চিঠি দিও
৫৩
__________________
"আর কতদিন জোর করে নিঃশ্বাসটুকু আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকবেন বাবা? কৃত্রিম এই যন্ত্রগুলো খুলে দিলেই তো লাইফ হুইল থেমে যাবে আপনার। আমি ভেবেছিলাম শেষ শয্যায় এসে অন্তত ছেলের কষ্ট কিছুটা কমিয়ে দেবেন। কিন্তু এখন দেখছি আমাকেই উপযাচক হয়ে..."
তর্জনীর সাহায্যে চশমা ঠিকঠাক করে নিয়ে শান্তভাবে ভ্যান্টিলেটর খুলে দিল শওকত। প্রকৃতির বিরুদ্ধে গিয়ে যে যন্ত্রগুলো হৃদপিণ্ডের গতিকে জোরজবরদস্তি স্বাভাবিক ছন্দ দিতে তৎপর, সেই যন্ত্রের সাপোর্ট হারানোর পর হাসপাতালের বেডে রীতিমতো তড়পাতে শুরু করল নিজাম চৌধুরীর স্বল্পপ্রাণ দেহ। অপরদিকে প্রবল উচ্ছ্বাস চেপে রেখে ঢেউহীন জলরাশির স্তব্ধতা ধারণ করে একদৃষ্টে শওকত উপভোগ করতে লাগল পিতা নামক পাপী লোকটার শেষ মুহুর্তে বাঁচার আকুতি। সম্পূর্ণ চেতনাহীন, বোধ-বুদ্ধিহীন লোকটার বাঁচার তাগিদে বন্ধ দুচোখের কোল বেয়ে কেমন ঝর্ণাধারার মতো অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। অক্লান্ত দৃশ্যটা উপভোগ করার পর যখন নিজাম চৌধুরীর শরীরে খিচুনির উপক্রম দেখা দিল তখুনি আবার চট করে বিচ্ছিন্ন সংযোগ জুড়ে দিয়ে হৃদযন্ত্র সচল করার ব্যবস্থা করে দিল শওকত। এত সহজ মৃত্যু তো ওর মানায় না৷
এককালে মায়ের কাছে শুনেছে শয্যাশায়ী মানুষের রুহ যেন শান্তিতে বিদায় নিতে পারে সেজন্য লোকে নাকি তাকে ধর্মীয়গ্রন্থ পাঠ করে শোনায়। শওকত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সেও শোনাবে আজ তার প্রিয় বাবাকে কিছু। তবে তা ধর্মীয়গ্রন্থ নয় বরং পাপে পূর্ণ বাবার নিজের জীবনগল্প। এত মহৎ মহৎ অপকর্ম তিনি করেছেন, সেগুলোর স্মৃতিচারণ করতে হবে না! বিলম্বের অবকাশ না রেখে শেলবিদ্ধ চোখে পালস্ চেক করতে করতে ঈষৎ ঝুঁকে জ্ঞানহীন পিতার কানের কাছে মুখ নিয়ে শওকত বলতে আরম্ভ করল,
-- আপনার কৃতকর্মের ইতিহাস কোনদিক থেকে তুলে ধরি বলুন তো?
একা একা ভাবুক হয়ে পরে বলল,
-- ঠিকাছে, যাঁর সাথে আমার অস্তিত্বের সম্পর্ক সেদিক থেকেই বরং বলতে শুরু করি। এই যে ভ্যান্টিলেটর খুলে দিলাম বলে খানিক আগেও যেভাবে তড়পে তড়পে মৃত্যুদুয়ারে পৌঁছে যাচ্ছিলেন এরচেয়েও বেশি একদিন তড়পেছিল আমার মা। জীবিতবস্থায় মৃত্যুর স্বাদ আপনি পেলেন তো মাত্র ক'মিনিট। অথচ আম্মা! তিনি অর্ধেকটা জীবন লাশ হয়ে বেঁচে থাকার অভিনয় করে গিয়েছেন৷ ছেলে হয়ে সেসব দৃশ্য অ্যাকসেপ্ট করা কত যন্ত্রণার আপনি জানেন?
