চিঠি দিও
শেষ পর্ব
_____________
কুয়াশায় মুখ লোকানো প্রকৃতি৷ দেখে মনে হচ্ছে খুব সকাল কিংবা বিকেলের কোনো একটা সময় হবে। কারণ শৈত্যপ্রবাহ ছাড়া এত কুয়াশা বেলা করে তো দেখা যায় না৷ সঙ্গে ঘড়ি থাকলে অবশ্যি এত হ্যাপা পোহাতে হতো না; চট করে সময়টা দেখে নেয়া যেত।
অতনু যেখানে বসে আছে, জায়গাটা ওর কাছে অপরিচিত। বন পেরিয়ে কোনো খাদের কিনারা। পাশে বয়ে চলেছে অবিরাম ছন্দের স্রোতস্বিনী জলধারা। গভীরচিত্তে অনুভব করলে মনে হয় কল-কল, ঝর-ঝর ধুনে নির্ঝর যেন নৈসর্গিক কোনো নাচের মুদ্রা তুলছে।
সর্পিল জলধারার উচ্ছ্বাস নিজের খুব কাছে থেকে শুনতে পাচ্ছে অতনু, অনুভব করতে পারছে শীতল জলের ছাঁট; কিন্তু, কিন্তু খুব অদ্ভুতভাবে নয়নাভিরাম দৃশ্যটা সে দেখতে পারছে না। দৃষ্টিশক্তি যেন ম্লান তার। চোখ মুছে কতবার পলক ফেলে চেষ্টা করল, কিন্তু কই? কালো পর্দা ছাড়া কিছুই নেই দৃষ্টিসীমায়। হতাশ হলো অতনু। মাথা নুয়ে আক্ষেপের সাথে ভাবতে লাগল,
"পৃথিবীর এত বৈচিত্র্যময় সৌন্দর্য খুব কাছে থেকে অনুভব করে তাকে দেখতে না পাওয়ার যন্ত্রণা সৃষ্টিকর্তা কেন দিলেন? দুচোখ ভরে যদি সৃষ্টির সৌন্দর্য আর প্রকৃতির মাধুর্য না-ই দেখতে পারবে, তাহলে নশ্বর পৃথিবীর বুকে বেঁচে থেকে তার লাভ কি?"
ভাবনা যখন এ পর্যায়ে এসে থেমে গেল, তখনই পেছন থেকে পানি মাড়িয়ে আসা ছলাৎ ছলাৎ শব্দধ্বনি ক্ষীণ হয়ে তার কর্ণদ্বয়ে আঘাত করল। স্বীয় অস্তিত্ব ব্যতিত দ্বিতীয় কোনো জীবের উপস্থিতি অনুভব করে কৌতুহলে সে শুধল,
-- কে?
-- তোমার মৃত্যু।
ঝর্ণার কলতান ছাপিয়ে অজ্ঞাত মেঘমন্দ্র ধ্বনি দূর পাহাড়ের গায়ে ধাক্কা খেয়ে প্রদক্ষিণ করে নিলো অতনুকে ত্রাসরূপে। এবং কোনো প্রতিক্রিয়া দেখানোর পূর্বে সমর্থ হাতের আঘাতে ছিটকে পড়ল সে খাদের কিনারা থেকে। দ্রুত পতনশীল শরীরটা ভাবনার অবকাশ পেল না;শুধু সিনেমার রিলসের মতো সে তার "মৃত্যু" নামক শ্বাশত সত্যের অবয়ব দেখতে পেল। অবয়বের নির্দিষ্ট মুখ নেই। তবু তার মনে হলো আসমা, রওনক, উপমা, বদিউজ্জামান, নিজাম চৌধুরী, রকিবুল; সকলের,সকলের পৈশাচিক হাসি সে দেখতে পেল অবয়বে একবার করে। এরা সবাই তবে তার শত্রু? সবাই এত ব্যাকুলভাবে তার মৃত্যু চায়!
চমকে চোখ খুলে নিজেকে অচেনা জায়গায় আবিষ্কার করে সহসা উঠে বসল অতনু৷ দুঃস্বপ্নের রেশ এত গভীর, প্রবল শীতেও শরীর ঘেমে একাকার৷ জুলফি বেয়ে সরসর করে গড়িয়ে পড়া স্বেদ হাতের তালুতে মুছে অস্থিরচিত্তে নিজের আশেপাশে তাকাল। হৃদপিণ্ড গতি এই মুহুর্তে রেসের ঘোড়ার চাইতে কিছু কম নয়। নিস্তব্ধ ঘরে ধুকপুক শব্দটাই দামামা বাজার মতো। সময় নিয়ে নিজেকে ধাতস্থ করার পর অস্থিরতা আর অবশিষ্ট রইল না৷পাশে শায়িতা স্বল্প বসনাকে আবিষ্কার করে এতটুকু বুঝতে পারল পৃথিবীর বুকে সে দিব্যি বর্তমান। ঠোঁট বিস্তৃত হলো হাসিতে। "উফফ" শব্দে স্বস্তির শ্বাস ফেলে শয়নের নিমিত্তে পুনরায় লেপমুড়ি দিতে দিতে দম্ভের সাথেই স্বগতোক্তি করল,
"জীবিত মানুষগুলোরই সাহস নেই তার ওপর আঁচড় কাটে, সেখানে মৃত্যেদের প্রতিচ্ছায়া! প্রহসন ছাড়া আর কি"
মুখে দম্ভ করলেও নিজের কথাকে কতটা স্বীকৃতি জানাতে পারল তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে৷ তথাপি মনের ভেতর হুট করে আগত খচখচানি ভাবটাকে পুরোটা অস্বীকার করতে পারল না অতনু। থেকে গেল ও অস্বস্তিরূপে সারাবেলা।
