ফন্ট সাইজ:
থিম:
তুমি আসবে বলে বসন্ত এসেছে

৩১তম পর্ব

লেখক: জেরিন আক্তার নিপা

#তুমি_আসবে_বলে_বসন্ত_এসেছে '৩১'

#জেরিন_আক্তার_নিপা

পেখমের কন্ঠ শুনে তাওয়াফের ঠোঁটের হাসি চওড়া হলো। এমুহূর্তে নিজেকে আয়নায় দেখলে দেখতে পেত সে কতটা ব্লাশ করছে। ঠোঁটে হাসি লেপ্টে থাকলেও কন্ঠে গম্ভীরতা এনে বলল,

-নম্বরটা যেহেতু আমার ফোন ধরা ব্যক্তিটিও আমিই হবো।

এরকম রাশভারী গাম্ভীর্যপূর্ণ পুরুষালি কন্ঠস্বর হয়তো পঞ্চাশ বছরের পুরুষেরও হবে না। কাঙ্ক্ষিত কন্ঠ স্বরটি শুনতে পেয়ে পেখমের বুকের ভেতর ছলাৎ করে উঠল। সমস্ত কথাই হারিয়ে ফেলল বেচারি।

অপর পাশে পেখম নিশ্চুপ তাওয়াফও কতক্ষণ এই নীরবতা উপভোগ করল। নীরবতায় তিন মিনিট কেটে গেলে তাওয়াফ বলল,

-কিছু কি বলবি?

পেখমের হুঁশ ফিরল। তার বলতে ইচ্ছে করল, বলবেন তো আপনি। আমি বলার জন্য না আপনার থেকে শোনার জন্য কল করেছি।

-আমার পাপার সাথে আপনার কিসের শত্রুতা তাওয়াফ ভাই?

এরকম একটা প্রশ্ন তাওয়াফ আশা না করলেও প্রশ্নটা শুনে সে নিঃশব্দে হাসল। বাবার ভালোবাসা থেকে তাহলে কল দিয়েছে। তাওয়াফ অযথাই অন্য কারণ ভেবে খুশি হচ্ছিল। প্রশ্নটা করে ফেলে পেখম জিভ কামড়ে ধরল। এটা কী বলে ফেলেছে সে? তাওয়াফ কন্ঠস্বর কঠিন রেখে বলল,

-তোর বাবার মেয়েকে যদি আমি বিয়ে করতে চাইতাম, আর উনি বিয়ে দিতে রাজি না হতো তাহলে হয়তো উনার সাথে আমার শত্রুতা থাকত। যেহেতু এরকম কোন ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা নেই, তাই তোর বাপের সাথেও আমার কোন শত্রুতা নেই।

তাওয়াফের উত্তর শুনে পেখম হতভম্ব, বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। এরকম জবাব তাওয়াফের থেকে আসতে পারে পেখম হয়তো স্বপ্নেও ভাবেনি। পেখম বোকার মতো আরেকটা প্রশ্ন করে ফেলল,

-আপনি কি রাগ করেছেন?

পেখম তার রাগের পরোয়াও করছে দেখে তাওয়াফ হেসে ফেললেও পেখম যাতে বুঝতে না পারে তাই কাশল। পেখম অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,

-আপনি হাসছেন!

-এখনও হাসি আর কাশির মধ্যে পার্থক্য বুঝিস না?

পেখম কনফিউজ হয়ে গেল। তাওয়াফ ভাইকে হাসতে শুনেছে এতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু উনি বলছেন হাসেননি, কেশেছেন। পুরোপুরি পাগল হয়ে যাওয়ার আগে পেখম বলল,

-ঠিক আছে। এখন তাহলে রাখছি।

-দাঁড়া।

পেখম ভ্রু কোঁচকাল। আবার কেন ডাকে?

-কিছু বলবেন?

-তুই যেটা বলার জন্য কল দিয়েছিলি সেটা না বলেই কল কেন রাখছিস?

-বলেছি তো।

-কী বলেছিস?

-যা বলতে কল করেছিলাম।

-কী বলতে কল করেছিলি?

তাওয়াফ ইচ্ছে করেই কথা বাড়াচ্ছে। তাওয়াফ ভাইয়ের প্যাঁচানো শুনে পেখমের মাথার তারে প্যাঁচ খেয়ে যাচ্ছে।

-আপনি আমার পাপার সাথে শত্রুতা করবেন না। আমি চাই না আপনাদের মাঝে ঝামেলা হোক।

তাওয়াফ ভ্রু নাচিয়ে জানতে চাইল,

-কেন চাস না?