উঁহু জানবেন কি করে! যে ব্যক্তি স্বার্থসিদ্ধির জন্য নিজের জন্মদাতা বাবা-মাকেই পথ থেকে সরিয়ে দেয় তার ভেতরে ইমোশন আশা করাটা বোকামি ছাড়া অন্যকিছু নয়।
আম্মার সাথে না-হয় আপনার আন্ডারস্ট্যান্ডিং হয়নি ঠিকঠাক, কিন্তু আমি আর শরণ্যা? আমরা তো ছেলেমেয়ে আপনার, নিজ রক্ত। আমাদের সাথে তাহলে এত নিষ্ঠুরতা, এত অন্যায় কেন? বাবা-র অবহেলা না নিতে পেরে মা'কে নিয়ে বাঁচতে চেয়েছিলাম আমরা ভাইবোন। আপনি সেটাও করতে দিলেন না। বিয়ের নাম করে পাঠিয়ে দিলেন শরণ্যাকে অন্য শহরে সংসার-সংসার খেলতে! ঐ ছেলেটাকে আমার বোন ভালোবাসে কি না, ওর ক্যারেক্টার সার্টিফিকেট কেমন কিচ্ছু জানার চেষ্টা করলেন না৷ হঠাৎ এদেশ থেকে ওইদেশে ফ্লাই করে গেলেন আর কয়েকদিনের বন্দোবস্তে বিয়ে! শরণ্যা আপনার বাধ্যগত হতেই পারে কিন্তু আমি নই। আপনি জানতেন তাই না। ইউ রেকগনাইজ ইওর সান ভেরি ওয়েল দ্যেন। কাদামাটির মতো ছিলাম আমি। মায়ের আদর্শে বড় হওয়া ছেলে, ইন্ট্রোভার্ট। নিজের জগতে ব্যস্ত থাকতাম। সেটা আপনার সইল না। নিজের মতো বানাবেন বলে আমার গ্রাজুয়েশন কামপ্লিট না হতেই জোরজবরদস্তি করে টেনে আনতে চাইলেন এদেশে, ন্যাস্টি পলিটিক্সে! আর যখন আমি রাজি হলাম না, তখন। তখন মেন্টাল টর্চার শুরু করলেন। আম্মাকে শাসিয়ে, আমার ক্যারিয়ার হুমকির মুখে পাঠিয়ে রিভেঞ্জ নিচ্ছিলেন।
নিজের ছেলের সাথে রিভেঞ্জ! মুখ বুঁজে সহ্য করেছি সেসময় সব৷ আম্মার মুখের দিকে তাকিয়ে কিচ্ছু বলিনি, কিচ্ছু না৷
স্নায়ুর উত্তেজনা বৃদ্ধি পাচ্ছে উপলব্ধি করে একটু থামল শওকত। নিঃশব্দে উঠে গিয়ে কেবিনের ভারী পর্দা সরিয়ে কাঁচ ঘেরা দেয়াল ভেদ করে ব্যস্ত নগরীর দিকে মন দেয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু আজ যে তার স্নায়ু ঠিক বশে আসার নয়। বৃথা চেষ্টায় তাই সময় অপচয় না করে পুনরায় ফিরে গিয়ে বেড চাপড়ে হিসহিসিয়ে বলল,
-- আপনার এসব টর্চার আমাকে ফেরোশাস বানিয়ে দিয়েছে, ব্লাডি মার্ডারার বানিয়ে দিয়েছে। রক্ত কথা বলে তাই না বাবা? ডোন্ট ওয়ারি আপনার ইচ্ছে পূরণ করব এবার। একদম কাউন্টারপার্ট হয়ে আমার প্রতিশোধ পূর্ণ করব। প্রথম ভিক্টিম কে হবে জানেন? আপনি।
পুত্রের নিষ্ঠুর কথাগুলো কিছুটা বোধহয় বোধগম্য হলো নিজাম চৌধুরীর। মনে হলো খানিক কেঁপে উঠলেন তিনি। বন্ধ চোখের পাতায়ও কাঁপুনির রেষ।