গড়পড়তা দিনকাল যেমন যেত, আজ তারচেয়ে ভিন্নভাবে দিন পার হলো তার; স্ত্রীর উপচে পড়া আদর-যত্ন এবং ভালোবাসায়। অস্বাভাবিকভাবে স্বাভাবিকতা দেখলে যেমন সন্দেহ হয়, তেমন সন্দেহকে এড়াতে পারল না। তবে মুখে কিংবা কাজে তা প্রকাশ করল না। যেমনটা পূর্ব পরিকল্পিত তেমনিভাবে দিন কাবার হলো। সারাদিন বসে-শুয়ে, আদর-সোহাগে কাটিয়ে সন্ধ্যে নামার মুখে ঢিমেতালে প্রস্তুতি নিতে শুরু করল সে বাইরে যাওয়ার জন্য। দুষ্টুমি-খুনসুটি সবকিছুর আড়ালে আসমাও বেশ নজরে নজরে রাখল তাকে। কতবার আড়ালে গিয়ে দোসরদের সাথে যোগাযোগ করে, কতটা পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র সাথে বেঁধে নিলো সবটা;সবটা। অতনুর পাশাপাশি চাপা উত্তেজনা আসমারও কম নয়। ভুল করেও ফেইলড হলে অতনু হাওলাদারের কুৎসিত রূপটার সাথে আরেকদফা সকলকে পরিচিত হতে হবে। করুণা বলতে কোনো শব্দ তো নেই-ই ওর ডিকশনারিতে। রাগে জ্ঞানশূন্য হয়ে কি করে বসবে ধারণা করলেও ভয় লাগে। এতদিন যাবৎ বুকের ভেতর উথলে উঠতে চাওয়া আগুনটাকে শক্ত হাতে সামলে শেষকালে এসে নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়া সমীচীন নয়। উপলব্ধি জাগ্রত হলে ভয়টাকে আর তেমন পাত্তা দিলো না আসমা। নিজেকে উৎসর্গ করে যে অভিনয়-অভিনয় খেলায় মেতে উঠেছিল তা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করল।
আসমার থেকে আড়ালের কোনো প্রয়োজন নেই, বরং তার দুর্ধর্ষতার আঁচ পেলে গর্জে ওঠার সাহস দেখাবে না ভেবে ওর চোখের সামনে দিয়েই বেরিয়ে গেল অতনু। স্বভাবসুলভ জিজ্ঞাসা জন্মেছিল আসমার মনে, কিন্তু সদুত্তর দেয়ার প্রয়োজনবোধ সে করেনি। মৃদু হেসে বন্দুকটা কোমরে গুঁজে বেরিয়ে পড়েছে।
অতনু বেরনোর আগে একফাঁকে ফোন সরিয়ে রকিবুলকে অ্যালার্ট করে দেবে ভেবেছিল আসমা;কিন্তু ওর সতর্ক দৃষ্টির সামনে ফোন সরানোর সুযোগ আর পায়নি। তবে শ'খানেক নেতিবাচক ঘটনার মধ্যে স্বস্তি শুধুমাত্র এক জায়গাতেই, রকিবুলের পাঠানো টিমকে ও হয়তোবা চিনতে পেরেছে। মাস কয়েক হয়ে যাবে নির্জন জায়গাটায় এসেছে ওরা। জঙ্গলের ভেতর থেকে বন্য পশু আর কালেভদ্রে দুটো-একটা বাইসাইকেল আরোহী ছাড়া আর কারোর দেখা পায়নি আসমা। সেখানে আজ ইনফরমাল পোশাকে কতগুলো মানুষকে অসংখ্যবার পথটায় দেখেছে, দেখেছে জঙ্গলের সীমানায়। ওদের শীতল দৃষ্টি এবং অঙ্গভঙ্গি দেখে মনে হয়েছে ওরা সাধারণ কেউ নয়৷ আসমার সমস্ত ভাবনা একটা "সম্ভাব্য" শব্দে আটকা পড়ে আছে। সে হাল ছাড়ার পাত্রী নয়৷ রকিবুলের আক্রমণে না হলেও ধরাশায়ী অতনুকে হতেই হবে৷ অতনু তার সমস্ত পরিকল্পনাকে এতকাল বাঞ্ছাল করে এসেছে কারণ অস্ত্রগুলো সব তার আড়ালে ছিল। কিন্তু আজ যে অস্ত্রের সাহায্য সে নিয়েছে, তা চোখের সামনে দেখেও বিন্দুমাত্র আঁচ করতে কি পেরেছে অতনু? উঁহু পারেনি৷
হলদে করবী; সামান্য একটা ফুলগাছ। সেটাও যে কোনোভাবে বিষাক্ত হতে পারে এমন ধারণা সহজে কারোর মস্তিষ্কে জাগ্রত হওয়ার কথা নয়। অতনুরও হয়নি৷ আসমার হুট করে বাগানের প্রতি এত আগ্রহ,বাচ্চাদের মতো ছড়া কাটা;বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলো একটাও তার চোখে অস্বস্তি হয়ে ফোটেনি। অদ্ভুত!
কলকে কিংবা হলুদ করবী একটা বিষাক্ত ফুলগাছ প্রথম জানতে পেরেছিল আসমা মেডিকেল লাইফে এক রোগীর হিস্টোরি দেখে। অন্তঃসত্ত্বা নারীর অকস্মাৎ হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যু। সময়ের অনেক পরে হাসপাতালে নিয়ে এলে ডাক্তাররা যখন রোগীকে এক্সপায়ার্ড ঘোষণা করেছিলেন তখন রোগীর পরিবার অনেক হম্বিতম্বি করেছিল ডাক্তারদের সাথে; মারামারি, হাতাহাতি ভয়ানক এক কাণ্ড৷ নিরাপত্তার স্বার্থে হাসপাতালে পুলিশ ডেকে পাঠানো হলে নরমাল ডেথ কেস সোজা পুলিশের হাতে চলে যায়। এবং ফর্মালিটি অনুযায়ী ময়নাতদন্ত করা হলে জানা যায় চাঞ্চল্যকর তথ্যটা। আপাতদৃষ্টিতে স্বাভাবিক দেখানো মৃত্যুটা আসলে একশব্দে একটা মার্ডার। কলকের বিষ দিয়ে অন্তঃসত্ত্বা নারীকে তার শিশু ভ্রুণের সাথে হত্যা করা হয়েছে। এবং যিনি হত্যা করেছেন তিনি আর অন্যকেউ নন রোগীর পরিবারের লোক, তার শাশুড়ি। সেসময় কেইসটা নিয়ে অনেক তোলপাড় হয়েছিল দেশে। নিউজ চ্যানেল গুলোর পাশাপাশি ফলাও করে লেখালেখি হয়েছিল পত্রিকায়। রিপোর্টাররা পেয়েছিল একটি কলাম এবং মেডিকেল স্টুডেন্টরা পেয়েছিল রিসার্চের টপিক। গুটিকয়েক স্টুডেন্টদের তালিকায় ভাগ্যিস আসমার নামখানা ছিল, নইলে এত উৎকৃষ্ট পন্থা কোথায় পেত সে?