-কারণ উনি আপনার চাচা। চাচা ভাতিজার এমন দা-কুমড়া সম্পর্ক আমার ভালো লাগে না।

-তোর ভালো লাগে না এতে আমার কী করার আছে?

পেখম পাল্টা প্রশ্ন করল,

-কিছু করার নেই?

তাওয়াফ টিশার্ট পরতে পরতে নিঃশব্দে হেসে বলল,

-এখন কি আমাকে তোর ভালো লাগার গুরুত্ব দিয়ে চলতে হবে! তোর ভালো লাগে না বলে তোর বাবার সাথে সম্পর্ক ভালো রাখতে হবে?

পেখম হাঁপিয়ে উঠে রাগ দেখিয়ে বলল,

-ঠিক আছে। আপনাকে সম্পর্ক ভালো রাখতে হবে না। আপনি আমাদের সাথে আরও শত্রুতা করুন।পাপাও আমার ওবাড়িতে যাওয়া একেবারের জন্য বন্ধ করে দিক। তাহলেই তো আপনি খুশি হবেন। আপনি তো এটাই চান আমি যেন আপনাদের বাড়িতে না যাই।

পেখম কল কেটে দিলে তাওয়াফ মন খুলে কতক্ষণ হাসল। বোকা প্রজাপতি কবে বুঝবে তাওয়াফ আসলে কী চায়। তাওয়াফ চায় পেখম চব্বিশ ঘণ্টাই তার চোখের সামনে থাকুক। সে যতক্ষণ বাড়িতে থাকে সারাক্ষণ তার আশেপাশে ঘুরঘুর করুক। লজিক ছাড়া বোকা বোকা সব কথা বলে তাওয়াফের হাসির কারণ হোক। তাওয়াফের দুঃস্বপ্নের ঔষধ হোক। তার মানসিক শান্তি হোক।

****

তিনদিন পর কনিকার বিয়ে। তারপরও আজ তাকে কনিকার কাছে আসতে হয়েছে। মেয়েটা তার মাথা না খেলে শান্তি পায় না। কাউন্সেলিং এর নাম করে যা তা করে। তার অসুস্থতা নিয়ে কনিকার কোন মাথা ব্যথা নেই। এর সব ইন্টারেস্ট তার লাভ লাইফ নিয়ে। তাওয়াফই গাধা। কেন স্বীকার করেছিল তার একজন পছন্দের মানুষ আছে।

-মেয়েটা দেখতে কেমন রে?

-প্রজাপতির মতন।

কনিকা ডান ভ্রু উঁচিয়ে রসিয়ে রসিয়ে বলল,

-প্রজাপতি! বাটারফ্লাই। এজন্যই তাকে দেখে তোর মনে বসন্ত এসেছে! আমাকে না দেখাস কিন্তু নাম তো বলতেই পারিস।

-না।

কনিকা অধৈর্য গলায় বলল,

-কেন? আমি কি ছেলে? তোর পছন্দের মানুষকে পটিয়ে ফেলব? আমাকে বলতে সমস্যা কী?

বরাবরের মতো আজও তাওয়াফ বিরক্তি চেপে কনিকার প্রশ্নের উত্তর দিয়ে যাচ্ছে।

-সে আমার কাছে ঝিনুকে লুকানো মুক্তোর মতো। ভীষণ স্পেশাল আর অনেক মূল্যবান। তাকে ঝিনুকের বাইরে এনে আমি খোলস ছাড়া করতে চাই না।

মেয়েটার কথা বলতে গিয়ে তাওয়াফের চোখে-মুখে আলাদা একটা উজ্জ্বলতা লক্ষ্য করেছে কনিকা। সে মুখ টিপে হেসে বলল,

-তাওয়াফ তুই কি বুঝতে পারছিস ওই মেয়েটাকে তুই কতটা ভালোবাসিস!

পছন্দের কথা স্বীকার করে যে প্যারায় ফেঁসেছে! ভালোবাসার কথা স্বীকার করে নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারার কাজ কিছুতেই করবে না। তাই বলল,

-তোর ভাবনা প্লিজ আমার নামে চালাস না।

-তুই স্বীকার কর বা না কর, তুই ওই মেয়েটাকে ভালোবাসিস। শুধু ভালোবাসিস বললে কম হবে। অনেক বেশিই ভালোবাসিস। ভালোবাসা অন্যায় না তাওয়াফ। তুই চাইলেই একটা মানুষকে ভালোবাসতে পারবি।

-সেই মানুষটা যদি আমাকে ভালো না বাসে?