সবটা দেখে ক্রূর হেসে পুনরায় ভেন্টিলেটরের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিল শওকত। এবং চোখের সামনে অল্পসময়ের মধ্যে তড়পাতে তড়পাতে পিতার শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ আনন্দের সাথে উপভোগ করল সে। সব যখন নিস্তব্ধ হয়ে গেল তখন ঘরঘর শব্দে স্টিলের টুল টেনে নিজাম চৌধুরীর লাশের পাশে বসে হিম কণ্ঠে স্বগতোক্তি করল,
-- গুড বাই বাবা। মনে আছে একদিন প্রমিস করেছিলাম? আই'ল বি দেয়ার টিল দ্য এন্ড অফ ইওর লাইফ। দেখুন আমি আমার কথা রেখেছি। ঠিক আপনার বাধ্য ছেলের মতো। খুশি হয়েছেন না আপনি? আমি জানি হয়েছেন ;মা-ও বড্ড খুশি হয়েছে। এতদিনে নিশ্চিত তার সৌল তৃপ্তি পেয়েছে। তবে আমার রিভেঞ্জ কি পূর্ণ হলো! আপনার কি মনে হয় বাবা?
গ্রস্তের মতো নিথর লাশের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন ছুঁড়ল শওকত। বিপরীতে উত্তরের অপেক্ষা অবশ্য করল না, করে লাভও হবে না। মৃতেরা কখনও জবাব দিতে পারে না। তাই সে নিজে থেকেই বলে গেল,
-- উঁহু এতটুকুতে আমার সৌল এখনও স্যাটিসফায়েড নয়। আরও একজনের রিভেঞ্জকে যে আমি নিজের করে নিয়েছি। আসমা; দ্য লাভ অফ মাই লাইফ। বেঁচে থাকলে শুনলে বোধহয় অবাক হতেন তাই না? আসমাকে আমি কীভাবে চিনি। সে অনেক গল্প। তবে এতটুকু বলে দিই ওকে চিনেছি আপনার কারণে। আপনি যে অন্যায়গুলো ওর সাথে করেছিলেন সেগুলোর মাধ্যমে চিনেছি ওকে।
বলতে বলতে দৃষ্টি ঘোলাটে হয়ে এলো শওকতের। স্মৃতিগুলো স্পিন হুইলের মতো ঘুরতে ঘুরতে কিছুটা পেছনে চলে গেল। ঠিক সেসময়টায়, যখন একটা মেডিকেল রিসার্চ পারপাসে ওই দেশের প্রখ্যাত ক'জন ডাক্তারের সাথে শওকতকেও আসতে হয়েছিল বাংলাদেশে। এবং কাজের সূত্রে পরিচয় হয়েছিল ডাঃ নীনা আফরোজের সাথে। নীনা মানুষ হিসেবে বড্ড ভাল, অতিথি পরায়ণ। শওকতের টিমটা যতদিন ময়মনসিংহে ছিল, অ্যাকোমোডেশনের ব্যবস্থা নীনা আফরোজ করে দিয়েছিলেন তাঁদের। শেকড়কে ঘিরে অনেক খারাপ স্মৃতি শওকতের মস্তিষ্কে জমা হলেও টানটা বোধহয় ও ভুলতে পারেনি। তাই অল্প সময়ে নীনা আফরোজের সাথে বেশ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। যদিও শওকত নীনার জুনিয়র, তবু তাকে বিশ্বাসযোগ্য মনে করে নিজের অনেক পেশেন্টের হিস্ট্রি শওকতের সাথে শেয়ার করেছিলেন ডাঃনীনা। বলা বাহুল্য তাদের মধ্যে আসমা ছিল অন্যতম। নীনা আসলে জানতেন না যে ভিক্টিমের কথা তিনি শওকতের সামনে বলছেন, সে ভিক্টিমের অপরাধী খোদ শওকতের পিতা। জানবেনই বা কি করে নিজের ঐ পরিচয়টা বরাবর সে আড়াল করতেই পছন্দ করত কি না!