রোজ যে নেশাদ্রব্যকে সঞ্জিবনী ভেবে সেবন করে তার প্রাণপ্রিয় স্বামী, সেখানেই মিশিয়ে দেয় সে কলকের গরল। অতনু হাওলাদারের সমাপন আটকায় সাধ্য কার!
____________
আঁধারে নিমজ্জিত গা ছমছমে জঙ্গলে থেকে থেকে করুণ সুরে ডাহুকের ডাক প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। শিশির পতনের মৃদু শব্দ আর পাতার খসখসানি ভূতুড়ে পরিবেশকে আরও ভৌতিক করে তুলছে। অতনু হেঁটে চলেছে একমনে চুরুট ফুঁকতে ফুঁকতে। কোমরে গোঁজা বন্দুক ইতোমধ্যে তার হাতের মুঠোয় এসে পড়েছে। ট্রিগারে আঙুল রেখেছে নিরাপত্তার খাতিরে। কেন যেন মনে হচ্ছে একসাথে অনেকজোড়া চোখ সাগ্রহে তার পথ চলা দেখছে। তাদের অধীর অপেক্ষার কেন্দ্রবিন্দু একমাত্র অতনুই। গভীর জঙ্গলে প্রবেশ করলেই একযোগে বেরিয়ে এসে ওর ওপর আক্রমণ করবে। সতর্ক থাকতে হবে অতনুকে;নিজের সর্বোচ্চটা দিয়ে লড়াই করে টিকে থাকতে হবে। এতদূর এসে হার মানা অসম্ভব;জাস্ট অসম্ভব।
বলা বাহুল্য অতনুর ধারণায় কিছু ভুল নেই। সত্যিকার অর্থে মানুষটা সে চতুর। তাই তো আরও একবার তার কল্পনা শক্তিকে সত্যি প্রমাণিত করে ঠিক গভীর জঙ্গলে পা রাখা মাত্র ভেজা মাটিতে বুটের খটখট আওয়াজ তুলে অনেকগুলো পদধ্বনি তালে তাল মিলিয়ে পেছনে এসে থেমে গেল। ডাহুকের আর্তনাদ এই মুহুর্তে নেই;কুয়াশার মিটমিট শব্দও অকস্মাৎ থেমে গিয়েছে। সন্দেহে কোনো ভুল ছিল না অতনুর। অর্ধাঙ্গীনি তাহলে সত্যি সত্যি তার সাথে প্রহসন করেছে। শরীরি খেলায় মাত করে তাকে ময়দান থেকে ছিটকে ফেলার পাঁয়তারা করেছে৷ পায়ের গতি শ্লথ করে চুরুটে শেষটান দিয়ে হেঁসে উঠল অতনু। তাচ্ছিল্য তার নিজের প্রতি, নাকি উপস্থিত প্রতিপক্ষদের প্রতি জানা নেই। তথাপি অসমাপ্ত চুরুট আস্তে করে ফেলে দিয়ে দীর্ঘ শ্বাস টেনে ফিরে তাকাল অতনু। অন্তরীক্ষগামী প্রকান্ড হিজল-তমাল, চালতা কিংবা অশ্বত্থ গাছের ছায়ায় কোনো পক্ষেরই মুখ একে অপরের কাছে স্পষ্ট নয়। কেবল স্থির ধরে রাখা অস্ত্র এবং মনুষ্য মূর্তি যা বোঝা যায়। অভেদ্য তমসায় অতর্কিত গুলি ছুঁড়ে যতটুকু কাবু করা যায়, করে গা বাঁচিয়ে চলে যাবে এমন ছক মনে মনে আঁকতে আরম্ভ করেছিল অতনু তৎক্ষনাৎ। কিন্তু সৃষ্টিকর্তাও আজ তার কোনো পরিকল্পনায় বিন্দুমাত্র সায় দিতে নারাজ৷ তাই তো পর্দার সিনেমার মতো চারিদিক থেকে চোখ ধাঁধানো আলো জ্বেলে নিমেষে সমস্ত আঁধার কেটে উজ্জ্বল হয়ে উঠল
প্রকৃতি। সংখ্যায় কমই কল্পনা করেছিল অতনু পুলিশ বাহিনী। কিন্তু চারিদিক চোখ বুলিয়ে অচীরে ভুল ধারণা ছিন্ন হলো। না চাইতেও পদক্ষেপ টলে উঠল তার। হাতের বন্দুকখানা শক্ত মুঠিতে চেপে সরাসরি বাগিয়ে ধরল নিজের ঠিক সামনে দাঁড়ানো আজন্ম শত্রু রওনকের দিকে। সে কি আশা করেছিল গান পয়েন্টের সামনে দাঁড়িয়ে রওনক ভয় পাবে? ভয় কিংবা ত্রাস বলতে কোনো শব্দের অস্তিত্ব এখন তার জীবনে আছে বলে মনে হয় অতনুর? প্রজ্জ্বলিত আলোয় অতনুর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘর্মকণা দেখে ব্যঙ্গের হাসি হাসল রওনক। উর্দিবাহিনীর পাশ থেকে সরে সামনে অগ্রসর হয়ে পরিহাসের সুরে বলল,
-- সে-কি, হার না মানা অতনু হাওলাদার, বন্দুক হাতে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছিস কেন? বুলেটের আঘাতে ঝাঁঝরা করে দিবি না আমায়! দেরি করছিস কেন৷ ট্রিগারে চাপ দে, কি হলো?
এক পা এক পা করে এগুতে এগুতে কন্ঠস্বর ইস্পাতদৃঢ় হলো রওনকের। ওদিকে ওর এগিয়ে আসা স্পষ্টই বুঝতে পারল অতনু, কিন্তু সিঞ্চিত শক্তিকে কাজে লাগিয়ে ট্রিগারে চাপ দিতে পারছিল না৷ কে জানে কেন দৃষ্টিশক্তি ঘোলা হতে শুরু করেছে ওর। টিমটিম বাতির মতো একবার আলোর প্রজ্জ্বলন তো আরেকবার অন্ধকার পর্দা দেখতে পারছে চোখের তারায়৷এমতাবস্থায় গুলি ছুঁড়বে কি করে!
