#আশিক_আল_জিন
#অন্তিম_পর্ব
#তাসমিয়া_তাসনিন_প্রিয়া
যুদ্ধ শেষ হয়েছে বহুদিন। রাজ্য ধীরে ধীরে শান্তির ছায়ায় ফিরছে, কিন্তু নুসাইরের হৃদয়ে সেই শান্তি আসছিল না। যতবার প্রাসাদের আকাশে দাঁড়িয়ে নক্ষত্রমালা দেখত, তার মনে পড়তো দুলফিকারের হাসি, আরিবার মুখ। ভাইয়ের অনুপস্থিতি তাকে কুঁড়ে কুড়ে খেলেও কখনো প্রকাশ করতে পারতোনা। কারণ রাণী নূর আল জোহরা, এমনিতেই ছেলের শোকে অসুস্থ তিনি। তারমধ্যে নুসাইরকে মুখ গোমড়া করে থাকতে দেখলে আরো অসুস্থ হয়ে যেতেন। সেজন্য বুকে পাথর চাপা দিয়ে শক্ত ছিলো নুসাইর। তবে দুলফিকারকে দেওয়া কথা সে রাখতে পারেনি বলে, রাতে ঘুম আসতো না নুসাইরের । পাশাপাশি আরিবার হাসি, চোখের দীপ্তি, তার মায়া সবই যেন ভেতরে ভেতরে এক অদৃশ্য আগুন জ্বালিয়ে রাখতো।
মাঝে মাঝেই নুসাইর পৃথিবীতে চলে আসতো। অজুহাত দিত “মানুষের জগৎ পর্যবেক্ষণ করতে এসেছে”, কিন্তু আসলে শুধু আরিবার স্মৃতি হাতড়াতে ।
একদিন এমনই এক সময়ে সে গিয়েছিল আরিবার বাড়িতে। চারদিক নিরব, জানালাগুলো বন্ধ, ঘর যেন শূন্য হয়ে আছে। বারান্দায় বসে ছিলেন রুস্তম। নুসাইর তার পাশে গিয়ে দাঁড়াল।
“কেমন আছেন?” নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করলো নুসাইর।
রুস্তম দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা নাড়লেন।
“ কেমন আছি তা তো অজানা নয় তোমার। ”
দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল নুসাইর। সবকিছু বোঝো সে কিন্তু নুসাইর নিজেও চায় এবার অন্তত সবকিছু স্বাভাবিক হোক। রুস্তম ও সালমার অবস্থা দেখে নুসাইরের আরও খারাপ লাগছিলো। দু'জনের মাঝে যখন পিনপতন নীরবতা নেমে এসেছিল, ঠিক তখনই দরজা ঠেলে ভেতরে এল হাবিবা। হাতে বাজারের ঝুলি, চেহারায় ক্লান্তি, কিন্তু চোখে মায়া। আরিবার ছায়া যেন ওর ভেতরেও মিশে আছে।
সে অবাক হয়ে তাকালো নুসাইরের দিকে।
“আপনি… আপনি দুল…?”
“ আমি নুসাইর। “
হাবিবার কথা শেষ হওয়ার আগেই বলল নুসাইর। কথা বলার পরমুহূর্তে নুসাইর প্রথমবার ওর চোখের দিকে তাকালো। অদ্ভুত এক আলো, একদম ভিন্ন অথচ আপন। সেই মুহূর্তে নুসাইরের বুকের ভেতর চাপা যন্ত্রণা যেন কিছুটা কমে এলো।
হাবিবা হাসতে চেষ্টা করলো।
“আরিবা বলেছিলো আপনি আর দুলফিকার ভাইয়া যমজ। কিন্তু এতটা মিল, সেটা বুঝতে পারিনি। ”
“ আচ্ছা। আপনার নাম, হাবিবা? “
“ হ্যাঁ। “
নুসাইরের হৃদয়ে অন্য রকম প্রশান্তি অনুভব করছে। ম্লান হেসে রুস্তম চুপচাপ সরে গেলেন, তাদের দু’জনকে একা রেখে।
সেদিনের পর থেকে নুসাইর প্রায়ই পৃথিবীতে আসতে লাগলো। হাবিবার সঙ্গে দীর্ঘ কথোপকথন, হাসি, কখনো কান্না–ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে অদ্ভুত এক বন্ধন তৈরি হলো।
আরিবার স্মৃতির ওপর দাঁড়িয়েই জন্ম নিলো নতুন ভালোবাসা।
কিছুদিন পর নুসাইর হাবিবাকে জিন রাজ্যে নিয়ে গেল। মানুষ ও জিন দুটি জগতের মেলবন্ধন ঘটলো ওদের সংসারে। হাবিবার কোমলতা আর নুসাইরের দৃঢ়তা মিলে রাজ্য পেল এক অনন্য রাণী। নূর আল জোহরাসহ পৃথিবীতে হাবিবার পরিবার সবাই বিষয়টা মেনেও নিলো।
*******
সময় থেমে থাকে না। বহু বছর কেটে গেছে।
যে রাজ্য একসময় রক্ত আর ধ্বংসে ভরে উঠেছিল, এখন সেখানে শান্তি নেমে এসেছে। জিন রাজ্যের সিংহাসনে আসীন নুসাইর। তার পাশে রাণী হাবিবা। দু’জনের ভালোবাসা আর বোঝাপড়ায় রাজ্য যেন নতুন আলোয় জেগে উঠেছে।
সকালে প্রাসাদের আঙিনায় দাঁড়িয়ে সূর্যোদয় দেখছে হাবিবা। তার চারপাশে ছোট ছোট জিনশিশুরা খেলায় মেতে আছে । হাবিবা কখনো মমতা ভরা দৃষ্টিতে ওদের দিকে তাকাচ্ছে, কখনো নুসাইরের দিকে। সময়ের সাথে সাথে সে-ও হয়ে উঠেছে শুধু রাণী না – একজন মমতাময়ী মা, রাজ্যের প্রতিটি প্রাণের কাছে আশ্রয়দাতা। দুই ছেলেমেয়ে আর স্বামী, শ্বাশুড়িকে নিয়ে সুখের সংসার হাবিবার। নূর আল জোহরা বয়সের ভাড়ে কিছুটা নুইয়ে পড়লেও যথেষ্ট সবল আছেন।
নুসাইর এখন অনেক পরিণত। শাসক হিসেবে দৃঢ়, কিন্তু হৃদয়ে কোমল। রাজসভায় তিনি কঠোর আইন মানান, তবে প্রজাদের সমস্যায় কণ্ঠে মিশে থাকে সহানুভূতি।
এদিকে সুলতানারও বিয়ে হয়ে গেছে। রাজপ্রাসাদের এক বিশাল উদযাপনের মধ্য দিয়ে তার বিয়ে হয় এক সাহসী জিন রাজপুত্রের সঙ্গে।
সুলতানা সুখে সংসার করছে। মাঝে মাঝে সে প্রাসাদে আসে, ভাই আর ভাবির সাথে গল্প করে। হাবিবার সাথে তার বন্ধুত্বও গাঢ় হয়েছে।
একসময়কার অস্থিরতা, যুদ্ধ আর মৃত্যুর স্মৃতি ধীরে ধীরে ইতিহাস হয়ে গেছে। তবে আরিবার নাম এখনো নুসাইরের মনে খোদাই করা আছে, এক গভীর অতীতের মতো। হাবিবা জানে, সেই স্মৃতি মুছে যাবে না, কিন্তু তিনি নুসাইরের আজকের হাসির কারণ হতে পেরেছে এটাই তার শান্তি। দুলফিকারের কথা আজও রাজ্যের সকল প্রজার মুখে মুখে রটে। নিজের জীবনের বিনিময়ে কীভাবে সেদিন ভ্যালেরিনাকে থামিয়েছিল তা সবারই জানা আছে।
“ আম্মিজান! আম্মিজান! “
বারান্দায় দাঁড়িয়ে কথা বলছিলো নুসাইর, হাবিবা। এরমধ্যে ছেলে রাইয়্যানের কণ্ঠস্বর শুনে ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠলো হাবিবা।
“ কী হয়েছে রাইয়্যান? “
রাইয়্যান ছুটে এসে মায়ের সামনে দাঁড়াল। একপলক বাবার দিকে তাকিয়ে ফের মায়ের দিকে দৃষ্টিপাত করে বলল,
“ আমি ফুপিজানের কাছে যাবো। ওখানে রেবা আছে, ওর সাথে খেলতে ভালো লাগে আমার। “
রাইয়্যানের কথা শুনে নুসাইর, হাবিবা দু'জনে হাসলো। রেবা সুলতানার মেয়ে। বয়সে রাইয়্যানের থেকে ছয় বছরের ছোটো। নুসাইর রাইয়্যানের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,
“ ঠিক আছে। নিয়ে যাবো। কিন্তু আগামীকাল তো তোমার জন্মতিথি। সেখানে তো সবাই আসবে, অনেক বড়ো আয়োজন করা হবে। “
“ তাহলে পরে যাবো। আগে জন্মতিথি পালন হোক তারপর। “
হাবিবা হেসে ছেলের কপালে চুমু খেলো।
“ ঠিক আছে। এখন তুমি খেলতে যাও। “
রাইয়্যান তাই করলো। বাবার কথামতো ছুটে চলে গেলো, খেলার উদ্দেশ্যে।
আচমকাই হাবিবাকে বুকে জড়িয়ে ধরলো নুসাইর। চমকাল হাবিবা।