যাকগে, ডাঃ নীনার মুখে পিতার অপকর্মের গল্প শুনে শওকতের যতখানি রাগ জন্মায় পিতার ওপর, ততখানিই সহানুভূতির জন্ম নেয় নিষ্পাপ মেয়ে আসমার ওপর। ট্রিটমেন্টের বাহানায়ই সে আসমার সাথে দেখা করার ইচ্ছে পোষণ করে। নীনাও রাজি ছিলেন দেখা করাতে, তবে সেসময় মায়ের শারীরিক অসুস্থতার বার্তা আসায় এমারজেন্সিতে তাকে ফিরে যেতে হয় তৎক্ষনাৎ। এরপর বহুদিন উপর্যুক্ত কারণের অভাবে শওকতের এদেশে আর পা রাখা হয় না। মায়ের মৃত্যুও বেশ বড় রকমের আঘাত হানে হৃদয়ে। সব মিলিয়ে সে কিছুটা ভুলতেই বসে আসমা নামক মেয়েটির জীবনগল্প। ডাঃনীনা না থাকলে বোধহয় ভুলেই যেত। কোনো একদিন আসমার কোনো এক সাফল্যের ছবি মেইল যোগে নীনা পাঠিয়েছিলেন শওকতকে। শওকত কিছু পরামর্শ দিয়েছিল আসমার কেসটায়, সেটারই কৃতজ্ঞতায় পেশেন্ট এবং পছন্দের ছাত্রীর পরিবর্তিত জীবনের চিত্রসমেত কৃতজ্ঞতা বার্তা পাঠিয়েছিলেন নীনা। সে-ই আসমাকে প্রথম দেখা শওকতের। অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই প্রথম দেখায়ই স্নিগ্ধ সৌষ্ঠব কলেবরের মায়ায় বাঁধা পড়ে গিয়েছিল শওকত৷ এক টুকরো নজরকাঁড়া হাসি নিমেষে ছুটিয়ে নিয়ে আসতে চাইছিল তাকে এদেশে সুদূর ঐ মার্কিন মুল্লুক থেকে। কিন্তু পিছু ঘুরে নিজের কালিমালিপ্ত অবয়ব তাকে বাঁধা দিয়েছে, পিতার কর্মকাণ্ড তার পায়ে শিকল পরিয়ে দিয়েছে। নিজেকে বুঝতে, অনুভূতির সঠিক পরিমাপ করতে সময় নিয়েছে শওকত। কিন্তু বেচারা বুঝতে পারেনি সময় নিতে গিয়েই আসমাকে চিরতরে হারিয়ে ফেলবে ও। দীর্ঘটা সময় পার করার পর, মনের সাথে বোঝাপড়া শেষে সে কিন্তু স্বদেশের মাটিতে পা রেখেছিল একমাত্র আসমাকে আপন করে নেবে বলেই। কিন্তু তার সমস্ত আশায় জল পড়ে আসমার বিয়ের খবর কানে এসেছে। অবশ্য তখনও শওকত জানত না আসমা যাকে বিয়ে করেছে সে মানুষটার পরিচয় কি! কিংবা বিয়ের পেছনে আসমার আসল উদ্দেশ্যটা। বরং শুরুর আগেই ভেঙে যাওয়া সম্পর্কের ওপর মনঃক্ষুণ্ন ছিল বল, তখন জানার চেষ্টাও করেনি। তবে নিজের ওপর সে রুষ্ট থাকতেই পারে, সৃষ্টিকর্তা তো ছিলেন