-- মিস্টার হাওলাদার অবশেষে গল্পের শেষ পাতায় এসে পড়েছেন তাহলে৷
দ্বিতীয় কণ্ঠস্বরের উপস্থিতি একটু দূর থেকেই। তবে তা যে ওসি রকিবুলের চিনতে পারল অতনু। জবাবে মৃদু হেসে মেরুদণ্ড সোজা করে বলল,
-- এত সহজে নয় অফিসার৷
কথার সাথে সাথে কম্পমান বন্দুকের গর্জন নীরব প্রকৃতিকে পাখপাখালির ডানা ঝাপ্টানোর শব্দে মুখরিত করে তুলল। সাথে সতর্ক হয়ে উঠল সশস্ত্র বাহিনী। গোটা বিশেক স্নাইপারের একমাত্র পয়েন্টে নিজেকে আবিষ্কার করে হাল ছেড়ে দেয়ার ভঙ্গিতে সহসা দু পা পিছিয়ে গেল অতনু। ওর নিশানা ছিল ঠিক রওনকের কপাল। কিন্তু দৃষ্টির অসামঞ্জস্যতার কারণে হাত কেঁপে উঠে ভুল করে ফেলেছে। ওকে পিছিয়ে যেতে দেখে এক মুহুর্তের জন্য সকলে ভেবেছিল গান পয়েন্টে সঠিক মানুষ আসার নয় বুঝতে পেরে বৃথা চেষ্টা অতনু বোধহয় ছেড়ে দেবে তাই পিছিয়ে গিয়েছে৷ কিন্তু ওরা ওর আক্রোশের জায়গাটা ঠিকঠাক ধরতে পারেনি৷ যতক্ষণে পেরেছে ততক্ষণে পুরোদমে বন্দুক বাগিয়ে এলোমেলো গুলি ছুঁড়তে শুরু করেছে অতনু। একটা না একটা বুলেট ঠিক রওনকের ছাতি চিরে বেরিয়ে যাবে ও নিশ্চিত। অন্যকেউ না হোক রওনক কিন্তু ঠিক ওর গতিবিধির ওপর সুক্ষ্ম নজর রাখছিল শুরু থেকে। তাই ও ফাঁকা গুলি ছুঁড়তে শুরু করল যখন, তখন আর দ্বিতীয় কোনো ভাবনায় না গিয়ে রকিবুলের দেয়া ডেজার্ট ঈগল বাগিয়ে সম্মুখযুদ্ধে অংশ নিলো স্বাভাবিকভাবে৷ অতনু অসংলগ্ন থাকলেও রওনকের চিন্তা-চেতনা স্থিরই আছে৷ তাই ওর পক্ষে অতনুকে নাকাল করা বড় ব্যাপার নয়। হলোও তাই। কম সময়ে যুদ্ধে হেরে, আহত হয়ে বাধ্য হলো অতনু খ্যান্ত দিতে৷ বুলেট বিহীন বন্দুক ছুঁড়ে ফেলে আঘাতপ্রাপ্ত হাত চেপে ধরে জান্তব গোংরানির সাথে হাঁটু মুড়ে ধপ করে বসে পড়ল আর্দ্র মাটিতে৷ এ মুহুর্তে রওনককে প্রতিশোধের অনলে দগ্ধ দানবীয় কিছুর সাথে তুলনা করলে ভুল হবে না। শত্রু নাকাল হওয়ার পুরো ফায়দা লুটে আহত সিংহের মতো শিকারকে ছিঁড়ে খেতে যেভাবে সে এগিয়ে গেল, উপস্থিত সকলে তো ভেবেই বসল আঘাতে আঘাতে মেরে না ফেলে সে অতনুকে। উন্মাদের মতো পরিবারের মানুষগুলোর স্মৃতিচারণ করতে করতে রওনক যখন অনবরত অতনুর বুক-মাথা এবং আহত হাতের ওপর পদাঘাত করছে তখন শঙ্কিত বাহিনী না থাকতে পেরে এগিয়ে যেতে চাইল ওকে আটকাতে। পারল না সিনিয়র অফিসার রকিবুলের ইশারায়। রওনককে থামানোর দায়িত্ব রকিবুল নিজ কাঁধে তুলে নিয়েছে। এতক্ষণ দূরে দাঁড়িয়ে সমস্ত চুপচাপ পর্যবেক্ষণের পর এগিয়ে এসে রওনকের কাঁধে হাত রাখল সে। বলল,
-- ছেড়ে দাও। ও তোমার একার অপরাধী নয়৷
সত্যি বলতে এতক্ষণ রওনক এই পৃথিবীর বুকে যেন ছিলই না। হারিয়ে ফেলা মানুষগুলোকে ন্যায় পাইয়ে দিতে সত্যি সত্যি উন্মাদ হয়ে উঠেছিল। তবে যতটা তৎপর হয়ে এগিয়ে এসেছিল সে, ততটা স্বস্তি কিন্তু পেল না। তথাপি বিরোধ না করে রকিবুলের ইশারা মেনে পিছিয়ে যাওয়াটা সমীচীন মনে হলো। বুক বরাবর শেষ একটা লাথি কষিয়ে একদলা থুতু ছিটিয়ে সরে গেল সে অসুর নামক অতনুর কাছ থেকে।
ওদিকে পীড়িত শরীরে এমন বজ্রাঘাতে মৃ/তের দশা অতনুর৷ বুকের ওপর লাথির কারণে মুখে র/ক্ত উঠে গেছে তার;চামড়া ছিলে ক্ষত তো রয়েছেই। শোণিত ধারায় ধুয়ে ওঠা মুখখানা দেখে এই মুহুর্তে অতনুকে ঠিক কোনো মানুষখেকো বলেই মনে হচ্ছে। ইঙ্গিতে পানির বোতল হাতে নিয়ে রকিবুল হাঁটু ভেঙে বসল অতনুকে সাহায্য করবে বলে। কিন্তু আহত হলেই অতনু হাওলাদারের পরাক্রম কমে যাবে এমন ভাবনা ভুল। সাহায্যের ধারের কাছেও না গিয়ে গা ঘসে একাই সে উঠল বসল মাটি থেকে। মৃদু গোঙানির সাথে নত মস্তকে আঘাতের সঙ্গে কিছুটা সন্ধি করে একসময় স্থির দৃষ্টিতে তাকাল। অস্ফুট উচ্চারণে অনুরণিত হলো একটি নাম,
-- আসমা...