-না-ই বাসতে পারে। এটা অস্বাভাবিক কিছু না। তুই কাউকে ভালোবাসলে তারও যে তাকে ভালোবাসতে হবে এটা বাধ্যতামূলক না।

-কিন্তু সেই মানুষটা যদি আমাকে ভয় পায়? আমার উপস্থিতি তার অখুশির কারণ হয়।

তাওয়াফের কন্ঠে বিষাদ চোখের দৃষ্টিতে লুকানো কষ্ট দেখতে পেয়ে কনিকা নরম গলায় বলল,

-এমনটা কেন বলছিস। তুই কারো অখুশির কারণ হতে পারিস না।

তাওয়াফ হাসল। তবে তার এই হাসিতে প্রাণ নেই। উদাস গলায় বলল,

-আমি তার অখুশির কারণ হয়েছি কনিকা। আমার সাথে সে মন খুলে হাসতে পারে না। আমার সামনে সে যা খুশি তা-ই বলতে পারে না। আমার সামনে নিঃশ্বাস নিতেও সে দু'বার ভাবে।

-আমি জানি তুই কেমন। কেন সবকিছু তুই নিজের মধ্যে রেখে দিস? আমার সাথে যেমন শেয়ার করিস ওই মেয়েটাকেও কি একটু বোঝাতে পারিস না?

-তাকে বুঝতে দিলে পরিস্থিতি আরও অকওয়ার্ড হয়ে যাবে।

-মোটেও না। সে তোকে ভয় পায় কারণ তুই তোর সফট সাইটডা তার থেকে লুকিয়ে রেখেছিস। সে তোকে রাগী, কঠিন রুপেই দেখেছে। যেদিন সে তোর সফট লাভার বয় রুপটা দেখবে সেদিন তোকে আর ভয় পাবে না। বরং তোর ভালোবাসায় নিজেকে রাঙিয়ে নিবে।

-হয়েছে তোর? এবার আমি উঠব। অফিসে না গিয়ে তোর কাছে এসেছি আমার মূল্যবান সময় নষ্ট করতে। যা অলরেডি করেও ফেলেছি।

তাওয়াফ উঠে দাঁড়িয়ে কনিকার ডেস্কের উপর থেকে নিজের ফোন হাতে নিল। বেরিয়ে পড়ছে সে।

কনিকা তাওয়াফের পিঠে মেরে বলল,

-পারলে আমার বিয়েতে তাকে নিয়ে আসিস। তাহলে আর গিফটও আনতে হবে না। তোর পছন্দের মানুষ আমার বিয়ের সবথেকে দামি এবং স্পেশাল গিফট হবে।

****

বাড়ির পরিবেশ অশান্ত। বাবা চাচাদের মধ্যে দুশ্চিন্তা লক্ষ্য করা যায়। তাদের কি সত্যিই তাওয়াফ ভাইয়ের জন্য পথে নামতে হবে? বিজনেস সম্পর্কে যদিও পেখমের খুব একটা ধারণা নেই। তবে বিজনেসে লাভ লস সে বুঝে। তাওয়াফ ভাই জেনে-বুঝে কেন তাদের ক্ষতি করবে? পেখম দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে হাঁটতে হাঁটতে আজানের ঘরে চলে এলো। আজান দরজায় কারো শব্দ পেয়েই হাত থেকে গিটার নামিয়ে রাখল। পেখম লটকানো মুখে ভেতরে এসে ধপ করে বেডে বসে পড়ল। আজান অনুসন্ধানী চোখে বোনকে দেখে জিজ্ঞেস করল,

-কী হয়েছে পেখম রানীর?

পেখম শূন্য দৃষ্টিতে কোথাও তাকিয়ে আছে। গলায় নিরাশা নিয়ে বলল,

-আজান ভাই আমার মাথায় মনে হয় কোন সমস্যা হয়েছে। মাথায় সমস্যা হলে মানুষ কোন ডাক্তার দেখায়?

আজানের কপালে ভাঁজ পড়ল। তবে পেখমকে সে এতটা সিরিয়াসলিও নিল না। জানে তো এই মেয়ের খবর।

-মাথায় সমস্যা হলে পাগলের ডাক্তার দেখাতে হবে।

-ইলহাম ভাই কি পাগলের ডাক্তার? তাকে দেখালে আমার সমস্যা ঠিক হবে?

-ইলহাম ভাই তোর মাথা কেটেকুটে ব্রেন পরীক্ষা করে দেখতে পারবে।

পেখম দৃষ্টি ফিরিয়ে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে দুঃখ ভরা গলায় বলল,

-মাথা কাটলে কি আমি বেঁচে থাকব?