না। তাই খুব অদ্ভুতভাবে এই শহরে একদিন আসমার সাথে সামনাসামনি দেখা করিয়ে দিলেন তিনি শওকতকে। ঐতো যেদিনটায় গরম পানির পাত্র পায়ের ওপর পড়ে আসমা ফেইন্ট হয়ে গেল! রাউন্ডে এসে কেবিনে তার না হওয়া প্রিয়তমাকে দেখে বিরাট ধাক্কা খেয়েছিল শওকত। সৃষ্টিকর্তার ওপর তার বিশ্বাস ছিল না কখনও। কিন্তু সেদিনের সে ম্যাজিক্যাল সন্ধ্যেটা অদেখা বিধাতার প্রতি কৃতজ্ঞতা জাগিয়ে দিয়েছিল তার। আপন করে না পাক, কিন্তু প্রিয়তমাকে চোখের দেখা দেখবে বলে কতখানি তৃষ্ণার্ত ছিল শওকত সেদিন খুব করে উপলব্ধি করেছিল৷ ট্রিটমেন্টের ফাঁকে সুযোগ পেলেই তৃষ্ণাটুকু মিটিয়ে নিতে নিতে ক্রমে তার লোভ বেড়েছে বৈ কমেনি। বলতে গেলে এরপর এই লোভ থেকেই আসমার বিবাহিত জীবন সম্পর্কে তার খোঁজ নেয়া। বজ্রপাত তো মাথায় তখন হয়েছিল, যখন সে জানতে পারল আসমার স্বামী আর অন্যকেউ নয় তারই অন্যতম অপরাধী অতনু হাওলাদার। সব জানতে পেরে শওকত অবাক হয়নি ঠিক। বরং পুরো ঘটনাটা তার কাছে বিরাট রহস্য মনে হয়েছিল। গোপনে রহস্যের জট ছাড়তে আসমার সব অ্যাকশনের ওপর নজর রাখতে হয়েছিল তাকে। কাজটা কঠিন ছিল না। অতনুর অনুচরদের মধ্যে নিজের একজন লোক পাঠিয়েছিল শওকত। সে-ই টাইম-টু টাইম আসমার সব রকমের খোঁজ এনে দিত। বিনিময়ে বিশাল অঙ্ক গুণতে হয়েছিল শওকতকে, তবে সেটা কোনো বড় ব্যাপার নয়।
ঐ সংসারে আসমার অবগুণ্ঠিত সিক্রেটগুলো শুধুমাত্র আসমা, শওকত এবং সেই অনুচর জানত। শওকত বুঝে গিয়েছিল আসমা আসলে প্রতিশোধ চায়। নিজের সাথে হওয়া অন্যায়গুলোর বিচার নিজ হাতে করতে চায়। সত্যিটা উপলব্ধি করতে পেরে প্রসন্নতায় মন ভরে গিয়েছিল শওকতের। দ্বিতীয়বার আসমাকে নিজের করে পাওয়ার বাসনা ভীষণভাবে আঁকড়ে ধরেছিল। এজন্য নিজের প্রতিশোধ ভুলে আসমাকে ন্যায় পাইয়ে দিতে তৎপর হয়ে উঠেছিল শওকত। ফলস্বরূপ জরুরি ভিত্তিতে ট্রান্সফারের ব্যবস্থা করে অন্যতম সহযোগী এবং প্রিয় বন্ধু রকিবুলকে ডেকে নিয়েছিল এই শহরে। শওকত চৌধুরী, ছোটোখাটো কোনো নাম নয়। রাজনীতিকের ছেলে সে, ক্ষমতা তার হাতেও নেহায়েত কম?