আলোর বিপরীতে, জিপের কাছে দাঁড়িয়ে ঠিক রকিবুলের মতো আসমাও চুপচাপ সবটা পর্যবেক্ষণ করছিল শুরু থেকে। অতনু বেরিয়ে যাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই রকিবুল জেনে নেয়া ঠিকানা অনুসরণে আসমার দুয়ারে উপস্থিত হয় সম্ভাব্যকে নিশ্চিতে রূপান্তর করতে। যতখানি যন্ত্রণা নিজে ভোগ করেছে, ততখানি কিংবা তারচেয়ে কিছু কম শাস্তি পশুটাকে ভোগ করতে দেখে তৃপ্ত হবে ভেবেছিল আসমা। অথচ ওর রক্তাক্ত মুখখানা দেখে, কম্পিত কণ্ঠে নিজের নামটা শুনে বুকের শক্ত মাটিতে খুরপির আঘাত শুরু হয়েছে।এ কোন বিশ্রী অনুভূতি, আপন সত্তার সাথে বেঈমানী! লাগামহীন অনুভূতির সুতো মুঠো ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার দশা হলে ওতে ধারালো আঘাত হানার অভিপ্রায়ে চট করে আঁধার ফুঁড়ে রণাঙ্গনে পা রাখল আসমা। রওনকের হাত থেকে ডেজার্ট কেড়ে নিয়ে সোজা গিয়ে বসল অতনুর সামনে। বুকের ওপর প্রিয়তমার কোমল আদরের বিপরীতে বিষাক্ত আঘাত নতুন করে স্তম্ভিত করল না অতনুকে। কেবল নিষ্প্রভ চোখজোড়া ঈষৎ কেঁপে উঠে আগল ছেড়ে দিলো। শোণিত ধারায় নোনা অশ্রু হারালে তাকে আলাদা করা যায় কি উপায়ে? কেউ টের পেল না নৃশংস খুনির চোখে ভালোবাসাহীনতার ব্যথা তরল বিষাদ নামে গড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে অবিরাম৷ কথা তো অনেক ছিল তার হৃদয়হীনা হৃদ মোহিনীর সাথে৷ জীবনের অন্তিমভাগে এসে তাকে ঘিরে নতুন স্বপ্নের জাল বোনার গল্পটা আড়ালে রয়ে গেল। মুখ ফুটে বলা হলো না,বিচ্ছেদের দুয়ারে দাঁড়িয়ে অতনুর আজ খুব করে ইচ্ছে করছে অর্ধাঙ্গীকে আষ্টেপৃষ্টে বুকে জড়িয়ে নিতে; বলতে,
"আমার সমস্ত পাপ ক্ষমা করে দাও তুমি প্রিয়তমা। ভালোবাসা হয়ে যাও শতজনমের"
বলে দিলে কি তাকে চিরকালের তরে অভিশপ্ত শিকলে আটকে রাখা হবে? ডানাভাঙা পাখির মতো ছটফট করতে করতে সে শেষ হয়ে যাবে অসময়ে! তাহলে বরং থাক। গোপনের কথা গোপনে জমা থাকুক। সময় হারিয়ে সাধন করতে চাওয়া অন্যায়। অনেক অন্যায় তো করে ফেলেছে জীবনে, শেষ সময়ে আর... অতনু হাওলাদার নামটা একটা ভুলে ভরা নাম। এই নাম ধরে পেছনে তাকালে অপরাধ ছাড়া আর কিচ্ছু দেখতে পাওয়া যাবে না, কিচ্ছু না। এলেবেলে ভাবনার জগতে চিরকালের মতো ইতি টেনে প্রলম্বিত শ্বাস ছেড়ে ক্ষীণ ঠোঁট প্রসারিত করল অতনু। আঘাতে জর্জরিত হাতখানা কোনোরকমে তুলে আসমার গালে ঠেকিয়ে কাঁপা কাঁপা স্বরে বলল,
"ভালো থেকো বউ৷ ভালোবাসায় থেকো"
বিপরীতে বলবার মতো অনেক কিছু আসমারও ছিল। তথাপি বেঈমান হৃদয়ের কাছে হার স্বীকার করে স্বীয় সত্তার সাথে বিরুদ্ধাচারণ না করে বসে, সেই শঙ্কায় ট্রিগার ছুঁয়ে নরপশুটার চোখে চোখ রাখল। ভালোবাসার হাতেই তবে অমানুষটার সংহার লেখা ছিল।
পরপর তিনটে গুলির শব্দে নীরব প্রকৃতি খানিক সরব হয়ে নিগূঢ় রহস্যে ডুবে গেল৷ সমর্থ শরীরটা ঠিক যেন পাতাখসার মতো মৃদু শব্দে লুটিয়ে পড়ল মাটির বিছানায়। এত কাছে শায়িত দুর্ধর্ষ খুনি-অমানুষ অতনু হাওলাদার মৃত;আসমার হাতেই ওর হৃৎস্পন্দন চিরকালের তরে থেমে গেছে উপলব্ধি করে ক্ষণকত নিস্তব্ধ বসে রইল আসমা। পলকহীন কাতর চোখজোড়ায় চেয়ে নির্বাক।
-- লোকে বলে নৈরাশ্যে পরিপূর্ণ থাকলে মৃত্যুর সময়ে মানুষের চোখ এমন খোলা থেকে যায়।
লাশের আধবোজা চোখ বন্ধ করে দিতে দিতে বলল রকিবুল। আসমার সেসবে কোনো হেলদোল নেই। ঠিক কোনো মূর্তিরূপে অক্লান্ত তাকিয়ে আছে সে প্রাণহীন অতনুর দিকে। কতকাল যাবৎ এই দিনটার অপেক্ষায় ছিল৷ অপরাধীগুলোকে নিজ হাতে শাস্তি দিতে পারবে, ওদের মৃত্যু দেখতে পারবে;বাবা-মায়ের বিদেহী আত্মাকে শান্তি দিতে পারবে। অবশেষে তাহলে সফল হতে পারল আসমা।
-- ইউ আর আন্ডার অ্যারেস্ট মিসেস হাওলাদার।
নীরদ গম্ভীর কন্ঠস্বরের মালিক এবং চকচকে হ্যান্ডকাফের দিকে দৃষ্টি বুলিয়ে ঠোঁট টেনে হাসল আসমা। মুঠো খুলতেই কালো ডেজার্ট-ঈগল খসে পড়ল মাটিতে। নিঃশব্দে দু-হাত বাড়িয়ে দিলো সে আইনের শিকলে বন্দিনী হতে। ওকে যখন হ্যান্ডকাফ পরানো হয় তখন রওনক এসে বাঁধ সাধল। যা সংঘটিত হয়েছে রকিবুলের ইশারায়, ওর চোখের সামনে। এমনকি একই অপরাধে রওনকও অপরাধী। তাহলে এরেস্ট শুধু আসমাকে করা হবে কেন? উত্তরটা রকিবুল বাঁকা ভাবেই দিলো৷ বলল,
-- তাহলে আপনি আসামি হয়ে ধরা দিন।
রকিবুল জানতো রওনক পিছিয়ে যাবে না, এবং সে গেলও না। বিনা বাক্য ব্যয়ে নিজেকে আইনের হাতে সোপর্দ করতে প্রস্তুত হলো৷ সবটা চুপচাপ পর্যবেক্ষণের পর এতক্ষণ বাদে আসমা কথা বলে উঠল। সোজা রওনকের চোখের দিকে তাকিয়ে কঠিন স্বরে বলল,
-- আপনাকে ভরসা করে উপমার দায়িত্ব দিয়েছিলাম ভাই। আপনি আমাকে কথা দিয়েছেন ওকে কখনো একা ছাড়বেন না। আজ তাহলে সে প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করছেন কেন?