-পাগল হয়ে বেঁচে থাকার চেয়ে মরে যাওয়া ভালো না?

ফোঁস করে দম ফেলল পেখম।

-আজান ভাই তুমি অনেক নিষ্ঠুর মানুষ। এসব কথা কত সহজে বলে ফেলতে পারছো।

-আচ্ছা যা। ওসব কথা আর বলব না। এখন বল তোর সমস্যাটা কী?

পেখম আশার আলো নিয়ে ভাইয়ের দিকে তাকাল।

-তুমি সমাধান করতে পারবে!

আজান ঠোঁট বাঁকিয়ে কতক্ষণ কিছু ভাবল। ভাবা শেষ হয়ে গেলে বলল,

-সমস্যার ধরন, সমস্যা কতটুকু বেড়েছে এটা তো আগে জেনে নিই।

-ঠিক আছে। বলছি তোমাকে। ধরো আগে আমি যাকে দু’চোখে দেখতে পারতাম না। তাকে এখন লুকিয়ে লুকিয়ে দেখি। তাকে নিয়ে...

পেখমকে কথার মাঝখানে থামিয়ে দিয়ে আজান জিজ্ঞেস করল।

-ছেলেটা কে?

চুরি করতে এসে চোর ধরা পড়ে গেলে যেমন ভয় পায় পেখম তার থেকেও বেশি ভয় পেয়ে গেল। তাড়াহুড়ো করে বলে উঠল,

-ছেলে না তো! আমি তো কোন ছেলের কথা বলছি না। তুমি কোন ছেলের কথা জিজ্ঞেস করছো?

আজান গম্ভীর মুখে বলল,

-সত্য না বললে তোর সমস্যার সমাধান করতে পারব না।

আজান মিটিমিটি হাসছে। সত্য কথা কীভাবে বলবে সে? কীভাবে বলবে তাওয়াফ ভাইকে একদিন না দেখলে কতটা মিস করে। কীভাবে বলবে তাওয়াফ ভাইকে দেখলে তার দিনটা কত ভালো কাটে। এসব কথা কি কাউকে বলা যায়? কিন্তু না বলেও তো সমাধান পাওয়া যাবে না। পেখম এদিক ওদিক তাকিয়ে আমতা আমতা করে বলল,

-আমাদের কলেজের একটা ছেলে।

-এই বয়সেই ছেলের চক্কর! কাকাকে জানাব? কলেজে কি পড়তে যাস নাকি ছেলে দেখতে যাস? তুই তো লেখাপড়া গাঙে ভাসাবি। ছেলেদের চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে পড়াশোনায় মনোযোগ দে।

-এজন্যই তোমাকে বলতে চাইনি। তুমি সমাধান দিবে বলে এখন জ্ঞান দিচ্ছ।

-যে জ্ঞান দিয়েছি এটাই তোর সমাধান। একটা ছেলেকে আগে তুই দেখতে পারতি না। এখন লুকিয়ে দেখিস। এর মানে ছেলেটাকে তুই পছন্দ করতে শুরু করেছিস। এই পছন্দ হাওয়া পেলে ভালোবাসায় পরিনত হবে। তাই আমি আগুনে হাওয়া না দিয়ে পানি ঢালার চেষ্টা করছি।

-দূর। তুমি কচু বুঝেছ। ওই ছেলেকে ভালোবাসার কথা আমি স্বপ্নেও ভাবতে পারি না। পছন্দ করার মতো ওই ছেলের মধ্যে কিছুই নেই। বরং অপছন্দ করার জন্য দশটা কারণ দেখাতে পারব।

-তাহলে লুকিয়ে কেন দেখিস?

-এটাই তো বুঝতে পারছি না। তাই তো বলছি, আমার মাথায় মনে হয় সমস্যা হয়েছে।

-সমস্যা মাথায় না। তোর মনে হয়েছে।

পেখম ঠোঁট কামড়ে মনে মনে ভাবল, হতে পারে। কারণ তাওয়াফ ভাইকে দেখলে তার বুক ধড়ফড় করে। মাথায় না। হার্টেই হয়তো কোন সমস্যা হয়েছে। তাই ভালো কোন হার্টের ডাক্তার দেখাতে হবে।

চলবে

পাঠক অনেকদিন পর গল্প দিচ্ছি। পারলে সবাই একটু বেশি বেশি করে কমেন্ট করবেন। 💜

আগের পর্ব

https://www.facebook.com/share/p/1EqeYXZnBP/

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩১তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন