মনে হচ্ছে কথাগুলো ঠিকঠাক তার কানে ঢুকছে না বোধহয়, কিন্তু সব কথা সে আসলে মনোযোগ দিয়ে শুনছে। বন্ধু বলা শেষ করে যখন থামল, বোতল থেকে কিছুটা পানি গলায় ঢেলে রওনক বলে উঠল,
-- ভাবছি আজ বাড়ি যাব উপমাকে নিয়ে। গতকাল যেভাবে বেরিয়ে এসছি, বাড়ির সবাই নিশ্চয়ই দুশ্চিন্তা করছে আমাকে নিয়ে।
-- এসব করতে যাইস না রুনু , বিপদে পড়বি।
-- বিপদকে ভয় পেলে চলবে মিজান? আর যাইহোক তোর বন্ধু কাপুরষ নয়৷ আগে পরিস্থিতিটাকে সামলানোর চেষ্টা করে দেখি। সামলাতে পারলে ভাল, নইলে তোরা যা বলবি সব শুনব।
-- আনিস ভাইকে কি...
-- খবরদার। ওকে জানানোর মতো ভুল একদম করবি না। যদিও এতক্ষণে খবর ওর কানে চলে গেছে, কিন্তু আমার ঠিকানা যেন ও না পায় মিজান। এতদিন বুঝতে পারিনি, আমার জীবনের সবচেয়ে বড় শত্রু আসলে আনিস শেখ।
-- কি বলছিস এগুলো!
-- ঠিকই বলছি। আমাকে নিয়ে নিশ্চয়ই ওর কোনো পরিকল্পনা আছে। এই কদিনে অনেককিছু চোখে পড়েছে আমার, তোকে বলার সময় হয়ে ওঠেনি। তবে এতটুকু জেনে রাখ উপমা আর শওকতের বিয়ের ব্যাপারে ওর ইন্ধন ছিল বেশি। ও যদি আমার পক্ষেই থাকত তাহলে আজ প্রেমিকাকে নিয়ে পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করতে হতো না আমাকে।
বন্ধুর কথা শুনে সত্যি ভারী অবাক হলো মিজান। এতক্ষণে যেন তার মস্তিষ্কের জট অল্প অল্প করে খুলছে। ভাগ্যিস গতকাল আনিস শেখকে জানাতে চেয়েও কি ভেবে পিছিয়েছে। নইলে আজ ভয়াবহ কিছুর সম্মুখীন হতে হতো তার বন্ধুটিকে, তারই ভুলের কারণে।
নিজেকে কোনোদিন ক্ষমা করতে পারত না মিজান, কোনোদিন না।
চলবে,
Sara