“ কী করছেন? “
“ বেগমকে ভালোবাসার প্রস্তুতি নিচ্ছি। “
আরিবা লজ্জায় চোখ বন্ধ করে ফেললো। খুব নিচু স্বরে বলল,
“ বাচ্চারা আছে আশেপাশে। এখন না। “
“ তাহলে? রাতে? “
“ হুম । “
মুচকি হাসল নুসাইর। দীর্ঘশ্বাস ফেলে হাবিবাকে আরও গভীরভাবে বুকে জড়িয়ে ধরে রইলো।
জিন রাজ্যে আজ এক মহা উৎসব।
প্রাসাদের প্রতিটি প্রাঙ্গণ সোনালি আলোয় ঝলমল করছে। সিংহাসনের সামনে সাজানো হয়েছে নানান রঙের রেশমি পতাকা, বাতাসে উড়ছে ফুলের গন্ধ। আজ রাজ্যজুড়ে আনন্দ, কারণ রাজা নুসাইর ও রাণী হাবিবার ছোট ছেলের জন্মদিন।
শিশু রাজপুত্রকে ঘিরে উচ্ছ্বাস সীমাহীন। প্রজারা সারি বেঁধে এসে শুভেচ্ছা জানাচ্ছে। কেউ ফল-ফুল দিচ্ছে, কেউবা নানা উপহার। হাবিবা ছেলেকে নিয়ে সবার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। তার মুখে পরম সুখের হাসি।
সামনে দাঁড়িয়ে নুসাইর তার পরিবারের দিকে তাকিয়ে মনে মনে ভাবলো,
" সবকিছুর মাঝ দিয়েও আমি একদিন এমন শান্তি পাবো, কখনো ভাবিনি।"
প্রাসাদের আঙিনায় দৌড়ঝাঁপ করছে আরেক শিশু – নুসাইরের মেয়ে। সে লাল রেশমি জামায় যেন খুদে এক পরী। সুলতানাও এসেছে বরের সাথে। সাথে আছে পুচকে রেবা।
চারপাশে ঢাক-ঢোল বাজছে, গাইছে জিন নারীরা। দূরে মশালের আলোয় সাজানো এক বিরাট ভোজ চলছে। প্রজারা বসে খাচ্ছে, আনন্দ করছে। সবার চোখে আজ খুশির ঝিলিক।
“ দাদিজান তোমার চুলগুলো পেকেছে কেন?”
নূর আল জোহরা রাইয়্যানের কথায় হাসলেন।
“ বুড়ো হয়ে যাচ্ছি তো সেজন্য। তুমি যখন বুড়ো হবে তখন বুঝতে পারবে। “
রাইয়্যান দাদির বুকে মুখ গুঁজে বলল,
“ আমি বুড়ো হবোই না। “
ওর কথা শুনে সবাই হেসে উঠলো। হাবিবা বলল,
“ সবাইকে একদিন বুড়ো হতে হয় বাবা। “
“ তাহলে আর কী করার! আমিও না হয় হবো। “
নূর আল জোহরা হেসে রাইয়্যানের কপালে চুমু খেলেন। সবাই রাইয়্যানের জন্মতিথি নিয়ে আনন্দে মেতে রইলো। সুলতানাও নিজের পরিবারসহ আছে সেখানে। জিন রাজ্যে এখন শুধু খুশি আর খুশি। পাশাপাশি পৃথিবীতেও এখন কোলাহল কমেছে, যুদ্ধ কমেছে। জিন ও মানুষের মাঝে তৈরি হয়েছে এক অটুট বন্ধন। তাই মানুষের যেকোনো বিপদে জিনরা সাহায্য করে এখন।
পরিশিষ্ট
সময় গড়িয়ে গেছে। রাজ্য পেয়েছে নতুন সকাল, নতুন হাসি। নুসাইর এখন রাজপুত্র নয়, রাজা–একটি বিশাল সাম্রাজ্যের শাসক। পাশে আছে হাবিবা, আছে সন্তান, আছে সুখের সংসার। তবুও এক কোণে আজও বেঁচে আছে দু'টি নাম– দুলফিকার, আরিবা।
আরিবার জন্য দুলফিকার কোনো রাজপুত্র ছিলো না, কোনো শাসকও ছিলো না। সে ছিলো আশিক জিন।
যুদ্ধ, রাজ্য, সিংহাসন সবই ইতিহাস হয়ে যাবে একদিন, কিন্তু ভালোবাসার এই নাম ইতিহাসেরও বাইরে টিকে থাকবে। কারণ, মানুষ হোক বা জিন– প্রেমের গল্প কখনো মরে না, কেবল প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ে আলো হয়ে।
সমাপ্ত
এডিট– #আশিক_জিন বইটির প্রি-অর্ডার চলছে। এই গল্পের এন্ডিং আলাদা করে বই আসছে। ওটা হ্যাপি এন্ডিং এন্ড রোমান্টিক। 💀🖤