অতনু না করলেও উর্বশী নামক মেয়েটার হত্যার পরিকল্পনা কিন্তু শওকত এবং রকিবুল মিলেই আগে বানিয়েছিল। তাদের পরিকল্পনা ছিল এই, উর্বশীকে হত্যা করে অতনুকে ফাঁসিয়ে কারারুদ্ধ করা। এরপর ওকে নিজ হাতে পথ থেকে সরাতে বন্ধুকে সাহায্য করত স্বয়ং রকিবুল। সময় গিয়ে সে কষ্টের ভার নিজ কাঁধে আর তুলতে হয়নি ওদের কাউকে। এর পূর্বেই নিজাম চৌধুরীর সাথে ঝামেলায় জড়িয়ে ক্রোধান্বিত অতনু অজ্ঞাতে শওকতের পরিকল্পনাকে বাস্তবায়ন করে দিল। তীব্র বাকবিতন্ডার পর মাতাল অতনুকে জিপ নিয়ে বেরিয়ে যেতে দেখেছিল শওকত হাসপাতাল থেকে ফেরার পথে। নিকষ আঁধারে একটা ইচ্ছে বড্ড মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছিল সে সময়। অতনুকে এই পথেই শেষ করে দেয়! কি ভেবে যে নিজেকে আটকাল এরপর৷ কিন্তু অনুচরকে নজরদারি করতে পাঠিয়েছিল পুনর্বার৷ উর্বশীর খুনটা যখন হলো, প্রথম খবর ভীতসন্ত্রস্ত লোকটাই তৃতীয় পক্ষ হয়ে কানে তুলে দিয়েছিল শওকতের। শুনে চওড়া হাসি ফুটে উঠেছিল শওকতের ঠোঁটের কোণে৷ অতনু হাওলাদার কখনো জানতে পারবে না স্পটে অপ্রত্যাশিতভাবে পুলিশ পৌঁছে যাওয়ার ঘটনা কাকতালীয় নয় কিংবা রওনকেরও সাজানো নয়। চেসের রাজা আসলে অন্যকেউ। যার দিকে অস্ত্র তাক করার দুঃসাহস কখনো অতনু দেখাতে পারবে না।
তবে শওকতেরও ভুল হয়েছিল; অতনুকে চিনতে, অনুচর বাছাই করতে। নইলে ছোট সাফল্যের পর নিজের পিতার কারণে ওভাবে হেরে যেতে হতো না তাকে। শওকত আসলে ভাবতে পারেনি নিজাম চৌধুরী অতনুর মাথার ওপর বটবৃক্ষের ছায়া। ওঁর কারণেই হাজারবার বিপদের মুখ থেকে ফিরে এসেছে অতনু ফিনিক্সের মতো। যখন জানতে পেরেছে তখন ঘুরেফিরে নিজের পিতাকে পথ থেকে সরানোর জন্য পুনঃ প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে হয়েছে।
প্রতিজ্ঞা পূরণে অবশ্য বিলম্ব বিশেষ হলো না। এবার তবে অতনুকে হারাতে পারবে শওকত। পূর্ণ করতে পারবে প্রিয়তমার প্রতিশোধ।
কেবিনের দরজায় ঠকঠক শব্দ এবং নার্সের কণ্ঠস্বরে অতীতের সুতো ছিঁড়ে অচীরে বর্তমানে ফিরল শওকত৷ উঠে যাওয়ার পূর্ব মুহুর্তে ধীরলয়ে লাশের উদ্দেশ্যে বিড়বিড় করল,
-- এখন আমি কি করব জানেন? আপনার খুনের সম্পূর্ণ দায়টা মিস্টার হাওলাদারের ওপর চাপিয়ে দেব। তার সর্বোচ্চ সাজা যেন হয় আমি শওকত চৌধুরী নিজে দাঁড়িয়ে থেকে নিশ্চিত করব।
আ..আমি আসমাকে ভালোবাসি বাবা। ভীষণ, ভীষণ ভালোবাসি। সব হারিয়ে একমাত্র ওকেই তো পেয়েছি অবলম্বন হিসেবে৷ হারাতে দিই কি করে! শীইজ মাইন, অনলি মাইন।
যেকোনো পরিস্থিতিতে ওকে আমার চাই ব্যাস।
____________
হোন্ডা চালানোর ফাঁকে ঘনঘন আয়নায় স্ত্রীর মলিন মুখখানা দেখে দীর্ঘশ্বাসের কুণ্ডলী বুকের ভেতর ঘূর্ণিপাক খেয়ে উঠছে রওনকের। মূল শহর ছেড়ে অনেকটা বাইরে চলে এসেছে ওরা। সূর্য পশ্চিমাকাশে হেলে পড়ে সাঁঝবার্তাও নিয়ে আসছে আপন গতিতে। শীতকালে বেলা এত ছোট হয়ে যায়!