বিনিময়ে রওনক কিছু বলতে চাইলে হাতজোড় করে আসমা পুনরায় বলে উঠল,
-- আমার জীবনের কিচ্ছু বাকি নেই। কিন্তু ঐ মেয়েটার জীবন মাত্র শুরু। ওকে এভাবে অসহায় করে একা ফেলে যাবেন না। আমার আত্মত্যাগ তাহলে মিথ্যে হয়ে যাবে। জানেন তো, এ নিষ্ঠুর পৃথিবীতে উপমার আপনি ছাড়া আর কেউ নেই;কেউ না। ওকে যত্ন করে আগলে রাখুন। দু-চোখ ভরা স্বপ্ন মেয়েটার। আমি জানি স্বপ্নগুলো সত্যি হবে একমাত্র আপনি পাশে থাকলে। আমাকে ভুলে যান, এই নোংরা ঘটনাগুলোকে ভুলে যান। সুস্থ পরিবেশে দুজনে নিজের মতো করে বাঁচুন।
এরপর রওনকের বিরোধিতার সামনে দিয়ে পুলিশ বাহিনীর সাথে এগিয়ে চলল আসমা ভ্যানের দিকে। তার জীবনের গল্পটা চাইলে এই মোড়ে এসে পাল্টে যেতে পারত, কিন্তু সে তো পরিবর্তন পছন্দ করে না। নিজের জীবনকে একদা দাবার বোর্ডের ওপর যেভাবে সাজিয়েছিল, যেভাবে নিজের সমাপ্তি পরিকল্পনা করেছিল সেভাবেই সবটা হবে। তাই তো ভ্যানের কাছাকাছি পৌঁছাতে না পৌঁছাতেই
সবাইকে চমকে দিয়ে দ্বিতীয় দফা গর্জে উঠল প্রাণঘাতী নাইন এমএম। বিমূঢ় নয়নে রকিবুলসহ বাকি ব্যাটালিয়ন দেখল পাখির পালকের মতো নরম শরীর ঠিক অতনু হাওলাদারের মতো করে লুটিয়ে পড়ল শিশিরস্নাত ঘাসের বুকে নিঃশব্দে। কখন রকিবুলের কোমরের কাছ থেকে বেল্টের খাপ খুলে অস্ত্র বের করে নিয়েছে আসমা কেউ বুঝতেই পারেনি।ওদিকে মর্মান্তিক দৃষ্টটা দেখে রওনকও বজ্রাহত। অতনুর লাশ বহনকারীদের সাথে ধীরপায়েই এগিয়ে আসছিল সে গাড়ির দিকে। তখুনি হঠাৎ ঘটনাটা ঘটলে পায়ের গতি রোধে নিশ্চল হয়ে পড়ল সে। বিহ্বল নজরে পুরোটা বুঝে ওঠার পর রীতিমতো ছুটে গিয়ে আসমার মাথাটা কোলের ওপর টেনে নিলো। তখনও আসমার প্রাণ বায়ু দেহ ত্যাগ করেনি। ইহকাল এবং পরকাল নামক দুই জগতের মধ্যবর্তী স্থানে তার অবস্থান। যেন মৃত্যুদূতের দেখা পেয়েছে আসমা। উষ্ণ শোণিত ধারার পাশাপাশি দুচোখ উপচে জল গড়াচ্ছে তার। মস্তিষ্ক ছিন্ন করে বিষাক্ত বুলেটের ঠাঁই ঠিক কোথায় হয়েছে জানা নেই, তবে বিদায় মুহুর্তে ঐ প্রদাহের চাইতে অন্তরের প্রদাহ তাকে বেশিই কাবু করে ফেলেছে। শুষ্ক ঠোঁট নাড়িয়ে কিছু বলার চেষ্টা করছিল আসমা, অথবা বলছিল। কৌতুহলে কথাগুলো শোনার বাসনায় ঈষৎ ঝুঁকে এলে রওনক শুনতে পেল অস্ফুটে বিড়বিড় করছে,
"আঁধারে যার ধ্বংসের শুরু, আঁধারেই তার সমাধি"
সমাধির পর নতুন কোনো কথা থাকে না। থাকে না সূচনার অবকাশ৷ এই পৃথিবীর সীমারেখা পার করে অন্য পৃথিবীর তরে যাত্রা শুরু করলে, সেখান থেকে আর ফিরে আসার উপায় নেই। মানুষ তবু বাঁচে নিজের মতো করে৷ ঘৃণা, ভালোবাসা, সুখ-স্বস্তি সব থরে থরে সাজিয়ে জীবন পরিচালনা করে। তারা ভুলে যায় এই সাজানো-গোছানো সংসার ছেড়ে একদিন চলে যেতে হবে প্রকৃতির নিয়মে। আদর-স্নেহ, ভালোবাসা সব সম্পর্ককে ছিন্ন করে একাকী বাঁচতে হবে। ঐ পৃথিবীতে কোনো হৃদ্যতার বাড়াবাড়ি নেই, নেই ঘৃণা কিংবা ভালোবাসার অবকাশ। ওখানে সন্ধি কেবল নিজের কর্মের সাথে ব্যক্তিসত্তার। সব কর্মের যোগ্য ফলাফল সৃষ্টিকর্তার তরফ থেকে তার সৃষ্টির জন্য রয়েছে। কাউকে শূন্য রাখতে তিনি পছন্দ করেন না।
________________
মাসকয়েক পরের কোনো এক আশ্বিনের রৌদ্রস্নাত মিঠে সকালের ঘটনা_