এসব এলাকায় ডাকাতের উৎপাত বেশ। বউয়ের সামনে যেন অস্ত্র তুলতে না হয় এজন্য রওনক গতিরোধ করছে না। একভাবে এগিয়ে চলছে গ্রামের পথে। যা কাণ্ড ঘটল খানিক পূবে! জীবন শুরুর পূর্বেই মুহুর্মুহু এসব ধাক্কা, আঘাত সারতে মেয়েটার যে ক'দিন লেগে যায়।
হ্যাঁ, অপ্রত্যাশিত হলেও শশুরালয়ে ঠাঁই হয়নি উপমার। একবুক আশার বিপরীতে নির্দয়ভাবে শূন্যবুকে চৌকাঠের বাইরে বেরিয়ে আসতে হয়েছে স্বামীর হাত ধরে। নাহ্ রওনকের বাবা ঠিক ছেলের বউ হিসেবে তাকে এবং তাদের অদ্ভুত এই বিয়েটাকে মেনে নেননি, বিষয়টা তা নয়। উপমাকে মেনে নেয়নি আসলে রওনকের বড় ভাই এবং তাঁর স্ত্রী হাসনা। কারণ? কারণটা তার সেজ ভাই অতনু হাওলাদার। উপমার এখনও বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে, নিজের সবচেয়ে প্রিয় ভাইটিকে এতদিন যে নজরে সে দেখে এসেছে, তার সম্পূর্ণ বিপরীত অস্মিতা সে ধারণ করে রাখে সবসময়। মুখোশ, একটা নোংরা মুখোশ পরে ভালো সাজার অভিনয় করে। যে ভাইকে সে ফেরেশতা মনে করে সম্মান করে, নিরেট সাদামাটা মনের একজন মনে করে আনন্দিত হয় তাকে নাকি আজ খুনীর বেশে দেখতে হবে, এও মানা যায়!
কষ্ট-যন্ত্রণা নাকি ক্রোধ। বুকের ভেতরটায় যেন ঝর্ণা ধারার ন্যায় রক্তলহরী ছুটতে আরম্ভ করেছে উপমার। অসহনীয় জ্বালা কাউকে ডেকে না সে শোনাতে পারছে, না বোঝাতে পারছে। সৃষ্টিকর্তার কাছে সমস্ত স্বত্তা কেবল চিৎকার করে অভিযোগ জানাচ্ছে এসব শোনার আগে সে বধির হলো না কেন!
ওদিকে প্রিয়তমার গহীনের ঝড় খুব করে আঁচ করতে পারছে রওনক। ঝড়ের ধাক্কা তাকেও কাবু করেনি তা নয়। সে তো অন্য আরেক প্রলয়ে ভেসে যাচ্ছে। পিতার পর পরই যে দু'জন মানুষকে সে ভরসা, সম্মান এবং ভালোবাসার আসনে বসিয়েছিল একদিন, তাঁরা আজ ওকে ভুল বুঝে সদ্য পরিণীতাসহ নির্বাসিত করেছে। এ যে রওনকের জীবনে সবচেয়ে বড় ধাক্কা। নিজের এ ভগ্নদশায় আরেকটা ভাঙাচোরা মানুষকে সে কি করে সামলাবে!
চলবে,
Sara