বেলা করে ঘুম ভেঙে বাইরে বেরিয়ে দেখে পুরো বাড়ি নিঝুম নিস্তব্ধতায় ডুবে রয়েছে। ডাইনিংয়ের ওপর ঢেকে রাখা খাবার দেখে নিশ্চিন্ত হয়, নির্ঘাত দাদীমা তাকে ঘুমুতে দেখে সবাইকে নির্দেশ দিয়ে গেছেন একবিন্দু শব্দ যেন কেউ না করে। কৃতজ্ঞতায় মিষ্টি হাসি ফুটে ওঠে উপমার ঠোঁটজুড়ে। চটপট ফ্রেশ হয়ে এসে ডাইনিংয়ে বসে খাবার খেতে। খিদেয় পেটেরটা রীতিমতো আন্দোলন শুরু করে দিয়েছে। ঠোঁট টিপে মৃদু হেসে ঢাকা দেয়া সব পাত্র উন্মুক্ত করে বিমুগ্ধ হয়ে যায় উপমা। সব তার পছন্দের খাবার রান্না করা হয়েছে আজ। ছানার পায়েস, পিঠেপুলি, মাংস-রুটি। আহ্ কি চমৎকার! এই মুহুর্তে দাদীমাকে সামনে পেলে নির্ঘাত জাপ্টে ধরে চুমু খেত বেচারি। একবার শুধু বলেছে কি কি খেতে ইচ্ছে করছে;সাথে সাথে ম্যাজিক করে সব সামনে হাজির! কপাল গুণে এমন দাদী-শাশুড়ি পেয়েছে বলতেই হবে।
টুপটাপ খাবার মুখে পুরতে পুরতে সহসা বাইরে থেকে ভেসে আসা কতগুলো শব্দ শুনতে পেল উপমা৷ উঁকি মেরে রান্নাঘরের জানালা দিয়ে তাকালে দেখতে পেল ভ্যানে করে বড়-বড় বাঁশ, কাপড়, হাড়ি এসব নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। পাশের বাড়িতে বিয়ের অনুষ্ঠান। প্রতিবেশীর বড় মেয়ের বিয়ে। সেই উপলক্ষে সপ্তাহখানেক যাবৎ নানাবিধ আয়োজন চলছে। কিছু আয়োজনে দাদীমা তাকেও নিয়ে গিয়েছিল সাথে করে। সবাই খুব সমাদর করেছে ওর, মধ্যমণি বানিয়ে অনেক গল্প করেছে। আজও যেতে হবে সন্ধ্যেবেলা হলুদে। শুনেছে বিয়ের দাওয়াত শহরে বকুলদের কাছেও পৌঁছে গেছে। বিকেলের মধ্যে তারাও এসে উপস্থিত হবে এখানে। অনুষ্ঠানে তাহলে পুরো পরিবার নিয়ে আনন্দ করতে পারবে উপমা। ভাবতেই মৃদু খুশির লহর বয়ে গেল উপমার বুকজুড়ে। খুশিটা কাউকে দেখাতে পারলে ভালো লাগত। রওনক, রওনককে দেখাবে কি? কিন্তু সে মানুষটা কোথায়।
দ্রুত খাওয়া শেষ করে উঠে গুটিগুটি পায়ে এ ঘর-ও ঘর দেখতে লাগল উপমা। আজ ছুটির দিন বিধায় অফিস যাওয়ার কথা নয় রওনকের। সে কি তবে বাইরে বেরিয়েছে?
বড় দাদুর বাড়িটাও অনেকটা পুরনো দিনের জমিদারবাড়ির মতো। উপমার শ্বশুরবাড়ি থেকে বেশি সুন্দর। এতদিন হয়ে গেল বাড়িতে থাকছে অথচ নানাবিধ ঝামেলায় সুযোগ করে কখনো পুরো বাড়ি ঘুরে দেখা হয়নি উপমার৷ আজ রওনককে খুঁজতে গিয়ে তাই মনের অজান্তে ভাবনা ভুলে বাড়ি দেখায় মশগুল হয়ে পড়ল উপমা। শোবার ঘরগুলো, স্টোররুম, প্যাসেজ, ছাদ সব একে একে সময় নিয়ে দেখা শেষ করে উপমাকে আকর্ষণ করল কাচারি ঘরটা। সেগুন কাঠের সুন্দর নকশাখচিত আসবাবে সুসজ্জিত ছিমছাম ঘরখানার স্বস্তিদায়ক এক রূপ। মাঝারিমতো একটা বুকশেলফ, ওতে ঠাঁসা কাগজপত্তর আর মোটা মোটা কতগুলো আইনের বই। উপমা শুনেছে বড়দাদু পেশায় উকিল ছিলেন। পড়ার শখ ছিল তাঁর খুব। দপ্তরখানা থেকে ফিরে ঘন্টার পর ঘন্টা অনায়াসে কাটিয়ে দিতেন এই ঘরটায় বসে বইয়ে মুখ গুঁজে। তার যত ক্লায়েন্ট আসতো তাদের বসার জায়গাও ছিল এটাই। একে একে সব আসবাব ছুঁয়ে, সোফা-চেয়ার সবগুলিতে বসে সময় কাটিয়ে অবশেষে উপমা গিয়ে উপস্থিত হলো ভারি পাল্লার কাঠের জানালার কাছে। দাদীমা রোজ নিয়ম করে এই ঘরটা পরিষ্কার করে, জানালা দরজা খুলে আলো-বাতাসে মনোরম রাখেন ঘরের পরিবেশ। আজ তাড়াহুড়োয় বেরতে হয়েছে বলে হয়তো মনে ছিল না তার। তাতে কি হয়েছে, দাদীর পরিবর্তে উপমা তো আছেই। খুশিমনে সে করে দেবে আজকের সব কাজ। মৃদু হেসে শুরুতেই ছিটকিনি খুলে কাঠের ভারি ভারি পাল্লা দুটো দু'হাতে ঠেলে খুলে দিলো উপমা। দিতেই এক পশলা সোনাঝরা রৌদ্র ঝেঁপে নামল গরাদ বেয়ে তার দু চোখ ধাঁধিয়ে দিতে। ঝাপ্টে চোখ বন্ধ করে আবার মুচকি হেসে চোখ খুলে ফেলল উপমা। আলোটা চোখে সয়ে গেলে গ্রীলে হাত রেখে উঁকিঝুঁকি মেরে বাইরেটা দেখার চেষ্টা করল। বেশি একটা দেখতে পারল না, কারণ জানালার ঠিক সামনে মাঝারি সাইজের একটা জবা গাছ। গাঢ় সবুজ পাত্রপল্লব অঙ্গে সাজিয়ে ডালপালা মেলে সে দৃষ্টিসীমা সংক্ষিপ্ত করে দিয়েছে। তবুও যতটুকু দেখা যায় তা দিয়েই উপমা দেখতে পেল, যাকে এতক্ষণ যাবৎ দু নয়ন ভরে খুঁজছে সে মানুষটা ঐ অদূরে পুকুরঘাটের কাছাকাছি গ্রামের কমবয়সী একটা ছেলের সাথে হাত নেড়ে নেড়ে গম্ভীর ভঙ্গিতে কথাবার্তা বলছে;যেন কত গুরুত্বপূর্ণ আলাপ! মান করবে ভেবেও শেষ পর্যন্ত মান করতে পারল না উপমা বরং সবসময়ের প্রিয়মুখটা দর্শনে আনন্দের সীমা পরিসীমা রইল না তার। আসলে রওনক আশেপাশে থাকলে যেকোনভাবে হোক তার সাথে জড়িয়ে থাকতে উপমার খুব খুব ভালো লাগে। আগাগোড়া মানুষটা যে ভালোবাসার।
আরক্ত বেশে এবার কিছুটা এগিয়ে গিয়ে গরাদের বাইরে দু-হাত বের করে উপমা সানন্দে ডেকে উঠল,
-- এই যে মাস্তান সাহেব, শুনছেন? আমি এইদিকে।
চাচাতো ভাইয়েরা পুলিশ কাস্টডিতে চলে যাওয়ার পর কেইস চালাতে সময়ে-অসময়ে সমস্ত সম্পত্তি একে একে রওনকের হস্তগত হয়ে গেছে সহজে৷ প্রতিবার ওরা নিজেরাই এসে যৎসামান্য অর্থের বিনিময়ে সম্পদগুলো বিক্রি করেছে রওনকের কাছে। তখন সানন্দে সব কিনে নিলেও এখন চাকরির পাশাপাশি ওগুলো সামলানো বেশ কষ্টসাধ্য হয়ে যাচ্ছে ওর পক্ষে। তাই জ্ঞাতিজনের পরামর্শে কিছু জমিজমা বিক্রি করার পায়তারা করছে রওনক। শুনেছে গ্রামে কতগুলো ছেলেপেলের উদ্ভব হয়েছে ইদানীং, যারা থার্ড পার্টি সেজে জমি বেচা-কেনায় সাহায্য করে। তেমনই একটি ছেলের দেখা পেয়ে জমি নিয়ে তার সাথে আলাপ করছিল রওনক পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে। এমন সময় অদূর থেকে ভেসে এলো এক মোহিনীর মোহময় সুরের মূর্ছনা। যত ব্যস্তই থাকুক, প্রিয়তমার কন্ঠস্বরের আহ্বান রওনক অগ্রাহ্য করতে পারে না কভু। আজও পারল না। তাই ছেলেটার সাথে কথা অসমাপ্ত রেখে তাকে বিদায় দিয়ে মুচকি হেসে একটা সিগারেট জ্বালাতে জ্বালাতে জবা গাছের দিকে এগিয়ে যেতে শুরু করল। ওদিকে প্রিয়তমের সমস্ত মনোযোগ তার দিকে আকর্ষিত হওয়ায় উপমার ঠোঁটের বিশ্বজয়ী হাসি বিস্তৃত হলো। হাত বাড়িয়ে রেখে সে শিশুবৎ রিনরিনে গলায় বলল,
-- জলদিই।
রওনকের গতি অবশ্য বিশেষ দ্রুত হলো না। শ্লথ ভাবেই সে সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে এগিয়ে গেল। এবং অনেকটা কাছাকাছি চলে যাওয়ার পর ফিল্টার ফেলে প্রেয়সী পরিণীতার বাড়িয়ে রাখা দু'হাতের তালুতে পর পর ঠোঁট চেপে চেপে চুমু খেল দু'টো। শুধল,
-- মিস করেছিলে কাল আমাকে?
-- ইশশ একদমই না। বরং আমি তো কালকে মজায় মজায় ঘুমিয়েছি দাদীমার গল্প শুনতে শুনতে। কেউ জোর করে চেপে ধরে দমবন্ধ করে দেয়নি আমার।
রওনক জানে মুখে যতই বলুক না কেন মেয়েটা তার আলিঙ্গন ভীষণ ভীষণ মিস করেছে কাল। ভুল তারই। রকিবুলের ডাকে সাড়া দিতে শহরের দিকটায় যেতে হয়েছিল, তাই তো ফিরতে রাত হলো। বাড়ি ফিরে দেখে দাদীর ঘরে উপমা ঘুমিয়ে কাদা। অতিথি আসার সংবাদ শোনার পর থেকে দাদীমা ভীষণ স্ট্রিক্ট হয়ে গেছেন। অত রাতে আর উপমাকে ফিরিয়ে নিতেই দিলেন না ঘরে। বেচারা রওনক কি আর করবে! গুরুজনের কথা তো অমান্য করা যায় না;তাই বাধ্য হয়ে শুষ্ক মুখে ফিরে এলো নিজের ঘরে৷
রাতের কথা স্মরণে বিষণ্ণ হয়ে গেছে ধারণা করে প্রিয়র মন ভালো করার নিমিত্তে গরাদের কাছটায় যেখানে হাত রেখেছিল উপমা সেখানে এবার চট করে নিজের থুতনি স্পর্শ করাল। সরল চোখে দৃশ্যখানা দেখে ইশারা বুঝতে বিশেষ কষ্ট হলো না রওনকের। সহাস্যে দু-পা এগিয়ে ওর থুতনির বাঁকানো জায়গাটায় ঠোঁট রাখল আলতো করে। যদিও গ্রীল এখানে বাঁধা হয়ে দাঁড়াচ্ছিল। তবু পুরো একরাত তাদের স্পর্শের ওপর স্ট্রাইক লেগে যাওয়ায় যতখানি তৃষ্ণার্ত হয়েছিল দুটিতে, তার কিছুটা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রেমাস্পর্শগুলিতে মিলিয়ে যেতে লাগল।
জানালার এপাশে ওপাশে হাতে হাত রেখে আরো কত রক?